ডেসটেনি পর্ব ৪০ (২)
সুহাসিনি মিমি
সকালের জমজমাট নাস্তার পর্বটা শেষ করেই ওরা চারজন একত্রে রওনা হলো বাজারের উদ্দেশ্য। গ্রামের স্থানীয় বাজারটা হাওলাদার বাড়ি বেশ থেকে কিছুটা দূরে। মিনিট বিশেকের পথ। ঠিক করল জিপে করে যাবে। গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল সেহরোজ। বাইরে কড়া রোদ থাকা সানগ্লাস পড়ল সকলেই।
পাশে ফ্রন্ট সিটে গিয়ে সশব্দে দরজা আটকে বসল তাজধীর। গায়ে সকালের ট্রাউজার আর টি-শার্টে। টি শার্ট এর কলারে সানগ্লাস ঝুলিয়ে গম্ভীর মুখে সিটে হেলান দিয়ে বসল সে। পেছনের খোলা সিটে হুড়মুড় করে গিয়ে উঠল অর্ণব আর ফাহিম।
গাড়ি স্টার্ট দিল সেহরোজ। কাঁচা মাটির রাস্তা ধরে এগোতে লাগল জিপটা। কয়েক গজ যেতে না যেতেই সেহরোজের মুখখানা বিরক্তিতে কালো হয়ে এলো। গ্রামের সরু, আঁকাবাঁকা কাঁচা মাটির রাস্তা। গত দুদিনের হাল্কা বৃষ্টিতে রাস্তার কয়েক জায়গায় বেশ থকথকে কাদা জমে আছে। চাকা ঘোরার সাথে সাথে মাটির চটচটে কাদা ছিটকে উঠে জিপের চকচকে কালো বডিতে আছড়ে পড়ছে। সেহরোজ ভীষণ পরিচ্ছন্নতা প্রিয় মানুষ। সকালে পানি দিয়ে ঘষে ঘষে জিপের চাকা ক্লিন করেছে সে। এখন আবার এসব ক্লিন করতে হবে। অযথা খাটনি।
সেহরোজ স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে বিরক্তিতে করে বিড়বিড় করতে লাগল,
’আনবিলিভেবল! এসব নাকি রাস্তা? গাড়ির চাকা তো দূরের কথা, স্প্রিং পর্যন্ত কাদায় লেপ্টে যাচ্ছে!’
ফাহিম বলল,
’গাড়িটা তো তুই চালাচ্ছিস সেহরোজ। চাইলে তুই রাস্তায় গাড়ি না চালিয়ে শূন্যে ভাসিয়েও নিয়ে যেতে পারিস। আমরা কেউ বারণ করব না।’
ফাহিমের কথায় আস্কারা পেয়ে বসল অর্ণব। এতক্ষন যথা কষ্টে নিজেকে আটকে রেখেছিলো। পেছন থেকে একহাতে গাড়ির রড ধরে লাফিয়ে উঠে বলল,
’তোর এই শুচিতাবায়ু রোগটা এবার একটু থামা তো ভাই! তোর গাড়ির চাকায় কাদা লেগেছে বলে কি গ্রামের কাঁচা রাস্তাগুলো রাতারাতি পিচ ঢালাই করে দেবে নাকি সরকার? একটু কাদায় না নামলে গ্রামের ফিলটা পাবি কীভাবে?’
ফাহিম হাত বাড়িয়ে অর্ণবের মাথায় চাপড় মেরে বলল,
’তুই মুখটা বন্ধ রাখবি?সকালে জুতো খেয়েও তোর শিক্ষা হয়নি?’
গাড়িটা আরেকটু এগোলো সামনে।রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত। হাঁটতে হাঁটতে মানুষজন অবাক হয়ে থেমে থেমে তাকাচ্ছে জিপের দিকে।হঠাৎ অর্ণবের চোখ আটকালো রাস্তার পাশের একটা পেয়ারা গাছে।
গাছটার কয়েকটা ডাল রাস্তার ওপর বেশ খানিকটা ঝুঁকে এসেছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে টসটসে কাঁচা পেয়ারা।অর্ণবের চোখ চকচক করে উঠল।ও ব্যাকুল হয়ে ডাকল,
‘সেহরোইজ্জা রে। একটু আস্তে চালা।’
‘কেন?’
‘জাতীয় সম্পদ দেখেছি।’
সেহরোজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই অর্ণব পেছনের সিট থেকে লাফিয়ে উঠল।
‘এই ব্যাটা!বস!’
ফাহিম হাত বাড়িয়ে ওকে টেনে বসাতে গেল। সামনে থেকে তাজধীর ধমকে উঠল,
‘কী করছিস?’
অর্ণব ততক্ষণে জিপের পাশের হাতল ধরে শরীরটা একটু ওপরে তুলেছে। জিপটা পেয়ারা গাছটার একদম নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় সে হাত বাড়িয়ে কয়েকটা পেয়ারা টেনে ছিড়ল।
‘পেয়ে গেছি!’
অর্ণব বিজয়ীর মতো হেসে সিটে বসল। শার্টের হাতায় কোনোমতে পেয়ারা দুটোকে দুই ঘষা দিয়েই বসিয়ে দিলো কামড়। মচ করে শব্দ হলো পুরো গাড়িতে!
অর্ণব পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে চিবোতে চিবোতে আরেকটা পেয়ারা ফাহিমের কোলের ওপর ফেলে দিয়ে বলল,
’একদম ফ্রেশ।সরাসরি প্রকৃতি থেকে প্লেটে!’
ফাহিম পেয়ারাটা হাতে নিয়ে ধুলো দেখে ইতস্তত করলেও অর্ণবের খাওয়ার ভঙ্গি দেখে লোভ সামলাতে পারল না। নিজের টি-শার্টে একবার পেয়ারাটা মুছে টপ করে কামড় বসাল তাতে।দুই বন্ধু তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তুলে খেতে লাগল। ড্রাইভিং সিটে বসে ফ্রন্ট মিরোরে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছিল সেহরোজ। চোখ দুটো ছানাবড়া করে স্টিয়ারিং চেপে গাড়ি থামাল ও। ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল পিছনে।
’আর ইউ গাইজ আউট অব ইয়োর ফাকিং মাইন্ড?কোনো ধোয়াধুই ছাড়া ওভাবে পেটে পুরছিস? হ্যাভ ইউ এভার হার্ড দ্য ওয়ার্ড ‘হাইজিন’? তোদের পেটে যে কত মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া ঢুকছে,কোনো ধারণা আছে?’
অর্ণব আরেক কামড় পেয়ারা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে জবাব দিলো,
’ওরে আমার কেমিক্যাল বিশেষজ্ঞ! তুই জানিস এসব কী? দিস ইজ ১০০% অর্গানিক অ্যান্ড আনটাচড ন্যাচারাল ফ্রুটস! শহরের তোদের ফরমালিন মার্কার থেকে হাজার গুণ ভালো আর পিওর হাইজেনিক জিনিস এটা!’
ফাহিম বলল,
’কথা সত্য। তোর এই অতিরিক্ত ফর্মালনেস কিন্তু একটা রোগের লক্ষণ ভাই। এসব বাদ দিয়ে একবার ট্রাই করে দেখ। অস্থির মিষ্টি কিন্তু!’
সেহরোজ শুকনো গলায় বলল,
‘গাছের ওপর পাখি বসে না?’
অর্ণব বলল,
‘বসে।’
‘পোকামাকড় থাকে না?’
‘থাকে।’
‘ধুলোবালি?’
‘থাকে।’
‘তাহলে—’
অর্ণব হাত তুলে থামিয়ে দিল।বেঙ্গ করে বলল,
‘ভাই, এত ডিটেইলসে গেলে প্রকৃতির প্রতি অবিচার হবে।আড় আমি হচ্ছি প্রকৃতির সন্তান!’
সেহরোজ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তুই যদি এখনই পেয়ারা খাওয়া বন্ধ না করিস। প্রকৃতির সন্তানকে জিপ থেকে প্রকৃতির কোলে ছুড়ে ফেলে দেব।মাইন্ড ইট!’
সেহরোজ বিরক্তিতে ফোঁসফোঁস করছে। এতক্ষন চুপ ছিল তাজধীর। এবার সেহরোজ কে শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল সে,
’ছেড়ে দে। এদের পেটে ব্যাকটেরিয়া নয়, বিষ ঢাললেও ওরা হজম করে ফেলবে। তুই বরঞ্চ ড্রাইভারে ফোকাস কর।’
সেহরোজ গাড়ি চালু করল আবার।অর্ণব এক হাতে পেয়ারা কামড়ে অন্য হাতে বাজারের কাগজটা মেলে ধরল।
‘কিরে ফাহিম! লিস্টের শুরুতে এসব কী লেখা রে ভাই?’
ফাহিম পেয়ারায় আরেকটা কামড় বসিয়ে শুধাল,
‘কী লেখা?’
’এখানে লেখা, সতেরো টা লম্বা সাইজের বাঁশ! এই সেহরইজ্জা আন্টি বাঁশ দিয়ে কি করবেন?’
ফাহিম মুখ ভর্তি পেয়ারা নিয়েই ফিক করে হেসে উঠল।ড্রাইভিং সিট থেকে সেহরোজ ধমকে উঠল,
‘তোকে ওগুলো পড়তে কে বলেছে? পেছনের পাতার লিস্ট দ্যাখ। ওটা প্যান্ডেল আর ডেকোরেশনের ফর্দ!’
অর্ণব কাগজটা উল্টে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল,
‘সুন্দর ভাবে বললেই হতো।’
‘ভাই… আমার দুধগুলা…’
রাস্তার মাঝখানে বারো-তেরো বছরের একটা ছেলে মাটিতে বসে আছে। পরনে মলিন একটা প্যান্ট আর পুরোনো শার্ট। পাশে পড়ে আছে একটা সাইকেল। সাইকেলের পেছনে বাঁধা ছিল কয়েকটা দুধের বোতল আর ছোট ছোট দুধের ক্যান। ধাক্কায় সেগুলোর প্রায় সবকটাই উল্টে গেছে।সাদা দুধ মাটির ধুলোর সঙ্গে মিশে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে আছে।
ছেলেটা দুই হাত দিয়ে মুখ মুছছে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে কান্নায়।তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে তিনটা মোটরসাইকেল। বাইকগুলোর পাশে চারজন তরুণ।
চেহারায় বেপরোয়া একটা ভাব।হাতে দুজনের জ্বলন্ত সিগারেট। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখলেই বোঝা যায়, বাকিরা তাকে একটু বেশিই গুরুত্ব দিচ্ছে।ছেলেটা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
‘কী হইছে? কান্নাকাটি করস ক্যান?’
মাটিতে বসে থাকা ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আপনি আমার সাইকেলে ধাক্কা দিছেন ভাই।’
‘আমি?তুই আমার বাইকের সামনে আইসা পড়ছিস।’
‘মিথ্যা কইয়েন না ভাই।’
‘কী কইলি?’
গর্জন তুলল মাঝের ছেলেটা। তাতে ছোটো ছেলেটা ভয় পেয়ে একটু চুপসে গেল।তবুও চোখের পানি মুছে বলল,
‘আপনিই ধাক্কা দিছেন। আমি তো আমার দুধ লইয়া বাজারে আতেছিলাম।সব দুধ পইরা গেছে। এখন বাসায় খালি হাতে গেলে আম্মা কী কইব? আব্বা খুব বকব..’
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল।কেউ এগিয়ে আসছে না।
সবাই ছেলেটার কথাই সত্যি জানে। কিন্তু মুখ খুলতে সাহস করছে না।একজন বয়স্ক লোক অবশেষে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।সাহস সঞ্চয় করে বিনীত গলায় বললেন,
‘বাবা, যা হওয়ার হইছে। ছেলেটার তো সব দুধ নষ্ট হইয়া গেছে। কিছু টাকা-পয়সা দিয়া দাও।’
মোটরসাইকেলের ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে লোকটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।উচ্চ কণ্ঠে ধমকাল,
‘আপনি মাঝখানে কথা কইবেন না চাচা।ফলাফল ভালো হইব না।’
সেহরোজ গাড়িটা বাজারের ঠিক মুখে এনে থামাল তখন। জিপটা মূল সড়কে ওঠার জন্য বাঁক নিতেই সামনে হঠাৎ একটা জটলা চোখে পড়ল।
‘ওখানে কী হয়েছে?’
পিছনে থাকা ফাহিম সামনে উঁকিঝুকি মেরে বলল,
‘মনে হচ্ছে রাস্তার মাঝে ঝামেলা।’
তাজধীর এতক্ষণ চুপচাপ সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। জটলার মাঝখানে কয়েকটা মোটরসাইকেল চোখে পড়ল ওর। চোখ খানিকটা সরু হলো তাতে। বাইকে থাকা ছেলেগুলো,ছেলেটার এই কান্না দেখে কোনো রকম অনুশোচনা তো দূরে থাক, উল্টো পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছে! হা হা করে হাসতে হাসতে একে অপরের সাথে হাত মেলাচ্ছে। এরপর একটানে বাইক নিয়ে ছুটল ওরা।
তাজধীর, সেহরোজ, অর্ণব আর ফাহিম ততক্ষণে জিপ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে ঘটতে না দেখলেও আন্দাজ করতে পারছে অনেকটা। সেহরোজ এগিয়ে গেল সেদিকে। নরম স্বরে ডাকল,
’কি হয়েছে চাচ্চু?’
কান্নায় বুক ফেটে যাওয়া ছেলেটা মুখ তুলে তাকাল। চোখ মুছতে মুছতে ও আধো-বোঁজা ফুলে থাকা চোখে সেহরোজের দিকে তাকিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
’ ওই চেয়ারম্যানের পোলা রাজীব আর তার দলবল জেনেশুনে আমার সাইকেলের ওপর বাইক তুইলা দিয়া আমার সব দুধ ফালাই দিছে! রাস্তায় সব দুধ পইরা নষ্ট হইয়া গেছে। আমি এখন খালি হাতে বাড়ি গেলে আব্বা আমারে খুব বকব।’
আশেপাশের মানুষজন ওদের কে দেখে কিছুটা মনোবল পেলেন। গ্রামে এই রকম মানুষ দেখে ভাবলেন হয়তো উনারা বড় পদের কোনো মানুষ হবে।তাই যে যার মত আগ বাড়িয়ে বলতে লাগলেন,
‘ওই চেয়ারম্যান এর পোলা রাজীব এই পুরা গ্রামটাড়ে জ্বালাইয়া মারতাসে। ছোটো থেকে বড় কেউ ছাড় পায়না ওগো হাত থেইকা। ইশ পোলাডার দুধ গুলা ইচ্ছা কইরা ফালাইয়া দিলো। ক্ষতিপূরণ চাইলাম হেইডাও দিলোনা বাবা।তয় আপনেগো তো এই এলাকায় আগে কখনো দেখি নাই!আপনাগো তো চিনলাম না! আপনারা কি এই গ্রামে নতুন আইছেন?’
সেহরোজ মৃদু হেসে নিজের পরিচয় দিল,
’না। হাওলাদার বাড়ির নাতি আমি।ইছহাঁক হাওয়ালাদার আমার নানা।’
বয়স্ক লোকটা আনন্দে আপ্লুত হয়ে বললেন,
‘ওমা তুমি আমাগো সুমির পোলাডা না? সরকারি চাকরি করো যে?’
‘জিহ। আর ওরা আমার ফ্রেন্ড!’
লোকটা সবাইকে দেখলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। দুজন পেরিয়ে শেষে চোখ আটকাল তাজধীরের দিকে। প্রচ্ছন্ন হাসলেন। ইশ! ছেলেগুলো কি সুন্দর দেখতে। এরকম একটা ছেলে যদি তার মেয়ের জন্য ঠিক করতে পারত। তাজধীর এগিয়ে এলো তখন।ডাকল হাতের ইশারায়,
‘এদিকে এসো।’
ছেলেটা এগিয়ে যেতেই পকেট থেকে বেশ কিছু নোট বের করে ছেলেটার হাতে গুঁজে দিলো। ছেলেটা চমকে পিছিয়ে গেল। আপত্তি জানাল,
’না না ! আপনে আমারে টাকা দিবেন ক্যান? আপনের কাছ থেকে আমি এই টাকা নিতে পারব না!’
তাজধীর নিজের হাত বাড়িয়ে জোর করে ছেলেটার কাঁপাকাঁপা মুঠোয় টাকাগুলো গুঁজে দিল। তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
’নাও। ধরে নাও, আজকে তোমার যত দুধ নষ্ট হয়েছে, তার সবটাই আমি অগ্রিম কিনে নিয়েছি। এখন আর কাঁদতে হবে না, বাড়ি যাও।’
ছেলেটা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাজধীরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে একপাশে একটা গাছের আড়ালে বসল। মুঠোয় গোঁজা টাকাগুলো মেলে ধরতেই চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে কপালে উঠে গেল! এতগুলো টাকা!এতটা ওর ক্ষতিপূরণ এর চাইতেই বহুগুন বেশি!ছেলেটা আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
’আল্লাহ! এতগুলো টাকা!’
বাজারের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত চষে ফেলে একে একে সমস্ত কেনাকাটা শেষ করল চার বন্ধু। তালিকার সব জিনিসপত্র বস্তাবন্দী করে গাড়ির দিকে বয়ে নিয়ে আসার দায়িত্বটা এসে পড়ল বরাবরের মতোই অর্ণবের ঘাড়ে!বেচারা অর্ণবের অবস্থা নাজেহাল।
ঘামে ভিজে ওর শার্ট একদম পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। হাঁপাতে হাঁপাতে জিপের পেছনে ব্যাগগুলো এক এক করে ছুড়ে ফেলে কোমর ধরে দাঁড়িয়ে রইল ও। পাশেই ফাহিম একেবারে রিল্যাক্স দাঁড়িয়ে মিটিমিটি মুচকি হাসছিল। অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,
’হাসছিস? হারামজাদা দাঁত কেলিয়ে হাসছে আবার। সারা বাজারটা আমি একা টেনে তুললাম।একটু তো সাহায্য করতে পারতি?’
ফাহিম প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলল,
‘অর্ণব! ভাই! রাগ করছিস কেন? গুরুজনে বলে‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’! তুই এত কষ্ট করছিস।তোর কপাল তো খুলে যাবে এযাত্রায়।’
অর্ণব তেড়ে যেতেই ফাহিম এক দৌড়ে জিপের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। এদিকে মাথার ওপর রোদ একদম খা খা করছে। মাথার ওপর চড়ে বসেছে পুরো। ঘেমে-নেমে একাকার অবস্থা চারজনেরই। রোদের তীব্রতায় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড়!
কপালের ঘাম মুছতে মুছতে অর্ণব হাঁপাতে হাঁপাতে আশপাশে খুঁজে খুঁজে বলল,
’উফ মরে গেলাম রে বাবা! এই ভ্যাপসা গরমে তো গলে পচে একাকার হয়ে গেলাম! এখানে কোনো এসিওয়ালা রেস্টুরেন্ট নাই?’
’শুধু রেস্টুরেন্ট কেন? সেভেন ষ্টার হোটেলও আছে?লাগবে নাকি তোর?’
অর্ণব চোখ কপালে তুলে বলল,
‘সত্যি? কই ভাই?’
সেহরোজ গজগজিয়ে বলল,
‘এইযে আমার মাথার উপর। আয় উঠে আয়।গর্দভ একটা।’
তাজধীর এগিয়ে এসে বলল,
‘ওখানে একটা নরমাল ক্যাফে আছে। আয়।’
টিনের চালের নিচে ছোট্ট একটা বসার জায়গা। ফ্যানের হাওয়া আর কিছুটা ছায়া রয়েছে সেখানে।অর্ণব সবার আগে ছুটল সেখানে।চার বন্ধু গিয়ে ক্যাফেটার ভেতরে বসল। দোকানের বয়টা একটা পুরোনো গামছা কাঁধে নিয়ে দৌড়ে এসে টেবিল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল,
‘কী খাবেন ভাই?’
সেহরোজ বলার জন্য মুখ খুলছিলো। তার আগেই ট্রেনের মত মুখ চালালো অর্ণব,
‘আমায় আগে একটা ঠান্ডা কোক দাও। ওদের টা পরে দিয়ো।’
সেহরোজ দাঁত খিচিয়ে বলল,
‘আগে ওটার জবান বন্ধ করো।যা চাইছে দাও।’
ছেলেটা ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই আরেকজন কে ডেকে একটা ঠান্ডা কোক দিতে বলল। এরপর সেহরোজ কে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি কি নিবেন?’
‘আমাকে একটা কফি করে দাও। আগে একটা স্প্রিট দিয়ো।’
‘আর স্যার আপনি?’
তাজধীর শান্ত গলায় শুধাল,
‘তোমাদের এখানে গ্রিন টি পাওয়া যাবে কি?’
দোকানের বয়টা একটু থমকে গিয়ে মাথা চুলকে বলল,
‘গ্রিন টি? ওইডা তো হুনিনাই স্যার! ওইডা কি কোনো নতুন জাতের চা নাকি? তবে আমগো কাছে লাল চা আর দুধ চা আছে।’
তাজধীর হালকা হেসে বলল,
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আমাকে এক কাপ চিনি ছাড়া লাল চা করে দাও।’
ফাহিম একটা কোল্ড ড্রিংকসের অর্ডার দিল। দোকানি কোল্ড ড্রিংকস আর চা এনে টেবিলে রাখতেই অর্ণব গ্লাসে ঢালারও সময় দিল না। টপাটপ একটা কোকের বোতলের ছিপি খুলে এক টানে অর্ধেক বোতল গলাধঃকরণ করে ফেলল! তারপর তৃপ্তির একটা শব্দ করে টেবিলে বোতলটা রেখে ফাহিম আর সেহরোজের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলে উঠল,
’আহ্! প্রাণটা জুড়িয়ে গেল ভাই! এই না হলে শান্তি! এসির হাওয়া না থাক, এই বরফ-ঠান্ডা কোকই আমাকে আবার নতুন জীবন দান করল।নাহলে গরমে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ৯৯. ৯%!’
তাজধীর বলল,
‘ওই এক পার্সেন্ট চান্স থাকা অব্দিও তুই স্ট্রোক করবি না। নো চান্স!’
অর্ণব এক এক করে পুরো দুটো কোক ফিনিশ করল। তৃতীয় নাম্বার কোক অর্ডার করতেই ফাহিম বলল,
‘এভাবে পরপর তিনটে কোক পেটে চালান করলে তোর পেট তো আজ সোজা হাসপাতালে গিয়ে গ্যাস্ট্রিকের অপারেশন টেবিলে উঠবে অর্ণব!’
অর্ণব গ্রাহকই করল না। ঢকঢক করে খেয়েই গেল।
গ্রামের কাঁচা বাজারের রাস্তায় একটা সিএনজি এসে থামল। সিএনজি থেকে নামল তিনটি মেয়ে।বাজারের একটা লাল-নীল প্লাস্টিকের ওড়না টাঙানো খোলা কাচের চুরির দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা তিনজন। সেই চুরির দোকানের ঠিক কয়েক গজের ব্যবধানেই এসে দাঁড়াল সেই তিনটে বাইক। মাঝ খানের ছেলেটার হাতে একটা সিগ্রেট। শেষ টানটা দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বাঁকা এক গাল হাসল। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে পায়ে পা মিলিয়ে চুরির দোকানের একটু কাছে এসে হাঁক ছাড়ল,
’ওরে বাস! আজ তো হাটে পূর্ণিমার চাঁদ একসাথে তিন-তিনটা নেমে এসেছে রে, জিন্টু। তা চুরি কিনার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের দিকেও একটু তাকাও কন্যারা। তাহলে তো আমাদের জীবনটাই ধন্য হয়ে যেত!’
মেয়েগুলো একে একে সরে দাঁড়াল গা বাঁচিয়ে।মেয়েগুলো যত সরছে,রাজীব ছেলেটা শীষ বাজিয়ে ততই আগাচ্ছে।দোকানের ওপাশেই ক্যাফেতে বসে চা খাচ্ছিল চার বন্ধু। অর্ণব হুট করে ক্যাফের খোলা অংশ দিয়ে বাইরের দিকে চাইতেই ওর চোখ কপালে উঠল! চা ভর্তি গ্লাসটা এক ধাক্কায় টেবিলে রেখে অর্ণব উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,
‘ঐগুলো সকালের ওই ছেলেগুলো না?’
সেহরোজ গজগজিয়ে উঠে দাঁড়াল। পা বাড়াতে গেলে হাতে টান অনুভব করল আকস্মিক। কারও একটা শক্ত, লোহার মতো মজবুত হাত ওর কবজি চেপে ধরেছে।সেহরোজ ভীষণ অবাক হয়ে নিজের আটকানো হাতের দিকে তাকাল। হাত ধরে রাখা লোকটির মুখ থেকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল—তাজধীর!তাজধীর তখনও বেশ শান্ত ভঙ্গিতে চা খাচ্ছে। ওর মুখমণ্ডলে বিন্দুমাত্র উত্তেজনার ছাপ নেই!সেহরোজের মাথায় কিছুই ঢুকল না! মাথা পুরো চক্কর দিয়ে উঠল। এরকম ঘটনা দেখার পরো তাজধীর এতটা নির্লিপ্ত ভাব? কিভাবে, কি?
সেহরোজ বিস্ময়ে চাইতেই চোখের ইশারায় চুপচাপ বসতে নির্দেশ দিলো তাজধীর। সেহরোজ বুঝতে না পারলেও বাধ্য হয়ে বসে পড়ল।অদূরে হেঁটে আসছেন টুপি-দাড়ি পরা এক বয়স্ক মুরুব্বি। সাবেক একজন রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার তিনি। বর্তমানে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালনে আছেন। পরের দৃশ্যটা ঘটল বাজ পড়ার মতো! হাজি সাহেব এসে দাঁড়ালেন চুরির দোকানের সামনে। বজ্রকণ্ঠে গর্জন তুলে উঠলেন,
’কী হইতাছে এখানে? রাজীব! তোরা এইখানে কী করতাছিস, অ্যাঁ?’
হাজি সাহেবের ধমকে সটান হয়ে দাঁড়াল রাজীব ও তার সাংগ পাঙ্গরা। রাজীব তোতলাতে তোতলাতে কাচুমাচু হয়ে উত্তর দিল,
’ইয়ে… ইয়ে মানে, কিছু না চাচা! এমনিই। আমাদের এই ছোট বোনরা আসছে তো। তাই দেখছিলাম ওদের কোনো সাহায্য লাগব কিনা।’
হাজি সাহেব আড়চোখে ওদের দিকে চাইতেই আরো চুপসে গেল ওরা। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো কে আদেশ ছুড়লেন,
’তোমরা ভয় পেয়ো না। তোমরা তোমাদের কাজে যাও। কিংবা বাড়ি ফিরে যাও।’
মেয়েগুলোর প্রাণে পানি ফিরে আসল।আর দাঁড়াল না। উল্টো ঘুরে একটা অটো রিকশা নিয়ে উঠে চলে গেল।হাজি সাহেব এবার রুষ্ট কণ্ঠে ধমকালেন,
’তোমাদের না শতবার নিষেধ করেছি?গ্রামের মেয়েদের ওপর কোনোদিন বাজে নজর দিবে না?তোমার আর তোমার ফাজিল বন্ধুদের লম্পটগিরির জন্য পুরো এলাকার মানুষের সামনে আমাদের গ্রামের মান-সম্মান সব আজ জলে ডুবতে বসেছে! আজই তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলছি আমি এই ব্যাপারে।যাও এখান থেকে।’
রাজীব আর ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা হুলুস্তর করে সিটকে পড়ল সেখান থেকে। আশ্রয় নিলো এসে সেই ক্যাফেটায়। অধৈর্য হয়ে ডাকল,
‘সাজু!তিনকাপ দুধ চা দিয়া যা!’
সেহরোজ দাঁত খিচিয়ে বসে রইল। পারছেনা এদের গিয়ে আচ্ছামতো ধুলাই দিতে। মাঝে দুই চেয়ার ফাঁকা রেখেই পিছনে বসেছে ওরা। রাজীবের পাশের কালোকুলো ছেলেটা আগ বাড়িয়ে বলল,
‘এই হাজির ব্যাটার জন্য শান্তি নাই। যেদিকেই যাই মৌমাছির চাকের মত উড়ে উড়ে আইসা হাজির হয় শালায়।’
আরেকজন বলল,
‘আরেহ ঐসব বাদ দে। শুনলাম শেখ বাড়িতে নাকি শহুরা ভাবিজান আইসে আমাগো। দেখতে যাবিনা?’
রাজীব দাঁত কেলিয়ে জানাল,
‘আমার প্রিয়জান আইব, আর আমি যামুনা? ডাইরেক্ট বিয়ের প্রস্তাব পাডামু এইবার। আব্বারে গতকাল রাইতে কইসি।’
‘আর না কইরা দিলে?’
‘না কইরা দিলে শালিরে সোজা তুইলা নিয়া যামু। আর কত অপেক্ষা করমু? অপেক্ষা করতে করতে বুড়া হইয়া যাইতাসি।শহরে গেলে আর আসতেই চায়না। এইবার আর সুযোগ হাতছাড়া করতাসি না।’
‘তাইলে এবার আমাদের রাজীব বিয়ের পিরিতে বইব সিউর?’
কথাগুলো স্পষ্টতই শুনল অর্ণব, ফাহিম, এমনকি সেহরোজও। তাজ্জব হয়ে তাকাল বন্ধুর দিকে। তারচেয়ে বেশি তাজ্জব হলো এতকিছু শোনার পরও ওদের বন্ধুকে তখন নির্লিপ্ত চুপচাপ বসে থাকতে দেখে। ভয়টাও পেলে ভীষণ। এতো নীরবতা তো ভালো লক্ষণ নয়।
বাজারের পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরল ওরা চারজন। হাওলাদার বাড়ির উঠানে ততক্ষণে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সুমি বেগমের বড় ভাই অর্থাৎ সেহরোজের মামা থাকেন সুদূর লন্ডনে। বোনের একমাত্র ছেলের বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্য আজ দুপুরের ফ্লাইটে তার ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এয়ারপোর্টে জটিলতার কারণে তাঁর টিকিটটি বাতিল হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে নতুন ফ্লাইটের টিকিট কাটতে হওয়ায় আসতে একদিন দেরি হচ্ছে। তিনি আজ আর পৌঁছাতে পারছেন না।এসে পৌঁছাবেন আগামীকাল সকালে।
একটাই মামা তার। ওদিকে ভাইকে ছাড়া একমাত্র ছেলের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করতে নারাজ সুমি। তাই পরিবারের গুরুজনেরা সিদ্ধান্ত নিলেন—আজকের অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গায়ে হলুদের পর্বটি স্থগিত থাকবে। সব অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হলো আগামীকালের জন্য। একগাল হেসে অর্ণব আকস্মিক বলে উঠল,
’কী রে হবু বর! মামার টিকিট ক্যানসেল হওয়াতে তোর তো বাসর রাতের কাউন্টডাউন আরও একদিন পিছিয়ে গেল রে!তোর রোমান্সের ওপর তো শুরুতেই গ্রহের দশা নেমে এলো দেখছি। থাক থাক। কাঁদিস না। আজকের মধ্যেই ভাবির সাথে তোর দেখা করার ব্যবস্থা করছি আমি।’
সেহরোজ রাগী চোখে চাইতেই অর্ণব উচ্চ শব্দে ডাকল,
‘আন্টি। আন্টি গো। দেখেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। না থাকলে সেহরইজ্জার মাথায় তুইলা দেন। আবার নিয়া যাই।’
গায়ে হলুদ কাল হওয়ায় আজ দুপুরে তাজধীরসহ, হাওয়ালাদার বাড়ির সকলকে দাওয়াত করেছে পাভেল। সম্পর্কে তার সম্মন্ধি। এভাবে হাত গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকলে কেমন দেখায়। তাই সকালে গিয়ে দাওয়াত দিয়ে এসেছে সবাইকে। সুমি প্রচ্ছন্ন হেসে জানিয়েছেন তারা না আসলেও ছেলেদের পাঠিয়ে দিবেন।
সকাল থেকে রান্না বান্নার তোড়জোড় চলছে শেখ বাড়িতে। গৃহীনরা ব্যস্ত ভীষণ। আবার দুপুরের ঠিক পর পর আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। হঠাৎ করেই হুড়মুড় করে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। দেখতে দেখতে প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা ধরে ধুমসে বৃষ্টি হলো। মেঘের গর্জনের পর এখন অবশ্য বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমে এসেছে। তবে একেবারে থামেনি। টিনের চাল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে তখনো।
প্রিয়ন্তী, নুসরাত আর অন্যান্য কাজিনরা বাড়ির উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজছে। পাভেল, মিতালী অনেকবার না করেও আজ প্রিয়ন্তীকে থামাতে পারেনি। কাজিনদের সঙ্গে মিলে নেচে নেচে বৃষ্টি বিলাস করছে সে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেজার পরে বাড়ির পেছনের যে বড় পুকুরপাড়টা আছে, সেখানে গিয়ে গোসল করবে ওরা।
প্রিয়ন্তী অবশ্য সাঁতার জানে না।তাই নুসরাত হাসতে হাসতে ঘর থেকে একটা মগ আর একটা প্লাস্টিকের বালতি সঙ্গে করে নিয়ে নিল। মেয়েরা সবাই উঠান পার হয়ে কলকল করে হাসতে হাসতে পুকুরপাড়ের দিকে রওনা হলো। কিন্তু বিপত্তি বাধল মেহেরিনকে নিয়ে!মেহেরিনও কতক্ষণ ধরে তার আম্মাকে অনুরোধ করে চলেছে,
‘ও আম্মা! প্লিজ একটু যেতে দাও না! দেখো প্রিয়পু আর নুসরাত আপুও তো ভিজছে! আমিও ওদের সাথে একটু পুকুরপাড়ে যাই?’
মেহেরিনের আম্মা রেগেমেগে কড়া চোখে ধমকে উঠলেন,
‘একদম না! মেহেরিন, তুই কি অবুঝ? কালকে তোর গায়ে হলুদ। দুদিন পর বিয়া! বিয়ের কনে নাকি বৃষ্টিতে ভিজে পুকুরে গোসল করতে যাইব? এই সময়ে মাইয়া গো বাড়ির বাইরে বাইর হতে হয়না। জানোস না? বাতাস লাগব গায়ে।’
মেহেরিন আরও কত কাকুতি-মিনতি করল, কিন্তু তবুও বিন্দুমাত্র গললেন না তিনি। উল্টো মেহেরিনকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরের সিটকিনিটা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে গেলেন।মেহেরিনের ভীষণ মন খারাপ হয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে রইল। গ্রিল ধরে বিষণ্ণ চোখে খুঁজল আশেপাশে। পেয়ে গেল মুয়াজ কে।
ফিসফিস করে মুয়াজকে ডাকল মেহরিণ,
‘মুয়াজ! এই মুয়াজ! একটু শোন এদিকে!’
’কী হয়েছে মেহেরিন আপা?’
’মুয়াজ। ভাই আমার। আমার ঘরে বাইরে থেকে আম্মা সিটকিনি তুলে দিয়ে গেছে। তুই একটু সিটকিনিটা খুলে দিবি ভাই? তুই যদি ওটা খুলে দিস তবে পাভেল ভাইয়ের আনা সবকটা চকলেট আমি তোকে দিয়া দিবো। প্রমিজ!’
চকলেটের লোভে মুয়াজ রাজি হলো। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে দ্রুত পায়ে মেহেরিনের ঘরের দরজা খুলল। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো মেহরিণ। মুয়জ ও পুকুরে গোসল করতে আপুর পিছনে ছুটল।
আম্মার কাছ থেকে বাঁচতে বাড়ির পিছনের দিক দিয়ে দৌড় লাগাল মেহরিণ। ওদিকটায় এমনিতেই মানুষজনের হাঁটাচলা কম। শেওলা পরে পিছিল হয়ে থাকে সবসময়। উপরন্তু আবার বৃষ্টি হওয়ায় একবারে চটচটে,মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে আছে।মেহরিণ দৌঁড়াতে গিয়েই পিছলা খেয়ে উল্টে পড়ল সেখানে,
’আহ্! মাগো!’
বিকট এক আর্ত চিৎকারে ধপাস করে উঠানের মাটির ওপর সশব্দে আছড়ে পড়ল মেহেরিন! পায়ের গোড়ালিতে ব্যাটা পেয়েছে বেশ। মোচড়ে গেছে কিনা কে জানে। যন্ত্রণায় চোখ-মুখ খিঁচে এলো ওর। হাটুতেও চোট পেয়েছে। ছুঁলে গেছে বোধহয়। কোমর ধরে আবারও ব্যথাতুর কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠল,
’উফফ ও মাগো। আমার কোমর!’
কোমর আর পায়ের ব্যথায় উঠতে গিয়েও পারল না। দুই-দুবার চেষ্টা করেও যন্ত্রণায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা হলো।আকাশ থেকে তখনও টুপটাপ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। কিন্তু হঠাৎ মেহেরিন খেয়াল করল ওর গায়ের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়া হুট করে বন্ধ হয়ে গেছে!মেহেরিন খুব অবাক হলো।
চোখ খুলল আস্তে আস্তে। ধীরে ধীরে মাথার ওপরের দিকে তাকাল ও। চোখে পরল সুগঠিত, ফর্সা ও শক্তপোক্ত একটা পুরুষালি হাত!বাড়িয়ে রেখেছে ওর দিকে। মেহরিণ আরেকটু উচাল মাথাটা। একমাস আগে ওকে না বলেই চলে যাওয়া মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে ওর সম্মুখে। বৃষ্টির ছাঁটে চুলের সামনের কিছু অংশ হালকা ভেজা। মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ এক শিশুতোষ অনুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ল ওর সমস্ত সত্তাজুড়ে। নিঃশাস হয়ে উঠল ব্যাকুল। কোথাও না কোথাও ভীষণ লজ্জাও পেলো।
সেহরোজ কপাল টানটান করে হাতটা তখনো বাড়িয়েই রেখেছে। ওই হাতে একটা কালো রঙের ঘড়ি লক্ষ করল মেহরিণ।ফর্সা পুরুষালি পশমবিশিষ্ট হাতটায় চকচক করছে কালো রঙটা।
’হাত ধরো ইডিয়েট!’
মেহেরিনের চোখ দুটো তখনও বিস্ময়ে স্থির। কাঁপাকাঁপা হাতটা বাড়াতে গিয়েও ইতস্তত করে গুটিয়ে নিল। মেহেরিন হাত না ধরে উল্টো ব্যথায় মুখ খিঁচে নিজের মতো ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলে ধপাস করে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ল আবার। ব্যথায় চোখ মুখ খিচিয়ে নিলো। মেয়েটার অবাধ্যতায় মেজাজ বিগড়ালো মানবের। রুক্ষ সরে ধমকে উঠল এবার,
ডেসটেনি পর্ব ৩৯
’ইডিয়ট! অন্ধ নাকি তুমি? একটু দেখে-শুনে পথ চলতে পারো না? সামান্য উঠোন পার হতে গিয়ে একেবারে আছাড় খেয়ে বসলে? উঠো বলছি। নাহলে এবার আমিই তোমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলাব।’
রূঢ় ধমক এবার কাজে আসল। কাঁপাকাঁপা হাঁতখানা বাড়াল মেহরিণ। এক গোছা লাল কাঁচের চুরি শোভা পাচ্ছে মেয়েলি চিকুন হাতে। সেহরোজ লক্ষ্য করল মেয়েটার গায়ে একটা লাল খয়েরি রঙা থ্রি পিস। হাটু সমান চুলগুলো একটা কাঁটা দিয়ে খোপা করে বাধা। মেহরিণ এর বাড়ন্ত হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে টান দিতেই হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। হাত ছাড়া পেতেই আর দাঁড়াল না সেখানে। পুকুরপারেরে দিকে চোখ মুখ খিচে পুনরায় দৌড় লাগাতে গেলে আবারও পিছলা খেয়ে পড়তে পড়তেও বাচল এযাত্রায়। পিছনে থেকে ভীষণ উদগ্রীব দেখা গেল সেহরোজ কে। চেঁচাল,
’একেবারে স্টুপিড একটা মেয়ে!’
