Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৬
সুরভী আক্তার

সদর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো রৌদ্র । চকিতে তাকালেন শাহিনা কাবির ‌। মেঘা তাকায় আলগোছে । পরক্ষনে ভেজা চোখ লুকিয়ে নামিয়ে নেয় ।
রৌদ্র এসে রমনীর পাশে দাঁড়ায় । কাঁধ জড়িয়ে ঝুঁকে একবিংশীর ভেজা ভেজা মুখ পানে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে….
” কাঁদছো কেনো ? কাঁদবে না একদম ।
মনি, ওকে বকছো কেনো তুমি ? ওর কি দোষ ?
” দোষ দেই নি আমি ওকে ! দোষ ওর ভাইয়ের । ওকে ভালো ভেবেছিলাম আমরা । ছেলের মতো খাতির যত্ন করেছি যতবার এসেছে । এ দুটো তো অনাথ । দেখলেই মায়া লাগে । মা তো আমি । মায়া দিয়ে ভালোবেসেছি । ইয়াশ কেও ছেলের মতো ভেবেছি । কিন্তু ও কি করলো ? আমাদের পিঠেই ছুরি মারলো ? আমার মেয়েটাকে কি করেছে কে……

” বিয়ে করেছে ও তোমার মেয়েকে !
ভদ্রমহিলার কথা শেষ হওয়ার আগেই রৌদ্র তাড়া দিয়ে উচ্চারণ করে বসে । থমকান ভদ্রমহিলা । সাথে উপস্থিত বাকিরাও । মেঘা চোখ তুলে তাকালো বিস্ময়ে । শাহিনা কাবির দাঁড়িয়ে যান দূর্বল পায়ে ভর করে । জানতে চান অস্ফুটে…….
” কি বললি তুই ?
” হ্যাঁ মনি । ইয়াশ টুকটুকি কে বিয়ে করেছে আজ । ওদের বিয়ে হয়েছে । খারাপ কিছু হয়নি তোমার মেয়ের সাথে ।
ঝটকা খেয়ে যেভাবে দাঁড়িয়েছিলেন , সেভাবেই ঝটকা খুইয়ে ধপ করে বসে পড়লেন শাহিনা কাবির ।
বাকশক্তি হারালেন তিনি । সবার আগে চোখের সামনে ভেসে উঠলো সায়ান নামক ছেলেটার স্নিগ্ধ শান্ত মুখাবয়ব টুকু । কি হবে সে ছেলের ?

মেঘার তাজ্জব চেহারা দেখে রৌদ্র উপর নিচ মাথা নাড়ায় । বাড়ির সবাইকে ডেকে জানিয়ে দেয় ইয়াশ আর টুকটুকির বিয়ের কথা । ইয়াশ নিজে জানিয়েছে রৌদ্র কে । মুখে নয় , সোজাসুজি কাবিন নামার ছবি পাঠিয়েছে । সেখানে আলাদাভাবে বিয়ের সময়টাও উল্লেখ করা । ক্যালিফোর্নিয়ার সময় অনুযায়ী রাত এগারোটা বেজে ঊন পঞ্চাশ মিনিট তখন । তারিখটা চব্বিশ ফেব্রুয়ারি । রৌদ্র কাবিনের ছবিটাও দেখায় সবাইকে ।
যেখানে স্পষ্ট দুজনের সাক্ষর জ্বল জ্বল করছে ।
থম মেরে বসে আছেন বাড়ির সকলে । একদিক থেকে ভাবতে গেলে তাদের মেয়ের সাথে খারাপ কিছু হয়নি । বিয়ে হয়েছে হালাল ভাবে । অন্যদিক থেকে ভাবতে গেলে , এটা তো গোটাটাই খারাপ হলো । সায়ানের সাথেও খারাপ হলো । কারোর মুখে কথা নেই ।
লিভিং রুমের স্তব্ধতা কাটলো চিকন রিনরিনে স্বরে……
” খালামনি , আমি চলে যাচ্ছি ।
ধীরে চাইলেন রুবিনা কাবির ‌। ল্যাগেজ ধরে সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে সারা ‌। ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা খানিক মিষ্টি হাসি । রুবিনা কাবির বাড়ির এমন পরিস্থিতিতে ওকে আটকাতে চাইলেন না । কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন……

” আবার আসিস । কেমন ? বাড়ির অবস্থা স্বাভাবিক হোক একটু । একা যেতে পারবি ? আদ্র কে পাঠাবো সাথে ?
” লাগবে না খালামনি । আমি যেতে পারবো । ক্যাব বুক করেছি ।
” আচ্ছা । যা তাহলে । গিয়ে ফোন করবি কিন্তু !
মিষ্টি হাসলো সারা । আর কারোর কাছের বিদায় নিলো না । চোখ নামিয়ে পথ ঘুরলো । তাকালো না কোনো দিকে । নিস্তেজ পদ যুগলে ধাপ বাড়িয়ে সোজা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসলো । সদর পেরোতেই টান পড়লো হাতে । মেয়েটা সচকিতে পিছু ফেরে । মেঘা কে দেখে হাসি টানে ওষ্ঠপূটে । মেঘা ভরাট চোখে তাকিয়ে বলে ধরা গলায়…..
” চলে যাচ্ছিস, আমাকে একবারও বললি না যে ?
” ওও,,, খেয়ালেই ছিলো না । আসি হ্যাঁ ? ভালো থাকিস !
” সারা !
” কিছু বলবি ?
মেয়েটা কি ভীষণ যন্ত্রণা নিয়ে হাসছে । মেঘা অবাক হয় । চোখ বেয়ে টুপটাপ পানি গড়ায় । শক্ত করে জাপটে ধরে সারাকে । ফুঁপিয়ে ওঠে শব্দ করে ।
সারা হাসে রমনীর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে । কাঁপে তার চিবুক । হাত উঠিয়ে মেঘার পিঠে ঠেকিয়ে বলে…..
” কাঁদছিস কেনো পাগল ?
” আ’ম সরি সারা । ভাইয়ার হয়ে ভীষণ সরি । ভাইয়া কাজটা মোটেও ঠিক করে নি । দেখিস আমি খুব করে বকে দেবো ওকে ।
” লাভ নেই মেঘা ।
মেঘা ছাড়লো ওকে । মুখোমুখি হলো । দেখলো ব্যাথায় জর্জরিত হাসি হাসি মুখখানা । কষ্ট চাপা ফিকে হাসি । চোখাচোখি হতেই হাসি প্রগাঢ় করলো সারা । মেঘা বিষ্ময়ে ওকে ঝাকালো দুহাতে,, বললো জড়িয়ে আসা গলায়…..

” এইই , কি হয়েছে তোর ? পাগল হয়ে গেছিস তুই ? হাসছিস কেনো এভাবে ?
” ওমা, হাসবো না ? কাঁদতে বলছিস আমায় ? কেঁদে কি হবে ? পাবো তাকে ? কাঁদলে বুঝি পাওয়া যায় মনের মানুষকে ? যদি পাওয়া যেতো , তাহলে কাঁদতাম । বিশ্বাস কর , গগন কাঁপিয়ে কাঁদতাম তাকে পাওয়ার জন্য ।
মেঘা বধির বনে চেয়ে রয় ভেজা চোখে । সারা কাঁদছে এ বেলায় । চোখ ফেটে নোনা পানি নেমেছে । লালচে অক্ষিপটের আর্দ্র কিনার । ইয়াশের সাথে শাফাহ্’র বিয়ের খবর শোনার পর থেকে এতক্ষণ অবধি ঘরে ছিলো । কেঁদেছে এতক্ষণ, সন্দেহ নেই এতে । এখন কান্না লুকিয়ে হাসছে অস্বাভাবিক । কষ্ট বুকে,, তবুও ঠোঁটে হাসি । সে চটপট চোখ মুছে নিলো । হাসলো শব্দ করে । ধেয়ে আসা কান্না চেপে বললো এক রাশ ব্যাথা নিয়ে…..
” তোর ভাইয়ার বউ কিন্তু খুব সুন্দর মেঘা । ততটা সুন্দর , যতটা সুন্দর হলে তোর ভাইয়া তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে । আমি বোধহয় অতটা সুন্দর ছিলাম না , তাই না ? আরেকটু সুন্দর হওয়া প্রয়োজন ছিলো বোধহয় । চেহারা না , নসিবের কথা বলছি । যে নসিবে সে নেই, সে নসিব আর সুন্দর হলো কই ?
জানিস, মুখ ফসকে তোর ভাইয়ার বউকে দেখতে চেয়েছিলাম সেদিন । আর উনি আমাকে ওনার বউ দেখিয়েই ছাড়লেন । এদিকে আমি হতভাগীর স্বপ্ন ছিলো তার বউ হওয়ার । তার বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে তার বউয়ের জায়গায় দেখলাম অন্য কাউকে ।

ভাঙলো আমার স্বপ্নটা । গুড়িয়ে গেলো…হেরে গেলাম আমি, মেঘা ।
ফুঁপিয়ে ওঠে সারা । ধরা বাধা কষ্ট ফাটল চিরে বেরিয়ে আসে । হাঁটু কাঁপে তার । সোজা হয়ে দাঁড়ানো দায় হয়ে পড়ে । মেঘা ঠোঁট কামড়ে সামলায় নিজেকে । সারাকে কিছু বলার ভাষা নেই তার । কি বলবে সে ?
সারা ঝট করে নিজেকে সামলে নিলো । ছাড়লো মেঘাকে । হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে দু কদম পিছিয়ে গেলো । হাসলো । বললো ঝটপট…..
” বাইরে ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে । আসলাম ।
পাল্টা মেঘার কিছু বলার অপেক্ষা করলো না সে । এক প্রকার ছুটলো । দৌড়ে গেইট পেরোলো । মেঘাও ডাকলো না ওকে ।

সারা তড়িঘড়ি করে ক্যাবে উঠে বসে । লোকেশন দেওয়া আগে থেকেই । গাড়ি ছাড়লো । জানালা ঘেঁষে বসতেই দমকা হাওয়া লাগলো চোখে মুখে । মেয়েটা শত চেষ্টাতেও নিজেকে ধাতস্থ করতে পারলো না আর । হউমাউ করে কেঁদে উঠলো । আকস্মিক কান্নার আওয়াজে ভড়কালেন গাড়ির ড্রাইভার । তড়িঘড়ি করে ব্রেক কষলেন তিনি । মধ্যবয়স্ক হবেন । পিছু ফিরলেন । সারা কে ওভাবে মাথা চেপে ধরে কাঁদতে দেখে ধড়ফড়ে গলায় বললেন….
” ম্যাম , আপনি কাঁদছেন কেনো ? ঠিক আছেন ?
সারা ধ্যানে ফেরে । মুখ চেপে ধরে দুহাতে । দম বন্ধ লাগে তার । বুক চিরে যায় অসহনীয় যন্ত্রণায় । এ কেমন কষ্ট ! সামলানো যাচ্ছে না যে ! মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার । সে ফিকড়ে উঠলো । দম টেনে সামাল দিলো অবাধ্য নিজেকে । বললো থেমে থেমে…..

” কি–ছু–না…….
ড্রাইভার লোকটা হাসলেন । হয়তো বুঝতে পারলেন কিছু । তিন অক্ষরের একটা শব্দ উচ্চারণ করতে তিনবার থেমেছে এই মেয়ে । অথচ বলছে কিছুনা । তিনি ঘাঁটলেন না । ড্রাইভিংয়ে মনযোগ দিলেন । ক্ষণে ক্ষণে রমনীর ফোঁপানির শব্দ শুনে মুখ খুললেন এক পর্যায়ে……
” কান্না চেপে নিজেকে কষ্ট দিতে নেই, মা । কেঁদে মন হালকা করতে হয় । কষ্ট পেয়েছো কিছু নিয়ে ?
সারা জানালার কাছে মাথা এলিয়ে রাখে । চোখ বুজে ভারী শ্বাস ফেলে বলে….
” যে আমার নয়, তার জন্য কেনো কষ্ট হয় আঙ্কেল ?
” কারন যে তোমার, সে তোমাকে কষ্ট পেতে দেবে না কখনো । জীবন কি শুধু সুখে চলে নাকি ? কষ্ট তো আছেই জীবনের কোন এক যাত্রায় । যে তোমার নয় , তার থেকেই তুমি সেই কষ্ট টা পাবে । তবেই না সুখের মর্ম বুঝবে । চিনবে সেই জনাকে, যে তোমার ।
সারা মাথা কাত করে মৃদু হাসলো চোখে পানি সমেত । বিড়বিড় করলো…..
” আমি আমার সেই জনাকে চিনতে ভুল করেছি তাহলে । দোষ তো আমারই । সেতো আমার ছিলোই না । আমি ভেবেছি তাকে নিজের । বছরের পর বছর ধরে আমি তাকে ফাওও ভালোবেসে এসেছি । অথচ জন্মের পঞ্চাশ হাজার বছর আগে থেকেই সে হয়ে আছে অন্য কারোর । সেতো আগেই অন্য কাউকে বেছে নিয়েছে । পাগল আমি, অন্যের সঙ্গীকে মন দিয়ে বসেছি । এ মন ফেরানো যে বড্ড যন্ত্রনার ‌। যন্ত্রণা চিরছে আমায়, পুড়ছে, দগ্ধ করে মারছে ।

রাত তখন দশটা…
কাবির ম্যানসনের চকচকে স্বচ্ছ মার্বেলের মেঝেতে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে সায়ান । খানিক আগে শুভ্র সহ ফিরলো এ বাড়িতে । সেই সেদিন সন্ধার পর এই কেবল তাদের দর্শন মিললো । ছেলেটার পড়নে এখনো একি পোশাক । সেদিন নীল রঙের একটা শার্ট পড়ে এসেছিল । এখনো সেটাই পড়নে । অথচ মাঝে কেটেছে গোটা একটা দিন, একটা রাত, আর দুটো সন্ধা । এখন আরেক রাতের প্রথম প্রহরের মধ্যভাগ । পার্থক্য ,,, ছেলেটা পরিপাটি ছিলো সেদিন সন্ধ্যায় ‌, আর আজ এ রাতে একেবারেই অগোছালো ‌। এলোমেলো কোনো পাগলের থেকে কম নয় । শাফাহ্’র নিখোঁজের খবর ছিলো তার কাছে । সে কেবলই জানতো শাফাহ্ ইয়াশের কাছে । এখন এ বাড়িতে এসে আরো জানলো, শাফাহ্’র সাথে ইতোমধ্যে ইয়াশের বিয়ে হয়ে গেছে । শুভ্রও জানতো না । এসেই জানলো । কাল থেকে সায়ান কে সামলাতে বড্ড হিমশিম খাচ্ছে সে । কোনো কিছুতে খবর রাখেনি আর ।
আজ কোনো রকমে ওকে এ বাড়িতে এনে ফেলেছে । তাও মুখোমুখি হলো আরেক কঠিন সত্যের । যা তার বন্ধুকে পুরোপুরি ভেঙ্গে দিতে যথেষ্ট ।
খবরটা শোনা মাত্রই ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে সায়ান । দূর্বল শরীর তার । কথা বলার শক্তিও নেই বিন্দুমাত্র । শুভ্রও আর সামলালো না ওকে । পাশে বসলো একই ভঙ্গিতে । ড্রইং রুমে বাড়ির সবাই উপস্থিত । মেহের গিয়ে ভাইয়াকে ডাকলো কাঁপা গলায় । শুনলো না তার ভাই । তৌসিফ কাবির ডাকলেন……

” সায়ান,, ওঠো । রুমে গিয়ে রেস্ট করো । রাত হয়েছে অনেক ।
চোখ তুলে চায় যুবক ‌। শান্ত শুকনো দৃষ্টি তার । বলে….
” আপনার মনে আছে আঙ্কেল,,, আপনি অনেক বছর আগে একবার আমায় কথা দিয়েছিলেন , যে সঠিক সময় আসলে শাফাহ্ কে আমার হাতে তুলে দেবেন ! মনে নেই ? সঠিক সময় কি এসেছে তবে ? সঠিক সময় এসে আমাকে ব্যাঠিক প্রমান করে দিয়ে চলে গেলো ? শাফাহ্ আমার হাতে আসলো না কেনো আঙ্কেল ? আমি সঠিক নই ? নাকি সময় আসেনি এখনো ! অপেক্ষা করবো আরো ?
অবুঝের মতো প্রশ্নাত্মক চাহনি তার । বাক্যগুলো তীরের ন্যায় বিধলো তৌসিফ কাবিরের হৃদয়ে । চোখ বুজে নিলেন তিনি…..

” তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন সায়ান ।
” উঁহু , আমার শাফাহ্ কে প্রয়োজন ! এনে দিন না ওকে ।
” ঘরে যাও !
” শাফাহ্ কে এনে দিন ।
” ও নেই !
” আমিও নাই হয়ে যাবো তাহলে ।
শুভ্র ভড়কে গিয়ে পাশ থেকে ধমকায় চড়া গলায়……
” সায়ান,, মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর ? কি সব বলছিস ?
” যা শুনছিস তাই ! শাফাহ্ কে এনে দে আমার কাছে !
রৌদ্র বসে ছিলো থ বনে । উঠলো সে । ধীরে এক হাঁটু মুড়ে সায়ানের সামনে অগ্রসর হলো । কাঁধে হাত রেখে ভেজা গলায় বললো……

” টুকটুকি’র বিয়ে হয়ে গেছে ভাইয়া । ইয়াশ ওকে বিয়ে করেছে । বুঝতে পারছো তুমি ?
সায়ান ঝট করে দৃষ্টি তুললো । অগ্নি দৃষ্টি তার । চোয়াল খিচে আসলো নিমিষেই । তেঁতে বললো মাড়ি খিচে…….
” চুপপ,,, শাফাহ্’র বিয়ে আমার সাথে হবে । কারন আমি ভালোবাসি ওকে । বাঁচবো না আমি ওকে ছাড়া । কোনো বিয়ে মানি না আমি । ও শুধু আমার ।
” তোমার নেই আর । ও এখন অন্য কারোর বউ ।
” রুডি চুপপপ,, তোর উপর হাত উঠে যাবে নয়তো । শাফাহ্ শুধু আমার, বুঝলি ? আর কারোর হতে পারে না ও । ঐ ছেলেটা ওকে জোর করে বিয়ে করেছে । কোনো মূল্য নেই এই বিয়ের ।
কথা টুকু বলেই দুদিকে মাথা ঝাঁকালো সে ‌। দুচোখ হতে দুফোঁটা পানি ছিটকে পড়লো মেঝেতে । সে তৌসিফ কাবিরের দিকে তাকায় । হামাগুড়ি দিয়ে তেড়ে যায় তার কাছে । ভদ্রলোক তখনো নিস্তেজ হয়ে সোফায় বসে আছেন । দৃষ্টি নত দগ্ধ ব্যাথা আর অনুশোচনায় । সায়ানের দিকে তাকাতে পারলেন না তিনি ।
সায়ান আকস্মিক তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে । দু’হাতে জাপটে ধরে কেঁদে ওঠে হু হু করে । ভড়কান তৌসিফ কাবির । নড়তে পারেন না । ছেলেটা রুদ্ধ জবান চিরে চিৎকার দিয়ে বলে……

” আঙ্কেল,,, আপনি শাফাহ্ কে আমার কাছে এনে দিন, যে করেই হোক । আমি কোনো বিয়ে মানি না । যাই হোক না কেনো, শাফাহ্ শুধু আমার । আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না আঙ্কেল । প্লিজ ওকে আমার করে দিন । আপনি তো জানেন, আমি ওকে ভালোবাসি । অনেক বছর ধরে ভালোবাসি । তাহলে কেনো আমি আসার আগ পর্যন্ত আগলে রাখলেন না ওকে ? কেনো হারাতে দিলেন ? কেনো ওকে আমার হতে দিলেন না ? আমি তো চাই ওকে । বলেছিলাম তো আমি আসবো, আমি আসার আগে ও কোথায় চলে গেলো ? ওকে এনে দিন প্লিজ । আমি বাঁচবো না ওকে ছাড়া ।
” সায়ান, কি করছো ? পা ছাড়ো আমার !
” নাআআ , ছাড়বো না আমি । আমি শাফাহ্ কে না পেলে সত্যি সত্যিই মরে যাবো আঙ্কেল । আমাকে মারতে চান আপনারা ?

উপস্থিত সকলের চোখ ভিজে আসে ছেলেটার এমন আহাজারিতে । সবাই সায়ানকে খুব নরম-সভ্য আর শান্ত ছেলে হিসেবেই চেনে । জানে শাফাহ্’র প্রতি তার অনুভুতি । কিন্তু এই অনুভুতি টা যে এতোটা গভীর , তা বোধহয় কেউ আন্দাজ করতেও পারেন নি । স্বচোক্ষে মূর্ত বনে দেখছেন এখন । ছেলেটা কাঁদছে । হাল বেহাল তার । কথা বেরোচ্ছে না যেনো গলা দিয়ে ।
মেহের একপাশে দাঁড়িয়ে । ওরনার কোণে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ভাইয়ার এমন পাগলামো দেখে ।
শুভ্র উঠে গেলো । টেনে হিচড়ে সরালো সায়ানকে । ঐ ছেলের এমন পাগলামী দেখে ঝাঁজিয়ে উঠলো এ বেলায়……
” এইইই , কি হয়েছে তোর ? সেদিন থেকে তোর এমন পাগলামী, উল্টো পাল্টা কথা সহ্য করছি আমি । কি পেয়েছিস তুই আমাদের ? আমার বোন ও ! বোন হারিয়েছে আমার, এ বাড়ির মেয়ে হারিয়েছে, আমরা করছি এমন ? তাহলে তুই কেনো এমন করছিস ?

” ও তোর বোন হতে পারে, কিন্তু আমার জান ও । বুঝলি ? আমার বেঁচে থাকার কারন ও ! সেটাই হারিয়েছে, হয়েছে অন্য কারোর , বাঁচবো কি করে আমি ?
শুভ্র ছেড়ে দিলো ওকে ।
পিছিয়ে এসে মাথা চেপে ধরলো রাগে ।
সায়ানের নড়বড়ে হাঁটু । দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ । ধপ করে পড়ে যায় মেঝেতে । আওড়ায় ঠোঁট কাঁপিয়ে…

” আমি তো ওকে ভালোবেসেছিলাম । সবাই জানতো । কেবল ওইই জানলো না । বোকাটা বুঝলো না আমায় !লোকে বলে ভালোবাসা নাকি গোপনেই সুন্দর ! সত্যিই বুঝি ? আমার বেলায় অসুন্দর হলো কেনো তাহলে ? আমিও তো ওকে গোপনেই ভালোবাসতাম , তাহলে পরিনতি সুন্দর হলো না কেনো ? হারালাম কেনো ওকে আমি ? আমার গোপন ভালোবাসার ফল এতো নিষ্ঠুর হলো কি করে ? গোপন ভালোবাসাকে আপন করার আগে হারিয়ে ফেললাম কেনো ? এখন যে আমার কষ্ট হচ্ছে ! ফেটে যাচ্ছে বুক । ওকে না পেলে বাঁচবো কি করে আমি….?
মেঘা আর দাঁড়াতে পারলো না এখানে ‌।
ছুটলো সিঁড়ি বেয়ে । আদ্র এগোয় সায়ানের দিকে ।
” ভাইয়া,,, পাগলামো করছো তুমি ! শান্ত হও আগে ।
” আর কি শান্ত হবো আদ্র ?
শাফাহ্’র সাথে কথা হয়েছে তোদের ? আমি কথা বলবো ওর সাথে । একটা বার কথা বলাতে পারবি…?

ঘরে এসে মেঘা লাগাতার ইয়াশের ফোনে কল লাগিয়ে যাচ্ছে । সায়ানের অমন অবস্থা দেখে হাঁসফাঁস করছে একবিংশী । শ্বাস কমে আসছে বুকে । একপাশে সায়ানের হাহাকার , অন্যপাশে সারার নীরব যন্ত্রণা । দুটোতেই পিষ্ট হচ্ছে মেঘা । যথেষ্ট বুঝতে পারছে সে । ভাইয়ের করা এক অবান্তর কর্মের ফল স্বরূপ ভুগতে হচ্ছে পুরো পরিবার সহ দুটো নিষ্পাপ প্রেমিক হৃদয়কে । কি দোষ ছিলো সায়ানের ? সারার বা কি দোষ ছিলো ? আর শাফাহ্, আসল তো সে । ওরই বা কি দোষ ? ইয়াশ কেনো করলো এমন ? কেনো জড়ালো শাফাহ্ কে ! মেঘা মানতে পারছে না এখনো । অবিশ্বাস্য লাগছে সবটা ‌।
রিং হচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করছে না ইয়াশ ‌। বাড়ি থেকেও শাফাহ্’র খোঁজে অনেক বার ফোন করা হয়েছে । ধরেনি ।
পুরো ঘরে এপাশ ওপাশ পায়চারি করতে করতে কমপক্ষে দশবার ডায়াল করলো । তবুও রিসিভ হলো না । বিব্রত মেঘা । চোখ থেকে অনার্গল পানি গড়াচ্ছে । নাক টানছে ক্ষনে ক্ষনে । ক্রোধে হাতের ফোনটা বিছানার দিকে ছুড়ে মারলো এবার । দু’হাতে মুখ ঢেকে বিছানার এক পাশে বসলো ধপ করে ।
রৌদ্র এসেছে পিছু পিছু । দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ পরখ করছিলো মেয়েটাকে ‌। এবার পা বাড়িয়ে সামনে আসলো,, ডাকলো মৃদু স্বরে….

” ইভারা !
মেঘা হাত সরিয়ে চোখ তুললো ।
তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো । চোখ মুছে হাত বাড়িয়ে চাইলো…..
” আপনার ফোন,,, ফোন দিন !
” কি করবে ?
” দিন আগে !
রৌদ্র বিনা বাক্যে পকেট থেকে ফোন বের করে রমনীর হাতে তুলে নিলো । মেয়েটা রৌদ্রের ফোন থেকে কাঁপা হাতে ইয়াশের নাম্বারে কল লাগায় । এ যাত্রায় ফোন বন্ধ দেখায় । রমনীর নরম চোয়াল ক্রোধে শক্ত হলো এবার । তীব্র ক্ষোভে হাতের ফোনটা সর্বশক্তিতে সজোরে ছুড়ে মারলো কোনো এক দিকে । সেকেন্ডের মাথায় বিকট শব্দ হলো । দেয়ালের সাথে সপাটে বারি খেয়ে ফোনটা নিমিষেই ভাঙলো বোধহয় । মুচড়ে জর্জরিত হলো । রৌদ্র চমকায় । ফোনের উদ্বেগ ছেড়ে একবিংশীর পানে সম্পুর্ন মনযোগ দেয় । দু বাহু টেনে কাছে এনে বলে…..

” ইভারা,, কি হয়েছে তোমার ? রাগছো কেনো ?
মেয়েটা এগিয়ে রৌদ্রের বুকের কাছে কপাল ঠেকালো । উচ্চতায় তার কপাল বরাবরই লোকটার বুকের কাছে মেশে । এবারও তাই । সে বললো ক্রন্দনরত ভেজা স্বরে…..
” এটা হতে পারে না, রৌদ্র । ভাইয়া কে ক্ষমা করবো না আমি । কিছুতেই না । সবকিছুর জন্য দায়ী ও ! সারা কে কাঁদিয়েছে ও । সায়ান ভাইয়াও কষ্ট পাচ্ছে ওর জন্যই । সব ভাইয়ার দোষ ‌। ও কাজটা মোটেও ভালো করে নি । মোটেও না । এরজন্য জবাবদিহি করতে হবে ওকে । কেনো এমন করলো সে ?
রৌদ্র হাত তুলে রমনীর মাথায় রাখে । শ্বাস ফেলে বলে…..
” যা হওয়ার, তা হয়েছে । কেঁদে লাভ নেই ।
” আমার কান্নায় কিছু যায় আসে না, রৌদ্র । কিন্তু সায়ান ভাইয়া , ওনার তো কষ্ট হচ্ছে, তাই না ?
” বুঝতে পারছো ওর কষ্ট ?
” দেখতে পারছি ।
ভাইয়াকে এর জন্য কোনো দিন ক্ষমা করবো না আমি ।

” উঁহু, দোষারোপ করো না জান ।
তোমার ভাইয়ার কষ্ট দেখোনি তুমি । সেও এমন ভাবেই কেঁদেছিলো হয়তো ।
লাস্ট দুবাক্য বিড়বিড় করলো । অতঃপর আবার বললো….
” টুকটুকি ওর জন্য একদম পারফেক্ট হবে ।
মেঘা মাথা তোলে ……
” কি বলছেন এসব ? এদিকে সায়ান ভাইয়া কষ্ট পাচ্ছে ।
” জানি । সায়ান ভাইয়াও বড্ড দেরি করে ফেলেছে । এটাই হওয়ার ছিলো । টুকটুকি ওর কখনো ছিলোই না । নিজের জিনিস যথা সময়ে নিজের নামে দাখিল করতে হয় । নয়তো পস্তাতে হয় । ভাগ্যিস তোমায় দাখিল করে নিয়েছিলাম ।

ক্যালিফোর্নিয়ায় তখন দুপুর বারোটা ।
সফেট রঙা তুলতুলে বিছানার মাঝে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে শাফাহ্ । ঘুমোচ্ছে বেঘোরে । নড়চড় নেই । ভারী শ্বাসে ওঠানামা করছে বুক খানি ।
পড়নে তখনো লাল জামদানি । এলোমেলো হয়ে গেছে ঘুমের ঘোরে । হাত পা এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে মেয়েটার । পাতলা দেহ খানা নিথর পুরো ।
এলোমেলো মাথার চুল ।
ঘুম হালকা হচ্ছে সময়ের ব্যবধানে । নড়চড় মিলছে খানিক । একেই ঘুম কাতুরে সে ‌। তার উপর কাল ঘুমোতে ঘুমোতে প্রায় তিনটে বেজেছে । এখনো পূর্ণ হয় নি ঘুম । এদিকে পেট খিদেয় চুইচুই । খাওয়া হয় নি বহুক্ষণ । মেয়েটা খচখচ করে উঠলো । বাড়লো নড়চড় । তখনো নেত্র পল্লব চিপকে আছে । টেনেও খোলা দায় ।
লাগাতার ঢোক গিললো শাফাহ্ । খিদের চোটে বিরক্ত হয়ে বেখেয়ালে ডাক পাড়লো চোখ বন্ধ রেখেই…..
” আম্মু,,, খিদে পেয়েছে আমার । খেতে দাও…..
থামলো । ধ্যান নেই তখনো । সাঁড়া না পেয়ে উঠে বসলো ধীরে সুস্থে । নেভানো চোখ জোড়া খুললো টেনে টুনে । ডাকতে গেলো……
” আম্মু ……
আশপাশ নিভু নজরে পড়তেই অকস্মাৎ থেমে গেলো মেয়েটা । ধক্ করে উঠলো তার বক্ষস্থল । আধো চোখ জোড়া মেলে আসলো তড়াক করে ।
ধ্যান ফিরলো । ঘোর ভাঙলো । চোখ গোল গোল হয়ে গেলো মেয়েটার । সে তো বাড়িতে নেই । আছে এক অজানায় । আম্মু নেই এখানে । সে নেই মায়ের কাছে ‌। ডাকলে তো সাড়া পাওয়া যাবে না । মেয়েটার নরম হৃদয় কেঁপে ওঠে ।

মুখশ্রীতে উদ্বেগ জাগে না খুব একটা । ধীরে দৃষ্টি নামায় । চোখ ফেরায় নিজের দিকে । তার পড়নের শাড়ি এলোমেলো । নিজেকে এমন বেগতিক অবস্থায় দেখে আঁতকে উঠলো আবার । তড়িঘড়ি করে শাড়ি ঠিক করলো । তাকালো এপাশ ওপাশ । ঘর ফাঁকা । কেউ নেই কোথাও । শুষ্ক ঢোক গেলে শাফাহ্ । ছাদের একপাশের স্বচ্ছ কাঁচ ভেদে দিনের আলো এসে পড়েছে ঘরের প্রতিটা কোণে । এতক্ষণে সাদা আলো চোখে পড়লো তার । উজ্জ্বল লাগছে চারপাশ ‌। ঘরটা এতক্ষণে ভালোমতো অবলোকন করলো ‌। টুকটাক জিনিস আছে ।
শাফাহ্ আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করলো না খুব একটা । মুখ তুলে কাঁচ ছাপিয়ে পাখির চোখে খোলা আকাশের দিকে তাকালো । ঘরটা রাতের মতো আর ভয়ঙ্কর লাগছে না । বেশ স্বাভাবিক লাগছে ।
সে ধীরে খাট থেকে নামে । দরজা ঠেলে বাইরে বেরোয় । অবিলম্বে চোখ জোড়া বৃহৎ হয়ে আসে তার । লিভিং রুমের ছাদ গোটাটাই স্বচ্ছ কাঁচের । ঝকঝক করছে পুরো । সূর্যরশ্মির তীর্যক আলো ঠিকরে আছড়ে পড়েছে কাঁচের উপর । ঝিকঝিক করছে গোটা বাড়ি । রাতের অন্ধকারে ভয় পেলেও এখন আর ভয় লাগলো না । যদিও গোটা বাড়িতে কারোর উপস্থিতির লেশমাত্র নেই । শূণশান পুরো পেন্টহাউস ।
শাফাহ্ ধীরে ধীরে কদম এগোয় । ডাকে এপাশ ওপাশ নজর ফেলে…..

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৫

” আ… আপনি কোথায় ? খিদে পেয়েছে আমার ?
কেউ নেই । সাঁড়া নেই কারোর ।
শাফাহ্ পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ঘুরে দেখলো । ইয়াশ কে না পেয়ে ঘরে গেলো । ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে নিচে নামলো আবার । খিদে সয় না পেটে । কিচেনে ঢুকে ফ্রিজ ঘাঁটতেই এক বাটি কাস্টার্ড পেলো সে । কোনো দিকে ধ্যান না দিয়ে খুশি মনে সেটা নিয়ে বসে পড়লো খেতে ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here