প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৫
জান্নাত নুসরাত
~অতীতের শেষাংশ
আল-হারামাইন হসপিটাল। ঘড়ির কাটায় সময় চারটা। দূর দূরান্তের মসজিদ হতে আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরেছে।। করিডোর দিয়ে চলা হুইলচেয়ারে বসা নাছির সাহেবের চোখ চঞ্চল। ইসরাত ড্রাইভিং করতে চাইলেও জায়িন করতে দেয়নি। মানুষগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো ঠেকছিল না তার নিকট। হাত-পা অস্বাভাবিক রকম কাঁপছিল। তাই নিজ দায়িত্বে নিয়ে এসেছে তাদের৷ সৌরভি আর ইরহাম এখনো জানে না এই ব্যাপারে। তাদেরকে বলার সুযোগই পায়নি কেউই, যখনই অতর্কিত খবরটা পেয়েছে পাগলের মতো ছুটে এসেছে৷ সাতান্ন নাম্বার কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল সবাই। ইসরাত হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল নব। হালকা করে মোচড় দিতে গিয়ে বুঝল তার শক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। জায়িনের গলার স্বর পেছন থেকে ভেসে আসছে, নাজমিন বেগমকে বলছে,”মেঝ মা, প্যানিক হবেন না। রিলাক্স! শরীর খারাপ হয়ে যাবে। অল বিয়িং ওকে! জোরে শ্বাস টানুন!
জায়িনের কথা মতো শ্বাস টানলেন ভদ্রমহিলা। ইসরাত নিজেকে সামলে দরজা খুলতেই সাদা বেডে বসে থাকতে দেখা গেল আমিরাকে। অক্ষিকোটর ঘুরে গেল আলগোছে পুরো রুমজুড়ে। না কোথাও নেই নুসরাত! আবারো ভালো করে তাকাল, না নেই! তবে কী আহান মিথ্যে বলল সবাইকে! ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই আহান বলে ওঠল,”ভেতরে ঢোকো!
ইসরাতের পা আগানোর সামর্থ হলো না। আহান কী বুঝল বোঝা গেল না। শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল কুনুই অব্দি। যতক্ষণে ইসরাত টের পেল সে কারোর বাহুর মধ্যে ততক্ষণে সে শূণ্যে ভাসছে। আহান তাকে কোলে করে নিয়ে বসাল সোফার উপর। নাছির সাহেব হাসছেন শোনা গেল। নাজমিন বেগম জায়িনের গায়ে ভর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বলে ওঠলেন,”ব্যাটা হয়ে গেছিস দেখি? আগের মতো আর বাচ্চা নেই আমাদের, আহান? এবার তো বিয়ে দিতে হবে, ভালো একটা মেয়ে দেখে!
আমিরার মুখ কালো হয়ে গেছে কথাটা শোনেই। নাজমিন বেগমের কথা কেটে দিল আহান। মৃদু স্বর ভাসল গুঞ্জনের মতো,”অনেক আগেই বিয়ে করে নিয়েছি আমি, মেঝ মা!
ভদ্রমহিলা ঈষৎ হেসে আমিরার দিকে তাকালেন। চোখ দুটোতে উজ্জ্বলতা খেলছে। খোঁচা দিয়ে বললেন,”আহানের বউয়ের কাছ থেকে পুড়া পুড়া গন্ধ আসছে নাকি!
কথাটা শেষ করে হেসে উঠলেন সবাই। তাদের কথায় ব্যাঘাত ঘটাতে বড্ড গম্ভীর, ভারী মেয়েলি স্বর শোনা গেল,”সুখী পরিবারের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দেখি। আমাকে এখানে তো প্রয়োজন মনে হচ্ছে না?
কথা শেষে টেনে টেনে বলতে শোনা গেল,”আরেএএ জায়িন ভাই যে! অল ফিটফাট? কবে দেশে আসলেন? আমি টপকে গেছি শোনে এসেছেন নাকি?।
ঢিপঢিপ করা বুকের হৃৎস্পন্দন নিয়ে শব্দের উৎস খোঁজার জন্য সবাই তাকাল ওয়াশরুমের দরজার দিকে৷ সাদা দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ফ্যাকাশে বর্ণের এক মেয়েকে। গায়ে হসপিটালের কাপড়। ফাটা শুকনো ঠোঁট! হাতের মধ্যে ক্যানেল লাগানো। কপালে, ঠোঁটের কাছে ব্যান্ডেট করে রাখা৷ উঁচু নাকটা শীতের জন্য জমে গিয়ে লাল বর্ণের হয়েছে। কালো মণির নেত্রগুলো সময়ের সাথে আরো বেশি জ্বলজ্বল করে উঠছে৷ ইসরাত এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেল। নুসরাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গালে স্পর্শ করল। ধীরে ধীরে স্পর্শটা আরো গাঢ় হলো। গাল, মুখ, ঠোঁট থেকে সরে গিয়ে দাবিয়ে দিল চেহারটা। চোখ বন্ধ করে মেয়েটা উচ্চারণ করল,”এতদিন কোথায় ছিলি তুই? জানালি না কেন?
নুসরাত ভ্রু কুটি করল। টু শব্দটি করার আগেই তার গায়ের উপর হামলে পড়ল ইসরাত। দু ইঞ্চি লম্বা নুসরাতের কাঁধে হামলে পড়ল দেড় বছরের বড় বোনটা। দু-হাতে আঁকড়ে ধরল মেয়েলি পিঠ। কান্নার স্বর চেপে গিয়ে চ্যাঁচানোর মতো শব্দ ভাসল,”এইইইই, কোথায় ছিলি তুই? এতদিন জানালি না কেন? আমাদের, আমাদের কথা তোর একবারো মনে পড়েনি? আমরা তোকে ছাড়া কীভাবে থাকব সেটা ভেবেই তো একটা কল করতে পারতি? করলি না কেন? বল, বল, করলি না কেন?
ইসরাতের দেহের ভার সামলাতে গিয়ে ক্যানেলে টান পড়ে, সামান্য রক্ত উঠে যেতে দেখা যায় স্যালাইনের ভেতর। জায়িন এগিয়ে আসতে যাবে, নুসরাত থামিয়ে দেয় হাতের ইশারায়। বিড়বিড়িয়ে বলে,”থাকুক, কেঁদে নিক!
কান্নার চোটে ভিজে যায় নুসরাতের কাঁধ। ইসরাতকে ঠেলে আহান এসে জায়গা করে নেয় সেখানে। ছোটবেলার মতো ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। নুসরাত কপাল কুঁচকে চেয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে ভীষণ কষ্টে হাসে। কাঁধে ব্যথা পাচ্ছে ভীষণ রকম, তবুও ব্যাথার ছাপ ফুটে ওঠে না মুখে। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। আহানের শক্ত সামর্থ শরীরটা সামলাতে ছোটোখাটো নারীদেহ টলে যায়। গুঙিয়ে উঠে সে! সটান দাঁড়িয়ে থেকে দু-জনকে থামানোর বৃথা প্রচেষ্টা করে। পুরুষালি কান্না আর মেয়েলি কান্নার ভারে পুরো রুমের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
ভাই বোনদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় চোখ বেয়ে এক ফোটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ে আমিরার। চাচাতো ভাই বোনদের ভেতর এত মায়া মহব্বত কখনো দেখেনি মেয়েটা। নিজেও ফুপিয়ে ওঠে। আহান অভিযোগ করছে! সবসময় গম্ভীর, বিরক্ত হতে থাকা ছেলেটা বাচ্চাদের মতো করে চ্যাঁচাচ্ছে,”তুমি এত নিষ্ঠুর, আমাদের জানালে না কেন এখানে তুমি? আর আমি কিনা তোমার জন্য কান্না করেছি, তুমি নেই ভেবে? এইইই, আপুউউউ!
নুসরাত পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। শান্ত করার বৃথা প্রচেষ্টা করে। বলে,”আহান, তোর বউ দেখছে!
আহান সেসব কথা কানে তুলে না, ভাই বোন দু-জনে পাল্লা দিয়ে কাঁদে। চিৎকারে পুরো কেবিন ভারী হয়ে ওঠে। জায়িন এসে আহানকে টেনে সরায়। কঠোর স্বরে ধমকে ওঠে,” পেশেন্টকে এভাবে কেঁদে কেটে তোমরা সবাই আরো বেশি অসুস্থ বানিয়ে ফেলবে। দূরে সরো সবাই!
আহানকে টেনে সরালেও তার কান্না থামতে ঘন্টা খানেক সময় নিল। দু-জনেই হেঁচকি তুলল। নুসরাত নাছির সাহেবকে জড়িয়ে ধরল। বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বলল,”কী একটা অবস্থা করেছেন আপনি নিজের, আব্বা? এটা কোনো কথা হলো? কিছু হলেই আপনি নিজে চিৎ হয়ে পড়েন? আমাদেরও একটু চিৎ হওয়ার সুযোগ দেন!
নাছির সাহেব একহাতে মেয়ের পিঠ জড়িয়ে ধরলেন। নুসরাত অনেকক্ষণ বাবার গলা আঁকড়ে বসে রইল।
বুকটা ফাঁপা, ভার ছিল! গুলি খাওয়ার পর তিনদিন তার হুঁশ ছিল না। যখন জ্ঞান ফিরল তখন সবকিছু ঘোলাটে ছিল। মিনিটের জন্য হুঁশ ফিরত, আবার ঢলে পড়ত সে নিদ্রায়। আল হারামাইন হসপিটাল রোগীর প্রাইভেসির বিষয়ে খুবই কঠোর৷ তাই এই খবর একটা কাক পক্ষি টের পায়নি। ইউনিমার্ট থেকে আল হারামাইনের দূরত্ব দশ মিনিটের। নুসরাতকে যখন রাস্তা পাশ থেকে তুলে নিয়ে আসা হলো তখন সে রক্তে লেপ্টে ছিল। চেহারা দেখে বোঝার যো ছিল না মানুষটা কে! সপ্তাহখানেকের বেশি দিনের ট্রিটমেন্টে পর নুসরাত আজকের অবস্থায়। সে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে! ঘাড়ে, কপালের একপাশে পুড়ে গিয়েছে! বোম ব্লাস্টের শব্দটা এখনো তার কানে ভাসে! যখন গুলি তাকে এফোড় ওফোড় করে চলে গিয়েছিল কী তীক্ষ্ণ ব্যথাই না হয়েছিল! অতিরিক্ত ব্যথার জন্যই জ্ঞান হারিয়ে ছিল সেদিন। আর নুসরাত মনে করেছিল কী! সে মরে যাচ্ছে! মৃত্যু তাকে হাতছানি দিয়ে নিতে চলে আসছে! কিন্তু না মৃত্যু আসেনি৷ সেবার তাকে নিতে আজরাইল (আঃ) আসেননি। নুসরাত বেঁচে ফিরেছিল, এখন সে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিবারের সামনে। প্রিয় মুখগুলোকে দেখতে পাচ্ছে।
জীবনে কখনো মিরাক্যাল হতে দেখেনি নুসরাত, কিন্তু নিজের সাথে হতে দেখেছে। তার যেদিন পুরোপুরি জ্ঞান ফিরল সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিল। পরিচিত ডাক্তার আন্দ্রে ভলকব। তব্ধুল হয়ে চেয়ে ছিলেন তার দিকে। ভদ্রলোক কখনো দেখেননি নুসরাতকে এভাবে, তাই! অবাক চোখে দৃষ্টিপাত করছিলেন তাকে৷ নুসরাতের কথা জানাতে চেয়েছিলেন সৈয়দ বাড়ির সবাইকে, কিন্তু নুসরাত তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। বলেছে বিছানায় এভাবে পড়ে থাকতে দেখলে সকলের অবস্থা আরো খারাপ হবে। তাই চেপে গিয়েছিলেন ডাক্তার আন্দ্রে। নুসরাতের শরীর খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠেছিল। বেশি সময় নেয়নি রোগ সারিয়ে তুলতে। শুধু পুড়া দাগ থেকে গেছে। নুসরাত এক সন্ধ্যায় আন্দ্রের কাছে মোবাইল চাইল, যখন তিনি সন্ধ্যার শিফটে এসেছিলেন। খ্রিষ্ট ধর্মের লোকটা ভেবেছিল বাড়ির সবাইকে কল দিবে নুসরাত, কিন্তু না সে ফেসবুক স্ক্রল করল৷ তার মতো পেশেন্টরা এত বড় ধাক্কা সামলে ওঠলে কান্না করে প্রতিদিন, নিজেদের চেহারার একাংশ পুড়া দেখলেও তারা হীনমন্যতা ভোগে, নিজেদের ফেলনা মনে করে, সেদিক থেকে এই মেয়ে যেদিন পুরোপুরি রুপে জ্ঞান ফিরেছিল ওইদিন কেঁদেছে শুধু।
বত্রিশ বছরের আন্দ্রে নুসরাতের এমন অদ্ভুতুরে কান্ডে মুগ্ধ হলেন তার উপর৷ তিনি ওই বাড়ির মানুষগুলোকে চেনেন বহু পূর্ব থেকে৷ ব্যবসাতে নাম করা পরিবার৷ নিজেদের নাম দিনে দিনে বিস্তার করছে তারা। উপশহর, শাহপরান, শহরের যাকেই জিজ্ঞেস করা হবে, স্থায়ী মানুষ হিসেবে এক নিমেষে তাদের কথা বলে দিতে পারবে। সেই বাড়ির মেয়ে মারা গিয়েছে এটা জানে না এমন লোক কমই আছে। আন্দ্রে নিজেও মনে করেছিল নুসরাত আর বেঁচে নেই, কিন্তু যখন রক্ত পরিস্কার করা হলো, মেয়েলি চিরাচরিত মুখটা বেরিয়ে আসলো তখন ভীষণ অবাক হলো। তার চোয়াল ঝুলে পড়ল! নুসরাতের মুখটা আহত অবস্থায় তখনো হাসছে। ঠোঁটের কোণে যেন ঝুলছিল মিষ্টি হাসি। আন্দ্রে অনেকবার বলেছিল নাছির সাহেবকে জানিয়ে দিবে সংবাদটা, নুসরাত মানা করে দিয়েছিল স্পষ্ট কন্ঠে। তাকে চূড়ান্ত পর্যায়ের আশ্চর্য করে দিয়ে বলল,”কাঁদুক, একটু শোক মানাক আমি মরে যাওয়ার। তাহলে হৃৎপিন্ড বড় হবে।
কথা শেষ করে পাগলের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। গতকাল রাতে তাকে জানাল আজকে যাতে জানিয়ে দেয়। আহান নামের ছেলেটাকে কল দেওয়ার পর যখন ছেলেটা আসলো তখন মাথার উপর তুলে ফেলেছিল পুরো হসপিটাল। নুসরাতকে বেডে বসে থাকতে দেখে একবার হাসল, একবার কাঁদল৷ উঁচু লম্বা নারী দেহটা কোলে তুলে ফেলল। পারিবারিক মিলবন্ধন দেখলেন আন্দ্রে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মিষ্টি একটা পরিবার! সবাই হাসছে, কথা বলছে, নিজেদের কষ্ট অনায়াসে জাহির করছে একে অন্যের নিকট, মন জুড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য অনেকক্ষণ দেখলেন তিনি, অতঃপর ফিরে গেলেন নিজের শিফটে, আজ আর নুসরাতের কেবিনের ঢুকলেন না।
সেদিন রাতে হসপিটালের মাঝারি আকারের কেবিনে থেকে গেল সবাই। নুসরাত নিজের বেড ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসে পড়ল। ইরহাম কল দিল সন্ধ্যার দিকে, যখন জিজ্ঞেস করল সবাই কোথায়, আহান শুধু বলল,’আগামীকাল এসে জানাব, আজ আর রাতে বাড়ি ফিরছি না!’ ইরহামকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিল। নুসরাত সোফায় বসে ছিল এক পা তুলে। আহান তার মুখটা দু-হাতের আজলায় ভরে নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। নুসরাত ভ্রু কুঞ্চন করতেই আহান তার গালে চটাস করে একটা চুমু খেল। গাঢ় ভাঁজ পড়ল মেয়েটার কপালে! গাল মুছে নিল হাতের তালু দিয়ে। আহান আবারো চুমু খেল। নুসরাত আবারো গাল মুছে নিল। একবার দু-বার তিনবার করে শতবার চুমু খেল আহান। ভেজা চুমুর চোটে নুসরাতের মুখটা ভিজে উঠল। তেতিয়ে ওঠা মেজাজে মেয়েটা চ্যাঁচাল,”খাচ্চোরের বাচ্চা, থুথু লাগিয়ে দিচ্ছিস সারা মুখে! সর.. চ্যাহ..
আহান সেসব কানেই তুলল না, আবারো গালে চটাস চটাস করে চুমু খেল। নুসরাত থাবড়া বসিয়ে বলল,”চুমু খেতে চাইলে তোর বউকে গিয়ে চুমু খা, শ্লা..! যাহ্.. সর এখান থেকে।
কাছে বসা আমিরা লজ্জায় লাল নীল হয়ে গেল ননাসের কথায়। নুসরাত ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আহানকে ইশারায় কিছু একটা দেখাতেই আহান নিজেও হেসে ফেলল হা হা করে।
পরের দিন সকালে আল হারামাইনের সকল বিল পে করা হলো৷ প্রায় এগারোদিন ভর্তি থাকায় বড় অংকের একটা বিল আসলো। ইসরাত কার্ড দিয়ে বিল পে করতে যাবে, জানানো হলো আগেই বিল পে করে দেওয়া হয়েছে। ইসরাত আহানকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু উত্তর আসলো সে করেনি। তাই সে আবারো রিসিপশনে ফিরে গিয়ে বলল,”বিল পে তো আমাদের কেউ করেনি, ভুল হচ্ছে, একবার চেক করে দেখুন।
মেয়েটা আবারো চেক করে বলল বিল পে করা হয়ে গেছে। ইসরাত বলল,”একটু বলতে পারবেন কে বিল পে করেছে?
রিসিপশনের মেয়েটা এক মিনিট দাঁড়ানোর কথা বলে নিজের কম্পিউটার চেক করল। বলল,”সৈয়দ জায়িন হেলাল করেছেন।
ইসরাত তপ্ত শ্বাস ফেলল বাঁ দিকে মাথা ঘুরিয়ে। জায়িন এখানে নেই, পার্কিং থেকে গাড়ি বের করার জন্য গিয়েছে।
নুসরাতকে নিয়ে বাড়িতে আসতে আসতে প্রায় এগারোটার কাছাকাছি বাজল। বাড়ির ভেতর গেল না সে। গায়ে সাধারণ একটা শার্ট ছিল তার। নাজমিন বেগমের কাছ থেকে ওড়না নিয়ে আগাল কবরের দিকে। মাথায় প্যাঁচিয়ে নিল ওড়না। বড় লোহার গেটে বড় বড় অক্ষরে লিখা কবরস্থান৷ নুসরাত গেট ঠেলে সামনে আগাল। যত আগাল স্পষ্ট হলো নতুন কবরটা। তার নামের নেমপ্লেট দেখে হাসল একটু। ভাগ্য সহায় না হলে হয়তো সে এ জায়গায় থাকত। মাটির মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসল। মাটির দিকে নির্মিশেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ডাকল,”রুবা?
অপাশ থেকে উত্তর আসলো না, নুসরাত আবারো ডাকল,”রুবা?
ঠোঁট কামড়ে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। কান্নাকাটি জুড়ে দেওয়া তার ধাঁচে যায় না। সে অনেকক্ষণ কবরের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের মধ্যে সামান্য জলের ছাপ দেখা গেল, তা ও মিলিয়ে গেল! আমিরা চেয়ে ছিল অবাক নয়নে ননাসের দিকে। ভদ্রমহিলা কাঁদছেন না কেন, সেটা ভেবেই তার মাথা হ্যাং হয়ে গেল। দেখা গেল এক মুঠো বালু কবরের উপর ছিটিয়ে দিচ্ছেন। অস্ফুটে উচ্চরণ করলেন,”জান্নাতের উচ্চ মাকাম আল্লাহ তোমাকে দান করুক, রুবা! তোমার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।
আর কোনো বাক্য উচ্চারণ হয়নি মেয়েলি ঠোঁট দিয়ে। আমিরা ভাবল একটু কষ্টের কথা বলবেন এবার তার ছোট ননাস কিন্তু তা হলো না! চুপচাপ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাত দুটো তুললেন৷ নিজ মনে কিছু একটা বিড়বিড় করে পড়লেন। তারপর দোয়া শেষ করলেন।
নির্বিচ্ছন্ন চেহারার আদল তখনো বজায় রইল! ছোট বেলায় যেভাবে তারা কোনো ব্যক্তি মরে যাওয়ার জন্য এক মিনিট স্থির থেকে শোক পালন করত, এখানেও সেরকম হচ্ছে। আমিরার বাড়ি হলে তো এতক্ষণে কবরস্থান গমগম করে উঠত। এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকত না। আমিরার অবাকতার ভেতর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল নুসরাত। নাছির সাহেব আর নাজমিন বেগম ছিলেন বাহিরে দাঁড়ানো, নুসরাত তাদের রেখেই দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। করার পরপরই ইরহামের গলার আওয়াজ ভেসে এলো,”তোমরা গতকাল কোথায় ছি…
কথা শেষ করার আগে তাকে থামতে হলো, সামনে সদৃশ্যমান ব্যক্তির পিঠ দেখে৷ টেবিলের কাছে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, গ্লাসে পানি ঢালছে। কথাগুলো দলা পাঁকিয়ে ঠোঁটের ডগায় থেমে গেল ইরহামের। চোখের ভুল ভেবে, পাতা ফেলল দুয়েকবারের জন্য। হৃৎস্পন্দন বাড়ল। তাল বেতাল হয়ে উঠল৷ সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসলো ছেলেটা। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শব্দ হচ্ছে। এক-পা দু-পা করে আগাল যত, বুকের কম্পন বাড়ল ততো। এই কয়েকদিনে নুসরাত নুসরাত যে গন্ধটা মিলিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে, কুস্তুরীর সুবাস পাওয়া যেত না, আজ বাড়িতে যেন সেই মন মাতানো কুস্তুরীর গন্ধটা আবারো ফিরে এসেছে। চারিদিক থেকে ভেসে এলো কুস্তুরীর সুবাস। গায়ে জড়ানো আহানের মিন্ট কালারের শার্ট। মেয়েটা হাতে পানির গ্লাস নিয়ে ফিরে তাকাল। পর্দা দিয়ে আসা আলোয় কোমরের উপর পরে থাকা রেশমের মতো চুলগুলো চকচক করছিল সেসময়। ইরহাম মেয়েটার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখাচোখি হতেই বেচারা ছেলেটা নিজের শ্বাস নিতে পারল না, চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেল। নিজের হাত দুটো শূণ্যে তুলে দেখল, এই দু-হাতেই তো কবরে রেখে এসেছিল। এই দু-চোখ দিয়েই তো শেষ বিদায় দিয়ে এসেছিল, তাহলে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ তার সামনে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে? নিজের হাতের দিকে একবার তাকাল, একবার তাকাল সামনের ব্যক্তির দিকে। বাতাসে মাথায় প্যাঁচানো ওড়নাটা উড়ছে। ইরহাম ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় অতিরিক্ত সময় ধরে শ্বাস চেপে রাখার জন্য ঢলে পড়ল মেঝেতে। সাথে করে পড়ল নুসরাতের হাতের কাচের গ্লাসটা। ঝনঝন করে শব্দ করে ভেঙে গেল। কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ইরহাম শুধু দেখতে পেল বাড়ির সবাই তার দিকে দৌড়ে আসছে। চিৎকার করছে তা শোনা যাচ্ছে, আর কেউ তাকে ধরে রেখেছে। এটা আর কেউ ছিল না নুসরাত ছিল!
যখন জ্ঞান ফিরল ইরহামের তখন আবারো দেখল মিন্ট কালার শার্ট পরা নুসরাতের মতো দেখতে মেয়েটা তার দিকে ঝুঁকে আসছে। ভয়ে চোখ খিঁচে ফেলল এরপর তার আর কোনো কিছু মনে নেই! আবারো জ্ঞান হারিয়ে ছিল সে। ইসরাত নুসরাতকে টেনে দূরে সরাতে পারল না ইরহামের কাছ থেকে, ছেলেটা যতবার ঝাপসা চোখ খুলে তাকাল ততবার নুসরাত তার মুখের কাছে ঝুঁকে কপাল কুঁচকে হাসল। ঘন্টাখানেক দু-জনের এমন নাটক চলল, অতঃপর যখন ইরহাম নিজেকে সামলে ওঠল তখন নুসরাত সোফার উপর বসে আঙুর খাচ্ছে। ছেলেটার পানে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। ইরহাম দু-হাত মেলে দিয়ে ভারী স্বরে বলল,”এদিকে আয়, জড়িয়ে ধরব তোকে।
নুসরাত অবাক কন্ঠে বলল,”আমি কেন আসব? তুই জড়িয়ে ধরবি তুই আয়!
ইরহাম এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। নাকি স্বরে জিজ্ঞেস করল,”এতদিন কোথায় ছিলি? আমাদের জানালি না কেন? লাশ থেকে জিন্দা হয়ে উঠে এলি কীভাবে?
নুসরাত সে কথার উত্তর দেয় না। ত্যক্ত কন্ঠে বলে ওঠে,”তোরা সবগুলো শুধু আমি কোথায় ছিলাম এটা জানতে চাস কেন? আমি বেঁচে আছি দেখে খুশি হোসনি?
ইরহাম পিঠ চাপড়ে দিল। বলল,”আর কিছু জিজ্ঞেস করব না। চ্যাঁতিস না! আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরছি, ব্যথা পেলে বলিস, আরো জোরে ধরব।
জীবন প্রবাহমান! সেই জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায় আমাদের চিন্তাভাবনার বাহিরে। কখনো জীবন বয়ে আনে সুখের সাগর, কখনো বা দুঃখের পাহাড়। অনেকসময় মিরাক্যাল এর মতো অনেক কিছু ঘটে যায়৷ নুসরাত বাড়িতে ফিরে আসার পর নিয়ম করে দু-বার তাকে জড়িয়ে ধরে ভাই বোন। এতে আহ্লাদ নুসরাত ঠিক সয়ে উঠতে পারছে না। এদের এত প্রেম দেখে তার মাথা ঘোরাচ্ছে। নাজমিন বেগম এতদিন চিৎ থাকলেও নুসরাত ফিরে আসার পর একদম চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। নানা রকম রান্না করে খাওয়াচ্ছেন তাকে। নাছির সাহেবের সাথে প্রতিদিন নিয়ম করে দাবা খেলে সে৷ সৈয়দ চয়েসে সকাল নয়টা ইরহামকে দেখা যায় একচোখ বন্ধ করে যেতে যেতে। নুসরাত হাসে! গতকাল ওজন মেপে ছিল, পঞ্চাশ কেজি হয়ে গেছে। গাল দুটো আগের তুলনায় ফুলে ফেঁপে উঠছে। চেহারার রঙ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে দিনে দিনে।
বুধবার রাত। ঘড়ির কাটায় তখন আটটা বাজছিল।অনিকার কাছ থেকে কল এসেছে জায়িনের কাছে। প্রথমে কল ধরতে গিয়ে থেমে গেল জায়িন, অতঃপর কী মনে করে কল ধরল। কানে মোবাইলটা চেপে ধরতেই গড়গড় করে বলতে শোনা গেল অনিকাকে,”জায়িন ভাইয়া, আঙ্কেলকে জানিয়ে দিবেন আমি আরশকে বিয়ে করব না। দুঃখিত!
জায়িন বোঝানোর চেষ্টা করল অনিকাকে, কিন্তু মেয়েটা কোনো কথাই কানে তুলল না। কেঁদে কেটে একাকার। বলল,”ওই লোকের বিন্দুমাত্র আমার প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। আমি কীভাবে এমন লোককে বিয়ে করব? আঙ্কেলকে আমি মানা করতে পারব না, প্লিজ আপনি না করে দিবেন। নিজের ব্যক্তিত্বের বাহিরে গিয়ে, একটা লোকের পেছনে অনিকা খান তো আর ছ্যাঁচড়ার মতো পড়ে থাকতে পারেনা৷ আমার ও তো আত্মসম্মান বলতে কিছু আছে!
জায়িন মোবাইল নিয়ে ধরিয়ে দিল হেলাল সাহেবের কাছে। ভদ্রলোক বোঝানোর চেষ্টা করলেন বিয়ে করার জন্য। অনিকা কী রাজী হলো নাকি রাজী হলো না তা বোঝা গেল না! সেই রাতে বাড়ির সদস্যদের নিয়ে আলোচনায় বসল জায়িন। আরশকে সেই আলোচনায় রাখা হলো না। ভ্রু কুঁচকে শুধু ছেলেটা দেখে গেল সবার লুকোচুরি। খুব একটা পাত্তা দিল না সেসব।। জায়িনের কথায় দরজা লাগিয়ে দেওয়া হলো। আমিরা ছোট সদস্য হওয়ায় তাকে নেওয়া হলো না আলোচনায়। মমো যখন দরজা লাগাতে গেল, দেখল আরশ আর আমিরা দু-জনের দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে৷ চেয়ে আছে তাদের দিকে কপাল কুঁচকে। আমিরার মুখটা থমথমে। আরশ ভাইয়াকে নিয়ে আলোচনা হওয়ায় তাকে নেওয়া হচ্ছে না ভেতরে, কিন্তু সে তো এ বাড়ির বউ! তাকে কেন নেওয়া হলো না! ছোট বলে কেন বের করে দিল! এত বড় অপমানের পর তার কী করা উচিত? কিছু করার নেই৷ থমথমে মুখটার উপর ঘটাং করে সবাই দরজা লাগিয়ে দিল। আড়চোখে ভাসুরের পানে একবার তাকাল আমিরা, মুখটা নির্লিপ্ত। একহাত পকেটে পুরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তাকে তাকাতেই দেখে ভ্রু উচিয়ে নিষ্পৃহ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,”আহানের বউ?
গলার স্বরটা শোনে মাত্রই আমিরার গা বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। মাথা দুলিয়ে আলগোছে কেটে পড়ল ওই জায়গা থেকে। জায়িনই কথা শুরু করল। বলল,”যে জন্য আলোচনা সভাটা বসিয়েছে, তার কারণ হয়তো ধরতে পারছেন না আপনারা। আমি সব খুলে বলছি।
শোহেব সাহেব, সোহেদ সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। হেলাল সাহেব বললেন,”হেয়ালি না করে সরাসরি কথা বলো, জায়িন।
জায়িন খুব একটা দীর্ঘ করল না, নিজের বক্তব্য। কথা বলা শুরু করল,”নুসরাত বেঁচে আছে। যে মেয়েটা নুসরাত ভেবেছিলাম আমরা ওই মেয়েটা ওর পি.এ ছিল। ও বেঁচে আছে এটা সবথেকে বড় মিরাক্যাল। যাই হোক, আরশের সাথে অনিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে আমরা সবাই জানি। কিন্তু অনিকা তো বিয়েটা করতে চাচ্ছে না, তাই আমি ভাবছি আরশের সাথে নুসরাতের বিয়েটা দিয়ে দিলে কেমন হয়!
হেলাল সাহেব দ্বিমোনা করলেন,”ওদের তালাক হয়ে গেছে…
আরো কিছু বলতে চাইলেন তার আগেই শোহেব সাহেব থামিয়ে দিলেন। একে একে সব ঘটনা খুলে বললেন। যেহেতু লিগ্যাল পেপার ছিল না, আর সেখানে তালাকের বিষয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ ছিল না তাই শরিয়ত মোতাবেক তালাক হয়নি। কথা শেষ করতে পারলেন না ঝর্ণা বেগম ধুপ করে একটা কিল বসালেন স্বামীর বাহুতে। বললেন,”আগে জানালে না কেন আমাদের এই বিষয়ে? চেপে ছিলে কেন এতদিন?
শোহেব সাহেব বললেন,”সময় সুযোগ হয়ে উঠেনি তাই বলা হয়নি।
রুহুনী বেগম জায়িনের কথাটায় ফিরে যেতে বললেন,”জায়িব আব্বা যা বলছেন তা ঠিক। যেহেতু আরশ আব্বা পছন্দ করেন নুসরাত আম্মাকে, তাহলে এখানে দ্বিমত পোষণ করার কোনো মানে হয় না। বিয়ের আগে আরশ আব্বা আর নুসরাতের আম্মার একবার দেখা করিয়ে দিলেই হবে।
রুহিনী বেগমের কথা শেষ হতেই সবাই সহমত পোষণ করলেন। সোহেদ বললেন,”একমিনিট, মেঝ ভাই রাজী হবেন? উনার তো মত নিতে হবে?
জায়িন বলল,”আমি মত নিয়ে নিব। চিন্তার করার কোনো কারণ নেই এই বিষয়ে।
আহান নিজের কথা রাখল এবার,”ছোট ভাইয়া যেহেতু জানে না, তাহলে তাকে জানানোর দরকার নেই। আম্মুর কথা মতো তাদের দেখা করিয়ে দিব আগামীকাল।
সবাই নিজেদের মধ্যে অনেক কথা বলল বিয়ে নিয়ে। হেলাল সাহেব টু শব্দটি করলেন৷ মিটিং শেষে একে একে বের হওয়া সবার মুখ দেখা গেল উৎফুল্ল, কিন্তু শুধু হেলাল সাহবের মুখটা গোমড়া। মুখ কুঁচকে স্ত্রীকে বললেন,”তুমি জানতে, নাছিরের মেয়েটা বেঁচে আছে?
লিপি বেগম মাথা দোলালেন নীরবে। হেলাল সাহেব কিছুটা হতাশ হলেও কিছু বললেন না। তিনি এ জীবনে স্বার্থপর হয়েছেন শুধু নিজের সন্তানদের জন্য। কে স্বার্থপর না নিজের সন্তানের বেলা! সে তো একজন পিতা, সেজন্যই তো আজ সবার কাছে খারাপ। নিজের ছেলেদের কাছেও খারাপ! এবার আর তিনি নিজের মন মর্জি কিছুই করবেন না, সব ছেড়ে দিবেন আল্লাহর উপর। যা হবে দেখা যাবে। একটা বাক্য ব্যয় করবেন না। যাই হয়ে যাক না কেন।
বৃষ্টিস্নাত বৃহস্পতি বার সকাল। ঘড়ির কাটায় বাজছে সন্ধ্যা ছয়টা। বিছানার উপর শুয়ে আপেল খাচ্ছিল নুসরাত। দলবল বেঁধে ইসরাত,আহান, ইরহাম, সৌরভি, মমোকে আকস্মিক তার রুমে প্রবেশ করতে দেখা গেল। নুসরাত উঠে বসার পূর্বেই গাদাগাদি করে সকলেই জায়গা দখল করে নিল নিজেদের। ধড়াম ধড়াম করে এসে বসল সবাই। বিছানাটা এত ভারে সামান্য নড়ে উঠল। নুসরাত নিজের হাতের খাবারগুলো আলগোছে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল, তার পূর্বেই সেগুলো কেড়ে নিয়ে মুখে ঢুকিয়ে নিল সবাই গপাগপ। নুসরাত উঠে বসতে বসতে চুলগুলো বান করল ঢিলে করে৷ কয়েক গাছি চুল কপালে মুখে, ঘাড়ে পড়ে রইল। পা দুটো সরিয়ে সৌরভি আর আমিরাকে বসার জায়গা করে দিল। আমিরার বিস্ময়ে ভরপুর চেহারাটা দেখে সৌরভি বলল,”ওরা এমনই করে, এত অবাক হওয়ার কিছু নেই! বসো তুমি!
আমিরা মাথা দুলিয়ে আলগোছে বসে গেল। নুসরাত জিজ্ঞেস করল,”সন্ধ্যা বেলায় আমার রুমে কী চাই?
ইরহাম কথা মেলল আস্তেধীরে। বলল,”মেঝ বাবার অবস্থা তো তুই দেখছিস?
গম্ভীর মুখটা কুঁচকে গেল। বলল,”সে তো প্রতিদিন দেখছি। আব্বার অবস্থা এখন আগের তুলনায় মাচ বেটার, তো কী হয়েছে? হেয়ালি করবি না ইরহাম আমার সাথে? সরাসরি কথা বললে বল, নাহলে ভাগ।
ইসরাত নিজের কানের পেছনে খুলে রাখা ভিজে চুলগোল গুজে ফেলল। বলল,”আব্বু চাচ্ছে তোকে বিয়ে দিতে।
নুসরাত ঠাট্টা করে হেসে উঠল। নাকের ডগায় চুলকে বলে উঠল,”আমার বিয়ে?
মমো মাথা দোলাল। ইরহাম বলল,”মেঝ বাবা চাচ্ছেন তোর বিয়ে দিতে। উনি ঠিক করেছেন আগামীকাল তোর বিয়ে দিবে। ছেলে ভালো, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো, নিজেদের ব্যবসা আছে, আর…
নুসরাত থামিয়ে দিল। আঙুল তুলে বলল,”আমি ছেলের বায়োডাটা শুনতে চাইনি, ইরহাম। আমার বিয়ে ঠিক করেছে, আমি জানি না সেটা, বিষয়টা জোকস মনে হচ্ছে না?
তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠল নুসরাত। আমিরা বিছানা থেকে উঠে গেল। যদি ভাই-বোনদের হাতা-পাই লেগে যায় সে ভর্তা হয়ে যাবে এদের মধ্যে। সৌরভিও উঠে দাঁড়াল। বলল,”তোকে জানানো হয়নি কোথায় নুসরাত? মাত্র তো জানিয়ে দেওয়া হলো!
নুসরাত তাকাল সৌরভির দিকে। বলল,”সৌরভি, আমার লাইফের বড় একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা তাদের উচিত ছিল না আমাকে এ বিষয়ে অবগত করা, আমাকে জানানো? তারা কী করল, আমার মতামতের কোনো মূল্য না দিয়েই বিয়ে ঠিক করে ফেলল? নাইছ…ব্রাবো! আমি এখানে বসে কী করছি?
আমিরা মিনমিনিয়ে বলে ওঠল,”ছোট মুখে বড় কথা বলছি আপু, আপনি চাইলেই বিয়েতে মানা করে দিতেই পারেন, এতে কিন্তু মেঝ বাবারই অসম্মান হবে। উনার শরীরের এখন যা অবস্থা আরো বেশি অবনতি হবে। আমি আপনাকে দোষ দিতে চাচ্ছি না, কিন্তু প্রাকটিক্যালি দেখলে আপনি এর জন্য দোষী হবেন। আমার কথায় কোনো ভুল ত্রুটি থাকলে আমি দুঃখিত।
আমিরা বুঝতে পারল মেয়েলি কালো বলয়ের শীতল চোখগুলো তার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করছে। মেয়েটা নিমেষেই গুটিয়ে নিল নিজেকে। নুসরাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। সৌরভি আর আমিরার দিকে তাকিয়ে বলল,”ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতেছ আমাকে? সবসময় আমি কেন হবো সবার ব্ল্যাকমেইলের বস্তু? সোজা কথা আমি বিয়ে করব না।
ইরহাম ধমকে উঠল,”কেন বিয়ে করবি না তুই? কার জন্য বসে থাকবি?
নুসরাত বাক্য উচ্চারণ করল না। ইরহাম চ্যাঁচিয়ে উঠল। গলার কাছের রগ দপদপ করছে তার,”আরশ ভাইয়ার জন্য? যে বিয়ে করে নিচ্ছে অনিকাকে?
নুসরাত অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”বিয়ে করে নিচ্ছে?
ইসরাত জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। বলল,”আরশ ভাইয়ের বিয়ে আগামীকাল অনিকার সাথে।
নুসরাত তাকিয়ে রইল ভাই বোনের দিকে অনিমেষ। যান্ত্রিক কন্ঠে শুধাল,”আমাকে জানালে না কেন? কবে বিয়ে ঠিক হয়েছে?
শীতল স্বরটা আরো বেশি শীতল হয়ে গেল। নুসরাত চ্যাঁচিয়ে উঠল,”এতদিন যাবত এই বিষয়ে আমাকে অবগত করা হয়নি কেন?
কেউ কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। রাগে ফেটে পড়ল সে। মুখ লাল হতে দেখে সবাই একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল৷ আহান দরজার কাছে গিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি দিল। বলল,”আপুউউ, তোমার বিয়ে টাকলা একটা ব্যাটার সাথে ঠিক হয়েছে। ব্যবসায়িক মানুষ বুঝতেই তো পারছ, পেট এই মোটা। প্রেগন্যান্ট মহিলাদের মতো লাগে। আমি তো প্রথমে দেখে সন্তান সম্ভবা মহিলা ভেবেছিলাম। যাই হোক, তুমি রাজী হও বা না হও মেঝ বাবা তোমার বিয়ে দিবে।
আহানের কথা শেষ হলো না উড়ে এসে তার গায়ে জুতো পড়ল। তেড়ে আসতে দেখা গেল নুসরাতকে। আহানকে ধরার আগেই সে অট্টহাসি হেসে পালিয়ে গেল।
নুসরাতকে কোনোভাবেই বিয়েতে রাজী করানো গেল না। সেদিন রাত বারোটার সময় নাজমিন বেগম ঘন্টাখানেক নিয়ে কী কী বোঝালেন, নুসরাত শুনল, চ্যাঁচাল না। লাগানো দরজার বাহিরে তখন আহান, আমিরা, মমো, সৌরভি, ইরহাম, ইসরাত কান পেতে রেখেছে। দরজা খুলে যখন নাজমিন বেগম বেরিয়ে আসলেন তখন ঠোঁটে দেখা গেল হাসি। চোখের পাতা ফেলে আস্বস্থ করলেন মত দিয়েছে নুসরাত বিয়েতে। আহান উঁকি দিল সামান্য। কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে আছে শ্যামলা মেয়েটা। টুকি বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করল সে। নুসরাত তাকাতেই ইশারায় পেট দেখিয়ে বলল,”এই মোটা পেট, দেখতে পুরো আলুর মতো। মাথায় টাক, চুল নেই। আপু তোমার কী হবে! শেষ পযন্ত কপালে টাক মাথার বর ঝুটবে, ইসসসস..
নুসরাত শার্টের আস্তিন গুটিয়ে দাঁড়াল। মুখ ফুটে বিশ্রী ভাষায় গালি আসলো তার। কোনোরকমে দাঁত কিড়মিড়িয়ে তা আটকে দিল। বলল,”আমি যদি আসি আহান, কুপিয়ে ফেলব তোকে। স্টপ যা…
আহান চুপ হলো না, দ্বিগুণ হারে টিটকারি করতে লাগল৷ নুসরাত আশপাশ হতে যা পেল ছুঁড়ে মারল। চিৎকার করল,”আহাইন্নায়ায়ায়ায়ার বাইইইইচ্চচ্চায়ায়ায়া, তোকে আমি খু ন করে ফেলব। শু*য়ো*রের জাত, আমাকে নিয়ে খিল্লি উড়াস তুই!
আহান অট্টহাসি হেসে দৌড় দিল। তার পেছন পেছন ঢিলেঢালা শার্ট পরে নুসরাতকেও দৌড়াতে দেখা গেল। হাতের মধ্যে কালো স্লিপার। দৌড়ের বেগে ঢিলে বান করে রাখা চুলগুলো রেশমের গোছার মতো খুলে পড়ল। বাতাসের দাপটে উড়ল সাদা রঙের পর্দা, তার সাথে উড়ল মেয়েটার পিঠের চুল। হাসি আর চিৎকার মিলে মিশে একাকার হলো! ইসরাত হাসছে। ভীষণ ক্ষীণ স্বরে। ইরহাম তাদের চিয়ার-আপ করছে। নুসরাতকে বলছে, দৌড়াও মুটকি, আরো জোরে দৌড়াও, নড়তে পারছিস না দেখি। আহান হি হি করে হাসতে হাসতে বলল,’’আপুর বিয়ে, বুড়ো ভামের মতো দেখতে একটা লোকের সাথে ঠিক হয়েছে।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৪
ইরহাম আহানের কথায় হুহু করে হেসে উঠল। ইসরাত হাসতে হাসতে একসময় বুঝল তার চোখ বেয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। হাত দিয়ে তা মুছতেই বাড়ি কাঁপানো নুসরাতের চিৎকার ভেসে এলো,”আহাআয়ায়ায়ায়াননন, তুইইই আস্তো একটা কুত্তা! খ*চ্ছোরের বাচ্চা, তোকে আমি জ*বা*ই করব। এইই দাঁড়া… এই ব্যাটা..
