প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (৩)
রোজ ও রুশা
কল্পনার জগৎ থেকে বের হতেই হেরা দেখে সবাই তার রুমে হাজির। কিন্তু সে তখনও তৈরি হতে পারেনি। হেরা কে এমন ছন্নছাড়া অবস্থায় দেখে রুশা একরকম চিৎকার করেই ওঠে——-
” কিরে হেরা পাখি! তুই এখনো রেডি হস নি?”
হকচকিয়ে যায় হেরা। অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে ওঠার জন্য দ্রুত জবাব দেয়————
” এই তো আর মাত্র দুই মিনিট ! আচ্ছা , রোজ কোথায় রে ?”
রুশা ঠোঁট উল্টে বলে——-
” নাগরের কাছে গেছে। সৃজন ভাইয়া নাকি ডেকেছে—কোন ড্রেসটা পরবে সেটা সাজেস্ট করার জন্য ।”
” ও আচ্ছা——
বলে হেরা বেশি পাত্তা না দিয়ে দ্রুত তৈরি হতে চলে যায়।
এদিকে এই ঘরেরই এক গোপন কোণে বসানো সিসি ক্যামেরার ওপাশে বসে একজন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল তার প্রেয়সীকে। হেরা যখন তাড়াহুড়ো করছিল, ওপাশের মানুষটি নিজের বুকের বাঁ পাশে হাত দিয়ে এক চিলতে মুচকি হাসল। ভালোবাসার এই গোপনতা হেরা টেরই পেল না।
রোজ আজ দ্বিতীয়বারের মতো সৃজনদের বাড়িতে পা রাখছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে তার। সৃজন তো সবসময় বলত, একবারে বউ করে তাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবে। তবে আজ হঠাৎ কী এমন হলো যে মেসেজ করে এত দ্রুত আসতে বলল?
ভয়ে ভয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখল রোজ। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত, ভয়াবহ ঘটনার পর সে আর কখনো এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়নি। সৃজন হয়তো এক লাফে ছাদ ডিঙিয়ে ওপাশে চলে যেতে পারত, কিন্তু রোজের সেই সাহস কোনোদিন হয়নি। তারা দুজনই চেয়েছিল তাদের সম্পর্কটা হালাল হোক। নারী আর পুরুষ তো আগুন আর পানির মতো—একসাথে থাকলে কত রকম ইচ্ছে জাগে মনে! কিন্তু ভালোবাসার গভীরতা যতই হোক, তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করেছে, সঠিক সময়ের অপেক্ষা করেছে।
কিন্তু আজ ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা দেখে রোজের মনটা কু ডাকল। ঠিক তখনই সৃজনের মা সালেহা সরকার কর্কশ গলায় ডাক দিলেন,
” কী ব্যাপার, সুর্বনা রোজ?”
কথাটা এমন ভারী গলায় বললেন শায়লা সরকার, শুনে রোজ একটু চমকে উঠল। পরিপাঠি মাঝবয়সী মহিলাটিকে দেখলে প্রথম দর্শনে ‘মা’ বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু উপর থেকে মানুষটাকে যতটা সুন্দর দেখায়, তার ভেতরের ব্যবহার কি আদেউ সুন্দর?
রোজ একটু কাচুমাচু করে সামনে আগায়। কিন্তু শায়লা সরকার ভারী গলায় আবারো বললেন——
“আমি কি নামটা ঠিক বলেছি?”
চারিদিক এত থমথমে দেখে রোজ একটু ভড়কে গেল। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে নরম সুরে সালাম দিল—
“আসসালামু আলাইকুম আন্টি। ভালো আছেন?”
শায়লা সরকার কোনো উত্তর না দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন মেয়েটিকে। রোজের মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে তার মনে একটাই কথা আসছিল—মাশাল্লাহ, মেয়েটার মুখে মায়া আছে সত্যি, কিন্তু সরকার বাড়ির বউ হিসেবে একে কোনোভাবেই মানা যায় না! তার ছেলে সৃজন এই বংশের একমাত্র সন্তান, কত নামডাক তাদের! তার ছেলের পাশে কোনো নামিদামি ঘরের মেয়ে থাকবে, যেমন তার নিজের ভাতিজি নূরী। নূরী দেখতেও সুন্দরী, এলাকায় তাদের কত সম্মান!
রোজের মায়ায় হয়তো কাজল খান বা তৌহিদা তালুকদারের মতো ফ্যামিলি গলে গেছে, তারা রক্তের কেউ না হয়েও একে মাথায় তুলে রেখেছে; কিন্তু শায়লা সরকার সমাজকে বড্ড ভয় পান। সৃজন যে কী পেয়েছে এই মেয়ের মধ্যে, তিনি ভেবে পান না। আসলে সৃজন তো কোনো মেসেজ করেইনি; নূরীই সৃজনের ফোন থেকে মেসেজটা পাঠিয়ে ফুফিমণিকে আগে থেকে সব শিখিয়ে রেখেছিল।
নূরী তখন ধীর পায়ে ফুফুর পাশে এসে দাঁড়াল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত রোজকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখল সে। রোজ মাথা নিচু করে তাকেও সালাম দিলে নূরী শুধু একটু বাঁকা হাসল, উত্তর দিল না।
শায়লা বেগম সোফার ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে চাবুকের মতো একের পর এক কথা ছুড়তে লাগলেন———
“আমার ছেলেকে তোমার এই চেহারার মায়ায় ফেলে এই বাড়ির বউ হতে চাইছ? তোমার সীমার মধ্যে থাকো মেয়ে! সরকার বাড়ির বউ হবার যোগ্যতা তোমার আছে? তোমার ব্যাপারে সব জেনেছি আমি। বাবা-মা নেই, মামা-মামি বড় করেছে।”
রোজ মাথা নিচু করে শুনছে, কী বলবে বুঝতে পারছে না। আর যাই হোক, ভালোবাসার মানুষের জন্মদাত্রীর সাথে উঁচুগলায় কথা সে বলতে পারবে না। এতে যে অপমান হবে সৃজনের! শায়লা সরকার আবার বললেন——
“আমায় দেখো, আমার বংশ এত উঁচু, তারপরও আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমায় এই বাড়ির যোগ্য মনে করতেন না। লেখাপড়া সবকিছু ছিল আমার। কিন্তু দেখো, তোমার তো বংশপরিচয়ই নেই! নেই বাবা-মা। থাকো অন্যজনের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে।”
রোজ এবার নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে মৃদু স্বরে বলল——-
“আন্টি, আমি এতিম হতে পারি, কিন্তু আমার বংশপরিচয় আছে। আমার বাবা একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। মা ছিলেন ভার্সিটির প্রফেসর।”
শায়লা সরকার চোখ দুটো সরু করে কুৎসিত হেসে আবার বললেন——-
“আহা! নিজেকে এত সতী-সাবিত্রী দেখানোর চেষ্টা কোরো না মেয়ে। আজকালকার বাজারে তোমার মতো অনাথ, আশ্রিতা মেয়েরা বড়লোক ঘরের ছেলেদের কীভাবে ফাঁদে ফেলতে হয়, তা খুব ভালো করেই জানে। আমার সোজা-সরল ছেলেটাকে কী জাদু করেছ জানি না, তবে ভেতরটা তোমার কতখানি পরিষ্কার, তা ওই দুলাভাইয়ের কাহিনী শুনলেই বুঝা যায়। ওই লোক কেমন তা জানা হয়েছে আমাদের। একটা যুবতী মেয়েকে ঘরের ভেতর রেখে সেই নষ্টচরিত্র দুলাভাই সাধু পুরুষ হয়ে বসে থাকবে? নিশ্চয়ই তুমিও ডাল গলে যাওয়ার মতো সুযোগ করে দিয়েছিলে! এডভোকেট কাজল আপা হয়তো দয়া করে তোমায় মাথায় তুলেছে, কিন্তু সরকার বাড়ির রক্ত এত সস্তা না যে তোমার মতো একটা নোংরা অতীত থাকা মেয়েকে এই বংশের প্রদীপ বানাব। আর তোমার ওই দুলাভাই… সে তোমার সাথে কোনো খারাপ কিছু করেনি তো? সৃজন ওইসব জানে তো?”
নুড়ি তখন পাশে দাঁড়িয়ে ফুফুর কথায় সায় দিয়ে ফিসফিস করে বলছিল————-
“ঠিক বলেছ ফুফিমণি। এই রাজহাঁসের ভিড়ে একটা বক এসে ঢুকেছে। লজ্জা-শরম থাকলে কি আর সেচে এভাবে বড়লোকের বাড়ি এসে হানা দেয়?”
এমন কুরুচিপূর্ণ ও নোংরা কথা শুনে রোজের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। তৌহিদা তালুকদার কিংবা কাজল খানের পরিবার কখনো তাকে এভাবে অপমান করেনি, অথচ এই ভদ্রমহিলা কত সহজে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন!
রোজ অবাক হয়ে কেঁদে ফেলবার মতো করে বলল——–
“আন্টি! আন্টি আপনি কী বলছেন এসব? না আন্টি, আমাকে কেউ কখনো ওভাবে টাচ করেনি!”
শায়লা বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন—-
” শুধু শারীরিক সম্পর্ক করলেই ওটাকে টাচ বলে না। তোমার দুলাভাই বাসায় ছিল, তুমিও ছিলে, এমনিতেও তো কত কিছু হতে পারে! দেখো, ক্লিয়ার করে বলে রাখি—সৃজন হয়তো তোমার হতে পারে, কিন্তু সেটা বেশিদিনের জন্য হবে না। আমার ছেলেকে আমি চিনি। বাড়িতে একটা যুবতী মেয়ে এত বছর ধরে ঘুরঘুর করছে, ওটা তো বুঝতেই পারছ! মুখে যতই বলুক তোমাকে ভালোবাসে, কিন্তু নুড়ির সাথে যে তার বিয়ে হবে, সেটা সে ছোটবেলা থেকেই জানত। এখন তোমাকে ভালো লেগেছে, পরে নাও লাগতে পারে। তুমি এই বাড়ির বউ হওয়ার পর যদি আমার ছেলের মন ঘুরে যায়, তবে আমি নির্দ্বিধায় নুড়িকে আমার পুত্রবধূ করব।”
কথাগুলো যেন রোজের বুকে বিষাক্ত তিরের মতো বিঁধল। সৃজন তাকে বিয়ে করে আবার ভুলে যাবে? আবার নুড়িকে বিয়ে করবে?
বুকভাঙা কান্না চেপে রোজ বলল——-
“না আন্টি, আপনি কী বলছেন এসব? সৃজন আমাকে অনেক ভালোবাসে। সে কখনো এমন করবে না। আর নুড়িকে তো সে কোনোদিন ভালোবাসেনি!”
শায়লা বেগম উপহাসের হাসি হেসে বললেন——-
“হ্যাঁ! তুমি কয়দিন চেনো সৃজনকে? শোনো মেয়ে, তোমার সাথে আমি বেশি কথা বলতে চাই না। তুমি এই বাড়ির যোগ্য নও। আর তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি! কাজল খান আপার মতো আমার দরদ নেই। ভবিষ্যতে যদি কখনো এমন কিছু হয়, তবে দুবার ভাবব না তোমাকে এখান থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্য। এখন তোমার একটা নাম হয়েছে, কাজল খানের মেয়ের পরিচয় পেয়েছ, কোনো ভালো জায়গায় বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি আমার সৃজনের যোগ্য না, আর মা হিসেবে আমি এটা কখনোই মানব না।” তোমায় কিছু পিক দেখাই!
বলে নুড়ি আর সৃজন এর কিছু পিক দেখায়, যেখানে তারা খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। এগুলা পিক এমন ভাবেই তোলা হয়েছে যে কেউ দেখলে সন্দেহ করবে। রোজের খানিক বিশ্বাস না হলেও মা তো আর ছেলের ব্যাপারে এমন বাজে কথা বলতে পারে না।
শায়লা সরকার রোজকে আরো নোংরা ও অপমানজনক কথা বলে তিনি থামলেন। আর নিতে না পেরে রোজ চোখ মুছতে মুছতে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলো সেই বাসা থেকে।
এক অনাথের না-বলা হাহাকার
নিজের রুমে এসে থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে দরজা বন্ধ করল রোজ। বেসিনের রানিং কল ছেড়ে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিল ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণ বেয়ে নামা নোনা জল যেন থামতেই চাইছে না। পানির প্রতিটি ফোঁটা যখন তার মুখে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল তা যেন চাবুকের মতো তার আত্মসম্মানে গিয়ে বিধছে।
বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে শ্মশান হয়ে গেছে রোজের। একটি এতিম মেয়ের জীবনে ভালোবাসার অধিকার কি এতই অপরাধের?
আজ যদি তার নিজের মা বেঁচে থাকতেন, তবে কি তাকে পরপুরুষের ঘরের আশ্রিতা বলে এভাবে অপমান সইতে হতো? আজ যদি বাবা মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তবে কি কোনো শায়লা বেগম তার চরিত্র নিয়ে এত কুরুচিপূর্ণ কথা তোলার সাহস পেতেন?
বাবা-মা হারানোর এতিমত্ব যে কতটা নিঃসঙ্গ আর অসহায়, তা আজকের এই অপমানের মুহূর্তে রোজ হাড়হাড় করে টের পাচ্ছে। রক্ত জল করা ভালোবাসাও যে বংশমর্যাদা আর অঢেল টাকার কাছে এতটা সস্তা হয়ে যেতে পারে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। কাজল খান কিংবা তৌহিদা তালুকদারের স্নেহ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল সত্যি, কিন্তু সমাজ আজ তাকে নির্দয়ভাবে মনে করিয়ে দিল—‘তুই তো এতিম, তোর তো কেউ নেই!’
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না সে। শায়লা বেগমের বিষাক্ত কথাগুলো চাবুকের মতো তার কানে বাজছে—‘তোমাকে কেউ টাচ করেনি তো?’আল্লাহ ! একটা নিষ্পাপ মেয়ের চরিত্রকে মানুষ কত সহজে টেনেহিঁচড়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে! তার সততা, তার পবিত্র ভালোবাসা, তার সম্মান—সবকিছু এক নিমিষে এক ফোঁটা কাদা বানিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হলো। যাকে বুক উজাড় করে ভালোবাসল, যার জন্য জীবনের সব স্বপ্ন বুনল, সেই সৃজনের ভালোবাসাও আজ কঠিন প্রশ্নের মুখে।
রোজ নিজের দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল। কিন্তু কান্নার আওয়াজটা যাতে ঘরের বাইরে না যায়, তাই একহাতে নিজের জামার হাতাটা শক্ত করে কামড়ে ধরে রইল। তার বুক চিরে বের হওয়া প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস যেন বলছিল—
“মা, তুমি কেন আমাকে একা ফেলে চলে গেলে? আজ যদি তুমি থাকতে, অন্তত জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে পারতাম। কেউ আমাকে এভাবে অপবাদের তিলক এঁকে তাড়িয়ে দিত না।”বাবা কেনো একা করে চলে গেলে!!
চোখের পানি মুছে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল সে। লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটিকে সামলে নিয়ে ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। বুকে একরাশ তীব্র অভিমান, জেদ আর বিষাদ চেপে রেখে সে একটা গভীর শ্বাস নিল।
না, সে কাঁদবে না। নিজের আত্মসম্মানকে এভাবে বিলিয়ে দিয়ে সে কারো দয়ার পাত্রী হবে না। যে সম্পর্কের ওপর আজ এত অপবাদ, সেই সম্পর্কে জড়ানোর আগে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ তাকে দিতেই হবে। যতদিন না সে নিজেকে সবার সামনে যোগ্য প্রমাণ করতে পারছে, ততদিন সে সৃজনকে বিয়ে করবে না।
দরজা খুলে যখন সে বাইরে পা রাখল, মুখে তার কৃত্রিম এক মলিন হাসি। নিজের কষ্টটা সবার কাছে গোপন করে সে একদম স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকালে যে কেউ বুঝতে পারবে—হাসির আড়ালে ভেসে চলেছে এক অনাথ মেয়ের বুকভাঙা কান্নার নদী।
রোজ বড্ড সরল, বড্ড সহজ। ছলচাতুরী আর কুটিলতার পৃথিবীটা তার কাছে এখনো অজানা। সে তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, নূরী তার অলক্ষ্যে কতটা বিষাক্ত চাল চেলে চলেছে! গত কয়েকদিনে ভণ্ডামির চরম সীমা পার করে নূরী সৃজনের কাছ থেকে ‘ভাইয়ের অধিকার’-এর নাটক সাজিয়ে অফুরন্ত সহানুভূতি আদায় করে নিয়েছে। তার মিষ্টি কথা, আহ্লাদি আচরণ আর অনর্থক হাসি-ঠাট্টায় সৃজন বুঝতেই পারেনি এর পেছনে কী গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। আজ আবার এই যাত্রাতেও নূরী তাদের সঙ্গ নিয়েছে, একই গাড়িতে যাওয়ার টিকিট কেটে নিয়েছে। নূরী আর তার পিসি-মনির পাতা এই নোংরা চক্রান্তের জালে ফেঁসে গিয়ে অবুঝ রোজ সৃজনকে মারাত্মক ভুল বুঝে বসে রইল। নিঃশব্দে এক অচেনা দূরত্ব জন্ম নিল দুটি ভালোবাসার হৃদয়ের মাঝে।
এদিকে যাত্রার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ। বড়রা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা সবাই আলাদা একটি গাড়িতে যাবেন। আর বাড়ির তরুণ প্রজন্ম যাবে অন্য একটি গাড়িতে। তবে এখানেও ছোটখাটো এক যুদ্ধ হয়ে গেছে। হায়দার আলীকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তিতিরও শেষমেশ তরুণদের সাথে যাওয়ার অনুমতি বাগিয়ে নিয়েছে। এমএলএ অ্যাডভোকেট কাজল খানের সাথে হায়দার আলীর অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকায় তিতিরকে তারা আর ‘না’ বলতে পারেননি। আর নাভান সুন্দর করে তিতিরকে বুঝিয়েছে, সে বিবাহিত, আর তার প্রতি এমন আচরণ করা ঠিক না। নাভান শুধু হেরার অসভ্য গিটার ওয়ালা। তিতির এর না। তিতির যেনো কথাটা কানে তুলেনি। ডাক্তারের সাথে কথা বলে। তিতির এর মানসিক সমস্যা যাতে না হয় নাভান ঠিক সেভাবেই শান্ত ভাবে তিতির কে বুঝিয়েছে। তিতির এর রিপোর্ট ভালো এখন, কিন্তু তাও মেয়েটার এমন করার কারণ বুঝতে পারে না নাভান,হায়দার চৌধুরী, বা ডাক্তার। সে আগের মতো রুডা বিহেভ না করলেও ন্যাকামি করে নাভানের সাথে।
তবে তিতিরের এই অতিরিক্ত মেকি ভালোবাসা আর আদিখ্যেতা হেরার চোখের সামনে মোটেও ভালো ঠেকছিল না। হেরার প্রখর দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধরা পড়ছিল—তিতির স্রেফ নাভানের কাছাকাছি থাকার বাহানায় এই সব নাটক ফেঁদেছে। অসুস্থতা নেহাত নাটক।
অবশেষে যাত্রার শুভসূচনা হলো। সবাই যার যার পছন্দমতো গাড়িতে গিয়ে উঠতে লাগল। গাড়িটি বেশ বড়, প্রশস্ত এবং অত্যন্ত আরামদায়ক। মাইক্রো বাস।
সবাই ওঠার আগেই তিতির দৌড়ে গিয়ে ড্রাইভারের ঠিক পাশের সামনের সিটটা দখল করে বসল। কারণ তার কাছে খবর ছিল নাভান নাকি ড্রাইভ করবে! তিতিরের মুখে তখন বিজয়ের এক চওড়া হাসি। সে মনের আনন্দে নিশ্চিত হয়ে বসে আছে যে নাভান ড্রাইভিং সিটে বসবে, আর পুরোটা পথ সে নাভানের একদম গা ঘেঁষে রোমান্টিক গল্প করতে করতে যাবে। কিন্তু তার সেই রঙিন আশায় অমনি এক বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল অন্য এক পেশাদার চালক। নাভান ড্রাইভারের আসনে নেই দেখে মুহূর্তের মধ্যে তিতিরের সেই উজ্জ্বল মুখটা কালো মেঘে ছেয়ে গেল। বিষণ্ন মনে সে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল।
ড্রাইভারের ঠিক পেছনের, অর্থাৎ সেকেন্ড লাইনের সিটটিতে গিয়ে বসল অধীর। তার সঙ্গে রুশাও কোনো দ্বিধা না করে পাশাপাশি গিয়ে জায়গা নিল। তারা দুজন নিজেদের আলাদা এক জগত বানিয়ে নিচু গলায় গভীর গল্পে মেতে উঠল। তবে রুশার পাশের সিট খালি ছিল না; মানুষের চেয়ে যেন জিনিসপত্রের বহর বেশি! এতো ব্যাগ আর টুকিটাকি জিনিস জমা হয়েছে যে সেগুলো বাধ্য হয়ে ওই সিটেই তুলে দিতে হয়েছে।
আসল নাটকের মঞ্চস্থ হলো তার ঠিক পেছনের থার্ড লাইনের সিটে। জায়গাটা একটু চওড়া, অনায়াসে তিনজনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। সৃজন গিয়ে বসার সাথে সাথেই নূরী একপ্রকার গায়ের জোরে, সৃজনের ঠিক গা ঘেঁষে মাঝখানের জায়গাটা দখল করে বসল! আর অগত্যা নুড়ির পাশে গিয়ে বসতে হলো রোজকে।
অর্থাৎ, একই সিটে একপাশে সৃজন, মাঝখানে বিষাক্ত চক্রান্তের প্রতীক নুড়ি , আর অন্যপাশে বুকে একরাশ কষ্ট চেপে রাখা রোজ। নুড়ি মাঝখানে বসে এমন এক ভাবভঙ্গি ছড়াতে লাগল, যেন সৃজন শুধুই তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি!
এদিকে চাইলেও সৃজনের এক ফোঁটা হাত ছোঁয়া কিংবা চোখ মেলানোর উপায় নেই রোজের। নুড়ির এই ধূর্ত চক্রান্ত আর কিছু সময় আগে শায়লা বেগমের মুখ থেকে ঝরে পড়া সেই বিষাক্ত, কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো মনে পড়তে রোজের ফর্সা মুখটা তীব্র অপমানে, রাগে আর কষ্টে একদম লাল টমেটোর মতো হয়ে উঠল। সে সৃজনের দিক থেকে পুরো মুখ ফিরিয়ে সোজা জানালার বাইরের অসীম রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। নোনা জল চোখে জমা হলেও তা অত্যন্ত কষ্টে গিলে নিল।
সৃজন মাঝখানে নুড়ির পাহাড়সম দেয়াল আর অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতির জন্য রোজের কাছে ঘেঁষতে পারছে না। তবে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখা রোজের ওই কঠিন, থমথমে অভিমানী রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে সৃজনের হৃদয়টা তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল কিছু একটা ভীষণ ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু শুধরে নেওয়ার কোনো পথ এই মুহূর্তে তার!
তাদের পেছনের ফোর্থ লাইনের সিটে গিয়ে আসন গেড়েছে তুষার আর ঝিনুক। নুড়ির চক্রান্ত কিংবা রোজ-সৃজনের এই নীরব ঝড়ের আঁচ তাদের গায়ে লাগেনি। তারা নিজেদের মিষ্টি দুনিয়ায় মগ্ন; টুকটাক দুষ্টুমি, খুনসুটি আর মুচকি হাসাহাসিতে মেতে আছে। তাদের পাশের সিটটাও খাবারের হরেক রকম ব্যাগে ঠাসা।
এবার বাকি রইল একদম লাস্ট লাইনের সিটটা। সেখানে কোনো কাপল নেই, নেই কোনো প্রেমের গুঞ্জন। হেরা মুখটা একেবারে হাঁড়ির মতো গোঁজ করে গিয়ে পেছনের সিটের এক কোণায় ধপ করে বসে পড়ল। চারপাশে সবাইকে জোড়ায় জোড়ায় প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খেতে দেখে তার খাঁ খাঁ করা ‘সিঙ্গেল’ মনটা মুহূর্তে হু হু করে উঠল! সে মনে মনে এই ‘মিঙ্গেল জেনারেশন’-কে আচ্ছা মতো উদ্ধার করতে লাগল আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল—
“ধুর ছাই! এই প্রেমে মত্তদের গাড়িতে আসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে! সবাই জোড়া বেঁধে সস্তা প্রেম মারাচ্ছে, আর আমি এখানে ফালতু মানুষের মতো একা বসে ধুলো বালি গুনছি! এর থেকে তো একশ গুণ ভালো হতো যদি আব্বু, আম্মু আর বাবাই-মামনিদের সাথে শান্তিতে তাদের গাড়িতে যেতাম… দুরর!”
কিন্তু ঠিক তখনই গাড়ির পেছনের দরজাটা স্লাইড করে খুলে গেল। হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাভান এসে ধপ করে হেরার ঠিক পাশের খালি সিটটাতে বসে পড়ল!
হকচকিয়ে গেল হেরা। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল। তিতির সামনের সিট থেকে পেছনে তাকিয়ে নাভানকে একদম লাস্ট সিটে হেরার পাশে বসা দেখে রাগে, ক্ষোভে আর হিংসায় যেন ফেটে পড়ার দশা হলো তার।
গাড়ির এই অদ্ভুত আর জটলা পাকানো সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্টের কারণে সবার মনেই তখন এক একটা আলাদা ঝড়। তিতির জ্বলছে নাভানকে না পেয়ে, নুড়ি মনে মনে হাসছে সৃজনকে রোজের থেকে দূরে রাখতে পেরে, রোজ জ্বলছে তীব্র অভিমান আর ভুল বুঝাবুঝিতে, সৃজন ছটফট করছে রোজের দূরত্বের কারণে, আর হেরা… হেরা পাশে নাভানকে পেয়েও এক অদ্ভুত জাঁতাকলে পড়ে গেল!
নাভান কানে হেডফোন দিয়ে ফোন টিপতে থাকে,অইদিকে অধীর আর রুশার বকবকানিতে জমে উঠেছে লং ড্রাইভ। মধ্যে তো তুষার আছেই। শুধু সৃজন আর নাভান দের সিটের সব চুপ। হেরা জানতো নাভান এমন কাজ করবে। তার ধারনা ঠিক। সে নাভান কে পাত্তা না দিয়ে মেসেজ অপশনে ঢুকলো। মন খারাপ প্রথমে করে থাকলেও রোজ কিছুক্ষন পর রুশার সাথে মিশে মজা করছে। আর নুড়ি ও রোজের সাথে এমন ভাবে মিশছে মনে হয় সে রোজকে অনেক ভালোবাসে। সৃজন একটু রিলেক্স হয়।
” যাক নুড়ি সব ভুলে আমার ফুলের সাথে ভালো ব্যাবহার করছে।
নুড়ির এই ত্যাগ দেখে সৃজন খুব খুশি হয়। মাঝ পথে, নুড়ি সৃজন কে এটা ওটা আনতে বলে সৃজন ও নুড়ির পছন্দ মতো অনেক কিছু নিয়ে আসে সবার জন্য। নাভান একটা দরকারি ফাইল চেক করছিলো ফোন দিয়ে। তাই সে এসব থেকে একটু দূরে।
গাড়ির ভেতরের গুমোট আবহাওয়া আর সম্পর্কের জটিল সমীকরণগুলোকে পেছনে ফেলে যখন তারা হাইওয়ের একটা বড় হোটেলের সামনে এসে থামল, তখন সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকার চারপাশটাকে ছুঁয়ে গেছে।
সবাই গাড়ি থেকে নেমে ফ্রেশ হয় আর রাতের খাবার খেতে গেল, কিন্তু হেরা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। লং জার্নি হেরা একদম সহ্য করতে পারে না, তাই গাড়িতে ওঠার আগেই কড়া পাওয়ারের মেডিসিন খেয়ে নিয়েছিল। সারাদিন পেটে একটা দানাপানিও পড়েনি মেয়েটার। সন্ধ্যার স্নিগ্ধ ঠাণ্ডা বাতাসে যখন হেরার চোখ মেলল, তখন এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে। সে আবিষ্কার করল, সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে নাভানের শক্ত, চওড়া উরুর ওপর মাথা রেখে!
ধড়ফড় করে উঠে বসল হেরা। লজ্জায়, জড়তায় আর এক অদ্ভুত স্পন্দনে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে, ওড়নাটা টেনে টুনে নিয়ে তোতলামি গলায় বলল—-
“আ… আমার একটু ফ্রেস হতে হবে ”
নাভান ততক্ষণে ফোনটা পকেটে রেখে , ড্রাইভারকে ইশারা করে গাড়ি থামাতে। নাভানের ইশারা পেয়ে গাড়ি ব্রেক করে ড্রাইভার। সিট থেকে নেমে পড়ে নাভান । তার শান্ত কিন্তু গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—-
“সবাই কিছুক্ষণ আগে খাবার খেয়ে এসেছে। এখন কারো নামার দরকার নেই, তুমি চলো।”
তিতির গাড়ি থেকে নামার সময় হোঁচট খেয়ে পায়ে বেশ ব্যথা পেয়েছে, তাই সে যেতে চেয়েও নাভানের পাশে যাওয়ার সুযোগ পেল না। রুশা ইচ্ছে করে লেং মেরেছিলো তিতিরকে। যা ন্যাকামি করেছিলো হেরা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর। গাড়ির অন্য মেয়েরা তখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন। ফলে বাধ্য হয়েই হেরাকে নাভানের পেছনে পেছনে হোটেলের দিকে এগোতে হলো।
হোটেলের করিডোরে এসে হেরা চরম লজ্জায় পড়ে গেল। নাভানের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষের সামনে সে বলবে কী করে যে সে ওয়াশরুমে যাচ্ছে? লজ্জায় লাল হয়ে মুখ নিচু করে সে বলল—–
“আ… আপনি এখানে দাঁড়ান, আমি আসছি।”
নাভান তার দিকে না তাকিয়েই ছোট করে বলল, “তুমি যাও, আমিও আসছি।”
হেরা চোখ কপালে তুলে বলল——
“আপনি কি মেয়েদের ওয়াশরুমে যাবেন নাকি?”
“হ্যাঁ।”
নাভানের সটান উত্তর।
“মানে!” হেরা স্তম্ভিত।
“আমি আগে যাবো, চেক করব, দেন তুমি যাবা।”
“মানে কী! এটা মেয়েদের ওয়াশরুম, আপনি একটা ছেলে হয়ে ওখানে কেন ঢুকবেন?”
হেরা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
কিন্তু নাভান আর কোনো কথার উত্তর দিল না। সে সরাসরি মেয়েদের ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক মহিলা নাভানকে ভেতরে ঢুকতে দেখে চোখ বড় বড় করে বলতে চাইলেন——
“আরে বাবা, এটা তো মেয়েদের…”
কিন্তু নাভান তাকে ইশারায় চুপ করিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সে প্রতিটি কোণা নিখুঁতভাবে চেক করল—কোনো আপত্তিকর কিছু আছে কিনা। বাইরে দায়িত্বরত এক হোটেল স্টাফ এসে যখন আপত্তি জানাতে চাইল, নাভান পকেট থেকে একটা বিশেষ কার্ড বের করে তার চোখের সামনে ধরল। কার্ডটা দেখামাত্রই লোকটা এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, মুখে আর কোনো কথা সরল না।
হেরা বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, এই লোকটা আসলেই এক গভীর জলের মাছ! বাইরে থেকে যতটা শান্ত, ভেতরে ততটাই রহস্যময় আর ক্ষমতাধর।
ভেতর থেকে বের হয়ে এসে নাভান গম্ভীর গলায় বলল——-
“যাও।”
হেরা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলো, তার ক্লান্ত মুখটা তখন অনেকটাই সতেজ দেখাচ্ছে।
রেস্টুরেন্টের একটা নিরিবিলি টেবিলে বসার পর নাভান চারপাশ তাকাতে তাকাতে যান্ত্রিক গলায় বলল—–
“কী খাবে বলো?”
নাভানের কথা বলার ধরণ দেখে হেরার মেজাজটা চটে গেল। সে এমনভাবে কথা বলছে যেন হেরা তার সামনে নেই, ডানে বা বামে কোথাও আছে! হেরা বিরক্ত হয়ে বলল——
“আচ্ছা, আপনি কার সাথে কথা বলছেন? আপনি কি খাবেন?”
নাভান এবার একটু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল——
“আমার সামনে কি আর কেউ আছে? নাকি আমি পকেট থেকে টাকা বের করে কোনো অচেনা মানুষকে খাওয়াবো?”
হেরা তিলমাত্র ছাড় না দিয়ে বলল—–
” সোজা কথা সোজাভাবে বললেই হয়, এত ঢং করার কী আছে? আপনি এদিক-সেদিক তাকিয়ে কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললে বুঝতাম আমাকে বলছেন। এদিক-সেদিক তো কত মানুষই আছে, আপনি তো আবার পরম জনদরদী, কাউকেও খাওয়াতেই পারেন!”
হেরার এই তড়বড়ে কথা শুনে নাভান মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েটা দিন দিন আস্ত একটা বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু নাভান যে কেন তার দিকে তাকাতে পারছে না, সেই সত্যটা তো শুধু তার হৃদয়ই জানে। আজ হেরার এই অতিরিক্ত রূপ আর সৌন্দর্যের আগুনে নাভানের চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছে। তাকালেই সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে।
হেরা আজ পরেছে একটা ক্যাজুয়াল স্কার্ট, আর গলায় চমৎকার একটা লকেট ঝুলছে যা তার ফর্সা গলার খাঁজে এসে থমকে আছে,তিল টা উকি দিচ্ছে চাদের ন্যায়। হাতে একটা স্টাইলিশ ঘড়ি, আর মাথার রেশমি চুলগুলো ওপরের দিকে সুন্দর করে ঝুঁটি করা। কপালে ছোট ছোট কিছু অবাধ্য চুল এসে পড়েছে, যা তার সৌন্দর্যকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই রূপ দেখে বারবার নাভানের মনে এক তীব্র নেশা ধরে যাচ্ছে,প্রেমের নেশা । মনে মনে গিটের টুংটাং শব্দ হচ্ছে সেখানে নাভান গাইছে।
” নেশা ও নেশা নেশা নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা।
কিছুক্ষণ আগে গাড়িতে যখন হেরা যখন তার উরুর ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল, তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে নাভানকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। তীব্র এসি চলার পরেও নাভানের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল। মন চাইছিল অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে তার ঠোঁটের ছোঁয়া ওই মায়াবী কপালে এঁকে দিতে, কিন্তু সে নিজেকে আটকেছে। তার এই পবিত্র ফুলটা, তার এই আদুরে পুতুল বউটা সবসময় তার কাছে পরম যত্নে থাকবে। তাই সে নিজে দগ্ধ হয়েও হেরাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিয়েছে। এই মেয়ে যে তাকে কোনোদিন শান্তিতে থাকতে দেবে না, সেটা নাভান খুব ভালো করেই বুঝে। আর সেই কারণেই সে নিজের চোখকে সংযত রাখতে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল। কিন্তু এই অভিমানী মেয়েটা তা বুঝবে কী করে? সে তো শুধু নাভানের ওপর রাগ করতেই জানে। আর তার মুখুশ খুলতে কতো কি করে। কিন্তু নাভান তো সঠিক সময়ের জন্য বসে আছে।
হেরার খোঁচা মারা কথা শুনে নাভান এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই দুজনের হৃদয়ে যেন এক হাজার ওয়াটের বিদ্যুৎ খেলে গেল। হেরা ছটফট করে চোখের পলক নামিয়ে নিল। মনে মনে সে-ও স্বীকার করতে বাধ্য হলো, এই ছেলেটাকে আজ বড্ড বেশি সুন্দর লাগছে। বরাবরের মতোই পরনে একটা সাদা গেঞ্জি, তার ওপর কালো শার্টের বোতাম খোলা, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। পায়ে দামি স্নিকার্স। আর কানে ইয়ারভাস যা তাকে এক পারফেক্ট হিরোর লুক দিয়েছে।
হেরা চোখ নামিয়ে নিলেও তার মন বলল—
“আপনি যতই অস্বীকার করুন অসভ্যগিটার ওয়ালা , আমি জানি আপনি আমার গোপন প্রেমিক পুরুষ আমার প্রথম অনূভুতি জি ম্যান । আর আপনার মুখ থেকেই আমি এই সত্য বের করব। আপনাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার না করা পর্যন্ত আমি থামছি না!”
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে হেরা গম্ভীর মুখে বলল—
“আমি চিকেন সুপ খাবো।”
”আর কী?”
নাভান ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
”আর ফ্রাইড রাইস।”
নাভান হাত উঁচিয়ে ওয়েটারকে ডেকে অর্ডারটা দিয়ে দিল। খাবার আসতে খানিকটা সময় লাগবে ভেবে হেরা চারপাশ দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
“আর সবার জন্য খাবার ?”
নাভান বেশ আড়মোড়া ভেঙে ছোট করে বলল—–
” আপনি যখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন তখন সবাই পেট পুজো করে, আবার গাড়িতে খাবারনিয়ে উঠিয়েছে। আপনার জন্য ও নেয়া আছে। অইগুলো পরে খাবেন এখন এগুলো শেষ করেন।
হেরা চোখ ছোট ছোট করে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। এই লোকের সাথে এখন লাগা যাবে না কিছুক্ষন পর মজা দেখাবে মনে মনে ভাবলো হেরা ।
খাবার আসতেই হেরা দ্রুত সুপ আর রাইসটুকু শেষ করে উঠে পড়তে চাইল। কিন্তু অমনি নাভান গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে তাকে বসিয়ে দিল। আসল ঘটনা হলো—নাভান শুধু সুপ আর রাইসের অর্ডার দেয়নি! সাথে দম দেওয়া গরম গরম বিরিয়ানি, ফ্রেশ জুস আর কোল্ড ড্রিংকসও চেয়ে রেখেছিল। সারাটা দিন উপোস করে থাকা জেদী মেয়েটার শরীরে একটু শক্তি ফেরানো যে বড্ড দরকার, তা কি আর নাভান মুখে ফুটবে?
হেরা একটু ইতস্তত করে বাটিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
“আপনি খান?”
নাভান বুক ফুলিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল–
“হ্যাঁ, আমি শেহেতাজ খান নাভান!”
হেরা বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টে বলল—
“আমি আপনার বংশপরিক্রমা জানতে চাইনি, আপনাকে খেতে বলেছি!”
নাভান এবার একটু ঝুঁকে এসে গম্ভীর মুখে শুধরে দিল–
“তো ‘খান’ কী বাক্য? সম্পূর্ণ বাক্য বলবে, ইডিয়ট! ‘আপনি খাবার খান’—এভাবে বলতে পারতে।”
হেরার পিত্তি জ্বলে গেল। সে চোখ মুখ কুঁচকে বলল–
“বেশি কথা বলছেন কিন্তু আপনি! আমি আর কিছুই খাবোই না, যান!”
নাভান এক পলক হেরার রাগানো রাঙা মুখটার দিকে তাকাল। তারপর এক অদ্ভুত মিষ্টি আর দুষ্টুমিভরা বাঁকা হেসে বলল—–
“এই খাবার না খেয়ে উঠলে কিন্তু গালে আরও চারটে থাপ্পড় পড়বে!”
হেরা চোখ দুটো গোল গোল করে অবাক হয়ে বলল—
“কী?!”
নাভান এবার খানিকটা নরম হয়ে, হেরার দিকে প্লেটটা আরেকটু এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“জি ম্যাডাম! থাপ্পড়টা অবশ্য হাত দিয়ে না… গালে গাল ঠেকিয়ে ভালোবাসার থাপ্পড় হবে! তাই লক্ষ্মী মেয়ের মতো চটপট খেয়ে নাও তো!”
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (২)
নাভানের কথা শুনে হেরার গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় ও রাগে লাল হয়ে উঠল। সে আর কথা না বাড়িয়ে চামচ হাতে তুলে নিল, আর মনে মনে ভাবল—এই লোকটার সঙ্গে পেরে ওঠা সত্যি অসম্ভব!কতো রুপ যে দেখবে এই লোকের, এই রুড,এই গম্ভির,এই রাগি তোএই রুমান্টিক হেরা ঘুমু ফোলা ফোলা চোখে নাভানের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলে—
” গিরগিটি ও এমন রঙ পরির্বতন করে না। যতটা করে এই অসভ্য গিটার ওয়ালা!
