Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৪
জান্নাত নুসরাত

~অতীতের একাংশ
কুয়াশাচ্ছন্ন দিন। রোদের আভা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না আজ আর। জোহরের নামাজ পড়া শেষ হওয়ার পর মসজিদ থেকে বের হলো আহান ইরহাম আর সৈয়দ বাড়ির পুরুষেরা। আহান আর ইরহামের পরণের ট্রাউজার ঠাখনু অব্দি গোটানো৷ চোখ দুটো উদাসীন। শরীর টানটান হলেও মাথা রাস্তার দিকে ঝোঁকানো৷ সামনে হাঁটছেন বড়রা। রাস্তা দিয়ে বয়স্ক চেনা পরিচিত কোনো লোক গেলে সালাম ঠুকছে নিচু স্বরে সবাই। শোহেব সাহেব, সোহেদ সাহেব ব্যবসায়িক আলাপ করছেন নিজেদের মধ্যে। পরিচিত কারোর সাথে দেখা হলে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন,সাথে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ইরহাম আহান। তেমন করে আবারো দাঁড়িয়ে গেলেন সবাই। বাতাসে কথার স্বর ভাসল,”নাছির এর খবর কী?

ইরহাম চোখ তুলে তাকাল। অক্ষিগত হলেন নিজাম শিকদার। অনেক দিন পর লোকটার দেখা পেল। সৌরভির সাথে তার সব ঠিক হয়ে গেলেও মেয়েটা বাপের বাড়ি পা রাখে না। অভিমান এখনো পোষে রেখেছে দাদার আর ভাইয়ের প্রতি। নিজাম শিকদার এসে অনেকবার নিতে চাইছিলেন, ইরহামকেও বলেছেন সৌরভিকে নিয়ে আসতে, তবুও মেয়েটা শোনেনি। স্পষ্ট কন্ঠে বলে দিয়েছে,”ও বাড়িতে আমার মরা লাশ ও যাবে না। যখন ওদের প্রয়োজন ছিল আমার, তখন ওরা আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, এখন নিতে আসবে কেন? এত দরদ দেখে আমার গা পিত্তি জ্বলে উঠছে।
ইরহাম আর বোঝানোর চেষ্টা করেনি। এবার সে ভালো করে তাকাল ভদ্রলোকের দিকে, শরীর ভেঙে পড়ছে বয়স বাড়ার সাথে। কম তো আর বয়স হলো না! এখনো হাঁটতে পারছেন এটাই ঢের বেশি। সোহেদ সাহেব কথা বলছেন,”নিয়মিত ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবেন। যেহেতু আগের তুলনায় পায়ে এখন একটু ভর পান।
নিজাম শিকদার মাথা দোলালেন। জায়িনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কী ইয়াং ম্যান কবে নিজের দেশে ফিরছ? কতদিন আছো?
জায়িন চোখ তুলে তাকাল। বলল,”এই তো আছি আরো সপ্তাহখানেক।
লোকটা আবারো প্রশ্ন করলেন,”এবার কী ইসরাতকে সাথে করে নিয়ে যাবে নাকি রেখে যাবে?
জায়িনের দৃঢ় গলার স্বর,”জ্বী সাথে করে নিয়ে যাব।
নিজাম শিকদার হাসলেন ঈষৎ। বললেন,”ছোটজন কী করবে? দেশে থাকবে নাকি ফিরে যাবে?
জায়িন অনায়াসে উত্তর দিল, “ফিরে যাবে, যেহেতু ওখানেই আমাদের সব, সেহেতু এখানে থেকে কোনো লাভ নেই।

শোহেব সাহেব আর সোহেদ সাহেব চুপচাপ দাঁড়িয়ে কথা শোনলেন। নিজাম শিকদার আফসোসের স্বরে বললেন,”আমার ভীষণ শখ ছিল আরমান এর জন্য ইসরাতকে৷ কখনো নাছিরকে বলিনি, নাছির তো বলেছিল মেয়েদের আশপাশেই বিয়ে দিবে। দূরে বিয়ে দিবে না বলে একেবারে দেশের বাহিরেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ভাগ্য, সবই ভাগ্য।
কথা শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আহান চোখ ঘোরাল বিরক্তিতে৷ এই লোককে সে দু-চোখে দেখতে পারে না। যত্তসব ন্যাকামি করে এখন! তার ভীষণ শখ ব্যাটাকে মাথার উপর তুলে আছাড় মারার। মুখ কোনোরকমের আটকে রাখলেও চেহারায় তার অসন্তুষ্টি ভেসে ওঠল। তাই আলগোছে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সামনে।
নিজাম শিকদার আর সৈয়দ বাড়ির লোকদের মধ্যে অনেকক্ষণ চলল আলাপ আলোচনা। কথা শেষ করে সবাই বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুটো ভেজে গেল। তখনো আহান আর ইরহাম বাড়ি ফিরেনি। তারা গিয়েছে কবরস্থানে। কবর জিয়ারত শেষে দু-জনেই সপ্তাহখানেকে ওঠা আগাছা পরিস্কার করে দিল। ইরহাম নামের ফলকের কাছে একটা গোলাপের চারা লাগাল। কাজ শেষে বসে রইল কবরের পাশে নিশ্চুপ।

নুসরাত মৃত্যুর দশদিন পরের কথা। এক সকালে আহানের কাছে একটা কল আসলো আল-হারামাইন ও যাওয়ার জন্য৷ আহান বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”কেন?
অপাশের লোকটা কী বলল বোঝা গেল না, কিন্তু আমিরা দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিরক্তিতে তিতিয়ে ওঠা লোকটার ভাবমূর্তি বদলে গিয়েছে৷ গোমড়া মুখটায় অস্তিরতা ভর করেছে কয়েক মিনিটের ভেতর। ঠোঁট গুলো কাঁপছে উত্তেজনায়, সাথে করে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ফোনটা৷ এমনকি পুরো শরীরটা। নাক, কান, গাল লাল হচ্ছে। অদ্ভুতভাবে লোকটা কানে ফোন ধরে রেখে হাতড়াল কিছু ধরার জন্য। এনজাইটি অ্যাটাক হতে আমিরা কাউকে দেখেনি কখনো, কিন্তু এভাবে হাত কাঁপা, শরীর কাঁপা দেখে ঈষৎ ভয় খেলে গেল তার হৃদয়ে। আমিরা এগিয়ে গিয়ে আহানের শক্তপোক্ত হাতটা চেপে ধরল নিজের হাতের মাঝে। অনুভব করল হাতটা কীভাবে কাঁপছে! দু-হাতে আগলে ধরল। শিরশিরে শিহরণ বয়ে গেল আমিরার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আহান নিজের কানে মুঠোফোনটা রেখেই বিড়বিড় করে,”আ আমি, আমি আসছি পাঁচ মিনিটের ভেতর। আ. আ স ছি…

লোকটার ভরাট কন্ঠ ছাড়া ছাড়া। আমিরা বুঝে পেল না এর কারণ কী! হঠাৎ আতঙ্কে, শঙ্কায় তার বুক কেঁপে ওঠল। আহানের কোনো প্রেমিকা ছিল নাকি যে ফিরে আসছে! যার জন্য লোকটা ওমন হয়ে গেছিল? জরুরি মুহুর্তে নিজের ভুলভাল চিন্তায় দু-পাশে মাথা নাড়ায় সে। না, না, এই লোক আর প্রেম? দুটোই ভিন্ন ব্যাপার। কোনো ভাবেই সে এটা মানবে না৷ মনে মনে মানবে না বললেও তার বুকের ভেতর ভার হয়ে আসে। যদি সত্যি কোনো প্রেমিকা ফিরে আসে তখন আমিরার কী হবে! তার ভাবনা চিন্তার ভেতর অনুভব করে মানব হাত ঝাড়া দিচ্ছে তাকে ছাড়ানোর জন্য। আমিরা ছাড়বে না হাত! সে ও যাবে লোকটার সাথে।
আহান নিজের হাত ছাড়াতে না পেরে ভ্রু উচিয়ে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,”হাত ছাড়ছো না কেন, আমিরা? তোমার সমস্যা কী?

আমিরা চোখ তুলে তাকিয়ে আবার তা নামিয়ে নিল৷ মিনমিন করে বলল,”আমিও যাব আপনার সাথে।
আহান তিক্ত কন্ঠে কিছু বলতে নিবে থেমে গেল। হাত ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াস বাদ দিয়ে বলে ওঠল,”চলো!
আমিরা ভেবেছিল তাকে নিতে লোকটা দ্বিমোনা করবে, কিন্তু তা করেনি। তাকেই বগলদাবা করেই বাড়ির বাহিরে আসলো। পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসে দাঁড়াল তার সামনে। অতঃপর ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে ইশারা করল ভেতরে প্রবেশ করার জন্য। আমিরা ফ্রন্ট সিটের মাঝে বসার সময় আড় নয়নে দেখল হাত দিয়ে মাথার উপর রেখেছে যাতে ব্যথা না পায়। সিটে বসতেই দরজা লাগিয়ে দিল আহান। ঘুরে এসে পাশে বসল আমিরার। গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলল,”সিট বেল্ট বাঁধো।
আমিরা অন্যমনস্ক থাকায় কথাটা বুঝেনি, তাই অবাক কন্ঠে বলল,”হু?

আহান কিৎকাল মুখ খিঁচে চেয়ে রইল আমিরার দিকে। বিরক্তিতে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে এমন করে তাকাল আহান তার দিকে। আমিরা কিছু বলার পূর্বেই নিজের সিট থেকে উঠে এগিয়ে আসলো সে। আমিরার মুখের কাছে ঝুঁকতেই মেয়েটা সেটে গেল সিটের সাথে। আহান এক পলক তাকিয়ে ফিরে গেল ড্রাইভিং সিটে। বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠল,”যত্তসব! বিরক্তিকর মেয়ে মানুষ!
গাড়ি আল হারামাইন হসপিটালের পার্কিং এড়িয়ায় পার্ক করে বেরিয়ে আসলো আহান। ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে দিয়ে আমিরাকে ইশারা করল বের হওয়ার জন্য। আমিরা নিজের ওড়না সামলে গাড়ি থেকে নামতেই ডোর লক করে ধুপধাপ করে এগিয়ে গেল আহান। ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটা আমিরাকে রেখেই অনেকদূর চলে গেল সে। পা মিলিয়ে হাঁটতে না পারায় মাথা নত করল আমিরা, দৌড়ানো শুরু করবে বলে। তার পূর্বেই নিজের পাশে আকস্মিক এসে আহানকে ভুতের মতো দাঁড়াতে দেখে মাথা তুলে তাকাল। চোখাচোখি হলো দু-জনের। স্বাভাবিকের মতো এখনো বিরক্তি নিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবারো ধমকে ওঠে মানব,”পিঁপড়ের মতো হাঁটছ কেন? এভাবে হাঁটলে সারাজীবনেও ভেতরে ঢুকতে পারবে তুমি?
আমিরা ধমকে মিইয়ে গেল। আবারো চোখ দুটো নামিয়ে নিল পায়ের দিকে। আহান তপ্ত শ্বাস ফেলল। এটাকে নিয়ে সে কী করবে! বলদ একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছে, সেটা ভাবতেই মাথা বারি দিতে ইচ্ছে হলো দেয়ালে। নিজের বিরক্তি, ত্যক্ততা গিলে নিয়ে বলে ওঠল ,”আমার হাত ধরো, আমিরা।

“হু?
আমিরার হু বলাতে মেজাজ খিঁচে গেল আহানের। এটা মানুষ নাকি রামছাগল সে ভেবে পায় না! একটা মানুষ এত বিরক্তিকর হয় কীভাবে! নিজের খিঁচানো মেজাজ শান্ত করতে দাঁতে দাঁত চাপে ছেলেটা। বিড়বিড়ায়,”বলদ একটা! মাথায় তুলে আছাড় দিব একটা।
আমিরা মুখ গোমড়া করে ফেলল। সে কানে না শুনলে হু বলবে না তো কী বলবে! হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আহান আবারো ধমকাল,”এই এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? চোখ নিচে, নিচে! নিচে নামাও! এদিকে কী? গিলে খেয়ে ফেলবে নাকি?
ধমকে ধামকে আহান মেয়েটাকে দিশেহারা বানিয়ে দিল। এখনো হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইচ্ছে করল পিঠে কয়েকটা কিল বসাতে, মনের ইচ্ছে মনে চেপে শীর্ণ হাতের মেয়েলি কব্জিটা চেপে ধরল নিজের হাতের মুঠোয়। তার ভাগ্যে এই বলদটা কিভাবে আসলো সে ভেবে পেল না৷ ভাবনা একপাশে ফেলে আহান আমিরাকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে চলল।

আমিরা শক্ত হাতের পিষ্টনে নিজেকে আরো গুটিয়ে নিল। শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল শিরশিরে শিহরণের স্রোত। নিজেকে সামলানোর আগেই আহান একটানে উড়িয়ে নিয়ে চলল তাকে। সামনের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,”এত কাঁপাকাঁপি করছ কেন?
আমিরাকে জিজ্ঞেস করলেও উত্তরের আশা করল না সে। হতবিহ্বল নয়নে মেয়েটা নিজের হাতের দিকে অনিমেষ চেয়ে রইল। বড় হাতটার মুঠোয় নিজের শীর্ণ হাতটা বড়ই নয়নবিরাম মনে হয় আমিরা নামক মেয়েটার নিকট। তার ইচ্ছে হয় সময়টাকে এখানে আটকে দিতে, সে যদি পারত সময়টা এখানেই থামিয়ে দিত। কিন্তু সময় তো বিরামহীন চলমান, আমিরার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সময়টা চলতেই থাকল।
হসপিটালের করিডোর দিয়ে আহান যখন তাকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে গেল, আমিরার কেমন কেমন যেন অনুভূতি হলো! তার ইচ্ছে হলো চ্যাঁচিয়ে সবাইকে বলতে লোকটার স্পর্শ তার ভালো লাগছে। লোকটা তার উপর যে বিরক্ত হচ্ছে সব ভালো লাগছে।
আমিরার সেই ভালো লাগা আরো কয়েকপল স্থায়ী হলো। আহান রিসিপশনের দিকে এগিয়ে গেল। সাদা কাপড় পরা নার্স মেয়েটা মাথা তুলে তাকাতেই আহান জানতে চাইল,”এখানে একজন মেয়ে ভর্তি। আপনাদের একজন প্রতিনিধি আমাকে কল দিয়ে বলেছে আসার জন্য। কোথায় সেই ব্যক্তি? কোথায়? তাড়াতাড়ি বলুন। কোথায় সে?

আহানের অস্থিরতা দেখে মেয়েটা বলল,”রিলাক্স স্যার! ধীরে সুস্থে কথা বলুন, আমি এখানেই আছি।
তারপর একগ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,”কীভাবে সাহায্য করতে পারি, স্যার?
আহানের অস্তির চেহারাটা আরো বেশি অস্থির হতে দেখা গেল। এগিয়ে দেওয়া পানি স্পর্শ করল না। নাকচ করল গম্ভীর স্বরে। আবারো বলল,” আ আপনাদের এখান থেকে ঘন্টাখানেক পূর্বে আমাকে কল দেওয়া হয়েছিল, আমাদের পেসেন্ট একজন এডমিট এখানে। সেই পেসেন্ট কোথায়! কেবিন নাম্বার কত? কোন রুমে? কত তলায় আছেন তিনি?
আহানের তৎপরতা দেখে সামনে নার্স মেয়েটা কম্পিউটার এর কাছে ঝুঁকে গেল। কিবোর্ডে টাইপিং করতে করতে শুধাল,”পেসেন্ট নেইম?
আহান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। কয়েকপল কাটল নীরব। আমিরা ভ্রু উচিয়ে তাকিয়ে রইল আহানের দিকে। কথা না বলে এমন স্ট্যাচু কেন লোকটা হয়ে গেছে তার কারণ খুঁজে পেল না! হসপিটালেই বা কেন এসেছে লোকটা তার কারণই-বা কী! আমিরার চিন্তাকরণে ব্যঘাত ঘটল মেয়েটার আবারো একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই কানে ভেসে এলো আহানের অস্তির কন্ঠস্বর,”সৈয়দা নুসরাত নাছির… উনি কোথায়? কোথায় এডমিট আছেন? কোন ফ্লোরে আছেন? কোন কেবিনে? প্লিজ তাড়াতাড়ি বলুন? হোয়ার ইজ সি? প্লিজ টেল মি, এত সময় নিচ্ছেন কেন?

ইরহাম বিছানার কাছে বসে কিছু ডকুমেন্টস চেক করছিল। ঘড়ির কাটায় দুটো বাজছে। নিচ থেকে খাবারের ডাক পড়তেই ডকুমেন্ট গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। চোখের চশমাটা নাকের ডগায় ঠেলে দিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখা পেল সৌরভির। মেয়েটা এদিকে এগিয়ে আসছে। সুতির সাধারণ শাড়ি পরণে। শাড়ি একপাশে সরে গিয়ে নাভি বেরিয়ে আছে। হাতের পানি শাড়ির আচলে মুছতে মুছতে ধমকে ওঠা স্বরে শুধায়, ”কী হয়েছে, আসছ না কেন? কখন থেকে ডাকছি না তোমাকে?
ইরহাম দাঁড়িয়ে গেল। চোখ বুলাল ক্লান্ত পরিশ্রান্ত নারী দেহের ভাঁজে। কয়েক পল কাটার পর চোখ সরিয়ে নিল সে, চোখ দুটো স্থির করল মায়াবী মেয়েলি মুখটায়। রান্না করায় ঘেমে নেয়ে একাকার চেহারা। কপালে, গালে ছোট ছোট চুল লেগে আছে। ইরহাম হাত দিয়ে সেগুলো সরিয়ে দিয়ে, হাতের তালু মেয়েলি গালে ঠেকাল। সৌরভি চোখ তুলে তাকাতেই একপেশে হাসল ইরহাম। চোখাচোখি হলো দু-জনের। সৌরভির সামনে দাঁড়ানো লোকটার বড় বড় আঙুলগুলো গাল থেকে আলগোছে চলে গেল কানের লতির কাছে। মেয়েটা বুড়ো আঙুলের স্পর্শ পেল সেখানে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল সে। ইরহাম ঝুঁকে আসলো মেয়েলি অধরের কাছে। নাক ছোঁয়াল পরম আশ্লেষে মানবীর নাকে। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘর্ষণ লাগল গালে, থুতনিতে। বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করতে বলে ওঠল,”ইরহাম, শোনো, শাড়ি আমি পরতে পারি না। নষ্ট করো না, পরে কে পরিয়ে দিবে? এখন না, থামো।

সৌরভির হাজারো মানা সত্ত্বেও ইরহামকে থামানো গেল না। হাত দিয়ে ওর ঠোঁট দাবিয়ে রাখল স্বৈরাচার লোকটা। সহজ কথা, সে মানা শুনতে চায় না। সৌরভি সামান্য কাঁপল। কন্ঠদেশে উপস্থিতি পেল লোকটার অধরের৷ এতক্ষণে ইরহামের ঘোর লাগা গলার স্বর পাওয়া গেল। ভীষণ নোয়ানো, ঠোঁট দিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ হচ্ছে কী না বোঝা গেল না,”আমি যেহেতু শাড়ি খুলছি, সেহেতু নিজ দায়িত্বে আমি-ই শাড়ি পরিয়ে দিব। ওকে? আর কোনো সমস্যা?
সৌরভি চোখ বুজে নিল। পুরুষালি হাতটা তার ঘাড় চেপে ধরছে উপলব্ধি করল। ঠোঁটটা কন্ঠদেশে স্থির নেই, তার বিচরণ চলছে, ঘাড়ে, কলার বোনে, পালস পয়েন্টে, চিবুকে। আঙুল দিয়ে চেপে ধরে আছে সৌরভির নরম ওষ্ঠপুট।

লোকটা বড্ড অস্থির, ভীষণ অবাধ্য! গলা, ঘাড় থেকে ঠোঁট সরে যায়, মুহুর্তেই মেয়েলি ঠোঁটগুলো পুরে নেয় নিজের দখলে। সৌরভি একটু পূর্বে ধাক্কা দিলেও, এখন আর ধাক্কা দিচ্ছে না। অবাধ্য লোকটার বাহুবন্ধনীতে আটকে থেকে, লোকটার ভালোবাসায় মত্ত হয়েছে সে, আত্মসমর্পণ করেছে। জিভের ডগায় উপস্থিতি পাচ্ছে দারুচিনির সামান্য স্বাদ। ইরহাম যখনই ওর কাছাকাছি আসে তখনই মন মাতানো এই স্বাদটা পায় সে। শার্টের কলার হতে নাকে এসে সুরসুরি দিয়ে গেল চন্দন কাঠের গন্ধ। ধীরে ধীরে সময় গড়াল! সাথে বাড়ল ইরহামের অবাধ্যতা। শাড়ির আঁচল সরে গেল সৌরভির বুক হতে। খসে পড়ল মেঝেতে। নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সৌরভি পুরুষালি পৃষ্ঠদেশ। বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,”ইরহাম, ইরহাম, একটা বার আমার কথা শোনো…

সৌরভির প্রথম বারের ডাকে সাড়া দিল না ইরহাম। দ্বিতীয় বারের ডাকে সাড়া দিয়ে মুখ তুলে তাকায়। ভ্রু উচিয়ে জানতে চায় সমস্যা কী! তা দেখে সৌরভি হেসে ফেলে। তার সামনে দাঁড়ানো লোকটার ঠোঁট দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। লোকটার শক্ত মুষ্টিতে দলা পাঁকিয়েছে শাড়ির একাংশ। নরম মেয়েলি আওয়াজ ভাসে রুমের দেয়ালে দেয়ালে ,”দরজা ভেজানো..
কথা বলতে বলতে নিজেদের ভেতরে দূরত্ব তৈরি করে দূরে সরে যায় সে, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা৷ ইরহাম সৌরভির কোমর একহাতে চেপে ধরে এনে নিজের বুকের কাছে ঠেকায়। নিজের পায়ের উপর দাঁড় করায় মেয়েটাকে। বুকের কাছে মেয়েলি মাথাটা রেখেই হাঁটতে হাঁটতে ভ্রু যুগল কুঁচকে বলে ওঠে,”লাগিয়ে দিচ্ছি, আর কোনো সমস্যা? ফাস্ট বলো? পরে বাঁধা দিলে বাঁধা মানব না! ফাস্ট বলো সৌরভি, ফাস্ট!
তাড়া দিলেও সেসব কথা শোনার খুব একটা আগ্রহ দেখা গেল না সুঠাম দেহি ছেলেটার ভেতরে। সৌরভিকে ওইভাবে নিজের বাহুতে করে নিয়ে এগিয়ে চলল সম্মুখে। মেয়েটা ইরহামের বাহুবন্ধনী হতে মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল,“খাবার খাবে না? ঠান্ডা হয়ে যাবে তো!
নব ঘুরিয়ে দরজা লক করে দিল ইরহাম। শান্ত স্বরে বলে ওঠল,”একদিন ঠান্ডা খাবার খেলে কিছু হবে না, ফক্সগ্লোভ! আর কোনো সমস্যা..?

সৌরভিকে নীরব হয়ে যেতে দেখে ইরহাম তাড়া দিল,”কাম অন, ফাস্ট বলো? আর কোনো সমস্যা আছে?
সৌরভি কথা বলার শক্তি পায় না। নিজেদের অন্তঃরঙ্গ মুহুর্তে অনেক সময় ফক্সগ্লোভ ডাকটা ইরহামের কাছ থেকে শুনেছে সে, তাই তেমন একটা চমকাল না, কিন্তু লজ্জায় মিইয়ে গেল। কিছু পল কাটার পর নিজেকে শূণ্যে ভাসতে দেখল সে। চোখে ভাসল শুধু সাদা সোনালির মিশ্রণের সিলিং আর বিছানা! সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে লোকটা। মেয়েটা নরম স্বরে ফিসফিস করে ওঠে,”ঘামের গন্ধ করছে না?
ইরহাম তাকে বিছানার কিনারায় বসিয়ে দিয়ে খোপা করা চুল গুলো ছেড়ে দেয়। ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,”না!
আবারো বলল সে,”গোসল করে আসি?
“প্রয়োজন নেই!
সৌরভি আর কিছুই পেল না বলার মতো তাই দু-হাতে ইরহামের গলা জড়িয়ে ধরল। আহ্লাদী স্বরে জিজ্ঞেস করল,”আমি কী মোটা হয়ে যাচ্ছি, ইরহাম? আগের মতো আমাকে কী আর সুন্দর দেখায় না?
ইরহাম ক্ষীন হাসল। সে জানে সৌরভি তার কাছ থেকে কী শুনতে চায়, তাই ঝুঁকে গেল সম্মুখে। ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট ঠেকাল মেয়েলি গালে। দক্ষিণা বাতাসে তখন রুমের পর্দাগুলো মৃদুমন্দ উড়ছে। ইরহাম তার কানের কাছে বিড়বিড়িয়ে স্বাগোতক্তি করল,”তুমি মোটা হয়ে গেলেও তোমাকে ভীষণ সুন্দর দেখাবে, সৌরভি। এভাবে ওভাবে তোমাকে সবভাবে ভীষণ সুন্দর দেখায়। আমার চোখে তুমি সবভাবেই সুন্দরী!
ইরহামের পুরুষালি কন্ঠ মিইয়ে যায় সময়ের সাথে। রুমের মধ্যে শুধু ভেসে বেড়ায় বিড়বিড়িয়ে বলা কিছু কথা, কিছু শব্দ,”সৌরভি, আমার সৌরভি।

নাছির সাহেবকে থেরাপি দিয়ে বাড়ি ফিরেছে ঘন্টাখানেক হবে ইসরাত। খাবার টেবিল খাবার বেড়ে বসে আছেন নাজমিন বেগম। ইসরাতকে হাত মুখ ধুয়ে এসে বসতে দেখে ভদ্রমহিলা চিন্তিত স্বরে বললেন,”সৌরভিকে কখন পাঠালাম ইরহামকে ডাকতে এখনো দেখি আসলো না, কিছু হয়েছে নাকি?
কথা শেষ করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন যাওয়ার জন্য। ইসরাত নাছির সাহেবের প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। সোফার উপর সাদা পাঞ্জাবি পরে বসা নাছির সাহেবকে ধরে এনে বসাল চেয়ারে। গরুর মাংস প্লেটে তুলে দিয়ে বলে ওঠল,”তোমরা খাও, আমি দেখে আসছি। বসো!
নাজমিন বেগমকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে ইসরাত মাথার ওড়না টেনেটুনে ঠিক করে নিল। শুভ্র রঙের কামিজে পানপাতার মতো ঢলঢলে চেহারাটা অপরুপ দেখাচ্ছে। ছেড়ে রাখা ওয়েবি চুলগুলো মাঝপিঠে উড়ছে। থাইগ্লাস দিয়ে ভেসে আসা নরম সূর্যের কিরণে কালো চুলের রঙ বাদামি বর্ণের ঠেকছে কিছুটা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনতে পেল মায়ের গলা,”সৌরভিকে বল তাড়াতাড়ি আসতে, আজ রান্না একা হাতে ও করেছে। মেয়েটার খিদেয় মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, ডাক দেয়।

ইসরাত মায়ের কথায় হাঁক ছুঁড়তে গিয়ে থেমে গেল। দো-তলার ড্রয়িং রুমে পা ফেলতেই চাপা স্বরের গোঙানি আর ফিসফিসানির স্বর শোনা গেল ইরহামের রুম থেকে। ইসরাত প্রথমে বুঝল না, আরো দু- এক পা বাড়াতেই যেভাবে এগিয়ে ছিল তার থেকে দ্বিগুণ বেগে পিছিয়ে গেল। ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজের। অস্বস্তিতে চেহারটা লাল হয়ে উঠল। সময়ের সাথে গাল, নাক, কান হতে লালিমা কমার বদলে ক্রমশ বাড়তেই থাকল। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই তড়িৎ পায়ে ফিরে গেল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো তার। চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা করল, হয়তো হলো না! চেয়ার টেনে বসতেই নাছিরে সাহেব শুধালেন,”কী হয়েছে, এমন অস্তির হয়ে আছো কেন? কোনো সমস্যা? আর সৌরভি, ইরহাম কই?
ইসরাত মাথা তুলে তাকাল না। মিনমিনিয়ে বলল,”কোনো সমস্যা নেই। তারা পরে খাবে বলেছে।
নাছির সাহেব মাথা দোলালেন। বললেন,”ভাত বেড়ে দাও!
ইসরাত মাথা ঝুঁকিয়ে রাখল। বুঝল নিজের গাল দুটো গরম হয়ে আছে। ওভাবে থেকেই বলল,”বেড়ে দিয়ে গেলাম না?

নাছির সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন,”চোখ তুলে উপরে একটু তাকাও, আমি ছাড়া এখানে অন্য কেউ আছে।
বাবার কথায় কপাল গোছাল সে। ভ্রু কুঁঞ্চিত করে তাকাতেই চোখাচোখি হলো বাদামি বর্ণের দুটো চোখের সাথে। তার দিকে তাকিয়ে আছে গম্ভীর মুখে। সামনে প্লেট রাখা। ইসরাত খেয়ালই করেনি তাদের পরিবার ছাড়াও এই লোকটা এখানে উপস্থিত। কোনো ধরণের সিনক্রিয়েট করল না সে। সাধারণ ভাবেই তুলে দিল খাবার লোকটার প্লেটে। মুরগীর মাংস বা গরুর মাংস কিছু দিল না লোকটার প্লেটে। গতকালের রান্না করা ছোট মাছের তরকারি তুলে দিল। নাছির সাহেব মানা করতে যাবেন ছোট মাছ না দিতে, ইসরাত তার কথা কেটে দিল। বলল,”এলার্জি বেড়ে যাবে,আব্বু!

নাছির সাহেব তবুও একটু দ্বিমোনা করলেন। বললেন,”মাছের কাটা বেছে খেতে পারবে না, দিও না ইসরাত!
ইসরাত তা শুনল না। প্লেটে তুলে দিল ছোট মাছ। বাবার চিন্তিত স্বরটা কানে বাজল, তাই প্লেট টেনে নিল নিজের দিকে। ছোট মাছের কাটা বেছে দিল। জায়িনকে ঠোঁট চাপা দিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারল হাসছে লোকটা৷ দূর্ত শিয়ালের মতো ঠোঁট টিপে টিপে। গলা খাদে নামিয়ে হুশিয়ারী দিল,”মাছের কাটা বেছে দিচ্ছি বলে ভাববেন না ফিরে যাব। কোনো উল্টাপাল্টা ভাবনা আনবেন না মনে।
তার মতো গলার আওয়াজ নিচে নামিয়ে সহজ স্বরে লোকটা স্বাগোতক্তি করল,”মোটেও উল্টাপাল্টা চিন্তা এই মুহুর্তে আনছি না মাথায়। ওগুলো রাতে আসে, কসম!
ইসরাত চোখ পাঁকিয়ে তাকাল। বলল,”অসভ্যের মতো কথা বলবেন না।
জায়িন আত্মসমর্পণ করে বলল,”অসভ্যের মতো কী কথা বললাম? শুধু বলেছি আপনাকে নিয়ে আমি রাতে কিছু-মিছু স্বপ্নে দেখি।
জায়িনের কথায় ইসরাত উরুর কাছে বাঁ-হাত দিয়ে চিমটি বসাল। কঠোর স্বরে বলল,”আজ থেকে সেগুলো ও দেখবেন না।

ঠোঁট টিপে মাথা দোলাল জায়িন। নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল,”আচ্ছা, সেটাও করব না।
ইসরাত মাছ মাখিয়ে দিল ভাতের সাথে। প্লেট ঠেলে দিল জায়িনের দিকে। জায়িন নাছির সাহেব আর নাজমিন বেগমের সামনে আবদার করে বসল,”খাইয়ে দেন!
ইসরাত দাঁতে পাটি পিষল। কটমটিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল,”আপনার হাতে কী হয়েছে?
নাজমিন বেগম আর নাছির সাহেব ও চেয়ে ছিলেন এদিকে। জায়িন নিজের হাত কোল থেকে তুলতেই দেখা গেল ব্যান্ডেজ করা। ইসরাতের মা ভদ্রমহিলা ভীষণ আবেগী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,”হাতে কী হয়েছে বাবা?
প্রশ্নের উত্তর গম্ভীর স্বরে দিল সে,”নাইফ হাতে লেগে কেটে গিয়েছে।
ইসরাতের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,”এবার খাইয়ে দিবেন, নাকি দিবেন না?
ইসরাত কট্টর স্বরে মানা করতে যাবে নাছির সাহেব থামিয়ে দিলেন। ইশারায় দেখালেন নাজমিন বেগমকে। বললেন,”নাজমিন খাইয়ে দিবে তোমাকে।

নাজমিন বেগমের পানে চেয়ে বললেন,”খাইয়ে দাও, ছেলেটার হাত কেটে গিয়েছে।
ভদ্রমহিলা মানা করলেন না। ইসরাত মায়ের পাশের চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল। ঘুরে গিয়ে বসল ইরহামের চেয়ারে। ইরহামের পাশের চেয়ার খালি পড়ে আছে। সেখানে ইসরাতের শূণ্য দৃষ্টি গিয়ে ঠেকে। একসপ্তাহ যাবত এ চেয়ারে কেউ বসে না। চেয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটো ভরে আসে। তাই তড়িৎ চোখের পাতা ফেলে যাতে গাল বেয়ে জল গড়িয়ে না পড়ে। মাথা ঝুঁকিয়ে নিজের প্লেটে চোখ স্থির করে।
নাজমিন বেগম বিসমিল্লাহ বলে জায়িনের মুখে লোকমা তুলে দিলেন। খাবার খেতে খেতে জায়িন একবার তাকাল সামনে বসা ইসরাতের দিকে। ঝুঁকিয়ে রাখা মুখটা তার তাকানোর সাথে সাথে উপরে উঠল। উদাসীন, বিষাদে ভরপুর চোখ দু’টোর দিকে তাকিয়ে বুক কেঁপে ওঠল সুঠাম দেহি ছেলেটার। টানটান হয়ে বসে থাকা দেহটা নমনীয় হলো সামান্য। ওই চোখ দুটো ভৎসনা করছে যেন তাকে। তার মায়ের হাতে খাবার খাওয়ার জন্য। বলছে,’ছি্হ লজ্জা করে না, আমার মায়ের হাতে খাবার খেতে! যখন প্রয়োজন ছিল তোমার তখন কোথায় ছিলে! এখন কোন অধিকারে ওই হাতের মাখানো দানা পানি খাও! থুহ…

জায়িন চোখ সরিয়ে নিল না, তাকিয়ে রইল।
ইসরাত নিজেই চোখাচোখি ভেঙে দিল। মোবাইলের শব্দ ভেসে আসছে। কলটোন বাজছে অনবরত! ইসরাত উঠে দাঁড়ানোর আগেই নাছির সাহেব হাত বাড়িয়ে কল ধরলেন। ইসরাত ভ্রু উচিয়ে চেয়ে ছিল তাই তার মনের প্রশ্নটা চাপা দিতে বললেন,”আহান কল দিয়েছে।
নাছির সাহেব কল ধরতেই আহানের তৎপর স্বর ভেসে এলো,”কোথায় আপনি, মেঝ বাবা? থেরাপির ওখানে নাকি বাসায়? বড় আপু কোথায়?
নাছির সাহেব বললেন,”আমি বাসায় আছি, আর ইসরাত আমার পাশেই বসে আছে। কী হয়েছে, বলো?
আহান সময় নিল নিজেকে সামলানোর। ফোনের অপাশে দাঁড়ানোর জন্য ভর খুঁজল। দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা বলল। নাছির সাহেব বুঝলেন না, বললেন,”হ্যালো, হ্যালো! বুঝিনি আবার বল! কী বলেছিস? কার কী হয়েছে?
আহান বলতে পারল না। তার গলার কাছে কান্নারা দলা পাঁকাচ্ছে। দেয়াল চেপে ধরে করিডোরে বসে পড়ল। নাছির সাহেব শুধু শুনতে পেলেন ছেলেটার হু হু করে কান্না করার শব্দ। উত্তেজিত হয়ে চ্যাঁচালেন,”এইই এইই, কাঁদছিস কেন? আহান কিছু হয়েছে? খারাপ কিছু? শোহেবের কিছু হয়েছে? এই এইই, কথা বলছিস না কেন?

আহান টু শব্দটি করল না। হু হু করে ফোনের অপাশে কেঁদেই চলল। ক্রমশ তার কান্নার গতি বাড়ল, সাথে করে স্পষ্ট হলো কান্নার ধ্বনি। নাজমিন বেগম অবাক চোখে চেয়ে আছেন স্বামীর পানে। চোখের ইশারায় জানতে চাচ্ছেন কী হয়েছে! ইসরাত বাবার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। খ্যাঁকিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে? কল দিয়ে মরা কান্না জুড়েছিস কেন? বলবি কিছু তুই?
আহান চোখের পাতা ঝাপ্টাল। হসপিটালের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো তার পানে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখছে! এত বড় একটা ছেলে করিডোরে বসে মরা কান্না কাঁদছে। আহানের কান্নার স্বর বাড়ছে। ইসরাত ধমকে ওঠে,”এই বলদ, তোর কান্না শোনানোর জন্য আমাকে কল দিয়েছিস? তুই কান্না করতে পারিস, এটা কেঁদে কেঁদে বোঝানোর কী আছে?
আহান কাঁদতে কাঁদতে একসময় হেসে ফেলল। ইসরাত কপাল গোছাল। নাছির সাহেব মোবাইলটা নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। সময় দিলেন ছেলেটাকে সামলে ওঠার। কয়েক পল কাটল। আহান কাঁদতে কাঁদতে, হেসে ওঠল। বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠল,”ও বেঁচে আছে মেঝ বাবা, ও বেঁচে আছে!
নাছির সাহেব বিরক্তিতে তিতিয়ে উঠলেন। শুধালেন,”খুলে বলবি তো, কে বেঁচে আছে? কে বেঁচে আছে সেটা বল?

ছেলেটার কান্নায় ভঙুর স্বরটা মিইয়ে আসছে। মৃদুমন্দ শ্বাস প্রশ্বাসের স্বর ভেসে আসছে অপাশ হতে। নাক টানতে টানতে আহান নিজের কথাটা শেষ করতে পারল না, তার আগেই নাছির সাহেবের হাত থেকে খসে পড়ল মোবাইলটা। ধড়াম করে মেঝেতে পড়ে গিয়ে স্ক্রিন ভাঙল ঝুনঝুন করে। অপাশ হতে আহান চ্যাঁচাচ্ছে,’’হ্যালো, হ্যালো,…
নাছির সাহেব টেবিল চেপে ধরে ওঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলেন। ইসরাত, জায়িন, নাজমিন সকলের অবাক চোখের দৃষ্টি স্থির হলো ভদ্রলোকের পানে। হঠাৎ এত অস্তির হয়ে উঠছেন কেন বয়স্ক লোকটা? বিস্ময় মিশ্রিত স্বরে নাজমিন বেগম শুধালেন,”কী হয়েছে?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৩

নাছির সাহেব বিমূর্ত নয়ন একবার ঘোরালেন পুরো খাবার টেবিলে। ভুলে বসলেন পায়ে ভর পাননা তিনি। ইসরাত এসে নিজের বাহু এগিয়ে দিল। জিজ্ঞেস করল,”কেউ তো বলো, কী হয়েছে?
নাছির সাহেবের আঁখিযুগলের একাংশ কিঞ্চিৎ লাল হতে দেখা গেল। খুশি চাপা পড়ে গেল অশ্রুর ভীরে। ইসরাত নির্বাক! হতবাক হয়ে চেয়ে আছে বাবার চাপা উৎফুল্লে ভরা মুখটায়। যেখানে একদিকে চোখে জল, অন্যদিকে ঠোঁট হাসি! নাছির সাহেবের অস্বাভাবিক আচরণে পুরো জায়গাটা নীরব হয়ে গেল। ঘড়ির কাটায় এক সেকেন্ড, দু সেকেন্ড করে কাটল কয়েক সেকেন্ড। টিক টিক ঘড়ির শব্দ নিস্তব্ধ ড্রয়িং রুমটায় ভীষণ ভারী শোনাল। তার সাথে আরো বেশি ভারী শোনাল নাছির সাহেবের কান্না চাপা গলার স্বর,”নুসরাত বেঁচে আছে, ও বেঁচে আছে। আহান দেখেছে ওকে! হসপিটালে দেখেছে, সুস্থ স্বাভাবিক!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৫