Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩
jannatul firdaus mithila

“ ডু ইউ ওয়ান্ট আ গুড মর্নিং কিস দেড়ব্যাটারী?”
লজ্জার রক্তিম আভায় মুহুর্তেই লাজুক মায়াবিনীর গালদুটি কেমন রাঙা হয়ে উঠল। ত্রস্ত আঁখিজোড়া নত করতে না করতেই, আচমকা বেপরোয়া হাওয়ার বেগে তার কোমল তুলতুলে অধরযুগলের ওপর ঝুঁকে পড়ল রূঢ় মানব। প্রগাঢ় অধিকারবোধে বিনাবাক্যে আঁকড়ে ধরল রমণীর কম্পিত ওষ্ঠপুট! নিজ রুক্ষ অধরযুগলের এক অনভ্যস্ত স্পর্শের আকস্মিকতায় অপ্রস্তুত করে দিলো ভীত রমণীর সমস্ত সত্তাকে। বেহায়া লোকের এরূপ অবাধ্য পরশে কর্পূরের ন্যায় পুড়ছে মাহি। ক্ষুদ্র বদনের অদৃশ্য ঝংকারে বারংবার ডানা ঝাঁপটাচ্ছে পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রজাপতিগুলো। আবেশের বদলে ভীত-সন্ত্রস্ততায় কুঁচকে গিয়েছে তার হরিণী চোখদুটো। রমণী স্থির! প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গিয়েছে তার ঘর্মাক্ত হাতপা। ওদিকে বেপরোয়া যুবক নিজ উন্মত্ততায় লিপ্ত। একহাতে যানের কন্ট্রোলার টেনে রাখা তার, অন্যহাত অবাধ্যের ন্যায় বিচরণ চালাচ্ছে রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমরে। ক্ষনে ক্ষনে দুলে উঠছে মাহি। তা রূঢ় মানবের রুক্ষ অধরযুগলের সিক্ত আবেশে, না-কি বান্দার বেহায়া হাতের পরশে, তা কে জানে!
সময়ের উর্ধ্বগতিতে হাসফাস বেড়ে গেল মাহি’র। গভীর চুম্বনের দৃঢ়তায় নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় বেচারির, তক্ষুনি দু’হাতে ঠেলতে লাগলো বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষভাঁজ। অন্যদিকে, নিজ প্রসন্ন কাজে হুটহাট বাধবিঘ্নে বড্ড বিরক্ত হলো মুগ্ধ। ত্বরিত গোছালো কপাল! ওষ্ঠপুটের কার্যক্রম অব্যহত রেখে পর্দা সরালো চোখের। দৃষ্টিতে একরাশ তীক্ষ্ণতা লেপ্টে পরপরই ঘন-ভ্রুযুগলের ইশারায় মানবীকে জিজ্ঞেস করল,

“ কি সমস্যা?”
বোকা মানবী উত্তর দিতে অপারগ। নিশ্বাস জুড়িয়ে আসার কষ্টে নিজ সিক্ত অধরযুগল রূঢ় মানবের আগ্রাসী ওষ্ঠপুটের বাঁধন হতে খানিক মুক্ত করতে চাইলেই বাঁধল আরেক বিপত্তি! বেয়াদব লোকটা তৎক্ষনাৎ ধারালো দাঁতের রুষ্টতায় পিষ্ট করে দিলো মানবীর নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুট। মুহুর্তেই তীব্র ব্যথায় গুঙিয়ে ওঠে মাহি। বেভুলার ন্যায় দু’হাতের তীক্ষ্ণ নখরের ডগাগুলো সঙ্গে সঙ্গে দাবিয়ে দিলো মুগ্ধের লোমহীন অর্ধউম্মুক্ত ফর্সা বক্ষে। তবে কান্ড দেখো! এতে পাহাড়সম লোকটার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। সে কেবল ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে মেয়েটার পানে। এতক্ষণ যাবত ধীরলয়ে মানবীর অধরজোড়ায় কর্তৃত্ব চালালেও এবার বড্ড রুক্ষ হলো রূঢ় মানবের পরশ। তা আর সইতে না পেরে তৎক্ষনাৎ গুঙিয়ে ওঠে মাহি,
“ উমমমম! উমমম।”
বিরক্তির শেষ নেই মুগ্ধের! মেয়েটার ওমন তীব্র বাধবিঘ্নে প্রসন্ন মনবিবাগে এক পশলা রাগের ঝাঁঝ লেপ্টে গেল তার। তক্ষুনি বিচ্ছিন্ন করল অধর যুগল। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, নিজ টকটকে বাদামী সিক্ত অধরজোড়ায় খানিক জিভের ডগা চালিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ম’রে যাচ্ছিলি বেয়াদব? একটুখানি চুমুতেই ম’রে যাচ্ছিলি? আমায় না রাগালে শান্তি হয় না তোর তা-ই না?”
দু’হাত বুকের কাছে আঁটকে রেখে হাঁপাচ্ছে মাহি, টানছে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস! রূঢ় মানবের ওমন কিড়মিড় কন্ঠে আপাতত কিচ্ছু যায় আসে না তার। সে কেমন রয়েসয়ে ঢোক গিলে থেমে থেমে আওড়াল,
“ আরেকটু হলেই মে’রে দিচ্ছিলেন! এভাবে কেউ চুমু দেয়? এটাকে চুমু বললে নির্ঘাত চুমুকে অপমান করা হবে।”
সহসা কপালের ভাঁজ গাঢ় করল মুগ্ধ। দৃঢ় চোয়ালে নামালো বেশ খানিকটা তীক্ষ্ণতা। সুদর্শন মুখখানা মানবীর মুখের ওপর আরেকটু ঝুঁকিয়ে এনে গমগমে গলায় শুধালো,
“ তুই মনে হচ্ছে বেশ বড়ো মাপের চুমু স্পেশালিষ্ট হয়ে গিয়েছিস! তা..এতো পেঁকেছিস কবে থেকে শুনি?”
নতদৃষ্টিযুগলের ভারে অবনত হলো রমণীর নরম ঘাড়ের পেশী। ঘর্মাক্ত হাতের তালু দ্বয় একে-অপরের সনে বড্ড ঘষে যাচ্ছে সে। ধীরলয়ে যুবকের কোল থেকে উঠে যাবার প্রয়াস চালাতেই আচমকা দু’হাতে রমণীর পাতলা কোমর আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ। শক্ত মুখাবয়বে রাগের ছাপ ফুটিয়ে, কন্ঠে ঝাঁঝ লেপ্টে শুধালো,

“ হাউ ডেয়ার ইউ সিগনোরা!”
এরূপ বাক্যে কেঁপে ওঠে মাহি। তক্ষুনি বিভ্রান্তি নিয়ে তাকায় সুদর্শনের পানে। হতবিহ্বলের ন্যায় আওড়ায়,
“ আবার কি করলাম?”
“ তোকে আমি কোল থেকে উঠে যাবার অনুমতি দিয়েছি?”
আকাশ থেকে টপকালো মাহি। গাল বাঁকায় পরক্ষণে। চোখেমুখে বড্ড অতিষ্ঠ ভাবাবেগ ফুটিয়ে, অস্ফুটস্বরে আওড়াল,
“ কোল থেকে উঠতে গেলেও অনুমতি লাগবে? ইশশ্! কি বাজে দিনকাল এলো আমার।”
রমণীর অস্ফুটকন্ঠ! হেলিকপ্টারের তীব্র গর্জনের বিপরীতে যা কর্নধার হলো না রূঢ় মানবের। সে কেমন শক্ত চোয়ালে কটমট শব্দ তুললো খানিক। মাহি’র পানে কিয়তক্ষন চোখ পাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই দৃষ্টি ঠেকালো অদূরে। মেঘেদের রাজ্যে উড়ছে তার হেলিকপ্টার! কি সুন্দর স্মুদলি চলছে আকাশপথে। তবে এ যেন সহ্য হলো না বেপরোয়া, পাগলাটে মানবের। মুহুর্তেই তার চোখেমুখে নেমে এলো এক অদ্ভুত দুঃসাহসিকতার রেশ। আকাশপথে শান্ত পায়রার ন্যায় উড়তে থাকা আকাশযানটি পরমুহূর্তেই পাগলাটে রূঢ় মানবের খেলনা রূপে আবির্ভূত হলো। ডানহাতের কন্ট্রোল স্টিকে সামান্য চাপ দিতেই হেলিকপ্টারটি কেমন দ্রুততার সঙ্গে ওপরে উঠে গেল। সহসা ধ্বক করে উঠল রমণীর অন্তঃকোণ। হুটহাট বেগতিক টানে সম্মুখে হেলে পড়ল তার ক্ষুদ্র বদন, তা গিয়ে ঠাঁই পেলো মুগ্ধের রুক্ষ বক্ষে। রমণী ভীত-সন্ত্রস্ত কন্ঠে তক্ষুনি আওড়াল,

“ বিস্ট!”
কন্ঠটা বেশ শুনলো মুগ্ধ। ডানহাতের কন্ট্রোল স্টিকে ফের টান বসিয়ে, জিভ ঠেললো গালের ভাঁজে। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে আওড়ে উঠল,
“ ইয়েস হটি!”
আতঙ্কে দু’হাত দিয়ে রূঢ় মানবের বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরেছে মাহি। ভয়ে কুঁচকে নিয়েছে দু-চোখ। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুধালো,
“ আস্তে চালান বিস্ট!”
তৎক্ষনাৎ অধর কামড়ে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। আকাশের দিকে চেয়ে থেকে, দুষ্ট কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ ওহ ফা’ক অফ বিউটি! ওসব উফফ! থামুন, আস্তে-ধীরে নামক শব্দ এখনো আমার ডিকশিনারিতে এখনো। যা এসেছে তার আগাগোড়ায় কেবল রাফনেস ভরপুর! তা… দেখবি না-কি একটু?”
ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ মাহি’র! অথচ লোকটার বেলাল্লাপনায় কমতি নেই একরত্তি। ভয়ার্ত মানবী তৎক্ষনাৎ প্রাণভয়ে মুখ লুকলো মুগ্ধের বক্ষভাঁজে। দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ অসভ্যতামি বন্ধ করুন।”
এহেন বাক্যের অভিঘাতে সহসা কন্ট্রোল স্টিক হতে দু’হাত সরিয়ে আনে মুগ্ধ। উঁচিয়ে রাখে কাঁধের সন্নিকটে! মুখাবয়বে নির্বিকার ভাবস্রোত বজায় রেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধায়,
“ ওকে ফাইন! বন্ধ করলাম।”

হেলিকপ্টারটা এবার বড্ড এলোমেলো ভঙ্গিতে দুলছে। এ যেন মাঝি ছাড়া নৌকা! বোকা মানবী বুঝলো না এরূপ কান্ডের কারণ। সে কেমন অবোধের ন্যায় ধীরেসুস্থে মুখ উঠালো মুগ্ধের বক্ষভাগ হতে। পরমুহূর্তে যে-ই দেখল — মুগ্ধ হেলিকপ্টার উড়ানো রেখে দু’হাত উঠিয়ে বসে আছে, ওমনি দেহ খাঁচা হতে পরাণ পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবার উপক্রম বেচারির। বিস্ময়ে চোখ ছুঁলো কপাল। একমুহূর্ত হতভম্বতায় কাটাতেই পরক্ষণে রমণীর স্থির মস্তিষ্কে টনক নড়ল। অস্থিরতা জেঁকে ধরল তাকে। তৎক্ষনাৎ দু’হাতে মুগ্ধের বাহুদ্বয় চেপে ধরে দিকবিদিকশুন্য কন্ঠে আওড়াল,
“ ওরেএএএ! পাগললল। কি করছেন আপনি এসব? আমাকে মে-রে ফেলার হলে মাটিতেই মা’রতেন, শুধু শুধু ঢং করে আকাশে আনলেন কেনো? আরেহ! পাগলের সর্দার, হেলিকপ্টার উড়াতে না জানলে মুখ উঠিয়ে পাইলট ছাড়াই চলে এলেন কেনো? ওহ আল্লাহ রে! কোন পাগলের সঙ্গে আমি চলে এলাম খোদা। বড্ড ভুল করে ফেলেছি, ইয়া মাবুদ! আমার ঘাট হয়েছে এই পাগলের সাথে এসে। বেঁচে থাকলে আর কোনোদিন এই পাগলের সাথে আসবো না কোথাও। আর না! এই পাগল, এক্ষুনি হেলিকপ্টার উড়াবেন, নাকি আমার থোবড়াই দেখতে থাকবেন? কোনটা?”
হতভম্ব মুগ্ধ! বোকা মানবীর এ কোন রূপ দেখছে সে। মেয়েটা কি এই সামান্য ভয়ে পাগল হয়ে গেলো? মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ বলিষ্ঠ হাতদুটো নামিয়ে এনে কোমর আঁকড়ে ধরল রমণীর। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ভয় পাচ্ছিস?”
কাঁপছে মাহি! সেই সঙ্গে দুলছে তার ক্ষুদ্র বদন। কম্পিত কণ্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ পাবো না বলছেন? এক্ষুণি কন্ট্রোলার টানুন। নয়তো দু’জনেরই পটল তোলার সময় হয়ে যাবে।”
ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত মৃদু হাসির টান বসলো মুগ্ধের। দৃষ্টিতে নামলো প্রগাঢ়তা। অস্থির রমণীর ক্ষুদ্র মাথাটা এদিক-ওদিক নড়ছে বড্ড। এই সুযোগে সে আলতো করে দুটো আঙুল ছোঁয়ালো রমণীর তুলতুলে চিবুকে। মুহুর্তেই অনড় হলো মাহি’র ঘাড়ের পেশী। ব্যাকুলতা ছাপিয়ে ভয়াতুর দৃষ্টিযুগল গিয়ে ঠেকল সুদর্শনের মুখপানে। তন্মধ্যে রূঢ় মানব কেমন ভনিতাহীন কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে,
“ এতো চিন্তা কিসের বেইব? ম-রলে তুই থোড়াই একা একা মরবি, তোর সঙ্গে কোম্পানি দেবার জন্য আমিওতো আছি। ম’রলে দু’জন একসঙ্গে ম*রব, বাঁচলেও সারাজীবন একসঙ্গে বাঁচব। কেমন?”
হুট করেই রমণীর সকল অস্থিরতা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রশান্তিতে ভরে গেল সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। অজান্তেই একপ্রকার বাধ্যতায় ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো বোকা মানবী। তা দেখে আলতো হাসলো মুগ্ধ। মুখটা সামান্য এগিয়ে এনে আলগোছে অধর ছোঁয়ালো মাহি’র মসৃণ ললাটে। হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ জাস্ট হোল্ড মি টাইটলি চাশমিস! আই’ম গনা শো ইউ সামথিং ট্রুলি অ্যাডভেঞ্চারাস।”
প্রশান্তির জালে আঁটকে আছে মাহি। গভীর আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, দু’হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরল লোকটাকে। মাথা ঠেকালো মুগ্ধের বুকের ঠিক বাঁদিকে। ঠিক তখনি বাহাতের কন্ট্রোল স্টিকে জোরালো টান বসায় মুগ্ধ। মুহূর্তেই হেলিকপ্টারটি একদিকে তীব্রভাবে কাত হয়ে বাঁক নিলো। ভয়াতুর রমণীর দু’হাতের বাঁধন তৎক্ষনাৎ শক্ত হলো যেন। ভয়ে খিঁচে নিলো চোখমুখ। এরইমধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ভরাট কন্ঠ!
“ আই’ম হিয়ার!”
শুনলো মাহি! বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে সামলানোর প্রয়াস চালালো বারকয়েক। কিছুদূর এগোতেই হেলিকপ্টারটির তলদেশে দেখা মিললো বিস্তীর্ণ সমুদ্রের। নীল জলের বুকের ওপর সাদা ফেনার রেখা, দূরে পাহাড়ের সারি! ভয়ে রূঢ় মানবের বুকে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা মায়াবিনী হুট করেই আড়দৃষ্টে সেথায় তাকালো একবার। ওমনি বিমুগ্ধতায় ছেয়ে গেল তার অন্তঃকোণ। মুগ্ধ কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,

“ মাশাআল্লাহ! কি সুন্দর!”
বাক্যদুয়েক বেশ কর্নধার হলো রূঢ় মানবের। সন্দিগ্ধতায় কুঁচকালো কপাল। রমণীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ ডু ইউ লাইক ইট বেইব?”
বিমুগ্ধতায় ডুবন্ত মাহি, তৎক্ষনাৎ ওপর নিচ নাড়ালো মাথা। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই রূঢ় মানব গতি টানলো উল্টো। বড্ড দক্ষ কৌশলে কন্ট্রোল স্টিক নাড়িয়ে হেলিকপ্টারটা নামিয়ে দিলো আরও নিচুতে। সমুদ্রের জল হতে হেলিকপ্টারের দুরত্ব এবার হাতেগোনা মাত্র। মায়াবিনী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো জানালার পানে। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীলাভ পানিতে থইথই করছে নাম না জানা অজস্র সামুদ্রিক প্রাণী। কি সুন্দর দেখতে তাদের! যে দৃশ্যের অপূর্বতায় একমুহূর্ত দিনদুনিয়া ভুলে গেল মাহি। মুগ্ধ এবার বেশ ধীরে ধীরে উড়াঁচ্ছে আকাশযানটি। সামনেই পাহাড়ের সারি। হেলিকপ্টারটি পাহাড়ের অভিমুখে এসে পৌঁছাতেই মুগ্ধ হঠাৎ হেলিকপ্টারটিকে দ্রুত ওপরে তুলে নিলো। এহেন কান্ডে যারপরনাই আঁতকে উঠে মাহি। নিঃশ্বাস আঁটকে গেল তার গলার কাছে। তড়িঘড়ি করে দুহাতে খামচে ধরল সুদর্শনের বলিষ্ঠ বুক। এতক্ষণের স্নিগ্ধ অনুভূতিতে এক পশলা ভয়ের বৃষ্টি এসে ঝপঝপিয়ে পড়তেই, প্রায় কেঁদে ফেলার ভং ধরল মাহি। আওড়াল,

“ আপনি একটু স্বাভাবিকভাবে হেলিকপ্টারটা চালাতে পারেন না?”
বাদামী ঠোঁটের কোণে আচমকা একখানা প্রশস্ত হাসির দেখা মিললো রূঢ় মানবের। কন্ঠে নামলো ভারিক্কি ভাবস্রোত!
“স্বাভাবিকভাবে চালালে তুই থোড়াই অ্যাডভেঞ্চারের টেস্ট পাবি! আমি চাই, আজকের এই জার্নিটা তোর সবসময় মনে থাকুক। অন্তত গালি দেবার জন্য হলেও মনে থাকুক। ”
না চাইতেও ফিক করে হেসে দিলো মাহি। আলতো স্বরে শুধালো,
“ ভাবছি, আপনার অ্যাডভেঞ্চারের চক্করে আমার প্রাণটাই না বের হয়ে যায়!”
সহসা কপাল গোছালো মুগ্ধ। দৃঢ় হলো চোয়াল,
“ এতো সহজে?”
মাহি প্রতুত্তর করলো না। বরং ধীরলয়ে ছেড়ে দিলো রূঢ় মানবকে। ঘাড়ের পেশী কুঁচকে আলগোছে চোখ তুলে তাকায় পরক্ষণে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেশ টেনে শুধালো,
“ হেভ ইউ ডান মিঃ বিস্ট? আমি কি এবার নিজের সিটে বসে এডভেঞ্চারটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারি?”
তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের বাদামী চোখদুটোর দৃষ্টি। গমগমে গলায় বলে উঠল,

“ আমাকে ছেড়ে দিলে ভয় লাগবে না?”
মৃদু হাসিটুকু প্রশস্ত হলো মাহি’র। ধীরে ধীরে মুগ্ধের কোল থেকে উঠতে উঠতে আওড়াল,
“ ছেড়ে দেবো? তাও আপনাকে? এতবড় সাধ্যি আপনি থোড়াই দিবেন আমায়! পরে না আমার ক্ষুদ্র প্রাণটা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়।”
বোকা মানবীর এরূপ উত্তরে দাম্ভিকতার অদৃশ্য স্তম্ভ আরেকটু উঁচু হলো মুগ্ধের। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো বাঁকা হাসির রেশ। তৎক্ষনাৎ হাস্কি স্বরে বলে উঠল,
“ যাক, দেরি হলেও বুঝেছিস।”

প্রায় বেশকিছুক্ষণ ধরে প্রশান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে মাহি। যার পুরোটা দায়ভার গিয়ে পড়ে রূঢ় মানবের ওপর। এখন মাথার ওপর থেকে এডভেঞ্চারের ভূত নেমেছে তাঁর। তাইতো স্বস্তিতে বাইরের দৃশ্যে মনোযোগী রমণী। কিছুটা পথ পাড়ি দিতেই আচানক ভ্রু-যুগল কুঁচকে এলো তার। যেই দেখল — আকাশপথের অর্ধেকটা বিভাজন হয়ে গিয়েছে অন্ধকার অতলে, আর বাকি অর্ধেকটা দিনের প্রকাশ্য আলোয় জ্বলজ্বল করছে। তাদের হেলিকপ্টার এগোচ্ছে অন্ধকার পথে। যেথায় মনে হচ্ছে রাত নেমেছে। বোকা মানবী চিনলো না সে পথ, চিনলো না জায়গার নাম। কৌতুহলের বশে হুট করেই জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ ওদিকে কি রাত নেমেছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি বিস্ট?”
মুগ্ধ নির্বিকার! দক্ষ হাতে টানছে কন্ট্রোল স্টিক। পা বসে আছে প্যাডেলে। মানবী ঘাড় বাকিয়ে তাকালো একবার। লোকটাকে ওমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে ফের উৎসুক কন্ঠে শুধালো,
“ বলুন না! এটা কোন জায়গা?”
“ আলবেনিয়া!”
মুগ্ধের ছোট প্রতুত্তর। তা শুনেই কেমন উৎফুল্লতার সাথে লাফিয়ে উঠল মাহি। বড্ড প্রসন্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ সিরিয়াসলি? আমরা আলবেনিয়া যাচ্ছি? জানেন? আমি একটা বইয়ে পেয়েছিলাম — পৃথিবীর অন্যতম নির্জন আইল্যান্ড এই আলবেনিয়াতে রয়েছে। কয়েক বছর আগে না-কি ভূমধ্যসাগরে প্রকাণ্ড ভুমিকম্প হওয়ায় এখানে নতুন একটা দ্বীপ হয়েছে। কোন এক জৈনক প্রকৃতিপ্রেমী পুরো দ্বীপটাই কিনে নিয়েছিল। নামকরণ করেছিল নিজের মতো করে। পত্রিকাতেও এসেছিল তো। আমিতো প্রচুর ম্যাগাজিন ঘাটতাম। নামটা পড়েছিলাম একবার। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না, কি যেন নামটা….”

“ M-M আইল্যান্ড!”
রমণীর কথার পিঠে হুট করেই গম্ভীর প্রতুত্তর ছুড়ঁল রূঢ় মানব। তা কর্নধার হতেই আচানক ঘাড় বাঁকায় মাহি। হতবিহ্বলের ন্যায় বলে ওঠে,
“ ইয়েস! ইউ আর রাইট। M-M আইল্যান্ড। এ-ও শুনেছিলাম, তিনি না-কি তার জীবনে থাকা একমাত্র নারীর জন্য দ্বীপটা কিনেছেন। শেষ বয়সে এখানেই বাকিটা জীবন কাটাবেন বলে বসে আছেন। কত্তো সুন্দর চিন্তাভাবনা তাই না?”
গম্ভীর মানব নির্বিকার! কেবল তাকিয়ে আছে অদূরে। খানিকবাদে হুট করেই জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ তোর পছন্দ হয়েছে?”
ভড়কায় মাহি। অবোধ্য স্বরে পরপরই শুধায়,
“ মানে? কী পছন্দ হওয়ার কথা বললেন?”
এপর্যায়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তা তার। যা সহজেই ভেদ করে দিলো রমণীর নরম হৃদয়টা। ধ্বক করে উঠল বুকের ভেতরটা। মাহি চাইলো চোখ সরাতে। তবে কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে আঁটকা পড়েছে সে। মুগ্ধ তখন গাঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ এই যে! শেষ বয়সে একসঙ্গে নিজেদের আলাদা একটা দুনিয়ায় থাকার চিন্তাভাবনাটা।”
ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ ফুটলো মাহি’র। অজান্তেই লাজুকলতা ঝুঁকালো নিজ নেত্রদ্বয়। লাজুক হেসে অস্ফুটে আওড়াল,

“ তা ভালো লেগেছে বৈকি! তবে আমার ভালো লাগা, বা না লাগায় কি আসে যায়?”
“ যাকে ছাড়া একমুহূর্তও কাটবে না, তার কিছু না লাগায় চলবে?”
অবোধ মাহি! আজ রূঢ় মানবের সবগুলো কথা মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে তার। ত্বরিত চোখ তুলে বোধগম্যহীনের আওড়াল,
“ বুঝিনি!”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মুগ্ধ। ফের ঘাড় সোজা করে তাকালো সম্মুখে। বাহাতে কন্ট্রোল স্টিক চেপে রেখে, ডানহাত আলগোছে উঠিয়ে আনলো নিজ পরনের শার্টের গায়ে। একে একে ব্যস্ত হাতে সবগুলো বোতাম খুলতে খুলতে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আরেকটু পরেই সব বুঝে যাবি।”
রূঢ় মানব কি বললো তা কর্ণকুহরে পৌঁছাল না মাহি’র। কেননা তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকেছে মুগ্ধের ব্যস্ত হাতের পানে। লোকটাকে ওমন বলাকওয়া ছাড়া পরনের শার্ট খুলতে দেখে শুকনো ঢোক গিলে মাহি। ত্রস্ত দু’হাতে সিট আঁকড়ে ভয়ার্ত কন্ঠে শুধালো,

“ একি! হেলিকপ্টার উড়ানো রেখে আপনি ওমন করে শার্ট খুলছেন কেনো?”
বাঁকা হাসলো মুগ্ধ! ত্বরিত ঘাড় বাকিঁয়ে বড্ড গভীর দৃষ্টিতে তাকালো মাহি’র পানে। চোখ দিয়ে আপাদমস্তক গিলে ফেলা যাকে বলে। রমণী ভড়কায় এসবে। মুগ্ধ ততক্ষণে অধর কামড়ে দেখে যাচ্ছে মানবীকে। হুট করেই মেয়েটাকে আরেকটু চমকে দিতে বলে ওঠে,
“ হ্যান্ডসাম বডি হলে এই এক জ্বালা বুঝলি! যখন-তখন চড়ুই দেখলে গরম বেড়ে যায়। উফফ! কি গরম। আয়, আয়, কাছে আয়! একটু বাতাস কর।”
বলেই একহাতে শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে দিলো মুগ্ধ। উম্মুক্ত করলো নিজ পেটানো আকর্ষণীয় বদন। সেদিকে চোখ পরতেই মাহি’র বেহায়া চোখদুটো যেন আঠার ন্যায় বসে গেল। তা আড়দৃষ্টে বেশ পরোখ করলো মুগ্ধ। সে কেমন বাঁকা হেসে একহাতে আচানক আঁকড়ে ধরল রমণীর ডান উরু। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল মাহি’র। মুগ্ধতার রেশ কেটে গেল নয়ন থেকে। কুঞ্চিত দৃষ্টিতে মুগ্ধের পানে তাকাতেই দেখে — মুগ্ধ কেমন অধর কামড়ে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে গিলে খাচ্ছে তাকে। তৎক্ষনাৎ নাক ফোলায় মাহি। ঝাঁঝিয়ে বলে,
“ চোখ সরান নির্লজ্জ লোক! আকাশ এদিকে নয়, ওদিকে! ওমন কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কি দেখছেন আপনি? আপনার মতলব তো ঠিক মনে হচ্ছে না।”

অধর কামড়ে রেখেই বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মানবীর উরু বরাবর চেপে রাখা রুক্ষ হাতটা আচানক বেপরোয়া ছন্দে পরশ লেপ্টাতে লাগলো গভীরভাবে। বোকা মানবী কেঁপে ওঠে এহেন স্পর্শে। এরইমধ্যে মুগ্ধ কেমন হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার’স ওয়ে দেড়ব্যাটারী! আমার মতলব ভালো ছিলোই বা কবে? তাছাড়া তোকে দেখলে আমার মতলব এমনিতেও খারাপ হয়ে যায়। শুধু একবার কাছে এসে দেখ, ঠিক কতকিছু করি।”
ভয়ে কাঁপছে মাহি। তবুও কন্ঠায় ঝাঁঝের শেষ নেই।
“ সামনে তাকান বেহায়া লোক। হাতে কন্ট্রোলার টানুন তাড়াতাড়ি।”
মুগ্ধ নিস্পৃহ! হুট করেই তার নিশ্বাসের ওঠানামার গতি বড্ড জোরালো হলো। শুধালো,
“ হাতে নাহয় কন্ট্রোলার টানবো তবে…তোকে দেখে যে বহুকিছুতে কন্ট্রোল হারাচ্ছি, তার কী হবে?”
“ হেলিকপ্টার উড়ানো বাদ দিয়ে বসে বসে রঙ্গতামাশা করছেন?”
কথাটা শেষ হবার পূর্বেই বুঝি মুখগহ্বরে কথা সাজিয়ে বসে আছে রূঢ় মানব। ফটাফট শক্তহাতের আলতো থাবায় রমণীর চুলের গোছা খামচে ধরে টেনে আনলো তার ক্ষুদ্র মাথাটা। হাস্কি স্বরে বলে উঠল,
“ রঙ্গতামাশার দেখলিই বা কী? কোলে আয় এন্ড গিভ মি আ কিস, নয়তো বসে বসে দেখ — কিভাবে হেলিকপ্টার ক্র্যাশ হয়।”

আঁতকে উঠে মাহি! সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
“ আপনি কি পাগল?”
“ কিস মি দেড়ব্যাটারী!”
নাক-মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। চুলের গোছা ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থেকে আওড়ায়,
“ ছাড়ুন আমায়।”
এবারে প্যাডেল থেকেও পা সরিয়ে আনে মুগ্ধ। অন্যহাত উঠিয়ে আনলো মেয়েটার তুলতুলে গাল বরাবর। চোখেমুখে কেমন দিশাহীন ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে আওড়াল,
“ যা বলবি তা-ই করব! সব করব। বাট নাউ…গিভ মি আ কিস চাশমিস। আ’ম ক্র্যাভিং ফর ইউ’র লিপস সো ব্যাডলি।”
অতিষ্ঠ মাহি। না চাইতেও তাকালো লোকটার মুখপানে। ধীরলয়ে শুধালো,
“ জ্বালিয়ে ছাড়লেন আপনি আমাকে।”
হাসলো মুগ্ধ। বৃদ্ধা আঙুলে রমণীর তুলতুলে অধরযুগল স্লাইড করতে করতে শুধালো,
“ পোড়াই যদি হয় তোর ভাগ্য, তবে তোকে পোড়ানোর একমাত্র দায়ভার কেবল আমার হাতেই পড়ুক। আই প্রমিজ, তোকে জ্বালানোর ক্ষেত্রে আমি একটুও কার্পণ্য করবো না। উঁহু! একটুও না।”

হলদেটে মাখনরঙা আলোয় জ্বলজ্বল করছে সুবিশাল মেহমান কক্ষটি। কক্ষের একপাশে বিছিয়ে রাখা বড়সড় রাজকীয় পালঙ্কের একপাশে গা গুটিয়ে বসে আছে নিরু। গায়ের ওপর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে একখানা মোটা ব্ল্যাঙ্কেট। বুকভাঙা আর্তনাদে কাঁদছে সে-ই গতরাত থেকে। অদূরের বাঁপাশের দেয়াল সংযুক্ত বিশালাকার জানালার অভিমুখে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। অনবরত টানছে মোটা সিগার। সুঠাম দেহ উম্মুক্ত তার, পরনে কেবল একখানা ঘিয়ে রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজার। অষ্টাদশীর বিরতিহীন কান্নায় বড্ড বিরক্ত সে। একপর্যায়ে আঙুলের ভাঁজে সিগার চেপে রেখে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো ক্রন্দনরত নিরুর পানে। চোখেমুখে এক আকাশসম বিরক্তি লেপ্টে তিক্ত কন্ঠে শুধালো,
“ এই মেয়ে এই! তোমার ফ্যাচ ফ্যাচ কান্না থামাও। আদৌও ছুঁয়েছি তোমায়? না ছুঁতেই যা শুরু করেছো, ছুঁয়ে দিলে না যেন কি করবে! চুপ করো বলছি।”

শেষটা বড্ড ধমকের স্বরে বলল এডউইন। সে-ই ধমকের অভিঘাতে কেঁপে ওঠে নিরু। বহুকষ্টে দু’হাতে নিজের মুখ চেপে আটঁকাতে চাইলো কান্নাগুলো। এতেও তেমন কাজের কাজ হলো না বোধহয়। গোঙানির শব্দ বড্ড প্রবল শোনালো এবার। এডউইন মহাবিরক্ত। তক্ষুনি ঠোঁটের ফাঁক হতে সিগারটা নামিয়ে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। অতঃপর রুক্ষ পায়ের তলায় বড্ড রুষ্টতার সনে সিগারটা পিষতে পিষতে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো নিরুর পানে। কটমট কন্ঠে আওড়াল,
“ সকাল হয়ে গেছে। আমি বের হচ্ছি ঘর থেকে! আমি চলে যাবার পর এমন একটা ভান ধরবে, যেন বোঝা যায় — লাস্ট নাইট আই স্লেপ্ট উইদ ইউ। পারলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটার ঢং করবে, আর ভুলেও যদি কারো কাছে সত্যিটা ফাঁস করেছো — দ্যান রিমেম্বার, আই উইল কি*ল ইউ। গট ইট?”
ভয়ার্ত ঢোক গিললো নিরু। ত্রস্ত ওপর নিচ ঝাঁকালো মাথাটা। গম্ভীর মুখো এডউইন এবার উল্টো ঘুরলো। গটগট পায়ে এগোলো সম্মুখের ডিভানের পানে। সেথায় পড়ে আছে তার অবহেলিত শার্ট। মানব তা উঠিয়ে এনে গায়ে জড়াতে গেলেই পেছন থেকে ভেসে এলো নিরু ভাঙা ভাঙা কন্ঠ!

“ আপনি আমাকে না ছুঁয়েও বদনাম করতে চাচ্ছেন কেনো?”
একমুহূর্ত থমকালো এডউইনের ব্যস্ত হাতদুটো। তবে সে-ই থমকানোর স্থায়িত্ব দীর্ঘ হলো না। তন্মধ্যেই গম্ভীর পুরুষ তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বড্ড অনিহা নিয়ে বলে ওঠে,
“ আমি যাকে-তাকে ছুঁই না। এডউইন স্যাবাস্টিয়ানের বেডে আসতে হলে যথেষ্ট যোগ্যতার প্রয়োজন, যার একাংশও তোমার মতো চিপকু মেয়ের নেই। সো..দ্যাটস ইট। তোমার সঙ্গে আমার একরাতের নাম জড়াচ্ছে এটাই তো তোমার সাত কপালের ভাগ্য! এরচেয়ে বেশি আর কি চাই?”
অপমানে সুশ্রী মুখখানা টকটকে লাল হয়ে গেল নিরুর। চোয়ালের পেশী হয়ে গেল শক্ত। এডউইনের জোরালো কদম দুয়ার পানে অগ্রসর হতেই নিরু কেমন ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে,
“ যেমন কৌটো, তেমন জল! যেখানে মনীবের মনের কোণে নেই বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব সেখানে তার সাগরেদের কাছ থেকে মনুষ্যত্ব আশা করা বড্ড বোকামি বৈকি!”

সহসা থমকে গেল এডউইনের ব্যস্ত কদম জোড়া। ধীরলয়ে দৈবাৎ শক্তিতে বাঁকালো ঘাড়। কিয়তক্ষন বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিরুর পানে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই গা দুলিয়ে হেসে ওঠে এডউইন। হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে থাকাও যেন দায় তার জন্য। দু’হাতে কোমর আঁকড়ে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে গিয়ে সুঠাম গা এলিয়ে বসল ডিভানের কোলে। অদূরে পালঙ্কে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা অষ্টাদশী ঘৃণায় নাকমুখ কুঁচকে নিচ্ছে। সম্মুখের ফর্সা লোকটা সুদর্শন হলেও বড্ড ভয়ানক দেখতে। দু’টো চোখ দু’ধরনের। একটা সাধারণ মানুষের মতো হলেও অপরটা ভুতের মতো সাদা। মাঝখানে কেবল কালো রঙা পিউপিল! ডানপাশের কপাল থেকে শুরু করে পুরো আড়ভাবে লোকটার মুখের ওপর বসে আছে এক গভীর ক্ষত। সে-কি বিদঘুটে রূপ তার! এই রূপ দেখেই তো ভয়ে প্রথমদিন জ্ঞান হারিয়েছিল নিরু।
এডউইনের গা দুলানো হাসিতে খানিক রুখ পড়ল এবার। হঠাৎ করেই হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে তাকালো নিরুর পানে। হুটহাট এরূপ চাহনিতে ভড়কায় নিরু। আমতা আমতা করতে যাবে তার পূর্বেই এডউইন কেমন হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ যার নামের আগে পদবী বসেছে রাক্ষসের, তার কাছ থেকে মনুষ্যত্ব আশা করা বোকামি নয়, বরং পাপ! এমনি এমনিই তো তাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত — মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার বলা হয়না। তোমার মতো লক্ষাধিক রমণী, যারা ইতোমধ্যেই রাক্ষসের কাছ থেকে মনুষ্যত্বের আশা রাখার মতো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে অকালে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছে, তা কি তুমি জানো? তুমি আদৌও জানো — রুশদী কিং ঠিক কতটা নির্দয় এবং ভয়ানক?”
হতভম্ব নিরু! প্রতিক্রিয়াহীন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে। এডউইন হাসলো। তক্ষুনি পকেট হাতড়ে আরেকটা সিগার বের করে এনে গুঁজল ঠোঁটের ফাঁকে। পরক্ষণে লাইটার ধরিয়ে লম্বা এক টান বসিয়ে ফের আওড়াল,
“ মেয়েদের গগনবিদারী চিৎকার না শুনে পেট ভরে খেতে পারেন না মাফিয়া মনস্টার। এতোদিনে তার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে অগণিত রমণী, খাবার হয়েছে তার পোষ্যদের। তা কী জানতে?”
ভয়ার্ত ঢোক গিললো নিরু। তার চোখেমুখে একরাশ অবিশ্বাস্যের ছাপ! তা দেখে কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো এডউইন। সিগারের শেষভাগে বিশাল বড়ো টান বসিয়ে আবার গমগমে গলায় বলে উঠল,

“ বাট, দেয়ার ইজ ওয়ান থিং — এতো এতো রমণীর মৃ ত্যুর পরোয়ানা জাহির করা নির্দয় মাফিয়া মনস্টার, যার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে আর কেউ বেঁচে না ফিরলেও, বেঁচে ফিরেছে কেবল একজন! হু ইজ নান আদার দ্যান দ্য কুইন অফ দা রুশদী কিংডম — রুশদী’স সিগনোরা ওরফ মাহিরা এহসান। যার হাতে একগুচ্ছ কালো গোলাপের বদলে রুশদী দিয়েছে — গোটা অন্ধকার সাম্রাজ্যের অর্ধেকটা। যার কদম তলে সোনালী আভার জুতাের বদলে ঠাঁই পেয়েছে — রুশদীর সকল অহংকার! যে এখনো অজ্ঞ — রুশদীর আসল ব্যাক্তিত্বের সম্বন্ধে। যার চোখে স্বয়ং রুশদী কিং পর্দা ফেলে রেখেছে আলগা মুখোশের। পুরো পৃথিবীর সম্মুখে হার্টলেস মাফিয়া বিস্ট ঠিক কতটা জঘন্য তা প্রকাশ পেলেও, মুনবার্ড একমাত্র ব্যক্তি যার সামনে এখন অব্দি প্রকাশ পায়নি রুশদীর আসল রূপ। যে এখনো জানে না, যার হাতদুটোকে সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সেফেস্ট প্লেস ভাবে সেই হাতে ইতোমধ্যেই লেপ্টে আছে অগণিত নর-নারীর লোহুর পরশ। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং তাই না?”
নিরু বাকরুদ্ধ! অধীর দা সত্যিই এতো জঘন্য? অবশ্য কথাগুলো অবিশ্বাস করার কোনো মানে নেই, যেখানে সে নিজেই ভুক্তভোগী। নিরু তৎক্ষনাৎ নজর ঝোঁকালো। ধীরলয়ে বলে উঠল,

“ তারমানে কী দাঁড়ায়? অধীর দা ঐ মেয়েটাকে ভালোবাসে?”
গাল বাঁকায় এডউইন! বিরক্তি প্রকাশ করে আওড়ায়,
“ ভালোবাসা? হোয়াটস দ্যাট? মনস্টার ওসব ভালোবাসা /টালোবাসায় বিশ্বাসী নয়। মুনবার্ড তো তার টক্সিক অবসেশন! যেই অবসেশনের কারণে তিনি স্বেচ্ছায় অন্য নারীদের সান্নিধ্যে যেতে চেয়েও ফিরে এসেছে।”
কথাটা বোধগম্য হলো না নিরুর। তৎক্ষনাৎ কথার পিঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ মানে? অধীর দা’য়ের নারী আসক্তি রয়েছে?”
সহসা পায়ের ওপর পা তুললো গম্ভীর পুরুষ। দু’হাত এলিয়ে দিলো ডিভানের গায়ে। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে রেখে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ যার আগাগোড়া নারী বিদ্বেষে ভরপুর, সে হবে নারী আসক্ত? নারী আসক্ত হলে সে থোড়াই মেয়েদের নিজে ভোগ না করে অন্যদের বেডে পাঠাতো! তবে….মনস্টারের সকল নিয়মে একদিন বাঁধ পড়ল। সেদিন মুনবার্ড আর সিডকে একসঙ্গে দেখে ফেলেছিলো মনস্টার। নিজের ভোগ্যবস্তুতে অন্যের নজর দেখে মাথা ঠিক ছিলো না তার। মুনবার্ডকে যেমন শাস্তি দিয়েছে, তার ঠিক দ্বিগুণ দিয়েছে অন্যদের। তাতেও রাগ কমেনি তার। তাই যখন রাত গভীর হলো….
★ অতীত ★
“ এডউইন!”
অস্থির কায়দায় পুরো ঘরময় পায়চারি চালাচ্ছেন রূঢ় মানব। ঘামছেন অনবরত! উম্মুক্ত গায়ে ঘামের ছিটেফোঁটা একেকটা মুক্তর সাদৃশ। মনীবের এক ডাকে ত্রস্ত ছুটে এলো এডউইন। বাধ্যতায় অবনত করল ঘাড়। ধীরকন্ঠে যে-ই না কিন্তু আওড়াবে তার পূর্বেই শোনা গেল রুশদী কিংয়ের হিং স্র গর্জন!
“ মেয়ে রেডি কর! আই ওয়ান্না স্লিপ উইদ সামওয়ান।”

হকচকায় এডউইন! অবিশ্বাস্যের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মেঝের পানে। কি শুনলো সে? নারী বিদ্বেষী মনস্টার নিজে বলছে মেয়ে আনার কথা? এটাও কী সম্ভব? কানে ভুল শুনলো না তো সে? এডউইনের এহেন ভাবনার ডোরে হুট করেই চিড় ধরল রূঢ় মানবের বিকট হুংকারে।
“ কি বলেছি শুনিসনি? গো এন্ড ডু ইট ফাস্ট।”
ত্বরিত মাথা নাড়ায় এডউইন। প্রাণভয়ে ছুটলো ঘরের বাইরে। পুরো করিডর জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের উদ্দেশ্যে তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“ শহরের যত সুন্দরী ভা*র্জিন রয়েছে, ওদের তুলে নিয়ে আয়। ফার্স্ট টাইম মনস্টারের নারী ক্ষুধা পেয়েছে, মেক শিওর কোনো কমতি যেন না থাকে।”
হুকুম তামিলে মত্ত হলেন সকলে। যে যেভাবে পারলো ছুটলো। এডউইনও ছুটলো পরক্ষণে। এবার নারী পাবে কোথায়? মুনবার্ড তো সেন্সলেস!

সারিবদ্ধ আকারে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত রাশিয়ান রমণী। তন্মধ্যে সুন্দরীদের শীর্ষে অবর্তীন রমণী ক্যাসেলা। যার ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যে আবির্ভূত সকলে। তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে মনস্টারের জন্য। সুন্দরীর মুখাবয়বে হাসি নেই। জোরপূর্বক তুলে আনা হয়েছে তাকে। কেমন মনমরার মতো বসে আছে মেয়েটা! পাঁচজন মেইড মিলে অপ্সরার ন্যায় সাজাচ্ছে তাকে। ঠিক তখনি কক্ষের দুয়ার ঠেলে প্রবেশ করল এডউইন। হাতে একখানা সফেদ রঙা রুমাল তার। সে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রমণীর পেছনে। হাতে থাকা রুমালটা তড়িঘড়ি করে রমণীর চোখ বরাবর বেঁধে দিতেই আঁতকে উঠে রমণী। ভয়ার্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁতে গেলেই গম্ভীর মুখো এডউইন গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ উহুম! কোনো প্রশ্ন নয়। আপনি কোনো সাধারণের বেডে যাচ্ছেন না। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, আপনাকে যার বেডে পাঠানো হচ্ছে তিনি লোকমুখে — মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার নামে পরিচিত। আশা করি, নামটা নিশ্চয়ই শুনেছেন।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬২ (২)

নাম শুনেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে ক্যাসেলা। দু’হাত জোর করে অনুনয় জুড়ে বলে,
“ নো, প্লিজ নো। প্লিজ ছেড়ে দিন আমায়। আমি মরতে চাই না।”
এডউইন বিরক্ত এসবে। কপাল কুঁচকে রমণীর চোখদুটো বেঁধে দিয়ে ফের আওড়াল,
“ নিজের সর্বোচ্চ এবং সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন মনস্টারকে প্রসন্ন করতে এবং খেয়াল রাখবেন, ভুলেও যাতে চোখ থেকে কাপড় না সরে। নয়তো কিছু হওয়ার আগেই ম*রবেন আপনি।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬৩ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here