মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৪
jannatul firdaus mithila
“ আপনার বাচ্চাও আছে?”
এক লহমায় ঘাড় সোজা হলো রূঢ় মানবের। অগ্নিদৃষ্টি যুগল একযোগে নিক্ষিপ্ত করল বোকা মানবীর পানে। এহেন দৃষ্টে মোটেও ভড়কায়নি মাহি। উল্টো এক অদ্ভুত অস্বীকৃত অধিকারবোধে দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। মুখাবয়বে একরাশ সন্দিগ্ধ ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে ফের তাকালো ছুটন্ত বাচ্চাটার পানে। বাচ্চাটার পায়ের গতি দূর্দম্য! কন্ঠে কেবল একটি ডাক — বাবা! সপ্তদশী স্পষ্ট টের পেলো তার বুক কাঁপছে। এক অজানা শঙ্কায় হুট করেই তার অস্থিরতা বাড়ছে। নিঃশ্বাসের গতি হচ্ছে তীব্র থেকে তীব্রতর। সুকোমল রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কন্ঠায় খরা নেমেছে তার। বারেবারে গিলছে শুকনো ঢোক। আচমকা সন্দিষ্ট কুঞ্চিত চোখদুটো রূঢ় মানবের পানে তাক করে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল —
“ বাচ্চাটা কে বিস্ট?”
সহসা মেজাজ বিগড়ে গেল মাফিয়া বিস্টের। অদৃশ্য আগুন ছড়ালো সুদর্শন মুখাবয়বে। ব্লেডের ন্যায় তীক্ষ্ণ হলো চোয়ালের রেখা। দাঁত কপাটি বোধহয় একে-অপরের সনে রুষ্ট চাপায় মত্ত তার। কেমন কটমট শব্দ তুলে বাজখাঁই কন্ঠে দিলো এক ধমক!
“ কৈফিয়ত চাচ্ছিস কোন স্পর্ধায় বেয়াদব?”
রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানায় একইরকম ঝাঁঝ! নাকের পাটা ফুললো অজানা অভিমানের তোড়ে। হিতাহিতজ্ঞান হারানো মানবী, আচমকা নিজ তুলতুলে হাত দু’খানা উঠিয়ে আনলো নির্দয় মানবের বলিষ্ঠ কাঁধ বরাবর। সেথায় খানিক খামচে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে মোটা হয়ে আসা কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ সারাদিন পেছন পেছন ঘোরার সময় মনে ছিলো না এ-ই কথাটা? এখন সামান্য কিছু জিজ্ঞেস করতেই, ওমনি স্পর্ধার কথা বেরিয়ে এলো? নিজের বেলায় ষোলো আনা আর পরের বেলায় এক আনাও না তাই না?”
উপচে পড়া রাগ ভুলে মুহুর্তেই হতবাকতায় ডুবলো মুগ্ধ। মেয়েটাকে হুট করেই কেমন অপরিচিত ঠেকছে তার নিকট। গভীর দৃষ্টিদ্বয় নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে ফুঁসতে থাকা মানবীর পানে। অধর জোড়া খানিক নাড়াতে উদ্যোত হলো মুগ্ধ, ওমনি সম্মুখ থেকে ফের ভেসে এলো ফুঁসতে থাকা রমণীর ঝাঁঝাল বাক্যবাণ!
“ জিভের ডগায় এখন কথা নেই বেয়াদব লোক? শেষ? কথা শেষ? অতি-উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে আগে-ভাগে ওতোবড় একটা বাচ্চা’র বাবা হয়ে বসে আছেন, তবুও যখন-তখন আমার মতো একটা হাঁটুর বয়সী মেয়ের সঙ্গে লু’চ্চা’মি তো কম করলেন না বেহায়া লোক! বলি এতো উত্তেজনা কোত্থেকে আসে আপনার?”
বদরাগী মুগ্ধ! মানবীর প্রত্যেকটি বাক্যে রাগের পারদ তরতর করে বাড়ছে তার। চোয়াল শক্ত হচ্ছে ক্রমশ! সপ্তদশীর বাক্যবাণ ছোঁড়া শেষ হতেই আচানক এক অপ্রত্যাশিত আক্রমণ করে বসল মুগ্ধ। নিজ শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবায় সজোরে চেপে ধরল বোকা মানবীর তুলতুলে চোয়াল। এহেন কান্ডে থমকায় মাহি! ঘটনার আকস্মিকতায় ভুলে যায় সকল রাগ। চোখদুটো তার বিস্ফোরিত রূপ ধারণ করতেই ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে মুগ্ধ!
“ কয়েকদিন আগে তোর এই বা*লপাকনামির জন্য তলোয়ার নিয়ে দৌড়ানি দিয়েছিলাম মনে আছে? এবার কিন্তু আর দৌড়ানি দিব না মনস্তার’স বান্দী। সোজা ঘাড় ধরে মটকে দিব বলে দিলাম।”
বাক্যটুকু কর্ণধার হতেই সপ্তদশীর বাকাঁনো শীরঁদাড়া বেয়ে ত্রস্ত নেমে গেল একখানা শীতল স্রোত। ঘেমে-নেয়ে একাকার হলো মসৃণ ললাটতট। এদিকে মুগ্ধ কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। এক ঝটকায় রমণীর নরম চোয়ালখানা ছেড়ে পরক্ষণেই দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। ছুটে আসা বাচ্চাটা ইতোমধ্যেই রুখ টেনেছে পায়ের। দাড়িঁয়ে আছে চার হাত দুরত্বে। পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষকে দেখে ভয় পাচ্ছে ভীষণ। বদমেজাজি সুদর্শনের মায়া হলোনা পুঁচকে বাচ্চাটার প্রতি। উল্টো বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে বাচ্চাটাকে একপ্রকার হুংকার ছুঁড়ে ডাকল,
“ ঐ হাফ-ফুট এদিকে আয়।”
ভয়ে কেঁপে ওঠে নাদুসনুদুস বাচ্চাটা। কাঁদো কাঁদো ভাব ধরে ক্ষুদ্র মুখাবয়বে। নরম তুলতুলে হাতদুটো বুকের কাছে উঠিয়ে এনে ত্রস্ত মাথা নাড়ায় দুপাশে। তা দেখে মেজাজ খিচঁলো নির্দয় মানবের। দাঁতে দাঁত চেপে যে-ই না ধমকে উঠবে ওমনি মুগ্ধের হাতা কাটা ট্যাঙ্কটপের কলার টেনে ধরে সপ্তদশী। সহসা থমকায় মুগ্ধ। কপাল কুঁচকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টে তাকায় মেয়েটার পানে। তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিলে মাহি। চিবুক ঠেকায় গলার কাছে। হাতের তালুতে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা রূঢ় মানবের পরনের ট্যাঙ্কটপের অংশটুকু মুক্ত করে দিয়ে, জায়গাটা নখ দিয়ে খুঁটতে থাকে বোকা মানবী। পুতুলের আবহে রিনরিনে কন্ঠে আওড়ায়,
“ ও বাচ্চা মানুষ! ওর সাথে এভাবে কথা বলবেন না প্লিজ! ও ভয় পাচ্ছে দেখুন।”
প্রলয়ঙ্কারী দাবানল যেমন শীতল পানির সংস্পর্শে এলে ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়, ঠিক তেমনভাবেই মাফিয়া বিস্টের মাথার তালুতে জ্বলতে থাকা ক্রোধের অদৃশ্য লেলিহান শিখাটুকু মুহুর্তেই স্তিমিত হলো যেন। দৃষ্টে নামল অদ্ভুত গাঢ় প্রশান্তি! মায়াবিনী সপ্তদশীর তীব্র মায়ায় ফের আটঁকালো মনস্টার খ্যাত অধীর রায়। মেয়েটার ধারালো নখরের খুটখাট পরশে ঢোক গিললো সামান্য। মাহি ঠোঁট কামড়ে রেখেছে। দৃষ্টি নিচু তার। পটকা মাছের ন্যায় ফুলে আছে গালদুটো। মুগ্ধ একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে দেখল তা। মুহুর্ত ব্যয়ে আচমকা নিজ ডানহাতের জোর চালিয়ে মেয়েটাকে তুলে আনলো আরেকটু উঁচুতে। ঘটনাপ্রবাহে হকচকালেও দৃষ্টি তোলেনি মাহি। উল্টো জোরপূর্বক চেপে ধরল মুগ্ধের গলার কাছের টি-শার্টের অংশ। সুদর্শন গম্ভীর বেশ। জোরালো পায়ের গতি টেনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে। শক্ত মুখে ঘাড় বাকিয়ে বাচ্চাটার পানে তাকিয়ে ডাকল,
“ এই লিলিপুট এদিকে আয়!”
বাচ্চাটা কাঁপছে ভীষণ। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে গুটি গুটি কদমে এগিয়ে এলো খানিকটা। মুগ্ধ তখন ফের কটমটিয়ে আওড়াল,
“ এখানে কি করছিস?”
নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে আদুরে বাচ্চাটা। মিনমিনিয়ে রয়েসয়ে প্রতুত্তরে বলে,
“ বাবার কাছে যাচ্ছিলাম!”
তৎক্ষনাৎ বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বোকা মানবী। ব্যাপক অনীহায় দু’হাতে ঠেলতে থাকে রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজ। দাঁত খিঁচে শুধায়,
“ নিচে নামান আমায়। তারপর কথা বলুন আপনার ছেলের সঙ্গে।”
মুহুর্তেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল মুগ্ধ। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ফের ধমক দিয়ে বসল মেয়েটাকে,
“ আরেকটা উল্টোপাল্টা কথা বলে দেখ বান্দীর মেয়ে! একদম কোল থেকে ছুঁড়ে মা’রব নিচে।”
ঘাবড়ে গেল মাহি। তৎক্ষনাৎ কুলুপ আঁটল ঠোঁটের ডগায়। মুগ্ধ একপলক খেয়ে ফেলার দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। দাঁত কটমট করতে করতে পরক্ষণেই ঘুরে তাকাল বাচ্চাটার দিকে। গম্ভীর মুখে আওড়াল,
“ কই তোর বাপ? এক্ষুণি ডাক ঐ বান্দীর ছেলেকে।”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ভ্রু গোটায় মাহি। মুখ ঝামটি দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে —
“ বাপ তো সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তাও ঢং যত্তসব! হুহ্।”
বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটা বেশ কানে পৌঁছুলো মুগ্ধের। তড়াক দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ এ্যাই বান্দীর মেয়েএএ!”
আঁতকে উঠে মাহি। তক্ষুনি ভয়ে ভয়ে দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় শুধায়,
“ না না! আমি কিছু বলিনি। সত্যি বলছি, আমি কিছু…!”
“ সাহিল? এই সাহিল? ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছো? তোমার মা ডাকছে না তোমায়?”
বাক্য পূর্ণ হবার পূর্বেই পেছন থেকে ভেসে আসা হুটহাট অপরিচিত ভরাট কন্ঠে খানিকটা চমকে উঠে মাহি। কৌতুহলবশত ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই যাবে, ওমনি মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল রমণীর কোমল চোয়াল। বেগতিক জোরে এক ঝটকায় মেয়েটার ক্ষুদ্র মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়ে এনে শক্ত গলায় চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার চাশমিস! নয়তো ঘাড় ভেঙে ফেলব। জাস্ট কিপ ইউ’র আ’ইস অন মি। ওকেই?”
ভয়ার্ত ঢোক গিলে পলক ফেলে মাহি। রূঢ় মানব বাঁকা হাসল তা দেখে। পরপরই সপ্তদশীর ক্ষুদ্র মাথাটা টেনে এনে নিজ প্রশস্ত বুকের সনে লেপ্টে ধরে মুগ্ধ। অদূরের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা ছিমছাম গায়ের গড়নের পুরুষের দিকে তাকায় পরক্ষণেই। কন্ঠে একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে হুংকার ছুঁড়ল,
“ কে তুই?”
ভড়কায় কানাই। নতমস্তকে জড়তায় পা বাড়াতে উদ্যোত হয় সম্মুখে। ওমনি কর্ণকুহরে পৌঁছাল রূঢ় মানবের আরেক হুংকার!
“ খবরদার! যেখানে আছিস সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক।”
সহসা থেমে গেল কানাই। শ্রদ্ধায় দু’হাত আলগোছে বাঁধল বুকের কাছে। মুগ্ধের চোয়াল শক্ত। কপাল গুটিয়ে গর্জে আওড়াল,
“ এ্যাই লিলিপুট কার?”
“ আ-আমার! আ-আমার অধীর দা।”
কানাই’য়ের বাক্য এলোমেলো। কন্ঠ কাঁপছে রূঢ় মানবের ভয়ে। তা দেখেও দাঁত খিঁচল মুগ্ধ। বিকট কন্ঠে ধমকে শুধালো,
“ হাফ-ফুট সামলাতে না পারলে পয়দা করতে যাস কেনো বান্দীর ছেলে? এতো উত্তেজনা কেন? তোর ঐ হাফ- ফুটের জন্য আমার না হওয়া সংসারটা ভাঙতে যাচ্ছিলো জানিস কু**বাচ্চা? আমারটা তো এমনিতেই বেশি বোঝে, এক কথায় বা*লপাকনা ছিড়ুঁদাস। আবার তোরটা হয়েছে একটা ভাঙা ঢোলের বারি! বেবা, বেবা! কু***বাচ্চা বলে দিস যাকে-তাকে বাপ ডাকতে না।”
তড়িঘড়ি করে ওপর-নিচ মাথা নাড়ায় কানাই। নতমুখে ছেলেকে আদুরে স্বরে ডেকে বলে,
“ সাহিল! আসো বাবা।”
সুপরিচিত কন্ঠ কানে পৌঁছুতেই ফটাফট ছোট ছোট কদমে ছুট লাগালো আদুরে বাচ্চাটা। একদৌড়ে ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল বাবার কোলে। কানাই সস্নেহে আগলে নিলো ছেলেকে। রয়েসয়ে পা ঘোরালো উল্টোপথে। এদিকে নতমুখে রূঢ় মানবের কোলে দোদুল্যমান মাহি। ঘাড় করেছে নিচু! মুগ্ধ কেমন শক্তমুখে তাকিয়ে আছে তার পানে। কটমট করছে দাঁত। তা বেশ কানে গেলো মাহি’র। তবুও দৃষ্টি উঁচায়নি বোকা মানবী। তাকিয়ে থোড়াই গালি খাবে! অথচ মুগ্ধ ওসবের ধার ধরেনি। ঠিকই দাঁত খিঁচে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ যেখানে হালকা পাতলা হ্যাংকি-প্যাংকি করতে গেলে জ্ঞান হারিয়ে চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকিস, সেখানে হ্যাংকি -প্যাংকি ছাড়া বাচ্চা পয়দা করব কোত্থেকে রে বান্দীর মেয়ে? তোকে কি আমি শুধু শুধু গালি দিই?”
মুখ তুললো না মাহি। মুখ বুঁজে হজম করে গেলো বাক্যটুকু।
পড়ন্ত বিকেল। দূর পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে ঢুলে পড়ছে সূর্যটা। অবসন্নতায় সময় কাটছে না মাহি’র। প্রশস্ত খোলা বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকিয়ে আছে অন্দরমহলের খোলা অঙ্গনে। ওতো বড়ো পুরনো ধাঁচের জমিদার বাড়ি! চারপাশের দেয়ালগুলোয় বোধহয় নতুন রং লাগিয়েছে কিছুদিন আগে। নাসারন্ধ্রের ছিদ্রপথ দিয়ে ভকভক করে ঢুকছে রং এবং কেরোসিনের উৎকট গন্ধ! মাহি বিরক্ত! কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে কেমন। তন্মধ্যে বলিষ্ঠ পুরুষের দেখা মিললো অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে। গায়ে তার একখানা কালো রঙা দামী ট্রেঞ্চ কোট! ভেতরে কালো রঙা ফিনফিনে শার্ট। বরাবরের ন্যায় শার্টের সবগুলো বোতাম হা করে খুলে রাখা। ফুলেফেঁপে থাকা হাতদুটো ট্রেঞ্চ কোটের আড়াল দিয়ে প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা তার। মুখ ঢাকা কালো মাস্কে! মাথার ওপর সেজে আছে একখানা কালো টুপি। মাহি স্থির হলো তৎক্ষনাৎ। কপাল কুঁচকে মানবের পানে তাকিয়ে থাকতেই নিচ থেকে আচমকা ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় মুগ্ধ। টুপির আড়াল দিয়ে বাদামী চোখদুটো নিবিড়ভাবে তাক হলো মেয়েটার মুখপানে। সে ধীরলয়ে হাত উঠিয়ে আলগোছে সরালো নিজ মুখের মাস্কটা। মুহুর্তেই দৃশ্যমান হলো সুদর্শনের মুখাবয়ব। বাঁকা হাসছে মুগ্ধ! ধারালো দাঁতের স্পর্শ বসিয়েছে ঠোঁটের কোণে। ভ্রু উঁচিয়ে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে আচমকা ঠোঁটের ইশারায় চুমু দেখালো বেয়াদব ছেলে। তৎক্ষনাৎ মুখ কুঁচকে নিলো মাহি। মুখটা অন্যত্র ঘোরাতেই যাবে ওমনি নিচ থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠস্বর!
“ মিসেস অধীর রায়!”
সহসা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় মাহি। সর্তকতার সঙ্গে ঘাড় ঘোরায় এদিক-ওদিক। আশেপাশে কেউ নেই — তা বোধগম্য হতেই স্বস্তির নিশ্বাস বেরুলো বোকা মানবীর বুক চিঁড়ে। ধীরলয়ে বুকের কাছে উঠে এলো হাত। পরমুহূর্তেই রাগান্বিত দৃষ্টিজোড়া একত্রে নিক্ষেপ করল মুগ্ধের পানে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আওড়াল,
“ উল্টাপাল্টা নামে ডাকবেন না আমায়।”
কথাটা একপ্রকার মাছি তাড়াবার ন্যায় উড়িয়ে দিলো মুগ্ধ। পরপরই বাঁকা হেসে হুট করে বাঁহাতের মধ্যমা উঁচিয়ে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে শুধালো,
“ ইউ্য নো হোয়াট মিসেস অধীর রায়? ফা’ক ইউ এন্ড ইউর ওয়ার্ডস!”
তিতিবিরক্তিতে ফের মুখ কুঁচকে গেল মাহি’র। তেঁতো কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ অসভ্য!”
“ গালি দিলি?”
মুগ্ধের সন্দিগ্ধ কন্ঠ! তা শুনে কপট ভাব ধরল মাহি। ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক হাসি ছড়িয়ে প্রতুত্তর করল,
“ নাহ! গালি দেইনি। তবে আপনার আসল নামটা বললাম আরকি!”
মুগ্ধ কেবল ঠোঁট পিষে হাসল। ধীরলয়ে ফের মুখে টানলো মাস্কের আবরণ। মাথার টুপিটা ঠিকঠাক করতে করতে ভরাট কন্ঠে আওড়াল,
“ টেক কেয়ার সিগনোরা!”
সৌজন্যবোধহীন মাহি! গম্ভীর রাখল মুখাবয়ব। মুখ ঝামটি দিয়ে ঘাড় ঘোরালো অন্যত্র। ওদিকে মুগ্ধ কেবল অপলক তাকিয়ে রইলো মায়াবিনীর পানে। মাখনরঙা একখানা গোল ফ্রক পরিহিতা রমণী, কোমর ছুঁই ছুঁই ঘনকালো চুলগুলো পিঠের ওপর দোল খাচ্ছে। কোনমতে আঁটকে আছে একখানা বো-ক্লিপের বাঁধনে। ইদানীং স্বাস্থ্যে ভালো উন্নতি হয়েছে মেয়েটার। গালদুটো ফুলেছে খানিক। বেড়েছে ত্বকের সৌন্দর্যপূর্ণ লালিমা। নির্দয় বিস্ট যতবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে, ঠিক ততবার থমকাচ্ছে! ঠিক যেমনটা এখন থমকালো। তবে তাড়া থাকায় সে-ই থমকানোর রেশ খুব একটা স্থায়ি হলো না মুগ্ধের। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা চললো উল্টোপথে। বোকা মানবী আড়দৃষ্টে ঠিক দেখল তা। মুগ্ধ চোখের আড়াল হতেই ঘুরে দাঁড়াল সে। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে পায়ে গতি টানল পরপরই। কাঠের রেলিঙে হাত গড়িয়ে গড়িয়ে হাঁটতে লাগলো ধীরলয়ে।
তিন-তলার প্রশস্ত করিডরের একদম শেষ কিনারায় এসে থামলো মাহি। এ নিয়ে দুবার প্রদক্ষিণ করল সম্পূর্ণ চারকোণা বারান্দাটা। গম্ভীর মুখে আরেকবার উল্টোপথে পা চালাতে উদ্যোত হতেই আচানক কর্ণকুহরে ভেসে এলো এক অপরিচিত রিনরিনে কন্ঠ!
“ নাম কি আপনার?”
বহুক্ষণ নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে থাকা বারান্দায় একা থাকার দরুন হুটহাট ডাকে খানিক চমকে উঠে মাহি। তড়াক শরীর ঘুরিয়ে তাকায় পেছনে। পরমুহুর্তে সম্মুখে দৃশ্যমান হলো এক অপরিচিত সপ্তদশীকে। গায়ে তার লাল টুকটুকে একখানা চুড়িদার, গলায় ঝুলছে ওড়নাটা। মুখাবয়ব যথেষ্ট গম্ভীর তার। মাহি সৌজন্যবোধে হাসার প্রয়াস চালালো খানিকটা। স্ব শরিরে ঘুরে দাঁড়িয়ে,অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ মাহিরা! মাহিরা এহসান।”
মুহুর্তেই অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল নিরুপমার মাথায়। বদনখানি নড়েচড়ে উঠল বোধহয়। চোখদুটো হলো বিস্ফোরিত। বিস্ময়ে দুরত্ব বাড়ল দু-ঠোঁটের মাঝে। হতবাক কন্ঠফুড়েঁ অস্ফুটে আওড়াল,
“ কিহ? কি বললেন আপনি? এহসান? মানে মুসলিম? মুসলিম হয়ে রায় জমিদার বাড়িতে পা রেখেছেন আপনি? আপনার এহেন দুঃসাহস দেখে অবাক না হয়ে পারছি না আমি।”
অবোধের ছাপ ফুটলো মাহি’র ক্ষুদ্র মুখখানায়। কপাল কুঁচকে গেল পরপরই। সন্দিগ্ধ গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ মানে?”
নিরু এগিয়ে এলো এক-কদম। গম্ভীর মুখে খানিক সর্তক কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনি জানেন না? প্রত্যন্ত রায় জমিদার বাড়িতে মুসলিমদের প্রবেশ নিষেধ! এ কথা যদি ঘুনাক্ষরেও কেউ টের পেয়ে যায়, তবে আপনার কি হাল হবে জানেন?”
শঙ্কিত ছায়ায় ডুবল মাহি! মৌন রইল খানিকক্ষণ। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে সম্মুখের রমণীকে শুধরে দেবার উদ্দেশ্যে আওড়াল —
“ আপনার ভুল হচ্ছে মিস। আমি এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি! বরং আমায় জোর করে তুলে আনা হয়েছে।”
এ ব্যাপারে বড্ড অবগত নিরু। তবুও মুখাবয়বে ভাব টানলো কপট। দূরদর্শিতার কৌশলী কায়দায় দৃষ্টি করল সরু। বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে নিয়ে গমগমে গলায় কেবল বলল —
“ তা যা-ই হোক! স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়, এসেছেন তো। নিজের ভালো চাইলে কাউকে আবার নিজের পুরো নামটা বলতে যাবেন না যেন। বলা তো যায় না, কে কখন কোনদিক দিয়ে আক্রমণ করে বসে।”
সহসা গম্ভীর হলো মাহি’র মুখো অভিব্যাক্তি। আর ক’টাদিন পার হলেই ১৮ তে দিবে মানবী, অথচ নিরুর তীক্ষ্ণ কৌশলী বাক্যবাণ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই অন্তর্মুখীর চরিত্রে শোভা পেলো সে-ই চিরচেনা দূরদর্শিতা। যা কালক্রমে ভাটি পড়েছিল খানিক। আজ আবারও উদয় হলো তা। রমণীর ঠোঁটের কোণে উত্থাপিত হলো একটুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি। তাচ্ছিল্যের কায়দায় পাদু’টো নাড়িয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে নিয়ে ভীষণ তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে শুধালো,
“ আক্রমণ? তাও আবার আমাকে? হাসালেন মিস! যার রক্ষণাবেক্ষণে আস্ত একটা রাশিয়ান দৈত্য সর্বদা পিছু পড়ে থাকে, তাকে আক্রমণ করার সাধ্যি আছে কার শুনি?”
ভ্রু গোটায় নিরু। বোধগম্যহীনতায় চোয়ালের পেশি করল টানটান। সন্দিহান গলায় আচমকা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ দৈত্য? কে সে?”
প্রসঙ্গ এড়াতে বড্ড ওস্তাদ মাহি। খানিক নড়েচড়ে পিঠ ঠেকালো রেলিঙের সনে। সরু দৃষ্টিযুগল একত্রে নিরুর পানে তাক করে রেখে, শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ তা আপনি ধীরে ধীরে জেনে যাবেন। যাইহোক, ওসব বাদ দিন আপাতত। আপনার সঙ্গে টুকটাক কথা তো হলোই, তবে আপনার নামটাই এখনো জানা হলোনা। কি বলে সম্বোধন করব আপনাকে?”
এতক্ষণে ঠোঁটের কোণে রায় জমিদার বাড়ির আত্ম-অহমিকা ফুটলো নিরুর ঠোঁটের রেখায়। কন্ঠে বাড়ল তেজ। সে কেমন জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে রইল সম্মুখে। কদম খানা একটুখানি এগিয়ে এনে হুট করেই দম্ভ নিয়ে শুধালো,
“ মিসেস-টু-বি অধীর রায়!”
থমকায় মাহি! একমুহূর্তের জন্য ডুবলো হতবাকতার ঘোরে। অথচ তার সে-ই ঘোর ভাঙতে নিরুর একটিমাত্র কথাই যথেষ্ট ছিলো,
“ আশা করি এবার আপনার আর আমার অবস্থানের পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন।”
কথার বাণে বিদ্ধ করবার প্রয়াস টুকু যথেষ্ট কৌশলে ধরে ফেললো মাহি। বুদ্ধিমতীর বুদ্ধির জোর দেখিয়ে কান্নার বদলে হেসে উঠল আচমকা। ঠোঁটের কোণে নিরবে ফুটলো এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ। ধীরলয়ে পাদু’টো একটুখানি এগিয়ে এনে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়াল,
“ আপনার আর আমার অবস্থান আগে থেকেই ভিন্ন মিস! আপনি শুধু শুধুই তা নিয়ে মাথাব্যথা করছেন। বাই দা ওয়ে ইন দা মন্সটার’স ওয়ে — ইউ আর মিসেস টু-বি অধীর রায় রাইট? তা এটা কি স্বঘোষিত? না-কি অধীর রায় ঘোষিত?”
বড্ড অবাক হলো নিরু! সঙ্গে রাগও বাড়ল তরতর করে। মেয়েটা কত নির্লজ্জ দেখো! কিভাবে তাকেই প্রশ্ন ছুড়ঁছে। নিরু ঢোক গিললো খানিক। চোয়াল শক্ত করে দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ এরম একটা সম্বোধন কারো স্বঘোষিত হয়?”
গম্ভীর মুখেই আলতো হাসল মাহি। ধীর কন্ঠে প্রতুত্তরে বলললল,
“ তা হয়তো না!”
“ তাহলে?”
রমণীর পাল্টা প্রশ্ন। মাহি থামল না। এগিয়ে এসে দাঁড়ালো নিরুর মুখোমুখি। মুখাবয়বে স্বস্তির ভাবাবেগ ফুটিয়ে আচমকা নিরুকে অবাক করে দিয়ে শুধালো,
“ থ্যাঙ্কিউ সো মাচ মিস! আপনি নিজেও জানেন না, এ কথাটা বলে আপনি আমায় কি বাঁচাটাই না বাঁচালেন। এরজন্য অবশ্যই আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে একটা কথা!”
থামল মাহি। ঠোঁটের কোণে আচানক রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ ঝুলিয়ে শান্ত গলায় আওড়াল,
“ যার নামটা নিজের নামের সঙ্গে জুড়তে চাইছেন, আগে তাকে আঁচলে বাঁধতে শিখুন। কেননা আপনার সে-ইজন আঁচলের অভাবে আমার পিছুপিছু ঘোরে! ইশশ্ কি জঘন্য ব্যাপার-স্যাপার তাই না?”
সর্বাঙ্গে আগুন ছড়িয়ে গেল নিরুর। দাঁতে বসল দাঁতের চাপ। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে ইতোমধ্যেই। ঝাঁঝিয়ে পরপরই শুধালো,
“ মুখ সামলে কথা বলুন!”
দৃষ্টিতে এতক্ষণে অজানা তেজ নামলো বোকা মানবীর। কন্ঠে বাড়ল দৃঢ়তা!
“ আগে আপনি দিবাস্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন মিস। ততক্ষণে দেখবেন — আমার মুখ আপনা-আপনি সামলে গিয়েছে। এখন আসি তবে! হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। এখন রেস্ট না নিলে আপনার সেজন ফিরে এসে থোড়াই রেস্ট নিতে দিবে আমায়! বাই দ্য ওয়ে— নাইস টু মিট উইথ ইউ্য!”
অপমান! এ যেন ভরা মজলিসে মুখ বরাবর কালিমা লেপ্টে দেবার মতো অপমান। মেয়েটাকে যতটা সহজ দেখাচ্ছিলো, সে যে তারচেয়েও বড্ড ত্যাড়া। কেমন ঝামা ঘঁষে দিয়ে চলে গেলো নিরুর মুখে।
ঘড়ির কাঁটায় সাতটে বেজে চল্লিশ মিনিট! ক্ষুধা পেয়েছে মাহি’র। এ বয়সে হালকা পাতলা বিকেলের নাস্তা না করলে চলে? অচেনা পরিবেশে এসে লজ্জায় মুখ খুলতে পারছেনা বোকা মানবী। অন্তর্মুখিতার বহিঃপ্রকাশে চাইতে পারেনি খাবার। তবে এবার যেন টিকে থাকা দ্বায় তারজন্য। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়াল কক্ষের বাইরে। সফেদ এবং হলদেটে আলোর মিশেলে ঝকমক করছে চারপাশ। সে আলোর দৃশ্যতায় এগোলো মাহি। টুকটাক কদমে খানিকটা এগোতেই আচমকা পেছন থেকে ভেসে এলো কোনো জন্তুর হিসহিসানোর শব্দ! মুহুর্তেই প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মাহি। বুকের ওঠানামার গতি হলো অবিন্যস্ত। ধীরলয়ে ঘাড়টা সামান্য বাঁকাতে গেলেই আচানক পেছন থেকে ধেয়ে এলো কুকুরের ডাক!
“ ভোউ!”
সহসা আঁতকে উঠে মাহি! ভয়ার্ত কন্ঠে খানিক চেঁচিয়ে উঠল বেচারি,
“ আল্লাহ গো!”
ছুটলো মাহি। পরক্ষণেই ছুটলো গায়ে জোরে। পেছন পেছন কুকুরটাও বোধহয় ছুটছে। মাহি কেঁদেই দিলো এবার। ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে সম্মুখে ছুটতে গিয়ে আচানক দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল অদূরে। বা দিকের অন্ধকার ভেঙে কে যেন ছুটে আসছে তার নিকট। হাওয়ায় ভাসছে তার গায়ের কোট জাতীয় কাপড়টা। বোকা মানবীর সে-কি আন্দাজ! তক্ষুনি গলা ছেড়ে ডাকল সম্মুখের মানুষটাকে,
“ বিস্ট!”
আন্দাজ সঠিক হলো রমণীর! অন্ধকার পথ ভেঙে আলোর দিশারিতে প্রবেশ করল বলিষ্ঠ রূঢ় মানব। হাওয়ার বেগে ছুটে এসে বিনাবাক্যে হেঁচকা টানে রমণীকে টেনে নিয়ে এলো নিজ বুকের কাছে। সপ্তদশী দূর্বল বেশ! তড়িঘড়ি করে মুখ লুকলো অপ্রিয় মানুষটার রুক্ষ বক্ষভাঁজে। অথচ মুগ্ধ স্থির! গম্ভীর মুখ অভিব্যাক্তিতে একবার চোখ তুলে তাকালো সম্মুখের কুকুরটার পানে। কুকুরটা মালিকের দর্শনে থমকে দাঁড়িয়েছে। শ্রদ্ধায় নুইয়েছে মস্তক। তা দেখে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। বাহাতের আঙুলের ইশারায় দাঁড়াতে বললো পৌষ্যকে। ওমনি বাধ্য পোষ্য দাঁড়িয়ে গেল চটজলদি। মালিককে অভ্যর্থনা জানাতে গলা উঁচায় ফের। তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মুগ্ধের বুকের সনে ভয়ে সিটিয়ে গেল মাহি। দু’হাতে খামচে ধরল বলিষ্ঠের পিঠ। গুনগুনিয়ে বলল,
“ বাঁচান বিস্ট!”
মুগ্ধ স্থির! হাতদুটো এখনো আঁকড়ে ধরেনি রমণীকে। বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আমি কিন্তু জোর করে তোকে ধরিনি বিউটি। তুই স্বেচ্ছায় এসেছিস আমার কাছে।”
ভয়ে কুপোকাত মাহি! ভয়ার্ত কন্ঠেই প্রতুত্তর করল,
“ তো কি হয়েছে? ধরুন আমায়! বাঁচান ওর হাত থেকে।”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। অধর কামড়ে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ আমি একবার ধরলে আমৃত্যু ছাড়বো না বিউটি!”
“ ছাড়তে হবে না।”
বলতে বলতেই কুকুরটা ফের আওয়াজ ছুড়ঁল। ওমনি চিৎকার দিয়ে ওঠে মাহি। মুগ্ধের বুক থেকে সরে এসে আড়াল হলো বলিষ্ঠের পিঠের পেছনে। দু’হাতে রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ ডানবাহু আঁকড়ে ধরে আমতা আমতা করে বলল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৩ (২)
“ হুশঁ হুশঁ! ওকে সামনে থেকে তাড়ান না বিস্ট!”
সুযোগ সন্ধানী মাফিয়া বিস্ট। রহস্যময় বাঁকা হেসে পরপরই আওড়াল,
“ কি দরকার? থাকুক আরেকটু। তুই বরং ধরে রাখ আমায় পিচ্চি, নয়তো কামড়ে দিবে ও তোকে।”
