আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬২
নাবিলা ইষ্ক
একমুহূর্তের জন্য আদিল মির্জা বুঝল না, তার এমন ননীর পুতুলের সঙ্গে সে কী করবে ঠিক! সিঁড়িগুলো বেয়ে এসে উদগ্রীব চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে গেল শুধু। সেই সুর ক্রমান্বয়ে ফিসফিসে হয়ে এলো। রোযা জবাব দিলো না। ছলছল চোখে কেবল চেয়েই থাকল। ক্রমশ তার রক্তিম চোখজোড়া আরও রক্তিম হতে থাকল। নাকের পাটা দুটো ফুলেফেঁপে উঠছে, আগেই জানান দিচ্ছে, এই তো সে কাঁদবে বলে! রোযার এইরূপে আদিল হতবিহ্বল, বিচলিত প্রায়। দুহাত বাড়িয়ে রোযাকে ধরবে, তার আগেই পাতলা শরীরটা সবেগে আছড়ে পড়ল তার শক্তপোক্ত বুকে। বুকে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল। ততক্ষণে তিনতলা, দোতলা, গ্রাউন্ড ফ্লোর ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। কারও উপস্থিতি নেই। আদিল রোযাকে পড়তে পারে, বুঝতে পারে। যখন বুঝল, এটা আবেগের কান্না, বিশেষ কোনো কারণ নেই—তখন কিছুটা দমাল নিজের বিচলিত হাবভাব। ডান হাতটা চলে এলো রোযার পিঠে। পিঠ বুলিয়ে মাথায় রাখল রুক্ষ তালু। বুলিয়ে দিয়ে কণ্ঠ বড্ড নরম করতে চাইল –
‘কী হয়েছে? বলো!’
রোযা কিছু বলতে পারল না। গতকাল থেকে অনুভূতি চাপিয়ে রাখতে রাখতে হিমালয়ের মতো হয়ে আছে। সেই অনুভূতির হিমালয় ভেঙেচুরে তাকে ভীষণ আবেগী করে তুলেছে। ওই কুকুর দুটোকে রোযা ভীষণ আহ্লাদ করত, ভালোবাসত। পারিবারিক অবস্থা তখন এতটাই খারাপ যে কল্পনাও করতে পারেনি কুকুর পালার কথা। বাড়িধারা ক্ষমতাসম্পন্ন এলাকা। রোযা এতটুকুই জানত, চমৎকার কেউ ওদের পালতে নিয়ে যাবে। উন্নত মানের ব্রিডের ছিলো যে! তাই সে কুকুরের বাচ্চা দুটো সেদিন যত্নের সঙ্গে রেখে এসেছিল। পরদিনই ব্যস্ততার মধ্যেও ফিরে এসেছিল দেখতে, ওরা আছে কি না এখনো। দেখল, নেই। তার বাক্সটা পড়ে ছিল। ওখানে একটা নোট ছিল। ইংরেজিতে একটা বাক্য লেখা ছিল –
‘দেয়’আর ডুয়িং ওয়েল। ডোন্ট ওয়ারি, মিস!’
স্বস্তি পেয়েছিল রোযা। অথচ সেই ব্যক্তি আদিল মির্জা ছিল জেনে কীভাবে শান্ত থাকবে? কুকুর দুটো এতকাল তার সামনেই ছিল, আর সে বুঝতেও পারেনি, জানতেও পারেনি!
এসব জানার পরে ভেতরে ভেতরে রোযা অনুভূতির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে! এই লোক কেন রোযার সবকিছু অনুসরণ করে এসেছে এতগুলো বছর? এমন পাগলামো করার মতো কেউ তো সে নয়!
‘দম আটকে যাচ্ছে, কান্না থামাও।’
আদিল ক্রমাগত বুলিয়ে যাচ্ছে রোযার মাথা। শান্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা তার সুরে। এতে রোযার অনুভূতি আরও বাড়ল, বাড়ল কান্নার গতি। আদিল বাধ্য হয়ে পাঁজাকোলে তুলে নিল তাকে। সোজা প্রবেশ করল তাদের বেডরুমে। পা দিয়ে দরজা আটকে বিছানায় শুইয়ে দিলো রোযাকে। পরনের কোট খুলে নিজেও গিয়ে শুলো কান্নারত, মিইয়ে যাওয়া শরীরটার ওপরে। ভর ছাড়ল পুরোপুরি। নরম বেড দেবে গেল পুরোপুরি!
রোযা দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছিল। আদিল জোরপূর্বক হাত দুটো সরিয়ে নিজের একহাতে বন্দি করে রাখল। অন্যহাতে মৃদু ছোঁয়ায় মুছিয়ে দিল ভেজা চোখদুটো। গাল বুলিয়ে আদেশের মতো ফিসফিস করল –
‘তাকাও, চোখ খুলে তাকাও।’
রোযা তাকাল না। মাথাটা ঘুরিয়ে রাখতে চাইল, আদিল দিলো না। চোয়াল ধরে নিজের দিকে করে রাখল।
‘কাঁদছো কেন? জানতে চাচ্ছি, রোজ-আ। বলো!’
রোযা না তাকিয়েই বিড়বিড় করল,
‘আপনি ছাড়া আর কে আমায় কাঁদায়?’
আদিলের চোখদুটো হঠাৎ হেসে উঠল। বিচলিত ভাবটা সরে গিয়েছে। মাথাটা নুইয়ে আনল রোযার মুখ বরাবর। ঠোঁট দিয়ে রক্তিম নাক ছুঁয়ে আওড়াল –
‘চোখ খোলো, আমার দিকে তাকাও। কী করেছি?’
রোযা তাকাল এবার। খুব কাছে আদিলের ধূসর চোখদুটো। সোজা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। ও চোখে চেয়ে রোযা ভীষণ অভিযোগ নিয়ে বলল –
‘আপনি ভালো জানেন, কী কী করেছেন! কত কী আমার থেকে লুকিয়েছেন!’
ভেজা চোখ দুটো ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে গেল আদিল।
‘বলো, শুনছি আমি। শুধরে নেব নিজের ত্রুটি।’
রোযা ডুকরে ওঠা থেকে নিজেকে দমিয়ে, বসে যাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল –
‘তিতান, থোর ওই ক্যাফের কুকুর দুটো! কেন বলেননি আমাকে?’
আদিল কেবলই হাসল। রোযার সারামুখে ঠোঁট ছুঁইয়ে এসে থামল ঠোঁটের কাছে।
‘এইজন্য কাঁদছো?’
বিপরীতে আদিলের ধূসর চোখে রোযা চেয়ে রইল শুধু।আদিলের হাস্যোজ্জ্বল চোখদুটো ধীরে ধীরে ক্রমশ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তাতে ভর করল অবসেশন। কণ্ঠ নেমে এলো, ভেসে বেড়াল রুমের আনাচে-কানাচে –
‘তবে তো তোমাকে আরও অনেক কাঁদতে হবে, বিলাভড। আমি আরও অনেক ভয়াবহ কাজ করে এসেছি—টু প্রটেক্ট ইউ, টু মেক ইউ মাইন। আই’ভ ডান থিংস ইউ ক্যান্ট ইভেন ইমাজিন। যার কথা শুনলে হয়তো আজকের এই কান্নাটাও তুচ্ছ মনে হবে।’
রোযা চোখ বুজে ফেলল। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইল, আগামী প্রশ্নগুলো ভেবে, বুঝেশুনে করতে চাইল, পারল কোথায়? আদিলের অবাধ্য হাত দুটো তাকে ঠিকঠাক ভাবতে দিলো না। পৃথিবীর কোনো কিছুতে আর মনোযোগ রাখতে দিলো না। শাড়িটা শরীর থেকে সরতে সময়ের প্রয়োজন পড়ল না। শাড়িটা উড়ে গিয়ে ফ্লোরে পড়ল ভাঁজে ভাঁজে। রোযা দুর্বল হাতে থামাতেও পারল না আদিলকে। আদিল শক্ত করে এক হাতে তার হাত দুটো মাথার ওপরে চেপে রেখেছে গোটা সময় যাবত। পুরুষালি একটা হাত রোযার অস্তিত্ব কেড়ে নিলো। তার সর্বশরীরের চালাল নিজের রাজ। আবেগের মুহূর্ত কেটে এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।।রোযা ভেঙে গুড়িয়ে গেল, ডুবতে বসা নাবিকের মতো হাহাকার করে গেল পুরোটা সময় জুড়ে। ফর্সা পা দুটো ক্রমশ র ক্তিম হতে থাকল আদুরে অত্যাচারে।
মায়ের আদরে সবসময় পুতুলটি সেজে থাকে হৃদি। পিঠ-সমান চুলগুলো যত্ন সহকারে সুন্দর স্টাইলে বাঁধা থাকে। যা অনেকটা সময় নিয়ে রোজ বেঁধে দেয় রোযা। হৃদির পরনে আছে আরামদায়ক কটনের হাঁটু-সমান ফ্রক। বর্তমানে বাচ্চাটার পছন্দের পুতুল হচ্ছে একটা সবুজ রঙের ব্যাঙ, যা আদিল আজই, কিছুক্ষণ আগেই নিয়ে এসেছে তার জন্য। ভীষণ নরম, তুলতুলে পুতুলটির মাথাটা একটা ব্যাঙের আকৃতিতে, বাদবাকি শরীর শুধু দুটো চিকন, ভীষণ লম্বা ঢ্যাঙ। এই ব্যাঙ নিয়ে হাঁটলে পুতুলটির অর্ধেকটা ফ্লোরে লুটোতে থাকে। ওভাবেই বাগানজুড়ে হেঁটে হেঁটে পুতুল নিয়ে খেলেছে হৃদি। তাকে বেশ প্রশ্রয়ই দিচ্ছে উপস্থিত গার্ডগুলো। খেলতে খেলতে এবারে বাবার খোঁজে বাড়ির ভেতরে ঢোকার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ল। মরিয়ম বেগমের হাতে ট্রে, একপাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কিছু বলবেন তার আগেই দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাচ্ছিল হৃদি। তখুনি হড়বড় করে নামতে থাকা শান্ত চটজলদি কোলে তুলে নিল বাচ্চাটাকে। হৃদি চোখ পিটপিট করে চেয়ে আছে শান্তর দিকে, প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে। শান্ত দুয়ার পেরিয়ে বেরোতে বেরোতে শুধায় –
‘আমার প্রিন্সেস কেমন আছে? তার কি আমায় মনে পড়েছে? একটুও?’
হৃদি মাথা দুলিয়ে ভীষণ বড়োদের মতো করে বলল –
‘আমি ভালো আছি, বডিগার্ড আংকেল। তুমি কি ভালো আছো? আর তোমার কথা আমার সবসময় মনে পড়ে। একটু না, অনেকটা।’
শান্ত নিজেকে হাজার বলেকয়েও সংযত রাখতে পারল না। তোতাপাখির মতো কিচিরমিচির করা পরীর বাচ্চাটার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফেলল চট করে।
‘ভালো আছি, ভীষণ ভালো আছি। আমার প্রিন্সেসের কথাও সবসময়, সর্বক্ষণ মনে থাকে। একটুর জন্যও ভুলতে পারি না।’
হৃদি দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে শান্তর গলা। শান্তর হাসি-হাসি মুখ দেখে আওড়াল –
‘তাই?’
শান্ত শব্দ করে ছোট্ট নাকে আঙুল ছুঁইয়ে টেনে টেনে বলল,
‘তাই, অনেক গুলোওওও তাই।’
হৃদি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। শান্ত সবুজ ব্যাঙটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ব্যাঙটা একটু ভয়ংকর ভয়ংকর লাগছে না প্রিন্সেস?’
হৃদি ব্যাঙটার নরম মাথা ধরে চোখের সামনে তুলে বলল –
‘কই, না তো। শি লুকস কিউট।’
শান্ত হাসি চেপে জিজ্ঞেস করে গেল হাঁটতে হাঁটতে, ‘শি কেনো? হি হতে পারে না?’
হৃদি ভীষণ গম্ভীরমুখে বলে গেল –
‘আমি শি। ও আমার ফ্রেন্ড। তাহলে ও হি হলেও আমার জন্য শি হবে। হতেই হবে। ডাজেন্ট ম্যাটার ও এক্সাক্টলি কী!’
শান্তর মনে হলো একমুহূর্তের জন্য স্বয়ং আদিল মির্জা কথা বলছে! এই না হলে আদিল মির্জার কন্যা! কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে পরপরই হেসে উঠল প্রাণ খুলে। হৃদির গাল আলতোভাবে টেনে ধরল –
‘দ্যাটস লাইক মাই প্রিন্সেস!’
হৃদি একেক প্রশ্ন করে যাচ্ছে ভীষণ উদগ্রীব হয়ে –
‘ড্যাডকে তো তুমি পাহারা দাও, তাই না?’
‘তাই।’
‘তোমাকে কে পাহারা দেয়?’
ভ্যাবাচেকা খেলো শান্ত। এলেন আর ক্লান্তও হতভম্ব প্রশ্নে। শান্ত পরমুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে বলে, ‘আমার পাহারা লাগে না, প্রিন্সেস। আমি নিজের, আপনার এবং ম্যাডামের সহ নিজেরও পাহারাদার।’
হৃদি চোখ পিটপিট করে দেখল শান্তর ভীষণ সুন্দর মুখখানা। মুখ বাড়িয়ে চুমু বসাল খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকা গালে। শান্ত চমকে ওঠে। আবেগে আপ্লূত হয়ে পড়ে। গদগদ ভঙ্গিতে হৃদিকে নিয়ে রাজ্যের আলাপ বসাল বাগান জুড়ে।
নূরজাহানের সঙ্গে হৃদি পড়ছিল গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিভিংরুমে। মরিয়ম বেগম নাস্তার ট্রে নিয়ে গিয়েছেন মাত্রই। সন্ধ্যায় অনেক কষ্টে অল্প কিছুটা খাওয়াতে পেরেছে নূরজাহান। তারপর থেকেই বাচ্চাটা অনেকক্ষণ ধরে ওপরে, তার বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। বুদ্ধিমতী নূরজাহান বুঝেছে, তার স্যার-ম্যাডামের একান্ত একটা মুহূর্ত প্রয়োজন। তাই নানা ট্রিকস খাটিয়ে হৃদিকে নিচেই আটকে রাখার চেষ্টা করছে। হৃদিও ছোটো মানুষ, কিছুক্ষণ পরপর ওপরে যাওয়ার কথা ভুলে যাচ্ছে। পড়াশোনার ফাঁকে খেলনা নিয়ে খেলছিল, কখনো খাতায় আঁকিবুঁকি কাটছিল। তখনই সিঁড়িতে পদধ্বনি শোনা গেল। হৃদি সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল। তিনতলা থেকে নেমে আসছে আদিল। চুলগুলো ভেজা। পরনে আরামদায়ক ট্রাউজার আর টিশার্ট। এক হাতে ফাইল। তাকে এতটা হোমলি, এতটা ঘরোয়া রূপে খুব কমই দেখা যায়। বাবাকে দেখামাত্র হৃদির চোখ চকচক করে উঠল।
‘ড্যাড!’
এক মুহূর্তও দেরি না করে দিকবিদিকশূন্য হয়ে ছুটল সে। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে দূর থেকেই দুহাত মেলে ধরেছে—বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। মেয়েকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দেখে আদিল দ্রুত কয়েক ধাপ নেমে এলো। ঝটপট তুলে নিলো কোলে। ফুলোফুলো গালে পরপর দুটো চুমু খেয়ে মেয়েকে বাম হাতের বাহুতে বসিয়ে নিচে নেমে এলো।
‘কী পড়ছিলে?’
হৃদি বাবার গলা জড়িয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল –
‘পড়ছিলাম না, ড্যাড। আমি অবজারভ করছিলাম।’
আদিলের ভ্রু সামান্য উঠল, ‘ওহ! তাই নাকি?’
ঠিক তখনই শান্তও ভেতরে ঢুকল। হাতে ছোটো একটা ব্যাগ। পরনে নিত্যদিনের মতো কোট নেই, সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। চুলগুলো এলোমেলো। এসে ব্যাগটা আদিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নিলো। আদিল মেয়েকে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসেছে। নূরজাহান ইতোমধ্যে খুব সন্তর্পণে সরে গেছে ওখান থেকে। আদিল মেয়ের দিকে তাকিয়ে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল –
‘কী অবজারভ করলে তবে?’
হৃদি গম্ভীর মুখে বলল –
‘এ চিকন, বি মোটা।’
শান্ত হেসে ফেলল। আদিলের চোখ দুটো হাসছে। ব্যাগের ভেতরের জিনিসপত্র একবার দেখে শান্তর হাতে ধরিয়ে দিয়ে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল –
‘অবজারভেশন এসব নিয়ে নয়, সোনা। আশপাশ নিয়ে করতে হয়।’
হৃদি বৃদ্ধদের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বলল –
‘তাহলে আমি অবজারভ করে তোমায় জানাব।’
আদিল প্রশ্রয় দেয়ার ভঙ্গিতে আওড়ায় –
‘আমি অপেক্ষায় থাকব।’
কথা শেষ হতেই হৃদি বাবার কোল থেকে নেমে গেল। সোজা সিঁড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করল –
‘মম কোথায়?’
আদিল তৎক্ষণাৎ উঠে এসে মেয়েটাকে ফের কোলে তুলে নিলো। মেয়েকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বেরোতে বেরোতে নির্বিকার স্বরে বলল –
‘মম ঘুমুচ্ছে।’
‘এখন? মম তো এ সময়ে ঘুমায় না!’
আদিল একটুও বিচলিত হলো না। মেয়েকে আদাপড়া বোঝানোর মতো করে বলল –
‘শি ফিলস টায়ার্ড।’
হৃদির ছোট্ট মুখটা আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল, ‘মম কি সিক হয়ে গেছে?’
‘না।’
‘তাহলে ঘুমাচ্ছে কেন?’
‘কারণ মম টায়ার্ড।’
‘কিসের জন্য টায়ার্ড? মম তো ভালো ছিল। আমরা বাগানে হাঁটলাম।’
আদিল থেমে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। পেছন থেকে ঠিক তখনই চাপা হাসির গুঞ্জন ভেসে এলো। শান্তর হাসি চেপে রাখতে রাখতে চোখে পানি জমে গেছে। এতক্ষণ ধরে মুখ শক্ত করে রাখলেও এবার আর পারছে না। এলোমেলো চুলের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁধ কাঁপছে। আদিল ধীর পায়ে ফিরে এসে আলগোছে একটা লাথি বসিয়ে দিল শান্তর পায়ে। শব্দ তুলে হাসতে হাসতে শান্ত সামান্য সরে গেল। আদিল চোখ সরু করে তাকাল। আওড়াল –
‘খুব হাসি পাচ্ছে, না?’’
শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করছে। পারছে কোথায়? ওর দেখাদেখি এলেন আর ক্লান্তর অবস্থাও ভীষণ বাজে। দুজন নির্বিকার থাকতে পারছে না।
নূরজাহান পুরোটা সময় দৃষ্টি নুইয়ে রাখল। তারপরও চোখ পড়ে যাচ্ছিল বারবার। রোযার ফর্সা গলা, হাতের দাগগুলো যে ভীষণভাবে দৃষ্টিতে পড়ছে! রোযা নিজেকে বেশ ঢেকেঢুকে রাখার চেষ্টা করেছে। তারপরও নূরজাহানের ভীষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, না চাইতেও নজরে এসে যাচ্ছে সবকিছু। রোযার কালো গাউনটা নরম সিল্কের। তার ওপর পাতলা একটা চাদর জড়িয়ে রাখা। হাঁটলে গাউনটা চমৎকার ভঙ্গিতে নিচে দুলে ওঠে। রোযা প্লেটগুলো ডাইনিং টেবিলে সাজাচ্ছিল। মরিয়ম বেগম গরম গরম খাবার এনে সাহায্য করছেন। পাশাপাশি নূরজাহানও হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করল আদিল। ডাইনিংয়ে ব্যস্ত রোযাকে দেখেই একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল সে। রোযা অনুভব করল। একপলক চেয়ে তাড়া দিলো –
‘আসুন, দ্রুত বসে পড়ুন। দুপুরে খেয়েছিলেন? আপনার খাওয়াদাওয়ার কোনো নিয়ম নেই।’
আদিল আদুরে শাসন শুনতে শুনতে পুতুলের মতো হেঁটে এলো ডাইনিংয়ের কাছে। রোযা তার দিকে না তাকিয়েই বলে গেল –
‘মাম্মা, আসোওওও। কী খাবে তুমি?’
হৃদি উচ্ছ্বাসে বাবার কোল থেকে নেমে এসে ছুটে গেল মায়ের কাছে। জড়িয়ে ধরে জানাল –
‘তুমি কি রেঁধেছ, মম? আমি তাই খাব।’
‘বিরিয়ানি করেছি। মাটন বিরিয়ানি। খাবে তুমি?’
‘অফকোর্স! আমার মম বেস্ট রান্না করে।’
আদিল চেয়ার টেনে বসেছে। পাশেই হৃদিকে বসিয়েছে রোযা। বিরিয়ানি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ঘ্রাণে ম-ম করে উঠেছে চারপাশ। রোযা পাশে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে আদিলের প্লেটে খাবার বেড়ে দিলো। মেয়ের প্লেটে দিতে দিতে হঠাৎ বলল
‘শান্ত, এলেন, ক্লান্ত… ওরা তো মনে হয় এখনো খায়নি। ওদের জন্য পাঠালে কেমন হয়?’
আদিল তাকিয়েই ছিল রোযার দিকে। তখন রোযা কথা বলতে বলতে মরিয়ম বেগমকে ইশারায় সালাদের বাটিটা আনতে বলছে। আদিল অগোচরে ঢোক গিলল। তারপর মুখ খুলল –
‘ওরা অনেকজন। কজনকে পাঠাবে? বাইরে থেকে খেয়ে নেবে।’
ঠিকই তো। গুনেগুনে তিনজনকে তো আর দেওয়া যাবে না। এতজনকে খাওয়ানোর মতো রান্নাও রোযা করেনি। তাই আর কথা বাড়াল না। তবে মনে মনে ঠিক করল, একদিন রেঁধেবেড়ে সবাইকে খাওয়াবে। রোযা এবার এগিয়ে এলো। চকচকে চোখে চেয়ে তাড়া দিলো –
‘খেয়ে বলুন, কেমন হয়েছে?’
হৃদি ইতোমধ্যে চামচ দিয়েই নিজে নিজে খেতে খেতে মুগ্ধ হয়ে মায়ের প্রশংসা করে যাচ্ছে।
‘মম, এটা খুব ইয়াম্মি!’
রোযা সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের গালে দুটো চুমু খেল। বিপরীতে আদিল রোযার প্রত্যাশিত জ্বলজ্বলে দৃষ্টির সামনে খেলো। একবার নয়, একটার পর একটা কয়েক লোকমা মুখে তুলে, ধীরে ধীরে চিবিয়ে অবশেষে জানাল –
‘মজা হয়েছে।’
রোযার কষ্ট সার্থক। নিজের স্বস্তি আর হাসিটা চেপে রাখল। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, ‘শুধু মজা? বেশি মজা হয়নি, না?’
আদিল গলার খাবার গিলে একটু ভেবে আবারও জানাল, ‘ভীষণ মজা হয়েছে। ভীষণ!’
রোযা শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে দুলে পড়ল আদিলের শরীরে। নূরজাহান আর মরিয়ম বেগমের দৃষ্টি তখনও নত। তবে দুজনের ঠোঁটেও ফুটে উঠেছে চাপা হাসির রেখা। রোযা হাসতে হাসতেই হঠাৎ টিস্যু তুলে আদিলের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা তেল মুছে দিদিতেই, আদিল তার হাতটা টেনে ধরল। এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি, তার হাবভাব, অদ্ভুত এক অনুভূতি এনে দিল রোযার ভেতর। হাসিটা ধীরে ধীরে থেমে গেল তার। ক্রমশ অনুভূতিতে গলার স্বর বন্ধ হয়ে গেল।
আদিল টেনে রোযাকে নিজের পাশে বসিয়ে নিলো। খুব স্বাভাবিক রাখতে চাইল কণ্ঠ –
‘তুমিও খেয়ে নাও।’
রোযা আর প্লেট নিলো না। হৃদিকে কোলে তুলে নিয়েছে। মেয়ের হাতটা পরিষ্কার করে নিজেই বাচ্চাকে খাওয়ানোর পাশাপাশি নিজেও খেতে লাগল। অথচ লক্ষ্য করল না আদিলের থমকে থাকা হাতটা। লক্ষ্য করল না ঘনঘন তার দিকে ফিরে আসা সেই নরম দৃষ্টি। লক্ষ্য করল না, কতক্ষণ ধরে আদিল নীরবে এই দৃশ্যটা দেখছে। এমন পরিপূর্ণ মুহূর্ত তার জীবনে বুঝি বহু বহু বসন্ত পর ফিরে এলো….
খাওয়াদাওয়া শেষ করে বাবার সাথে হাঁটছে হৃদি। খাওয়ার পরে হাঁটা বাধ্যতামূলক যে! রোযা তখনো রান্নাঘরে পায়চারি করছে। বেশ গৃহিণী একটা ভাব তার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হৃদি বাবার উদ্দেশ্যে হঠাৎ ফিসফিস করে বলল –
‘ড্যাড, কিছু একটা পরিবর্তন লাগছে।’
আদিল মেয়ের মাথা বুলিয়ে তাকিয়ে রইল রান্নাঘরে থাকা ব্যস্ত শরীরটা দিকে –
‘কিরকম? ইজ ইট ইন আ গুড ওয়ে, ওর ব্যাড ওয়ে?’
‘খুব চমৎকার ওয়েতে। আমাকে এই পরিবর্তন হ্যাপিনেস দিচ্ছে। আই ফিল সো হ্যাপিইই। মমকে এমন আগে আমি কখনো দেখিনি।’
‘যেমন?’
‘সে খুব কেয়ার করছে তোমার। কান্ট ইউ ফিল দ্যাট?’
আদিল স্তব্ধ হলো মেয়ের এরূপ তীক্ষ্ণ চিন্তাভাভনা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে। আওড়াল শুধু –
‘আই ডু।’
হৃদি বাবার টিশার্ট টেনে বোঝাল কোলে নিতে। আদিল কোলে তুলে নিলো মেয়েকে। হৃদির বাবার বড়ো একটা হাত দুহাতে নিয়ে খেলতে খেলতে আওড়ে গেল –
‘আমি আমার মমকে এভাবেই চাই।’
রোযা একপলক ফিরে তাকাল কিছু একটা করতে করতে। চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝাল। আদিল বুঝল। হৃদি বলে যাচ্ছে –
‘আমি চাই ঘুরতে যেতে। ড্যাড, মম অ্যান্ড হৃদিইই, দ্য হ্যাপিয়েস্ট ফ্যামিলি ওন আর্থ।’
আদিলের নাকমুখে উচ্চারণ ‘হুম’ টুকু ভেসে বেড়াল….
‘কবে যাব বলো? যাব তো ঘুরতে আমরা?’
‘যাব…শীঘ্রই!’
হৃদি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল মুহূর্তে। বাবা কখনো মিথ্যে কথা বলে না তাকে।
সেদিন শনিবার ছিল। সন্ধ্যার সময়। গাড়ি এসে থামল ফার্মহাউসের সামনে। এটা আব্দুল মান্নানের ফার্মহাউস। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক সুন্দরী রমণী। কিছুটা দূরে দিকপাল চ্যাটার্জিও উপস্থিত। আদিলের গাড়ি থামতেই সামান্য হৈচৈ শুরু হলো। বরাবরের মতোই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন আব্দুল মান্নান। অথচ আদিলের পলকটুকুও পড়ল না। অভ্যস্ত যে, সোজা ভেতরে ঢুকে গেল। গিয়ে সোফায় বসল। পায়ের ওপরে পা তুলে। আব্দুল মান্নান তখনই বুঝলেন, তার সোনার হরিণের মেজাজ ভালো নেই।
মুহূর্তেই সতর্ক হলেন তিনি। চোখের ইশারায় গার্ডদের মালটা সরিয়ে ফেলতে বললেন। এই ‘মাল’ কোনোভাবেই গোছানো সম্ভব নয়, ততক্ষণে সে নিজেই কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে আদিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আচার-আচরণে স্পষ্ট, আকৃষ্ট করার তীব্র ইচ্ছা তার। কাছে গিয়ে স্বেচ্ছায় ঝুঁকে পড়ল।
‘আমি ড্রিংকটা ঢেলে দিই, বস?’
বলতে বলতেই ঢুলে পড়তে চাইল আদিলের শরীরে। তবে পারল কোথায়? এর আগেই শান্ত ময়লা ধরার মতো করে টেনে ধরল মেয়েটার শরীরে ল্যাপটে থাকা বডিকন ড্রেসের ফিতাটা। এক টানে তাকে আদিলের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিল।মেয়েটা ছিটকে পড়ে গেল ফ্লোরে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। আব্দুল মান্নানের গার্ড দুটো এগিয়ে এসে মেয়েটাকে ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। ফাঁকা হাসি হেসে আব্দুল মান্নান পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করলেন।
‘সুদর্শন পোলা থাকা ভীষণ ঝামেলার। মাইয়ামানুষ গায়ে ঢইলা পড়ে। হা হা হা!’
দিকপাল চ্যাটার্জি চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন আব্দুল মান্নানের দিকে। সন্দেহটা এবার তার হৃদয়ে পাকাপোক্ত হয়ে বসেছে। ঠিক তখনই শোনা গেল আদিলের সেই চেনাপরিচিত শীতল হাসির আওয়াজ –
‘আপনি তো আমাকে চেনেন, চেনেন না, মন্ত্রী সাহেব?’
আব্দুল মান্নানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গা কাঁটা দিয়ে উঠল তার। আদিল মির্জার ওপর পরপর হামলার ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, তাকে ঘিরে গুরুতর কোনো ছক সাজানো হয়েছে। আর সেই ছকের সঙ্গে আব্দুল মান্নানের নাম জড়িয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আব্দুল মান্নানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। জড়সড় হয়ে এলেন ভদ্রলোক আদিলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে। কিছু বলবেন, তার আগেই আদিল উঠে দাঁড়াল –
‘মন্ত্রী সাহেব, আমি আদিল মির্জা। ওসমান মির্জা নই। আমি যখন ধরব, আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ধরব। ছাড় নেই, মাফ নেই। সোজা গোড়া থেকে উপড়ে ফেলব।’
আব্দুল মান্নান কুঁকড়ে গিয়ে গলগল করে বলে উঠলেন –
‘ভুল বুঝতাছো, বাপ। আমি নাই এসবে। খোদার কসম। তুমি মন্ত্রীর ভাইরে ধরো।’
দিকপাল চ্যাটার্জির চিন্তিত চোখ এবার আদিলের দিকে উঠল।
আদিল আর বসল না। ব্যবসায়িক আলাপটাও আর সারল না। আগামী সপ্তাহে তার মাল আসার কথা। ওই ট্রাক দেশের বর্ডার ক্রস করাবে আদিলের লোকজন। সেই নিয়েই ছিল আজকের মিটিং। কিন্তু আপাতত আর কোনো কথা বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না সে। নিজের বডিগার্ডদের নিয়ে সোজা বেরিয়ে এলো। তিনটি গাড়ি মুহূর্তেই ফার্মহাউস ছেড়ে সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে বেরিয়ে গেল। দিকপাল চ্যাটার্জি তখনো দাঁড়িয়ে ছিলেন আব্দুল মান্নানের সামনে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠান্ডা গলায় বললেন,
‘যাই করেন, মন্ত্রী সাহেব… বলদামি কইরেন না।’
এইটুকু বলে তিনিও গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলেন। বারিধারার নির্জন এই এরিয়াটা রাতের অন্ধকারে আরও নিস্তব্ধ হয়ে আছে। আদিল আজ সঙ্গে গার্ড বেশি আনেনি। গাড়িও মাত্র তিনটা। কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আঁধার চিড়ে ছুটেছে গাড়ি গুলো।
জানালার কাঁচ নামানো ছিল। এক হাতে ফাইল, অন্য হাতে পাতাগুলো উল্টাচ্ছিল আদিল। গাড়ি ছুটে চলেছে নির্জন রাস্তা ধরে। হঠাৎ, আকস্মিক আক্রমণ। চোখের পলকে বারোটা বড়ো গাড়ি পুরো রাস্তা ব্লক করে ফেলল। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে তাদের গাড়িকে। সাজানো গোছানো আক্র মণ। আদিল ভ্রু তুলল। আশ্চর্য হওয়ার চেয়ে আগ্রহটাই যেন বেশি তার চোখে। এত ডেসপারেশন! সম্ভবত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন না, তার ছোটো ভাই কী করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ লোকটা আদিলকে মারার জন্য এতটা উতলা কেন? আদিলের ভেতর অদ্ভুত এক কৌতূহল জন্ম নিল। জানার আগ্রহটা বেশ তীব্র।
ততক্ষণে শান্ত গাড়িতে প্রচণ্ড ব্রেক কষতে বাধ্য হয়েছে। এলেন সতর্ক হয়ে পিস্তল তৈরি করে নিয়েছে। জানালার কাঁচ সামান্য নামিয়ে মুহূর্তেই গু লি ছুড়ল সে। কয়েকটি গাড়ি একসঙ্গে আক্রমণ শুরু করল। ধাক্কার প্রচণ্ড জোরে আদিলের গাড়িটা দুলে উঠল। আরেকটা ধাক্কা খেলেই গাড়িটা আছড়ে উল্টে যাবে। তার আগেই শান্ত দ্রুত গাড়ি কিছুটা পিছিয়ে নিল।
ঠিক তখনই—সামনে থেকে ভয়ংকর গতিতে কিছু একটা ছুটে আসতে দেখে শান্তর নির্বিকার হাবভাব বদলে গেল।
‘বস!’
আর একবার আঘাত এলে গাড়িটা ঝলসে যাবে। চোখের পলকে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আদিল। সঙ্গে শান্ত ও এলেনও। পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড শব্দে আক্রমণকারী একটি বড়ো গাড়ি তাদের গাড়িটাকে ধাক্কা মেরে উড়িয়ে নিয়ে গেল।
দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। মেঘ গর্জে উঠছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে। আগুনের তীব্র আলোয় মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। শান্ত, এলেনসহ সবাই আদিলকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। ততক্ষণে অপর দল থেকেও একে একে বেরিয়ে এসেছে কালো পোশাক পরা লোকজন।
সংখ্যায় তারা কম নয়। আদিলের মুখে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই।
ভীষণ শান্ত গলায় একজনকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আদেশ কর –
‘ওটা মনে হচ্ছে প্রধান। এটাকে যেকোনো মূল্যে চাই।’
শান্ত এক মুহূর্তও দেরি করল না জবাব দিতে, ‘ইয়েস, বস!’
শুরু হলো দুপক্ষের সংঘর্ষ। গুলির শব্দে কেঁপে উঠল রাত।
চারপাশে ছুটছে মানুষ। একের পর এক আক্রমণ। আগুনের আলো, ধোঁয়া আর গুলির শব্দে মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটা পরিণত হলো যুদ্ধক্ষেত্রে। শেষ পর্যায়ে এসে আদিল নিজেই পিস্তল বের করল। পরপর কয়েকজনের দিকে গুলি ছুড়ল সে।
একসময় ছিটকে আসা রক্ত এসে লেগে গেল তার হাতে। অথচ শান্ত কোনোভাবেই আদিলের কাছ থেকে সরছে না। পুরোপুরি আড়াল করে রেখেছে বসকে নিজের শরীর দিয়ে। আদিল একবার তাকাল ছেলেটার দিকে। তারপরই, দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের আলোয় কিছু একটা লক্ষ্য করল তার ধূসর চোখ। সতর্ক হয়ে উঠল দৃষ্টি। এইপর্যায়ে হঠাৎ চোখের পলকে ছুটে আসা গু লি শান্তর শরীর ছুঁতে পারল না। আচমকা আদিলের কালো গ্লাভসে ঢাকা হাতদুটো ওকে একটানে সরিয়ে আনে সামনে থেকে পেছনে। প্রথম গু লিটা ছুঁতে না পারলেও দ্বিতীয় গু লিটা তীরের মতন এসে ঢুকে গেল আদিলের বাম কাঁধে। সঙ্গে সঙ্গে গ ল গল করে বেরোল তাজা র ক্ত। ফ্যাকাসে হয়ে এলো শান্তর মুখ। দিনদুনিয়া ভুলল ছেলেটা। চিৎকার করে উঠল –
‘ভাই! ভাই!’
আদিল চোখমুখ কুঁচকে ফেলল তীব্র যন্ত্রণায়। কপালে জমল ঘাম। বাম কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। অথচ শান্ত তখন অস্থির হয়ে পড়েছে। পাগলের মতো বিড়বিড় করছে কিছু একটা। তারপর হঠাৎ হুংকার ছাড়ল –
‘মাদার*** বাচ্চা…’
দুহাতে পিস্তল তুলে নিল শান্ত। তারপর আর থামল না।ক্রমাগত গুলি ছুড়তে ছুড়তে কদম বাড়িয়ে গেল সামনে। ওর পাগলামির সামনে কেউই টিকতে পারল না। এলেন নিজেও হতবিহ্বল প্রায়। শান্তর রক্তিম চোখমুখ, দাঁতে দাঁত চেপে রাখা রাগ আর রাগান্বিত হুংকারে যেন কেঁপে উঠল জমিনও। ঠিক তখনই, ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামল। মুহূর্তেই আগুন, ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধের সঙ্গে মিশে গেল বৃষ্টির গন্ধ। কিন্তু শান্ত থামল না। একজনকেও বাঁচতে দিলো না।
শুধু সর্বশেষ লোকটাকে গুলি করার আগে হঠাৎ মনে পড়ে গেল বসের আদেশ। থমকে গেল হাত। পিস্তলটা ধীরে ধীরে নামিয়ে নিল। ততক্ষণে তাদের একজন গার্ড আক্রমণকারী লোকটাকে আটকে ফেলেছে। এলেন ইতোমধ্যে আদিলের ক্ষতস্থানে নিজের টাই দিয়ে শক্ত করে প্যাঁচিয়ে দিয়েছে। শান্ত ছুটে এলো আবার। আদিল তখনো দাঁড়িয়ে। এক হাত দিয়ে শক্ত করে বাম কাঁধটা ধরে আছে। পরমুহূর্তেই শান্ত ছুটে এসে জাপটে ধরল তাকে। বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে উঠল –
‘আপনি কেন সরিয়েছেন আমাকে! একটা গুলিতে কিছু হতো না আমার!’
আদিল ব্যথার মাঝেও আলতো করে চাপড়াল শান্তর কাঁধ। কণ্ঠ বসে গিয়েছে যন্ত্রণায় –
‘শান্ত হ। কিছু হয়নি।’
শান্ত দাঁতে দাঁত পিষল। ছলছল করে ওঠা চোখ দুটোয় বৃষ্টির পানি এসে মিশে গেল। ভিজে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে দুজনেই। শান্তর বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কণ্ঠ কাঁপছে। তবু আদেশটা দিতে ভুলল না –
‘ডক্টর মোজাফফরকে বাড়িতে পৌঁছাতে বল। যত দ্রুত সম্ভব!’
এলেন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেছে। আদিল উঠে বসতেই শান্তও উঠে বসল। তাদের গাড়ি ছুটল….
–
রোযার আতঙ্কিত চিৎকারে থমকে গেল মির্জা ভবন। সেই চিৎকারে আদিলের ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চোখের পাপড়ি কেঁপে উঠল। দুর্বল ভাবে শ্বাস নেয়া সে উপলব্ধি করল চমৎকার এক অনুভূতির। আদিলকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে রোযা দিশেহারা হয়ে ছুটে নামতে শুরু করল সিঁড়িগুলো বেয়ে। আদিল দুর্বল গলা তুলল সেই দৃশ্যে –
‘ধীরে নামো!’
কথা শুনল না রোযা। পাগলের মতো ছুটে এলো। হৃৎপিণ্ড কাঁপছে তার। কাঁপছে সর্বাঙ্গ। ভয়ে মুখটা এইটুকুন হয়ে গেছে। ছুটে নামতে গিয়ে একবার পা হড়কে পড়তেও নিয়েছিল।আদিল নিজের এই অবস্থাতেই এগিয়ে গিয়ে তাকে থামাতে চাইল। অথচ তার আগেই রোযা জাপটে ধরল তার রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হাতটা। তীব্র যন্ত্রণায় আদিলের চোখ দুটো বুজে আসতে চাইছে। সেই মুখটা দেখেই মুহূর্তে রোযার দু-চোখ ছলছল করে উঠল।
‘কীভাবে হলো এসব! সুস্থসবল বেরুলেন মাত্র!’
কণ্ঠটাও যেন বের হলো না ঠিকমতো। ততক্ষণে ডাক্তার মোজাফফর চলে এসেছেন। আদিলের ক্ষ ত লক্ষ্য করে, পরিস্থিতি বুঝে ভদ্রলোক দৃষ্টি নুইয়ে শান্ত স্বরে বললেন –
‘কিছু হবে না, ম্যাডাম। আমি দেখছি। বেডরুমে নিতে হবে।’
সঙ্গে সঙ্গে সবাই মিলে আদিলকে ধরে ওপরে নিয়ে যাওয়া হলো। দিশেহারা রোযাও পিছু পিছু ছুটল। বেডরুমে এনে আদিলকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার মোজাফফর চিকিৎসা শুরু করলেন। তিনি আদিল মির্জার পার্সোনাল ডাক্তার। এমন পরিস্থিতির জন্য কমবেশি সবসময়ই প্রস্তুত থাকেন। রোযা এলোমেলো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে দেখে তিনি আশ্বস্ত করার সুরে বললেন –
‘ম্যাডাম, শান্ত হোন। গুলিটা বেশি ভেতরে ঢোকেনি।’
রোযা শান্ত হতে পারল না। আদিলের হাতটা শক্ত করে ধরে রইল। আদিলের আপাতত আর জ্ঞান নেই। চোখজোড়া বন্ধ। মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ। ডাক্তার মোজাফফর প্রথমে গুলিটা বের করার প্রস্তুতি নিলেন। পরক্ষণেই, তীব্র যন্ত্রণায় আদিল চাপা গলায় গর্জে উঠল। রোযা আঁতকে উঠল এতে। একফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়াল। যেন ব্যথাটা সে পাচ্ছে। আর শান্ত? শান্তির চোখমুখ মুহূর্তেই আরও লাল হয়ে উঠল। দুহাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে এলো। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল ছেলেটা।কিছুক্ষণ পর ডাক্তার মোজাফফর সফলভাবে আদিলের কাঁধ থেকে গুলিটা বের করে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ দিলেন। ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো হলো। আরও কিছুক্ষণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে অবশেষে তিনি বললেন –
‘চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম। সব ঠিক আছে।’
রোযা জবাব দিতে পারল না। ব্যস্ত হয়ে পড়ল শুধু। আদিলের মুখটা ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিল প্রথমে। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর নিজের হাতে তার শরীর মুছিয়ে কাপড়চোপড়ও বদলে দিল। অথচ আদিলের আর জ্ঞান ফিরল না।
নির্জীবের মতো শুয়ে আছে সে। রোযা এসে বসল তার পাশে।
কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল মুখটার দিকে। এই মানুষটা তো কিছুক্ষণ আগেও নিজের পায়ে হেঁটে বেরিয়েছিল। নিজের মতো করে সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছিল। অথচ এখন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে তার সামনে। তারমানে জীবনের কোনো মূল্য নেই! যেকোনো সময় কিছু হতে পারে! রোযা ভেতরটা মুষড়ে উঠল।
ঝুঁকে পড়ল আদিলের মুখের সামনে। আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল কপালে। তারপর লম্বা নাকে। অবশেষে ঠোঁটে। আঙুলের ডগা দিয়ে গাল ছুঁয়ে দেখল। শরীরটা তখনো কাঁপছে রোযার। আরেকটু হলেই বুঝি আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত সে। এত ভয় কেন পেল? কেন মনে হলো, এই মানুষটার কিছু হয়ে গেলে তার নিজের ভেতরটাও বুঝি থেমে যাবে? রোযা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। এই পুরুষ যে তার অস্তিত্বজুড়ে বসে গেছে। তার পৃথিবীর শুরু আর শেষ দুটোই এখানে সীমাবদ্ধ।
বিছানার হেডবোর্ডের সাথে পিঠ এলিয়ে বসা আদিল মনোযোগ সহ দেখল রোযাকে। চোখমুখ ফুলে আছে। সম্ভবত সারারাত ঘুমায়নি। কেঁদেছে বেশ! ভালোভাবে আদিলের চোখে তাকাচ্ছে না। সারাসকাল তাকে এড়িয়েছে। কাছে আসছে না, কথা বলছে না, বসছে না পাশে। একপর্যায়ে স্যুপটা খাইয়ে মুখ মুছিয়ে রোযা সরতে চাইলে আদিল অন্য হাতে টেনে ধরল। সূর্যের ঝলমলে আলো প্রবেশ করছে। রোযার সুন্দর চোখমুখ কেমন চকচক করছে এতে। আদিল তাকে টেনে বুকের ওপর ফেলতেই রোযা চমকে তাকাল –
‘ব্যথা পাবেন!’
আদিল গ্রাহ্য করল না সেদিক। রোযাকে বুকে নিয়ে চোখমুখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এড়াচ্ছো কেনো? তোমর এড়ানো এই ক্ষ তর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক।’
রোযা কিছু বলল না। ছলছল চোখে চেয়ে থাকল শুধু। পরপরই ভীষণ ধীরে মাথাটা রাখল শ ক্ত বুকে। বলল না মনের কথা গুলো। অথচ আদিলের স্বীকারোক্তি তার অস্তিত্ব মিইয়ে দিলো –
‘তোমার প্রেম যেমন আমায় পুড়িয়ে দেয়, তেমনি তোমার এড়ানো আমার অস্তিত্ব ঝলসে দেয়। জানো তো তুমি!’
রোযা মাথা তুলে তাকাল চোখ দুটোতে। মাথাটা বাড়িয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল আচমকা। আদিল চোখ বুজল স্বস্তিতে। রোযাকে বুকের ভাঁজে নিয়ে আওড়াল –
‘ইফ ইউ কিপ অ্যাভয়ডিং মি, ইউ’ল ড্রাইভ মি ইনসেইন।’
রোযা শান্ত হয়েছে। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে হুকুম ছুড়ল –
‘কোথাও যেতে পারবেন না। এই অবস্থায় কোনো কাজকর্ম করা যাবে না।’
আদিল বেশ বাধ্য। মাথা দোলাল। বলল, ‘আচ্ছা, ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও।’
রোযা হতবিহ্বল হলো। তাজ্জব হয়ে আওড়াল, ‘কেনো?’
‘হানিমুনে যাব। মালদ্বীপ। সব রেডি, রাতে বের হব।’
কিংকর্তব্যবিমুঢ় রোযা। কখন কী করল মানুষটা? অথচ এই খবর শুনে হৃদির উচ্ছ্বাসে পুরো বাড়ি ঝলমল করে উঠল। তার হাসির ধ্বনি ভেসে বেড়াল পুরো বাড়ি জুড়ে। নিজের ল্যাগেজ সে নিজেই গোছাল নূরজাহানকে নিয়ে। অগত্যা রোযাকেও বাধ্য করা হলো। নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রোযা হৃদিকে তৈরি করে নিজেও তৈরি হয়েছে। হৃদি পরেছে বাবার মতো সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট। রোযা নীল সিল্কের শাড়ি পরেছে। আদিলের হেলিকপ্টার করে প্রথমে এয়ারপোর্ট, তারপর এয়ারপোর্ট থেকে তার নিজস্ব প্রাইভেট জেট করে মালদ্বীপ পৌঁছাবে। মালদ্বীপে ইতোমধ্যে তার প্রাইভেট লাক্সারি ইয়ট গুছিয়ে রাখা আছে। মালদ্বীপের নীল সাগরে ভাসবে। সেই যাত্রাপথ শুরু হলো রাত বারোটায়, শেষ হলো ভোর পাঁচটায়। আকাশের বুকে ততক্ষণে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা মিলেছে নীল সাগরের বিশাল স্রোত।
আকাশযাত্রার পর প্রাইভেট জেট মালদ্বীপের মাটিতে অবতারণ করল। ভি-আইপি দিয়ে বেরিয়ে নির্দিষ্ট পথে মারিনার দিকে এগিয়ে গেল। পুরোটা সময় আদিল মেয়েকে অক্ষত বাহুতে নিয়ে রেখেছিল। ক্ষতওয়ালা হাতের রোযার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় রেখেছিল ভীষণ অধিকার বোধের সাথে। তাদের পেছনে শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুব সহ রাফিনও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামনে খুলে গেল বিশাল নীল সমুদ্র। মারিনার শেষ প্রান্তে নোঙর করা ছিল তাদের প্রাইভেট লাক্সারি ইয়ট। সাদা-কালো রঙের বিশাল বিলাসবহুল ইয়টটি রোদের আলোয় ঝলমল করছিল। একাধিক ডেক, কাচে ঘেরা বিলাসবহুল কেবিন আর খোলা আকাশের নিচে প্রশস্ত উপার ডেক, পুরো জাহাজটাই ভীষণ রাজকীয়।
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬১
রোযা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সব। স্বপ্নের মতন লাগছিল সবটা। ছুটে এসে দাঁড়াল রেলিং ঘেঁষে। বাতাসের তীব্রতায় উড়ছিল তার চুল, শাড়ির আঁচল। প্রাণ ভরে শ্বাস টেনে নিলো সে। রোযা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সবটা। পৃথিবী এতো সুন্দর? এতো? তখুনি অনুভব করল উপস্থিতির। আদিল এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। কোলে হৃদি। বাচ্চাটা প্রাণখোলা হেসে কিচিরমিচির করছে। আদিল ফাঁকা হাতটায় রোযার কোমর জড়িয়ে নিয়েছে। জোরপূর্বক নিজের দিকে টেনে এনে আওড়াল –
‘কাছে যাওয়া যাবে না। এখান থেকে দেখো।’
