নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪২
রূপন্তী সরকার
বাড়িতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান প্রায় শুরু হয়ে গেছে। চারদিকের গান-বাজনার আওয়াজ রায়ান কুঞ্জ জুড়ে। । কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও ইয়াশফার মনের ভেতর কেন জানি তীব্র একটা হাহাকার নেমে এলো,
ওর চোখ দুটো ফেটে বড্ড কান্না আসতে লাগল। ও ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল
বিয়ের এই ফাঁদটা পাতার আগে ওর আরেকবার ভালো করে ভাবা উচিত ছিল। ওর এই জেদ আর নাটকের কারণে ড. রোহান ইউভান মানুষটা কত বড় কষ্ট পাবে, সেটা ও আগে কেন তলিয়ে দেখল না? নিজের স্বার্থের জন্য একটা নিরীহ আর ভালো মানুষকে ও কত নিখুঁতভাবে, কত যত্ন সহকারে ঠকিয়ে যাচ্ছে!
ইয়াশফা আর নিজের ভেতরের কান্নাটা চেপে রাখতে পারল না, ও চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। ও ঘরের শূন্য দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রাগ আর অভিমানে ফিসফিসিয়ে বলল, “সব দোষ আপনার আপনিই আমাকে বাধ্য করেছেন আজ এতটা বেয়াদব হতে, আমাকে এতটা স্বার্থপর বানিয়েছেন আপনিই! আমার আর কোনো দরকার নেই আপনার মতো পাষাণ আর অহংকারী জীবনসঙ্গী! আপনি নিজের ইগো নিয়ে থাকুন!”
মনের এই তীব্র ছটফটানি আর ইউভানের প্রতি একরাশ অপরাধবোধ থেকে ও আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ও টেবিল থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি কল করল ইউভানকে। ইউভান তখন গাড়িতে ছিল, ও ওপাশ থেকে রিং হতেই সাথে সাথে কলটা রিসিভ করে শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ বেবিগার্ল, বলো? তৈরি হয়েছ তুমি?”
ইয়াশফা নিজের কাঁপতে থাকা গলার স্বরটা কোনোমতে শক্ত করে চোখের পানি মুছে বলল, “সরি!”
ইউভান ওর এই আচমকা গম্ভীর গলা আর সরি শব্দটা শুনে একটু অবাক হলো। ও নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, “কেন? কিসের সরি বেবিগার্ল?”
ইয়াশফা নিজের মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো ফিসফিসিয়ে বলল, “এই যে আপনাকে আগে থেকে না জানিয়ে নিজের স্বার্থের জন্য এই বিয়ের মিথ্যে নাটকটা করছি। আপনার আবেগ নিয়ে খেলছি, এর জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত।”
ফোনের ওপাশ থেকে ইউভান এক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ও হুট করেই বাঁকা হাসি হেসে বলল, “তুমি এই বিয়েটাকে একটা মিছেমিছি নাটক ভাবলেও আমি কিন্তু এটাকে কোনো নাটক ভাবছি না বেবিগার্ল। এই বিয়েটা একশো ভাগ সত্যি হবে, আর সেটা আমার সাথেই হবে।”
ইউভানের মুখ থেকে এমন ধারালো কথা শোনা মাত্রই ইয়াশফা পুরো থমকে গেল! ওর হাত-পা যেন এক সেকেন্ডে ঠান্ডা হয়ে এলো। এই লোকের গলার স্বর আর রূপটা হুট করে এভাবে চেঞ্জ হয়ে গেল কীভাবে? ও তো কোনোদিন ইয়াশফার সাথে এভাবে গম্ভীর হয়ে কথা বলে না! ইয়াশফা একটু দমে গিয়ে ভাবল হয়তো ইউভান বরাবরের মতোই ওর সাথে কোনো মজা করছে। ও নিজের মনের খটকাটা দূর করতে আবার বলল, “ইউভান, আমি কিন্তু ইয়ার্কি করছি না। আমি সত্যিই আপনার কাছে মন থেকে দুঃখিত।”
ইউভান এবার নিজের গলার আওয়াজটা আরও বেশি কড়া করে বলল, “আজব! এখানে দুঃখিত হওয়ার কী হলো? তোমার এই জীবনের বিয়েটা তো শেষমেশ আমার সাথেই হতে যাচ্ছে। দুনিয়ার সব সত্যি একপাশে, আর তুমি যে মিসেস ইউভান হতে যাচ্ছো এই সত্যি আরেক পাশে।”
ইউভানের এই ক্রমাগত অধিকার খাটানো আর জেদ দেখে ইয়াশফার মাথার সব কটা রগ এক সেকেন্ডে চিড়বিড় করে জ্বলে উঠল। ও রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলল, “এই শাট আপ! মুখ বন্ধ করুন আপনার! আমি ভদ্রভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে সরি বললাম তো, ওখানেই চ্যাপ্টার ক্লোজ করুন!”
ইউভান তবুও দমে গেল না। ও জেদি গলায় ওপাশ থেকে সাফ জানিয়ে দিল, “সরি বললে কি সব মিটে যায়? আমি ওসব কিচ্ছু জানি না বেবিগার্ল। এই বিয়েটা তোমাকে আমার সাথেই করতে হবে, কারণ তুমি শুধু আমার!”
ইউভানের এই কথাবার্তা শুনে ইয়াশফার গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইল। ওর মাথায় তখন রাগ চড়ে গেছে। ও নিজের পুরো গলার জোর এক জায়গায় এনে ফোনের স্পিকারে এক মস্ত বড় হুংকার দিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “আসিস শালা বিয়ে করতে! দেখবো নি কত বড় দম আছে!”
কথাটা শেষ করেই ইয়াশফা আর ওপাশের কোনো কথা শুনল না, ও রাগে এক ঝটকায় খট করে কলটা কেটে দিল। ও ফোনটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের দুই হাত কোমরে রেখে রাগে হাঁপাতে হাঁপাতে জানালার বাইরে তাকাল। ও বুঝতে পারল না।
হঠাৎ করেই ইয়াশফার গালে কেউ একজন শক্ত করে চুমু খেল। ইয়াশফা চমকে পাশে তাকিয়ে দেখল হুডি পরা ঋষভ দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ দুটো লাল। ও ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বড্ড গম্ভীর গলায় বলল, “চুমু খেতে চাই।”
ইউভানের সাথে ফোনে ঝগড়া করে ইয়াশফার মাথা এমনিতেই গরম হয়েছিল। ঋষভকে নিজের সামনে এভাবে হঠাৎ দেখে ওর মেজাজ আরও চড়ে গেল। ও ঋষভের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “থাপ্পড় দিতে চাই।”
ঋষভ ওর এই কড়া কথা শুনে নিজের চওড়া চোয়াল শক্ত করে কড়া গলায় বলল, “আমি তোমার বর। তুমি আমাকে দিনের বেলা থাপ্পড় মারবা আর আমি রাতে”
ওকে নিজের পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে ইয়াশফা মাঝপথেই ওর মুখের ওপর আঙুল তুলে কাটকাট গলায় বলল, “অকালে মরবেন ভাই! অকালে মরবেন আমার হাতে।”
ঋষভ এবার নিজের পজেসিভ মাফিয়া ইগো ধরে রাখতে না পেরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল, “বকবক করিস না চুমু দে বাল!”
ইয়াশফা নিজের কোমরে দুই হাত দিয়ে রাগী চোখে চেয়ে কড়া গলায় বলল, “মুখটা খারাপ করতে চাচ্ছি না আপনার মতো অসভ্য লোকের জন্য। খবরদার, আমার গায়ে হাত ছোঁয়ানোর চেষ্টা করবেন না।”
ঋষভ নিজের কাটা ঠোঁটের কোণ টেনে এক পৈশাচিক হাসি হেসে ইয়াশফার আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে বলল, “থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব মেয়ে! আমি তোর জামাই হই।”
ইয়াশফার মাথায় এবার এক সেকেন্ডে চণ্ডী চড়ে গেল। ও আর কোনো সম্মান বা ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে সরাসরি চেঁচিয়ে বলে উঠল, “তুই আমার বালের জামাই!”
কথাটা বলার সাথে সাথেই ইয়াশফা চোখ পিটপিট করে দেখল ওর সামনে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। পুরো ঘরটা একদম ফাঁকা, জানালার পর্দাটা বাতাসে উড়ছে। ও বুঝতে পারল এটা ওর নিজের মনের ভেতরের এক চরম ক্ষোভের কল্পনা ছিল। ও নিজের কপালে একটা হাত দিয়ে বড্ড আফসোসের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল “ইশ! এভাবে যদি বাস্তবে সত্যি সত্যি এই বেয়াদব লোকটার মুখের ওপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলতে পারতাম! বালডা সব সময় আমার মাথার ভেতর ঘুরে”
ঠিক তখনই ইয়াশফার হাতের ফোনটা হঠাৎ কাঁপো কাঁপো শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা নতুন নাম্বার থেকে একটা মেসেজ ভেসে এলো। ও মেসেজের ইনবক্সটা খুলতেই দেখল সেখানে লেখা আছে
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪১
“তোর পা কাটবো আমি, বিয়ে করার শখ বের করবো। আর ওই বেগুনের বাচ্চার ও মেইন পয়েন্টে লাথি দিবো”
মেসেজের স্টাইলটা পড়া মাত্রই ইয়াশফার বুঝতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না যে এই মেসেজটা আসলে কে করেছে। বলদা পাডা ছাড়া এমন অদ্ভুত আর খ্যাপাটে হুমকি কেউ দেওয়ার সাহস পাবে না। ইয়াশফা নিজের ঠোঁটের কোণে একটা চতুর শয়তানি হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও নিজের কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে উল্টো টাইপ করে একটা পাল্টা মেসেজ পাঠিয়ে দিল
“সব সময় বেগুনের বাচ্চা বলেন কেন ওকে? ও আপনার সতিন হয়, একটু সম্মান দিয়ে কথা বলবেন ওকে!”
