Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৩

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৩

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৩
জান্নাত নুসরাত

নাছির মঞ্জিলের পরিবেশ তখনো রমরমে। খুশির ঢল নেমেছে বাড়িতে যেন আজ। এত বছরের আমানিশা কেটে গিয়ে এক চিলৎে খুশির জোয়ারে ভাসছে পুরো পরিবার। তাদের সেই খুশিতে ভাটা পড়ল না কোনোভাবেই, যেন তা আরো দ্বিগুণ হয়ে উঠল। রুমানা খাতুন পুরো পরিবারসহ এসেছেন। গত পাঁচ বছরে অনেক কিছু বদলেছে। তুলি আর পলির ও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্বামী সন্তান নিয়ে তারা এখন বাহিরে স্যাটেল্ড। সুখে সাংসারিক জীবন কাটাচ্ছে। সবার মধ্যে আরশের জীবনটাই যেন বিশৃঙ্খলায় মোড়ানো ছিল। এখন আরশের জীবনটা ও সুসজ্জিত, সুশৃঙ্খল হয়ে উঠলেই হলো। অতিথি বলতে তেমন কেউই নেই। নুসরাতের নানা বাড়ির লোক আসেনি আজ। আগামীকাল আসবে। রুমানা খাতুন আসার পর আপ্পায়নে লেগে পড়লেন সবাই।

দু-হাতে নাস্তার আয়োজন করতে শুরু করলেন। নাজমিন বেগমের মুখের উপর থেকে হাসির দুত্যিই যেন সরছে না। ড্রয়িং রুমে লাগানো বড়সড় ফ্যামেলি ফটোটা সরিয়ে ফেলেছিল ইসরাত। নুসরাতের এক্সিডেন্টের পরে সেটা দেখলেই আরো বেশি তার কথা মনে পড়ত তাই। তা আবারো আহান এনে নিজ উদ্যোগে তার জায়গায় লাগিয়ে দিয়েছে। সুফি খাতুন পা তোলে বসে ছিলেন চেয়ারের উপর। খোশগল্পে ব্যস্ত ছিলেন রুমানা খাতুনের সাথে৷ আগের গল্পগুলোই করছিলেন। এবার আরশ নুসরাতের কথা আসতেই সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করলেন তিনি। বিতৃষ্ণায় মোড়ানো কন্ঠে বললেন,”সেই যেহেতু এক হবে, তাহলে এত নাটক সাজানোর দরকার ছিল কী? দুটো দুটোকেই পছন্দ করে, ভালোবাসা আছে, তাহলে সেসব মানতে এত নারাজি কেন? যেন জাত কমে যাবে অল্প অনুভূতি প্রকাশ করলে। বোঝলাম আরশ ব্যাটা মানুষ, চাপা স্বভাবের, পুরুষ মানুষ হয়ই তো চাপা স্বভাবের, তারা তো এত সহজে ভালোবাসার কথা স্বীকার করে না। পুরুষালি একটা ব্যাপার স্যাপার আছে সেখানে। কিন্তু তুই তো মেয়ে মানুষ। সারাদিন পকরপকর করতেই থাকিস, তুই বলে দিলেই তো হতো। এত চাপা স্বভাব অনুভূতির ব্যাপারে এদের, ভাবতেই আমার বিরক্তি লাগছে। মেয়ে মানুষ হবে খোলা বইয়ের মতো, জামাই মানুষের কাছে সপে দিবে, নিজেকে প্রকাশ করবে, তুই তা না করে ভাব দেখাস, দেখলি এবার কী হলো? দুটোর জীবন থেকেই পাঁচটা বছর এমনি গেল। লাভ হলো কিছু? যদি দুটো মিলমিশ করে থাকত, তাহলে এতদিনে চার পাঁচটা বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যেত। বাচ্চাগুলো টুকটুক করে বড় হয়ে যেত। কী বলেন আপনি এই বিষয়ে বেয়াইন?

রুমানা খাতুন মাথা দোলালেন। সুফি খাতুন মুখে পান সুপারি ঢোকালেন। টেবিলে বসা নুসরাতের দিকে তাকালেন দু-জনেই একসাথে, যে মাথা ফেলে শুয়ে আছে। রুমানা খাতুন বললেন,”বিয়ের অনেক বছর হয়েছে, তাড়াতাড়ি এবার সুখবর দিও।
নুসরাত চোখ তুলে তড়াক করে তাকাল। ভ্রু উপরে তুলে জিজ্ঞেস করল,”কীসের সুখবর?
সুফি খাতুন হাত দিয়ে নুসরাতের বাহুতে থাপ্পড় বসালেন,”মুখ পুঁড়ি, সুখবর বুঝিস না কী?
“না বুঝিনা, তুমি বলো কীসের সুখবর?
রুমানা খাতুন বললেন,” নাতির ঘরের পুতির।
“এটা আর এমন কী বিষয়! আগামীকালের ভেতর এনে দিব।
সুফি খাতুন অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,”কীভাবে?
“অনাথ আশ্রম থেকে এডপ্ট করে এনে দিব।

রুমানা খাতুন বললেন,”ওভাবে কে চাইছে? আমি আরশের ঔরস জাত সন্তান দেখতে চাচ্ছি।
আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল নুসরাত। বসার ধরণ খুব একটা ভালো না। গায়ে এখনো লেহেঙ্গা। দোপাট্টা কোথায় আছে বলা মুশকিল। চুলগুলো পাখির বাসার মতো মাথার মধ্যে ঝাঁক বেঁধেছে। গলার আওয়াজ নিচে নামিয়ে রুমানা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলল,”আমার কাছে চাইছেন কেন, আপনার বড় নাতীর বউয়ের কাছে চান? বিয়ের তো কমদিন হলো না। আমার বাবা এখন এসব বিষয়ে কোনো ইন্টারেস্ট নাই।
সুফি খাতুন খোঁচা মারলেন সূক্ষ্ম কন্ঠে,”ইন্টারেস্ট নাই বলতে বলতে দেখবি বছর ঘুরতে না ঘুরতে আরশ একটা কোলে দিয়ে দিয়েছে।
নুসরাত ভেংচি কাটল। বলল,”বললেই হলো। আমার অনুমতি ছাড়া একটা বাচ্চা ও হবে না।
রুমানা খাতুন বললেন,”তা সময় হলে দেখা যাবে।
সুফি খাতুন নুসরাতের দিকে চাপলেন। মুখ চোখে দুষ্টুমি। নুসরাত সরে গেল দূরে। উনি আরো বেশি করে আগালেন। বললেন,”শোন, বাসর নিয়ে কিছু কথা বলি তোকে।
নুসরাত সরে গেল আরোকটু। বলল,”শুনতে ইচ্ছুক নই।

“আরে শোন, এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে আগে ভাগে পরামর্শ নিতে হয়।
“তোমার নাতীকে দাও গিয়ে।
“ দূর, এসব ওকে বলার আছে নাকি? আয় তোকে শিখিয়ে পড়িয়ে দেই।
নুসরাত সরতে চাইলে সুফি খাতুন চেপে ধরলেন তাকে। রুমানা খাতুনকে বললেন,”বেয়াইন, ওদিক থেকে এসে চেপে বসুন। একটু পরামর্শ দেওয়া জরুরি, এমন তিড়িংতিড়িং করা মেয়ে মানুষকে।
রুমানা খাতুন ঘুরে এসে বসলেন নুসরাতের অপাশে। পেছনে এসে দাঁড়ানো আমিরাকে খেয়াল করলেন-ই না কেউই। যে কান পেতে দাঁড়িয়ে আছে, কথা শোনার আশায়। নুসরাত উঠতে চাইলেও চেপে ধরে দু-জনে রাখলেন তাকে। ত্যক্ত মেয়েলি গলার স্বরটা ভাসল,”আরে ভাই, কী বলবে আমাকে! আমি জানি, ভাই! এরা কারা! একজন এডাল্ট মেয়েকে এসে বাসর সম্পর্কে জানাচ্ছে। সরুন..!

সুফি খাতুন সরলেনই না, উল্টো চেপে ধরে বিস্তারিত বলতে শুরু করলেন। নুসরাতের মুখ দেখে বোঝা গেল সে বিরক্তিতে ফেটে যাচ্ছে। দীর্ঘ দশ মিনিট বাসর সম্পর্কে আলোচনার পর গলার আওয়াজ আরো নিচে ঝোঁকালেন সুফি খাতুন। আশপাশ তাকিয়ে দেখলেন কেউ আছে কিনা, কিন্তু পিছু দেখতে ভুলে গেলেন। নুসরাত থামানোর প্রচেষ্টা চালাল অনেক। তবুও থামাতে পারল না দুই বাসর বিশেষজ্ঞদের। স্বামী স্ত্রীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অন্তরঙ্গ মুহুর্তের কথা বলতে লাগলেন অনায়াসে। নুসরাতের বমির উদ্রেক হলো। চোখ দুটো বুজে ছি্হ ছি্হ করে উঠল। রোমানা খাতুন শেষে কিছু একটা বলতেই আর গলদঃকরণ করতে পারল না সে, পেট চেপে ধরে ওয়াক্ করে উঠল। ঠেলে সরিয়ে বের হতে যাবেই, এর মধ্যে দেখা গেল ডায়নিং স্পেসে থাকা বেসিনে হরবরিয়ে বমি করছে আমিরা। নুসরাতের নিজের অবস্থা শোচনীয়। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। বারবার পেট ঠেলে বমি চলে আসছে। সে নিজেও ছুটল উপরের দিকে। পেছনে বসা সুফি খাতুন আফসোসের সুরে বললেন,”এদের কী হবে আমি বুঝতে পারছি না! স্বামী স্ত্রীর অন্তরঙ্গ বিষয়ের কথা শোনে এভাবে কেউ বমি করে ভাসায়? আশ্চর্য! আশ্চর্য!

রোমানা খাতুন ঠোঁট টিপে হাসছিলেন। সুফি খাতুন বললেন,”আশা ছেড়ে দিন, এত তাড়াতাড়ি আরশের ঔরস জাত সন্তান আসবে বলে মনে হচ্ছে না।
রোমানা খাতুন ও একই স্বরে বললেন সুফি খাতুনকে,”আপনিও আশা ছেড়ে দিন, আপনারও আহানের ঔরসজাত সন্তান এত তাড়াতাড়ি আসছে না। অবস্থা ভালো না।
ঘড়ির কাটায় আটটা বত্রিশ। আমিরার তখন বমি করতে করতে অবস্থা নাজেহাল। রুহিনী বেগম বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বমি করতে দেখে এগিয়ে গেলেন দৌড়ে। হাইপার হয়ে শুধালেন,”আরে,আরে কী হয়েছে? এই অবস্থা কেন তোর?
আমিরা উত্তর দেওয়ার সময়টুকু পেল না, অনবরত বমি করেই চলল। চেয়ারে বসে আরাম করে পান সুপারি খাওয়া সুফি খাতুন বললেন,”মনে হয় সুখবর আসতে চলেছে।
সৌরভি কিচেন থেকে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বলে ওঠল,”কার? আপনার?
চ্যাতে গেলেন বয়স্কা। বললেন,”চপ্, আমার আসবে কেন? আমার কী এখনো সময় আছে?
আমিরা টু শব্দটি করল না। মুখে পানির ছিটা দিল। রুহিনী বেগম তাকে সোফার উপর বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কী হয়েছে, আমিরা? পেট খারাপ করেছে?
আমিরা উত্তর দেয় না। সুফি খাতুনই বললেন,”জামাই আদর সম্পর্কে বলছিলাম, বিস্তারিত শুনে এই মেয়ে এভাবে বমি করছে।

সুফি খাতুন থামলেন। রুহিনী কিছু বলবেন তাকে থামিয়ে দিয়ে পরপর আবারো বললেন,”বয়স কত তোর? বিয়ে হয়ে বাচ্চা হওয়ার সময় এসে যাচ্ছে, এখনো এসব বিষয় নিয়ে বমি করে ভাসাচ্ছিস? আমরা তো এমন করলাম না কখনো।
ঝর্ণা বেগম শাড়ির আঁচলে হাত মুছে এগিয়ে আসলেন। বললেন,”ফুপি, সবার মস্তিষ্ক তো একরকম হয় না। আমি আপনি বিষয়টা যত সহজে মেনে নিয়েছি ততোটা সহজে অন্য কেউ মেনে নিবে এমন ধারণা রাখা ভুল। সবার গ্রোথ তো আর সমান না।
ঝর্ণা বেগমের কথা বলার মধ্যেই চোখ মুখ উলটে বমি করে ভাসিয়ে দিল আমিরা ড্রয়িং রুম৷ উপর থেকে ভেসে এলো নুসরাতের ওয়াক্ ওয়াক্ শব্দ। ঝর্ণা বেগম রুহিনীকে পরিষ্কার হওয়ার কথা বলে আমিরাকে নিয়ে ছুটলেন সৈয়দ বাড়িতে। গা ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটা। বাড়ির সদর দরজা ঠা করে খোলা। বাড়িতে কারোর নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে৷ তাই সদর দরজা খোলা নিয়ে মাথা ঘামালেন না। আমিরাকে তার রুমে পৌঁছে দিয়ে বললেন,”ফ্রেশ হয়ে আসো, যাও। আমি নিচে আছি। ফ্রেশ হয়ে লম্বা একটা ঘুম দাও, দেখবে মন ফ্রেশ হয়ে গেছে। উল্টাপাল্টা চিন্তা বের হয়ে গেছে।

আমিরা কথা শুনল। ঝর্ণা বেগমই তোয়ালি এনে দিলেন। বাথরুমের দরজা ভেজানো ছিল, ভেতরে ঢুকেই দরজার ছিটিকিনি লাগিয়ে দিল আমিরা। কাপড় রেখে যেই ঘুরল, দেখল চোখ বুজে বাথটবে আহান শুয়ে আছে৷ শিষ বাজাচ্ছে নিজ মনে। খেয়াল নেই আমিরা দাঁড়িয়ে। রোমানা খাতুনের ফিসফিস করে বলা কথাটা আবারো বেজে উঠল তার কানের কাছে। গভীর কন্ঠস্বরটা যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছে, ‘স্বামী যখন ধীরে ধীরে সান্নিধ্যে এগিয়ে আসবে, তখন তোমাকেও’ আমিরা তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল। গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল।

আহান যখন দেখল তার দিকে তাকিয়ে ভুতের মতো ভয় পাচ্ছে আমিরা সে নিজেও চোখ কুঁচকে তাকাল। বাথটব থেকে উঠে এক পা বাড়াতে যাবে আমিরা নিষেধ করল,”আ আগাবেন না।
আহান কানে তুলল না। বাথটব থেকে উঠে দু-পা আগাল ধুপধাপ করে। এর মধ্যেই ধড়াম করে শব্দ হলো। অবাক হওয়ার সময় পেল না আহান, সেন্সলেস হয়ে বটল গ্রীন কালার টাইলসের মেঝেতে পড়ে গিয়েছে আমিরা। হাত -পা কাঁপছে তার থরথর করে। ভয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। আহান কপাল কুঁচকে ছোটোখাটো অবচেতন দেহটা কোলে তুলে নিল। মেঝে ভিজে থাকায় কাপড় ভিজে গেছে। কিছুক্ষণ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থেকে নিয়ে শুইয়ে দিল বিছানায়। ওড়না বাথরুমের মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খেল, সাথে আমিরার গায়ের বাকি কাপড়গুলো গড়াগড়ি খেল বাথরুমের মেঝেতে।

নুসরাত লেহেঙ্গা খুলে ফেলে রেখেছে বিছানার উপর। সারা গায়ে তার ব্যথা হয়ে গেছে। লাল লাল স্ক্র‍্যাচ পড়ে গেছে স্কিনে। হিটার অন করে বিছানা গা এলিয়ে দিতেই নাছির সাহেবকে দেখা গেল দরজার সামনে। বাবাকে দেখতেই নুসরাত উঠে বসল। হুইল চেয়ার ঠেলে ভেতরে আসলেন নাছির সাহেব। বললেন,”শরীর খারাপ লাগলে শুয়ে থাকো। কম ধকল যায়নি তো।
নুসরাত তবুও উঠে বসল, শুনল না। নাছির সাহেব বেডের পাশে এসে দাঁড়ালেন। ঠোঁটে হাসি। নুসরাতের শীর্ণ হাত দুটো মুঠোয় পুরে হাসলেন৷ বিগলিত সেই হাসি দেখে নুসরাত নিজেও হাসল। নাছির সাহেব বললেন,”তুমি খুশি তো, নুসরাত?
নুসরাত উত্তর দিল না। তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। নাছির সাহেব বললেন,”আমার এখনো বিশ্বাস হয় না তুমি এটা৷ তুমি বেঁচে আছো ভাবলেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে খুশিতে। কেন যেন মনে হয় এটা স্বপ্ন? ঘুম ভাঙলেই সব শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এগুলো আমার স্বপ্ন নয় বাস্তব। বিশ্বাস করাই কঠিন।
নাছির সাহেব মুচকি হাসি দিলেন মাথা ঝুঁকিয়ে। বললেন,”আমি তো জানতাম আমার ইসরাত চাপা স্বভাবের, সে নিজের অনুভূতি স্বীকার করতে লজ্জা পায়, কিন্তু আমার নুসরাত তো এমন না! সে তো অনায়াসে যা ইচ্ছে তাই বলে দিতে পারে, তাহলে তুমি এত চাপা স্বভাবের হলে কীভাবে? নিজের মনের ভেতর কেন কথা চেপে রাখলে?

নুসরাত উত্তর দিল না, শুধু হাসল। নাছির সাহেব নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলেন শীর্ণ হাতজোড়া,”কথা দাও, আর কখনো কথা ভেতরে চেপে রাখবে না।
নুসরাত একহাত রাখল নাছির সাহেবের হাতের উপর। ইসরাত এগিয়ে আসতে আসতে টিটকারি মারল,”বাহ্, আমাকে ছাড়া এখানে বাবা-মেয়ের আবেগপূর্ণ কথা বার্তা হচ্ছে? আমাকে ভুলে গিয়েছেন আব্বু?
নাছির সাহেব ইসরাতের কথায় শব্দ করে হাসলেন। বললেন,”তোমার কথা আমি ভুলে যাব কীভাবে, বলো? তোমার জন্যই প্রথমবার আমি বাবার হওয়ার অনুভূতি জানতে পেরেছি৷ তুমি তো আমার মতো একজন বাবার কাছে বিগ একচিভমেন্ট। তুমি ছাড়া আমি কেউ নেই, ইসরাত।
ইসরাত এসে বসল বিছানায়। নাছির সাহেব বললেন,”আমি চাইতাম তোমরা ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠো৷ ছোটবেলায় তোমাদের কী বলতাম আমি?

ইসরাত নুসরাত একইসাথে বলে ওঠল,”ভদ্রমহিলা হয়ে ওঠো। ভদ্রমহিলাদের মতো আচরণ করো।
নাছির সাহেব বললেন,”কেন বলতাম এই কথা আমি জানি না। তবুও চাইতাম তোমরা ভদ্রমহিলা হয়ে উঠো। ইসরাত ভদ্রমহিলা হয়ে উঠলেও, নুসরাত হয়তো হয়ে উঠেনি। আমি মেনে নিয়েছি। এটাই হয়তো তোমার বিশেষত্ব। সবাই ভদ্রমহিলা হয়ে উঠলে তো আর হবে না। কাউকে দস্যিপনা করতে হবে৷ সেই দস্যি মেয়েটা হয়ে গড়ে উঠেছ তুমি। তোমাকে নিয়ে হাজারো বিষাদ সবার মনে থাকলেও আমার কিছু যায় আসে না, হাজার খারাপ হলে তুমি আমার মেয়ে। তুমি আমার সন্তান। আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। আমি যখন তোমার ছবি টিভির স্ক্রিনে ভেসে উঠতে দেখি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে, আমার বুক গর্বে ফুলে উঠে। তুমি সবার কাছে খারাপ হলে তুমি তোমার বাবার কাছে খারাপ না। তুমি সেরা! তুমি সবার সেরা! কখনো তুমি কষ্ট পেও না, আমি চাই দুনিয়ার সব সুখ তুমি আর ইসরাত পাও। তোমরা দু-জন আমার হৃদয়ের এক অংশ জুড়ে আছো। তোমাদের কিছু হলে আমি ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে যাব। কখনো কষ্ট পেলে ভুল কাজ করবে না। কোনো খারাপ কাজ করবে না নিজের সাথে। নিজেকে আঘাত করবে না। কষ্ট পেলে বাবার কাছে চলে আসবে। কেউ ভালো না বাসলে জানবে বাবা তোমাদের খুব ভালোবাসে। তোমরা না থাকলে বাবার জীবনটা রঙহীন। বাবা তোমাদের ভালোবাসে৷ তোমাদের ছাড়া তার এই পৃথিবীটা পানসে। সে তোমাদের ছাড়া এক মুহুর্ত শ্বাস নিতে পারে না। তোমরা ছাড়া আমার কেউ নেই। বুঝেছ, কেউ নেই!

নুসরাতের হাতটা আরো শক্ত করে মুঠিতে চেপে ধরলেন। বললেন,’”তুমি, তুমি আর কখনো নিজে থেকে বিপদকে আমন্ত্রণ জানাবে না, যাই হয়ে যাক না কেন! একবার ভাগ্যের জুড়ে বেঁচে ফিরেছ, তাই বলে আরেকবার আল্লাহ তোমাকে সেই সুযোগ দিবে তার নিশ্চয়তা কী? যেখানে নিজের নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই, সেখানে ভাগ্যের কী বিশ্বাস? ভুলেও তুমি কোনো পদক্ষেপ নিবে না৷ যেচে পড়ে বিপদে ঝাপ দিবে না। শুনেছ, বাবার কথা? না শুনলে ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও। তোমরা ছাড়া বাবার কেউ নেই। আমার সব তোমরা দুই বোন। তোমাদের মুখ চেয়ে আমি বেঁচে আছি, তোমাদের কিছু হলে আমার কী হবে!

হেলাল সাহেব, শোহেব সাহেব, সোহেদ সাহেব, নামাজ শেষ করে নাছির মঞ্জিলে প্রবেশ করতেই ঝড়ের গতিতে কেউ একজন এসে জড়িয়ে ধরল তার গা। অবাক হওয়ার সময় পেলেন না ভদ্রলোক, দু-পা পিছিয়ে গেলেন৷ চোখ মুখে বিভ্রান্তির ছাপ। এত বছর পর ছেলে নিজ থেকে এসে জড়িয়ে ধরায় মস্তিষ্ক অসাড়ই কিছুটা। শোহেব সাহেব হেসে ফেললেন। ঠাট্টা করলেন,”বউ পাওয়ার খুশিতে আজমল আলীর ছোট নাতি কী পাগল হয়ে গেছেন? আরো একবার পাগলা গারদ থেকে ঘুরে আসতে চান?
আরশের কাছ থেকে উত্তর আসলো স্বাভাবিকের তুলনায় একটু দেরিতে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই বলল,”দ্বিতীয় বার পাগলা গারদে যেতে সমস্যা নেই, যদি নুসরাত নাছির আমার সাথে যায়।
সোহেদ সাহেব পিঠ চাপড়ে দিলেন। হেলাল সাহেব তখনো শকে। এত বড় ঝটকা মেনে নিতে পারছেন না তিনি। উনাকে আরেকটা ঝটকা হয়তো নুসরাতই দিল৷ আরশ সরে দাঁড়াতেই নুসরাত এসে জড়িয়ে ধরল। দ্বিতীয় বারের মতো ঝটকা খেয়ে শক্ত হয়ে গেলেন তিনি। নুসরাত শুধাল,”বড় বাবা, আপনাকে একটা চুমু খেতে পারি?

ভদ্রলোক নিজের থেকে উচ্চতায় খাটো মেয়েটার দিকে তাকালেন। চোখ দুটোতে বিস্ময়। তাকে চূড়ান্ত থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিস্ময়ে পৌঁছে দিয়ে নুসরাত অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ক্লিন সেভ করে রাখা গালে চুমু বসাল শব্দ করে দুটো। হেলাল সাহেবের থেকে দূরে সরে আসতে আসতে প্রশ্ন করল,”কী স্কিনে এপ্লাই করেন, এত ভালো স্কিন?
খ্যাঁক করে উঠলেন তিনি,”কী করব ব্যবহার? কিছুই করি না।
সোহেদ সাহেব বললেন,”আরশের বিয়ে উপলক্ষে আজ সকালে আমি নিভিয়া লাগাতে দেখেছি ডলে ডলে।
হেলাল সাহেব চোখ পাঁকিয়ে তাকালেন। বললেন,”হ্যাঁ বললেই হলো লাগিয়েছি, তুই চোখে দেখিস ঠিকমতো? আমার স্কিন এমনিতেই ভালো। কিছু লাগাতে হয় না।
হেলাল সাহেব কথা শেষ করতেই লিপি বেগম এসে হাজির হলেন। তাড়া দিলেন সবাইকে,”খাবার খেতে বসো, অনেক রাত হয়েছে।

হেলাল সাহেব ভাবলেন নুসরাত এই দৌড় দিবে খাবার টেবিলের দিকে, হামলে পড়বে খাবারের উপর, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সে দৌড়াল না। তার মতো হেঁটে গেল ডায়নিং এর দিকে। নাছির সাহেব হুইল চেয়ার নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পেছনে ইসরাত দাঁড়ানো। নাছির সাহেবের সাথে চোখাচোখি হতেই অপরাধ বোধে চোখ সরিয়ে নিলেন ভদ্রলোক। সোহেদ সাহেব হেলাল সাহেবের পাশ ঘেঁষে যেতে যেতে বললেন,”অনেক বছর তো হলো রাগ অভিমানে, এবার এসব শেষ করুন৷ রাগ অভিমান ভালো কিছু বয়ে আনে না। সম্পর্ক শেষ করে দেয় গুড়া থেকে। আপনি নিজেও জানেন মেঝ ভাইয়ের দোষ কখনো ছিল না, আব্বা যদি এই বিয়ে না পড়াতেন তাহলে উনি তো বলতেনই না। কখনো আবদার ও রাখতেন না। আব্বা বিয়ে পড়ালেন, আপনি ভাইকে বের করলেন বাড়ি থেকে। ভাই চলেও গেলেন। আজ পর্যন্ত ও বাড়িতে পা রাখেননি। আম্মা মারা গেলেন তবুও উনি গেলেন না৷ আপনি না হয় এবার এগুলো মিটমাট করুন। বাচ্চাগুলো বড় হয়েছে। তাদের এখন সংসার হবে।কিছুদিন পর জায়িন, আরশের ঘরে সন্তান হবে। আপনাদের দু-জনের নাতিনাতনি আসবে। তারা এসে দেখবে কী, নানা, দাদা কথা বলে না একে অপরের সাথে? আর কতদিন এসব? এভাবে জীবন চলে না কখনো, বড় ভাই! রাগ গোস্স্বা রাখুন। এসব আর কতদিন চেপে রাখবেন।

হেলাল সাহেব সোহেদ সাহেবের কথার উত্তর দিলেন না। এক পা দু-পা করে আগালেন নাছির সাহবের দিকে। নাছির সাহেব এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন, এবার চোখ সরিয়ে নিলেন। হেলাল সাহেব দাঁড়ালেন তার সামনে। চোখাচোখি হলো দু-জনের। টু শব্দটি বের হলো না দু-জনের মুখ দিয়ে। অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন। ঘড়ির কাটা সেকেন্ডের কাটা থেকে মিনিটের কাটায় গিয়ে ঠেকল। দু-ভাই তখনো তাকিয়ে। বহু বছরের রাগ, অভিমান, অভিযোগ গুলো গলে পানি হতে সময় লাগল। ইসরাত নাছির সাহেবের হাত চেপে ধরতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন তার গায়ে ভর দিয়ে৷ হেলাল সাহেব দু-হাত মেলে ধরতেই অনেক বছর পর দু-ভাই গলা মিলালেন। বুক জড়িয়ে ধরলেন একে অপরকে।
ভাইদের মিলনমেলা সবাই দেখল নির্মিশেষ চোখে। বাড়ির মহিলাদের চোখে পানি ও দেখা গেল। ইসরাত তখনো বাবাকে ধরে রেখেছে। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে লাঠি হয়ে। জায়িনকেও দেখা গেল তাদের পাশে দাঁড়ানো। নুসরাত টেবিলের উপর এক ঠ্যাং তুলে বসে আবারো তা নামিয়ে বসল। আগের স্বভাব এখনো পাল্টায়নি, সময় লাগছে অনেক কিছু বদলাতে। গরুর গোস্ত এক টুকরো মুখে ঢুকিয়ে চিবোল আরাম করে। তারপর আরেক টুকরো।

দু-জনের জড়িয়ে ধরে দুঃখবিলাস চলল অনেকক্ষণ। নুসরাত এত ইমোশনাল দৃশ্যপট মেনে নিতে না পারায় চোখ সরাল, সরিয়ে প্লেটে নিজের জন্যই নিজের খাবার বাড়তে লাগল। এর মধ্যে একে একে এসে বসতে দেখা গেল বাড়ির সবাইকে৷ হেলাল সাহেবের একপাশে নাছির সাহেব অন্যপাশে ইসরাত। ইসরাতের পাশেই জায়িন বসেছে৷ নুসরাত নিজের মতো এক কোণায় বসা। সে কারোর দিকে ধ্যান দিল না। খাবার খাওয়ার সময় কারোর কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় না সে। তার ডান পাশে চেয়ার টেনে বসল আরশ, বাঁ-পাশে ইরহাম। আহান আর আমিরাকে খাবারের টেবিলের আশপাশে দেখা গেল না কোথাও। রোমানা খাতুন বসলেন হেলাল সাহেবের মুখোমুখি চেয়ারে। খাবার বেড়ে দিলেন আজ হেলাল সাহেব। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,”ঝর্ণা, নাজমিন, রুহিনী, লিপি, তোমরা ও বসে যাও।
সবসময় ফাঁকা থাকা ডায়নিং টেবিল ভরপুর হয়ে উঠল। চেয়ার কম পড়ায় অনেকে বসলেন সোফার উপর। সুফি খাতুন আরশকে ডিঙ্গিয়ে নুসরাতের দিকে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন,”কী বলেছি মনে আছে?
নুসরাত দাঁতে দাঁত চেপে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। আরশ নুসরাতের হাত থেকে চামচ নিয়ে প্লেটে ভাত বেড়ে দিল প্রথমেই। জিজ্ঞেস করল,”আর দিব?

নুসরাত মানা করল আর নিবে না। গোরুর গোস্তের বাটিটা টেবিল থেকে টেনে আনল সে। নুসরাতের প্লেটে গোস্ত তুলে দিতেই সুফি খাতুন বললেন,”একদিনেই দেখি বউয়ের গোলাম হয়ে গেলি?
আরশ ভ্রু উচিয়ে বলল,“গোলাম? শুধু গোলাম দাদি?
“তাহলে তুই বউয়ের পালতু কুত্তা হয়ে যেতে চাস?
“ হলে সমস্যা কোথায়!
“বিয়ে হতেই মাথায় চড়াচ্ছিস ডুগডুগিটাকে? মাথায় তবলা বাজাবে।
“বাজালে সমস্যা কোথায়! বাজাক না, আমার মাথায়ই তো বাজাবে।
সুফি খাতুন কিছু একটা বিড়বিড় করে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আরশ আলগোছে মাংস এক পিস নিয়ে নিজের মুখে ঢোকাল। নুসরাতের উদ্দেশ্যে বলল,”স্পাইস বেশি। আর দিব? খেতে পারবি?
“সমস্যা নেই, দিন!
“ শিওর তো খেতে পারবি?
নুসরাত নাক মুখ চূড়ায় তুলল। আরশের আশিক টাইপ কান্ড মেনে নিতে তার কষ্ট হলো। মাথা ঘোরাতে শুরু করল, তবুও নিজেকে সামলে বলল,”হ্যাঁ, খেতে পারব, আপনি দিন।
হেলাল সাহেব বললেন,”শাহেদের মেয়েটার বিয়ে দিয়ে যেতে চাচ্ছে শাহেদ। ভালো কোনো ছেলের সন্ধান থাকলে দিস তো, নাছির।

হেলাল সাহেবের কথায় জড়তা নিয়ে তাকালনে নাছির সাহেব। দীর্ঘ দিনের দূরত্বে দু-জনের মধ্যে জড়তা এসে গিয়েছে৷ সময় নিয়ে বললেন,”ঠিক আছে।
শোহেব সাহেব আগ বাড়িয়েই বললেন,”সৌরভির ভাই তো আছে, আমাদের সোসাইটির, দেখতে পারেন। ছেলেটা ভদ্র সভ্য, বিভিন্ন অর্গানাইজেশন হয়ে ইভেন্টে হোস্টের কাজ করে। বেতন ও ভালো। কোয়ালিফাইড একটা ছেলে। আপনি চাইলে কথা বলতেই পারেন নিজাম চাচার সাথে।
কথা শেষে শোহেব সাহেব সরাসরি সৌরভির দিকে তাকালেন। যে মাথা ঝুঁকিয়ে খাচ্ছিল,”কী বলো তুমি, মা? তোমার কোনো সমস্যা আছে এ বিষয়ে?
সৌরভি মাথা তুলে তাকাল তড়িঘড়ি করে। সুফি খাতুন ফোড়ন কেটে বললেন,”ও ছোট মানুষ কী বুঝবে এসব বিষয়ে?
সোহেদ সাহেব বললেন,”ফুপি ওর অনুমতি নেওয়া জরুরি, যেহেতু ওর ভাইয়ের বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে। ছোট মানুষ, বড় মানুষ বলতে কিছু নেই। নুসরাত, ইসরাত, আহান, মমো, ইরহামের যেমন সব বিষয়ে অনুমতি নেওয়া হয়, তেমনি ওর অনুমতি নেওয়াটা জরুরি। বাড়ির বউ হিসেবে ওর মতামত নেওয়া আরো বেশি জরুরি।

সৌরভি অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে সামান্য ভরকেছে। তাই তোতলিয়েই বলল,”আ আমার কোনো সমস্যা নেই, আপনারা যা ভালো বুঝেন।
এবার রুহিনী বেগম কথা তুললেন। বললেন,”ভাবী বলছিলেন মমোর কথা।
লিপি বেগম জিজ্ঞেস করলেন,“কোন ভাবী?
খোলাসা করতে এবার ভদ্রমহিলা বললেন একে একে সব কথা,”উনার নাকি মমোকে মাহাদির জন্য ভীষণ পছন্দ। এখন ছেলে মেয়ে রাজী থাকলে কথা আগানোর কথা ভাবছেন। মমোর ও তো অনেক বয়স হয়েছে, বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, মাহাদিও চোখের সামনে বড় হয়েছে, ওদের বিয়ে দিয়ে দিলে কোনো সমস্যা হবে বলে আমার মনে হয় না।
মমো কিছু বলতে যাবে ঝর্ণা বেগম চোখ পাঁকিয়ে থামিয়ে দিলেন। হেলাল সাহেব বললেন,”আগেরবার ও আমি এই বিষয়ে কথা বলেছিলাম মমো রাজী হয়নি, এবার রাজী হবে তো? ওরা রাজী না হলে তো আর জোর করে বিয়ে দেওয়া যাবে না, মতের বিরুদ্ধে।
ঝর্ণা বেগম ঝটপটই বললেন,”ও রাজী হবে না কেন? আপনারা তো ওর ভালোর জন্যই সিদ্ধান্ত নিবেন। আপনারা যা সিদ্ধান্ত নিবেন তাই ও মেনে নিবে।

হেলাল সাহেব মমোর দিকে তাকাতেই সে অসহায় চোখ দুটো লুকিয়ে ফেলল। অনুমতি নেওয়ার ভঙ্গিতে হেলাল সাহেব শুধালেন,”আমি কথা আগাব মমো?
মমো না করার জন্য তৎপর থাকলেও চেপে গেল। এর আগে মগজ ধোলাই করেছেন দুই জা মিলে তার। ছোটবেলার আত্মকাহিনী শুনিয়েছেন। কীভাবে পেলে পুষে তাকে বড় করেছেন। এখন বড় হয়ে তাদের কথা না শুনলে তো সে প্রমাণ করেই দিবে ভাগ্না কুটুম হারাম হয়। সেই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলে নরম হৃদয়ের মমো মাথা দোলাল উপর নিচ। বলল,”আপনারা যা ভালো বুঝে সিদ্ধান্ত নিবেন তাই আমি মেনে নিব। আমার কোনো দ্বিমত নেই।
সোহেদ সাহেব শুধালেন,”কোনো পছন্দ আছে?
মমো দু-পাশে মাথা দোলাল। সবাই হাসি হাসি মুখ করে সরিয়ে নিল তার থেকে দৃষ্টি। তারপর আলোচনায় ব্যস্ত হলো কীভাবে কথা পারবে শাহেদ খানের কাছে বিষয়টা নিয়ে।
ড্রয়িং রুমে থাকা ঘড়ির শব্দটা জানিয়ে দিল প্রায় একটা বেজে গিয়েছে। একে একে সবাই এবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। নুসরাত চেরি ফল খাচ্ছিল। শোহেব সাহেব আকস্মিক তার হাতের মুঠোয় ক্যাস কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেন। চোখ তুলে সে তাকাতেই বললেন,” ক্যাস নেই আর, এইগুলো ছিল। হঠাৎই তো সব হলো।
নুসরাত হাতের টাকা গুলো গুণে দেখল৷ পনেরো হাজার টাকা। খুচরো আরো কিছু পয়সা আছে৷ সেগুলো হিসাব শেষে নিজের পকেটে পুরে রাখল। হেলাল সাহেবকে জড়তা নিয়ে একবার নুসরাতের দিকে তাকাতে দেখা গেল আবার চোখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি। তারপর এগিয়ে গেলেন সময় নিয়ে হেঁটে। কার্ড এগিয়ে দিলেন তার দিকে। ভ্রু উচিয়ে নুসরাত তাকাতেই বললেন,”সালামি তোর।

“কতটাকা আছে?
কার্ড হাতে নিতে নিতে শুধাল সে। হেলাল সাহেব বললেন,”নিজেই চেক করে নিস।
বলা শেষে নিজেও চলে গেলেন। রুহিনী বেগম আর ঝর্ণা বেগম তাড়া দিলেন সবাইকে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য। সৌরভির উদ্দেশ্যে বললেন,”সৌরভি যাও, ওকে ওর রুমে দিয়ে আসো।
সৌরভি এগিয়ে এসে নুসরাতের হাত ধরতেই সে মানা করল। হাত ছাড়িয়ে নিল আলগোছে মেয়েটার হাত থেকে৷ বলল,”সমস্যা নেই, আমি পারব।
সুফি খাতুন এগিয়ে আসলেন। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠলেন,”যা বলেছি মনে আছে? ওই যে ওই বিষয়টা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে…
চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝালেন। নুসরাত কপাল কুঁচকে তাকাল। বলল,”তুমি বাসর নিয়ে পড়েছ কেন এভাবে?
নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর বয়স্কার,“তোরা তো আর প্রথম পদক্ষেপ উঠাবি না, আমাকেই তো অভিজ্ঞ হিসেবে তোদের পথ দেখাতে হবে।

সুফি খাতুন আরো কিছু বলছিলেন নুসরাত তার কথা কানেই তুলল না, ধুপধাপ পা ফেলে দৌড়াল। দৌড়ে গিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখল একপাশে আরশ দাঁড়িয়ে অন্যপাশে রুহিনী বেগম দাঁড়িয়ে আছেন মূর্তির মতো। আরশের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ দূরে সরিয়ে নিল সে। সেকেন্ড কয়েক কাটল। রুহিনী বেগম বললেন,”ঘোমটা দিয়ে বসো নুসরাত আম্মা, আরশ আব্বা এসে ঘোমটা উঠাবে।
নুসরাত ত্যক্ত শ্বাস ফেলল। নাক মুখ কুঁচকাল। কপালের পুড়ে যাওয়া অংশ এতে যেন আরোকটু গভীরভাবে দেখা গেল। তার নাক মুখ কুঁচকানো ঠেকল না ভদ্রমহিলার নিকট, টেনে নিয়ে গিয়ে রুহিনী বেগম বসিয়ে দিলেন বিছানার উপর। লম্বা দোপাট্টা দিয়ে মুখের উপর ঘোমটা দিয়ে দিলেন। রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বললেন,”আরশ আব্বা, ঘোমটা তুলে ফেলুন তাড়াতাড়ি। বউয়ের চাঁদ মুখ দেখুন।
দরজা আটকে দিতে গিয়ে দেখল সৌরভি, ইরহাম, দাঁড়িয়ে। দু-জনের দিকে ভ্রু উচাতেই ইরহাম বলল,”কিছু বকশিস দিন, ভাউ। এত কষ্ট করলাম আপনার বিয়ে নিয়ে।
আরশ দরজা টেনে লাগাতে লাগাতে বলল,”আগামীকাল দিব।

ইরহাম মেনে নিল, সৌরভিকে বগলদাবা করে নিয়ে চলে গেল নিজেদের রুমে। দরজা আটকে এসে আরশ গায়ের পাঞ্জাবিটা খুলে রাখল কাউচের উপর। গায়ে রইল শুধু ট্রাউজার আর স্যান্ডো গেঞ্জি। ধীর পায়ে নুসরাতের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসল। নুসরাত তখনই বলল,”আরশ ভাই, ঘোমটা তাড়াতাড়ি উঠান। এত সময় নিচ্ছেন কেন আপনি? স্লো-মশনে আসছেন নাকি?
আরশ নুসরাতের ঘোমটা উঠাল। মুখোমুখি বসা থাকায় চোখাচোখি ও হলো সেকেন্ড কয়েকের জন্য। নুসরাত ফট করে চোখ দূরে সরিয়ে নিল। আরশ নুসরাতের দিকে ঝুঁকে আসলো। দু-হাত রাখল নুসরাতের দু-পাশে। নিজের হাতের মধ্যে মেয়েলি দেহটা আবদ্ধ রেখেই কানের লতির দিকে ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁট রাখল সে। বিড়বিড় করে বলে ওঠল,”আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না, তুই এখন আমার। নুসরাত নাছির এখন আমার! আমি নিজেকে কীভাবে এ কথা বিশ্বাস করাব, তুই বল নুসরাত?

নুসরাত মাথা সামান্য পিছনে সরিয়ে নিয়ে আরশের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল। আরশ তখনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশায় নুসরাতের দিকে তাকিয়ে। নুসরাত কী বলবে খুঁজে পেল না! সে বিশ্বাস করতে পারছে না, তাহলে নুসরাত বিশ্বাস করাবে কীভাবে? তার মুখ গম্ভীর করে ভাবনার মধ্যেই আরশ নিজের ঠোঁট চেপে ধরল তার নাকে। একহাতে চেপে ধরল ঘাড়। হাতের আঙুল গুলো অনায়াসে স্পর্শ করল নুসরাত নাছির এর চুল। আরশকে চোখ বন্ধ করে তখনো বিড়বিড় করতে শোনা গেল,”আমার বিশ্বাস হচ্ছে না এটা তুই, যেন কোনো স্বপ্ন, ঘুম ভাঙলেই সব শেষ হয়ে যাবে। এতটা শান্তি লাগছে কেন আমার? বল?
আরশ থামল সেকেন্ড কয়েকের জন্য। তারপর ডাকল,“নুসরাত..?
নুসরাত আরশের কপালের চুল ছাড়া কিছুই দেখল না। আরশকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করতে শোনা গেল,”আমার কথা মনে হয়েছে তোর কখনো?

“না।
“আমার জন্য কেঁদেছিস কখনো?
“ না!
‘“কাঁদিস নি?
“না!
আরশ চোখ খুলে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল৷ মেয়েটার নাক থেকে ঠোঁট সরিয়ে বিড়বিড়িয়ে ওঠল,” মিথ্যুক!
°°
“পূর্ব…
নাহিয়ান চোখ তুলে তাকাল। দৃশ্যপটে দেখা গেল রেস্টুরেন্টের ভেতর। অভিজাত্যে মোড়ানো! ডাক অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই নুসরাতের দেখা মিলল। কারাগারের সেই শ্যাওলা পড়া দেয়াল নেই। শিক নেই! আছে শুধু ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস। রাস্তার বাহিরের চলাচলকৃত গাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে শব্দ ভেসে আসছে রিকশার ক্রিং ক্রিং করে। ঠাট্টা করল নাহিয়ান,”আজ নামের বিকৃতি ঘটালেন না যে?
গায়ের কালো রঙের কোটটা রাখল নুসরাত। চেয়ার টেনে বসার আগেই নাহিয়ান উঠে তা বের করে দিল। নুসরাত টু শব্দটি করল না। ইন করে রাখা শার্টের একটা বোতাম খুলে ফেলল। এসির ঠান্ডা বাতাসে নিমেষেই ঠান্ডা হয়ে আসলো শরীর। টেবিলের উপর রাখা পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে তা আবার রেখে দিল৷ শার্টের হাতা গুটিয়ে শুধাল,”আবার কেন দেখা করার কথা বলে পাঠিয়েছেন?

“সময় নিন, একটু শ্বাস ফেলুন, তারপর বলছি!
নুসরাত চোখের চশমা খুলে রাখল টেবিলের উপর। টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বলল,’”সময় নেই পূর্ব, অনেক কাজ ফেলে রেখে এসেছি।
“কাজ পরেও করা যাবে, এত হাইপার হচ্ছেন কেন?
“মেইন টপিকে আসুন ,পূর্ব। এত সময় নিচ্ছেন কেন?
পুরুষালি পুরু ঠোঁট বাঁকিয়ে কিঞ্চিৎ হাসল নাহিয়ান। বলল,”আপনি জানেন আমি কেন আপনাকে আবার ডেকে পাঠিয়েছি।
নুসরাত কপাল কুঁচকাল। চোখের আকার সরু হয়ে আসলো নিমেষেই। দাঁড়িয়ে পড়ল তড়িৎ। কন্ঠস্বর আগের মতোউ রইল,”এই বিষয় ছাড়া আপনার আর কোনো কথা নেই, পূর্ব?

“না!
“ আমি আপনাকে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে মানা করিনি?
“সমস্যা কোথায়?
“সমস্যা নেই কোথায়?
নাহিয়ানের কন্ঠস্বর খানিকটা উঁচুতে উঠল। তা ও সামান্য মাত্রার। বলল,”আপনাকে আমি পছন্দ করি।
নুসরাতের তিরিক্ষে কন্ঠের কথা ভাসল,“আমাকে জিজ্ঞেস করে আপনি আমাকে পছন্দ করে ছিলেন? এর দ্বায়বার তো আমার না, সম্পূর্ণ আপনার।
নাহিয়ান শ্বাস ফেলল। বলল,”আপনি আগে বসুন, নুসরাত!
“বসার মতো পরিস্থিতি আপনি রাখলেন কোথায়, পূর্ব?
নাহিয়ান সে কথার প্রতিত্তোরে কিছুই বলল না। উঠে দাঁড়াল। অপাশের ব্যক্তি কিছু বোঝার ওঠার আগেই চেপে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল। নুসরাত চোখ পাঁকিয়ে শাসাল। কঠিন কন্ঠে নিষেধাজ্ঞা করল,”গায়ে হাত না দিয়ে কথা বলুন।
নাহিয়ান চেয়ার সহ নুসরাতকে টেনে এনে বসাল তার পাশে। চোখ বন্ধ করে সময় নিল। তারপর তাকাল সরাসরি নুসরাতের চোখে। চোখদুটো তাকিয়েই ছিল তার দিকে। চোখাচোখি হলো নিমেষেই। যেন জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দিবে। নাহিয়ান সেসবের তোয়াক্কা করল না। স্পষ্ট কন্ঠে জানাল,”আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আপনার মত কী এই বিষয়ে?
বিয়ের প্রস্তাবের উত্তর সেকেন্ডের ভেতরে আসলো,”আমি এর আগেও এই বিষয়ে আমার মত জানিয়েছি।

“আমি আবারো জানতে চাচ্ছি?
নাহিয়ানের দৃষ্টি প্রশ্নাত্মক। নুসরাত সেদিকে ফিরেও তাকাল না। বলল,”আপনাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক নই আমি।
নাহিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল,“সমস্যা কোথায় আপনার? আরশের অপেক্ষায় এখনো বসে আছেন? ওকে চান আপনি? বলুন? বলুন?
নুসরাত কঠোর স্বরে নাহিয়ানের নাম ধরে ডাকল,”পূর্ববব…আপনি…
অতি উৎসাহী কন্ঠে নুসরাতের কথা ফুরানোর জন্য সে তাড়া দিল,”হ্যাঁ, কী? আমি খারাপ? এটা বলবেন?
নুসরাত মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। নাহিয়ান সতর্ক করল,”আমার দিক থেকে এভাবে মুখ ফেরাবেন না, নুসরাত। আমি এই বিষয়টা সহ্য করতে পারি না।
নাহিয়ান থামল সেকেন্ড কয়েকের জন্য৷ নুসরাতকে জিজ্ঞেস করল,”আপনাকে আমি গত ছয় বছরে কতবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি আপনার কাছে তার হিসাব আছে?
নুসরাত সে কথারও উত্তর দিল না। মুখ ঘুরিয়ে রাখল অন্যদিকে। নাহিয়ানই বলল,” চারশত চুরানব্বই বার। এটা আপনার কাছে কম মনে হচ্ছে? আর কতবার আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিবেন? দেয়ালে এতবার মাথা ঠুকলে তো দেয়ালে এক চিলৎ ফাটলের সৃষ্টি হয়, আপনার মনে আমার জন্য হলো না একটুও?
সিমেন্টের মতো একজায়গায় অটল থাকা শক্ত নুসরাতের উত্তর আসলো,”না।

নাহিয়ান কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। টেবিলের উপর হাত ঠেকিয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। নুসরাত সেই যে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আর ফিরে তাকায়নি। ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের অপাশে চেয়ে আছে। বহু পূর্বে করা অর্ডার ওয়েটার এনে রেখে গেল টেবিলের উপর। গোলাপি রঙের অতিরিক্ত হুইপ ক্রিম দিয়ে তৈরি এক টুকরো কেক। নাহিয়ান ঠেলে দিল নুসরাতের দিকে, মৃদু আওয়াজ করে বলল,”নেন, খান!
নাহিয়ানের ডাকে চোখের পলক ঘুরল না।সে চেয়ে রইল বিকেলের শেষ আলোর দিকে। আবারো লোকটার স্বর ভেসে এলো,”খাবারের উপর রাগ করতে নেই, খান।
“খাব না।
“ খেয়ে ফেলুন, নুসরাত। আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন?
“আমি কোথায় দিলাম?
“ আপনি দিচ্ছেন না?
প্রশ্ন শেষ করেই নাহিয়ান শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে অট্টস্বরে হেসে উঠল। নুসরাতের থেকে উত্তর আসলো সেকেন্ডের ভেতর,”না! আপনি নিজ উদ্যোগে তা নিজের করে নিচ্ছেন।।
“যান, সব দ্বায়বার আমার। এবার খেয়ে ফেলুন।

নুসরাত দু-হাত টেবিলের উপর রেখে নাহিয়ানের দিকে তাকাল। মলিন চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে হতাশা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,” আপনার জন্য আমার কষ্ট হয়, পূর্ব। কেন আমার মতো একটা মেয়ের পিছু নিয়েছেন ? এখনো সময় আছে, ভালো একটা মেয়ে বিয়ে করে সুন্দর জীবন-যাপন শুরু করুন।
“সম্ভব না।
নুসরাত অতিরিক্ত হুইপড ক্রিম মিশ্রিত কেকটা নিচ্ছে না দেখে নাহিয়ান বলল,”পেস্ট্রি না খেলে আমি খাইয়ে দিব। আপনি নিশ্চয়ই সেটা পছন্দ করবেন না?
নুসরাত কথা বাড়াল না। চামচ দিয়ে পেস্ট্রির একটু একটু মুখে ঢোকাল। বলল,”ভদ্রলোক হয়ে উঠুন। খারাপ কাজ ছেড়ে দিন।
নুসরাত আরো কিছু বলবে তার কথা কেটে দিল নাহিয়ান। বলল,”ছেড়ে দিব খারাপ কাজ। সব ছেড়ে দিব। আপনি যা বলবেন তাই করব। কিন্তু…
নুসরাত শুধাল,“কিন্তু কী?

“আমার হয়ে যান। আপনার জন্য আমি সব ছেড়ে দিব। আমাকে বিয়ে করে ফেলুন৷
নুসরাত হাসল ঠোঁট বাঁকিয়ে। আগের তুলনায় কিছুটা স্বাস্থ্য ভালো হওয়ায় গালটা ফুলে ওঠল। নাহিয়ানের কাছে দেখতে আকর্ষণীয় লাগল।
“বিয়ে করব কীভাবে বলুন, পূর্ব? আমি তো বিবাহিত।
“ আপনার ডিভোর্স হয়ে গেছে।
“তবুও? খারাপ দেখায় না, একজন ছেড়ে যেতেই আরেকজনের ঘাড়ের উপর চড়ে বসা? আমার কাছে বিষয়টা লজ্জাজনক মনে হয়। বিয়ে করা কোনো জরুরি ফ্যাক্ট না আমার কাছে। বিয়ে করে লাভ কী?
নাহিয়ান দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল। বলল,”বিয়ে করা আপনার কাছে জরুরী ফ্যাক্ট না, নুসরাত? সমাজে ডিভোর্সি নারীদের মানুষ সহজ চোখে নেয় না।

“এই বিষয়ে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আছে। যেহেতু আমার নারীবাদি মন সংগ্রাম করছে এই বিষয়ে কথা বলতে তাই শর্ট করে একটা কথা বলি। ডিভোর্সি নারীদের যেহেতু সমাজ সহজ চোখে নিবে না, তাহলে পুরুষকে কেন নিবে? দু-জনকেই সমান চোখে দেখা উচিত। কিন্তু এমন হয় না আমাদের সোসাইটিতে৷ তারা শুধু মেয়েটাকে এর দ্বায়বার দেয়, ছেলেটাকে দেয় না। প্রকৃতপক্ষে দু-জনেই সমান দোষী।
কথা শেষ করে নুসরাত হাতের ঘড়ির দিকে তাকায় সময় নিয়ে। সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। বাহিরে সাঁঝ নেমেছে অনেক পূর্বে। ভ্রু দুটো কুঁচকে যায়, এত তাড়াতাড়ি এত সময় গেল কীভাবে ভেবে? চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে ভেবে উঠে দাঁড়ায় সে। নিজের হান্টার গ্রীন কালার হ্যান্ড ব্যাগটা তুলে নেয় হাতে। চোখের চশমা চোখে এটে নিয়ে নাহিয়ানের দিকে তাকায়। বলে,”আমার কাছে যদি আরেকটু সময় থাকত তাহলে এই বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলাপে বসতাম। আজ উঠি তাহলে। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কথা শেষে ওয়েটারকে ডাক দেয় সে,”এক্সকিউজ মি!
ওয়েটার এগিয়ে আসতেই নুসরাত কার্ড এগিয়ে দিল। নাহিয়ান বাঁধা দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে, তা খাটল না নুসরাতের উপর। সে চোখ পাঁকিয়ে বলল,”আজ আমার পক্ষ থেকে ট্রিট। কিছু খেতে চাইলে অর্ডার করে ফেলুন, ঝটপট! নুসরাত নাছিরের পক্ষ থেকে এরুপ অফার আসে খুব কমই। আমি খুবই টাকার বিষয়ে হিসেবি।

নাহিয়ান দু-পাশে মাথা দোলাল সে কিছুই অর্ডার করবে না বলে।৷ শুধাল,”আমার প্রস্তাবের উত্তর কী?
ঠোঁট এলিয়ে হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল। পি-অ-এস মেশিনে কার্ড দেওয়ার আগেই ওয়েটার জানাল,”ম্যাম, বিল পে করা হয়ে গেছে। আপনাকে পে করা লাগবে না।
নুসরাত কথা বাড়াল না, হ্যান্ড ব্যাগ বগলদাবা করে এগোল সামনে। পিছু থেকে নাহিয়ান তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মার্বেল টাইলসে ঘর্ষণ তোলা লুই ভিটন এর স্টিলেটোর শব্দ হারিয়ে গেল বাতাসের সাথে, তার সাথে মিলিয়ে গেল নুসরাত নাছিরের গায়ের সুগন্ধি। তখনই চারিদিক থেকে ভেসে আসলো মাগরিবের আজান। নাহিয়ান হাসল। এই তো শেষ দেখা ছিল তাদের! সেদিনের দেখাটা আরোকটু দীর্ঘ হলো মন্দ হতো কী? হতো না। নুসরাত নাছির বেঁচে থাকলে কী পৃথিবীর অবসান ঘটত? ঘটত না। তাহলে কেন নুসরাত নাছির হারিয়ে গেল?

নাহিয়ানের সে প্রশ্ন তার মনের ভেতর রয়েই গেল। উত্তর আসে না। ফজরের আজানের শব্দ আসলো তার মধ্যেই। উঠে বসল সে শক্ত খাটিয়াটা থেকে। ছোটোখাটো জানালার অপাশে কয়েকটা গাছ দেখা যাচ্ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তারারা উঁকি দিচ্ছি। যেন উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো মিটমিটিয়ে হাসছে। দিনের আলো ফুটে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। নাহিয়ান উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সময় নিয়ে। দেখতে সেগুলো কোনো প্রজ্জ্বলমান দীপ্তির মতো লাগছে। চার দেয়ালের আড়ালে থাকা শিকের মধ্য দিয়ে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো দেখতে দেখতে নাহিয়ানের মনের কোণে কারোর চোখের কথা মনে পড়ল। উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো সেই চোখগুলো! অন্ধকারে দেখলে মনে হয় কুচকুচে কালো মণি। আর আলোর ছটা পড়লে মনে হয় সামান্য বাদামি। শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল উপরের দিকে৷ ঠোঁটে হাসির ছটা৷ সামনে দেখতে পেল এক ঝলক নুসরাত নাছিরের। সে ঠোঁট এলিয়ে হাসল। আজকাল এমন বিভ্রম একাধিক বার হয়। হাঁটতে বসতে সে দেখতে পায় মেয়েটার মুখ। এত আকর্ষণীয় ঠেকে চেহারাটা শব্দে বয়ান করা ভীষণ মুশকিল। হাজার স্মৃতি মনে কড়া নাড়ল।

এই তো সেদিন তার আর নুসরাত নাছির এর দেখা হয়েছিল, এই সেদিন-ই তো তাদের আলাপ হয়েছিল, এই তো সব হলো সেদিন! বোঝার যো নেই এত তাড়াতাড়ি পাঁচটা বছর কেটে গেছে। চোখের পলকে! সময় এত তাড়াতাড়ি কেন কেটে যায়? সময় না কাটলে তো এত তাড়াতাড়ি নুসরাত নাছির পাড়ি জমাত না অপাড়ে। হাতটা তুলে চোখের উপর রাখতেই নাহিয়ানের অনুভূতি হলো তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ঠোঁট ছিঁড়ে আচানক বেরিয়ে আসলো শ্লেষ মিশ্রিত হাসি। হা হা করে হেসে উঠল বহুদিন পর। পাগলের মতো হাসল। বিড়বিড় করে উঠল,”নুসরাত নাছির, নুসরাত নাছির, আমার অপ্রিয় নুসরাত নাছির। আপনি যেতে যেতে আমার কারাবাস নিশ্চিত করে চলে গেলেন। আপনি আমাকে ধ্বংস করে দিলেন আর আমি সেই ধ্বংসের এক মুঠো ছাই আপনার হাতে তুলে দিতে তৎপর হয়ে বসে আছি। আপনার আমার দেখাটা কী সৃষ্টিকর্তা আমাকে ধ্বংস করার জন্য করিয়ে ছিলেন?

নাহিয়ান থামল। পাগলের মতো হাসতে হাসতে আকাশের দিকে তাকাল। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই রবের উদ্দেশ্যে বলল,”আই লাভ ইউ, আল্লাহ! আই লাভ ইউ। আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। আপনি যদি আমাকে সৃষ্টি না করতেন, আমাকে জন্ম নেওয়ার না সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি আপনার এত সুন্দর, সৃষ্টির দেখা পেতাম কীভাবে? আপনিই বলুন? ইউ আর বেস্ট প্লেনার, আল্লাহ। আই লাভ ইউ!
নাহিয়ান ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু পড়ল সময় নিয়ে। পায়ে পানি ঢালল। পশ্চিমের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি তার। দীর্ঘ সময় নিয়ে সে সূরা পাঠ করল। রুকু দিয়ে সিজদাহে্ যেতেই ডুকরে কেঁদে উঠল। চোখ থেকে টপটপ করে ঠান্ডা মেঝেতে পড়ল পানি। নাহিয়ানের ফিসফিস করে কথার আওয়াজ ভেসে এলো,”নুসরাত নাছির কেন আমার হলো না? ওকে না পাওয়ার আক্ষেপ আমি কীভাবে মিটাব? আপনিই বলুন?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬২

নাহিয়ানের আক্ষেপ মিশ্রিত করুণ সেই স্বর ভোরের শীতলতার সাথে মিশে গেল। সে জানতে পারল না যার জন্য সে এই কারাবাস গ্রহণ করেছে, যার জন্য এই বিভ্রমে তার দিন কাটছে, যার জন্য সে ধ্বংস হওয়ার পথে, সেই নুসরাত নাছির বেঁচে আছে। নিজের ঘরে আছে। নিজের বিবাহিত জীবন সুখে কাটাচ্ছে। নাহিয়ান আবরার পূর্ব কোনো কিছুরই ঘূনাক্ষরেও টের পেল না।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৪