Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৭
রূপন্তী সরকার

দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে কেটে গেছে অনেকটা দিন। সময়ের সাথে সাথে রায়ান পরিবারের ভেতরের সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থিতিয়ে এসেছে,
পরিস্থিতি এখন একদম স্বাভাবিক। জীবনের এই নতুন নিয়মের মাঝেই ইউভান সিদ্ধান্ত নেয় সে দেশ ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে। নিজেকে একটু সময় দেওয়া আর নতুন করে জীবনটা শুরু করার জন্য এটাই হয়তো ওর কাছে একমাত্র পথ ছিল।
অবশেষে দেশ ছাড়ার সেই নির্দিষ্ট দিনটি চলে আসলো। এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে ইউভান যখন শেষবারের মতো ছোট ইয়ানকে নিজের সামনে দেখলো, ও আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলো না। গত দুই বছর ধরে যাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসে বাবা বলে বুকে আগলে রেখেছে, তাকে আজ চিরতরে অন্যের হাতে সঁপে দিয়ে চলে যেতে হচ্ছে
এই যন্ত্রণা ও নিতে পারছিল না। ও হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে ছোট্ট ইয়ানকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে একদম পাগলের মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো।

ইউভান ইয়ানের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ভাঙা, ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলতে লাগলো, “আমি হয়তো তোমার আপন কেউ না বাবা… কোনোদিন ছিলামও না। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার পাপা তোমাকে নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসে। তুমি অনেক ছোট বাবা, কিছুদিন পর তুমি হয়তো তোমার পাপাকে একদম ভুলে যাবে? কিন্তু তোমার পাপা তোমাকে কোনোদিন ভুলবে না। তুমি চিরকাল আমারই সন্তান হয়ে থাকবে। তুমি রোহান ইউভানের ছেলে ইয়ান ইউভান। পাপা আবার তোমার কাছে ফিরে আসবে”

ইউভানের চোখের জল আর গলার এই আকুলতা দেখে দুই বছরের ছোট ইয়ানও যেন এক অদ্ভুত কষ্ট অনুভব করলো। সে বড় বড় চোখ করে তাকাল, তারপর হঠাৎ করেই ও বেশ জোরে কেঁদে উঠলো। যেন সে ইউভানের এই দূরে চলে যাওয়াটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
ঋষভ এতক্ষণ একটু দূরত্ব বজায় রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের দুইজনের এই বিদায় নেওয়ার দৃশ্যটা দেখছিল। তার নিজের বুকেও এক সূক্ষ্ম কষ্ট হচ্ছিল। ইয়ানকে ওভাবে কাঁদতে দেখে সে আর স্থির থাকতে পারলো না। ঋষভ আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে ইউভানের কোল থেকে আলতো করে ইয়ানকে নিজের বুকে তুলে নিলো। আশ্চর্যের বিষয়, এতক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকা ইয়ান তার আসল বাবার বুকে আসতেই এক নিমেষে কান্না থামিয়ে একদম শান্ত হয়ে গেল। ও ঋষভের গায়ের শার্টটা শক্ত করে খামচে ধরে রইলো।ছেলের এই শান্ত হয়ে যাওয়া দেখে ইউভান এক চিলতে মলিন হাসলো। সে চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঋষভ ইউভানের কাঁধে একটা হাত রাখলো। ওদের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্ত দেয়াল আর দূরত্ব এই একটা স্পর্শে যেন গলে জল হয়ে গেল। ঋষভ পরিবেশের এই ভারী কষ্টটা হালকা করার জন্য নিজের চেনা দাপুটে ভঙ্গিতে হেসে উঠে বললো,
“অনেক তো হলো ছন্নছাড়া জীবন। এবার বিদেশ থেকে যখন ফিরবি, তখন একবারে বিয়ে করে নিজের একটা বাচ্চা পয়দা করে তারপর এ বাড়ি আসিস। তখন দেখবি এই একাকীত্ব আর থাকবে না।”

ঋষভের রসিকতা আর ওর ভেতরের অধিকারবোধটুকু দেখে ইউভানের ঠোঁটের কোণে এতক্ষণ পর একটা হাসি ফুটে উঠলো।
ঋষভের মুখের ওই রসিকতাটুকু শুনে ইউভান আর নিজের ভেতরের বাঁধভাঙা কান্না আটকে রাখতে পারলো না। সে আচমকা এগিয়ে গিয়ে ঋষভকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এতদিনের গম্ভীর ইউভান আজ ছোট বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কাঁদছে। সে ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
“ঋশ… ও কিন্তু আমারো সন্তান! আমার ইয়ানকে তুই একটু ভালো করে দেখে রাখিস, ওর যেন কোনো কষ্ট না হয়। ওকে সময় মতো চেকআপ করাস, আমি সব ঠিক করে রেখে যাচ্ছি। তুই শুধু মাসে মাসে একবার গিয়ে চেকআপ করিয়ে আনবি”

ইউভানের এই হাহাকার দেখে ঋষভের ভেতরের কঠোরতা কিছুটা নরম হলো। সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে ইউভানের পিঠে রাখলো। ইউভান তখনও ঋষভের কাঁধটা খামচে ধরে কাঁদছে। সে চোখের জল মুছতে মুছতে একরাশ অনুশোচনা নিয়ে বললো, “ছোটবেলা থেকেই তুই ছিলি আমার চোখের বালি, আমার একমাত্র শত্রু। সারাজীবন শুধু তোর সাথে হিংসা করেছি, সবসময় চেষ্টা করেছি তোর পছন্দের জিনিসগুলো তোর থেকে কীভাবে কেড়ে নেওয়া যায়। অথচ দেখ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি যে জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টের দিনে এই তোর কাঁধেই মাথা রেখে আমাকে এভাবে শিশুর মতো কাঁদতে হবে!”

ইউভানের এই স্বীকারোক্তি শুনে ঋষভের চোখ দুটোও কিছুটা থমকে গেল। ঋষভ ইউভানকে নিজের বুক থেকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে সে ওর চোখের দিকে তাকালো। শান্ত গলায় বললো,
“ছোটবেলা থেকে তুই যা চেয়েছিস, আমি নিজ থেকে তোকে নিজের অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছি ইউভান। কিন্তু তুই শেষমেশ কী করলি? আমার সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের জায়গাটাতেই বেইমানি করলি! আমার নিজের বউকেই তুই নিজের করে নিতে চাইলি?”
এটুকু বলে ঋষভ একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ইউভানের দিকে তাকিয়ে একটা মলিন হাসি ফুটিয়ে তুললো, “যাই হোক, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। পেছনের সব তিক্ততা আর শত্রুতা আজ এখানেই শেষ। তুই চলে যা যেখানেই যাচ্ছিস, তোর নতুন জীবনটা যেন অনেক সুন্দর আর সফল হয়।”
ঋষভের এই ক্ষমা আর ব্যক্তিত্বের রূপ দেখে ইউভান শেষবারের মতো ওর দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকালো। দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে ইউভান নিজের লাগেজটা টেনে নিয়ে এয়ারপোর্টের গেটের দিকে পা বাড়ালো।

কেটে গেছে আরও কিছুদিন। রায়ান পরিবারে এখন শুধুই খুশির আমেজ। জ্যোতি এখন দুই মাসের প্রেগন্যান্ট, আর এই সুখবরটা জানার পর থেকে বাড়ির সবার আনন্দের সীমা নেই। সবাই যেন তাদের হারানো হাসিমুখ আবার ফিরে পেয়েছে। তার ওপর কাল অদ্রীতের বাড়ি থেকে লোকজন আসবে রুহিকে দেখতে। পুরো বাড়ি জুড়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ।
ইয়াশফা তখন রুহির রুমেই ছিল, জ্যোতিও সাথে ছিল। তিনজনে মিলে গল্প করছিল। ঠিক তখনই হুট করে কোথা থেকে যেন ঋষভ সেখানে এসে হাজির হলো। ঘরে ঢুকেই সে কোনো কথা না বলে, কারো দিকে না তাকিয়ে ইয়াশফার হাত ধরে এক টানে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। ওর এমন ঝড়ের বেগে আসা আর ইয়াশফাকে টেনে নিয়ে যাওয়া দেখে রুহি আর জ্যোতি পুরো হাঁ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
নিজের রুমে ঢুকেই ঋষভ খট করে দরজাটা লক করে দিল। ইয়াশফা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত আর রাগি গলায় বললো, “এটা কেমন অসভ্যতা, বলুন তো? ওরা এখন কী ভাববে আমাদের নিয়ে?”

ঋষভ ওসব কোনো কথার উত্তর দিল না। সে ইয়াশফার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে স্রেফ দুটো শব্দ উচ্চারণ করলো, “থ্রি ইয়ার্স…।”
ইয়াশফা ঠিক বুঝতে পারলো না ঋষভ এই অসময়ে কী বোঝাতে চাইছে। ও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “মানে? কীসের থ্রি ইয়ার্স?”
ঋষভ এবার ইয়াশফাকে আলতো করে নিজের দিকে টেনে নিলো। ওর ঘাড়ের নরম চামড়ায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে আবার বললো,
“থ্রি ইয়ার্স…।”
ইয়াশফা এবার একটু বিরক্ত হয়ে, নিজের মেজাজে ফিসফিসিয়ে গাল দিয়ে উঠলো,
“বালের থ্রি ইয়ার্স!”
বিছানায় তখন ছোট ইয়ান শান্ত হয়ে শুয়ে ছিল। ঋষভ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ইয়াশফার জামার ফিতা আলতো করে খুলতে খুলতে আবার আকুল গলায় আওড়ালো,
“থ্রি ইয়ার্স…।”
ইয়াশফা ওর হাত সরানোর চেষ্টা করে বললো, “আবার অসভ্যতা করছেন? এসব করা পাপ, ছাড়ুন!”

কিন্তু ঋষভ তখন কোনো যুক্তি বা নিয়মের মুডে ছিল না। দীর্ঘ তিন বছরের একাকীত্ব আর তৃষ্ণা ওকে তখন অন্য এক নেশায় মগ্ন করে তুলেছে। সে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল ইয়াশফার নরম ঠোঁটের মাঝে। আন্ডারকভার মিশন থেকে দেশে ফেরার পর এটাই হয়তো ইয়াশফার ঠোঁটে ওর প্রথম গভীর এবং তৃষ্ণার্ত চুমু। এতদিন তো ও শুধু ভালোবেসে ওর পেটে আর বুকে মুখ গুঁজেছে, কিন্তু আজ যেন ও নিজের সবটুকু অধিকার উজার করে দিচ্ছিলো।
প্রায় দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট পর ঋষভ যখন ইয়াশফার ঠোঁট ছাড়লো, ততক্ষণে ইয়াশফার পুরো মাথা ভনভন করে ঘুরতে শুরু করেছে। ও ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিল না। মনে মনে ভাবলো তিন বছরের পুরো ডোজ কি এই বেয়াদব লোকটা আজ ত্রিশ মিনিটে একবারে তুলবে? ইয়াশফার মনে হলো ও এবার সত্যি সত্যি জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর পড়ে যাবে।ঋষভ ইয়াশফার এই অবাধ্য রূপ দেখে মুচকি হাসলো।

সে নিজেকে সামলাতে না পেরে আবার যখন ওর ঠোঁটের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই টাইমিং মিলিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা ইয়ান হঠাৎ বেশ জোরে কেঁদে উঠলো। ছেলের এই অসময়ের কান্নায় ঋষভের রোমান্টিক মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো হলো।
ইয়াশফা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ঋষভকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে ইয়ানকে কোলে তুলে নিয়ে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে লাগলো।
ঋষভ নিজের কপাল চাপড়ে চরম বিরক্ত হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো, “ভাইরে ভাই! তোমাকে এখনই ঘুম থেকে উঠতে হলো? এই দীর্ঘ তিনটা বছর আমি আমার বউকে একটু কাছে পাইনি, আজ অন্তত একটু শান্তিতে…!”

ঋষভ সোফায় ধপ করে বসে ইয়াশফার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ইয়াশফার দুধ খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখতে দেখতে ও নিজের ঠোঁট চেটে বললো, “আমার মনে হয় আরেকটা চুমু খাওয়া উচিত আমার।”
ইয়াশফা ছেলের দিক থেকে চোখ তুলে ঋষভের এই অদ্ভুত চাউনি দেখে একটু চমকে উঠে বললো, “কীহ?”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৬

ঋষভ বেশ গম্ভীর মুখে দুষ্টুমি ভরা গলায় বললো, “আই মিন, মিল্ক তো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো। আমাদের সবারই রেগুলার মিল্ক খাওয়া উচিত। সো, আমিও এখন একটু খেতে চাই।”
ইয়াশফা ঋষভের ডাবল মিনিং কথার আসল অর্থটা ধরতে না পেরে একদম সাধারণভাবেই বললো, “ওহ, এই কথা! কিচেনে ফ্লাস্কে গরম করে রাখা আছে, গিয়ে খেয়ে আসুন। আর না হলে দুই মিনিট বসুন, আমি ইয়ানকে খাইয়ে নিয়ে এসে আপনাকে ঢেলে দিচ্ছি।”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৮