Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৫৭

মহামায়া পর্ব ৫৭

মহামায়া পর্ব ৫৭
তুশকন্যা

“ইয়াক থু!”
নিকষিত মার্সিডিজখানা ফাঁকা রাস্তার একধারে থামিয়েই, কেনীথ ত্বরিত বেরিয়ে এলো; রাস্তার ধারে মুখ ফিরিয়ে ত্যক্ত ভঙ্গিতে ছুঁড়ে ফেলল ঘৃণিত থুতু। তার সাথে সাথে মুহূর্তেই গাড়ির বিপরীত পাশের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো সেই রহস্যময় ব্যক্তি। সেও একপ্রকার গা-গোলানো ভঙ্গি করে কেনীথকে উদ্দেশ্য করে জার্মান ভাষায় চেঁচিয়ে উঠল,
“শা’লা তুই আমার সাথে এটা কি করলি? আমার গা গুলাচ্ছে।”

কেনীথ পাশে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। কালো ওভার কোট পরিহিত ব্যক্তিটি আর কেউ নয় বরং তিনি কেনীথেরই কর্মক্ষেত্রের বিশেষ বন্ধু—ফেলিক্স হান্টার। সে একজন জার্মান; একইসাথে একজন খাঁটি পুরুষ। কিন্তু সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়। ফেলিক্সের পোশাকআশাক, সাজসজ্জা কিংবা বাহ্যিক অববয়ের ধরণ কিছুটা ভিন্নধর্মী।
মূলত ব্লাডেনের টেক্সটাইল সেক্টরের সাথে বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছে ফেলিক্স। এখনো সে প্রধান ডিজাইনার হিসেবে ব্লাডেনের সাথে যুক্ত আছে। আর স্বাভাবিক ক্ষেত্রে যেটা ঘটে থাকে—ফেলিক্স আদর্শঅর্থে একজন পুরুষ হলেও, দীর্ঘজীবনের পুরোটাই রঞ্জিত-চাকচিক্যময় কর্মক্ষেত্রে অতিবাহিত করার পর, তার চালচলন এবং পোশাকের শৈলীতে এক ধরনের বৈচিত্র্য ও নমনীয়তা চলে এসেছে।

ফেলিক্সের চুলগুলোও সাধারণ পাঁচটা কোনো নারীর চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘ কিংবা আকর্ষণীয়। প্রায় পিঠ ছাড়িয়েছে সেই চুলের ধরণ। শারিরীক গঠন কিংবা হাঁটাচলার ধরনও অন্যান্য পুরুষদের থেকে কিছুটা ভিন্ন কিংবা নমনীয়। সবমিলিয়ে শীতের আবহে গায়ে বিশাল অভারকোট চাপানো এই পুরুষকে সূদূর কিংবা পেছন হতে দেখে যে কেউ মেয়ে ভেবে ভুল করতে বাধ্য। বিশেষ করে ফেলিক্সের সেই চমৎকার আকর্ষণীয় দীর্ঘ চুলগুলোই সব বিভ্রান্তির মূল।
কিন্তু সে কোনোমতেই বুঝতে পারছে না, সর্বক্ষণ গম্ভীর মেজাজে নিজেকে ঢেকে রাখা ভি আজ তার সাথে এসব কি করেছে? এখনো যেন তার মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। তার বিশুদ্ধ পুরুষ সত্ত্বায় কিছুটা আঘাতও লেগেছে বটে।
ফেলিক্স তার সকল রাগ-ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব নিয়ে শুধালো,

“ভাই, সত্যি করে বলতো তুই আজ এমনটা কেন করলি? আর কেউ না জানুক, তোরা তো জানিস, আমি ঐসব না। তাহলে… ছিঃ! ইউ আর ট্রুলি আ শিট, ম্যান!”
ফেলিক্সের কথা শেষ করারও ফুসরত দিল না কেনীথ। আচমকা হাতের নাগালেই থাকা ফেলিক্সের পেছন বরাবর সজরে একটা লাথি মেরে, গাড়ির বোনেটের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ওভারকোটের ভেতর হতে একটা সিগারেট বের করে, ঠোঁটে চাপিয়ে নির্লিপ্তে টান দিয়ে বলল,
“এইজন্য বলি, তোর অটিস্টিক ফ্যাশন স্টাইল ঠিক কর। নয়তো দুদিন পর আর বংশ বিস্তারের জন্য কোনো মেয়ে পাবি না।”
মুহূর্তেই ফেলিক্স ক্ষেপে উঠল। আজ পর্যন্ত যতদূর দেখেছে, কেনীথ তার অতিরঞ্জিত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণও খুব একটা পছন্দ করে না। কারণ সে নিত্যন্তই প্রচন্ড গম্ভীর ও স্বল্পভাষী স্বভাবের মানুষ। কিন্তু আজ? আজ কি হয়েছে বেটার?
ঠিকমতো কোনো কিছু বুঝতে না পারলেও, হঠাৎ এভাবে পার্সোনাল এ্যাটাকে সে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

“ড্যাম ইট, এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে। তুই অটিস্টিক স্টাইল কাকে বলছিস? এটাকে এস্থেটিক বলে। একে তো উল্টোপাল্টা কাজ করে, আমার গা গুলিয়ে দিয়েছিস। তার উপর সোজা আমার…”
কেনীথ নির্লিপ্তে পাশে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“হোয়াট’স মাই ফল্ট? লোকজন তোকে মেয়ে ভাবতে শুরু করেছে।”
—“সিরিয়াসলি? হু? হুইচ বিচ? নাম বল একবার। ঐ শা’লার নাক-মুখ ফাটিয়ে…”
ফেলিক্সের কথা অসম্পূর্ণ রইল। কেনীথ তার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে, নির্লিপ্তে সিগারেটে টান দিয়ে অকপটে বলল,
“উঁহু, ওকে মারা যাবে না। দ্যাটস মাই পার্সোনাল প্রোপার্টি।”
মুহূর্তে ফেলিক্সের ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল। সে সন্দেহভাজন স্বরে বলল,
“ঐই,তুমি সত্যি করে বলতো, তুই ঠিক কি বলতে চাচ্ছিস? তুই ঠিকঠাক করে বলছিস না, নাকি আমি কিছু বুঝতে পারছি না—কোনটা?”
কেনীথ দুদণ্ড স্থির থেকে অকপটে বলল,

“একটা মেয়ে আছে, প্রচুর ডিস্টার্ব করছে ইদানীং। ওকে একটু শায়েস্তা করার জন্য, এইটুকুর প্রয়োজন ছিল।”
—“একটা মেয়ে…ডিস্টার্ব করছে, তা-ও তোকে? তোর সিকিউরিটি টিম কি করে? আর তুই তাকে কিভাবে শায়েস্তা করলি? বুঝলাম না তো ব্যাপারটা।”
—“আর বুঝে কাজ নেই। চল সামনে রেস্টুরন্ট আছে, তোকে কিছু খাইয়ে নিয়ে আসি।”
কেনীথ গা ঝেড়ে কথা বলে, ফেলিক্সকে সামনের দিকে এগোতে ইশারা করল। ফেলিক্স হতভম্ব হয়ে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
“তোর কি হয়েছে বলতো? আমি আসলেই কিছু বুঝতে পারছি না।”
—“বললাম তো, ওসব বুঝে আর কাজ নেই। কাজের কথা বলি, তোর প্রয়োজন পড়ুক বা না পড়ুক, হেডকোয়ার্টারে আসার প্রয়োজন হলেও, ওখানে আর কখনো যাবি না।”

—“যাব না? কিন্তু কেন?”
—“আমি বলেছি তাই। আমাদের কাজের ব্যাপারে কোনোকিছু ডিসকাস করার হলে, সোজা ব্লাডেন হেলে চলে যাবি। আপাতত অফিসে যাবার কোনো প্রয়োজন নেই।”
—“আচ্ছা, তাই হবে। আমি সোজা বাড়িতে চলে যাব, কিন্তু…”
—“কিন্তু কি?”
—“ঐ মেয়েটা কি খুব সুন্দর-টুন্দর নাকি? না মানে, তোকে যখন ডিস্টার্ব করছে তাহলে না হয় আমার কাছে পাঠিয়ে দিস।”
ফেলিক্স উৎসুক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা করল। কেনীথ ভ্রু-যুগল কুঁচকে তৎক্ষনাৎ ধমকে উঠল,
—“জাস্ট শাট আপ! সুন্দর হোক বা অসভ্য বাদর; ও শুধু আমার।”

ফেলিক্স আর কিছু বলল না। এটা শোনার জন্যই বোধহয় প্রশ্নটা করেছিল ছিল সে। ফেলিক্স মনে মনে ভাবল,
“আরেহ্ শা-লা,যা বুঝেছিলাম তাই। তাহলে কাহিনি অনেকদূর। পাভেল-ইমানি কি জানে এই বেটা তলে তলে এতোকিছু করে বেড়াচ্ছে। উমম…দেরি করা যাবে না। ওদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। কিন্তু একটা জিনিস তো এখনো বুঝলাম না… ও হঠাৎ ঐ মেয়েকে শায়েস্তা করতে আমার সাথে কেন…ওয়াক থু!”
ভাবতে ভাবতেই ফেলিক্স চোখ-মুখ খিঁচে নিল। কেনীথ বিরক্ত হয় বলেই, এতোকাল ধরে তাদের যখনই দেখা হতো, ফেলিক্স ইচ্ছেকৃতভাবে রয়েসয়ে কেনীথের সাথে চিপকে যেতো। কিন্তু আজকের পর তার কেনীথের সংস্পর্শে ঘেঁষতেও সংশয় হচ্ছে। এ যেন, এক ঢিলে দুই পাখি মা’রা। একজনকে শায়েস্তা করার ছলে আরেকজনকে ট্রমায় ফেলে দিয়েছে। ফেলিক্স আঁড়চোখে কেনীথকে একবার পরখ করে, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাফ ছেড়ে বাঁচল। কিছুক্ষণ পূর্বের কথা মনে পড়লে এখনো তার মাথাটা ভনভন করে উঠছে।
এদিকে কেনীথের ওষ্ঠকোণে ক্ষীণ হাসির রেশ ফুটেছে। ফেলিক্স নিজের মনে নানান ভাবনায় বকবক করে গেলেও, সে ভাবছে মিনিট পঁচিশ আগের কথা।

আজ ফেলিক্সের সাথে দেখা করতেই সে তড়িঘড়ি করে হেডকোয়ার্টার হতে বেড়িয়েছিল। উদ্দেশ্য তার কাজ বিষয়ক আলোচনা ব্যতীত আর কিছুই নয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে জুটে যাওয়া বন্ধু হিসেবে ফেলিক্স তো বরাবরই ভিন্নধর্মী। পার্কিংলটে কেনীথকে দেখামাত্রই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে সে তাকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে। কেনীথ প্রতিবারের মতো এবারও তাকে থামানোর চেষ্টা করেও, ব্যর্থ। বিরক্তিতে ধমকে ওঠে,
“হোয়াট দ্য হেল, ম্যান। কতবার বলেছিলাম এভাবে চিপকে যাবি না—”
কিন্তু কে শোনে কার কথা। সে যখন ফেলিক্সকে ঠেলে দূরে সরানোর প্রচেষ্টায় বিরক্ত,ঠিক তখনই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভুলবশত চলে যায় হেডকোয়ার্টারের দূরপ্রান্তে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তখন আনায়া সম্ভবত ক্যামেরা হাতে তাদেরকেই অবলোকন করছিল। দুজনকে একত্রে দেখে রমণী যখনই একটু বেখেয়ালি হয়েছে তার সন্দেহভাজন ভাবনায়—ঠিক তক্ষুনি তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের ভাবনায় বিষয়টাকে পুরোপুরিভাবে আন্দাজ করে ফেলে কেনীথ। অতঃপর আনায়ার মতো ফেলিক্সকেও পুরোপুরি হতভম্ব করে দিয়ে, এক লহমায় কেনীথ তার ভাবমূর্তি বদলে ফেলে। এতক্ষণ হতে দুহাতে ঠেলেও সরাতে না পারা ফেলিক্সকে সে আচমকা জাপ্টে জড়িয়ে ধরে। দাম্ভিক পুরুষের স্বভাবজাতের উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখে, ফেলিক্স হকচকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। বিস্ময়ের সাথে বলতে থাকে,
“আরে…এটা.. এটা কি করছিস…”
তার কথা শেষ হওয়ার ফুরসত দেয় না কেনীথ। আঁড়চোখে দৃষ্টির মনোযোগটা আনায়ার দিকে রইলেও, চোখ-মুখ দৃঢ় করে হঠাৎ কেনীথ দুহাতে ফেলিক্সের মুখাবয়ব আঁকড়ে ধরে। ফেলিক্সের চোখ বিস্ফোরিত হতেই, কেনীথ তার মুখের অন্যপাশে একের পর এক চুমুবিশেষ ভঙ্গিতে নিজের হাতের পিঠেই ঠোঁট ছোঁয়ায়। ফেলিক্সের কানের কাছে চাপা স্বরে আওড়ায়,
“বেশি নড়চড় করিস না, নয়তো ধরে আছাড় মারব।”
—“কিন্তু ভাই তুই এসব কেন করছিস? আমার এখনো বিয়ে করা বাকি। এভাবে কেন আমার মানইজ্জত লুটে দিচ্ছিস?”
—“চুপ থাকতে বলেছি না তোকে?”

—“দেখ ভাই আমায় ছেড়ে দে। বিশ্বাস কর আমি ঐসব গে-টে না। তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু আমার না। আই প্রমিজ, আজকের পর আর কখনো তোকে ডিস্টার্ব করব না, হাগ করতেও আসব না। তোর থেকে দশ হাত দূরে থাকব, তবুও ছেড়ে দে আমায়।”
ফেলিক্সের মুখখানা যেন ক্রমশই চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। এমন শিক্ষা সে তার সমগ্র জীবনেও কখনো পায়নি। মোচড়ামুচড়ি করেও সে কোনোভাবে কেনীথের হাত থেকে ছুটতে পারছিল না।
অথচ অবোধ রমণী আনায়ার দৃষ্টিতে এই দৃশ্য ছিল—এক পরনারীর সাথে তার আরাধ্য পুরুষের অতিঘনিষ্ঠ বিশেষ এক মুহূর্তের।

ক্যামেরা হাতে আনায়ার উৎসুকভাব দেখেই কেনীথ শুরুতেই বুঝেছিল, বাকিদের মতো আনায়াও হয়তো ফেলিক্সকে ভুলভাল কিছু ভেবে বসেছে। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে সে। অতঃপর কেনীথ ফেলিক্সকে ছেড়ে দিলেও, কৌশলে ফেলিক্সকে ইচ্ছেকৃত জাপ্টে জড়িয়ে চেপে ধরে; একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে গাড়িতে এমনভাবে বসে যেন—ফেলিক্সের মুখাবয়বও ভুলক্রমে পেছনে না ফেরে।
কেনীথের আন্দাজ যদি ভুল না হয়, তবে সে নিশ্চিত যে তার অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ কিংবা পরিকল্পনা অনায়াসেই আজ সফল হয়েছে। আনায়া ঠিকই সেই মুহূর্তটুকু জটলা পাকিয়ে নিজের আমলে নিয়েছে। অবশ্য সর্বক্ষণ উৎপটাং কাজকর্ম করে বেড়ানো মেয়ের কাছে,এরচেয়ে বেশি আর কি-ই বা আশা করা যায়!
কেনীথ এসব ভাবতে ভাবতেই, রমণীর অবোধের পরিধিটুকু মেপে, বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে আওড়াল, “স্টুপিড কোথাকার!”

অকস্মাৎ সন্ধ্যারাত হতেই তুষারপাতের প্রকোপ বেড়েছে। অথচ কনকনে এই ঠান্ডার মাঝেও, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের ধারে কাঠের ব্রেঞ্চের ওপর হাত-পা তুলে, নিথর দেহখানা গুটিয়ে বসে আছে আনায়া৷ তীব্র কান্নার দরূন ফর্সা মুখাবয়ব লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। তবুও সে কোনোমতেই নিজের কান্না থামাতে পারছে না।
হাত-পা ক্রমাগত গুটিয়ে নিয়ে, অনবরত ফুঁপিয়ে চলেছে সে। একহাতে ইনহেলার রইলেও, ঠান্ডায় শ্বাসকষ্ট যেন বারবার মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠছে। আনায়া ওষ্ঠদ্বয় চেপে নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে উন্মাদের ন্যায় রাগ-ক্ষোভ, কষ্ট-অভিমান ঝেরে আওড়াতে থাকে,

“নির্বোধ আমি, কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। ভেবেছি উনি জুলিকে ইগনোর করতে পাঁচটা-দশটা রিলেশনের কথা বানিয়ে বলতো। অথচ… আমি কি করব, খোদা! মানুষ এতো জঘন্য হয় কি করে? এতোটা নিকৃষ্ট, নিচু, চরিত্রহীন কোথাকার…কেনো ঐ শয়তানটা আমার জীবনে এলো। কেনো ভালোবাসলাম আমি এই অসভ্যটাকে। ভাবতেও অবাক লাগছে, ঐ জানোয়ারটা নাকি আমার স্বামী! ছিহ!”
এলোমেলো স্বরে কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতেই, আনায়ার শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বাড়ে। দ্রুত ইনহেলার নিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হতেই, সে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে।
ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে শুনশান রাস্তার নিকষিত অন্ধকারের দিকে চেয়ে, তীব্র আক্রোশের সাথে আনায়া জোর গলায় বলে উঠল,
“আমি ঘৃণা করি আপনাকে! ভীষণ,ভীষণ ঘৃণা করি। আপনাকে ভালোবেসেছি বলে, জগতের সব সীমা অতিক্রম করতেও নূন্যতম দ্বিধা ছিল না আমার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সচক্ষে সব’টা দেখার পরও, আমি আপনার মতো নিচু চরিত্রের একজন মানুষকে চিরকাল ভালোবেসে যাব।”

রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে এসেছে আনায়া। অত্যন্ত স্বাভাবিক রূপে, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গিয়েছে। তার অতিমাত্রায় থমথমে শান্তরূপ দেখে আইজেলের কিঞ্চিৎ সন্দেহ হলেও,সে কথা বাড়ায়নি। এমনিতেও মেয়েটা রাতের বেলায় কতরাত করে ফেরে, তা-ও সে টের পায়না। আজ অবশ্য অনেকটা আগেই বাড়ি ফিরেছে।
অথচ সত্যিটা হলো আনায়া সন্ধ্যা নাগাদ হেডকোয়ার্টার হতে বেরিয়ে আসার পর আর সেখানে ফিরে যায়নি। বরং সেই সন্ধ্যা হতে রাত দশটা অব্দি সে একাই আনমনে কনকনে ঠান্ডায় রাস্তার ধারে বসেছিল।
কিন্তু ঘরে ঢোকা মাত্রই রমণীর শান্তরূপ পুনরায় রাগ-ক্ষোভে ঢাকা পড়ল। শুরুতেই নজর পড়েছিল বিছানায় সাজিয়ে রাখা, পুতুলগুলোকে। এই সফটটয় গুলো কার স্মরণে সাজিয়ে রাখা তা বাদবাকি দুনিয়া না জানলেও, আনায়ার কাছে আপাতদৃষ্টিতে এগুলোই তার চিরশত্রু। একমুহূর্তও বিলম্ব করল না সে সবগুলো পুতুলকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের এককোণে ফেলে ছুঁড়ে ফেলতে। বিছানা হতে সব আগাছা সরিয়ে তার নজর পড়ল স্টেলার দিকে। সেলফে সাজিয়ে রাখা গোলাপি পুতুলটার সামনে দাঁড়িয়ে আনায়া তাচ্ছিল্যের সহিত আসল। দুবার বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগল,

“স্টেলা,স্টেলা, কি অদ্ভুত তাই না? আমার সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন ক্যারেক্টারগুলোই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু, একেকটা জানোয়ার। আর তুই তো সবচেয়ে বড় শয়তান। তোকে আবার সামনে পাই আমি, তোর মা’থা ফাটিয়ে ছাড়ব।”
কি হতে কি ভাবল, সোজা গোলাপী পুতুলটার মাথা-শরীর দুহাতে ধরে টান দিয়ে সেটাকেও রেড-গুলোর কাছে ছুঁড়ে ফেলল। উন্মাদ মস্তিষ্কে এখন আর কোনো ভাবনাই ঠিকঠাক কাজ করছে না। আনায়া দুহাতে ভর দিয়ে বিছানায় বসল। রাগে মাথাটা নুইয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভাবতে লাগল,
“আমি এখানে থাকব না। যতদ্রুত সম্ভব জার্মানি থেকে চলে যাব আমি। বাবা ভুল বলেনি, সে ঠিকই জানতো ঐলোক পুরো একটা অমানুষ। অথচ আমারই বুঝতে দেরি হয়েছে। আবারও ভুল করেছি আমি৷ কিন্তু আর না, ঐ শয়তানটার জালে ক্রমাগত ফেঁসে যাচ্ছি আমি। এখানে থাকলে আমি ঐ অসভ্যটার মায়া থেকে কোনোদিন বের হতে পারব না৷ প্রয়োজনে বাবাকে বলে ইউকে-তে শিফট হয়ে যাবো, তবুও এখানে থাকব না। অসভ্যটা মরে যাক, ওমন শয়তানের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।”

দেখতে দেখতে দুদিন কেটে গিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই যেন আগের মতোই ঠিকঠাক আছে। সেভাবে বিশেষ কোনোকিছুরই পরিবর্তন হয়নি। শুধু পরিবর্তন হয়েছে আনায়ার আচরণ। আনায়া গত দুদিন আর হেডকোয়ার্টারের আশেপাশেও যায়নি সে। বাড়ি হতে ভার্সিটি, আবার ভার্সিটি হতে সোজা বাড়ি। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলে একা একা পার্কে গিয়ে সময় কাটিয়েছে। এভাবেই তার সময় অতিবাহিত হচ্ছে।
তবে এই দুদিনে ভার্সিটিতে যে একেবারেই কেনীথের সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ হয়নি, বিষয়টা তেমনও নয়। ঘটনার পরদিনই ভার্সিটিতে কেনীথের ক্লাস ছিল; তথাপি ঐদিনও ক্লাসে আর পাঁচটা স্টুডেন্টের মতোই স্বাভাবিক ছিল আনায়া। এবং আজও থার্ড পিরিয়ডে প্রফেসর সাহেবের আরো একটা ক্লাস আছে।
কিন্তু দুটো ক্লাস পেরোতেই এক বড়সড় বিপত্তি বাঁধল। সেকেন্ড পিরিয়ডের ঠিক মাঝামাঝি পর্যায় হতে আনায়া বেশ অসুবিধায় ভুগছিল। পেট এতো পরিমাণে ব্যথা করছিল যেন সে আর একটুও কিছুই সহ্য করতে না পেরে, ক্লাসরুমেই জ্ঞান হারাবে। তবুও নির্লিপ্ত এক তেজ নিয়েই সে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে, চুপচাপ ক্লাস করে যাচ্ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ক্লাসটাও শেষ হওয়ামাত্রই আনায়ার আর সম্ভব হলো না ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকা।

সে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। আইজেল জিজ্ঞেস করতেই বলল, ওয়াশরুম হতে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবে৷ ওদিকে আবার প্রফেসর ভিকেরও আসার সময় হয়েছে ভেবে, আইজেল কিছুটা শঙ্কিত হলেও, আনায়াকে আশ্বস্ত করে বলল,
“দ্রুত চলে এসো, প্রফ ভিকের ক্লাস এখন। বেশি দেরি করলে আবার প্রবলেম হয়ে যেতে পারে।”
আইজেলের সতর্কতায় আনায়ার বিশেষ ভাবান্তর হলো না। আলতোভাবে মাথা নেড়ে সে তার তলপেট চেপে ক্লাসরুম হতে বেরিয়ে পড়ল। করিডোরে পা রাখামাত্রই আনায়া সবকিছু ভুলতে বসল। ব্যাথার চোটে তার চোখ-মুখ খিঁচে এলো। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ছুটল করিডোরের শেষপ্রান্তের ওয়াশরুমের দিকে।
তার এমন হন্তদন্ত প্রস্থানে, সদ্য ক্লাসরুমের দরজার কাছে এসে উপস্থিত হওয়া কেনীথের ভ্রু-জোড়া খানিক কুঁচকে গেল। ওটা যে আনায়া ছিল তা আর বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু হঠাৎ তার ক্লাসের সময়ই এই মেয়ে এভাবে কোথায় ছুটছে! কেনীথ ক্ষণকালের ব্যবধানে পরিস্থিতি পরখ করে বুঝল, আনায়া হয়তো ওয়াশরুমে গিয়েছে। যথারীতি এই নিয়ে সে আর বিশেষ কিছু ভাবতে গেল না।

এমনিতেও আন্দাজ ছিল, তার ধারণা যদি ঠিক হয় তবে সেই ঘটনার একটা বিশেষ প্রভাব তো অবোধ আনায়ার মাঝে পড়বেই৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত সেভাবে কিছু পরিলক্ষিত না হলেও, দুদিন হলো আনায়ার হেডকোয়ার্টারে না যাওয়া কিংবা তার ক্লাসে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে উপস্থিত থাকা,অত্যধিক সেই মৌনতা—সবটাই অনেককিছু বুঝিয়ে দেয়। অবশ্য কেনীথও হয়তো কোথা না কোথাও চেয়েছিল, এই দূরত্বটা বাড়ুক। হয়তো তার পাষণ্ড হৃদয়ে এই নিয়ে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটবে না, কিন্তু তাদের মধ্যে যদি এখন সব দূরত্ব ঘুঁচে গিয়ে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়—তবে খুব দ্রুতই হয়তো আনায়াকে এর ফল ভোগ করতে হবে; অত্যন্ত নির্মমভাবে।

কিন্তু কেনীথ কখনোই চায় না অকারণে আনায়াকে অবশিষ্ট জীবনটুকু তীব্র কষ্ট নিয়ে কাটাতে হোক। তার সময় হয়তো ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু আনায়ার জন্য তো এখনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষায়! আপাতদৃষ্টিতে কেনীথের মস্তিষ্কের অধিকাংশ কেবল এই ভাবনারই দখলে। রমণীর কান্ডকারখানায় কখনো কখনো নিজের যান্ত্রিক সত্তা হতে বিচ্যুত হলেও, একটা সময় পর সে আবারও সেই বাস্তবিক নিষ্ঠুর সত্যর ভাবনার অতলে ডুবে যায়।
কেনীথ আর বিলম্ব না করে ক্লাসের ভেতরে প্রবেশ করল। দীর্ঘ সময় নিয়ে সম্পূর্ণ ক্লাস নেওয়ার পরও তার ধ্যান পড়ে রইল ঘড়ির কাঁটার দিকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় পার হয়ে গেছে; সময়ের মতো সময় বয়ে গেলেও, আনায়ার ফিরে আসার কোনো নামগন্ধ নেই।

সে মনে মনে মেয়েটার ওপর কিছুটা ত্যক্ত ও রাগান্বিত হলেও, শেষমুহূর্তে সেই ক্ষোভটুকু অজানা দুশ্চিন্তা ও কৌতুহলে রূপ নিল। আগের দিন যদি ঠিকঠাকভাবে পুরো ক্লাসটা করতে পারে, তবে আজ তো তার ক্লাসে উপস্থিত থাকাটা আনায়ার জন্য বিশেষ কোনো সমস্যার কারণ হওয়ার কথা নয়।
​এই চিন্তার রেশ রেখেই কেনীথ ক্লাস শেষে বেরিয়ে এলো। তবে সে আর সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল না; বরং একই চাপা উদ্বিগ্নতা নিয়ে এগোতে লাগল মেয়েদের ওয়াশরুমের দিকে। প্রতিটি ক্লাসেই নতুন পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, ফলে করিডোরে বিশেষ কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
​কেনীথ দৃঢ় পদে এগোতে এগোতে একবার দৃষ্টি তুলে আশেপাশের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো দেখে নিল। আপাতত এসব নিয়ে সে ভাবছে না; সিকিউরিটির দায়িত্বে যে রয়েছে, তার সাথে কথা বলে পরবর্তীতে বিষয়টি সামলে নেওয়া যাবে।

​এসব ভাবতে ভাবতেই এক থমথমে গাম্ভীর্য নিয়ে কেনীথ ওয়াশরুমের সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যে তার মুখাবয়বে উদ্বেগের স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠল। ওয়াশরুমের এককোণে আনায়ার অবয়বের এক রমণী মেঝেকে আঁকড়ে ধরে কুঁকড়ে বসে আছে। দুহাতে পেট চেপে ধরে, চোখ-মুখ খিঁচে একপ্রকার কাতরাচ্ছে সে।
​কেনীথ বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে সোজা ওয়াশরুমের ভেতরে প্রবেশ করল। বিস্ময় ও উদ্বেগের সংমিশ্রণে দু-পা এগিয়ে থমথমে স্বরে প্রশ্ন করল,
​”কী হয়েছে তোর?”
​আনায়া পরিচিত সেই কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল। পাশে মুখ ফেরাতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। কেনীথ এখানে কী করছে? আনায়া বিস্ময় ও রাগমিশ্রিত কণ্ঠে জোরালো স্বরে বলে উঠল,
​”আপনি এখানে কেন?”
​কেনীথ প্রত্যুত্তরে তাকে একই পাল্টা প্রশ্ন করল,
​”কী হয়েছে তোর?”
​আনায়া ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে সেই উদ্বিগ্ন পুরুষের আপাদমস্তক একঝলক দেখে নিয়ে অকপটে মুখ ফিরিয়ে নিল। রুক্ষ কণ্ঠে সে বলল,

​”কিছু হয়নি, যান এখান থেকে। আর সম্ভব হলে, দয়া করে আইজে…আইজেলকে একবার ডেকে দিন।”
​এটুকু বলতে না বলতেই, আনায়া আবারও তীব্র ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে নিল; শব্দগুলো বারবার জট পাকাতে লাগল। যন্ত্রণার চোটে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন মুচড়ে উঠছে। নিজের ভাগ্যকে পরিহাস করে সে কেবল এটাই ভাবছিল—কতটা অলক্ষুণে কপাল নিয়ে জন্মালে তাকে আজ এমন একটা জায়গায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়! শুধুমাত্র এই একটি কারণেই তার মা কখনো তাকে একা ছাড়তে চাইতেন না।
কারণ মা-ও জানতেন, তার মেয়ে ছোটবেলা থেকে আজ অবধি এই শারীরিক সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান খুঁজে পায়নি; আর না এর কোনো সহজ সমাধান রয়েছে। প্রতিবার গুনে গুনে তারিখ নির্দিষ্ট করে রাখার পরও, তার মান্থলি এমন এক অসময়ে শুরু হয় যার কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমান করা সম্ভব নয়।
আর তার এই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা স্বাভাবিক আর দশটা মেয়ের মতোও নয়—একবারে প্রাণ সংশয়ের মতো অবস্থা তৈরি হয়। ছোটবেলায় এমনও ঘটেছে যে, ব্যথার তীব্রতায় আনায়াকে জ্ঞান অব্দি হারাতে হয়েছে।
​যথারীতি আজও আনায়া বুঝতে পারেনি যে মান্থলির সূচনা আজই হতে চলেছে। সন্দেহজনক তলপেটের ব্যথা নিয়ে ওয়াশরুমে আসার পরই সে বুঝতে পারে তার ধারণাই ঠিক। কিন্তু কাউকে ডাকার মতো ন্যূনতম শক্তিও তার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। ফোনটাও ক্লাসরুমে ব্যাগপ্যাকের ভেতর ফেলে এসেছে। ফলস্বরূপ ঘণ্টাখানেক ধরে চেষ্টা করেও আনায়া আর উঠে অব্দি দাঁড়াতে পারেনি; দীর্ঘ এই সময় ধরে বিষম যন্ত্রণায় মেঝেতেই সে অনবরত কাতরাচ্ছিল।

​এরই মধ্যে আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, দীর্ঘাকার এক অবয়ব এসে তার সম্মূখে হাঁটু গেঁড়ে বসেছে। কেনীথকে এভাবে কাছে আসতে দেখে আনায়া হতভম্ব হয়ে গেল। একদিকে তীব্র ব্যথায় তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা, চোখ দুটো কান্নায় ছলছল করছে, মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে; অস্থিরতায় কপালে মুখাবয়বের চারপাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে—তার ওপর আবার হঠাৎ কেনীথের এই অপ্রত্যাশিত আগমন!
​যে লোকটাকে দুদিন হতে চোখের দেখাও সহ্য করতে পারছে না সে, এই মুহূর্তে তাকে তো কোনোভাবেই প্রত্যাশা করেনি আনায়া। যন্ত্রণার চরম সীমায় থেকেও রমণী তীব্র আক্রোশের সাথে বলল,
​”আপনাকে যেতে বলেছি না আমি? তাহলে আমার কথা শুনছেন না কেন?”
​কেনীথ তার কথায় বিশেষ আমল দিল না। তার উদ্বিগ্ন দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো আনায়ার জামার একটি অংশে। বেবি-পিংক রঙের প্লেন ওয়েস্টার্ন গাউনটির একাংশ রক্তের ছোপে ভিজে উঠেছে।
​কেনীথের আর বুঝতে বাকি রইল না, তার ধারণাই সঠিক ছিল। তবে সে আনায়াকে কোনো প্রশ্ন না করে আচমকা ধমকের স্বরে বলে উঠল,

​”ইডিয়ট! এসব নিয়ে কেউ ঘণ্টা ধরে এভাবে বসে থাকে? মরার শখ হয়েছে তোর?”
​দাম্ভিক পুরুষের রাগে আনায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও, ক্ষোভের সাথে বলল,
​”আমি মরলে আপনার কী, হ্যাঁ? দেখতে চাই না আপনাকে, চলে যান এখান থেকে… আহ্!”
​বলতে বলতেই ব্যথার তীব্রতায় আনায়া আবারও চোখ-মুখ খিঁচে মুখটা পাশে ফিরিয়ে নিল। নিজের ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে একপ্রকার কেঁদে ফেলল।
​”তারা, ঠিক আছিস…?”
রমণীর ব্যথিত অভিব্যক্তি দেখে কেনীথ ত্বরিত তাকে আগলে নিতে চাইল; কিন্তু আনায়া তৎক্ষণাৎ তার হাতটা দূরে ঠেলে দিল। পাষণ্ড পুরুষের ব্যাকুল অভিব্যক্তি অপূর্ণই রয়ে গেল। অন্যদিকে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে আনায়া চোখ রাঙিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল,
​⠀⠀⠀⠀⠀”খবরদার, স্পর্শ করবেন না আমাকে! ⠀⠀⠀⠀⠀আপনাকে আমার ভীষণ অসহ্য লাগে। ⠀⠀⠀⠀⠀বিশ্বাস করুন, আপনি আমাকে যতটা
⠀⠀⠀⠀⠀সস্তা ভেবেছেন, আমি ততটাও সস্তা নই।⠀⠀⠀⠀⠀উপকার করতে না পারলে, দয়া করে
⠀⠀⠀⠀⠀আমাকে বাকিদের মতো সস্তার পণ্য
⠀⠀⠀⠀⠀ভাববেন না!”

​আনায়া মুখ ফিরিয়ে নিল; যন্ত্রণার চোটে প্রাণ যায় যায় উপক্রম হলেও, তার কণ্ঠস্বরের ঝাঁজে বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। রমণীর এই তীব্র অভিযোগে মুহূর্তেও সেই উদ্বিগ্ন পুরুষের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কেনীথ কোনো প্রত্যুত্তর করল না। অকস্মাৎ আনায়াকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দিয়ে, দু-হাতে রমণীকে আগলে ধরে সোজা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। পাঁজা কোল করে তুলে নেওয়ার প্রয়াসে কেনীথ উঠে দাঁড়ানোর আগেই, আনায়া চরম বিস্ময়ে হাত-পা ছুড়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করল। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
​”বলেছি না স্পর্শ করবেন না আমাকে! ঘৃণা হয় আপনার স্পর্শে। আপনি আমার আশপাশে থাকলেও আমার ঘৃণা হয়। ছেড়ে দিন, নয়তো খুব খারাপ কিছু করে বসব আমি! ভাবছেন, আপনি আপনার ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যাবেন? হয়তো পাবেন, কিন্তু আপনি আমাকে আর কখনো পাবেন না। আপনি যদি আমাকে এই ভার্সিটি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন, দ্যান আই প্রমিজ—আমি এই দেশ থেকেই চিরতরে চলে যাব!”
​বলতে না বলতেই আনায়া আবারও নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল। অস্বস্তিতে ঘামে গা ভিজে উঠলেও সে নিস্তার পেল না। তার এই ছটফটানিতে কেনীথ তাকে আরও শক্তভাবে নিজের প্রশস্ত-নিরেট বক্ষের সাথে চেপে ধরল। আনায়া তার বিশাল অবয়বের মাঝে এক প্রকার কুঁকড়ে গেল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু একটা করে বসার আগেই, কেনীথ আচমকা তার চোয়ালটা শক্ত হাতে চেপে ধরল। পুরুষের এই আকস্মিক পদক্ষেপে আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেও কেনীথ তাকে ছাড়ল না। বরং তার চিবুকটা দু-আঙ্গুলে মুঠোয় চেপে সটান উঁচিয়ে তুলল; শক্ত হাতে চেপে ধরে, নিজের দিকে টেনে এনে মুখোমুখি স্থির করল। চাপা স্বরে কটাক্ষ করে বলল,

​”বড্ড বেশি কথা বলিস তুই!”
​আনায়া এমন অবস্থাতেও তীব্র রাগে ঝাঁঝিয়ে উঠল,
​”কারণ আপনি একটা জানোয়ার—”
​কেনীথ তার কথা শেষ করতে না দিয়েই চিবুক হতে হাতটা সরিয়ে তার গালটা শক্ত করে চেপে ধরল। আনায়ার কণ্ঠ হতে যন্ত্রণাকাতর শব্দ নির্গত হলো,
​”আহ্…”
​ব্যথিত রমণীর আর্তনাদের প্রত্যুত্তরে,কেনীথ ঠান্ডা গলায় দাঁত পিষে বলল,
​”তোর ড্রামা দেখতে চাইনি আমি!”

মহামায়া পর্ব ৫৬

​কেনীথ একটু থেমে, রমণীর মুখখানা আরও খানিকটা নিজের মুখের কাছে টেনে আনল;দুজনের নাসারন্ধ্র প্রায় একে-অপরের সাথে সংঘর্ষও হলো বটে। রমণীর ওষ্ঠদ্বয়ের সম্মূখে মুখটা নামাতেই আনায়া ভীত-সন্ত্রস্তের মাঝেও চোখ রাঙাল। কেনীথ তাতে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্য করে শুষ্ক হাসল। পরমুহূর্তেই মুখাবয়বে সহজাত নিরেট গাম্ভীর্য এনে, কন্ঠস্বর দু’খাদ নিচে নামিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল,
“আর একটা শব্দ করে দেখ; সোজা গলার টুটি টেনে ছিঁড়ে ফেলব!”

মহামায়া পর্ব ৫৮