মহামায়া পর্ব ৫৬
তুশকন্যা
নতুন দিনের কর্মব্যস্ততাতেও আনায়ার দিনকাল বেশ রয়েসয়েই কেটে যাচ্ছে। গতকালের ন্যায় আজ আর কোনো ফাঁকফোকড় না খুঁজে সোজা ভার্সিটিতে গিয়েছে। অতঃপর সময়মতো ভার্সিটি হতে তিন জনে একত্রে বাড়ি ফিরেছে। দুপুরের ব্যস্ত সময়টুকুও কাটিয়ে বিকেল হতে-ই, চপল রমণী আনায়া হাজির হয়েছে ব্লাডেনের হেডকোয়ার্টারে।
তবে আনায়া’র আজ হঠাৎ সাহস হচ্ছে না কেনীথের কেবিনে প্রবেশ করে তার মুখোমুখি হওয়া। যদিও গতকাল ওমন উৎপটাং কাজগুলো সে জুলি সেজে করেছিল, কিন্তু তাতে কি? মানুষটা তো সে নিজেই ছিল।
বদমাশি করার সময় হুঁশ না রইলেও, এখন হঠাৎ তার লজ্জায় জান যায় যায় অবস্থা। এই ভাবনায় গত দু’ঘন্টা হতে হেডকোয়ার্টারে পৌঁছেও সে একবারের জন্যও কেনীথের কেবিনের দিকে পা বাড়ায়নি। আপাতত তার ব্যস্ততাটুকু কাটছে নিজের কেবিনে। ভাবতেই তার অবাক লাগছে, ঠিকমতো কোনো কাজকর্ম না করেও সে কত সুন্দর একখান কেবিন পেয়েছে।
চারপাশ গ্লাসওয়ালে ঘেরা, কেবিনের মাঝবরাবর একটা মাঝারি আকারের টেবিল। একদিকে আবার বসার সুব্যবস্থার জন্য দুটো সোফা আর টি-টেবিলও সাজিয়ে রাখা। এছাড়া পুরো কক্ষে আরো বেশ কিছু শেলফ ও কফি-কাউন্টারও আছে। অল্পের মাঝে এলাহি ব্যাপার-স্যাপার দেখে আনায়া খানিকটা উৎফুল্ল ঢঙে চারপাশ ঘুরেফিরে দেখছে। একটা সময় পর, কাজবিহীন কি করবে ভেবে না পাওয়ায় সে হেলতেদুলতে কফি কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। দুধ-চিনি মিশিয়ে বেশ কড়া করে একমগ কফি বানানোর তোড়জোড় শুরু করল সে। একইসাথে খুশিতে মুচকি হেসে বিড়বিড় করল,
“ক্যেয়া জিন্দেগী হে মাইরি! এভাবে শুয়ে-বসে চাকরিই তো আমি সারাজীবন ধরে করতে চেয়েছিলাম।”
এরিমধ্যে আনায়া হঠাৎ কফির মগে চামচ দিয়ে চিনি নাড়াচাড়া করতে করতে, মৃদুছন্দে গা-কোমর দুলিয়ে গুনগুন করে বাচ্চাদের ছড়া গাইতে লাগল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀See you later, Alligator
⠀⠀⠀⠀⠀⠀In a While, Crocodile…
⠀⠀⠀⠀⠀⠀Give a Hug, ladybug
⠀⠀⠀⠀⠀⠀Blow a kiss, Jelly fish….
⠀⠀⠀⠀⠀⠀
ছড়ার ছন্দ মন্দ ছিল না। তবে এতবড় এক মেয়েকে এভাবে হেলে-দুলে বাচ্চাদের ছড়া কাটতে দেখে, কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর অবয়বের ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল।
কিছুক্ষণ আগে পাভেল এসেছিল কেনীথের কাছে। কথায় কথায় শুনল আনায়া আজ হেডকোয়ার্টারে এসেছে। অথচ সে তার কাছে আসেনি—এই ভাবনাতেই আজ নিজেই কেবিন থেকে বেরিয়ে আনায়ার খোঁজে এসেছিল কেনীথ। কিন্তু এখানে এসে যা দেখছে তাতে সে কিছুটা হতবিহ্বল।
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ See you soooon
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ Big babaooooon
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ Out the door,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ Dinasourrrrrrrrrrrrr
⠀
এরিমধ্যে আনায়ার কন্ঠস্বর থমকে গেল। ওষ্ঠদ্বয় গোল করে ‘ডাইনোসর’কে অদ্ভুত এক কায়দায় উচ্চারণ করা সেই রমণী পেছনে ফেরামাত্রই, হতবিহ্বল হয়ে কফির মগ নিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কালো সুট-বুট পরিহিত পুরুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খানা গ্লাসওয়াল পেরিয়ে তার দিকেই নিবদ্ধ হয়েছে। কেনীথ প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে ভ্রু-যুগল কুঁচকে তার দিকে চেয়ে আছে। আনায়া কি করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, হঠাৎ কেনীথ নিজেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। আনায়া হাত থেকে দ্রুত কফির মগটা টেবিলের উপর রেখে, দুহাতে গা-ঝেড়ে নিজেকে কিছুটা ঠিকঠাক করে নিল। কিন্তু সে এটাও বুঝতে পারছে না, আজকে হঠাৎ কেনীথকে দেখে সে এতোটা কেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা এতোটা বেড়েছে, যেন এখনেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়বে।
কেনীথ তখনো সেই একই গম্ভীর্যের সাথে তাকে পরখ করে চলেছে। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে আলতোস্বরে প্রশ্ন করল,
“আপনি এখানে কেনো?”
দাম্ভিক পুরুষ তার গুরুগম্ভীর্যের সাথে কাঁধটা কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে, একঝলকে চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
“কেনো, কোনো সমস্যা?”
আনায়া খানিকটা স্বাভাবিক হওয়ার প্রচেষ্টায় হাসার চেষ্টা করে বলল,
“না,না, আমার আবার কিসের সমস্যা।”
কেনীথ কিছু বলল না। তার নজর তখন পড়েছে টেবিলের ওপর থাকা একটা কালো রঙের ক্যামেরার দিকে। সে ভ্রুকুটি করে যেই-না হাত বাড়িয়েছে ক্যামেরাটা নেওয়ার জন্য, ঠিক তক্ষুনি আনায়া তীব্র সচেতনতার সাথে ছোঁ মে’রে ক্যামেরাটা কেনীথের হাতের নাগাল হতে নিয়ে নিল।
মুহূর্তেই কেনীথের ললাটে সন্দেহের ভাজ পড়ল। অন্যদিকে আনায়ার বুক ধকধক করে কাঁপছে। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে, ক্যামেরাটা তড়িঘড়ি করে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। কেনীথের দিকে ফিরতেই, তার সন্দিহার চাহুনিতে সে আরো বেশি হকচকিয়ে গেল। তবুও নিজের উপস্থিত বুদ্ধি খাটানোর প্রয়াসে একপ্রকার ত্যাছড়া সুরে কেনীথকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কারো পার্সোনাল জিনিস না বলে ছুঁতে নেই; আপনাকে কেউ শেখায়নি?”
কেনীথ নিরুত্তর থেকে আনায়ার দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টির গভীর শান্তরূপে আনায়া আরো বেশি অপ্রস্তুত। চোখ পিটপিট করে ইতস্তত করতে লাগল। কেনীথ আর বিলম্ব না করে, গম্ভীর স্বরে বলল,
“দু’ঘন্টা হলো হেডকোয়ার্টারে এসেছিস, আমার সাথে দেখা করিসনি কেনো?”
কেনীথের রুক্ষ প্রশ্নে আনায়া নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু এই স্বাভাবিক হওয়াটা মানেই, রমণীর বাঁকা ঢঙের কথা আওড়ানো। আশানুরূপ আনায়া থমথমে গলায় সপাটে উত্তর দিল,
“আপনি আমায় দেখা করতে বলেছিলেন নাকি?”
কেনীথ দাঁতে দাঁত পিষে কিছুক্ষণ স্থির রইল। অতঃপর খানিক শাসানো গলায় বলল,
—“ত্যাড়ামি করিস?”
আনায়া চুপসে যাওয়া মুখ করে বলল,
—“আমি কখন ত্যাড়ামি করলাম? আর সবসময় আপনি এমন করেন কেন, বলেন তো? ভালো ভাবে কথা বললেও তো হয়।”
—“ওহ আচ্ছাহ্!”
অদ্ভূতপূর্বক এক তির্যক ভঙ্গিতে কেনীথ বলল। আনায়াকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই, সে তার দিকে পা বাড়াল। অকস্মাৎ তার এরূপ অগ্রসরে আনায়া হকচকিয়ে উঠল,
“কি…কি হলো, হঠাৎ এদিকে কেনো আস…ছেন…”
আনায়া দ্রুততর পেছাতে গিয়ে দেয়ালে ঠেকে গেল। তড়িঘড়ি করে পাশ দিয়ে পালাতে নিলেই, কেনীথ তৎক্ষনাৎ তার মুখোমুখি হয়ে ঝুঁকে পড়ল। দীর্ঘ অবয়বের আদলে ঢাকা পড়ল তার ছোট্ট শরীর৷ আনায়া তীব্র অসহায়ত্বের সাথে আঁড়চোখে এদিক-সেদিক পথ খোঁজার পায়তারা করল। কিন্তু কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে, শেষমেশ শুষ্ক ঢোক গিলল।
ততক্ষণে কেনীথ নিরেট স্বরে চোয়াল নাড়িয়ে বলল,
—“সারাক্ষণ এতো পালাই পালাই করিস কেন, হুহ্?”
কেনীথ নির্বিকার অথচ আনায়ার দশা বেহাল। পিঠটা যেন একটু পর সোজা দেয়ালের ভেতর ঢুকে পড়ব। এমনিতে সারাক্ষণ উৎপটাং কাজকর্ম করলেও, লোকটার অতি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শেই যেন সে সর্বদা কপোকাত। আনায়া চোখদুটো পিটপিট করে কোনোমতে বলল,
—“আমি আপনাকে বলেছি, ভালোভাবে কথা বলতে। এতো কাছে আসতে তো বলিনি।”
কেনীথ আরেকটু ঝুঁকে পড়ে,কন্ঠস্বর দুখাদ নিচে নামিয়ে অকপটে শুধায়,
“কেনো, প্রবলেম হচ্ছে?”
আনায়া দুবার ঢোক গিলে নিজেদের অবস্থান অবলোকন করে৷ মনে হচ্ছে অস্বস্তিতে তার ভেতরটা পুরো দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। আনায়া ওষ্ঠদ্বয় চেপে আওতায়,
—“হ্যা… না মানে…”
কেনীথ সর্বশেষ দুরত্বটুকুও খুঁচিয়ে দেয়। আনায়া চোখমুখ খিঁচে দেয়ালের সাথে লেপ্টে যায়। পুরুষালী সুঘ্রাণ কিংবা চেরি-ব্লাড মিশ্রিত পারফিউমের সুগন্ধিতে তার দম বেরোনোর উপক্রম হয়। এই মূহুর্তে শ্বাসকষ্ট হওয়ায় আংশকায় আনায়া দ্রুততর কেনীথকে নিজের সামনে হতে সরানোর প্রচেষ্টায়, পুরুষের প্রশস্ত বুকে বা-হাত ঠেকিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়েও ব্যর্থ হয়,
—“সরুন এখান থেকে, আমার দম…”
কেনীথ তার কথাটুকু শেষ হবারও ফুরসত দিল না। অকস্মাৎ হাত বাড়াল রমণীর লতানো তনু কোমড়ে। এক লহমায় আনায়া হকচকিয়ে চমকে উঠল। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল কেনীথের পানে,
“এটা কি করছেন!”
কেনীথ প্রত্যুত্তর করল না। প্রথমত রমণীর গায়ের হুডি অতঃপর নিন্মের টিশার্টাও আলতোভাবে উঁচিয়ে স্পর্শের গভীরতা বাড়াল। উন্মুক্ত ত্বকে তপ্ত হাতের ক্ষিপ্র স্পর্শ পাওয়ামাত্রই আনায়ার অক্কা পাবার দশা হলো। সে দু’হাতে কেনীথের দুবাহু শক্ত করে চেপে ধরেও তাকে থামাতে পারল না। বরং পুরুষ তার নির্দয়তায় অকস্মাৎ রমণীর তনু কোমড়ের চামড়ার একাংশ দু’আঙ্গুলের উল্টো-পিঠের ক্ষিপ্ততায় চেপে ধরল।
অকস্মাৎ এই তীব্র ব্যাথার আকস্মিকতায় আনায়া সহ্য করতে না পেরে, অস্ফুটে চোখ-মুখ খিঁচে শব্দ করে উঠল,
—“আহ্!”
কিন্তু না! কেনীথ তখনও তাকে ছাড়ল না। সেই একই দাম্ভিক, নির্দয় পুরুষালী গম্ভীর্যের সাথে আনায়ার আর্তনাদকেও যেন সে উপোভোগ করল। কোমল চামড়ায় দু’আঙ্গুলের চাপ বাড়িয়ে, রমণীর মুখাবয়বের কাছে মুখ নামিয়ে মন্থর স্বরে বলল,
“বল, এরপর থেকে আরো কখনো বদমাশি করবি?”
আনায়া ব্যাথার চোটে হিসহিসিয়ে উঠল,
—“আআআহ্, লাগছে…আমি কখন বদমাশি করলাম, অসভ্য লোক!”
কেনীথ এক চিলতে তির্যক হাসল। আনায়াকে ছেড়ে দিয়ে ঠিক দু’পা পিছিয়ে গেল। আনায়া ছাড়া পেতেই, দ্রুততর পেছন ফিরে নিজের হুডি উচিয়ে কোমড়ের বা-পাশ পরখ করল। ফর্সা চামড়ার একাংশ যেন র’ক্ত জমাট বেঁধে লালচে হয়ে ফুটে উঠেছে। আনায়া নিজের কোমড়ের এহেন দশা দেখে, বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। দ্রুততর হুডিটা টেনেটুনে ঠিক করে পুনরায় পেছনে ফিরল সে। কেনীথের দিকে ক্ষিপ্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সপাটে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল,
—“এটা কি করেলেন? আপনি একটা আস্ত…”
ব্যাথায় কষ্টে আনায়ার নাকের পাটা ফুলে ওঠে। ব্যথা দিতেই ইচ্ছেকৃতভাবে লোকটা এ-কাজ করেছে! তার অশ্রুসিক্ত রাগান্বিত দৃষ্টিতে কেনীথ নূন্যতম বিচলিত হলো না। অত্যন্ত নির্লিপ্ততার সাথে অকপটে শুধাল,
“আপনাকে কাজের জন্য রাখা হয়েছে, অকাজের জন্য নয়।”
সমাপ্ত! কেনীথ আর একটি কথাও বলল না। আর না আনায়াকে বলার সুযোগ দিল। অকপটে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। আনায়া পারছে না কেবল নিজের জুতাটা খুলে পেছন থেকে লোকটার দিকে ছুঁড়ে মারতে। কেনীথ চলে যেতেই আনায়া আবারও নিজের ক্ষতঅংশের দিকে তাকাল। জখম হয়ে যাওয়া জায়গাটা দেখামাত্রই তার কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত পিষে সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে শুধালো,
“মাবুদ! তুমি কি কিছু দেখো না? উনি সবসময় এমন করে। আমি কি কখনো কোনো উল্টাপাল্টা কিছু করি? করি না তো। তাহলে উনি কেন এমন করে?”
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আনায়া থমকে গেল। ব্যাথার তীব্রতাও কমে গেল সেই প্রশ্নের তোপে। সে ভ্রু-যুগল কুঁচকে ভাবতে লাগল,
“এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড! উনি আজ হুট করে নিজে থেকে আমার কাছে এলো, আবার হঠাৎ করে আমার কোমড়েই…ঘটনা কি? উনি কি কোনোভাবে বুঝে গিয়েছে যে, আমিই জুলি? কিন্তু কিভাবে? আর বুঝলেও, উনি তো সেভাবে কখনো কিছু… ওরেহ খোদা, কাহিনিটা কি হচ্ছে? আমি গাধা নাকি উনি বেশি চালাক?”
নিজের কেবিনে ব্যাকচেয়ারে গা এলিয়ে নির্লিপ্তে বসে আছে কেনীথ। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা মুচকি হাসি। দৃষ্টি তার হাতে ধরে রাখা ফোনের স্ক্রিণে। দাম্ভিক পুরুষের ফোনের লকস্ক্রিণ পেরিয়ে, ওয়ালপেপারে স্থান পেয়েছে কোনো এক চপল-অবাধ্য রমণীর সুগঠিত তনু কোমড়ের চিত্র।
কেনীথ অপলকভাবে একাগ্রতার সহিত সেই ছবির সর্বস্ব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। অতঃপর স্ক্রিণ ডান দিকে সোয়াইপ করতেই, সেকেন্ড ওয়ালপেপার হিসেবে দৃশ্যমান হলো সেই একই রমণীর কলারবোনের একাংশ।
নাসারন্ধ্রে তর্জনী ছুঁয়ে পুরুষ সেই ছবিটাও বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। একটা সময় পর ওষ্ঠদ্বয় বিস্তৃত হাসির রেশে ঢাকা পড়ল। বিড়বিড় করে কেনীথ আওড়াল,
“আর ক’টা দিন অপেক্ষা কর, তোর সব ইচ্ছে পূরণ করব আমি। এমনভাবে করব যে, হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদেকেটেও কূল পাবি না।
কেনীথ ফোনটা বন্ধ করে, চেয়ার হতে উঠে দাঁড়াল। তাকে এখন বেরোতে হবে। বিকেলের শেষ প্রহর চলছে। আর খানেকবাদে সূর্য পুরোপুরি ডুববে। আলো থাকতে থাকতে এখন না বেরোলে, পরবর্তীতে বেশ দেরিও হয়ে যেতে পারে।
বহুতল ভবনের বারান্দায় ক্যামেরা হাতে একমনে দাঁড়িয়ে আছে আনায়া। কাজকর্ম যেহেতু নেই তাই বসে বসে এদিক-সেদিক ঘুরে বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছে সে। বারান্দা থেকেও আশেপাশের কিছু ছবি তুলেছে। আপাতত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনায়া সেসবই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে।
দুদিনের মাথাতেই এই ক্যামেরাটা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সে নিজের ছলাকলা কিংবা পরিকল্পনার এমন একাংশ ধারণ করেছে যে, যা এখন অব্দি সকলেরই ধারণার বাহিরে। আনায়া যেসব ছবি দেখছে আর মিটমিট করে হাসছে। কখনো বা তীক্ষ্ণ হাসি ফুটিয়ে তুলছে তার ওষ্ঠকোণে।
এরিমধ্যে আনায়া দৃষ্টি ক্যামেরা হতে সরে গিয়ে, নিচের পার্কিং এরিয়ার দিকে পড়ল৷ বিকেলের আকাশে সন্ধ্যার লাল-কমলা রঙের আভা। আবহটাও চমৎকার! কিন্তু চোখের সামনে দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ যেন একদমই স্বাভাবিক নয়।
আনায়া তার সকল মনোযোগ এবার সেই বিশেষ স্থানের দিকে নিবদ্ধ করল। দুটো অস্তিত্ব অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দূর হতে সেভাবে কিছু স্পষ্টভাবে দেখতে না পাওয়ায় সে দ্রুততর ক্যামেরাটা নিয়ে, স্থানটুকু জুম করে দেখার চেষ্টা করল।
ঠিকই ধরেছিল, কালো কোট পড়া লোকটা আর কেউ নয় বরং সেটা তার বহুকাঙ্ক্ষিত আরাধ্যের পুরুষ! কিন্তু তার সাথে আরেকজন কালো ওভারকোট পড়া মানুষটা মূলত কে? কেনীথের মুখাবয়ব স্পষ্ট হলেও, সেই মানুষটার কোনোকিছুই তো স্পষ্ট না।
আনায়ার ললাটে ভাজ পড়ে; ক্যামেরাকে সর্বচ্চ পর্যায়ে জুম করে বোঝার চেষ্টা করে। দেখতে পায়, বেশ উঁচু হাইটে তবে কেনীথের চেয়ে লম্বা নয় এমন এক ব্যক্তি কেনীথকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। সেই ব্যক্তির এলোকেশী লম্বা চুলগুলো আবার পিঠ অব্দি ছড়ানো। আনায়া হতভম্ব স্তব্ধ হয়ে সে দৃশ্য দেখে। হাত দেখে ক্যামেরটা প্রায় আলগা হয়ে পড়ে। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে, অস্ফুটে ভাবে,
“এটা কি ইমানি আপু? কিন্তু না, ইমানি আপুকে দেখতে তো এমন না। তাহলে…”
আনায়া একমুহূর্তেই অস্থির হয়ে ওঠে। সেদিন ইমানির সাথে কথাবার্তায় যতটুকু বুঝেছে, তাদের এদেশে সেভাবে কোনো ঘনিষ্ঠ মেয়ে ফ্রেন্ড নেই। থাকার মধ্যে ইমানি নিজেই৷ কিন্তু তার সাথে এই দুইভাইয়ের সম্পর্ক তো আলাদা হিসেব।
আনায়া বিস্ময়ে আবারও আওড়াল,
“তাহলে এই মেয়ে কে?”
ততক্ষণে আরো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। আনায়ার ভাবনার মাঝেই কেনীথ আচমকা, সেই রহস্যময় ব্যক্তিকে দুহাতে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, স্পষ্টত দেখতে পায়—কেনীথ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সেই ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে মুখাবয়বে একের পর চুমু খেয়ে যাচ্ছে।
এ দৃশ্য সহ্য করার মতো শক্তি আনায়ার নেই। যতযাই হোক, এটা সে কিভাবে সহ্য করবে। তার হাত-পা অনবরত কাঁপতে থাকে। হাত ধরে ঠাস করে ক্যামেরাটা নিচে পড়ে যায়। সেভাবে ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, আনায়ার ভেতরটা যেন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। একমুহূর্তের মাঝে সে শ্বাসকষ্টের তীব্রতায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। বাধভাঙ্গা কষ্টের মাঝেই দেখতে পেল, কিভাবে তার আরাধ্যের পুরুষ সেই ব্যক্তিকে আগলে ধরে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে; কিভাবে দুজন দুজনার হাত শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
অতঃপর কতটা ঘনিষ্ঠতায় দুজনে একত্রে গাড়ির ভেতর চড়ে বসল। এবং একটা সময় পর আনায়ার দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে তারা নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল।
মহামায়া পর্ব ৫৫
অথচ এদিকে আনায়া ওষ্ঠদ্বয় কামড়েও নিজের কান্না থামাতে পারছে না। দুচোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছে। সে দুহাত মুঠো করে, ফুঁপিয়ে উঠল। ক্রন্দনরত কম্পিত গলায় আওড়াল,
“তার মানে উনি আমাকে ভালোবাসেন না?সব মেয়ের সাথেই তিনি এরকম? ছিহহ্! আর আমি ভেবেছি উনি হয়তো আমাকে ভালোবাসেন, তাই এতো কেয়ার করছেন!কতটা নির্বোধ আমি!”
