প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (৪)
রোজ ও রুশা
রাত ঠিক কখন গভীর হতে শুরু করে, সেটা ঘড়িও বলে দিতে পারে না,কিছু রাত থাকে, যেগুলো নিজের ভেতরেই অন্ধকার জমিয়ে রাখে। ঢাকা–চট্রগ্রামের মহাসড়কের এই রাতও তেমনই । দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এক টুকরো কালো ফিতা রাস্তার বুক চিরে সোজা কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে । মাঝেমধ্যে বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা ট্রাকের সাদা আলো মুহূর্তের জন্য চারপাশ উজ্জ্বল করে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
কালো রঙের মাইক্রোবাসটা সেই অন্ধকার কেটে এগিয়ে চলেছে।
ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন, এসির ঠান্ডা বাতাস আর চাকার ছন্দময় শব্দ মিলিয়ে একটা স্থির পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ গাড়ির ভেতরের বাতাসে যেন অদৃশ্য উত্তেজনা মিশে আছে।
যেন কেউ একজন নিঃশব্দে যুদ্ধ করছে।বাইরে নয়—নিজের সঙ্গে। সেই মানুষটার নাম— শেহতাজ খান নাভান। গাড়ির জানালার পাশে বসে আছে নাভান।
ডান কনুইটা জানালার ফ্রেমে ঠেকানো, আঙুলে হালকা ভর দিয়ে থুতনি ধরে রেখেছে। বাইরে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখ রাস্তা দেখছে না। কারণ তার মন রাস্তার ওপারে নেই। তার মন আটকে আছে নিজের পাশের সিটে। তার পরি বউ এর দিকে।
মেয়েটা জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। হাতে ধরা আইফোনের স্ক্রিনে আঙুল নাচছে অবিরাম। কখনো টাইপ করছে, কখনো আবার পড়ে হেসে ফেলছে। সেই হাসিটা খুব ছোট। খুব নরম। খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সামান্য হাসিই নাভানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ব্যথা তৈরি করছে। কেন করছে?সে নিজেও জানে। কিন্তু মানতে রাজি নয়। নাভান নিজের মনকে কঠিন গলায় ধমক দিল।
“কেন তাকাচ্ছিস অসভ্য মিসাইল গার্ল এর দিকে? ও যা খুশি করুক। তোর কী?
মনের আরেকটা অংশ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—
“আমার কিছুই না…”দূর আমার অই তো সব। না! আপাতত আমার কিছু না!
এক সেকেন্ড থেমে আবার বলল—
” ও কেন হাসছে?” কার সঙ্গে?” এত খুশি কেন?”
তার ভেতরের প্রশ্নগুলো একটার পর একটা মাথা তুলছে। উত্তর নেই। কেবল অস্বস্তি আছে।
আর সেই অস্বস্তিটা এতটাই তীব্র যে বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠছে। নাভান কখনোই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখেনি। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়েছে—
“শেহতাজ খান দুর্বল হয় না।”
শেখতাজ খান অনুভূতি দেখায় না।” সেই শিক্ষা এত বছর ধরে তার রক্তে মিশে গেছে। তাই আজও সে মুখে কোনো অভিব্যক্তি আনল না। কিন্তু মানুষ যতই শক্ত হোক—ভালোবাসার সামনে অহংকার বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। হেরা হঠাৎ ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে হেসে ফেলল। একটা মেসেজ এসেছে। সে পড়েই মাথা নিচু করল। নাভানের বুকের ভেতর ধুপ করে উঠল।
“আবার হাসল…”বাট why?
নাভান থাকতে পারল না। আড়চোখে তাকাল।
হেরা এতটাই ফোনে মগ্ন যে তার অস্তিত্বটাই যেন ভুলে গেছে। নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“একবার তাকাও…” শুধু একবার…” মিসাইল গার্ল।
মনের ভেতর খুব শান্ত একটা আকুতি জন্ম নিল।
কিন্তু মুখে তার ছিটেফোঁটাও প্রকাশ পেল না।
বরং সে এমন ভাব করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—তার জুতো। হঠাৎ নিচু হয়ে বসল। জুতোর ফিতা খুলে ফেলল। ধীরে ধীরে আবার বাঁধতে লাগল। একবার। দুইবার। তিনবার।ফিতা ঠিকই ছিল। তবুও সে বারবার বাঁধছে। কখনো টানছে। কখনো ছেড়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই একটু শব্দ করছে। যেন হেরা তাকায়। শুধু একবার। হেরা তাকাল না। একবারও না। নাভান গভীর শ্বাস ফেলল। খুব আস্তে। যাতে কেউ না শুনতে পায়।
“Seriously…”
খুব নিচু গলায় ইংরেজিতে বিড়বিড় করল সে।
সামনের সিটে বসা অধীর রিয়ারভিউ মিররে সব দেখছে। তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
সে তুষার এর সাথে মজার মজার কথা বলছে আর চোখের ইশারা করছে হেরার সাথে ।
তুষার প্রশ্নবোধক চোখে তাকাল। অধীর খুব আস্তে মাথা নাড়ল। তার দৃষ্টি গেল নাভানের দিকে। তারপর হেরার দিকে। সব বুঝে ফেলতে তুষারের এক সেকেন্ডও লাগল না। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। পেছনের সিটে বসা ঝিনুকও একই দৃশ্য দেখছিল। সে হেরার ফোনে একটা মেসেজ করলো —
“শুরু কর?”
হেরা ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই খুব আস্তে বলল—
“হুম …”
ঝিনুক ঠোঁট চেপে হাসল।
আজকের পুরো প্ল্যানটার মূল উদ্দেশ্য একটাই—
নাভানকে নিজের মুখে স্বীকার করানো।লোকটা ভালোবাসে। কিন্তু স্বীকার করে না। আজ করবে।
করতেই হবে। এদিকে নাভান এখনও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে মনে মনে বলল—
“না… আমি কেন রিঅ্যাক্ট করব?” ও তো আমার পাশেই আছে …”যা খুশি করুক…এখন।
পরের মুহূর্তেই আবার হেরা হেসে উঠল।
এইবার একটু জোরে। নাভানের সমস্ত যুক্তি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।
“কে এত হাসাচ্ছে?” এত আনন্দের কী আছে?”
সে সোজা হয়ে বসল। আবার কাশল।
ইচ্ছে করেই একটু জোরে।
কেউ তাকাল না। হেরা তো নয়ই।
অধীর মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে হাসি চেপে রাখল। নাভান বিরক্ত হয়ে সিটে হেলান দিল। দশ সেকেন্ডও বসে থাকতে পারল না। আবার সোজা হয়ে বসল। সামনের ম্যাগাজিন পকেট থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করল। দুই পাতা উল্টে আবার রেখে দিল। বোতলের ঢাকনা খুলল। আবার লাগাল। ঘড়ি দেখল। মোবাইল বের করল। আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। প্রতিটা কাজের মাঝখানে একবার করে হেরার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু হেরা যেন আজ পৃথিবীতে একাই আছে। নাভান বলে কেউ নেই। নাভানের বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্য লাগল। এতক্ষণ পর্যন্ত সে ভেবেছিল—
হেরা হয়তো ইচ্ছে করে তাকাচ্ছে না।
এখন মনে হচ্ছে— হয়তো সত্যিই তার আর কোনো গুরুত্ব নেই। ভাবনাটা আসতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। সে খুব আস্তে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। কেউ বুঝল না।
কারণ কিছু কিছু ভালোবাসা মুখে প্রকাশ পায় না।
সেগুলো প্রকাশ পায়—অকারণে ফিতা বাঁধায়… অকারণে কাশিতে… অকারণে বোতলের ঢাকনা খুলে আবার বন্ধ করায়… আর প্রকাশ পায় সেই মানুষটার দিকে চুরি করে তাকানোয়—
যে মানুষটার চোখে নিজের জন্য একটুখানি মনোযোগ খুঁজে বেড়ায় একজন অহংকারী পুরুষ।
আজ নাভান ঠিক সেটাই করছে। সে ভালোবাসার কথা বলতে পারে না। কিন্তু হেরার একটুখানি দৃষ্টি পাওয়ার জন্য নিজের অজান্তেই ছোট ছোট শতটা বোকামি করে যাচ্ছে। আর গাড়ির ভেতরে বসে থাকা বাকি তিনজন…
তারা প্রত্যেকেই সেই নীরব যুদ্ধটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
গাড়িটা তখনও একই গতিতে ছুটে চলছে। হেডলাইটের আলো সামনে দীর্ঘ একটা সাদা রেখা এঁকে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা যেন নীরব সাক্ষী—এই গাড়ির ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকা এক অঘোষিত প্রেমযুদ্ধের।
গাড়ির ভেতরে কেউ উচ্চস্বরে কিছু বলছে না। কিন্তু তুষার সৃজন, রুশা,ঝিনুক মজা করছে,সাথে নুড়িও,
তবু নীরবতারও একটা শব্দ থাকে।আজ সেই শব্দের নাম—নাভানের অস্থিরতা। নাভান ঠোঁট শক্ত করে বসে আছে। বাইরে থেকে তাকে দেখলে মনে হবে লোকটা ভীষণ শান্ত।
যেন পৃথিবীর কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই।
কিন্তু তার বুকের ভেতরে এই মুহূর্তে যেন কেউ একটার পর একটা ঢিল ছুড়ে মারছে। কারণ— হেরা এখনও ফোনেই মগ্ন। একবারও তার দিকে তাকায়নি। একবারও না। নাভান বির বির করে।
“আমাকে দেখেও দেখছে না?” এত ব্যস্ত?”
নাকি ইচ্ছা করেই?”এমনি এমনি বলি অসভ্য, ব্যায়াদপ, মিসাইল গার্ল! ইডিয়ট একটা!
মনের ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমছে।
অথচ মুখে সেই বরফঠান্ডা ভাব। নিজের অহংকারটা নাভান এত বছর ধরে আগলে রেখেছে। আজও সেটা ভাঙতে দেবে না। সে নিজেকে বোঝাল—
“Relax, Navan. You don’t care.”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই হেরা আবার মিটিমিটি হেসে উঠল।
নাভানের মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ঠিক মাঝখানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে আর বসে থাকতে পারল না। হঠাৎ করে সামনের দিকে একটু ঝুঁকল। সিটের নিচে হেরার পায়ের কাছে কিন্তু কিছু খুজার ভঙ্গি করতে লাগলো!
“এক্সকিউজ মি…”
তারপর নিচু হয়ে হাতড়াতে শুরু করল। তুষার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
“কী খুঁজছো সালাবাবু ?”
নাভান ভ্রু কুঁচকে তুষারের করা প্রশ্নে থ ত মত খেতে বললো!
“আমার… উম… ওয়ালেটটা।”
তুষার অবাক।
“ওয়ালেট পায়ের নিচে থাকে ! আগে পকেট থাকতো জানতাম! আজ জানলাম ।” যাই হোক সালাবাবু ওয়ালেট তোমার পকেটেই আছে সি।
নাভান হাত দিয়ে পকেট ছুঁয়ে বুঝল সত্যিই ওয়ালেট সেখানেই। এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তারপর নির্বিকার মুখে বলল
” হুম… I know ওয়ালেট পকেটেই থাকে ” বাট আমি মনে করেছি প প পকেট থেকে পরে গেছে।
তুষার ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।
অধীর রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে প্রায় হেসে ফেলছিল।
হেরা সব শুনছে। সব বুঝছেও। কিন্তু মাথা তুলল না।
বরং ফোনে আরও দ্রুত টাইপ করতে লাগল।
তার ঠোঁটের কোণে এমন একটা হাসি—সৃজন বন্ধুর বেহাল দশা দেখছে। হেরা টাইপ করছে হাসি মুখে নাভান এর যে এমন অবস্থা হচ্ছে তা যেন সে কিছুই দেখে নি। হেরাকে দেখলে মনে হচ্ছে ওপাশের মানুষটা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় কেউ। তাই এতো মতো মনোযোগ ফোনে।হেরার হাসি নাভানের চোখে সেই হাসি বিষের মতো লাগল। কটমট চোখে তাকায়
*”ওর হাসিটা…”এই হাসিটা তো… মনে হচ্ছে লজ্জা পেয়ে হাসছে। কার জন্য লজ্জা পাচ্ছে ইডিয়ট। এদিকে যে তার জলজ্যান্ত জামাই পাশে বসে আছে তার খেয়ালই নেই।
সে হঠাৎ থেমে গেল। কারণ মনে পড়ে গেল—
এই একই হাসি সে একদিন নিজের গিটার বাজানোর সময় দেখেছিল। সেদিন হেরা লুকিয়ে তাকিয়েছিল।
আজ? আজ সেই হাসি অন্য কারও জন্য? ভাবতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। নাভান আবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে কৃত্রিম ভঙ্গিতে হাতঘড়ি ঠিক করতে লাগল। একবার খুলল। আবার বাঁধল।
কব্জি ঘুরিয়ে দেখল। আবার খুলল। তারপর হঠাৎ বলে উঠল—-
“এই ঘড়িটা ঠিক চলছে তো?”
কেউ উত্তর দিল না। সবাই জানে— ঘড়ি একদম ঠিকই চলছে। ভুল চলছে নাভানের মন। সৃজন তুষারের দিকে তাকিয়ে বলল—-
” হ্যাঁ ঠিক চলছে!
তুষার হাসি চেপে মাথা নেড়ে ঝিনুক এর কাছে ফিসফিস করে বলল—-
” সালাবাবু শেষ।”টুটগায়া।
হঠাৎ নাভান আবার সোজা হয়ে বসল। তারপর গলা পরিষ্কার করল।
“ঝিনুক।”
উত্তর করলো ঝিনুক।
“হুম?”
“তোর কাছে টিস্যু আছে?”
“আছে।”
“দে।”
ঝিনুক ব্যাগ খুলে একটা টিস্যু দিল। নাভান সেটা নিয়ে হাত মুছল। হাত তো আগেই পরিষ্কার ছিল। তবুও মুছল।
তারপর টিস্যুটা ভাঁজ করল। আবার খুলল। আবার ভাঁজ করল। চোখ কিন্তু একবার পরপর হেরার দিকেই যাচ্ছে। হেরা এখনও নির্বিকার। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে সে হঠাৎ খুব আস্তে বলে উঠল,
“উফফ…”
ড্রাইভিং সিট থেকে অধীর এবার আসল চালটা চালল। লুকিং গ্লাসে নাভানের অগ্নিদৃষ্টি অগ্রাহ্য করে সে টিপ্পনি কেটে বলল,—
“হ্যাঁ, কিউটি পাই! অনেকক্ষণ ধরে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে দেখছি। তা কী ব্যাপার? কার সাথে এত চ্যাট চলছে?”
হেরা একটু লাজুক ভান করে, গলাটা আরও নরম করে বলল, —-
“আছে একজন…। এইতো, গান শুনছিলাম আর কী!”
নাভানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে তীব্র বিরক্তিতে পানির পটটা হেরার আর তার মাঝখানের সিটের ফাঁকা জায়গায় ধপাস করে রাখল।
এই মুহূর্তে পেছনের সিটে পাশাপাশি বসা এই দুটি মানুষের ভেতরের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। যে গম্ভীর পুরুষটা নিজের ভালোবাসার কথা কখনো মুখে বলতে পারেনি, সে আজ তার ঠিক পাশে বসা মেয়েটির অন্য একজনের জন্য লেখা দুটো সাধারণ কথা সহ্য করতে পারছে না। নাভানের মনে হচ্ছে, হেরা যদি সত্যিই অন্য কারও হয়ে যায়, তবে তার এই গম্ভীর অস্তিত্বটাই অর্থহীন হয়ে যাবে।
গাড়ির ভেতরের নীরবতা এখন আর শান্ত নয়, এটি এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। পেছনের সিটে পাশাপাশি বসা নাভান যেন রাগে ফুঁসছে।
অধীর সামনের সিট থেকে আবার বলল—-
“তা কিউটি পাই, কী গান শুনছ একটু আমাদেরও শোনাও না? আমরাও একটু প্রেম-ট্রেমে বুঁদ হই।”
হেরা মুচকি হেসে নাভানের দিকে মুখ না ঘুরিয়েই অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে বলল—-
“এই গান সবাই শুনতে পারবে না। এটা শুধু আমার শোনার অধিকার। তোমাদেরতো বলি নি আমার জি ম্যান কে আমি পেয়ে গেছি।
এবার নাভানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে —
” আ আসলে সরি আমি ভুল ছিলাম আপনি আমার জি ম্যান নন। আমার জি ম্যান কে আমি খুজে পেয়েছি!
নাভান দাঁত কিড়মিড় করে তাকাল হেরার দিকে। রাগে তার কান গরম হয়ে উঠছে। ঠিক তখনই হেরার ফোনে একের পর এক মেসেজের টোন বাজতে লাগল। সাথে সাথে কয়েকটা ভয়েস মেসেজও এলো। মেসেজের অনবরত শব্দে আর নিজের অবহেলা সহ্য করতে না পেরে নাভান আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। হঠাৎ করেই সে তার ঠিক পাশে বসা হেরার হাত থেকে ফোনটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিজের সিটের কোণে নিয়ে গেল।
“কী এমন মেসেজ শুনি?” বলতে বলতেই স্ক্রিনে চোখ গেল নাভানের। চ্যাটের ওপরে বড় বড় অক্ষরে
লেখা’আমার গোপন প্রেমিক পুরুষ’।
মুহূর্তের মধ্যে নাভানের চোখ দুটো যেন রক্তবর্ণ ধারণ করল। রাগে, হিংসায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে কোনো কিছু না ভেবেই প্রথম ভয়েস নোটটায় ক্লিক করে দিল।
স্পিকারে একটা অত্যন্ত মিষ্টি, সুন্দর ছেলের কণ্ঠ ভেসে উঠল—
“আমি তোমার সেই গোপন প্রেমিক পুরুষ। আমি সেই ডায়েরির মালিক…”
নাভান হিংস্র চোখে হেরার দিকে তাকাল। তার নাকের পাটা কাঁপছে রাগে।
ঝিনুক সামনের সিট থেকে ঘুরে নাভানের এই উগ্র রূপ দেখে নাটকীয় গলায় বলল, —
“কী ব্যাপার নাভান? কী হয়েছে? এত রাগছিস কেন তুই? ওর প্রেমিক পুরুষ ওকে মেসেজ পাঠিয়েছে, এতে তোর কী? হ্যাঁ এখন তোর বিবাহিতা স্ত্রি হেরা। কিন্তু অই লোক ও তো তাকে খুব ভালোবাসে শুনলাম হেরার কাছে।
ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল অধীর। সে আগে থেকেই গাড়ির ব্লুটুথ সিস্টেমের সাথে হেরার ফোনটা কানেক্ট করে রেখেছিল। সে ড্যাশবোর্ডের একটা বাটনে চাপ দিতেই গাড়ির স্পিকারে অত্যন্ত জোরালো শব্দে একটা অডিও রেকর্ড চালু হয়ে গেল।
পুরো গাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো সেই যুবকের কণ্ঠ:
“আমি তোমার গোপন প্রেমিক পুরুষ, হেরা। আই লাভ ইউ সো মাচ! খুব জলদি তোমার কাছে আসবো আমি। তুমি আমার প্রথম অনুভূতি…” এর পরপরই ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা রোমান্টিক গিটারের সুর বেজে উঠল।
অডিও শেষ হতেই অধীর দুই হাত তুলে তালি বাজিয়ে উঠল—
বাহ! দারুণ তো! কিউটিপাই , তোমার প্রেমিক তো চরম রোমান্টিক !”
নাভান পেছনের সিট থেকে সামনের দিকে এমন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল, যেন সুযোগ পেলে সে অধীরকে জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু গাড়ির বাকিরা তখন সামনের সিটগুলোতে হাসাহাসি আর মজায় মেতে উঠেছে।
তুষার ঘুরে বলল—
“আরে সালাবাবু এভাবে রেগে যাচ্ছো কেন? তুমি তো আর হেরার প্রেমিক নোও ! হেরা যার সাথেই প্রেম করুক, ভালো থাকলেই হলো। আমাদের কিউটি পাই খুশি তো আমরাও খুশি!”
ঝিনুক সায় দিয়ে বলল—
“একদম ঠিক! হেরা যার সাথে খুশি থাকবে, আমরা তাকেই মেনে নেব।
হেরা মিষ্টি করে হেসে পাশে বসা নাভানের জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনি কেটে বলল—
“হ্যাঁ… আমি আমার প্রেমিক পুরুষকে অনেক অনেক ভালোবাসি। ও খুব কেয়ারিং। এখন প্লিজ, আমার ফোনটা আমায় ফেরত দিন। ওর সাথে আমার অনেক কথা আছে।”
নাভানের বুকের ভেতর তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড় বইছে। সে তার রাগকে আর সামলাতে পারছে না। পাশাপাশি বসেও হেরা অন্য এক কাল্পনিক পুরুষের ভালোবাসায় হাবুডুবু খাচ্ছে! অথচ সেই সত্যি পুরুষটা যে সয়ং তার পাশে বসে আছে, তা স্বীকার করানোর জন্য এই নাটক—এটা বোঝার মতো মানসিক অবস্থা নাভানের এখন নেই। ঈর্ষা আর অপমানে তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
ঠিক এই মুহূর্তে গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিখ্যাত ব্রিজের ওপর এসে উঠল। নিচে কুচকুচে অন্ধকার, গর্জনশীল নদী বয়ে চলেছে। রাতের আলো-ছায়ার খেলায় নদীর গভীর পানিকে আরও রহস্যময় আর ভয়ংকর দেখাচ্ছে।
হেরা তার হাতটা বাড়িয়ে বলল—
“দিন না ফোনটা…”
নাভানের ভেতরের সবটুকু সহ্যশক্তি এবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দিয়ে হাতটা বের করল। এবং তীব্র আক্রোশে হেরার দামি আইফোনটা ছুড়ে ফেলে দিল ব্রিজ ডিঙিয়ে পানিতে লেম্প পোস্ট এর আলতে স্পস্ট দেখা গেলো কেমন ঘুর্নিপাক এর মতো ঘুরে ঘুরে নিচের দিকে পরছে হেরার ফোন টা , সরাসরি নদীর অতল জলরাশির বুকে!
“আহহহহহ !!!” হেরা চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো গাড়িতে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। ড্রাইভার ব্রেক চেপে গাড়িটা ব্রিজের একপাশে দাঁড় করাল। তুষার আর ঝিনুক হা করে নাভানের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা জাস্ট মজা করতে চেয়েছিল, কিন্তু নাভান যে জেলাসি আর রাগে এতটা উগ্র হয়ে উঠবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তিরির নাভান কে উদেশ্য করে বলে —
“ আহা বেবি! তুমি ফালতু এতো রিঅ্যাক্ট করছো কেন? সে তার গোপন প্রেমিকের সাথে যা খুশি করুক না! সহজ সত্যটা মেনে নাও—সে তোমাকে ভালোবাসে না, বাসে কেবল তার ওই জিম্যানকে। ভালোবাসা কি আর জোর করে হয়, বলো? তবে হেরা… একটা কথা স্বীকার করতেই হয়, তুমি নিজের জায়গায় একদম ঠিক আছো। এতোদিনে অন্তত তোমার একটা কাজ আমার মন মতো হলো!”
গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা তখন থমথমে। নাভান তখনো হাঁপাচ্ছে। তার বুকের ভেতর এক চিলতে ঝড় বয়ে গেছে, যার রেশ এখনো কাটেনি। সে হেরার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল অথচ ভেতর কাঁপানো গলায় বলল, —
“গাড়ি স্টার্ট দিন। আর হ্যাঁ, আর একটা শব্দও যেন গাড়ির ভেতর না শুনি,ঘার বাকা হলেই ঘার মটকাতে টাইম লাগবে না …”গট ইট। যদি নিশ্বাস এর শব্দ ও শুনি আই প্রমিস ফোনের মতো নেক্সট একেক টাকে ধরে ফিক্কা মারবো ।
নাভানের সেই পাথরে কণ্ঠস্বরে গাড়ির ভেতরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। অধীর তখনো হেরার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে ভাবল, তার এই চকলেট হিরো ভাইটার ফোন পানিতে ফেলে দেওয়ার যেন একটা জন্মগত অভ্যাস আছে! প্রতিবার রেগে গেলেই কোনো না কোনো দামি ফোন এর ওপর দিয়ে ঝড় যায়। অধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল——–
‘সিট লোকেশন দেখে, জ্বালানো উচিত ছিল হারামিকে ! শেষমেশ আমাদের কিউটিপাই বনুর আইফোনটাকেই ডুবিয়ে হত্যা করল!’ এর ফোনের সাথে কি শত্রুতা আছে আল্লাহ জানে।
অধীরের মনের ভেতর তখন বাপ্পারাজের বিরহের গান করুণ সুরে বেজে উঠল—
চলে যায় প্রাণের ফোন চলে যায়…
অসভ্য গিটারওয়ালার হাতে,,,,,,,,,
নদীতে আইফোন ডুবে মরে যায়…
বাপ্পারাজের গানটা এই মুহূর্তে খুব করে গাইতে ইচ্ছে করছে অধীরের, কিন্তু নাভানের ওই এক ধমকে সবার মুখে কুলুপ। তিতির অবশ্য মনে মনে বেশ খুশি। এতক্ষণ ধরে এরা গাড়ির ভেতর যে রঙ-ঢং করছিল, এবার অন্তত চুপ করেছে। নাভানের কড়া নির্দেশে ড্রাইভার জলদি গাড়ির ভেতরের সব লাইট অফ করে দিল। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেতেই হেরা আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। তার সাধের ফোনটার জন্য ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কত দামি একটা ফোন! কিছুদিন আগেই তো জাওয়াদ খান নিজে গিয়ে শখ করে ফোনটা কিনে দিয়েছিল। রোজ আর রুশাকেও সেম ফোন কিনে দিয়েছিল সে। ওদের দুই জনেরটা ঠিকই আছে, অথচ হেরার আদরের ফোনটা এখন পানির নিচে মরণকামড় খাচ্ছে!
নাভান চরম বিরক্তিতে আর রাগে নিজের দুই চোখের ওপর হাত রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। তার ওই এক ধমকের ধাক্কায় গাড়ির বাকি সবাই যে যার মতো ঘুমানোর ভান করল এবং একসময় সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল। নুড়ি অনেক আগেই সৃজনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে ঘুমিয়ে গেছে। তিতিরও এক কোণায় চোখ বুজেছে। রুশা পরম শান্তিতে অধীরের বুকে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, আর তুষারের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে আছে ঝিনুক। বাইরে থেকে দেখলে কী সুন্দর, নিখাদ ভালোবাসার এক একটা প্রতিচ্ছবি!
কিন্তু এই গাড়ির ভেতরেই সৃজন আর রোজের মনে তীব্র ব্যাকুলতা। তারা আজ এত কাছাকাছি থেকেও যেন বহুদূরে হারিয়ে আছে। সৃজন মনে মনে ঘুমন্ত নুড়িকে সমানে বকেই যাচ্ছে। এই মেয়েটার জন্যই সে আজ তার ‘ফুল জান’-এর সাথে দুটো কথা বলতে পারছে না, না পারছে মেয়েটিকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে তার অশান্ত বুকটাকে শান্ত করতে!
আর এদিকে, নাভানের পাশেই বসা হেরার শরীরের চেনা, মাদকতাময় মেয়ালি সুবাস নাভানের নাসারন্ধ্রে বারবার এসে বাড়ি খাচ্ছে। অন্ধকারে হেরা যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, তা নাভান খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে। ইচ্ছে করেই যেন হেরার একদম গা ঘেঁষে, চিপকে বসে আছে নাভান। নাভান জানে হেরা এসব ইচ্ছে করে করছে। তার মুখ থেকে সত্যি বের করার জন্য। কিন্তু নাভান যে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। তাও হেরা কেনো অন্য ছেলের সাথে কথা বলবে। আবার জি ম্যান এর পদবি টাদিচ্ছে তাকে, এটা যে নাভান মেনে নিবে না। সিটের চিপা জায়গায় হেরার একটুও সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই চরম অসহায়ত্ব আর নাভানের এমন আগ্রাসী নৈকট্যে হেরা আরও বিরক্ত হয়ে অন্ধকারে নিঃশব্দে কেঁদেই চলল। ঠিক তখনই নাভানের একটা হাত অন্ধকারের নিয়ম ভেঙে হেরার চোখের ওপর নেমে এল। সে আলতো করে হেরার চোখ থেকে জল মুছে দিল, যেন এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেও হেরার প্রতিটা অভিব্যক্তি সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে!
হেরা চরম অভিমানে আর জেদে নাভানের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল। সে মনে মনে শক্ত পণ করে বসল—যতক্ষণ না নাভান সবার সামনে স্বীকার করবে যে সে-ই হেরার সেই ‘গোপন প্রেমিক’, ততক্ষণ এই অসভ্য গিটারওয়ালার সাথে কোনো রকম আপোষ হবে না! কোনো মতেই না!
হেরাকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে অভিমান করতে দেখে নাভানের ভেতরের সুপ্ত পুরুষটা যেন আরও অবাধ্য হয়ে উঠল। সে কোনো কথা না বলে, এক ঝটকায় হেরার নরম কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
হেরা চমকে উঠে ছটফটিয়ে উঠল নাভানকে ছাড়াতে। কিন্তু এই শক্তপোক্ত, জিম করা পাথরের মতো অনমনীয় পুরুষের শক্তির সাথে হেরা কোনোভাবেই পেরে উঠল না। তার প্রতিটি ছটফটানি যেন নাভানের ভেতরের জেদ আর অধিকারবোধকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। নাভান হেরার এই তিরিং-বিরিং করা শান্ত, অন্ধকার চোখ জোড়া দিয়ে দেখল।
হঠাৎ করেই নাভানের একটা হাত হেরার টিশার্ট এর ভেতর গলে গেল। পেটের নরম, মসৃণ চামড়ায় নাভানের তপ্ত আঙুলগুলো স্লাইড করতেই হেরা বিদ্যুবেগে শিউরে উঠল। লজ্জায় আর এক অজানা আশঙ্কায় সে নাভানের হাতটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে হাত আর এক চুলও উপরে উঠতে না পারে।
নাভান হেরার কানের লতির একদম কাছাকাছি নিজের মুখ নামিয়ে আনল। তার গরম, ঘন নিঃশ্বাস হেরার ঘাড়ে আছড়ে পড়তেই হেরা ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। নাভান কামুক অথচ অত্যন্ত ধমকের সুরে ফিসফিস করে বলল, —
” আর একটা বারও যদি ছটফট করেছ বা তিরিং-বিরিং করেছ, আই সোয়ার মিসাইল গার্ল
সবার সামনে এই গাড়ির ভেতরেই এমন কিছু করব যা সামলানোর ক্ষমতা তোমার এই নরম শরীরের নেই। তখন ওই মুখ দিয়ে কান্নার বদলে
অন্য রকম সাউন্ড বের হবে!”
হেরা অপমানে, লজ্জায় আর ক্ষোভে ফুঁসে উঠে কাঁপা গলায় বলল, —
“আপনি… আপনি একটা আস্ত অসভ্য! ছাড়ুন আমাকে!”
নাভান তার ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা, অন্ধকার হাসি ফুটিয়ে বলল, —
“হ্যাঁ, আমি। আমি শেহতাজ খান নাভান বলছি। আমার হাত অবাধ্য হতে কিন্তু এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। যদি সবার সামনে লজ্জায় লোক হাসাতে না চাও, তবে চুপচাপ আমার বুকে মাথা রাখো। জাস্ট ফাইভ সেকেন্ডস টাইম দিলাম তোমাকে।”
হেরা তার চিরাচরিত ঘাড়ত্যড়ামি নিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল। সে দেখাবে সে নাভানের এই হুমকিতে ভয় পায় না। পাঁচ সেকেন্ড অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু হেরা এক চুলও নড়ল না, নাভানের বুকে মাথা রাখাও দূর কি বাত!
কথা দিয়ে হেরা যে কথা রাখেনি, তার শাস্তি দিতেই যেন নাভানের অবাধ্য হাতের বেশামাল, তীব্র স্পর্শ সরাসরি গিয়ে পড়ল হেরার নাভির ঠিক উপরে। নাভানের শক্ত আঙুলের সেই অতর্কিত চাপ আর উষ্ণতা হেরার মেরুদণ্ড বেয়ে এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বইয়ে দিল। লজ্জায়, অপমানে আর এক অদ্ভুত শিহরণে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হেরা নিজের অজান্তেই সমস্ত প্রতিরোধ হারিয়ে মাথাটা সমর্পণ করল নাভানের চওড়া বুকে।
হেরা বুকে মাথা রাখতেই নাভানের ভেতরের সেই অশান্ত, জ্বলন্ত এবং হিংস্র আত্মাটা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে এক শীতল জলস্রোতে পরিণত হলো। যেন এই একটা আশ্রয়ের জন্যই সে এতক্ষণ চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিল। সে তার লোহার মতো শক্ত দু-হাতে হেরাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে পিষে ফেলল, যেন হেরা তার শরীরেরই একটা অংশ।
হেরা দমবন্ধ গলায়, অভিমানী সুরে নাভানের শার্ট খামচে ধরে ফিসফিস করে দাতে দাত চেপে বলল, —
“ছাড়ুন আমাকে। আপনি একটা পাষাণ, ! জোর করে, ভয় দেখিয়ে কাউকে এভাবে নিজের কাছে রাখা যায় না… অসভ্য গিটার ওয়ালা।
নাভান হেরার মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে, তার রেশমি চুলে মুখ গুঁজে গভীর এক শ্বাস নিল। হেরার শরীরের সেই মন মাতাল করা সুবাস তার ফুসফুস ছাড়িয়ে সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল। নাভান তার ডান হাতের আঙুলগুলো হেরার পিঠের ওপর আরও শক্ত করে চেপে ধরে অত্যন্ত নিচু, কিন্তু এক অদ্ভুত মায়াবী ও ভালোবাসায় জড়ানো গলায় বলল,
“জোর না করলে কি তুমি কোনোদিন স্বেচ্ছায় এই বুকে আসতে মিসাইল গার্ল ? আমি পাষাণই ভালো। এই পাষাণের বুকেই তোমাকে সারাজীবন এভাবেই ছটফট করতে হবে, এর বাইরে তোমার কোনো মুক্তি নেই। আমার থেকে পালাতে চাইলে আমি আরও বেশি অন্ধকার হয়ে যাব, আরও বেশি অবাধ্য হয়ে যাব। তোমার এই অবুঝ জেদ আমার খুব চেনা, কিন্তু আমার এই অবাধ্য, আগ্রাসী ভালোবাসাকে সামলানোর সাধ্য তোমার ওই ছোট্ট হৃদয়ের বা শরীরে নেই। তাই চুপচাপ এখানেই মিশে থাকো মিসাইল গার্ল … যেখানে তোমার আসল এবং একমাত্র অধিকার।”
নাভানের কথার তীব্রতায়, তার কণ্ঠের সেই অদ্ভুত আকুলতায় আর বুকের ভেতর তার হৃদপিণ্ডের দ্রুত ধকপকানি শব্দে হেরা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে অন্ধকারেই বুঝতে পারল—এই পুরুষটি বাইরে থেকে যতটাই ডার্ক আর পাষাণ, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত, আগ্রাসী ভালোবাসাটা ঠিক ততটাই গভীর আর খাঁটি। হেরা আর নড়ল না, কোনো প্রতিবাদ করল না। কেবল তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু নাভানের শার্ট ভিজিয়ে দিল, যা নাভান কোনো আলো ছাড়াই নিজের বুকের চামড়া দিয়ে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল।। নাভানের চওড়া বুকে মাথা রেখেই সে তার শার্টের কলারটা খামচে ধরল। অন্ধকারের মাঝেই নাভানের জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জিং গলায় বলল, —
“আমি অতীতের কোনো কিছুই বাদ দেব না, অসভ্য গিটার ওয়ালা ! আমার জীবনের সেই অতীত, সেই সুন্দর অনুভূতি আর আমার সেই গোপন প্রেমিককে সাথে নিয়েই আমি আমার বর্তমানকে সাজাব। তাকে মন থেকে মুছে ফেলার সাধ্য আমার নেই।”
হেরার মুখ থেকে ‘গোপন প্রেমিক’-এর প্রতি এই গভীর টান আর একগুঁয়েমি শুনে নাভানের ভেতরের হিংস্র পুরুষটা যেন এক লহমায় অবাধ্য হয়ে উঠল। সে কোনোভাবেই স্বীকার করবে না যে সে-ই সেই গোপন প্রেমিক, কিন্তু হেরার মুখে অন্য একটা সত্তার প্রশংসা সে সহ্যও করতে পারছে না—যদিও সেই সত্তাটা তারই ছদ্মনাম!
নাভান এক ঝটকায় হেরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে এতটা শক্ত করে পিষে ফেলল যে হেরার মুখ দিয়ে একটা মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। নাভান তার চোয়াল শক্ত করে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হেরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে অত্যন্ত ডার্ক এবং কাঁপানো গলায় বলল, —
“অতীতকে সাথে নিয়ে চলবে? Forget it, মিসাইল গার্ল ! Just damn forget it! তোমার ওই পাস্ট, ওই সস্তা মেমোরি আর ওই তথাকথিত গোপন প্রেমিক—সবকিছু আজ এই মুহূর্তে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দাও। তোমার ওই জীবনে যা কিছু ঘটে গেছে, সেসবের ওপর আজ থেকে আমি নিষেধাজ্ঞা জারি করলাম।”
হেরা ছটফটিয়ে উঠে বলল, —
“আপনি জোর করছেন অসভ্য গিটার ওয়ালা ! আপনি আমাকে বাধ্য করতে পারেন না!”
“আমি সব মিসাইল গার্ল , আই ক্যান ডু অ্যানিথিং!”
নাভান তার এক হাত হেরার সুতি কামিজের ওপর দিয়ে তার পিঠে শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আরও নিবিড় করে নিল। নাভানের তপ্ত নিঃশ্বাস হেরার গাল আর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে অন্ধকারের মাঝেই হেরার ঠোঁটের খুব কাছাকাছি নিজের ঠোঁট জোড়া এনে ফিসফিস করে বলল,
“আই ডোন্ট কেয়ার তোমার পাস্টে কে ছিল বা তুমি কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে। তোমার সেই গোপন প্রেমিক যদি আজ সত্যি সত্যি তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়, আর তুমি যদি তার দিকে এক পলক তাকাও… তবে আই সোয়ার মিসাইল গার্ল , আমি নিজের হাতে তাকে ধ্বংস করে দেব। তোমার ওই ছোট্ট হৃদয়ে কোনো পাস্টের জায়গা নেই। সেখানে কোনো মৃত স্মৃতির অস্তিত্ব থাকবে না। সেখানে শুধু এই রক্ত-মাংসের অভদ্র, অসভ্য, অহংকারী শেহতাজ খান নাভানের একান্ত রাজত্ব থাকবে। তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার ভাবনায়, তোমার এই নরম শরীরে… শুধু আমার অধিকার থাকবে।
নাভানের এই তীব্র রাগ আর আগ্রাসী ভালোবাসার প্রকাশে হেরা শিউরে উঠল। সে টের পেল নাভানের শক্ত হাত দুটো কীভাবে তার শরীরে এক অদ্ভুত অবাধ্যতায় মেতে উঠেছে। নাভান মুখে নিজেকে গোপন প্রেমিক বলে স্বীকার তো করলই না, উল্টো নিজের সেই অতীত রূপটাকেই এক চরম হিংসায় হেরা’র মন থেকে মুছে দিতে চাইল। তার এই জোর খাটানো আর অতিরিক্ত ভালোবাসার তীব্রতায় হেরা এক অদ্ভুত আবেশে অবশ হয়ে যেতে লাগল।
গাড়িটা তখন অন্ধকারের মাঝে, সমস্ত সত্য-মিথ্যার দেয়াল ভেঙে হেরা আর নাভান একে অপরের নিঃশ্বাসে মিশে রইল—যেখানে কোনো অতীত নেই, কোনো ছদ্মনাম নেই, আছে শুধু এক তীব্র, অপ্রকাশিত এবং অবাধ্য ভালোবাসার গল্প।
সকালে বান্দরবান পৌঁছানোর পর থেকেই সবার ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা অত্যন্ত নামী, বিলাসবহুল এক রিসোর্টে উঠেছে সবাই। বড়রা যে যার মতো স্বামী-স্ত্রীর রুমে সেটেলড হয়ে গেছেন। অন্যদিকে তুষার, অধীর আর সৃজন—এই তিনজন ছেলে এক রুমে আস্তানা গেড়েছে। কিন্তু নাভান বরাবরের মতোই আলাদা, সে নিজের জন্য সিঙ্গেল রুম নিয়েছে।
রিসোর্টের রুম বণ্টনে নাভান একটা চাল চেলেছিল। সে ইচ্ছাকৃতভাবেই হেরাকে একদম একা একটা রুমে পাঠিয়েছে, আর তিতির ও নুড়িকে দিয়েছে একসাথে অন্য একটা রুম। রোজ রুশা ঝিনুক একসাথে, তুষার,সৃজন,অধীর একসাথে,যদিও বন্ধুমহল বুঝতে পেরেছে। তাও হেরাকে একা রুম দেয়ার জন্য নাভানের সামনে না বোঝার বান ধরেছে। দুপুরে সবাই মিলে একটা নামী দামি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভরপেট খেয়ে নিল। তারপর পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, ছবি তোলা আর মাস্তি—সব মিলিয়ে দারুণ কেটেছে সময়টা। রাতে অবশ্য আজ আর কেউ উঁচু পাহাড়ে ওঠার ঝুঁকি নেয়নি। সবাই মিলে রিসোর্টের লবিতে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিয়েছে, গান গেয়েছে।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও কয়েকটা ভাঙা হৃদয়ের নীরব আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি।
হেরা পুরোটা সময় নাভানের ওপর চরম রেগে ছিল। গাড়ির ভেতরের সেই অবাধ্য স্পর্শ আর জোর খাটানোর পর থেকে সে নাভানের দিকে এক পলকও তাকায়নি, একটা কথাও বলেনি। নাভানও যেন এক শিকারী চিতার মতো শান্ত হয়ে বসে ছিল, সে শুধু সুযোগের অপেক্ষা করছিল—কখন এই অবুঝ মেয়েটাকে একা পাওয়া যাবে। কিন্তু হেরা এক মুহূর্তের জন্যও রোজ আর রুশার পাশ থেকে নড়েনি।
রিসোর্টের শান্ত পরিবেশটাকে বিষাক্ত করে তুলতে তিতিরের এক মুহূর্ত সময় লাগল না। নাভানের পাশে গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে অহেতুক হেসে হেসে কথা বলছিল। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে হেরার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সে কান্নাকাটি করতে রাজি নয়।নিজেও জানে না অই অসভ্য গিটার ওয়ালার জন্য তার কেমন জানি খারাপ লাগা জেলাসি সব আসছে। নিজের কষ্ট আড়াল করতে সে জাস্ট বিরক্তির এক অদ্ভুত এক্সপ্রেশন দিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিতে চাইল।
হেরার এই ছোট ইশারাটুকু চোখে পড়তেই তিতির বিজয়ের হাসিতে মুখ ভেংচি কেটে বসল! যেন নাভানকে নিজের দখলেই রেখে হেরা-কে হিংসা দেখানোই তার মূল লক্ষ্য।
ঠিক তখনই নাভানের ফোনে একটা জরুরি কল এল। নাভান একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে তিতিরের পাশ দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলো। আর অমনি হেরা হেলেদুলে তিতির এর দিকে আসতে গিয়ে চতুরতার সাথে পা বাড়িয়ে দিল! হেরার গায়ের সামান্য ধাক্কায় তিতির প্রায় সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল।
তিতির কড়া গলায় বলল—-
“এটা কী করলে? অভদ্র মেয়ে!”
হেরার মুখে এক জয়ের হাসি ধরে রেখে ডাঁটের মাথায় বলল—
“ক্যান? ভেংচি কাটার সময় মনে ছিল না বুঝি?”
হেরার চাল ধরে ফেলে ধিক্কারের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল তিরির —-
“আহা! তুমিই তো আমায় আগে ভেংচি কেটেছ! আসলে তোমার ভেতরে প্রচণ্ড হিংসে কাজ করছে, তাই না? নাভান যে একটু বাধ্য হয়ে আমার সাথে ঘুরছে।
হেরা হেসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“এ মা! হিংসে হতে যাবে কেন, তিতির পাখি? আমার তো আনন্দ হচ্ছে! ইচ্ছে করছে একদম নাচ-গান জুড়ে দিই! সত্যি বলতে, দূর থেকে না… অসভ্য গিটার ওয়ালা আর তোমাকে একদম কালনাগিনী আর নাগরাজ-এর মতো লাগছিল!”
তিতির রাগে ফুসফুস করে বলে —
“কী! তুমি আমায় কালনাগিনী বললে?!”
হেরা উপহাসের সুরে বলল—
“ওহ্, ভুল হয়ে গেছে! তা হলে কী বলব? ‘নাগরানী’ বলব?”
তিতির রাগি গলায় জবাব দিল—
“ইডিয়েট!”
হেরা এবার নিজের আসল রূপটা বের করে আনল। মুখ থেকে সমস্ত কৃত্রিম মিষ্টি ভাব মুছে ফেলে তিতির এর একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। হিংস্র চোখে বলল—
“তুমি যতই ওর পিছু পিছু ঘোরো না কেন, আর অসুস্থতার মিথ্যে অজুহাত খুঁজে সিমপ্যাথি নেওয়ার চেষ্টা করো না কেন—আমি তোমায় হাড়ে হাড়ে চিনি মিস তিতির জায়িন চৌধুরী ! চুপ করে আছি বলে ভাবছ কিছু বুঝি না? তুমি হলে ওই অতিথি পাখির মতো… এসেছ ক’দিনের জন্য, আবার অতিথি পাখির মতোই উড়ে চলে যাবে!”কিন্তু আমার জায়গা আমি চাইলে একই জায়গায় রাখতে পারবো মরার আগ অব্দি!
হেরার চোখে কান্না আসার বদলে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠল। সে নাভানের ওপর তার গভীর বিশ্বাসের জায়গা থেকে স্পষ্ট আর শক্ত গলায় বলল—
“হা হা! তুমি সত্যি বোকার স্বর্গে বাস করছ, হেরা ! এই তিতির এর দেহে প্রাণ থাকতে নাভানকে আমি তোমার সাথে সংসার করতে দেব না, বুঝেছ? দেখতে পাচ্ছ না, ও আমার সাথে সময় কাটায়। আর কাটাবেই না কেনো আমার মতো সুন্দরী আশে পাশে থাকলে ছেলেরা এমনি পাগল হয়ে যাবে। আর নাভান তো আমায় অনেক কেয়ার করে। ওর মনটা যে আমার কাছেই থাকে!” ওসব তুমি বুঝতে পারবে না!
তিতির, হেরার এই মানসিক জোর সহ্য করতে পারল না। নিজের অবস্থান হারিয়ে ফেলার ভয়ে ঠোঁট কামড়ে দাতে দাত চেপে হুমকি দিয়ে বলল—
“মেয়ে, যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে। লাটাই তো আমার হাতে!!
হেরার এই হীন মানসিকতা দেখে ঘৃণাভরা চোখে তাকাল তিতির —
“ফালতু মেয়ে! তোমাকে আমি দেখে নেব!”
হেরা কোনো লজ্জিত না হয়ে উল্টো একটা টিপ্পনি কেটে বলল—
“আচ্ছা, কোনো ব্যাপার না! সুন্দর দেখে একটা পিক পাঠিয়ে দেব ‘হোয়াটসঅ্যাপে’, ভালো করে জুম করে দেখিয়েন!”
তিতর আর নিজেকে ছোট না করে হেরার দিকে ত্যাড়্যা দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বলল—-
অসভ্য!”
হেরা নিজের কুটিল হাসি বজায় রেখে জবাব দিল–
“সেম টু ইউ, ডিয়ার!”
তাদের কথা কাটাকাটির পর। সবাই এক সাথে হয়েছে সন্ধ্যায় —
এদিকে লবির আড্ডায় তিতির বারবার নাভানের কাছাকাছি ঘেঁষার চেষ্টা করছিল, কিন্তু নাভান এখন তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। সে স্বাভাবিকভাবে তিতিরকে এড়িয়ে গিয়ে সবার সাথে কথা বলছে। তিতিরের ভেতরের হিংসা যেন আগুনের মতো জ্বলছে, এটা সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। নুড়ি আবার সৃজন এর সাথে রোজের ব্যাপারে এটা-ওটা বোঝাচ্ছিল, রোজের নামে খুব সুনাম করছিল। সৃজন তখন রোজের কথা ভেবে আপনমনেই হাসছিল।
কিন্তু দূর থেকে তো রোজ এই ভেতরের কথা জানে না! সে দেখছে সৃজন আর নুড়ি হাসাহাসি করছে, আর নুড়ি সেই সুযোগে সৃজনের দিকে চেয়ে আছে। রোজের মনটা শুরু থেকেই ভীষণ খারাপ। এই ট্যুরে আসার পর থেকে সৃজন তার সাথে দু-দণ্ড ভালোভাবে কথাই বলেনি। অভিমানে, কষ্টে রোজের চোখ ফেটে জল আসতে চাইল।
রাত বাড়ার সাথে সাথে আড্ডা ভাঙল। তুষার-ঝিনুক আর অধীর-রুশা যে যার রুমে চলে গেল। যাওয়ার আগে তারা অবশ্য নাভানের মুখ থেকে কোনো একটা স্বীকারোক্তি বের করার জন্য খুব আঁকুপাকু করছিল, কিন্তু নাভানের সেই চতুর নীরবতার দেয়াল ভাঙার সাধ্য কারোর হলো না।
সবাই রুমে চলে যাওয়ার পর রিসোর্টজুড়ে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নাভান আর দেরি করল না। পকেট থেকে একটা মোটা অঙ্কের নোট বের করে রিসোর্টের কেবিন বয়কে দিতেই হেরার রুমের ডুপ্লিকেট চাবিটা তার হাতে চলে এলো। ঠোঁটের কোণে এক অন্ধকার, তৃপ্তির হাসি নিয়ে নাভান হেরার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
হেরা তখন মাত্রই ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। গায়ের ভারী পোশাক বদলে একটা ঢিলেঢালা, আরামদায়ক কামিজ পড়েছে। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। সারা দিনের ক্লান্তির পর ওই নরম, তুলতুলে বিছানাটার দিকে তাকিয়ে হেরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ধপাস করে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে—এটাই ছিল তার একমাত্র ভাবনা।
কিন্তু দরজার লক খোলার মৃদু শব্দে হেরা চমকে উঠল। সে ভাবল হয়তো রোজ বা রুশা এসেছে। কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে যে অবয়বটি প্রবেশ করল, তাকে দেখে হেরার গায়ের রক্ত এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল!
শেহতাজ খান নাভান!
হেরা বিছানা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—-
“আপনি? আপনি এখানে কী করছেন? যান নিজের রুমে যান!”
আইনত তারা স্বামী-স্ত্রী হলেও, এই অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়া বিয়েটাকে হেরা এখনো মন থেকে মেনে নেয়নি। সারাদিন সে এই মানুষটাকে সুকৌশলে এভোয়েড করে চলেছে, আর এখন মাঝরাতে সে সরাসরি তার বেডরুমে! হেরা দরজার দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই নাভান চিতার বেগে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। এক ঝটকায় হেরার নরম হাতটা ধরে তাকে পেছনের দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল।
নাভানের চোখ দুটো রাগে আর তীব্র নেশায় জ্বলজ্বল করছে। সে হেরার একদম মুখোমুখি হয়ে, তার বিষাক্ত তপ্ত নিঃশ্বাস হেরার মুখে ছড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত ও উগ্র কণ্ঠে বলে উঠল, —
“কী হয়েছে তোমার, হ্যাঁ? সারাদিন ধরে এই রকম নাটক করছ কেন? এই শেহতাজ খান নাভানকে এভোয়েড করার সাহস তোমার হয় কী করে, মিসাইল গার্ল ? How dare you!”
হেরা আর নিজের ভেতরের বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না। সে নাভানের শক্ত বুকের ওপর দুই হাত দিয়ে ধাক্কা মারার চেষ্টা করে, মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করে বলল, —
“এভোয়েড করার যথাযথ কারণ আছে! কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি না। আমি আমার ওই অতীতকে, আমার সেই গোপন প্রেমিককে ভালোবাসি! তাই এভোয়েট করছি।
হেরার মুখ থেকে অন্য কারো প্রতি ভালোবাসার এই জোরালো দাবি নাভানের ভেতরের সমস্ত ধৈর্য আর নিয়ন্ত্রণ এক লহমায় পুড়িয়ে ছাই করে দিল। তার পুরুষালি অহংকার আর তীব্র পজেসিভনেস এবার হিংস্র রূপ নিল।
“তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো? আমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য পুরুষের নাম নিচ্ছ?” নাভানের কণ্ঠস্বর এবার এক আদিম হিংস্রতায় ফেটে পড়ল।
সে হেরার কোনো প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করে, এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল এবং দুই কদম এগিয়ে সরাসরি নরম তুলতুলে বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাভান তার ভারী, শক্তপোক্ত শরীরটা দিয়ে হেরার ওপর চেপে বসল। হেরা দুই হাত দিয়ে নাভানকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, বিছানায় ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হাত-পা ছুঁড়ল। কিন্তু নাভানের এই পাথুরে শক্তির সামনে তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
নাভান হেরার দুই হাত মাথার ওপর শক্ত করে এক হাত দিয়ে চেপে ধরে বিছানার সাথে লক করে দিল। তার অন্য হাতটা চলে গেল হেরার নরম গলায়। সে হেরার গলার চামড়ায়, তার কণ্ঠনালীর ঠিক ওপরে নিজের মুখটা জোর করে গুঁজে দিল। নাভানের ঠোঁট আর দাঁতের তীব্র, কামুক স্পর্শে হেরা যন্ত্রণায় আর এক অদ্ভুত শিহরণে চোখ বুজে চিৎকার করে উঠল।
নাভান হেরার গলা থেকে মুখ তুলে তার লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁটের ঠিক ইঞ্চিখানেক দূরে নিজের ঠোঁট রাখল। তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে। সে এক চরম জেদ আর উগ্র কণ্ঠে গর্জে উঠে বলল,
“ভুলে যাও! আই সেড জাস্ট ফরগেট দ্যাট পাস্ট, মিসাইল গার্ল ! তোমার ওই অতীত, যে অতীতে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই । ওই ছাইপাশ স্মৃতি আর ওই নামহীন গোপন প্রেমিককে যদি তোমার মাথা থেকে টেনে বের করতে না পারি, তবে আমার নামও শেহতাজ খান নাভান না! তুমি আমার একান্ত বেক্তিগত হালাল অধিকার , আমার এই বুকে তোমার স্থান। কোন সাহসে তুমি অন্য একটা ছায়ার মোহে আমাকে এভোয়েড করো? আমাকে অস্বীকার করার শাস্তি কতটা ভয়ানক হতে পারে, তোমার এই নরম শরীরটা তা এখনো টের পায়নি!”তাই এমন করছো?!
নাভান থেমে আবার বলে—–
” অইদিন ছেড়ে দিয়েছি বলে আবার ছাড়া পাবে? নো!!
আমি কিন্তু মানুষ ভালো না। তোমার বেলায় বড্ড অবাধ্য আমি!
নাভান হেরার কোমরে নিজের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তার অবাধ্য হাত দুটো হেরার শরীরের প্রতিটা ভাঁজে এক চরম আগ্রাসনে মেতে উঠল, যা হেরা’র ভেতরের সমস্ত অহংকার আর জেদকে মুহূর্তের মধ্যে অবশ করে দিচ্ছিল। নাভানের এই অতিরিক্ত ডার্ক রোমান্স, এই হিংস্র অথচ বুক কাঁপানো ভালোবাসা হেরার নিঃশ্বাস কেড়ে নিচ্ছিল।
নাভান হেরার কানের লতি দাঁত দিয়ে হালকা চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল—-
“তুমি যতই ছটফট করো মিসাইল গার্ল , যতই ওই গোপন প্রেমিকের নাম জপো… এই বন্ধ ঘরে, এই বিছানায় তোমার ওপর শুধু আমার রাজত্ব। তুমি ভালোবাসো আর না বাসো, তোমার এই শরীর, তোমার এই তপ্ত নিঃশ্বাস আর তোমার এই অবুঝ হৃদয়—সবকিছু আজ থেকে শুধু আমার এই বর্তমান রূপটার কাছেই সমর্পণ করতে হবে। এর বাইরে তোমার কোনো মুক্তি নেই।”
নাভানের এই উগ্র রূপ, তার কণ্ঠের সেই তীব্র আকুলতা আর বিছানায় তার শরীরের এই উত্তপ্ত আগ্রাসনে হেরা আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। তার চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল বালিশে। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষটি যতটাই নিষ্ঠুর, তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য তার ভেতরের পাগলামিটা ঠিক ততটাই তীব্র ও মারাত্মক। হেরা আর নড়ল না, কেবল এক অদ্ভুত মায়াবী ও ডার্ক আবেশে নাভানের বুকে নিজেকে সঁপে দিয়ে চোখ বুজে রইল।
নাভানের অবাধ্য ঠোঁটের স্পর্শ আর গলার ওপরে তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের তাপে হেরা তখনো কাঁপছে। বিছানার চাদরটা এক হাত দিয়ে খামচে ধরে, চোখ দুটো বন্ধ রেখেই সে কোনোমতে নিজের কাঁপানো গলার স্বর উঁচিয়ে বলে উঠল, —
“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন, অসভ্য গিটার ওয়ালা ? একবার মুখ ফুটে বলুন না যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন! কেন এত জোর খাটান, অথচ আসল কথাটা স্বীকার করতে আপনার এত অহংকার?”
‘ তুমি কি আমায় ভালোবাসো মিসাইল গার্ল।
নাভানের করা প্রশ্নে হেরা রাগে উত্তর দেয়।
” না আমি ভালোবাসি না।
নাভান হেরা’র মুখে ‘ভালোবাসি না ’ শব্দটা শুনে এক মুহূর্তের জন্য থামল না, বরং তার ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে হেরা’র দুই হাত আরও শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরে অত্যন্ত রুক্ষ, পাথুরে কণ্ঠে সরাসরি অস্বীকার করে বলল, —
“ভালোবাসা? তোমাকে? Are you out of your mind, Hera? কোন স্বর্গে বাস করছ তুমি? আমি তোমাকে ভালোবাসি—এই কাল্পনিক ধারণাটা নিজের মাথা থেকে যত দ্রুত পারো বের করে দাও। আমাদের বিয়ে হয়েছে,সেটা যেমন করেই হোক না কেনো , আর তুমি এখন আইনিভাবে আমার ঘরের বউ। ব্যস, এইটুকুই সত্য! এর বাইরে তোমার ওপর আমার যে অধিকার, তা শুধুই আমার হালাল অধিকার …।” ভালোবাসতে শুরু করো আমিও তাহলে শুরু করবো!
নাভানের এমন নির্মম ও সরাসরি অস্বীকৃতিতে হেরা’র বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। হেরা দাঁতে দাঁত চেপে চোখের জল আটকে রেখে বলল, —
“মিথ্যে বলছেন! আপনি ভালোবাসেন না, অথচ আমার গোপন প্রেমিকের মতো করে আমাকে আগলে রাখেন? কেন আপনি স্বীকার করছেন না যে আপনিই সে?”
“Just shut up!”
নাভান এবার চরম উগ্র কণ্ঠে গর্জে উঠল। তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে। সে হেরা’র কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে তাকালো কিছু বলতে গেলো কিন্তু গলা অব্দি এসে থেমে গেল।
“আমি তোমার কোনো গোপন প্রেমিক নই, মিসাইল গার্ল !
ধমকে উঠে নাভান। হেরার চোখের দিকে তাকিয়ে বির বির করে বলে —
আর আমার রাগটা ঠিক এই জায়গায়—আজ যদি আমার জায়গায় অন্য কোনো ছেলে তোমাকে ওই গুন্ডার হাত থেকে বাঁচাত, তবে কি তুই আজ এই মাঝরাতে আমার বিছানায় শুয়েও ওই দূর অতীতের কোনো এক ‘গোপন প্রেমিক’-এর ধ্যানে মগ্ন থাকতি? আমার জায়গায় অন্য কাউকে নিয়ে তুই ভাবতি । তোর যত বড় অতীত থাকুক,আমি তোর জীবনে আছি এর মানে সব অতীত তুই মুছে ফেলতে বাধ্য।
প্রথম কথা জোরে বললেও পরের গুলা মনে মনে বলে। সত্যি তো যার জন্য নাভান এর লড়াই,যার জন্য দুরুত্ব,খানিক সময়ের জন্য অন্য কেউ তার অধীকারে ভাগ বসাবে। না! এটা শেহতাজ খান নাভান তো মানবে না কখনো। যে অতীতে সে নেই সেই অতীতের সব মুছে যাক। কিন্তু হেরা যে অই এক কথা বলেই পাগল করে ফেলছে। এখানেই তো নাভানের রাগ। বিয়ে হয়েছে,হেরা জেনেছে ছোট বেলায় তাদের ভালো সম্পর্ক আছে তার পরেও হেরা এই বর্তমান শেহতাজ খান নাভান কে মানছে না।
নাভানের কণ্ঠস্বরে এবার এক তীব্র হিংসা আর ক্ষোভ ফুটে বের হলো। সে হেরা’র মুখের একদম কাছাকাছি নিজের মুখ এনে ফিসফিস করে বলল
“আমি কোনো পাস্ট বা কোনো ছদ্মনামের দয়ায় তোমাকে আমার পাশে চাই না। তোমার ওই জীবনে যা কিছু ঘটে গেছে, যেসব মেমোরি আছে—সবকিছু আজ এই মুহূর্তে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দাও। ভুলে যাও যে তোমার কোনো গোপন প্রেমিক ছিল। আমি চাই তুমি তোমার সমস্ত অতীত ভুলে স্রেফ এই মুহূর্তের রক্ত-মাংসের ‘শেহতাজ খান নাভান’কে নিজের একমাত্র পুরুষ বলে স্বীকার করো। কারণ তোমার ওই অতীত একটা মৃত ছায়া, আর আমি তোমার জীবন্ত বর্তমান!”
নাভানের এই তীব্র উগ্রতা আর মুখের ওপর এমন কঠোর অস্বীকৃতি হেরা’কে স্তব্ধ করে দিল। হেরা আর কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। নাভানের এই পাথুরে দেয়াল ভাঙার সাধ্য যেন কারোর নেই। সে অভিমান আর তীব্র অপমানে মুখ ফিরিয়ে চোখ বুজে রইল।
হেরা তো জানে না, নাভানের এই নির্মম অস্বীকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রলয়ঙ্কারী অপেক্ষা! নাভান মনে মনে হেরা’র ওপর নিজের অবাধ্য স্পর্শ বিলীন করে দিয়ে বলল—-
‘আজ আমি কোনোভাবেই স্বীকার করব না যে আমিই তোমার সেই গোপন প্রেমিক, পরি বউ মাই এঞ্জেল । আজ যদি আমি মুখ ফুটে তোকে ভালোবাসি বলি, তবে তুই তোর অতীতকে খুঁজতে যাবি । আর সেই ট্রমা তোর ব্রেইন নিতে পারবে না, যদি তোকে আমি চিরতরে হারিয়ে ফেলি । আমি জাস্ট একটা পারফেক্ট সময় আর দিনের অপেক্ষায় আছি। তোর জীবনের সমস্ত অন্ধকার কেটে যাক, তোর এই মেডিকেল রিস্কটা দূর হয়ে যাক… আমি এমন এক রাজকীয় মুহূর্ত তোর সামনে দাঁড়িয়ে তোকে প্রপোজ করব, যেদিন আমাদের মাঝে কোনো পাস্টের ছায়া থাকবে না। সেই বিশেষ দিনটার জন্যই আজ আমি এই পাষাণ রূপ নিয়ে নিজেকে আটকে রাখছি, অক্সিজেন … শুধু তোর সুরক্ষার জন্য। আমায় ক্ষমা কর জান প্লিজ। আমি অসহায়। তোর বিন্দু পরিমান ক্ষতি আমি নাভান হতে দিবো না।
নাভান হেরা’র নীরবতা দেখে তার কপালে আর চোখের পাতায় নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তার স্পর্শে রোমান্সের কোমলতা ছিল , ছিল এক চরম অবাধ্যতা আর তীব্র অধিকারবোধ। নাভান ফিসফিস করে বলল—-
“চুপচাপ এই বুকেই মিশে থাকো মিসাইল গার্ল । তোমার অতীতকে আমি তোমার মন থেকে মুছে তবেই ছাড়ব।”
রিসোর্টের সেই বন্ধ ঘরে, বান্দরবান পাহাড়ের শীতল হাওয়ার মাঝে হেরা নিজের সমস্ত জেদ আর অভিমান নিয়ে নাভানের চওড়া বুকে মিশে রইল। হেরাকে বুকে জরিয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষন।
নাভান হেরার কপালে নিজের ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে ধরে এক দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিল। তার কণ্ঠস্বর এবার ক্ষ্যাপাটে থেকে আচমকা এক মায়াবী মদিরতায় রূপ নিল,
“তুমি যার জন্য অপেক্ষা করছ মিসাইল গার্ল , সে একটা অতীত, একটা ছায়া মাত্র। আর আমি তোমার বর্তমান। ছায়াকে ছুঁতে গেলে শুধু শূন্যতা পাবে, আর আমার এই বুকে এলে তুমি জীবন্ত ভালোবাসার ওম পাবে। চুজ করো মিসাইল গার্ল … তুমি কি ওই মৃত ছায়াকে নিয়ে বাঁচবে, নাকি এই অবাধ্য নাভানের বুকে নিজেকে বিলীন করে দেবে?”
নাভানের কথার এই গভীরতা, তার স্পর্শের এই তীব্র ব্যাকুলতা আর বুকের ভেতরের সেই চেনা পাগলামি হেরা’র মনের সবটুকু প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। হেরা অন্ধকারেই বুঝতে পারল—এই পুরুষটি মুখে নিজেকে অস্বীকার করলেও, তার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ আর ডার্ক ভালোবাসাই প্রমাণ করে দিচ্ছে সে হেরা’র কতটা আপন। হেরা আর কোনো তর্ক করল না, নিজের জেদটুকু বিসর্জন দিয়ে সে আরও শক্ত করে নাভানের চওড়া বুকটাকে জড়িয়ে ধরল।
নাভান মৃদ হাসলো। হেরার জরিয়ে ধরা দেখে।হেরা বলে উঠে।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (৩)
” আমি শুধু সত্তিটা জানতে চাই অসভ্য গিটার ওয়ালা।
নাভান মাথায় হাত বুলিয়ে আরো আবেশে জরিয়ে নিয়ে বলে।
” সময় হলে সব জানতে পারবে।
হেরার গলায় অবাধ্য স্পর্শ করতে করতে নাভান হেরাকে জরিয়ে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে তা বুঝতে পারে নি।
