Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩ (২)
jannatul firdaus mithila

“ আ’ই উইশ…তুই যদি কোনোদিন আমার না বলা কথাগুলো বুঝতি।”
আত্মগ্লানির হাহাকারে ভঙ্গুর রূঢ় মানবের কন্ঠস্বর। ভারী হয়েছে বাদামী চোখদুটোর পর্দা। লালিমা ছেয়েছে সুদর্শন গম্ভীর মুখাবয়বে। রুক্ষ অধরযুগল তার ঠায় ছুঁয়ে রাখা সপ্তদশীর মসৃণ ললাটতটে। তা সরানোর খুব একটা তাড়া নেই মুগ্ধের। চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু! সপ্তদশীর উষ্ণ গা, জ্বরের তাপমাত্রা বাড়ছে ক্রমশ। সে-ই উষ্ণতায় জ্বলছে রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বক্ষভাজ। মুগ্ধ নড়ল খানিক। অচেতন মানবীর ললাটতট হতে আলতো করে সরিয়ে আনলো নিজ রুক্ষ অধরযুগল। অতঃপর ধীরলয়ে মেয়েটাকে ফের শোয়ালো মখমলি বিছানার কোলে। স্থবির বনে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। অনিমেষ দৃষ্টে দেখছে মাহি’কে। সে বেশ টের পাচ্ছে তার বুক কাঁপছে! বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা ভীষণ লাফাচ্ছে। সুদীর্ঘ কন্ঠনালীর অভ্যন্তরে চাপ বসেছে মনে হচ্ছে। মুগ্ধ কপাল গোছালো। নিরব যন্ত্রণায় মুখখানা কুঁচকে নিয়ে হাত উঁচিয়ে রাখল নিজ উম্মুক্ত বক্ষের বাঁপাশে। সেথায় অনবরত হাত ডলতে ডলতে, রুক্ষ অধরযুগলের মধ্যকার দুরত্ব বাড়াল মুগ্ধ। নিঃশ্বাস টানলো অগোছালো ভঙ্গিতে। অস্থিরতার চূড়ান্ত শিখরে পোঁছাতেই হুট করে মস্তিষ্কে টনক নড়ল তার। ত্বরিত বেগে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল অচেতন মাহি’র ফ্যাকাশে মুখপানে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার। তার কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই! এহেন ভাবাবেগে তক্ষুনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। ব্যাকুল পদক্ষেপে ছুটে যায় ঘর সংলগ্ন ওয়াশরুমে।

দেয়ালঘেঁষা ঘড়ির কাঁটায় ঢংঢং শব্দ বাজছে আবারও। জানান দিচ্ছে রাত্রির শেষ প্রহর শেষ হবার বার্তা। একজোড়া শক্তপোক্ত হাত বেগতিক জ্বরে কুপোকাত মাহি’র সেবাশুশ্রূষায় ব্যস্ত। বারেবারে উদ্বেগী কায়দায় ঘন্টা খানেক পেরুলেই পরোখ করছে থার্মোমিটারের পারদ। সপ্তদশীর মসৃণ ললাটে একখানা সফেদ রঙা পাতলা পট্টি ছড়িয়ে রাখা। সামান্য উষ্ণ হলেই তা বিরতিহীন ভঙ্গিতে বারংবার নতুন পানিতে ভিজিয়ে ফের রমণীর উষ্ণ ললাটে ছড়িয়ে দিচ্ছে মুগ্ধ। নিজ রুক্ষ হাতের অমসৃণ তালু দিয়ে ধীরলয়ে মালিশ করছে মেয়েটার শীতল পাদু’টোর তালু। মাঝেমধ্যে স্পঞ্জ বাথের ন্যায় টুকটাক মুছিয়ে দিচ্ছে রমণীর সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠদেশ।

রাত প্রায় শেষ হলো বলে। আরেকটু পরেই বোধহয় পূব আকাশে দেখা মিলবে দিনের একফালি আলোর! অথচ রূঢ় মানবের চোখদুটোর পাতা আজ বড্ড অনড়। সেথায় ঘুমের লেশমাত্রও নেই, রয়েছে কেবল এক আকাশসম উদ্বিগ্নতা। রমণীর পদতলে হাত ঠেকিয়ে, হালকা ধূলোপড়া মেঝেতে আসন পেতে বসে আছে মুগ্ধ। মালিশ করছে মাহি’র পা। তন্মধ্যে উদ্বেগী কায়দায় খানিকটা ঝুঁকে এসে পরোখ করল থার্মোমিটারের পারদ। ওমনি তার বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগলে ধরা পড়ল সপ্তদশীর বর্তমান দৈহিক তাপমাত্রা! জ্বর নেই আর। কমেছে বড্ড ধীরলয়ে। তক্ষুনি বুক ফুলিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রূঢ় মানব। দৃষ্টিতে নামায় একরাশ প্রশান্তির ছাপ। অন্তঃকোণে শীতলতার ঢেউ বইছে তার।পরম স্বস্তিতে খানিকটা ঝুঁকে এসে আচমকা দু’হাতে আঁকড়ে ধরে অচেতন মানবীর কোমল উদরদেশ। পরপরই সেথায় আলগোছে গুঁজে দেয় নিজ প্রকাণ্ড মস্তক। নাক ডোবায় সপ্তদশীর নাভিকমল অঞ্চলে। একইরকম ভঙ্গিমা ধরে রেখে বারকয়েক জোরালো নিঃশ্বাস টানল মুগ্ধ। আলতো স্বরে আওড়াল,
“ ওয়েক আপ সিগনোরা! আই ডোন্ট নো হোয়াই, আ’ম ফিলিং লো উইদাউট ইউ্য।”
ঘুমন্ত মাহি’র কর্ণকুহর অব্ধি পৌঁছায়নি রূঢ় মানবের এহেন ভনিতা হীন স্বীকারোক্তি। পৌঁছালে বোধহয় থমকাতো নিশ্চিত। এদিকে, মেয়েটার নরম তুলতুলে উদরে মুখ গুঁজতেই আবেশে চোখদুটো বুঁজে এলো মুগ্ধের। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ফলপ্রসূ হিসেবে চোখদুটোর পাতা হলো ভারী। আপনাআপনি ধরা দিতে চাইলো ঘুম। একটুকরো শান্তির ঘুম! তবে মুগ্ধ মহাশয় সেসবে তোয়াক্কা দিলো না। নির্ঘুমে জড়িয়ে রাখল মেয়েটার উদর।

বড্ড দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ! কানের কাছে খুটখুট করছে কি যেন একটা। এহেন উদ্ভট পরিস্থিতিতে গাঢ় ঘুমটা কেমন হালকা হয়ে গেল মাহি’র। মসৃণ ললাটের চামড়ায় হুট করেই দৃশ্যমান হলো গোটাকতক ভাঁজের ছাপ। নড়চড় বাড়ল ক্লান্তিতে মুদে থাকা ক্ষুদ্র বদনখানিতে। ওমনি রমণী টের পেলো তার ক্ষুদ্র বদন আটঁকা পড়েছে কোনো এক দৈবাৎ শক্তির জোরালো বাঁধনে। মাহি নড়ল টুকটাক। ছাড়াতে চাইলো নিজেকে। কিন্তু বালাইষাট! অদেখা বাঁধনটা এতো দৃঢ়! তৎক্ষনাৎ ঘুম বিজড়িত চোখদুটো একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুললো সপ্তদশী। ধীরলয়ে দৃষ্টি ফেলল এদিক-ওদিক। পরক্ষণেই ভর দিলো দু’হাতের দূর্বল কনুইয়ে। ঘামে জবজবে শরীরখানা খানিকটা উঁচাতেই ভড়কায় মাহি। উদর পানে বলিষ্ঠ মানবকে ওমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে দেখে বাকশূন্য মানবীর জিভের ডগা। হতবিহ্বলতার ছাপ ফুটলো মুখাবয়বে। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক তখনো পরিপূর্ণ রূপে সজাগ হয়নি তার। বোকার ন্যায় আবারও বদনে নড়চড় চালাতেই হুঠাৎ তার উদর হতে মাথা তোলে মুগ্ধ। ক্লান্ত দুটো বাদামী চোখ পরপরই একযোগে নিক্ষেপ হলো সপ্তদশীর পানে। মাহি একমুহূর্ত স্থির রইল। হতভম্বতায় ডুবে থাকতেই মস্তিষ্ক হুট করে সজাগ হলো তার। একে একে মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের সকল ঘটনা! ওমনি রমণী ঢোক গিললো। রূঢ় মানবের লাগামহীন হিং স্র কর্মকাণ্ডের শঙ্কায় কাঁপতে লাগলো কেমন। মুগ্ধের গভীর চোখদুটো নিরবে দেখল সব। দেখল মেয়েটার অদৃশ্য ভয়। তক্ষুনি ফের অপরাধবোধ বাড়ল রূঢ় মানবের। বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো একখানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। দৃষ্টিতে শীতলতা নামিয়ে ভরাট কন্ঠে আওড়াল,

“ ইউ্য ডোন্ট হেভ টু বি আফ্রেইড সিগনোরা। আমি আপাতত কামড়াকামড়ি করব না।”
সহসা চিবুক নামালো মাহি। ভয়ের রেশ খানিকটা কমতেই টের পেলো রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাতদুটোর জোরালো টান! তক্ষুনি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সম্মুখে তাকায় মানবী। দেখে — মুগ্ধ তার শক্ত হাতদুটোর দৃঢ় বাঁধনে আবারও সস্নেহে আগলে নিচ্ছে তার মেদহীন উদর। শুকনো ঢোক গিলে মাহি। তড়িঘড়ি করে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত হতেই আচানক শিকার হয় রূঢ় মানবের উদ্ভট কর্মকান্ডের। মুগ্ধ মুখ ডুবিয়েছে মেয়েটার উদরে। মাহি নড়তে চাইলেই বাড়াচ্ছে হাতের জোর। মানবী অতিষ্ঠ হলো এপর্যায়ে। অতিষ্ঠ কন্ঠে হুট করেই শুধালো,
“ কি হয়েছে আপনার?”
রূঢ় মানব তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করেনি। উল্টো সরু নাকের ডগাটা আলগোছে ঘষে দিলো মেয়েটার নাভিকমল অঞ্চলে। তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল ক্লান্ত রমণীর। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, নিজ রুক্ষ অধরযুগল খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে মুগ্ধ কেমন ভারী কন্ঠে শুধালো,

“ কিচ্ছু না।”
বোকা মানবীর অস্বস্তি বাড়ল এবার। মোচড়াতে লাগল ক্ষুদ্র বদনখানি। আমতা আমতা স্বরে আওড়াল,
“ ছাড়ুন তাহলে!”
“ ইচ্ছে করছে না।”
মুগ্ধের পরপর ছোট প্রতুত্তর। তা কর্ণধার হতেই সামান্য ঢোক গিললো মাহি। সৌজন্যতার খাতিরে আচমকা জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি কি অসুস্থ?”
তক্ষুনি মাথা তোলে মুগ্ধ। ঘোলাটে দৃষ্টিযুগল মেয়েটার পানে তাক করে রেখে মুখের ওপর বলে বসল,
“ উঁহুম! অপেক্ষায় ক্লান্ত।”
বলিষ্ঠ পুরুষের কন্ঠস্বর অদ্ভুত শান্ত! সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখখানায় সে-কি ক্লান্তির ছাপ। রমণীর নিখাঁদ দৃষ্টি হতে লুকোতে পারেনি তা। তাইতো পরপরই ভেসে এলো সপ্তদশীর পাল্টা প্রশ্ন!
“ কিসের অপেক্ষায়?”
অধরের কোণে আচমকা মৃদু হাসির টান বসল মুগ্ধের। দৃষ্টে নামল চাতকী তৃষ্ণা। কন্ঠনালীর নিখাঁদ সৌন্দর্যমণ্ডিত উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে, সে কেমন নির্মল কন্ঠে শুধালো,
“ যদি বলি তোর! তবে কি বিশ্বাস করবি?”
থমথমে ভাবভঙ্গি ফুটলো মাহি’র মুখাবয়বে। দৃষ্টি ঝুঁকে গেল আপনা-আপনি। কন্ঠে তাচ্ছিল্য ভর করল তার। সময় নিয়ে শুধালো,

“ কেনো? আবারও মে’রে -টে’রে বিছানায় শোয়ানোর ইচ্ছে হচ্ছে না-কি আপনার?”
অন্তঃকোণে সামান্য মোচড় ধরল মুগ্ধের। মোটা কন্ঠ ফুঁড়ে তার অজান্তেই বেরিয়ে গেল,
“ আমি কি শুধু মা’রি-ই তোকে ?”
রমণীর তাচ্ছিল্যের হাসি এবার রূপ টানলো প্রশস্ত কায়দায়। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত স্বরে পরপরই প্রতুত্তর করল,
“ এখন পর্যন্ত আপনার কাছ থেকে মা’র, অপমান, হিং স্রতা ছাড়া আর কিছুই পাইনি অবশ্য!”
অভ্যন্তরে আহত হলো রূঢ় মানব। চোয়ালের পেশি হলো দৃঢ়। রমণীর কথায় ভুল নেই। তা বোধ হতেই বুকের মাঝে অদৃশ্য চাপ বাড়ল তার। ওদিকে, দূর্বল মানবী কোনমতে ওঠে বসার প্রয়াস চালাচ্ছে। তবে কান্ড দেখো! মাথাটা হুট করেই ঘোরাচ্ছে তার। দূর্বল বদনখানি টলমল হতেই সম্মুখ থেকে একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এগিয়ে এসে আচমকা আগলে নিলো তাকে। মাহি স্থির! হতবাক দৃষ্টিজোড়া উঁচিয়ে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো — সুদর্শনের গম্ভীর মুখ। গম্ভীর মুখে মেয়েটাকে সযত্নে উঠিয়ে বসাচ্ছে বিছানার হেডবোর্ডের সঙ্গে। মাহি রা করল না। বাধ্য মেয়ের ন্যায় চুপচাপ উঠে বসল বিছানায়। ততক্ষণে মেয়েটার পিঠের কাছে একখানা বালিশ টেনে দিয়েছে রূঢ় মানব। মাহি’র সর্বাত্মক আরাম নিশ্চিত করে গম্ভীর মুখে আচানক বলে উঠল,

“ আফসোস! তুই আমার সব দেখলি তবে অন্তর দেখলি না!”
সহসা ঘাড় বাঁকায় মাহি। ভ্রু উঁচিয়ে তাকায় সুদর্শনের পানে। মুগ্ধ গম্ভীর! তাকাচ্ছে না মেয়েটার দিকে। মাহি তখন শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলেই বসল,
“ মনস্টারদের অন্তর বলতে কিছু হয়না অধীর রায়।”
থমকায় মুগ্ধ! কপাল গোছায় পরক্ষণে। কথার সমীকরণে মেয়েটাকে বেঁধে ফেলতে শেষ বাক্যবাণ ছুঁড়ে মুহুর্ত ব্যয়ে।
“ বিউটির বিস্টের তো হয়!”
সহসা হতভম্বতার ঘোরে ডুবল মাহি। মস্তিষ্ক ব্যর্থ হলো রূঢ় মানবের ছোঁড়া বাক্যবাণের অর্থ বুঝতে। মুগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টে দেখল রমণীর এহেন হতভম্বতা। গরম মুখে খানিকটা ঝুঁকে এসে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই আচানক রমণীর ক্ষত ওষ্ঠপুটের ওপর আলতো করে ছোঁয়াল নিজ অধর। এরূপ অতর্কিত কান্ডে আঁতকে উঠে মাহি। চোখদুটো তার বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল কেমন। মুখের সম্মুখে ঝুঁকে থাকা রূঢ় মানবের সুশ্রী মুখমণ্ডল পানে তাকিয়ে থাকতেই মুগ্ধ কেমন বাঁকা হেসে বলে ওঠে,

“ চাল চাল! তারাতাড়ি ওঠ বান্দীর…..”
আশ্চর্য! মানবীর মায়াবী চোখজোড়ার পানে দৃষ্টি আটকাতেই আচমকা বাকরুদ্ধ হলো মুগ্ধ। জিভের ডগায় “ বান্দীর মেয়ে ” ডাকটা এসেও বেরুচ্ছে না কেমন। রূঢ় মানব সময় নিলো। বোকা মাহি’র মলিন মুখখানায় খানিকক্ষণ দৃষ্টি বুলিয়ে হঠাৎ সন্দিগ্ধ গলায় বলে উঠল,
“ ইউ্য আর মাইন রাইট? সো ফ্রম নাউ ইউ আর — মনস্তার’স বান্দী! কিউট নাহ?”
মুখ কুঁচকায় মাহি। ঝাঁঝ দেখিয়ে মুখ ঘোরায় অন্যত্র। তা দেখে গালের ভাঁজে জিভ ঠেলল মুগ্ধ। মেয়েটার রাগান্বিত মুখশ্রীটা সময় নিয়ে বিমুগ্ধ হয়ে দেখল সে। এতক্ষণে বোধহয় ক্লান্তি কমলো তার। কমলো সকল অচেনা অস্থিরতা!

“ হায় ভগবান! শুনলে শুনলে? কিরম অলক্ষুণে দানবীয় কান্ডখানা ঘটে গেলো শুনলে? তোমার দানব ভাগ্নেটা। হায় হায়! গত একরাতেই না-কি ঐ পুঁচকে মেয়েটার হাল বেহাল করে ছেড়েছে তোমার দানব ভাগ্নেটা! ভগবান জানে, কি এমন কান্ড সেরেছে যার জন্য পুরো একটারাত হুঁশ নেই বেচারির। শরীরে বাধিয়েছে ১০৩° জ্বর। কিছুক্ষণ আগে তিন তলায় গিয়েছিলাম বুঝলে? উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে এলাম পুঁচকে মেয়েটার অবস্থা। দেখলাম….”
একমুহূর্ত থামলেন সুদীপা রায়। তার কন্ঠে উপচে পড়া রাগ! মুখাবয়বে লেপ্টে আছে এক আকাশসম ঝাঁঝের ছাপ। দৃষ্টিতে আগুন ছড়িয়ে তাকিয়ে আছে স্বামীর পানে। বলে যাচ্ছেন কতকিছু! অথচ সেদিকে অপারগ হিমাংশু রায়। কব্জি অব্দি ডুবিয়ে রেখেছেন সুক্তের থালায়। চেটেপুটে খাচ্ছেন গরম গরম ভাতের সঙ্গে। তা বোধহয় আর সহ্য হলোনা কর্তাগিন্নির। রাগে গজগজ করতে করতে তক্ষুনি নজর ঘোরালেন এদিক-ওদিক। টেবিলের ওপর সগৌরবে দাঁড় করিয়ে রাখা কাঁচের ক’টা গ্লাস। কর্তাগিন্নির সকল রাগ গিয়ে উপচে পড়ল সেসব নির্জীবদের ওপর। ক্ষুব্ধ বাঘিনীর ন্যায় একহাতে একখানা গ্লাস খামচে ধরে তা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। মুহুর্তেই চিড়বিড় শব্দ তুলে কাঁচের গ্লাসটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে গেল এদিক-ওদিক। এতক্ষণে স্ত্রীর পানে মনোযোগ টানলেন হিমাংশু রায়। মুখাবয়বে এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ নিয়ে তাকালেন গজগজ করতে থাকা স্ত্রীর পানে। গোটালেন মসৃণ ললাটের চামড়া। মুখভর্তি ক’টা কটুবাক্য আওড়ানোর উদ্দেশ্যে অধরযুগল খানিক নাড়লেন হিমাংশু রায়,

“ সকাল সকাল পা গ ল হয়ে গিয়েছো তুমি? না-কি রাতের নে শা এখনো কাটেনি? কতবার করে বলেছি রাতের বেলা বেশি বেশি গিলতে না।”
তেঁতে উঠলেন সুদীপা রায়। তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে উঠার ন্যায় ঝাঁঝিয়ে বললেন,
“ মুখ সামলে কথা বলো নিরুর বাবা। আমি ততটুকুই গিলি যতটুকু হজম করতে পারি। তোমার খচ্চর নই আমি!”
কপাল কুঁচকে গেল হিমাংশু রায়। উদ্যোত হলেন আর-ও কিছু বলতে। তবে পথিমধ্যে বাঁধ সাধলেন গিন্নি। আগ বাড়িয়ে হড়বড়িয়ে বললেন,
“ শোনো নিরুর বাপ! তোমার ভাগ্নে অধীর কোনো সাধারণ মানুষ না, আমি নিশ্চিত ও একটা দানব। মেয়ে মানুষের ক্ষুধা থাকে না কার শুনি? কিন্তু কেউ তো তাদের ছিড়েখুঁড়ে দেয় না। তোমার ভাগ্নে কি করেছে জানো? আমি ঐ পুঁচকে মেয়েটার ঠোঁটগুলো দেখে এলাম। ইশশ্! দেখে মনে হলো — কেউ বোধহয় ছিড়েখুঁড়ে খেয়েছে বেচারির ঠোঁটদুটো। ভোর রাত্তিরে ডাক্তাররা বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে যাবার সময় কানপেতে শুনলাম, ওরা সব কানাঘুঁষা করছে,

“ ঐটুকুন একটা মেয়ের সঙ্গে এতো রাফলি এসব না করলেই নয়!”
কথাটার মানে বুঝলে? মানে হচ্ছে তোমার ভাগ্নে….ছিহ!”
মুহুর্তেই বিরক্তির পারদ তরতর করে বেড়ে গেল হিমাংশু রায়ের। দাঁতের সনে পিষ্ট হলো দাঁত। কটমট শব্দ তুলে যে-ই না কিছু আওড়াবেন ওমনি তার আনমনে দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল স্ত্রীর ঠিক পেছনে। যেথায় তিন হাত দুরত্বে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠদেহী রূঢ় মানব। ফর্সা পেটানো দেহখানায় আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে আছে একখানা কালো রঙা হাতাকাটা ট্যাংক-টপ, সঙ্গে জুড়েছে ঘিয়ে-রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজার। হাতদুটো কেমন আত্ম-অহমিকায় গুঁজে আছে ট্রাউজারের পকেটে। ফলে ফুলেফেঁপে উঠেছে তার মাংসল বাহুদ্বয়! চোয়াল শক্ত তার, দৃষ্টি হয়েছে তীক্ষ্ণ। শক্ত মুখে নিরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে সুদীপা রায়ের কর্কশ বাক্যালাপ। ভড়কান হিমাংশু রায়। তড়িঘড়ি করে নড়েচড়ে বসলেন নিজ আসনে। স্ত্রীকে চোখের ইশারায় বোঝালেন চুপ থাকতে। তবে বালাইষাট! সুদীপা রায় থামলেন না, উল্টো জোর গলায় চিড়বিড়িয়ে বললেন,
“ বলি অধীর কী আদৌও মানুষ? না-কি একটা দানব গো? আবার এই দানবের সঙ্গেই তুমি আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছো নিরুর বাবা? এতকিছুর পরও দানবটা একবার আমার মেয়েটাকে কাছে পেলে আস্ত রাখবে বলে মনে হচ্ছে তোমার?”
স্ত্রীর এহেন অদম্যতা দেখে তক্ষুনি শব্দ করে কপাল চাপড়ালেন হিমাংশু রায়। অস্ফুটে আওড়ালেন,

“ শেষ! এবার আমি নেই এসবে।”
ভ্রু গোটালেন কর্তাগিন্নি। সন্দিগ্ধতায় ফের খেঁকিয়ে বললেন,
“ আরে রাখো তোমার ইশারা-ইঙ্গিত! আগে বলো ঐ দানবটা আর কতদিন থাকবে এখানে? ভাবা যায়? কি পরিমাণ রাক্ষুসে শক্তির অধিকারী হলে একটা মেয়েকে ওভাবে পুরো এক রাতের জন্য অচেতন করে রাখতে পারে! আচ্ছা.. মেয়েটা আদৌও বাঁচবে তো?”
বসে থেকেই একপ্রকার লাফিয়ে উঠলেন হিমাংশু রায়। ভয়ার্ত দৃষ্টে তাকালেন স্ত্রীর পেছনে। আড়দৃষ্টে তা পরোখ হতেই কপাল গোছালেন কর্তাগিন্নি। চোয়াল নাড়িয়ে কিছু আওড়াবেন তার পূর্বেই পাদু’টো নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্রপথে প্রবেশ করল এক অচেনা মনোমুগ্ধকর পুরুষালী সুগন্ধির ঘ্রাণ। তৎক্ষনাৎ শীরঁদাড়া সোজা হয়ে গেল মধ্যবয়সীর। শঙ্কায় কেঁপে উঠল অন্তরাত্মা। তড়িঘড়ি করে তাকালেন স্বামীর মুখপানে। সন্দিগ্ধতায় অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলেন,
“ আমার কেনো মনে হচ্ছে — অ-অধীর এখানেই আছে?”
ব্যতিব্যস্ত হিমাংশু রায়। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে মাথা নাড়ালেন ওপর নিচ। সহসা কাঁপতে লাগলেন সুদীপা রায়। বাকরুদ্ধ ভঙ্গিতে প্রস্তরখন্ডের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতেই পেছন থেকে ভেসে এলো রূঢ় মানবের হিং স্র হুংকার!

“ আবে বান্দীর ছেলে হিমাংশু রায়! এখনো সময় আছে আপনার স্ত্রীকে সামলান। তার জিভ চলছে বড্ড! জানেনই তো, আমি আবার ভদ্র ছেলে। আমার বিষয়ে নাক গলানোর সুবাদে যারতার জিভ ধরে টেনে ছিঁ ড়ে নিয়ে আসতে পারি যেকোনো সময়। তাছাড়া আমি খুব ধৈর্য্যশীল! যেদিন আমার মেজাজ বিগড়াবে সেদিন আমার ধৈর্য্যের মাপদন্ড দেখাতে সবার আগে আপনার স্ত্রী নামক বান্দীর ঘরের বান্দীর মহিলার, ঘাড় ধরে এমন একটা ঘোরান দেবো না…! যেন সে ঘোরানিতে তার দেহ ছেড়ে ঘাড়টা মুহুর্তেই ছিটকে চলে আসে আমার পায়ের কাছে। বহুদিন হলো মানুষের মন্ডু দিয়ে ফুটবল খেলিনা। এবার নাহয় সে আক্ষেপটুকু মিটিয়ে নেব আপনার স্ত্রীকে দিয়ে।”
সর্বাঙ্গ কাঁপছে সুদীপা রায়ের। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা হয়েছে বদনটার। হিমাংশু রায় কুলুপ এঁটেছেন ঠোঁটের ডগায়। গম্ভীর করেছেন মুখ। ওদিকে মুগ্ধ সাপের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, শরীর ঘোরালো উল্টোপথে। দু’টো কদম সম্মুখে বাড়াতেই রূঢ় মানব করে বসলেন আরেক কান্ড! সহসা কোমরের পিঠে হাত নিয়ে গিয়ে বের করে আনলো নিজ ব ন্দু ক টা। অতঃপর উল্টো ঘুরে থেকেই কোনরূপ বাক্যব্যয়ে শ্যুট করল কর্তাগিন্নি ঠিক পায়ের সন্নিকটে। তক্ষুনি ভয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুদীপা রায়। হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে লাফাতে লাফাতে পিছিয়ে গেলেন কয়েক কদম। রূঢ় মানব দাঁতে দাঁত চেপেছে। পরপর তিনবার শ্যুট করে থামল অবশেষে। সদ্য ফায়ার হওয়া বন্দুকটা সম্মুখে নিয়ে এসে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল মুগ্ধ। কর্কশ কন্ঠে গর্জে বলল,

“ আজকে শুধু ট্রেইলার দেখালাম। নেক্সট টাইম পুরো পিকচার দেখাবো। মাইন্ড ইট চুলপাকনা বান্দীর মহিলা!”
এহেন অভিনব কৌশলী আলটিমেটামে মুখ টিপে টিপে হাসছেন হিমাংশু রায়। তা অবশ্য স্ত্রীর অলক্ষ্যেে। মুগ্ধের দাম্ভিক কদম জোড়া ডাইনিং ছাড়তেই মহাশয় ঘুরে বসলেন। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে তাকালেন কাঁপতে থাকা স্ত্রীর পানে। আওড়ালেন,
“ প্রাণের মায়া থাকলে জিভ সামলাও নিরুর মা। মাঝেমধ্যে কথা না বলেও অনেককিছু করা যায় বুঝলে?”

দূর্বল মাহি! মাথাটার ওপর যেন একমণ ওজনের ভার বসেছে কিছুর। সদ্য গোসল সেরে, এলোমেলো পায়ে কোনমতে বেরিয়েছে কক্ষ ছেড়ে। প্রশস্ত কাঠের বারান্দা, নিরবতায় ডুবে আছে চারপাশ। রমণী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। সুবিশাল চারকোণা বারান্দার একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। অপর প্রান্ত মানবশূন্য। কৌতুহলী মানবী পা বাড়াল বা-দিকে। কক্ষের কমতি নেই এখানে, তবে সবক’টাই তালাবদ্ধ! কৌতূহলী দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে তাক রেখে, দূর্বল কদমে খানিকটা এগোতেই হুট করে কিছু একটার সনে পা বাঁধল রমণীর। আর ওমনি বেচারি হোঁচট খেলো সম্মুখে। পড়ে যাবে যাবে অবস্থা তার! ঠিক তখনি কোত্থেকে যেন একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে বাজপাখির ন্যায় ছো মে’রে কোলে তুলে নিলো রমণীকে। ঘটনাপ্রবাহে দোদুল্যমান মাহি’র নরম পদযুগল! হকচকিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে সম্মুখে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো — সুপরিচিত সুদর্শন মুখাবয়বটি। তৎক্ষনাৎ দাঁত খিঁচল মাহি। অকৃতজ্ঞের ন্যায় ঝাঁঝ দেখিয়ে আওড়াল,

“ কথায় কথায় কোলে তোলেন কেনো? রাশিয়ান দৈত্য একটা!”
অধর কোণে দাঁত বসায় মুগ্ধ। বাঁকা হাসল নিরবে। রমণীর রাগান্বিত পেলব মুখখানায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লেপ্টে রেখে পরপরই প্রতুত্তর করল —
“ কথায় কথায় শুকনো মাটিতে হোঁচট খাস কেনো? বাংলাদেশী দেড়ব্যাটারী একটা!”
মুখ কুঁচকায় মাহি! উচ্চতার খোঁটা সহ্য হলোনা তার। চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল,
“ হোঁচট খেলে খেয়েছি! তাতে আপনার কী? পড়ে যেতে দিতেন!”
“ এতো সহজ? আমি থাকতে আমার সিগনোরা মাটিতে হোঁচট খাবে? নাহ! আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দিচ্ছি না মনস্তার’স বান্দী।”
কপাল গোছালো মাহি। পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত চাপলো বেশ। কন্ঠে অনমনীয়তা ঢেলে আরও কিছু আওড়াতেই যাবে ওমনি বিপরীত বারান্দা হতে ভেসে এলো এক বাচ্চার উৎফুল্ল কন্ঠস্বর!
“ বাবা!”
তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে ডাকের উৎসের পানে তাকায় মাহি। অদূর থেকে তাদের নিকট ছুটে আসছে এক বাচ্চা ছেলে। বয়স কত হবে? বড়জোর ৪ অথবা ৫। যার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে কেবল একটাই ডাক!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩

“ বাবা!”
হতবুদ্ধির ন্যায় ভাব ধরল মাহি। হতবাক নেত্রে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মুগ্ধের পানে। মুগ্ধ কেমন শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে ছুটে আসা বাচ্চাটার পানে। তার মুখো অভিব্যাক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে। রেগে আছে, না-কি স্বাভাবিক রয়েছে তা বোঝা বড় দায়। মাহি’র হতবাকতা বাড়ল বেশ। হতবাক কন্ঠফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো —
“ আপনার বাচ্চাও আছে?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৪