মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩ (২)
jannatul firdaus mithila
“ নিজের সর্বোচ্চ এবং সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন মনস্টারকে প্রসন্ন করতে এবং খেয়াল রাখবেন, ভুলেও যাতে চোখ থেকে কাপড় না সরে। নয়তো কিছু হওয়ার আগেই ম*রবেন আপনি।”
ভীতসন্ত্রস্ত রমণী ঢোক গিললো পরপর। বাধ্যকৃত অন্ধত্ব অনিচ্ছায় বরণ করে অশ্রু ঝরালো নিঃশব্দে। তার মাখনরঙা টকটকে গায়ের রঙ! ভয়ের চোটে নীলচে রূপ ধরেছে তা। কন্ঠার সন্নিকটে আঁটকে আছে বাক। তটস্থ ভয়ার্ততায় রমণীর তুলতুলে কদম জোড়া আঁটকে আছে জমিনের সনে। ঠিক তখনি একখানা রুক্ষ হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল ক্যাসেলার নরম কনুই! এরূপ অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় রাশিয়ান সুন্দরী। হকচকান কন্ঠে তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে ওঠে,
“ কে? কে?”
আফ্রিকান নারী মেইডটি বড্ড গম্ভীর। বড়ো রুষ্টতায় সুন্দরীর কনুইটা একপ্রকার টানতে টানতে এগোতে লাগলেন দুয়ার পানে। প্রতুত্তরে মৌনতা অবলম্বন করতেই ভীত ক্যাসেলা ফের তটস্থ কন্ঠে শুধালো,
“ কথা বলছেন না কেনো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”
“ যমের কাছে।”
মেইডের গুরুগম্ভীর ছোট উত্তর! তা কর্নধার হতেই অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ ক্যাসেলার। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো তার বাঁচার আকুতি – মিনতি। অথচ রমণীর এহেন আকুতিভরা কন্ঠে বিন্দুমাত্র হেলদোল হলো না কারো। বরং এডউইনের হুকুম তামিলে তারা কেমন নির্দয়ের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল রমণীকে।
মনস্টার প্যারাডাইসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘প্রাইভেট স্যুইট’! ক্যাসেলের বাঁ-দিকের সুউচ্চ টাওয়ারে অবস্থিত এই কক্ষটি বহু বছর ধরেই অব্যবহৃত। ধুলো আর নৈঃশব্দ্যের আস্তরণে ঢাকা কক্ষটিতে রূঢ় মানবের এক আদেশেই আজ বহুবছর পর পুনরায় জ্বলে উঠেছে আলো। পুরোদমে সাজানো হয়েছে মন্সটারের মনমতো।
সুবিশাল কক্ষটির ঠিক মধ্যভাগে ঝুলে আছে গোলাকার এক বিছানা। যার মখমলি কোলের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে ক্যাসেলা। অঝোর ধারায় সেই কখন থেকে কেঁদে চলেছে সুন্দরী। চোখদুটো রুমালের বন্ধনে আবৃত থাকায় চারপাশের সকল দৃশ্য এক অন্ধকারে নিমজ্জিত তার নিকট। এরইমধ্যে কক্ষের দুয়ার পানে খট করে শব্দ হলো আচমকা! কেউ বোধহয় ঢুকছে কক্ষে। মুহুর্তেই অশুভ সংকেতে তটস্থ হয়ে গেল ক্যাসেলা। সিটিয়ে গেল ভয়ে! মনস্তার এসেছে না-কি? এবার কি তবে সত্যিই মরণ হবে তার? ভয়ে জর্জরিত ক্যাসেলা, ফুপিয়ে উঠল ফের। ঠিক তখনি, একজোড়া দাম্ভিক কদম ধীরলয়ে প্রবেশ করল কক্ষে। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ কক্ষে ছড়িয়ে গেল মনমাতানো এক পুরুষালী কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এরূপ সুবাসে এতক্ষণে নিশ্চয়ই এক-আধবার মোহিত হতো ক্যাসেলা, তবে আজ যে পরিস্থিতি বড্ড ভিন্ন।
নেশার ঘোরে সামান্য টলছে রূঢ় মানবের দাম্ভীক পদক্ষেপ। এক হাতে তার অর্ধভর্তি হুইস্কির বোতল, অন্য হাতে জ্বলছে মোটা সিগার। সুদর্শনের মুখাবয়বে রাগের গাঢ় ছাপ স্পষ্ট। ললাটের চামড়া গুটিয়ে একাকার অবস্থা! অন্তঃকোণের অবাধ্য দহনে পুড়ছে মাফিয়া বিস্ট। ইগোর সন্নিকটে অবচেতন মনকে জোরপূর্বক চুপ করে বসিয়ে রেখেছে এককোণে। চোখদুটো কিঞ্চিৎ কুঁচকে বোতলের মুখে ঠোঁট ছোঁয়ালো মাফিয়া মনস্টার। নির্বিকার ভঙ্গিতে গিলতে লাগলো অগণিত ঢোক। তবুও থামলো না তার ব্যস্ত পদযুগল। ধীর অথচ ভারী পায়ে এগিয়ে চলল অদূরে বসে থাকা সুন্দরীর দিকে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো — এখন পর্যন্ত একটিবারের জন্যও চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের অধিকারীনির পানে দৃষ্টি তুলে তাকালো না রূঢ় মানব। দাম্ভিকের পাহাড়ে ঘেরা বলিষ্ঠ ঘাড়টা বারংবার ঘোরাচ্ছে এদিকওদিক। চাইছে বোধহয় দৃষ্টি লুকতে। তার পাদু’টো শূন্যে ঝুলন্ত বিছানার সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন অজান্তেই ধ্বক করে উঠল মনস্টারের। মুহুর্তেই হতবুদ্ধির ন্যায় জমে গেল সে। ত্বরিত বাহাত উঁচিয়ে আনলো বুকের কাছে। জায়গাটা কেমন জ্বলছে মনে হচ্ছে! না, না, ঠিক জ্বলছে না, কেমন অদ্ভুত একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। সহসা দাঁত খিঁচল মুগ্ধ। নিজ দেহের এহেন হুটহাট পরিবর্তনে বড্ড বিরক্ত সে। সাপের ন্যায় ফুঁসতে ফুঁসতে আগালো রমণীর পানে। ডানহাতে থাকা প্রায় শূন্য হুইস্কির বোতলটা আচানক মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে, হাত উঁঠিয়ে এনে খামচে ধরল ভীতসন্ত্রস্ত রমণীর চুলের গোছা।
চোখদুটোয় মহা তিতিবিরক্ততা লেপ্টে ঠেকিয়ে রাখলো অন্যত্র। চিড়বিড় করতে করতে ক্যাসেলার ক্ষুদ্র মাথাটা নিজ মুখের বড্ড সন্নিকটে এগিয়ে এনে হিং স্র কর্মে লিপ্ত হবার পায়তারা জুড়লো রূঢ় মানব। ভুবনমোহিনীর তুলতুলে দেহ হতে ভেসে আসা মনমাতানো সুগন্ধির সংস্পর্শে এসে যেখানে যেকোনো পুরুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য, সেখানে রূঢ় মানবের সঙ্গে ঘটে গেল আরেক কান্ড! ক্যাসেলার ক্ষুদ্র মাথাটা কাত করে তার ঘাড়ের ত্বকের কাছে মুখ এগোতে উদ্যোত হতেই আচানক খিঁচে রাখা চোখদুটোর পাতায় ভেসে উঠল মাহি’র নির্মল মুখখানা। তৎক্ষনাৎ থমকে গেল মুগ্ধ! থমকে গেল তার হৃৎস্পন্দন। যত্রতত্র চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে সম্মুখে তাকাতেই যে-ই দেখল — অক্ষিপুটের সম্মুখে অন্য এক নারী ওমনি গা গুলিয়ে উঠতে শুরু করল মুগ্ধের। দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের এই প্রথমবার বমি বমি ভাব ধরল মনে হচ্ছে। অবচেতন মনের উর্ধ্বে গিয়ে করতে চাওয়া উদ্ভট কর্মের মাশুল হিসেবে কাঁপতে লাগলো তার সর্বাঙ্গ। এলোমেলো হলো দৃষ্টি! ক্যাসেলার চুলের গোছায় আঁটকে রাখা শক্ত মুঠো ক্রমশ ঢিলে হতে লাগলো রূঢ় মানবের। নেশায় বুঁদ ভাবস্রোত বহু আগে কেটে যেতেই হাসফাস বাড়লো তার। আনমনে আরেকবার ভুবনমোহিনীর পানে তাকাতেই এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা মুগ্ধ। তক্ষুনি ভীত-সন্ত্রস্ত রমণীর গায়ের ওপর ভকভক করে উগরে দিলো ব-মির ধারা। এরূপ অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব ক্যাসেলা। কি থেকে কি হচ্ছে তা নিয়ে ভাবার প্রয়াসে মত্ত থাকতেই রূঢ় মানব এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মানবীর চুলের গোছা। পাহাড়সম দেহটার অভ্যন্তরে উত্থাপিত অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে সরে গেল বিছানার কাছ হতে। কয়েক কদম পেছাতেই আঁচানক গায়ের ভারে মেঝেতে ঢুলে পড়ল মুগ্ধ। নিজেকে ধাতস্থ করবার পূর্বেই ফের উগরে দিলো পেটে যা ছিলো তা। মেঝেতে পড়ে থেকে দূর্বলের ন্যায় হাঁপাতে হাঁপাতে তক্ষুনি হুংকার ছুঁড়ল মাফিয়া বিস্ট!
“ এডউইন! এডউইন!”
দরজার সন্নিকটে কান পেতে দাঁড়িয়ে ছিলো এডউইন। তন্মধ্যে মনস্টারের ওমন বিকট হুংকারে ভড়কায় সে। হতভম্বের ন্যায় তক্ষুনি ঘুরে তাকালো দরজার পানে। আনমনে বিড়বিড়িয়ে শুধালো,
“ হোয়াট দা হেল! চিৎকার দেবার কথা কার, আর চিৎকার দিচ্ছে কে?”
সন্দিগ্ধতায় আঁটকে গিয়েছে এডউইন। পরক্ষণে তেমন কালবিলম্ব না করে দু’হাতে দুয়ার ঠেলে প্রবেশ করল কক্ষে। আনমনে দৃষ্টিযুগল সম্মুখে নিবদ্ধ করতেই চমকে উঠে এডউইন। অদূরের মেঝেতে এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে আছে মাফিয়া বিস্ট, কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ! টু স্টেজ ক্লিন ফ্রিক ওসিডিতে আক্রান্ত মানবের সম্পূর্ণ গায়ে ওমন ময়লার উপস্থিতি দেখে যারপরনাই হতবাক সে! তৎক্ষনাৎ বোধহীনের ন্যায় মনস্তারের পানে ছুটলো গম্ভীর মুখো। এগিয়ে এসে ধপ করে হাঁটু গেঁড়ে বসল পরমুহূর্তেই। হকচকানো কন্ঠে আওড়াল,
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড টু ইউ মনস্তার? আর ইউ ওকে?”
একহাতে বুক ডলছে মুগ্ধ! মুখ হা করে নিচ্ছে শ্বাসপ্রশ্বাস। চোখদুটো তার বুঁজে রাখা বহুক্ষণ ধরে। এডউইনের কথার পিঠে কেবল থেমে থেমে শুধালো,
“ প-পানি দে এডউইন। পানি দে!”
ত্রস্ত ছুটে গেল এডউইন। অথচ রূঢ় মানব বসে আছে ঠায়। তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠেছে ভীত রমণীর নির্মল মুখখানা। সে কেমন গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে দেখো! চোখদুটোতে চিকচিক করছে নোনাজল। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই বাঁধহীন অস্থিরতায় ধুঁকে ম’রতে আরম্ভ করল রূঢ় মানব। চোখের পাতা বদ্ধ থাকলেও চোয়ালের পেশি টানটান করে দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ ধরিনি রে কু-***বাচ্চা। ছুঁইনি আমি কাউকে। এ্যাই বান্দীর মেয়ে চোখ নামা। চোখ নামা জানোয়ারের বাচ্চা, চোখ নামা!”
হাতে পানিভর্তি গ্লাস। উদ্বিগ্নতায় ছুটে এসে পানিভর্তি গ্লাসটা এগিয়ে দিতে গেলেই মুগ্ধের ওমন বিড়বিড়ানো দেখে কপাল গোছালো এডউইন। হতভম্বের ন্যায় একপল তাকিয়ে থেকে পরক্ষণে ডাকলো মনস্তারকে।
“ মনস্তার? মনস্তার?”
তক্ষুনি চোখ খুললো মুগ্ধ! অশ্রুসজল অদৃশ্য অগ্নির প্রকোপে রক্তিম হয়ে উঠেছে তার বাদামী চোখদুটো। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই ঘাবড়ে গেল এডউইন। ভয়ার্ত আবহে কেঁপে উঠল বেচারা। কম্পিত হাতে পানির গ্লাসটা এগিয়ে ধরে রাখতেই চোয়াল শক্ত করল মুগ্ধ। হাওয়ার বেগে উঠে দাঁড়ালো পরমুহূর্তে। বড্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে পা ছোটালো দুয়ার পানে। হিং স্র কন্ঠে চিড়বিড়িয়ে বলে গেল,
“ কন্ট্র্যাক্ট পেপার রেডি কর এডউইন!”
থামলো এডউইন। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফুটিয়ে, পায়ে গতি টেনে পরপর গমগমে গলায় শুধালো,
“ কিসের মনস্তার?”
“ আমার বিয়ের!”
মুহুর্তেই মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অনুভূত হলো এডউইনের। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল তার ব্যস্ত পদযুগল। মুখাবয়বে একরাশ হতবাকতা ফুটিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় জিজ্ঞেস করল,
“ কিন্তু…বিয়েটা কার সঙ্গে মনস্তার?”
ব্যগ্র গতিতে এগোচ্ছে মুগ্ধ। তন্মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা এডউইনের এহেন কন্ঠে সহসা ঘাড় বাঁকায় রূঢ় মানব। দাঁত খিঁচে হিং স্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ আমার বান্দীর মেয়ের সঙ্গে।”
দু’ঘন্টা পেরুনোর পথে। তারপরও ওমন তীব্র স্নোফলে বরফ ঠান্ডা পানিতে দক্ষ সাঁতারুর ন্যায় সাঁতার কাটছে রূঢ় মানব। তার ফর্সা বলিষ্ঠ বদন ইতোমধ্যেই লালচে আভায় ছেয়ে গিয়েছে। গায়ের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে তীব্র ঠান্ডার প্রকোপে। ভারী স্নোফলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাতাসের ঝাপটা। ছাঁদের দুয়ার পানে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে এডউইন। গায়ে জড়িয়েছে মোটা একটা ওভারকোট। তাতেও বুঝি ঠান্ডা কমছে না তার। বেচারা জড়োসড়োভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্মুখে একপা বাড়াতে গেলে দুপা পিছিয়ে যাচ্ছে আপনা-আপনি। তবুও প্রাণভয়ে সম্মুখে অগ্রসর সে। কাঁপতে কাঁপতে কয়েক কদম এগিয়ে এসে কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,
“ মনস্তার! পেপার’স আর রেডি।”
তৎক্ষনাৎ পানির গভীর হতে মাথা তুললো মুগ্ধ। তাকালো বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টে। ধীরলয়ে ছোট ছোট বরফ টুকরো বলিষ্ঠ দেহের ভারে মাড়িয়ে উঠে এলো সুইমিংপুল হতে। তার সিক্ত ট্রাউজার হতে ঝপঝপিয়ে বইছে পানি। তা নিয়েই নির্বিকার ভঙ্গিতে এগোলো মুগ্ধ। তন্মধ্যে গম্ভীর এডউইন কেমন সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ মনস্তার! মেয়েটাকে কি করব?”
“ বেসমেন্টে ফেলে দিয়ে আয়!”
আঁতকে উঠে এডউইন! সহসা ভড়কানো কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কিন্তু ওতো এখনো জীবিত মনস্তার।”
সম্মুখে অগ্রসর পাথুরে মানব নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ সো হোয়াট?”
উপযুক্ত উত্তর পেলো না এডউইন। লোকটা এমন নির্দয়, সে জানে। তারপরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করার মানে নেই কোনো। বেচারা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে এগোলো নিজ কর্মে।
টিমটিমে নীলাভ আলোয় জ্বলজ্বল করছে সপ্তদশীর কামরা। আহতাবস্থায় বিছানায় কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে সে। সম্পূর্ণ মুখাবয়বে ক্ষতের স্পষ্ট উপস্থিতি। অদূরে বিছানার দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। গা উদোম তার, ত্বকে পানির ছিটেফোঁটা স্পষ্ট। সিক্ত বাবরিছাঁটা বাদামি চুলগুলো হতে চুইয়ে পরছে পানি। নির্দয়ের একহাতে একখানা ধারালো চাকু, অন্যহাতে কন্ট্র্যাক্ট পেপার। অচেতন মানবীর পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে এগোলো সে। ঘুরে এসে দাঁড়ালো রমণীর মাথার কাছে। অতঃপর আচমকা নিজ ডানহাতের তালুতে চাকুর তীক্ষ্ণ গা ছোঁয়াল মুগ্ধ। মুহুর্তেই তাজা লহুর ধারা বেরিয়ে এলো সেখান থেকে। অথচ রূঢ় মানবের মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র ব্যথার ছাপ নেই। সে ধীরলয়ে হাত বাড়ালো। বোকা মানবীর নিশ্চল ডানহাতের বৃদ্ধা আঙুলটা আলতো করে নিজ লহুতে ডুবিয়ে রঞ্জিত করে নিলো গাঢ় ভাবে। পরক্ষণে মাহি’র অজান্তেই মেয়েটার বৃদ্ধা আঙুলখানা কন্ট্রাক্ট পেপারের সইয়ের জায়গায় চেপে ধরল মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে ফোঁটালো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। কার্যসিদ্ধি শেষে রূঢ় মানব কেমন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাল অচেতন মায়াবিনীর পানে। কন্ঠে বড়ো রহস্যময় ভাবস্রোত টেনে শুধালো,
“ কংগ্রাচুলেশনস বান্দীর মেয়ে! শেষ… তোর আজাদী শেষ। এবার থেকে তুই আমার হলি। পুরোদমে আমার হলি!”
★ বর্তমান ★
অতীতের একাংশ আওড়াতে গিয়ে বাঁকা হাসির টানে অধর প্রশস্ত এডউইনের। পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছে বেগতিক কায়দায়। ওদিকে তার ওমন বাক্যালাপে হতবাকতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে নিরু। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটার পানে। নিজেকে খানিক ধাতস্থ করে আচমকা ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ অধীর দা যে এতোটা নির্দয় পাষণ্ড — তা যদি কোনোদিন মাহি জানতে পেরে যায় তখন? আপনার কি মনে হয়? ঐ নরম মনের মেয়েটা এতকিছু জানার পরও অধীর দা’য়ের সঙ্গে থাকতে চাইবে?”
সহসা ঘাড় কাত করল এডউইন। দৃষ্টি করল ক্ষুদ্র! মুখাবয়বে বড্ড শান্ত ভাব ঢেলে বিশাল আত্মবিশ্বাসের সাথে শুধালো,
“ আগে জানলে তো! এতদিনে যেহেতু জানতে পারেনি, আগেও জানতে পারবেনা। আমি জানতে দিবো না তাকে।”
বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে নিরুর। অজানা শঙ্কায় মাহি’র জন্য চিন্তা হচ্ছে বেশ। চিন্তিত চিত্তে হুট করেই এডউইনের পানে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তাক করল সে। প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কেনো করছেন এমনটা আপনি? ও-তো নিষ্পাপ! তাহলে কেনো ওর মতো নিষ্পাপকে জেনেশুনে মাফিয়া মনস্টার নামক রাক্ষসের জন্য উৎসর্গ হতে দিচ্ছেন? কেনো দিচ্ছেন আপনি?”
এবারে মুহুর্তব্যয়ে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এডউইন। দু’হাত তৎক্ষনাৎ ঢুকিয়ে নেয় পকেটে। অত্যন্ত গম্ভীর অথচ ভয়ানক কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে ওঠে,
“ রুশদী কিংডমের কিংয়ের জন্য শুধু একটা মাহিরা এহসান কেনো? দরকার পড়লে লক্ষাধিক মাহি’রা এহসানকেও উৎসর্গ করে দিবো আমি। প্রয়োজন পড়লে এই পৃথিবীর যতো মেয়ে আছে সবাইকে উৎসর্গ করে দিবো মনস্টারের পদতলে। এন্ড… আই উইল মেক শিওর অফ ইট।”
বলেই গটগটিয়ে কদম ছোটালো এডউইন। দাঁড়ালো না একপলও। এদিকে তার এহেন বাক্যবাণে জড়িয়ে জর্জরিত নিরু। আশ্চর্য! হুট করেই বুকের ভেতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। কাল পর্যন্ত যে-ই মেয়েটা ছিলো তার চিরশত্রু, আজ তার চিন্তাতেই হাসফাস করছে অষ্টাদশী!
নির্বিঘ্নে আকাশের বুকচিরে এগিয়ে চলেছে মাফিয়া বিস্টের হেলিকপ্টারটি। কন্ট্রোলারে হাত ঠেকিয়ে রেখে এক-আধবার আড়দৃষ্টে পাশে তাকাচ্ছে মুগ্ধ। দেখছে — গাল ফুলিয়ে বসে থাকা মায়াবিনীকে। মায়াবিনীর অবনত দৃষ্টি! বারংবার দু’হাতে পরনের ছিঁড়ে ফাটা জামাটা ঢেকে রাখার দূর্বার প্রচেষ্টা, সবকিছুই কেমন নিরবে পরোখ করে যাচ্ছে বেহায়া লোক। তখনকার বেপরোয়া জোরজবরদস্তিতে বোকা মানবীর পরনের জামাটার সে-কি বেহাল দশা করেছে সে। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই রূঢ় মানবের মুখাবয়বে। সেথায় আছে কেবল একরাশ দুষ্ট ভাবস্রোত।
এদিকে, বোকা মানবীর নত দৃষ্টিযুগল আনমনে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো জানালার স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে। ওমনি অভ্যন্তরে খানিক হোঁচট খেলো মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো আরেকবার। আকাশ থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামছে তাদের হেলিকপ্টারটি। মুহুর্তেই মানবীর অক্ষিপুটের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একখানা দ্বীপ! এ যেন নীল সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা সবুজ কোনো পান্নাখণ্ড। চারদিক ঘিরে স্বচ্ছ নীল জল, তীরের কাছে যার রং ধীরে ধীরে আকাশি থেকে গাঢ় নীলে মিশে গেছে। কোথাও সাদা বালুর সরু সৈকত, কোথাও আবার কালচে পাথুরে পাহাড় সমুদ্রের বুক চিরে উঠে এসেছে তীরে। বোকা মানবী হতভম্ব! হতভম্বতায় বাকরুদ্ধ তার জিভের ডগা। হেলিকপ্টার যত নিচে নামছে, ততই সম্মুখের অবিশ্বাস্য দৃশ্য নজর কাড়ছে তার।
অদূরের দ্বীপের ঠিক মাঝখানে সবুজের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল সাদা প্রাসাদ। তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাগান। জলপাই-বন আর সরু পাথুরে পথগুলো কেমন নিখুঁত আঁকা নকশা ন্যায় জ্বলজ্বল করছে। মায়াবিনীর বিস্ময়বিষ্ট দৃষ্টিযুগল পশ্চিম প্রান্তে পড়তেই দেখল — চকচকে ব্যক্তিগত এক হেলিপ্যাড। তার পাশে পাহাড়ের ঢালে নেমে গেছে আলোকিত পথ, তার নিচে সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত মেরিনা কেমন মাথা উঁচিয়ে রেখেছে। সেথায় কয়েকটি বিলাসবহুল নৌযান নোঙর করে রাখা। দ্বীপের এক কোণে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে কাচে ঘেরা ছোট্ট একটি ভিলা। বোকা রমণী তৎক্ষনাৎ পাশ ফিরলো। হতভম্ব কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ আমরা এটা কোথায় এলাম বিস্ট? এই দ্বীপের নাম কী?”
রূঢ় মানব প্রতুত্তর করল না। গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলো সম্মুখে। কন্ট্রোল স্টিকে ধীরলয়ে টান বসিয়ে নামাচ্ছে হেলিকপ্টারটি। খানিকবাদে দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তের পাহাড়চূড়ায় নির্মিত ব্যক্তিগত হেলিপ্যাডে ধীরে ধীরে অবতরণ করালো কালো হেলিকপ্টারটি। আকাশযানের ঘূর্ণায়মান ব্লেডের তীব্র বাতাসে চারপাশের জলপাইগাছগুলো কেমন উন্মত্তের মতো দুলে উঠল। হেলিকপ্টারের চাকাগুলো মাটিতে স্পর্শ করতেই হেলিপ্যাডের চারপাশে বসানো ক্ষীণ সোনালি বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠল। এহেন কান্ডে বোকা মানবী তার হতভম্বতার সাগরে আরেকটু তলিয়ে গেল বোধহয়। জিভের ডগা বাকশূন্য রেখে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখল সব। আকাশযানের ঘূর্ণায়নমান ব্লেডের গতি ক্রমশ কমে এলো। এপর্যায়ে মুগ্ধ কেমন গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলো হেলিকপ্টার থেকে। পাশে বসে থাকা মাহি হকচকালো। লোকটা তাকে বের করবে না?
সে-কি একা একা বসে থাকবে? এরূপ চিন্তায় মগ্ন মানবী, ত্রস্ত হাত বাড়িয়ে দুয়ার খুলতে চাইলেই একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা খুলে দিলো হেলিকপ্টারের দুয়ার। পরক্ষনে মেয়েটাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আলগোছে তাকে তুলে নিলো নিজ কোলে। মাহি স্তব্ধ! পড়ে যাবার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের কাঁধ। আনমনে দৃষ্টি ঠেকালো অদূরে।
হেলিপ্যাড থেকে শুরু হয়েছে কালো একখানা পাথরে বাঁধানো দীর্ঘ পথ। পথটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে গিয়েছে নিচে — সরাসরি দ্বীপের রাজকীয় প্রাসাদের দিকে। দুপাশে সারি সারি জলপাইগাছ আর ছাঁটা ল্যাভেন্ডারের ঝোপ। রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ পাদু’টো গটগটিয়ে এগোচ্ছে সে পথ ধরে। পথের নিচে লুকানো আলোয় পুরো পথটা রাতের অন্ধকারেও কেমন জ্বলজ্বল করছে। মাহি বড্ড বিমুগ্ধতার সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সব। বিস্ময়ে আকুল হয়ে অস্ফুটে ফের জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ কোথায় যাচ্ছি?”
নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটায় মত্ত মুগ্ধ। একহাতে মানবীকে কোলে তুলে রেখে পরপরই প্রতুত্তর করল,
“ স্বস্তি পেতে।”
দ্বীপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সু-বিশাল প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছে ইতালিয়ান-আলবেনিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে। বাইরে থেকে এতক্ষণ প্রাসাদটাকে পুরোনো কোনো রাজপরিবারের দুর্গ মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই সবখানে আধুনিক বিলাসিতার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হতেই চোখদুটো ধাঁধিয়ে উঠল মাহি’র। তড়িঘড়ি করে রূঢ় মানবের কোলে থেকেই ঘাড় ঝুঁকিয়ে তাকালো মেঝেতে। কি সুন্দর তকতকে মার্বেলের মেঝে! মাথার ওপর অগণিত ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর বাদিকে সুবিশাল কাঁচের দেয়াল যা সমুদ্রের দিকে মুখ করে রাখা। প্রাসাদের এহেন সৌন্দর্যে আবিভূত মাহি। চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে সব। কিন্তু কাউকেই তেমন নজরে আসছে না তার। বাড়িতে কেউ নেই না-কি? কৌতুহলে প্রশ্নটুকু জিভের ডগায় এসে আচানক থেমে গেল মাহি’র। যে-ই দেখল রূঢ় মানব তাকে নিয়ে এগোচ্ছে ডানদিকের এক সুবিশাল কাঁচ-ঘেরা কক্ষে। যেথায় চারপাশে স্বচ্ছ আয়নার দেয়াল, অদূরে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা ম্যানিকুইন। যার গায়ে জড়িয়ে রাখা একদম অবিকল সিন্ড্রেলার ড্রেসের মতো ড্রেস। পুতুলের মতো সাজানো ড্রেসটির দিকে তাকিয়ে মাহির চোখ দুটো কেমন বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
হালকা আকাশি আর রুপালি রঙের মিশেলে তৈরি গাউনটি কোমরের কাছে নিখুঁতভাবে আঁটসাঁট। বুকের ওপর সূক্ষ্ম ক্রিস্টালের কাজ, কোমর থেকে নিচে নামতেই গাউনটি কয়েক স্তরের নরম, স্বচ্ছ টিউলের পরতে পরতে ফুলে উঠেছে। প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝিলমিল পাথর।
গাউনটির সামনের অংশ যেমন কোমল, মার্জিত — কাঁধের ওপর থেকে তেমন নেমে এসেছে স্বচ্ছ রুপালি কাপড়ের সরু স্ট্র্যাপ। পেছনে রয়েছে লম্বা এবং হালকা ট্রেইল। বোধহয় হাঁটার সময় মেঝের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পিছলে যাবার জন্য দিয়ে রাখা। ড্রেসটির পাশে রাখা রয়েছে একজোড়া স্বচ্ছ ক্রিস্টাল হিল। আর তার ঠিক ওপরে ছোট্ট একটি রুপালি টিয়ারা। মানবীর চোখদুটোতে এবার বিস্ময় বাদ দিয়ে মুগ্ধতা ছড়ালো। এমন ড্রেস টিভিতে দেখেছে সে, তবে বাস্তবেও যে এমন মনোমুগ্ধকর ড্রেস হয় তা যেন কল্পনাতীত ছিলো তার। মুগ্ধ খানিকটা এগিয়ে এসে আচানক মেয়েটাকে আলতো করে নামিয়ে দিলো কোল থেকে। বিস্মিত মানবী ঘাড় বাকাঁনোর পূর্বেই রূঢ় মানব বড্ড গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ ওয়্যার দিস!”
আচমকা মুগ্ধতার দেয়ালে চির ধরলো মাহি’র। ত্বরিত বিভ্রম নিয়ে তাকালো লোকটার পানে। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ হু?”
গভীর হলো মুগ্ধের দৃষ্টি। অধর খেললো এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ। ক্ষুদ্র মানবীর মুখের ওপর বলিষ্ঠ ঘাড়টা বড্ড ঝুঁকিয়ে এনে আলতো স্বরে আওড়াল,
“ বলেছি এটা পরে নে! আ’ই হেভ সামথিং ফর ইউ। আমি বাইরেই আছি। তাড়াতাড়ি চলে আসবি কেমন?”
বলেই মেয়েটাকে আর কিছু বলার ফুরসত না দিয়ে গটগটিয়ে উল্টো পথ ধরল মুগ্ধ। তবে মাঝপথেই কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে আচমকা ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। মুখাবয়বে দুষ্টুমির প্রলেপ লেপ্টে আচানক গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ ড্রেসটা একা একা পরতে পারবি? না-কি আমি হেল্প করব? কেননা এখানে তুই আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সো…. আসব না-কি খুলতে? ওপস, আই মিন টু সে পরাতে।”
ভড়কায় মাহি! লজ্জায় রাঙা হলো তার পেলব মুখখানা। ত্রস্ত ঘাড় ঝুঁকিয়ে লুকলো মুখ। কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,
“ নাহ! আমি পারবো?”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। পরক্ষণে সন্দিষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ সত্যি?”
ওপর নিচ নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকায় মাহি। তা দেখে অলক্ষ্যে গালের ভাঁজে জিভ ঠেললো অসভ্য লোক। আচমকা শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে শুধালো,
“ ইউ হেভ অনলি টেন মিনিটস। এরমধ্যে না হলে — আমি এসে খুলে… ওপস, পরিয়ে দিবো কেমন?”
লজ্জায় কানদুটো গরম হয়ে গেল মাহি’র। নিঃশব্দে খানিক মাথা কাত করল মানবী। রূঢ় মানব একপলক তাকিয়ে থেকে পরক্ষণে গটগটিয়ে চলে গেল বাইরে। তা আড়দৃষ্টিতে পরোখ করে স্বস্তিতে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মাহি। ধীরলয়ে ফের তাকালো সম্মুখের রাজকীয় ড্রেসটার দিকে। ড্রেসটা পরলে কেমন দেখাবে তাকে? কোনো রূপকথার গল্পের রাজকন্যার মতো? না-কি রানীর মতো?
হাতের রোলেক্স ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক শব্দ বাজছে। জানান দিচ্ছে সময়ের অনুমান! সমুদ্রের বালুময় তীরে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ, ফুঁকছে সিগার। ক্ষনে ক্ষনে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার দাম্ভিক কদম জোড়া। বাদামী চোখদুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া অদূরের আকাশপটে নিবদ্ধ। ঠিক তখনি রূঢ় মানবের অন্তঃকোণে হুট করেই ধ্বক করে উঠার মতো বহু পরিচিত এক অনুভূতি জেগে উঠল। কোনরূপ বাক্য বিনিময় ছাড়াই রূঢ় মানবের মনে হলো — তার সিগনোরা এসেছে। সেই নিরব অনুভুতির অভিঘাতে দৈবাৎ শক্তিতে বলিষ্ঠ ঘাড়খানা বাঁকালো মুগ্ধ। ওমনি তার আনমনে দৃষ্টিজোড়া থমকে গেল একদিকে। থমকে গেল তার হৃৎস্পন্দন। সর্বাঙ্গের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল মুহুর্তেই। নিঃশ্বাসের গতি আঁটকে গেল ঠায়। আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত সিগারটা জ্বলছে অবিরত। যেকোনো সময় ছ্যাক দিয়ে বসবে রূঢ় মানবের রুক্ষ আঙুলদ্বয়ে। অথচ সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে মানবের। সে-তো থমকেছে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সিন্ড্রেলার পোশাক পরিহিত মায়াবিনীকে দেখে তার হৃৎস্পন্দনের গতি কয়েকটা হারিয়েছে ইতোমধ্যেই। মাহি জড়তায় জর্জরিত! সুবিশাল ড্রেসটা নিয়ে ওতোদূর থেকে নির্বিঘ্নে হেঁটে এলেও, এবার এহেন বালুময় পথে হাঁটতে গিয়ে বড্ড বেগতিক দশায় পড়তে হচ্ছে তার। তাইতো দাঁড়িয়ে থেকে বারংবার ইতস্ততায় কচলাচ্ছে হাত। ধীরলয়ে ঘাড় উঁচিয়ে আনমনে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের পানে তাকাতেই লজ্জায় পড়ল মাহি। লজ্জায় পড়ল লোকটার ওমন গভীর দৃষ্টি দেখে। চটজলদি নজর অন্যত্র সরাতে উদ্যোত হতেই বেখেয়ালিবশত মুগ্ধের হাতের পানে দৃষ্টি ঠেকল মাহি’র। একি! লোকটার আঙুল পুড়ছে। সিগারের জ্বলন্তে স্পর্শে ধোঁয়া উড়ছে তার হাত থেকে। তবুও সে হাত থেকে সিগারটা ফেলছে না কেনো? মাহি উদ্বিগ্ন! তৎক্ষনাৎ হাত উঁচিয়ে মুগ্ধের উদ্দেশ্যে আওড়াল,
“ বিস্ট! হাত থেকে সিগারটা ফেলুন।”
পলক পড়ছে না মুগ্ধের। সেই সঙ্গে কথাটা কানে গেলো কি-না কে জানে! সে কেমন আগের ন্যায় তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি উপায়হীন এমুহূর্তে। তক্ষুনি দু’হাতে পরনের গাউনটা যথাসম্ভব উঁচু করে ছুটলো লোকটার পানে। ঐটুকুন পথ অতিক্রম করতে বেশ সময় লাগলো তার। অবশেষে ছুটে এসে একটানে মুগ্ধের আঙুলের ভাঁজ হতে ফেলে দিলো সিগারের বাদবাকি অংশটুকু। পরক্ষণে সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় বড্ড ঝাঁঝ লেপ্টে আওড়াল,
“ কি সমস্যা আপনার? কখন থেকে বলছি সিগারটা হাত থেকে ফেলতে। ফেললেন না কেনো? সবসময় আমাকে জ্বালাতন করতে ভালো লাগে তাই না?”
মুগ্ধের দৃষ্টিতে পরিবর্তন নেই! সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে এক অবোধ্য বিমুগ্ধতা। মায়াবিনী কি বলছে তা শুনলো না সে। সে কেবল দেখল — মেয়েটার টকটকে গোলাপি ঠোঁটদুটো নড়ছে। গালদুটো পাকা টমেটোর ন্যায় লাল হয়ে উঠেছে। সরু নাকের ডগাটা কুটুমের রঙে রঙিন। বিমুগ্ধ মানব তক্ষুনি শক্ত হাতের জোরে একটানে মানবীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমরটা আঁকড়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল মাহি। রাগ করে দৃষ্টি ঘোরালো অন্যত্র। মুগ্ধ হাসলো নিরবে। আচানক মানবীর চোখের সম্মুখে আঙুল উঁচিয়ে তাক করল অদূরের আকাশপথে। সন্দিগ্ধ মাহি কপাল কুঁচকায়। আড়দৃষ্টিতে অনুসরণ করল লোকটার ইশারা। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১১টা ৫৮ মিনিট। মুগ্ধের ব্যক্তিগত দ্বীপের আকাশে হুট করেই নিভে গেল সমস্ত কৃত্রিম আলো। চারদিক মুহূর্তেই ডুবে গেল নীলচে অন্ধকারে। মাহি হতভম্ব! মুগ্ধের বাহুর নিরাপদ বেষ্টনীতে আঁটকে থেকে চেয়ে রইলো কেবল। ঠিক তখনি মাথার ওপর দূর আকাশে একটি আলোকবিন্দু জ্বলে উঠল মনে হচ্ছে। পরপর জ্বললো আরেকটি! মাহি’র সন্দিগ্ধতা বেড়ে গেল বহুগুণে। অথচ তার সকল সন্দিগ্ধতা বাড়াতে পরমুহূর্তেই আকাশের বুকে একসঙ্গে জ্বলে উঠল শত-শত আলোকবিন্দু। মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার আকাশের বিশাল ক্যানভাসজুড়ে সেই আলোগুলো নিজেদের অবস্থান বদলাতে শুরু করল। মাহি বিস্ময়ে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে আলোগুলো একত্রিত হয়ে বিশাল অক্ষরে ফুটে উঠল—
❝ HAPPY BIRTHDAY ❞
দৃশ্যটুকু অবলোকন হওয়া মাত্রই মাহি’র ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেল মনে হচ্ছে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টে দেখল তা। তৎক্ষনাৎ হাত বাড়িয়ে রমণীর ফাঁক হয়ে যাওয়া চোয়ালটা হাত দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে মৃদু হেসে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। ওদিকে, আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করতে থাকা প্রথম লাইনের নিচে আরও অসংখ্য আলো জ্বলে উঠল এবার। অক্ষরগুলো নিজেদের পাল্টে গিয়ে তৈরি করল অন্য একটি নাম—
❝ RUSHDI’S SIGNORA ❞
মাহিরার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল এবার। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার বুঝে গেল — আকাশের বিশালতায়, সমুদ্রের ওপরে, শুধুমাত্র তার জন্য জ্বলছে এই নাম। সে যেমন নিরব আইল্যান্ডে নিজ ঐকান্তিক মানুষটার নিরব বাহুবন্ধনে বিস্ময়টুকু উপভোগ করছে, অপরদিকে, বিশ্বের আঠারোটি দেশের আকাশেও একই দৃশ্য ফুটে উঠেছে একই সময়ে। উৎসুক জনতার ভীড় জমে গিয়েছে রাস্তায়। ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত রাস্তার মানুষগুলো নিজেদের কাজ থামিয়ে দিয়ে হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো আকাশপটে। লন্ডনের কোনো এক অ্যাপার্টমেন্টের জানালা খুলে গেল উৎসুকতায়। কেউ কেউ ক্যামেরাবন্দী করতে লাগলো — কোনো এক পাগল প্রেমিকের পাগলামির নিদর্শনকে। একই সঙ্গে — রোম, প্যারিস, দুবাই, নিউইয়র্ক এক শহর থেকে আরেক শহরে ছড়িয়ে পড়ল এহেন বিস্ময়কর ঘটনা। মানুষ যে যার শহর থেকেই মাথা তুলে দেখল, আকাশে জ্বলজ্বল করছে —
“ HAPPY BIRTHDAY RUSHDI’S SIGNORA ”
তবে উৎসুক জনতার ভীড়ে কেবল একটি গুঞ্জন — আন্ডারওয়ার্ল্ডের সুপরিচিত মাফিয়াও তবে প্রেমিক হয়ে উঠল? তাও আবার পাগল প্রেমিক? তারা কেউ জানে না এই অসম্ভব আয়োজন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু… কিন্তু পৃথিবীর আঠারোটি দেশের মানুষ একই সময়ে একই বিস্ময়কর বার্তার সাক্ষী হয়ে গেল যেন। শুধু কি তারা? কয়েক মিনিটের মধ্যেই তো বিশ্বের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে চলমান অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। আচমকা চলমান অনুষ্ঠানে রুখ টেনে টিভির পর্দায় লাল ব্যানারে ভেসে উঠল—
❝ BREAKING NEWS ❞
“এই মুহূর্তে বিশ্বের আঠারোটি দেশের আকাশে একই সঙ্গে একটি বিশাল জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা দেখা যাচ্ছে। বার্তাটি হলো—‘HAPPY BIRTHDAY, SIGNORA’।”
থামলেন বিদেশী অ্যাঙ্কর। পরমুহূর্তেই বিস্মিত কণ্ঠে আবারও বলল,
“এটি কোনো সরকারি আয়োজন নয়। এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা এর দায় স্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই অভূতপূর্ব আয়োজনের পেছনে রয়েছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম রহস্যময় মাফিয়া’স কিংডমের কিং — রুশদী কিং। তবে কি এবার পাগল প্রেমীদের নামের তালিকার শীর্ষে নিজের নামটা স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করলেন রুশদী কিং?”
মাহি তখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বিস্মিত চোখদুটোর কোণ চিকচিক করছে অশ্রুর উপস্থিতিতে। আচমকা এক হেঁচকা টানে রমণীর ক্ষুদ্র বদনখানা ঘুরে গেল বেপরোয়া যুবকের দিকে। অশ্রুসজল চোখদুটো তুলে তাকানোর জো নেই তার, তার পূর্বেই এক আগ্রাসী কায়দায় একজোড়া রুক্ষ ওষ্ঠপুট নিজ উদ্যোগে মিলন ঘটালো রমণীর তুলতুলে অধরযুগলের সনে। রমণী আজ বাঁধ সাধল না। শুরুতে বড্ড জড়তায় জর্জরিত থাকলেও, ধীরলয়ে তার জড়তাটুকু মিলিয়ে গেল দমকা হাওয়ার তালে। নিজ তুলতুলে হাতদুটোর নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল বেপরোয়া যুবকের ভি-শেইপের কোমরের ঝাঁক। প্রায় বেশকিছুক্ষণের উম্মত্ত ওষ্ঠপুটের মিলনে অনিচ্ছায় বিচ্ছেদ ঘটালেন রূঢ় মানব। পরমুহূর্তেই রমণীর কপালের সনে ঠেকালো কপাল। বোকা মানবী চোখদুটো বুঁজে রেখেছে। হাঁপাচ্ছে বেশ! মুগ্ধ হাসলো। ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ হেপি বার্থডে সিগনোরা! আমার সিগনোরা।”
ভেজা চোখে আচমকা অধরজোড়া প্রশস্ত করল মাহি। তন্মধ্যে রূঢ় মানব ফের বলে উঠল,
“ মেক থ্রি উইশেস সিগনোরা!”
তৎক্ষনাৎ চোখদুটো খুলে তাকায় মাহি। মিলন ঘটায় লোকটার বাদামী চোখদুটোর সনে। সামান্য ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,
“ কেনো?”
অধর কামড়ে হাসল জনাব। আলতো করে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল মায়াবিনীর পেলব মুখখানা। ধীরকন্ঠে ফের বলল,
“ তোর বার্থডে উইশ ফুলফিল করা আমার দায়িত্ব সিগনোরা। সো…টেল মি। হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?”
বোকা মানবী অপ্রস্তুত হলো। নজরে বিলকুল ব্যাঘাত না ঘটিয়ে আচমকা বলে বসল,
“ যা চাইবো দিবেন?”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩
ওপর নিচ মাথা ঝাঁকায় মুগ্ধ। তা দেখে মৃদু হাসে মাহি। তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে,
“ আমার প্রথম উইশ — আমি চাই আপনি আমাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করুন। দ্বিতীয় উইশ — আমি চাই আগামী সাতদিন আপনি শুধু আমার থাকুন। কোনো মাফিয়া বিস্ট নয় শুধুমাত্র আমার মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে। আমি শুধু আপনাকে চাই — মির্জা সায়ান মুগ্ধ। শুধু আপনাকে। বলুন, পূরন করবেন আমার এই উইশ দু’টো?”
