মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৪ (২)
jannatul firdaus mithila
“ কি দরকার? থাকুক আরেকটু। তুই বরং ধরে রাখ আমায় পিচ্চি, নয়তো কামড়ে দিবে ও তোকে।”
সপ্তদশীর অবুঝ মন! ভয়ডরে কুঁচকে নিয়েছে চোখমুখ। কম্পিত হাতদুটো ভরসার ক্ষীণতম আভাস পেয়ে তৎক্ষনাৎ খামচে ধরেছে রূঢ় মানবের রুক্ষ বাহু। কুকুরের ভয় থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে ফের কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ দে-দেখুন বি-বিস্ট…”
সহসা অধর কোণে দাঁত চাপলেন মাফিয়া বিস্ট। সরল মানবীর ভয়ার্ত বাক্যটুকু পূর্ণ হবার ফুরসত না দিয়ে, ত্বরিত শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন মেয়েটার অভিমুখে। এহেন হুটহাট কান্ডে হকচকায় মাহি। ঘাড়ের মাংসল পেশী কয়েক কুঁচকে, ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল সুদর্শনের মুখপানে। লোকটা কেমন ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমির প্রলেপ! দম্ভের ভারে সটান হয়ে থাকা ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকি এসেছে তার। বাদামী চোখদুটোর গভীর দৃষ্টি মেয়েটাতে নিবদ্ধ। যে দৃষ্টিতে চোখ আটকাতেই নিশ্চল হলো মাহি। কন্ঠে নামলো অসারতা। এরইমধ্যে কর্ণকুহরে কেবল ভেসে এলো সুদর্শনের দুষ্টুমির প্রলেপ ছড়ানো শ্লেষাত্মক কন্ঠ!
“ ওহহো নটি গার্ল! তুই সেধে সেধে দেখাতে চাইলে আমি থোড়াই না করব! তবে দেখাবি যেহেতু…”
থামল মুগ্ধ! ঠোঁট কামড়ে রেখে, দৃষ্টিজোড়ায় তীক্ষ্ণতা নামিয়ে একবার আপাদমস্তক পরোখ করল বোকা মানবীকে। মুহুর্তেই ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো মাহি’র। মুখাবয়বে নামলো খানিক অস্বস্তির ছাপ। তা দেখে বেয়াদব সুপুরুষ কেমন বাঁকা হেসে এগিয়ে এলেন এক-কদম। মেয়েটাকে আরেকটু নাস্তানাবুদ করবার সুকৌশল প্রয়াসে মত্ত থেকে হাস্কি স্বরে শুধালেন,
“ ঘরে গিয়ে একদম পারফেক্টলি এন্ড ওপেনলি দেখাস কেমন? আমি নাহয় সোডা উইদ পপকর্ণ খেতে খেতে দেখব।”
হতভম্ব মাহি। বোকার ন্যায় তাকিয়ে আছে কেবল। মস্তিষ্ক খানিক নড়বড়ে তার। মিনিট খানেক লাগালো বোধহয় সম্পূর্ণ বাক্যটুকুর অর্থ বুঝতে। তবে যে-ই না সবটা বোধগম্য হলো মানবীর, ওমনি চোখজোড়া কেমন বিস্ফোরিত রূপ ধরল তার। সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে উঠল আপনা-আপনি। মুখাবয়বে এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ টেনে তেতোঁ কন্ঠে পরপরই শুধালো,
“ মুখ সামলে কথা বলুন বেহায়া লোক! আপনার…!”
“ ভাউ…!”
বোকা সপ্তদশীর সে-কি রাগ! ঝাঁঝানো বাক্যটুকু জিভ খসানোর পূর্বেই বলিষ্ঠ মানবের পেছন থেকে ধেয়ে এলো কুকুরের বাজখাঁই গর্জন। ওমনি ভয়ে তটস্থ মাহি। আকাশসম রাগ-গোসসা ভুলে তক্ষুনি এগিয়ে এসে দু’হাতে খামচে ধরল মুগ্ধের ওভারকোটের একাংশ। বেভুলার ন্যায় চোখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ ইয়া আল্লাহ! সরছেও না কুকুরটা। বিস্ট..আপনার সমস্যাটা কী? কুকুরটাকে সামনে থেকে তাড়াচ্ছেন না কেনো?”
অলক্ষ্যে গালের ভাঁজে জিভ ঠেলে হাসছে মুগ্ধ। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দু’হাত গুঁজেছে প্যান্টের পকেটে। কিয়তক্ষন মৌন থেকে আচানক কূটকৌশলী কায়দায় আওড়ায়,
“ জানিস সিগনোরা? এই কুকুরটা যাদের একবার কামড়ে দেয়, তাদের কিন্তু মৃ ত্যু নিশ্চিত!”
ভয় বাড়ল বোকা মানবীর! কাঁদো কাঁদো হলো ক্ষুদ্র মুখখানা। তড়িঘড়ি করে ফের সিটিয়ে গেল মুগ্ধের রুক্ষ বক্ষভাঁজের সনে। তুলতুলে নরম হাতদুটো দিয়ে একপ্রকার খামচে ধরল রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ পিঠ! ভয় বিজড়িত নিষ্পাপ কন্ঠে শুধালো,
“ আর ভয় দেখাবেন না বিস্ট! আমায় প্লিজ ঘরে দিয়ে আসুন।”
সুযোগ সন্ধানী মুগ্ধ! হাতের কাছে অতো ভালো একটা সুযোগ পেয়ে থোড়াই হাতছাড়া করবে! সে তৎক্ষনাৎ নিজ বলিষ্ঠ হাতের রুষ্ট চাপায় আঁকড়ে ধরল রমণীর মেদহীন বাঁকানো কোমর। অতঃপর এক সুবিশাল হেঁচকা টানে তুলোর সাদৃশ সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদনখানি উঁচিয়ে তুললো রূঢ় মানব। মুহুর্তেই পাদু’টো দোদুল্যমান হলো মাহি’র। ভড়কানোর পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের নিরুত্তেজ কন্ঠ!
“ গালটা কেমন চুলকাচ্ছে আমার! একটু চুলকে দে তো।”
নাক কুঁচকায় মাহি। তাকায় বিরক্তির দৃষ্টে। মুগ্ধের কথামতো চুলকে দেওয়া তো দূর, উল্টো ঝাঁঝিয়ে বললো,
“ এমন একটা সিরিয়াস মোমেন্টে ওতো চুলকানি আসে কোত্থেকে আপনার? নিজের হাত নেই? আমাকে কেনো বলছেন চুলকে দিতে? যত্তসব খাঁজের রোগী কোথাকার!”
তৎক্ষনাৎ চোয়াল শক্ত হলো বদরাগী মানবের। দৃষ্টে নামলো চিরচেনা আগুন। মেয়েটার কোমর বরাবর চেপে রাখা হাতের জোর বাড়ালো তক্ষুনি। এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালো উল্টো! সম্মুখেই হিং স্র কুকুরটা। লালা ফেলছে অনবরত। মাহি’র দেখা পাওয়া মাত্রই সে কেমন লাফিয়ে উঠল আনন্দে! সহসা গলা উঁচিয়ে ডাকল ফের,
“ ভাউ!”
ভয়ে কুপোকাত মাহি! তৎক্ষনাৎ দু’হাতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ ঘাড়। কাঁপতে কাঁপতে শুকনো ঢোক গিলে আওড়াল,
“ এ্যাই না না না! চুলকে দিচ্ছি, এক্ষুণি চুলকে দিচ্ছি। কোথায় চুলকে দিব বলুন?”
কার্য সিদ্ধিতে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। আলগোছে ঘাড় নামিয়ে আনলো মেয়েটার কানের কাছে। রয়েসয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল —
“ আপাতত গালে! পরে নাহয় সময় করে অন্য কোথাও।”
উপায়হীন মাহি! এক আকাশসম অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও ধীরলয়ে মুখ সরিয়ে আনলো মুগ্ধের কাঁধ হতে। কাঁপা কাঁপা ডানহাতটা কোনরকমে এগোলো সুদর্শনের ক্লিন শেভড ফর্সা গাল বরাবর। ওমনি মেয়েটার নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে বাঁধ সাধে মুগ্ধ। এহেন অতর্কিত কান্ডে স্থির মানবী, একজোড়া শীতল চাহনি পরমুহূর্তেই তাক করল মুগ্ধের পানে। দেখল — রূঢ় মানব কেমন ঠোঁট পিষে রেখেছে। চোখদুটোর চাহনিতে স্পষ্ট দুষ্টমি ভাব। সহসা ফাঁপা ঢোক গিললো সপ্তদশী! দৃষ্টিজোড়া কুন্ঠায় নুইয়ে পড়তে চাইলেই মুগ্ধ একপ্রকার দুষ্ট কন্ঠে বলে ওঠে,
“ হাত নয় পিচ্চি! ইউ্য শ্যুড ইউজ ইউ্যর লিপস।”
মুহুর্তেই মাথার তালুতে বাজ পড়ল মাহি’র। দৃষ্টে ছড়ালো বিস্ময়! তড়িৎ বেগে দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ আপনি তো ডাকাতের চেয়েও খারাপ দেখছি! এমন প্রকাশ্যে আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে চুমু আদায় করতে চাচ্ছেন অসভ্য লোক? ছাড়ুন আমায়, কুকুর কামড়ালে কামড়াবে। মর*লে মর*ব, তবুও স্বেচ্ছায় আপনাকে চুমু দিব না।”
সপ্তদশীর কন্ঠে উপচে পড়া রাগ! তবুও সেসবে ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ। হাতের শক্ত বাঁধনে রমণীর নড়চড় বাড়তেই মেজাজ খিচল তার। বিরক্ত কন্ঠে খানিক ধমকে বলল,
“ এতো নাটক করছিস কেনো বেয়াদব? ঠোঁট দিয়ে সামান্য চুলকে দিতে বলেছি, কোনো হ্যাংকি প্যাংকি করতে নয়!”
শুনলো না মাহি! দু’হাতে বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষ ভাঁজ ঠেলতে ঠেলতে আওড়াল,
“ এক্ষুণি নামান আমায়। অসভ্য, বেয়াদব একটা!”
খুব বেশিক্ষণ আলগা খোলসে থাকবার রেকর্ড নেই মাফিয়া বিস্টের। মেজাজ খিঁচে অতিদ্রুত। একবার মেজাজ খিঁচে গেলে লাগামহীন হয় মুখের ভাষা। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হয় আগুন! ঠিক যেমনটা এখন হচ্ছে। বদরাগী উৎসে রূঢ় মানব তার শক্ত হাতের রুষ্ট থাবায় তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে মাহি’র নরম চোয়ালের হাড়। ক্ষুব্ধ কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ ইউ্য বি’চ! ডোন্ট ইউ ডেয়ার সে নো টু মি। ভুলে যাস না আমি কে, আর তোর এই ঘাড়ত্যাড়ামির জন্য এমুহূর্তে তোর সঙ্গে ঠিক কি কি করতে পারি। শান্তভাবে কথা বলছি বিধায় গায়ে লাগে না তাই না? আরেকবার শুধু না বলে দেখ — একদম গায়ে আগুন ধরিয়ে দিব মনস্তার’স বান্দী। দে চুমু!”
ফুপিয়ে ওঠে মাহি। নাকের পাটা ফুলে সে-কি সৌন্দর্য বেড়েছে মেয়েটার! ছলছল করছে চোখদুটো। বদরাগী পুরুষ এক ঝটকা মে’রে চোয়াল ছাড়ল বোকা মানবীর। অতঃপর নিজ চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, গালটা এগিয়ে দিলো মেয়েটার মুখের কাছে। ভরাট কন্ঠে হুকুম ছুঁড়ল,
“ ডু ইট ফাস্ট ঘাড়ত্যাড়ার ঘরে ঘাড়ত্যাড়া!”
নাক টানছে মাহি। কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে ধীরলয়ে এগোয় মুখ। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় তুলতুলে অধরযুগল কোনরকমে যাচ্ছে তা-ই ভাবে সুদর্শনের গালে ছুঁইয়ে দিয়ে মুখ সরিয়ে নিলো ফের। তার এরূপ কান্ডে শান্ত হবার বদলে বড্ড বিরক্ত হলো মুগ্ধ। ত্বরিত কপাল গুছিয়ে তাকাল মেয়েটার পানে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শুধালো,
“ তোকে আমি খাবার দেই না মনস্তারের বান্দী? কি দিলি তুই? হোয়াই কুডন্ট আই ফিল ইউ? ঠিকমতো দে চাশমিস, নয়তো আমি দিয়ে দেখিয়ে দিব কিভাবে দিতে হয়। পরবর্তীতে গাল গালের জায়গায় না থাকলে আমায় কোনো দোষ দিতে পারবি না বলে দিলাম!”
অতিষ্ঠ মাহি! নাক ফুলিয়ে দাঁতে দাঁত চাপছে বারংবার। ফের সময় নিয়ে মুখটা এগিয়ে আনলো মুগ্ধের গালের কাছে। পূর্বের তুলনায় খানিকটা জোর দেখিয়ে শব্দ করে খেলো একখানা চুমু। তাতেও বোধহয় মন ভরলো না রূঢ় মানবের। কেমন দাঁত খিঁচে ধমকে বলল,
“ পুট প্রেসার মনস্তারের বান্দী!”
এপর্যায়ে রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মাহি। কটমট করতে করতে আচানক অধরের বদলে মুগ্ধের ফর্সা মসৃণ গালের ত্বকে ছোঁয়াল নিজ ধারালো দাঁত! তুমুল শক্তির অভিঘাতে কামড়ে ধরে রাখল বেশ কিছুক্ষণ। এদিকে মেয়েটার এরূপ অতর্কিত আক্রমণে মোটেও বিচলিত হয়নি রূঢ় মানব। উল্টো মাত্রাতিরিক্ত ব্যথার উপশমে নিজ নিম্নাংশের অধর কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কেমন। মাহি সরাচ্ছে না দাঁত! কামড়ে রেখেছে তো রেখেছেই!
সময় পেরুলো মিনিট পাঁচেক! এতক্ষণে যুবকের গালের ত্বক হতে দাঁত সরালো মাহি। ধীরলয়ে নজর ঠেকালো গালটায়। ওমনি দেখতে পেলো — রূঢ় মানবের ফর্সা গালে পরপর বেশ ক’টা ধারালো দাঁতের গভীর ক্ষত বসেছে। একপাশের ক্ষত বেয়ে অনায়াসে গড়াচ্ছে লহু! মুহুর্তেই সরল মানবীর অন্তর ভারী হলো। দৃষ্টে নামলো অপরাধবোধ। তন্মধ্যে ঘাড় বাকাঁয় মুগ্ধ। ক্ষীণ দৃষ্টিতে তাকায় অপরাধবোধে ভুগতে থাকা মেয়েটার পানে। মাহি ঘাড় ঝোঁকায়। এই বুঝি লোকটা দেবে এক ধমক। অন্তঃকোণে এহেন আশঙ্কা জাগ্রত হবার পরমুহূর্তেই তাকে অবাক করে দিয়ে বাঁকা হাসে মুগ্ধ। আলগোছে ডানহাতের বৃদ্ধা আঙুল উঁচিয়ে এনে ঠেকায় মাহি’র ওষ্ঠপুটের নিচে। সেথায় লেগে আছে এক ছটাক লহু! তা সযত্নে মুছে দিয়ে রূঢ় মানব অন্যন্ত ঠান্ডা স্বরে আওড়াল,
“ আমি তোকে কিস করতে বলেছিলাম। কিন্তু তুই তো একেবারে লাভ বাইট দিয়ে দিলি! এবার আমি একটা দিই?”
আঁতকে উঠে মাহি। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে আগলে নেয় নিজ গালদুটো। ভয়ে ভয়ে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“ একদম না! ম’রে যাব আমি।”
মুগ্ধ কেবল ঠোঁট পিষে হাসলো। একদৃষ্টে কিয়তক্ষণ দেখে গেল বোকা মেয়েটাকে।
টিমটিমে হলদেটে আলোয় ডুবে আছে দোতলার একমাত্র রাজকীয় কামরাটি। যার চারিদিকে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত গুমোট বাতাবরণ। সুবিশাল কামরা সংলগ্ন হাটখোলা বারান্দা। সেথায় মোটা দড়িতে দুপাশ দিয়ে ঝুলে আছে একখানা প্রশস্ত কাঠের তক্তার দোলনা। মৃদু দুলুনিতে দুলছে দোলনাটা। তার নরম গদিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে নিরু। দূর থেকে দেখলে মনে হবে মেয়েটা বোধহয় ঘুমচ্ছে।
রাত বাড়ছে ক্রমশ! একজোড়া ব্যস্ত কদম ধুপধাপ পদধ্বনিতে ছুটে এলো নিরুর ঘরে। তার তন্ময় চোখজোড়া এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে বারংবার। বোধহয় খুঁজছে কিছু কিংবা কাউকে। তবে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা না পেয়ে ব্যস্ত কদম জোড়ার মালিক পরমুহূর্তেই ছুটলো ঘর লাগোয়া বারান্দায়। মুহুর্ত ব্যয়ে তার তন্ময় চোখজোড়া শান্ত হলো বুঝি, যে-ই দেখল অদূরের দোলনায় নড়চড়বিহীন দুলছে নিরু। ব্যস্ত কদম জোড়ার মালকিন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন তক্ষুনি। ধীরলয়ে এগোলেন দোলনার সন্নিকটে। তন্মধ্যে তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো মেয়েটার ফ্যাচফ্যাচানোর শব্দ। ঠিক তখনি ব্যস্ত পাদু’টো থমকে দাঁড়ালো মাঝপথে। কানখাড়া করে ফের শুনতে চাইলো মেয়ের গুমোট কান্নার সুর। সহসা বুক ভারী হয়ে এলো থমকানো কদম জোড়ার মালকিন সুদীপা রায়ের। কন্ঠস্বর হয়ে গেলো ভারী! তিনি ফের গতি টানলেন পায়ের। আনমনে এগোতে গিয়ে আচমকা পায়ের সনে আঘাত পেলো মোমবাতির পিতলের স্ট্যান্ডটা। ওমনি বেচারা নির্জীব স্ট্যান্ডটা কেমন বিকট শব্দ তুলে গড়িয়ে গেল সম্মুখে। এহেন হুটহাট শব্দে ভড়কায় নিরু। তড়িঘড়ি করে নিজ কান্নাগুলো ওড়নার কোণা দিয়ে মুছে নেয় কোনমতে। সুদীপা রায় বেশ দেখলেন মেয়ের কৌশল। ভগ্নহৃদয়ে কদম বাড়িয়ে চুপচাপ এসে বসলেন মেয়ের পাশে। নিরু নড়লো না। না ঘুরলো মায়ের দিকে। মুখটা বালিশের কোলে ডুবিয়ে রেখে হা করে নিশ্বাস ফেলছে নিষ্পাপ রমণী। সুদীপা রায় সময় নিলেন না। ধীরলয়ে হাত বাড়িয়ে আলগোছে মেয়ের মাথায় রাখলেন। সিক্ত নয়নে মুচকি হেসে ভারী কন্ঠে আওড়ালেন,
“ শুভ জন্মদিন মা।”
এবারে ঘুরে তাকায় নিরু। লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটো মায়ের সিক্ত নজরে পরতেই বুক মোচড় দিয়ে ওঠে জননীর। তবুও বাইরে থেকে নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত রেখে ফের শুধালেন,
“ ওঠ! তোর জন্য পায়েস এনেছি। ঘরে চল। নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছি!”
“ সঙ্গে একটু বিষ দিবে?”
মেয়ের এহেন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে আকাশ ভেঙে পড়ল সুদীপা রায়ের মাথার ওপর। চোখদুটো কেমন বিস্ফোরিত তার। বিস্মিত কন্ঠে হুট করেই বললেন,
“ কিসব যা-তা বলছিস তুই? মাথা ঠিক আছে তোর?”
ভঙ্গুর ভাবস্রোতে আহত হাসলো নিরু। ধীরেসুস্থে উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। মোটা কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ মাথা ঠিক থাকলে ১০ বছর বয়স থেকে বাবা-মায়ের কথায় এক বেখেয়ালি পুরুষের অপেক্ষায় সিঁথি থোড়াই রাঙাতাম!”
কথা হারালেন সুদীপা রায়। নজর ঝুঁকে গেল আপনাআপনি। ওদিকে নিরু কেমন মুখ হা করে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের পানে। নিশ্বাস নিতে সে-কি কষ্ট তার। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানার কাঁদতে কাঁদতে বেহাল দশা! থেমে থেমে ফের বলল,
“ আমি তো অধীর দা-কে কখনো নিজের করে পেতে চাইনি মা। আমিতো কখনো চাইনি — সে আমার হোক। আমি অভাগী তো জানতামও না — ভালোবাসা কি? জানতাম না কার জন্য অপেক্ষা করছি। জানতাম না দীর্ঘ ৮টা বছর যার নামে সিঁদুর পরছি, সে ফিরে এসে আমার হবে না। কেনো করলে এমনটা মা? কেনো আমার পুতুল খেলার বয়সে আমায় স্বপ্ন দেখালে রাঙা বউ হবার? কেনো মিথ্যে স্বপ্ন দেখালে — জমিদার অধীর রায়ের অর্ধাঙ্গিনী হবার?”
সুদীপা রায়ের চোখদুটো বেয়ে নিঃশব্দে টুপ টুপ করে গড়াচ্ছে নোনাজল। মেয়েও তো কাঁদছে ভীষণ। ভগ্নদশায় আচানক মায়ের কোলে আছড়ে পড়ে, সদ্য অষ্টাদশে পা দেয়া মানবী কেমন হাউমাউ জুড়ে আওড়াল,
“ তুমি আর বাবা বলেছিলে না মা? পিসি কেবল আমাকে অধীর দা-য়ের বউ বানাতে বলে গিয়েছিল! তুমি বলেছিলে না? অধীর দা পৃথিবী উল্টে গেলেও তার মায়ের কোনো কথা অমান্য করে না। তুমি না বলেছিলে, অধীর দা আমায় ভালোবাসে। তুমি এ-ও বলেছিলে — অধীর দা নারী বিদ্বেষী! কিন্তু কোথায় মা? তার যে নারী লিপ্সা রয়েছে। প্রচুর লিপ্সা রয়েছে। নয়তো কোনো প্রকার বৈধ সম্পর্ক ছাড়া একটা মেয়ের সঙ্গে এভাবে একই ছাদের নিচে কি করে থাকে মানুষ? কি করে থাকে মা? কেনো সে আমার হলো না? আমার অপেক্ষায় আদৌও কোনো খাদ ছিল না-কি?”
সুদীপা রায় মেয়ের মাথায় হাত উঠালেন। ভেজা চোখদুটো অন্য হাতের উল্টোপিঠে মুছে নিলেন নিঃশব্দে। কন্ঠে ভারী দৃঢ়তা ঢেলে আওড়ালেন,
“ ভালোর সাথে সংসার সকলে করতে জানে নিরু। তবে খারাপকে ভালো পথে নিয়ে এসে, তাকে মানুষ বানিয়ে সংসার করাটা ক’জন পারে? তুই কি জানিস? তোর বাবাও একটা সময় এমন ছিলো!”
বিস্ময় লেপ্টে গেল নিরুর মুখাবয়বে। হতবাক চোখদুটো আচানক ঠেকল মায়ের মুখপানে। সুদীপা রায় ভেজা চোখে হাসলেন খানিক। দু’হাতে আলগোছে মুছে দিলেন মেয়ের সিক্ত চোখদুটো। পরক্ষণে চুমু আঁকলেন মেয়ের কপালে। মেয়ের ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখেই বলতে লাগলেন,
“ কালো জগতে থাকলে চরিত্র কালো হবেই মা। তবে সে-ই কালো চরিত্রকে পবিত্র করার সাধ্যি কেবল মনের মানুষেরই হয়। অধীর ছোট থেকেই একা একা মানুষ হয়েছে। নিজের মতো করে মানুষ হয়েছে! ছোট বেলাতেই হারিয়েছে নিজের মা’কে। ওর মনে দয়ামায়া বলতে কিচ্ছু নেই! থাকবে কি করে বলতো? ওকে আদৌও কেউ বলেছে কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক? ও তো নিজ ইচ্ছের রাজা। তবে আমি জানি, অধীরের মনে মায়া জন্মানোর কাজটা খুব একটা সহজ নয়। কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে বল? তোর কি নিজের ওপর বিশ্বাস নেই? বিশ্বাস নেই নিজের ভালোবাসার ওপর?”
পলক ফেললো নিরু। তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে। সুদীপা রায় আলতো হাসলেন। মেয়ের ললাট হতে ঠোঁট সরিয়ে এনে ফের শুধালেন,
“ তুই চেষ্টা করতে থাক মা। আজ তোকে ছুঁয়ে আমি কথা দিচ্ছি — অধীরের জীবনে একমাত্র নারী হিসেবে কেবল তুই-ই থাকবি। অন্যরা সময় এলে বাতাসের ঝোঁকার ন্যায় ঠিক উড়ে যাবে। এরজন্য আমার যা যা করতে হয়, আমি তাই তাই করব। তুই কিচ্ছুটি চিন্তা করিস না।”
সকাল ৯টা বেজে ১২ মিনিট!
বিছানার দুপাশে হাত চেপে বসে আছে মাহি। গরমে অতিষ্ঠ সে। ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা! রাত থেকে ঘরের এসি-টার কি যে হলো। লাইটও জ্বলছে না ঠিকমতো। ঘরের প্রতিটি সুইচবোর্ডের সুইচ চেপে চেপে দেখেছে সে, কাজ করছেনা একটাও! হাতপাখা নিয়ে যে বাতাস করবে তার-ও কোনো ইয়ত্তা নেই। মানবী অস্থির এপর্যায়ে। গরমে আর টিকতে না পেরে তক্ষুনি পা ছোটালো ওয়াশরুমে। দুয়ার আঁটকে গুটি গুটি কদমে এগোলো ওয়াশ বেসিনের সন্নিকটে। সম্মুখেই একখানা ঝকঝকে আয়না। সেথায় দৃষ্টি ঠেকিয়ে রেখে ফসেট ঘোরায় মাহি। আনমনে পানির স্রোতে ডানহাতের দু-তিনটে আঙুল চালাতেই চিৎকার বেরিয়ে আসে মানবীর কন্ঠ ফুঁড়ে। বেসিনের ফসেট হতে বের হচ্ছে উত্তপ্ত পানি। হতবিহ্বলতায় মানবী তক্ষুনি ছিটকে সরে যায় দু-কদম পেছনে। জ্বলতে থাকা আঙুলগুলো সম্মুখে এনে তাক করতেই দেখে — আঙুলগুলোয় কেমন ফোঁসকা পড়া অবস্থা হয়েছে তার। মাহি ফু দিচ্ছে অনবরত। কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ! বেসিন থেকে এমন গরম পানি বের হচ্ছে কেনো? সে-তো গ্রিজার অন করেনি! তাহলে? ভাবনায় বুদ মাহি। জ্বলতে থাকা আঙুলগুলো নিয়ে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। অবচেতন মনটা তার হুট করেই মনে করালো রূঢ় মানবের কথা। ওমনি সকল ভাবনাচিন্তা কাঁধে নিয়ে মানবী ব্যস্ত কদমে পরপরই পা ছোটালো ঘরের বাইরে।
তিন তলার প্রশস্ত চারকোনা করিডর! মাহি’র কক্ষের ঠিক বিপরীতমুখী কক্ষটা মুগ্ধের। বোকা মানবীর ব্যস্ত পদযুগল ততক্ষণে ছুটে এসেছে মুগ্ধের কক্ষের বাইরে। কক্ষের সুবিশাল কাঠের দরজাটা হালকা ভেজিয়ে রাখা। মাহি দোনোমোনো করলো খানিক। অন্তঃকোণে ভাবনার উদয় হলো —
“ ভেতরে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?”
পরপরই সপ্তদশী টের পেলো হাতটা বড্ড জ্বলছে। এক্ষুনি এন্টিসেপ্টিক না লাগালে অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এহেন আশঙ্কায় দোনোমোনো ভাবনার জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হলো মাহি। বাহাতের আলতো ধাক্কা দরজার গায়ে বসাতেই দরজাটা কেমন নিঃশব্দে খুলে গেল খানিক। সপ্তদশী নজর ঠেকালো সম্মুখে। ওমনি বিস্ময়ে চোখদুটো কেমন গোল গোল হয়ে গেল তার। ঘর তো নয়, এ যেন পুরনো আমলের রাজাদের শোবার ঘর। যতদূর চোখ যাচ্ছে সবকিছু কেমন এন্টিক শো-পিসে মুড়িয়ে রাখা। ঘরের সিলিংয়েও কি সুন্দর কারুকাজ! মুগ্ধতায় নিজ ব্যথাগুলো খানিক ভুলে গেল সপ্তদশী। আনমনে পা রাখলো কক্ষে। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো সব। ঘরটা যার ছিলো, মনে মনে তার রূচীর প্রশংসা না করে থাকতে পারলো না মাহি। অবাক নেত্রে ধীরলয়ে এগোলো সম্মুখে। অতোবড়ো ঘরের ঠিক মাঝখানে একখানা বেড। সেথায় উবুড় হয়ে শুয়ে আছে মুগ্ধ। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ব্ল্যাকওয়ার্ক ট্যাটু-শৈলীতে অঙ্কিত সুদর্শনের পেশিবহুল ইস্পাত-দৃঢ় পিঠখানা উম্মুক্ত। জানালার ফিনফিনে পর্দা ভেদ করে ছুটে আসা সামান্য রোদের ঝিলিক এসে আষ্টেপৃষ্ঠে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার ফর্সা দেহ। কোমরের বড্ড নিচে স্থান পেয়েছে সফেদ রঙা মোটা ব্ল্যাঙ্কেটটা। ফলে স্পষ্ট দৃশ্যমান মেদহীন পেটানো কোমরের ভি-শেইপের ঝাঁক। সেথায় বোধহয় গোটা গোটা রাশিয়ান হরফে ট্যাটুশৈলীতে কিছু একটা লিখে রাখা। সুদর্শনের দেহের এহেন নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকন হওয়া মাত্রই কন্ঠায় খরা নামলো মাহি’র।
পাদু’টোয় ভর করলো অদ্ভুত অসারতা। সে ঢোক গিললো পরপর। মনের অজান্তেই এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এগোলো বিছানার ধারে। মুগ্ধ মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে ডানদিকে। মাথার নিচের বালিশটা কেমন দু’হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে রেখেছে! মাহি নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালো সেথায়। চুপচাপ বেহায়ার ন্যায় দেখতে লাগলো সুদর্শনকে। সর্বদা হিং স্র গর্জনে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া লোকটা এখন কতটা শান্ত! মায়ার জোরে তাকিয়ে থাকা দ্বায় তার পানে। তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটোও বোধহয় বেশ মানিয়েছে মুখটায়। ঠোঁটের কোণে পিয়ার্সিং করা। লোকটার কি ব্যথা হয়না এসবে? মাহি ভাবতে লাগলো নিজে নিজে। লোকটার ফর্সা মুখশ্রীর সেকি জেল্লা! সে-কি তারচেয়েও ফর্সা? বোকা মানবী কৌতুহলবশত ধীরলয়ে নিজ ডানহাতটা এগিয়ে এনে দাঁড় করালো মুগ্ধের অভিমুখে। পরোখ করলো নিজের জেল্লার সঙ্গে! তবে ফলাফল দেখে মুখটা ভারী গোমড়া হলো মাহি’র। লোকটা তারচেয়েও দু-তিন শেড ফর্সা! কি একটা অবস্থা! ছেলেদের ওতো সৌন্দর্য দিয়ে কি হবে শুনি? বোকা সপ্তদশী গাল ফুলিয়ে চলে যাবার উদ্দেশ্যে পা ঘোরালো উল্টোপথে। একটা কদম বাড়ালো বোধহয়! ওমনি পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি! এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি। তড়াক ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই যাবে ঠিক তখনি কব্জিসন্ধিতে টান পড়ল প্রবল। ঘটনার আকস্মিকতায় তক্ষুনি চোখদুটো কুঁচকে নেয় মাহি। টানের রেশ কাটতেই নিজেকে আবিষ্কার করে কোনো এক শক্তপোক্ত বাঁধনে। মাহি চোখবুঁজে রেখেও বেশ বুঝলো নিজ অবস্থান। কিছুটা স্থির হয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে গেলেই কষ্ট টের পেলো সে। গায়ের ওপর বুঝি বিশাল দুটো বটগাছ ফেলে দিয়েছে কেউ। নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার উপক্রম বেচারির! এরইমধ্যে সে বেশ টের পেলো তার সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠায় মুখ ডুবিয়েছে রূঢ় মানব। টানছে জোরালো নিঃশ্বাস। নাক ঘষছে অনবরত! ঘুম জড়ানো মোটা কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ গুড মর্নিং সিগনোরা!”
মুহুর্তেই বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল মাহি’র। মুগ্ধের ঘুম জড়ানো বাক্যুটুকু কেমন অমৃতবাণীর ন্যায় গুঞ্জল তার কর্ণকুহরে। সে বোধহয় অন্তঃকোণে নিজেকেই প্রশ্ন ছুড়ঁল — পুরুষ মানুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠ এতো সুন্দর হয়? কই সে-তো আগে জানতো না এসব। মানবী ধীরলয়ে চোখ খুললো। ঘাড়টা সামান্য বাঁকাতেই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হলো সে। চোখদুটোর একদম সন্নিকটে সুদর্শনের মুখ। চোখদুটো বুঁজে রেখেছে সে। নাক-মুখ ডুবিয়ে রেখেছে মাহি’র মসৃণ কন্ঠায়। মাহি অগত্যা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ আপনি কি করে বুঝলেন আমি এসেছি?”
মুগ্ধ কি হাসলো? ঠোঁটজোড়ার প্রতিক্রিয়া দেখল না মাহি। তবে মসৃণ কপোলে টের পেলো মুগ্ধের রুক্ষ অধরযুগলের উষ্ণ পরশ। কর্ণকুহরে ভেসে এলো সে-ই মনোমুগ্ধকর কণ্ঠধ্বনি!
“ তোর গা থেকে আমার আমার ঘ্রাণ করে। তাই চোখ বন্ধ থাকা স্বত্বেও বুঝে গেলাম আমার অর্ধেক এসেছে!”
ক্ষুদ্র স্বীকারোক্তি! অথচ এটুকু স্বীকারোক্তিতে বিমুগ্ধ হাসতে গিয়েও থমকে গেল মাহি। মস্তিষ্কে তখন হুট করেই বেজে উঠল রূঢ় মানবের হিং স্রতার ক্রুর ধ্বনি। সহসা চোখদুটো বুঁজে নিয়ে অন্যত্র মুখ ঘোরায় মাহি। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়,
“ হাত-পা সরান বিস্ট! আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
কথাটা কেমন মাছি তাড়াবার ন্যায় উড়িয়ে দিলো মুগ্ধ। মেয়েটাকে আরেকটু চেপে ধরল নিজের সঙ্গে। অস্ফুটে আওড়াল,
“ অভ্যেস করে নে।”
“ পারব না। সরুন!”
তড়াক চোখদুটোর পর্দা সরালো মাফিয়া বিস্ট। কপাল গুছিয়ে তাকালো মেয়েটার পানে। একমুহূর্তে কি যে হলো তার কে জানে! সে কেমন আচানক হাত-পা ছাড়িয়ে আনলো মাহি’র ওপর থেকে। পরক্ষণে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ সরলাম! তারপর?”
ছাড়া পেয়ে তক্ষুনি স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো রমণীর বুক চিঁড়ে। যত্রতত্র উঠে যাবার প্রয়াসে কোনমতে শোয়া ছেড়ে খানিকটা উঁচু হতেই রূঢ় মানব ঘটালো আরেক কান্ড! চোখের পলকে তুলোর ন্যায় হালকা মানবীকে নিজ শক্তপোক্ত দু’হাতের কারিশমায় উঠিয়ে আনে নিজ কোলে। ঘটনাপ্রবাহের আকস্মিকতায় বেভুলার ন্যায় ভাব ধরে মাহি। খানিকটা স্থির হয়ে নিজেকে আবিষ্কার করে রূঢ় মানবের ওপরে, তা-ও সে-কি বেগতিক দশায়! লজ্জায় লাল হয়ে গেল মাহি। তড়িঘড়ি করে মুগ্ধের কোলের ওপর থেকে নামতে চাইলেই বাঁধ সাধে মুগ্ধ। একহাতের বলিষ্ঠ চাপায় আঁকড়ে ধরে সপ্তদশীর মেদহীন বাঁকানো কোমর। নিম্নাংশের অধর কামড়ে কেমন ভ্রু উঁচিয়ে সর্তক বাণী ছুড়ঁল!
“ উঁহুম হটি! ডোন্ট মুভ। নয়তো বন্দুক ছাড়া ফায়ার করতে খুব একটা সময় নিবো না আমি।”
লজ্জায় কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে মাহি’র। জড়সড়ভাব ধরল তৎক্ষনাৎ। মুগ্ধ ঠোঁট পিষে হাসল তা দেখে। কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া হুট করেই অন্যহাতটা খানিক ঘুরিয়ে এনে আলগোছে ঠেকালো নিজ মাথার নিচে। পরক্ষণেই নিজ জিম করা বলিষ্ঠ দেহখানা একপ্রকার টানটান করে নিয়ে, আচানক মাংসল বক্ষ পেশীদ্বয়ের বিন্যস্ত ছন্দ বাড়ালো বেয়াদব লোক। মেয়েটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে উচুঁ বক্ষপেশীর ছন্দ বাড়াচ্ছে সময়ের তালে তালে। আড়দৃষ্টে তা পরোখ করতেই লজ্জায় মরি মরি অবস্থা মাহি’র। গালদুটোয় লালাভ আবরণ লেপ্টে গেলেও কন্টে নামালো ঝাঁঝ!
“ কথায় কথায় বডি শো না করে কথা বলতে পারেন না আপনি, তাই না বেহায়া লোক?”
ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। চাপ বাড়ালো রমণীর বাঁকানো কোমরে ঠেকিয়ে রাখা হাতের। তীক্ষ্ণ স্বরে আওড়াল,
“ প্রশ্ন করলি? না উত্তর দিলি?”
মাহি বেশ বুঝল লোকটা নিজের কথা দিয়ে আবারও গুলিয়ে ফেলতে চাইছে তাকে। তাই তো মানবী তেজ বাড়ালো কন্ঠে,
“ এসব রূপ-যৌবনের বড়াই আর কতদিন করবেন নির্লজ্জ লোক?”
“ পার্সোনাল একটা ফুটবল টিম বানানো অব্ধি।”
মুগ্ধের পরপর নির্লিপ্ত প্রতুত্তর। তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই বোকা মানবী বিস্ময়ে চোখ তুললো। বিস্মায়াবিষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ মাফিয়া হয়েও আপনি ফুটবলে ইন্টারেস্টেড?”
তিক্ততায় গাল বাঁকায় মুগ্ধ। আচানক ডানহাতে মাহি’র উরু বরাবর খানিক হাত বুলিয়ে ভাবলেশহীন কায়দায় আওড়াল,
“ উহুম! আমি কেবল তোর ওপর ইন্টারেস্টেড। নেহাৎ পিচ্চি বলে এখনো ছাড় পাচ্ছিস! নয়তো এতদিনে ২-৪টা অন দা ওয়ে থাকতো।”
ফের মুগ্ধের ডাবল মিনিং বাক্যালাপে অতিষ্ঠ মাহি। মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ ছিঃ!”
শব্দটুকু জিভ খসানোর ফুরসত পেলো না বোধহয়, তার আগেই রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাত কেমন খামচে ধরল বোকা মানবীর গলার কাছের জামার একাংশ। অতঃপর এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে নিজের ওপর ঝুঁকিয়ে আনে মুগ্ধ। মাহি হতভম্ব! বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে মুগ্ধের পানে তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করে শুধালো,
“ খ-খবরদার অসভ্য লোক! সকাল সকাল আপনার এসব লুচুগিরী আমার সামনে দেখাবেন না। ছা- ছাড়ুন আমায়।”
শুনলেন না অভদ্র লোক! উল্টো নিজ বলিষ্ঠ বা-হাতের হেঁচকা টানে ফের আঁটকে নিলো রমণীর মেদহীন বাঁকানো কোমর! অন্যহাতে মেয়েটার জামার একাংশ আঁকড়ে রেখে চোখ রাখল রমণীর তিরতির করে কাঁপতে থাকা অধরযুগলের পানে। ধীরলয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“ লুচুর কাছে লুচুগিরী ছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায় না সিগনোরা! সো জাস্ট ফা’ক অফ দিস বুলশিট। একবার চলবে না-কি বলতো?”
ত্বরিত মুখ কুঁচকায় মাহি! বলিষ্ঠ পুরুষের শক্তপোক্ত হাতের রুষ্ট বাঁধন হতে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থেকে পরপরই ঝাঁঝিয়ে শুধালো,
“ অসভ্য বেয়াদব লোক! কোন দুঃখে যে এখানে এলাম আমি। ঘাট হয়েছে আমার! ঘটে বুদ্ধি থাকলে আর যদি কখনো এসেছি আমি!”
যুবক বাঁকা হাসলো। ধারালো দাঁতের রুষ্ট ছোঁয়ায় একমুহূর্তের জন্য কামর বসালো মাহি’র তুলতুলে নিম্নাংশের ওষ্ঠে। ওমনি বিষিয়ে ওঠে মাহি’র সর্বাঙ্গ। অতিষ্ঠ মানবী দাঁত খিঁচে অধর নাড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের হাস্কিস্বর!
“ নো প্রবলেম চাশমিস! নেক্সট টাইম থেকে তোর আর কষ্ট করে আসতে হবে না। আমি আছি তো! আমি-ই নাহয় চলে যাবো যখন-তখন!”
মুগ্ধের হাতের স্পর্শ বেপরোয়া হচ্ছে ক্রমশ! গড়িয়ে উঠছে সপ্তদশী ধনুকের ন্যায় বাঁকানো পিঠ বেয়ে। এহেন হুটহাট স্পর্শে কুপোকাত মাহি। নড়বড়ে কন্ঠস্বরে কোনমতে আওড়াতে উদ্যোত হলো,
“ আপনি….!”
বোকা মানবীর কথাটা পূরণ হবার ফুরসত পেলো না বোধহয়। তন্মধ্যে ঘরের হা করে খুলে রাখা দোরের কাছ থেকে ধেয়ে এলো এক মধ্যবয়সীর নাক সিটকানো অতি কর্কশ কন্ঠ!
“ ছ্যাহ! ছ্যাহ! সকাল সকাল কিসব নির্লজ্জতা দেখতে হচ্ছে গো মনা। বলি ঘরের দোর আঁটকে যা ইচ্ছে তা-ই করা যায় না? না-কি নিজেদের নোংরামো অন্যদের না দেখিয়ে শান্তি হচ্ছে না?”
তড়াক পিঠ সটান হলো মাহি’র। ঘাড় বাকাঁবে তার পূর্বেই দরজার পানে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো মুগ্ধ। চোয়ালের পেশি শক্ত করে বাজখাঁই কন্ঠে তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৪
“ বাড়িতে জায়গার অভাব পড়েছে আপনার মতো পাড়ার কুচুটে মহিলার? আমার ঘরে কি করব না করব, ওপেনলি করব না আঁটকে করব, তা বলার আপনি কোন ভেড়ার বা*ল? যাক কষ্ট করে এসেছেন যখন কাছে আসেন। আমি এখন ফুল মুডে আছি, আপনার সামনেই নাহয় রঙ্গলিলাটা শুরু করি। এতে অনেককিছু লাইভ শিখতে পারবেন আপনি। বুড়ো বয়সে কাজে দিবে! এটলিস্ট ভীমরতি বাড়বে!”
