Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৬৬

মহামায়া পর্ব ৬৬

মহামায়া পর্ব ৬৬
তুশকন্যা

“ও আমাকে মারলো কেনো? ও কেনো মারলো আমাকে!”
হিসহিসিয়ে উঠে ভিভিয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করল ছোট্ট তারা। তীব্র ক্রোধে রক্তিম হয়ে উঠেছে তারা’র সেই দুগ্ধফেননিভ ফর্সা মুখাখানা। চোখদুটো জলে ছলছল; অথচ ক্রোধে যেন কোটর হতে বেরিয়ে আসবে। ছোট্ট মেয়েটার এরূপ রাগ-জেদ দেখে স্তম্ভিত হয়ে থমকে দাঁড়াল ভিভিয়ান।
বিকেলবেলায় বাড়ির পাশের পার্কে খেলতে এসেছিল তারা। অন্য এক পিচ্চির সাথে খেলাধুলার একপর্যায়ে, আধো-আধো কথার সুরে তর্কবিতর্ক করতে করতে দুজনের তুমুল দ্বন্দ্ব লেগে যায়। অতঃপর সে শিশুটি আচমকা আনায়াকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আনায়া চোট পেলেও কান্নাকাটি করেনি; বরং উল্টো হিংস্র হয়ে ওঠে তার ওপর।
​ওদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আনায়ার ফেরার কোনো নামনিশানা না দেখে, ভিভিয়ান খুঁজতে খুঁজতে পার্কে এসে দেখে এই অবস্থা! ধবধবে সাদা গাউনটায় ধুলোয় মাখামাখি; যা এখন ভিভিয়ানে কালো শার্টের সাথেও পাউডারের ন্যায় লেপ্টে যাচ্ছে। কিন্তু এটা তো বড় বিষয় নয়! এই মেয়ে মা’রামা’রি করেছে শুনলে বাড়ির সবাই রীতিমতো আহাম্মক বনে যাবে; সুশীল আদবকায়দার আবরণে মানুষ করতে চাওয়া, এহসান বংশের গুনধর বড় মেয়ে বলে কথা!

খানিকটা কটাক্ষ করেই বিষয়গুলো নিয়ে মনে মনে ভাবছিল ভিভিয়ান। কিন্তু তার আগেই খেয়াল করল, ​নিজের কোলজুড়ে বুকের সাথে জড়িয়ে থাকা তারা’র ছোট্ট শরীরটা যেন তীব্র রাগে অনবরত কাঁপছে। মেয়েটির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে ভিভিয়ান আচমকা তাকে শক্ত করে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরল। আনায়ার মুখখানি তার বুকের মধ্যভাগে ডুবে যেতেই, ভিভিয়ান আলতোহাতে তার পিঠ চাপড়ে কানের কাছে ফিসফিস করে চাপা স্বরে বলল,
“হুঁশশশ, এতো রাগ-জেদ ভালো না। এভাবে দিনকে-দিন বদমেজাজী হয়ে গেলে, দুদিন পর বাড়ি থেকে আমাদের দুজনকেই বের করে দেবে। বলবে, আমি সেঁধে তোকে আমার মতো বানিয়েছি।”
যুবকের বৃহৎ আকৃতির দেহাবয়বের আবেশে মোটেও দমলো না আনায়া। বরং তৎক্ষনাৎ দুহাতে ভিভিয়ানের কাঁধ চেপে ভর দিয়ে, মুখটা সটান যুবকের বুক হতে উঁচিয়ে তুলল। কান্নায় সিক্ত মুখটায় রাগের মাত্রা তখনো সেই একই। কন্ঠে ঝাঁঝ রেখেই ছোট্ট তারা বলে উঠল,
“কেনো, আমি তোমার মতো হলে কি ছমস্যা?”
ভিভিয়ান তার জেদি-ক্ষিপ্ত মুখাবয়বটা একপলকে দেখে নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। অকপটে প্রত্যুত্তর দিল,
“আমার মতো হলে, তোকে আর কেউ ভালোবাসবে না।”
মুহূর্তেই আনায়ার ছোট্ট মস্তিষ্ক কিছুক্ষণের জন্য নানান চিন্তা ভাবনায় ঘুরপাক খেয়ে গেল। তার কন্ঠস্বরের ঝাঁজ কমে গিয়ে, কিছুটা নমনীয় এবং একইসাথে রুক্ষ হলো। সে আচমকা ভ্রু উঁচিয়ে কাটাকাট গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“তোমাকে কেউ বালোবাছে না?”
“না!”
ভিভিয়ানের নির্লিপ্ত রুক্ষ এক অভিব্যক্তি। তার জবাবে আনায়ার চোখ-মুখ চুপসে গেল। মুখ ফুলিয়ে কিছু একটা ভেবে নিয়ে, তক্ষুনি আবার নিজের হাতদুটো বাড়িয়ে দিল ভিভিয়ানের মুখটার দিকে। হালকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ভর্তি গালদুটো আলতো দু’হাতের আদলে চেপে ধরল পিচ্চি মেয়েটা; ভিভিয়ানকে আশ্বস্ত করতে জোরালো কন্ঠে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে আনায়া বলল,
“কে বলেচে; আমি বাছি তো! আমি তোমাকে অনেক বালোবাছি। জদি আমি কোখনো তোমার মতো হয়ে জাই, তাহনে তুমিও আমাকে অনেক বালোবাছিও, থিক আছে? তাহনেই হবে! আমাদের আর কাউকে নাগবে না।”
বলেই সে ভিভিয়ানের গাল ছেড়ে দিয়ে কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। ক্রোধ এবং কান্নার তোড় পুরোপুরি দমে যাওয়ায়, ফুপিয়ে খানিকটা নাক টেনে নিল সে। দু’হাতে ভিভিয়ানের কাঁধ জড়িয়ে ধরতেই, ভিভিয়ান আবারও আলতোহাতে তার পিঠ চাপড়ে দিল। সোডিয়ামের আলোয় ঘেরা নির্জন রাস্তার পথ ধরে বাড়ির দিকে পা বাড়াল; কিঞ্চিৎ বিদ্রূপের স্বরে আনায়াকে উদ্দেশ্য করে ভিভিয়ান অস্ফুটে বলল,

“বেশি পাকনা পাকনা কথা বলিস তুই। চল, এবার বাড়ি ফেরা যাক।”
“কিনতু বাইয়া…”
“কি হয়েছে আবার?”
“তুমি কি সবাইকে বলে দেবে যে আমি খেলতে এসে দুষ্টুমানি করেসি? আমি কিন্তু কিসু করিনি, সব ঐ পঁচা মেয়েতা করেসে! খেলতে পারে না কিসু না, খালি ঝগরা করে।”
“তো খেলতে যাস কেন ওদের সাথে?”
“আমি কি কবব…ওই তো এসে হুত করে দাক্কা মেরে দিলো। তারপর আমি সুদু একতা গুছি মেরেছি। আর কিসু করিনি।”
ভিভিয়ানের কাঁধ হতেই মুখ ফুলিয়ে কথাটা আওড়াল আনায়া। আশা রেখেছিল, ভিভিয়ান হয়তো প্রত্যুত্তরে বললেও কিছু ভারিক্কি কথাবার্তা তার উপর উগড়ে দেবে। কিন্তু না! ছোট্ট তারাকে ভীষণই অবাক করে দিয়ে, আচমকা গম্ভীর স্বরে ভিভিয়ান বলে উঠল,

“ঝগড়া করা ভালো না। এর পরের বার যখন কেউ তোকে বিরক্ত করতে আসবে, তখন ওটাকে মেরে সোজা হাত-মুখ ফাটিয়ে দিবি। যেন দ্বিতীয়বার তোর আশেপাশেও ঘেঁসার সাহস না পায়।”
আনায়া বিস্ময়ের সাথে মুখ তুলে, ভিভিয়ানের থমথমে নির্বিকার মুখাপানের দিকে তাকাল। বলল,
“ছত্যি? হাত-মুক ফাতিয়ে দেবো?”
“অবশ্যই! যে যেমন করবে তার সাথে ঠিক ওমনটাই করবি।
কিন্তু আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কোনো ঝামেলায় যাবি না। দ্যাটস আ ওয়েস্ট অব টাইম।”
মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল তারা। ভিভিয়ান চলতে চলতে আরো বলল,
“আজ বাড়িতে গিয়ে তোকে সেল্ফ-ডিফেন্স শেখাব। কিন্তু হ্যাঁ, এটা আমাদের মাঝে সিক্রেট থাকবে। কাউকে কিছু বলেছিস তো, খবর আছে তোর!”
আনায়া দ্রুততর মাথা নাড়ল। বলল,
“থিক আসে, কাউকে কিসু বলব না। কিনতু…’
“কিন্তু…?”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়। আনায়া মিটমিট করে হেসে বলে,

“কিনতু জদি তুমি আমাকে ঐ দুকান থেকে দুতো বড় বড় আইসকিম কিনে দাও, তাহনে আমি আর কাউকে কিছছু বলবো না। আর বাড়িতে গিয়েও তুমি কাউকে বলবে না যে, আমি খেলতে এছে দুষ্টুমানি করেসি। তাহনে সবাই আমাকে পঁচা বলবে। কিন্তু তারা তো পঁচা না, তাই না? আর যদি তুমি বলে দিয়েসো…তাহলে আমিও সবাইকে বলে দেবো যে তুমিই আমাকে দুষ্টুমানি করতে শিকিয়েছো। তকন দেইখো, বড় আব্বু তোমাকে কি করে!”
বলেই আনায়া অদ্ভুত এক কুটিল হাসিতে মুখ চেপে হাসতে লাগল। ভিভিয়ান তার কথা শুনে তখন তখনই রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছে। চোয়াল শক্ত করে চাপা রাগ দেখিয়ে বলল,
“ওরে বিচ্ছু, আমার সাথেই মাতব্বরি? আবার আমাকেই আমার বাপের ভয় দেখাচ্ছিস? ইচ্ছে তো করছে তোকে এখানেই আছাড় মেরে ফেলে রেখে যাই।”

আছাড় মারা’র কথা শুনেই, আনায়া দু’হাতে জাপ্টে ভিভিয়ানের কাঁধ গলা চেপে ধরল। কাঁধে মুখ ডুবিয়ে কানের কাছে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,
“আমি জানি, তুমি আমায় কিসু কববে না।”
পিচ্চির এমন আত্মবিশ্বাস দেখে,ভিভিয়ান অচিরেই নিঃশব্দে এক চিলতে মুচকি হেসে ফেলল। আবারও পা বাড়াল ধীরস্থিরে। আনায়াকে উদ্দেশ্য করে মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,

মহামায়া পর্ব ৬৫

“এখন কিছু করব না ঠিকই, কিন্তু যখন করব তখন বুঝবি মজা। একদিনেই ধোলাই দিয়ে সাফ করে ফেলল।”
কে শোনে কার হুমকি-ধামকি! ভিভিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে আনায়ার হাসির প্রকোপ আরো বেড়ে গেল। সে হাসতে হাসতে মরি মরি হতেই, ভিভিয়ান তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল,
“এই পাগলী চুপ কর। আর কত হাসবি?”

মহামায়া পর্ব ৬৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here