Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৫৮

মহামায়া পর্ব ৫৮

মহামায়া পর্ব ৫৮
তুশকন্যা

“আর একটা শব্দ করে দেখ; সোজা গলার টুটি টেনে ছিঁড়ে ফেলব!”
পুরুষের ক্ষিপ্র সতর্কবাণীতে আনায়া’র চোখ-মুখ শুকিয়ে চুপসে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কেনীথ নূন্যতম কোনোকিছুর পরোয়া না করে রমণীকে সোজা পাজকোলে করে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। আনায়া ব্যথা ও বিস্ময়ের সংমিশ্রণে কেনীথের বুকের একাংশ কাপড় হাতের মুঠোয় খাঁমচে নিল। বেপরোয়া মানুষটাকে থামাতে,চাপা স্বরে বলল,

“পাগলামি করছেন, মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার। ছেড়ে দিন আমাকে। দয়া করে আইজেলকে ডেকে দিন, ওর সাথে আমি বাড়ি অব্দি একাই পৌঁছে যাব। লাগবে না আপনার এই আগবাড়ানো সাহায্য…”
আনায়ার কথাগুলোর একটাও কেনীথ ঠিকঠাক গুরুত্ব দিয়ে শুনল কিনা,এটা কেবল সে নিজেই জানে। রমণীর ছটফটানির মাঝেই কেনীথ তাকে নিয়ে ওয়াশরুম হতে বেরিয়ে এলো। করিডোরে পা রাখামাত্রই আনায়া আতংকে কুঁকড়ে গেল। এভাবে কেউ দেখে ফেললে, কি ঘটনাটাই না ঘটবে—ভাবতেই তার কলিজা শুঁকিয়ে যাচ্ছে। সে নিজেকে দ্রুততর আড়াল করতে, চোখ-মুখ খিঁচে আরেকটুখানি কুঁকড়ে গেল; কেনীথের শার্ট-কোটের কলার আঁকড়ে ধরে মুখটা বিস্তৃত বুকটার মাঝে লুকালো। চাপা স্বরে দাঁতে দাঁত পিষে ফিসফিস করে বলল,
“অসভ্য লোক! দোহাই লাগে আপনার, ছেড়ে দিন। আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না।”
কিন্তু কেনীথ তার কথাগুলোকে এবারও আমলে নিল না। বরং একই দৃঢ়তা নিয়ে সে হঠাৎ ওয়াশরুমের পাশ ঘেঁসে যাওয়া বিপরীত সিঁড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। এই সিঁড়িটা সচারাচর তেমন কেউ ব্যবহার করে না। তার চেয়েও বড় কথা, ওয়াশরুম হতে ঘুরে যদি মূল সিঁড়ির দিকে যেতে হয় তবে ক্লাসরুমগুলো হতে অসংখ্য উৎসুক দৃষ্টি তাদের অবলোকন করবে। অতঃপর শুরু হবে অত্যন্ত বিরক্তকর আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। কিন্তু আপাতত কেনীথ চাইছে না, এই মুহূর্তে নতুন কোনো নাটকীয়তা পরিস্থিতিকে আরো বেশি জটিল করে তুলুক।

—“আপনি আমার কথা শুনছেন না কেনো? বললাম তো আমি আপনার সাথে কোথাও যেতে চাই না।”
কেনীথ সিঁড়িতে পা রাখার পূর্বে শেষবারের মতো অবাধ্য রমণীকে সতর্ক করে বলল,
“যদি আরেকটু ত্যাড়ামি করিস তবে এখান থেকেই সোজা নিচে ছুঁড়ে মারব। এখন তুই ডিসাইড কর,তুই কি চাস।”
মুহূর্তেই আনায়া দমে গেল। পুরুষের শক্ত-পোক্ত বুক হতে মুখ তুলে হতভম্ব দৃষ্টিতে কেনীথের দিকে তাকাল। মনে মনে কাঁদো কাঁদো স্বরে ভাবল,
“মাবুদ, না জানি কোন পাপের ফল পাচ্ছি আমি আজ।”

শতবার সতর্ক করার পরও দুর্ধর্ষ পুরুষের অবাধ্য রমণী কোনোমতেই নিজের ত্যারামো বন্ধ করল না। শর্টকাট রাস্তা ধরে আনায়াকে নিয়ে নিজের গাড়ি অব্দি পৌছাতে পৌঁছাতে যেন কেনীথকে বিশ্বযুদ্ধের আসরে নামতে হলো। এই মেয়ে একের পর এক উদ্ভট কাজকর্ম করে চলেছে যে, কেনীথ শুধু পারছে না কোল থেকেই আনায়াকে সোজা নিচের দিকে আছড়ে ফেলতে।
—“অসভ্য, নির্লজ্জ ব্যাটাছেলে! বলতে বলতে আমার মুখ ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে, তবুও ছেড়ে দিচ্ছেন না কেনো আমায়? বলেছি না, আপনাকে আমার একটুও সহ্য হয়না। আপনার কোনো দয়া আমার চাই না। তাহলে কেনো এইসব করছেন—?”
আনায়া বলতে বলতেই হঠাৎ কোল হতেই কেনীথের ঘাড় আঁকড়ে ধরা হাতটাকে আরেকটু দৃঢ় করল। এবং হুট করেই পুরুষের ঘাড়ের নিরেট চামড়ায় নিজের হাতের পাঁচ আঙুলির পাঁচ নখ বসিয়ে দিল। কেনীথ স্তম্ভিত হলো আনায়ার এই কান্ডে। তবুও হাঁটার গতি থামাল না। নখগুলো বোধ-হয় চামড়া ভেদ করে মাংসে ডেবে গিয়েছে; অথচ আনায়া তখন হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“ছেড়ে দিন বলছি!”
বলেই সে ঘাড়ে আঙুলের চাপ আরেকটু দৃঢ় করল। কেনীথ ব্যথার চোটে অজান্তেই ওষ্ঠদ্বয় চেপে কাধটা খানিক টানটান করে মাথাটা উঁচিয়ে তুলল। আনায়ার এমন উন্মাদের মতো পাগলামি দেখে, দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“এ কেমন বাচ্চাদের মতো বিহেভ করছিস? মার খাবি তুই আমার হাতে?”
আনায়া তখনো সেই একই জেদ নিয়ে আওড়াল,
“ছাড়তে বলেছি, শোনেন না কেন?”
কেনীথ আর কথা বাড়াল না। আনায়াকে ছটফট করার নূন্যতম ফুসরত না দিয়ে আরো জোরালে ভাবে তাকে নিজের সাথে চেপে ধরল। আনায়ার হাত-পা যেন এবার অবশ হয়ে আসছে। এতোকিছুর পরও ব্যর্থ হয়ে এবার তার গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
ততক্ষণে কেনীথ তার গাড়ির কাছে পৌঁছে দরজাটা কোনোমতে খুলেই, সোজা আনায়াকে কাঁধে তুলে সিটের ভেতর একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলল। আনায়া চোখ রাঙিয়ে ফুঁসে উঠলেও, কেনীথ তখন নিজের ঘাড় ডলতে ডলতে দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল।
কিন্তু ততক্ষণে অবাধ্য রমণীও নিজের জানপ্রাণ লাগিয়ে এখান থেকে পালানার পায়তারা করেছে। হুট করেই গাড়ির দরজা খোলার জন্য ছটফট শুরু করল সে,

“এটা খুলছে না কেন, আমাকে ছেড়ে দিন,যেতে দিন বলছি…”
জেদের চোটে রমণীর চোখদুটো ছলছল করে উঠেছে। অন্যদিকে কেনীথ এবার অসহ্য রকমের ত্যক্ত হয়ে উঠল। আনায়া হাতের পাশাপাশি পা-তুলে দরজায় ধাক্কা দেয়ার পূর্বেই, কেনীথ তার দিকে ঝুঁকে পড়ল। আচমকা রমণীর বাম’পা-টা ধরে সজোরে টান দিতেই, আনায়া
ছিটকে এসে কেনীথের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আনায়া তাকে প্রতিহত করার নূন্যতম সুযোগ পেল না। কেনীথ আবারও একহাতে রমণীর দু-পা ধরে সজোরে একটান দিয়ে, সোজা আনায়াকে নিজের কোলের উপর আছড়ে ফেলল। আনায়া ছটফটিয়ে হাত-পা ছোঁড়ার পূর্বেই, কেনীথ তাকে জাপ্টে জড়িয়ে নিজের সাথে চেপে ধরল। রমণীর রাগান্বিত রক্তিম মুখপানের দিকে চেয়ে চাপা স্বরে বলল,
“আমার কোলে বসার যখন এতোই ইচ্ছে; মুখে বললেই হতো!”
আনায়া মুহূর্তেই দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে উঠল,

“অসম্ভব! আমি কখনোই আপনার কোলে বসতে চাইনি। প্রতিবার আপনি নিজেই এই অসভ্যতাটা করেন। হয়তো বাকিদের সাথে আপনি এভাবেই অভ্যস্ত, কিন্তু আমি না। তাই দয়া করে হলেও, আমাকে ছেড়ে দিন। ভীষণ ঘৃণা হয় আপনার স্পর্শে; বোঝেন না কেনো আপনি?”
রমণীর উৎকন্ঠিত কন্ঠস্বর ক্রমশই কান্নায় জড়িয়ে আসতে লাগল। কিন্তু আনায়া কোনোমতেই চাইছে না, এই অসভ্য লোকটার সামনে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে; কেটে-কুটে নিজের বেহাল দশা করতে। কিন্তু তার অবস্থা যে খুব একটা ভালো তা-ও নয়। পেটের যন্ত্রণায় ভেতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
আনায়া আর সহ্য করতে পারল না। জেদ-আক্রোশ-যন্ত্রণা, সবমিলিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। একইসাথে করে বসল অদ্ভুত এক পাগলামি। নিজের গায়ের পুরো শক্তি এক করে, উন্মাদের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে, দু-হাতের জোরে একের পর পর কিল-ঘুষি কিংবা ধাক্কা দিতে লাগল বলিষ্ঠ দেহবিশেষ পুরুষের শক্ত-পোক্ত বক্ষদেশে। অথচ কেনীথ একটা শব্দও করল না। যেভাবে আনায়াকে নিজের সাথে জড়িয়ে বসে ছিল, ঠিক সেভাবেই স্থির রইল।

কিছুক্ষণের মাঝেই আনায়া হাঁপিয়ে উঠল। নির্দয় পুরুষের কোনো ভাবান্তর না দেখে, আনায়া হাত-দুটো স্থির করে ওষ্ঠদ্বয় চেপে পুনরায় ফুপিয়ে উঠল।নিস্তেজ দেহটা লেপ্টে গেল কেনীথের গায়ের সাথে; মাথাটা গিয়ে আলগোছে ঠেকল কেনীথের বুকের বা’পাশে।
কেনীথ সবটা নির্লিপ্তে দেখে নিয়ে, একবুক ভারী শ্বাস ফেলল। পিঠ ছাড়িয়ে রমণীর বাহুখানা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে, মুখাবয় খানিকটা আনায়ার দিকে ঝুঁকিয়ে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“এতো জেদ? এতো রাগ আমার প্রতি?”
পুরুষের অকপটে শুধানো অভিব্যক্তিত্বে, আনায়া নিস্তেজ স্বরেই উত্তর দিল,
“অমানুষ আপনি, ঘৃণা করি আপনাকে।”
কেনীথ কথা বাড়াল না। শুষ্ক মলিন হেসে ভারী শ্বাস ফেলল। এরিমধ্যে হঠাৎ আনায়ার পেটের যন্ত্রণা বেড়ে যেতেই, দাঁতমুখ খিঁচে কেনীথের শার্টের একাংশ আঁকড়ে ধরল। তার অবস্থার বেগতিক দেখে কেনীথ খানিকটা বিচলিত হয়ে বলল,

“তারা,আর ইউ ওকে? খুব বেশি ব্যাথা করছে?”
আনায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। চোখদুটো মেলে কেনীথের উদ্বিগ্ন দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে বলে,
“প্লিজ, আমায় ছেড়ে দিন। যন্ত্রণায় আমার যতটা না কষ্ট হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি অস্বস্তি হচ্ছে আপনার সাথে এমন অবস্থায় চিপকে থেকে। আমি ওয়াদা করছি, আমি আপনাকে আর কখনো বিরক্ত করবো না। তবুও আমায় ছাড়ুন।”
আনায়ার নিস্তেজ কন্ঠস্বর; বারবার একই কথার পুনরাবৃত্তিতে কেনীথ কিঞ্চিৎ বিরক্ত-ত্যাক্ত হয়ে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে সম্মূখে তাকাল। পূর্বের ন্যায় আজও দুজনের ওপর দিয়েই সিট বেল্ট লাগিয়ে, তৎক্ষনাৎ গাড়িটা স্টার্ট দিল।
আনায়া বুঝতে পারছে না সে কি করবে। এই একটা মানুষের জন্য না জানি গত একবছরে সে কত পাগলামি করেছে। অথচ মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আজ সব ভালোলাগার অনুভূতি গুলো ঘৃণায় রূপ নিয়েছে। নিজের আরাধ্য পুরুষকে চোখের দেখাতেও এতো ঘৃণা করে যে আনায়া খুব একটা শান্তি পাচ্ছে—তেমনটাও নয়৷ এক অদ্ভুত কষ্ট তার সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। যেন সে কোনো পথ খুঁজেই আর মুক্তির সন্ধান পাচ্ছে না। বরং একের পর এক কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে।
এরিমধ্যে আনায়ার খেয়াল এলো নিজের ওপর। সে মাথাটা কিঞ্চিৎ নিচের দিকে নোয়াতেই তার হুঁশ হলো, সে এমন অবস্থায় কি করে এই লোকের কোলে নিশ্চিন্তে বসে আছে? অস্ফুটেই আনায়ার কন্ঠস্বর হতে ঘৃণ্যতার সাথে নির্গত হলো,

“ছিহ্!”
এরূপ অভিব্যক্তিতে একহাতে রমণীকে আঁকড়ে, অন্যহাতে ড্রাইভ করতে থাকা কেনীথের ভ্রু-যুগল খানিক কুঁচকে গেল। সে আনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
আনায়া কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। তবে তার চোখেমুখে অগাধ অস্বস্তি দেখে কেনীথ কড়া স্বরে বলল,
“হয়েছে টা কি, বলবি তো?”
আনায়া চোখমুখ খিঁচে ঝাঁঝাল স্বরে বলল,
“আপনার কোনোকিছুতে হুঁশ আছে? আপনি কোন আক্কেলে আমায় এভাবে কোলে নিয়ে বসে আছেন…”
আনায়ার কথাটুকু মাঝপথেই থেমে গেল। কেনীথ ভ্রুকুটি করে গম্ভীর গলায় শুধালো,
“হু, তো কি হয়েছে?”
আনায়া চাপা রাগ নিয়ে, কেনীথের চোখের সাথে চোখ মিলিয়ে দাঁত পিষে বলল,
“বুঝতে পারছেন না আপনি? আমার নিজেরই তো নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে।…আপনি…আপনি পুরো একটা উন্মাদ।”
রমণীর এতো ভণিতায় কেনীথ খানিক বিরক্ত হয়ে নিজেই বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল। পরক্ষণেই খুব স্পষ্ট ভাবে বুঝে নিল, আনায়া ঠিক কি বোঝানোর চেষ্টা করছে। সে রমণীর এরূপ অহেতুক ভাবনায় বেশ বিরক্তির সাথে বলল,

“ইডিয়ট, এতে এতো ড্রামা করার কি আছে? আমার ড্রেস আমি নিজেই ধুয়ে নেবো, তোর চিন্তা তুই কর।”
আনায়া ঠোঁটে ঠোঁট চেপে, দাঁতে দাঁত ঠেকিয়ে বলল,
“আপনি আসলেই একটা…”
—“জাস্ট শাট আপ! স্টপ দিস ননসেন্স, স্টুপিড! এই যুগে এসেও এমন ব্যাকওয়ার্ড চিন্তাভাবনা রাখিস কি করে? পিরিয়ড্’স ইজ অ্যান অ্যাবসোলিউটলি নরমাল বডি প্রসেস; যেটা প্রতিমাসে ঘটে, সেটা নিয়ে এতো কাহিনি করার কি আছে?”
রমণীর আক্রোশটুকু চাপা পড়ল হঠাৎ কেনীথের আকস্মিক ধমকে। কেনীথ আবারও বলল,
“অনেক জ্বালিয়েছিস, এবার সোজা তোর বাড়ি যাব। বাদবাকি সিনক্রিয়েট ওখানে গিয়ে করিস।”
আনায়া মুখ ফুলিয়ে রাগে ভেতরে ভেতরে গিজগিজ করতে লাগল। অস্ফুটে বিরবির করল,
“নির্লজ্জ কোথাকার!”

বাড়িতে পৌঁছে রমণীর বেডরুমে ঢুকেই আনায়াকে কোল হতে নিচে নামাল কেনীথ।অবশেষে দুর্ধর্ষ মানবের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আনায়া হাফ ছেড়ে বাঁচল। পেটের যন্ত্রণা ভুলে ঘরের এককোণে গিয়ে দাঁড়াল। ততক্ষণে কেনীথ সপাটে জানতে চাইল,
“বাড়িতে প্যাড আছে, নাকি কিনে আনতে হবে?”
আনায়া তার সোজাসাপ্টা উক্তিতে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“না,না, ওসব লাগবে না। ওসব ঐ ক্লোজেটেই আছে।”
কেনীথ বিলম্ব না করে হঠাৎ ক্লোজেটের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু হুট করে বিশেষ কিছু একটা স্মরণ হতেই, আনায়া সব ভুলে ক্লোজেটের দিকে ছুটে চলল। কেনীথ ক্লোজেটে হাত ছোঁয়ানো মাত্রই আনায়া একপ্রকার বাঁধা দিয়ে, দুহাতে ক্লোজেট আঁকড়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াল। তার এরূপ আচরণে কেনীথের ভ্রু-যুগল সন্দেহের বশে কুঁচকে গেল। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে, নিজেকে সামলানোর প্রয়াসে ইতস্তত করে বলল,
“আ…আপনাকে এদিকে আসতে আবার কে বলল? আর কিছু করতে হবে না আপনাকে, আপনি এখন যেতে পারেন। আমাকে ফ্রেশ হতে হবে; আমি এখন গোসলে যাব।… আর হ্যাঁ, সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ।”
কেনীথ আর কথা বাড়াল না। আনায়াকে একঝলকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে, দুপা পিছিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, তুই ফ্রেশ হয়ে নে। কোনো প্রবলেম হয়ে আমায় একবার ডেকে নিস।”

—“আচ্ছা।”
আনায়া মাথা নাড়ল। কেনীথ বিলম্ব না করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। গুরুগম্ভীর অবয়বটা চোখের সামনে থেকে দূর হতেই, আনায়া হাফ ছেড়ে বাঁচল। তখনোও সে ক্লোজেটটা আঁকড়ে ধরে, ভারীভারী শ্বাস ফেলে আওড়াল,
“ম’রতে ম’রতে বাঁচলাম আজ!”

দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল শেষে ওয়াশরুম হতে ধীরস্থিরে বেরিয়ে এলো আনায়া৷ রমণীর সর্বাঙ্গে এক অদ্ভুত সংকোচ ও অস্বস্তির ছাপ। পরনে আকাশী-নীল রঙের সাদামাটা একটা জামা; চুলগুলো বেয়ে তখনো অনবরত টপটপ করে জল ঝড়ছে।
আনায়া কিছুটা সংকোচ নিয়েই নিজের রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। ধীরস্থিরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে, নানান সব ভাবনা ভাবতে লাগল। ঘন্টাখানেক পূর্বেই কিভাবে টেনেটুনে বাড়িতে নিয়ে এলো, হাজারবার নিচে নামানোর কথা বললেও পুরুষ তার একবারের জন্যও কথা শুনল না।
এমনকি গাড়ি হতে নামার সময়ও আনায়া বারবার বলেছিল,
“দয়া করে এবার তো ছাড়ুন আমায়৷ আমি আর আপনার কোলে উঠবো না।”
কেনীথ তার এই সাদামাটা কথাকেই অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে, হঠাৎ রমণীকে কাঁধে তুলে নিল। আনায়া বিস্ময়ের সাথে চেঁচিয়ে উঠল,

“আরে কি করছেন! কোলে উঠবো না বলেছি, তারমানে আপনার কাঁধে উঠতে চাইনি আমি।”
কিন্তু কেনীথ তখনও তার অভিব্যক্তিতে গুরুত্বহীন। আনায়া ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতেই, ভারী শ্বাস ফেলল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“লোকটা এমন কেনো। পাগলামিরও একটা সীমা আছে।”
এরিমধ্যে আনায়া সিঁড়ি হতেই ড্রইংরুমের চারপাশে নজর ফিরিয়ে দেখল, আশেপাশে কোথাও কেনীথের দেখা নেই। আনায়া কিছুটা অবাক হয়ে, পরক্ষণেই তাচ্ছিল্যের সাথে ভাবল,
“আমিও একটা পাগল। এখনো থাকবে নাকি? চলে গেছে নিশ্চিয়; কোনো পাছুফুলা মেয়ের কাছে, অসভ্য!”
গাল-মন্দ করতে করতেই আনায়া ড্রইংরুমে এসে থামল। কিন্তু সোফার এককোণে পুরুষের কালো কোট-টাকে পড়ে থাকতে দেখে, আকস্মিকভাবে তার দৃষ্টি চলে গেল কিচেনের দিকে। আনায়া বিস্ময়ের সাথে কিচেনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সাদা ফর্মাল শার্টের হাতা দুটো অবিন্যস্ত আকারে কনুই অব্দি গুটিয়ে রাখা। অবয়বে কিঞ্চিৎ তাড়াহুড়ো ও অস্থিরতা। গোছানো চুল গুলোও খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেছে। অথচ সেসবের কোনো কিছুতেই খেয়াল না রেখে, কেনীথ নিজের মতো রান্নার তোরজোর করে চলেছে।
আনায়া বিস্ময়ের সাথে দুপা এগিয়ে যায়। মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে পরখ করে সুপুরুষের আপাদমস্তক। বেশ দৃঢ়তা নিয়ে চপিং কিছু রঙ-বেরঙের সবজি কাটছে কেনীথ। অথচ আনায়া তখন প্রমত্ত স্বরে অস্ফুটে আওড়াল,

“মানুষটা এতো সুন্দর কেন? একটু বেশিই সুন্দর, সুবহানাল্লাহ!”
এসব ভাবতে না ভাবতেই আনায়ার হুঁশ ফিরল। হকচকিয়ে গেয়ে নিজেকে স্থির করে ভাবল,
“আবারও ফেঁসে যাচ্ছিস,তারা! এই লোকের জালে ফেঁসে গেলে চলবে না, শক্ত থাকতে হবে। উনি ওনার ঐ রূপ দিয়েই সব মেয়েকে কাবু করে,এটা তোকে বুঝতে হবে।”
আনায়া নিজের ভাবনা ঝেরে রেখে, কেনীথের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, পেছন হতে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এখানে এসব কি করছেন?”
কেনীথ মুখ না ফিরিয়েই পাল্টা প্রশ্ন করল,
“গোসল শেষ তোর?”
আনায়া মাথা নাড়ল। বলল,
“হ্যা, কিন্তু… আপনি এখানে এসব কি করছেন? আপনাকে কেউ কিছু করতে বলেছে?”
—“ভি কারো হুকুমে কাজ কাজ করে না; আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই এখানে নিজ ইচ্ছেতেই রান্না করছি।”
আনায়া মুখ চুপসে, গম্ভীর মানবটাকে পরখ করল। কাজের ধরন অবলোকন করতেই তার চোখদুটো খানিক সরু হলো। মনে মনে ভাবল,

“আদোও উনি রান্নাবান্না জানেন তো? দেখে তো মনে হচ্ছে না।”
আনায়া আগ বাড়িয়ে আরো কিছু বলবে, তার আগেই কেনীথ তাকে কড়া সুরে আদেশ করল,
“এখানে পটরপটর না করে, ঐদিকে গিয়ে চুপচাপ বসে থাক। খাবার রেডি হলে আমি নিয়ে আসছি।”
আনায়া মুখ ফুলিয়ে দমে গেল। আর কথা বাড়িয়ে মেজাজ খারাপ করতে চাইল না। চেহেরা-সুরত দিয়ে আর কি হবে?—সবসময় তো শুধু ধমকাতেই থাকে। কিন্তু এতোকিছুর মাঝেও আনায়ার খটকাগুলো ঠিক পরিষ্কার হচ্ছে না। ব্যাপারটা ক্রমশই যেন আরো বেশি গোলমালে ঠেকছে।
কেনীথের কথামতো আনায়া গিয়ে চুপচাপ ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসল। তলপেটের যন্ত্রণা অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। রমণীর অপেক্ষারত ভাবনার মাঝেই, কেনীথের আগমন হলো।
টি-টেবিলের ওপর একে একে একবাটি স্যুপ এর পাশাপাশি একগ্লাস চেরি স্মূুদি ঠেলে দিল। আনায়া অবাক হয়ে কেনীথের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“বাড়িতে তো চেরি ছিল না। আপনি বাহিরে গিয়েছিলেন নাকি? কিন্তু কখন?”
কেনীথ নির্লিপ্তে শার্টের হাতা-দুটো ঠিকঠাক গুটিয়ে নিয়ে,আনায়ার পাশে বসে পড়ল। অকপটে বলল,
“তুই গোসলে ছিলি; তখনই একবার মার্টে গিয়েছিলাম।”

আনায়া অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কেনীথের দিকে তাকিয়ে রইল। এইটুকু সময়ের ব্যবধানে লোকটা বাহিরে গিয়ে বাজার-সদাই কিনে এনে আবার একাই রান্নাবান্না সেরেছে। রমণীর এরূপ অদ্ভুতপূর্বক চাহনি দেখে, কেনীথ চোখদুটো খানিক সরু করে ভারিক্কি স্বরে বলল,
“আমার দিকে হা করে তাকিয়ে না থেকে, চুপচাপ খেতে শুরু কর। আমায় আবার ভার্সিটি ফিরতে হবে।”
আনায়া শুকনো মুখে আওড়াল,
“তো যান না! আপনাকে আঁটকে রেখেছে কে?”
কেনীথ বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, গমগমে মেজাজ নিয়ে বলল,
“তোকে যেটা করতে বলেছি সেটা কর। দ্বিতীয়বার যেন বলতে না হয়।”
আনায়া দ্বিরুক্তি করল না। চুপচাপ অবিন্যস্ত সুপুরুষ হতে নজর সরিয়ে, টি-টেবিলের দিকে তাকাল। খাবারগুলো দেখতে মন্দ নয়; আশা করা যায় স্বাদও যথেষ্ট ভালো হবে। এই ভাবনায় আনায়া গরম স্যুপ হতে একচামচ মুখে দিল। মুহূর্তেই তার হাত-পা শিথিল হয়ে গেল। ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝে উঠতে পারল না।
ততক্ষণে সোফায় গা এলিয়ে কপালে হাত ঠেকানো কেনীথ চোখদুটো মেলে,আঁড়চোখে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“সব ঠিকঠাক?”
আনায়া মুখে খাবার নিয়েই তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়াল। ত্বরিত স্যুপের বাটিটা দু’হাতের আদলে নিয়ে,মুখের খাবারটুকু কোনোমতে গিলে ফেলল,
“অনেক মজা হয়েছে, সব ঠিকঠাক আছে। একদম পারফেক্ট!”
কেনীথ চোখদুটো কিঞ্চিৎ সরু করে আনায়ার আপাদমস্তক একঝলকে দেখে নিয়ে, পুনরায় চোখদুটো ক্লান্তিতে বুজে ফেলল। রমণীকে উদ্দেশ্য করে আওড়াল,
“দ্যান ওকে!”
আনায়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচতে চেয়েও বিপত্তিতে জড়াল। এখন আর করবেই বা কি। বেশ রয়েসয়ে হলেও সে স্যুপটুকু একপ্রকার গিলতে লাগল। একটা সময় পর হুট করেই কেনীথ নড়েচড়ে বসল। আনায়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে, ললাটে ভাজ রেখে সন্দিহান সুরে বলল,
“তুই সত্যি বলছিস তো?”
আনায়া তার আকস্মিক প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। বাটিটাকে আরেকটুখানি আগলে নিয়ে, মাথা নেড়ে বলল,
“কি আশ্চর্য! আমি মিথ্যে কেনো বলবো? খাবার সত্যিই অনেক মজা হয়েছে।”

—“তাহলে টেস্ট করা আমায়।”
আনায়ার চোখ-মুখ চুপসে গেল। আমতাআমতা করে বলল,
“থাক না। আমার জন্য রেঁধেছেন যখন তবে আমিই খাই?”
তার কথায় কেনীথের মন গলল না। সে হুট করেই ঠিকঠাক হয়ে বসে, আনায়ার হাত থেকে চামুচটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিল। আনায়া কিছু বোঝার আগেই কেনীথ তার কোলের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। দু’হাতে ধরে রাখা স্যুপের বাটি থেকে খানিকটা চামুচে তুলে মুখে দিতেই সে পুরোপুরি থমকে গেল। থমথমে দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে মুখ তুলে তাকাতেই, আনায়া অসহায়ত্বের সাথে মলিন হাসল। বলল,
“বললামই তো, না খেতে…শুধু শুধু…”
আনায়া তার কথা শেষ করতে পারল না। কেনীথের মুখাবয়বের করুন দশা দেখে বেচারী হতভম্ব হয়ে গেল। কেনীথ ততক্ষণে খাবারটা মুখ থেকে ফেলতে না পেরে, কোনোমতে গিলে ফেলল। দুবার গা ঝেড়ে কেশে নিয়ে ভারিক্কি গলায় বলে উঠল,

“ইডিয়ট! এতক্ষণ ধরে এটা কি খাচ্ছিলি তুই? ইয়াক, পুরো জঘন্য!”
আনায়া অসহায় ভরা মুখ করে বলল,
“আমি কি করতাম, আপনিই তো রেঁধেছেন।”
কেনীথ তার এহেন উত্তরে বেজায় বিরক্ত ও ত্যক্ত হলো। আক্রোশের সাথে আচমকা আনায়ার মাথায় চাটি মেরে বলল,
“গাধা কোথাকার! বললেই তো হতো এটা খেতে এতো জঘন্য। তোকে একবারও আমি জোর করে কিছু খেতে বলেছি?”
আনায়া মুখ ফুলিয়ে,কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“একটু আগেই বলল সবগুলো খাবার শেষ করতে।তার ওপর আবার এতো কষ্ট করে রান্না করেছে; আমি চাইলেই কি আর মুখের উপর বাজে কিছু বলতে পারি?”
আনায়ার মনের কথাগুলো মনেই চাপা পড়ল। কেনীথ ততক্ষণে স্মুদির গ্লাসটা আনায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এটা টেস্ট করে দেখ তো, খাওয়া যায় কিনা?”
আনায়া তার কথামতো খানিকটা স্মুদি স্ট্র দিয়ে টেনে মুখে নিল। মুহূর্তেই তার চোখদুটো সামান্য প্রফুল্লিত হলো। সে মাথা নেড়ে উদ্দীপ্ত স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা অনেক মজা হয়েছে।”
কেনীথ তার কথা ঠিকঠাক বিশ্বাস করতে পারল না। অবশ্য যে মেয়ে অনায়াসেই তার বানানো জঘন্য খাবারটাও গ্রোগাসে গিলতে পারে, তার কাছে আর কি’বা আশা করা যায়।
—“দে, আমায় দে। তোর কোনো বিশ্বাস নেই।”
হঠাৎ আকস্মিক এক টানে কেনীথ আনায়ার হাত থেকে স্মুদির গ্লাসটা টেনে নিল। আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেনীথ, সেই একই স্ট্রয়ে ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে কিছুটা খেয়ে টেস্ট করে ভাবুক ভঙ্গিতে বিজ্ঞ স্বরে বলল,
“না, খারাপ না। এটা খাওয়া যায়।”
নিমিষেই আনায়া ক্ষিপ্ত হয়ে কেনীথের হাত থেকে গ্লাসটা ছিনিয়ে নিল। সেই একই স্ট্র-তে ঠোঁট ছোঁয়াতে দ্বিধা করল না সে। অবশ্য সেদিকে দুজনের কারোরই কোনো ধ্যানজ্ঞান নেই। আনায়া নিজের ক্ষিপ্ততা নিয়ে, স্মুদি খেতে খেতে বলল,

“এটা খেতে ভালো হয়েছিল, তাহলে আপনি কেন আমার ভাগেরটুকু খেতে গেলেন?”
কেনীথ স্তম্ভিত দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কিঞ্চিৎ কটাক্ষ করে বলল,
“কতবড় নালায়েক রে তুই! নূন্যতম কৃতজ্ঞতা বলতেও কিছু নেই।”
আনায়া মুখ ভেঙচিয়ে মুখখানা পাশে ফিরিয়ে নিল।লোকটাকে আরেকটু ক্ষ্যাপানোর আশায়, রয়েসয়ে বলল,
“আর কিছু না হোক, এই একটা জিনিস বেশ ভালো বানিয়েছেন আপনি। আপনার এতোগুণ, আগে জানা ছিল না। সত্যিই প্রশংসনীয় ব্যাপার-স্যাপার।”
—“হোয়াট ডু ইউ মিন? রান্নাটাই একটু পারিনা। বাদবাকি আর কিসের কমতি আছে আমার?এখনো সেভাবে প্রয়োজন পড়েনি,কোনোদিন প্রয়োজন পড়লে রান্নাটাও ভালোমতো শিখে নেবো।”
কেনীথের রুক্ষ অভিব্যক্তিতে আনায়া চোখদুটো সরু করে, খানিক রয়েসয়ে বলল,
“কোন প্রয়োজনে শিখবেন শুনি? না মানে, রান্না যখন শিখবেন তখন তো কাউকে না কাউকে শখ করে রেঁধে-টেধেও খাওয়াবেন, তাই না?”

কেনীথ প্রত্যুত্তর না করে আনায়ার পরবর্তী কথাগুলোও শোনার অপেক্ষায় রইল। বুঝতেই পারছে, এই মেয়ে ভালোকিছু বলার নিয়তে তো নেই।
আনায়াও আর কোনোরূপ ভণিতা না করে বলল,
“এতো ভাববেন না প্লিজ! আপনার ধর্মে চার বিয়ে জায়েজ আছে। আপনার মন তো আবার দয়ার সাগর। যদি চারটার জায়গায় আট-দশটাকে জায়গা দিতে পারেন,তবে না হয় ওদেরই সুন্দর করে রেঁধে-রেঁধে খাওয়াবেন। কি জোস না ব্যাপারটা?”
আনায়া প্রত্যুত্তের আশায় কেনীথের গম্ভীর মুখপানে চেয়ে রইল। অথচ কেনীথ কোনোপ্রকার শব্দ না করেই, আচমকা উঠে দাঁড়াল। আনায়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে তার প্রস্থান দেখল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“চলে গেল? বাহ! মনে হয় বেশি সত্যি বলে ফেলেছি।”
আনায়ার ভাবনাগুলো অত্যধিক অবকাশের সুযোগ পেল না। কিছুক্ষণের মাঝেই একগাদা ফল ধুয়ে হাজির হলো সেই দাম্ভিক পুরুষ। আনায়া হকচকিয়ে তার দিকে মুখ তুলে তাকাতেই, কেনীথ প্লেটটা আনায়ার সামনে রেখে গমগমে সুরে বলল,
“এগুলো যেহেতু আমাকে বানাতে হয়নি, তাই আশা করছি সবগুলো নির্দ্বিধায় খেয়ে শেষ করতে কারো কোনো অসুবিধা হবে না।”
আনায়া ওতোগুলো ফলমূলের দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা আসলেই বোধহয় পাগল। এতোকিছু কে কিনে আনতে বলেছিল?
আনায়া হতবাক হয়ে বলল,
“সবগুলো খাবো?”

—“অবশ্যই!”
—“সম্ভব না।” আনায়ার ত্যাছড়া প্রত্যুত্তরে কেনীথ সপাটে জবাব দিল,
—“একটা মাইরও মাটিতে পড়বে না।”
এক ধমকেই আনায়ার চোখ-মুখ চুপসে গেল। তবুও চাপা স্বরে তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
—“আপনি আমায় মারবেন না—আমি জানি!”
রমণীর এরূপ হেয়ালি ভাবনা শুনে, কেনীথের ললাটে ভাজ পড়ল। ত্যাক্ত সুরে বলল,
—“বেশি জানিস তুই, মুড খারাপ করিস না আমার। দু’চারটে মেরে দেওয়ার পর কেঁদে আর কূল পাবি না।”
আনায়া আর কথা বলার ফুরসত পেল না। লোকটা হঠাৎ একটা কমলা হাতে নিয়ে তার পাশে বসে পড়ল। আনায়া হকচকিয়ে গিয়ে কিছু বলবে, তার আগেই একটা অদ্ভুত ব্যাপারে তার চোখদুটো খানিক সরু হয়ে গেল। হাতে থাকা স্মুদিটুকুর অবশিষ্টাংশ খেতে খেতে আঁড়চোখে কেনীথের সবটা পরখ করতে লাগল।
ধীরস্থিরে কোমলার খোসাগুলো ছাড়িয়ে, প্রত্যেকটি কোয়ার শ্বেতকোষগুলোও অত্যন্ত নিপুণ কৌশলে ছাড়িয়ে নিচ্ছে কেনীথ। এই দৃশ্য নতুন নয়। হুট করেই আনায়ার মনে পড়ে গেল গতবছরের ঘটনাকাল। খুব যদি ভুল না হয় তবে আগস্টের কোনো এক বৃষ্টির মৌসুমে তাদের প্রথম দেখা; যেহেতু পূর্বের কোনোকিছুই আনায়ার মনে নেই, তাই সেটাই তাদের প্রথম দেখা বলে বিবেচিত। শুরুটা অনেক অগোছালো, অপ্রত্যাশিত হলেও সেই গেস্ট হাউজের দুদিনের কথা আনায়ার খুব ভালো করেই মনে আছে।

তার যন্ত্রণায় পাশে থাকা, কেয়ার করা, কখনো নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দেওয়া তো কখনো এভাবে বাচ্চাদের মতো কমলার খোসা ছাড়িয়ে দেওয়া—আনায়া অবাক হয়ে সবকিছুই পরখ করেছিল তখন। বিশেষ করে পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর, বারান্দা দিয়ে যখন দেখল, সুপুরুষ কিভাবে একা-একা একগাদা জামাকাপড়, তার নোংরা করা বিছানার চাদর অব্দি ধুয়ে তারে শুকিয়ে দিচ্ছে; রৌদ্রজ্জ্বল আলোয় সদ্য স্নান করা জ্বলজ্বলে সেই বলিষ্ঠ পুরুষে মোহাবিষ্ট অবয়বের দৃশ্যপট আজও আনায়ার মানসপটে ভেসে বেড়ায়। আনায়া মুচকি মুচকি হাসে; আবার লজ্জায় নুইয়ে যায়।
অথচ এই মানুষটাকেই তখন সে কি না কি ভেবে বসেছিল। কখনো কি’ড’নাপার,তো কখনো টে’রো’রিস্ট-ক্রি’মি’নাল। কিন্তু আনায়া নিশ্চিত যে, সেই রৌদ্রময় সকালেই সে এই মানুষটার মোহে জড়িয়েছিল। অতঃপর মোহ হতে মায়া, তারপর সেটা রূপ নিল মহামায়া’য়। যে মায়া হতে সে এখন অব্দি নিস্তার পায়নি। শতচেষ্টা করেও সে এই মানুষটার ভাবনা মস্তিষ্ক হতে সরাতে পারেনা। তার কল্পনা-যন্ত্রণা,ভাবনা-চিন্তা সবকিছুতেই যেন ভিভিয়ানের বসবাস।

আনায়া আনমনা হয়ে একমুহূর্তে কতকিছু ভেবে ফেলল। তার ভাবনার মাঝেই হুটহাট ওষ্ঠকোণে ফুটে উঠছে মুচকি মুচকি হাসি। আনায়া কিছুটা নড়েচড়ে উঠতেই হুট করে নজর পড়ল কেনীথের দিকে। লোকটা কমলার কোয়া হাতে তার মুখের সামনে ধরে আছে। চোখে-মুখে গুরুগম্ভীর গাম্ভীর্য, কপালে সন্দেহের ভাজ। আনায়া হকচকিয়ে উঠল। চোখের পলক ঝাপটে নিজেকে স্বাভাবিক করতেই, কেনীথ প্রশ্ন ছুড়ল,
“ঘটনা কি বলতো? আমি কয়েকবার খেয়াল করেছি, তুই অধিকাংশ সময়ই একা একাই মুচকি মুচকি হাসিস, কথা বলিস নয়তো বিড়বিড় করিস। এসব কি?”
আনায়া উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেল না। চোখ-মুখ চুপসে গিয়েছে তার। সে প্রচন্ড ইতস্তত করতে করতে আওড়ায়,
“কি সব বলছেন, আমি পাগল না।”

—“আমি জানি তুই পাগল নস—তুই পাগলী।”
কেনীথের অকপটে দেওয়া অভিব্যক্তিতে আনায়া তাজ্জব বনে গেল। মুখ ফুলিয়ে রাগ ঝারার আগেই, কেনীথ আচমকা তার ওষ্ঠদ্বয়ের ফাঁক-ফোঁকড়ের মাঝেই কোমলার কোয়াটা ঠেসে ঢুকিয়ে দিল। চাপা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“মুখ বন্ধ রাখবি। বেশি কথা ভালো লাগে না আমার।”
আনায়া কোয়াটুকু চিবোতে চিবোতে বলল,
“আমার তো ভালোই লাগে। আপনার ভালো না লাগলে আমি কি করব?”
কেনীথ বিরক্ত হয়ে, আনায়ার দিকে ঘুরে বসল। আনায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও তা প্রকাশ করল না। ততক্ষণে কেনীথ তার মুখে আরো একখান কোয়ার খোসা ছাড়িয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
“ইউ আর সাচ আ ক্যামেলিয়ন! লাস্ট ইয়ার, আই থট ইউ কুডন্ট ইভেন টক প্রপারলি। বাট নাউ আই সি আই ওয়াজ কমপ্লিটলি রং।”
আনায়া চোখ রাঙিয়ে বলল,

“মোটেও না, আমি কোনোকালেই গিরগিটির মতো না। আমি আগেও যা ছিলাম, এখনও তাই আছি, ভবিষ্যতেও তাই থাকব। শুধু মানুষভেদে আচার-আচরণ একটু পাল্টে যাই, এই আরকি।”
কেনীথ সরু চোখে রমণীর দিকে তাকিয়ে রইল। আনায়া নিজের নামে সাফাই গেয়েও কেমন যেন শান্তি পেল না। কিঞ্চিৎ থতমত খেয়ে গলা খাকিয়ে বলল,
“এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন? সত্যি বলছি আমি। আমি গিরগিটির মতো না, আমি অনেক ভালো মানুষ।”
কেনীথ এবারও নিশ্চুপ। আনায়া কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ করল। সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
“আ…এভাবে কমলার খোসা ছাড়াতে হবে না। বাচ্চারা এভাবে খায়, আমি বাচ্চা নই।”
কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে সূচালো তীক্ষ্ণ সুরে প্রশ্ন ছুড়ল,
“তুই বড় হয়ে গেছিস?”
আনায়ার থতমত খেল পুরুষের মুখে এহেন কথা শুনে। এটা আবার কেমন কথা। সে কি বড় হয়নি?
আনায়া কিছু বলার আগেই কেনীথ বলল,
“ঠিক আছে, এমনিই খা। শুধু শুধু খেটে যাচ্ছিলাম।”
কথামতো এবার কোষসহ কোয়া মুখের সম্মূখে বাড়িয়ে দিতেই, আনায়া মুখটা কিঞ্চিৎ পিছিয়ে নিয়ে দ্বিমত পোষণ করল; রয়েসয়ে বলল,

“না মানে, থাক…ঐভাবেই দিন। ওভাবে খেতে আবার মজা লাগে।”
কেনীথের হাতখানা থেমে গেল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল আনায়ার দিকে। আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে কিছুটা হাসার চেষ্টা করল। কেনীথ দৃষ্টি নামিয়ে, কোয়ার কোষ ছাড়াতে ছাড়াতে অস্ফুটে বিড়বিড় করল,
“মেয়েটা আর কোনোদিন শুধারালো না।”
আনায়া তার কথা শুনেও যেন শুনল না। তার ভাবনা পরিবর্তন হয়েছে ভিন্নকিছুতে। হঠাৎ গতবছরের ঘটনাগুলো মনে করতে গিয়ে,হুট করে তার মাথায় একটা বিশেষ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে মুহূর্তেই সে চোখে-মুখে গম্ভীর্য নামিয়ে, কোনোপ্রকার ভণিতা না করে কেনীথকে প্রশ্ন করল,
“একটা কথা বলি?”
কেনীথ নিজের কাজে মনোযোগ ধরে রেখেই, গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,
“কথা বলা থামিয়েছিস কখন? বলতেই তো আছিস।”
আনায়া কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো পুরুষের এরূপ আচরণে। তবুও সে ভিন্ন প্রসঙ্গ না তুলে, সরাসরি নিজের প্রশ্নটাই করে বসল,
“আপনি তো চিটাগাং-এর ছেলে। রাঙ্গামাটি-বান্দারবন তো গিয়েছেনই হয়তো অনেকবার। কাপ্তাই লেক গিয়েছেন কখনো?”
কেনীথ অকপটে মাথা নেড়ে বলল,
“হুম।”

—“শেষ কবে কাপ্তাই লেক গিয়েছিলেন?”
কেনীথ কিছুটা ভেবে উত্তর দিল,
“সম্ভবত গতবছর।”
—“আগস্ট মাসে? বৃষ্টি ছিল তখন?”
কেনীথ এবার মুখ তুলে আনায়ার দিকে চাইল। ভ্রু-যুগল কুঁচকে বলল,
“হুম, কিন্তু কেনো?”
আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করল। বলল,
“না, তেমন কিছু না এমনিতেই বললাম আরকি।”
আনায়া কিছুটা থেমে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“আরেকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি?”
—“হুম কর, কিন্তু আগে এটা খা।”
বলতে না বলতেই, কেনীথ তার মুখে একটা আস্ত চেরি ঢুকিয়ে দিল। আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে চিবোতে চিবোতে বিরক্তির সুরে বলল,
“বীজসহ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, অসভ্য লোক।”
কেনীথ তার কথা আমলে না নিয়ে বলল,
“ওয়েট, বীজ ছাড়িয়ে দিচ্ছি।”

বলতে না বলতেই কেনীথ হঠাৎ করে হৃষ্টপুষ্ট টসটসে চেরিতে কামড় বসাল। সামান্য রসালো তরল পুরুষের পুরু ঠোঁটের কোণে লেপ্টে গেলেও, তাতে তার নূন্যতম ভাবান্তর হলো না। সে তখন ব্যস্ত চেরি হতে বীজখানা বের করতে। অথচ আনায়ার দৃষ্টি তখন পুরোপুরি আঁটকে গেল সেই মোহাবিষ্ট দৃশ্যতে। কন্ঠস্বর শুকিয়ে চৌচির; হাত-পা যেন ক্রমশই অবশ হয়ে এলো। একবারের জন্য চোখের পলক ফেলাও দায়!
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিয়ে দ্রুততর নিজের জামার একাংশ হাতের মুঠোয় খিঁচে নিল। শ্বাস-প্রশ্বাস বারংবার থেমে এলেও, রমণী মনে মনে নিজেকে কটাক্ষ করে বলতে লাগল,
“ছিঃ আনায়া, একটু তো লজ্জাশরম রাখ! মাথা নিচু কর। আর তাকাস না ওদিকে। মরে যাবি। ঐ লোক নিশ্চিত জাদু জানে। ধ্বংস করে ছাড়বে তোকে। তাকাস না, তাকাস না। মাবুদ তুমি একটু দয়া করো এই মেয়ের ওপর। একটু লজ্জাশরম ঢেলে দাও এই মেয়ের মাঝে!”
ততক্ষণে কেনীথ চেরির বীজ ছাড়িয়ে খেয়ালি রমণীর মুখের সম্মূখে তুলে ধরে বলল,
“নে, এবার খা।”
আনায়া তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলায়। এই দূর্বলতা প্রকাশ পেয়ে গেলে, মান-ইজ্জত বলে আর কিছু থাকবে না বোধহয়। সে কোনো বাছবিচার না করেই, পুরুষের ওষ্ঠ ছোঁয়া রসালো চেরিখানা মুখে পুরে নিল। মুহূর্তেই মাথা নামিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল,
“আমি এমন কেন হয়ে গেলাম? আমি তো সত্যিই এমন ছিলাম না। এতো অসভ্য কি করে হলাম।”
এরিমধ্যে কেনীথ হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“তুই যেন জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলি?”
আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে মাথা তুলল। সবকিছু যেন গুলিয়ে ফেলেছে। লোকটা কিসের কথা জিজ্ঞেস করছে শুরুতে বুঝতে না পারলেও, পরক্ষণেই তার মনে পড়ল,
“ওহ, হ্যা…বলছিলাম যে…রাঙ্গামাটিতে কি কখনো আপনার থাকা হয়েছিল?”
কেনীথ আনায়ার সাথে সাথে আনমনে নিজেও একটা চেরি মুখে পুরে দিয়ে, নির্লিপ্তে ভেবেচিন্তে বলল,
“হ্যাঁ, গতবারই তো থেকেছিলাম বোধহয়।”
—“কটেজে ছিলেন?”
—“হু, আমি আর পাভেল ছিলাম।”
—“কটেজের বারান্দায় ঝুম বৃষ্টির মাঝে গিটার নিয়ে গান গেয়েছিলেন তখন?”
দন্তপাটির এককোণে চেরির বীজখানা চেপে, কেনীথ কিছুটা ভেবে চিন্তে সন্দিহান সুরে বলল,
“হুম,গেয়েছিলাম বোধহয়। কিন্তু হঠাৎ তুই এসব কেনো জিজ্ঞেস করছিস?”
আকস্মিক প্রশ্নে আনায়া অপ্রস্তুত হলেও, সামান্য মুচকি হাসল। মাথা নেড়ে বলল,
“এমনি।”
কেনীথ চোখদুটো সরু করে তার আপাদমস্তক পরখ করল। বিশেষ কিছু অনুসন্ধান করতে না পেরে, কিঞ্চিৎ অসন্তোষ প্রকাশ করল। ততক্ষণে আড়ালে রমণী মুচকি মুচকি হেসে, মনে মনে আওড়াল,
“তারমানে আমার ধারণাই ঠিক। আমাদের দেখা ঐ বিয়ের গন্ডোগোলের মাঝে হয়নি, রাঙ্গামাটিতে যখন ট্রিপে গিয়েছিলাম তখনই আমি ওনাকে প্রথম দেখেছিলাম। আর যে গিটারওয়ালা লোকটার উপর ক্রাশ খেয়েছিলাম, সেটাও উনি ছিল?”

ভাবতে না ভাবতেই আনায়ার আরো মনে পড়ল,
“ওহ হ্যাঁ, কাপ্তাই লেকের ওপর থেকে যখন পড়ে যেতে নিয়েছিলাম—তখন আমায় যে লোকটা বাঁচিয়েছিল, সেটাও বোধহয় উনিই ছিল। ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে; আমাদের সম্পর্কটাও বহু পুরোনো, শুরু থেকেই আমরা একে-অপরের পরিপূরক, অথচ তখনও কেউ বুঝতে পারিনি৷ হায়য়য়য়, দিল তো গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল।”
আনায়ার আনমনা হাসিখুশি ভাবনার মাঝেই তার মুখে আরো দুখানা চেরি এসে ঢুকল। আনায়া প্রকৃতিস্থ হয়ে, নিজেকে খানিকটা সামলে নিল। তবে বেহায়া দৃষ্টি তার আবারও সেই একটি মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের প্রতি নিবদ্ধ হলো। সামান্য একটা চেরিই তো। অথচ প্রতিবারই লোকটা কি করে যেন তার অবস্থাটা নাজেহাল করে দেয়।
কেনীথ বীজ ছাড়িয়ে আনায়াকে আরো একখান চেরি শুধাতেই, আনায়া তড়িঘড়ি করে নিষেধ করল,
“থাক,আর চেরি খাব না।”
—“কেনো?”

কেনীথের স্বাভাবিক প্রশ্ন। আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে বাহানা খুঁজে নিয়ে বলে,
“আ…অনেক খেয়ে ফেলেছি,এক ফল এতো খাওয়াও ঠিক না।”
—“কোথায় অনেক খেলি? মাত্র তো দু-চারটে। বেশি কথা না বলে, আর ক’টা খেয়ে নে। প্রতিবার এখানে এসে এসে তোকে খাইয়ে দিয়ে যাবো না আমি।”
বলতে না বলতেই, কেনীথ তার মুখে আরো একটা চেরি পুরে দিল। আনায়া রয়েসয়েও নিজের অস্বস্তি প্রকাশ করতে পারল না। ততক্ষণে কেনীথ আরো বলল,
“ডু ইউ নো, চেরিতে অ্যান্থোসায়ানিনস নামে অত্যন্ত পাওয়ারফুল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এলিমেন্ট থাকে, যেটা ন্যাচারাল পেইনকিলার হিসেবে কাজ করে। ইট’ল ইনস্ট্যান্টলি ইজ ইউর সিভিয়ার পিরিয়ড ক্র্যাম্পস, ইউ স্টুপিড!”
আনায়া থতমত খেয়ে তার কথাগুলো শুনল। মনে মনে আওড়াল,
“বাপরে, কতকিছু জানে! অবশ্য প্রফেসর মানুষ, ভাবসাবই আলাদা। মা-ও তো বলেছিল,উনি শুরু থেকেই নাকি খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। পরে নাকি কিসুমিসু করে বিগড়ে গেছে। বড়-আব্বুর হাতে উত্তম মধ্যমও খেয়েছে। মনে হয় ঐ শাঁকচুন্নি গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বাড়িতে ধরা খেয়েছিল। ঠিকই আছে,কেলানি আরো দেওয়া উচিত ছিল।”

—কি হলো?
আনায়ার চুপচাপ অবয়ব দেখে কেনীথ প্রশ্ন করল। আনায়া প্রকৃতিস্থ হয়ে, অসহায় ঢঙে বলল,
“আ…না, কিছু না,আর খাবো না প্লিজ…”
—দ্যান ইট’স ওকে।”
কেনীথ প্লেটটা পাশে সরিয়ে রাখল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই, আনায়ার উদ্দেশ্যে সূচালো সুরে বলল,
“এমনিতেও,চেরি না তোর প্রিয় ফল ছিল?
আনায়া অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে জানায়,
“কি, সত্যি? কি জানি, আমি তো জানিনা, আপনি কি করে জানলেন?
রমণীর খামখেয়ালি কথার ধরনে কেনীথ খানিকটা অসন্তোষ হলো। আচমকা কিছু না বলেই, সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। আনায়া উৎসুক দৃষ্টিতে কেনীথের গম্ভীর মুখপানে চেয়ে বলল,
“আপনি কি এখন চলে যাবেন?”
—“না, আরেকটু পর।” বলেই সে আর রমণীকে কোনোকিছু বলার অবকাশ দিল না। আচমকা আনায়াকে হতভম্ব করে তার দিকে ঝুঁকে পড়ল সে। আনায়া তার এরূপ আগমনে শুষ্ক ঢোক গিললেও, বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। ততক্ষণে কেনীথ তার বাহু ও কোমড়ে দু-হাত পেঁচিয়ে অকস্মাৎ এক টান দিল। আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পুরুষ তার বলিষ্ঠ দুহাতে আনায়াকে সহসাই কাঁধে তুলে নিল। নির্লিপ্তে পা বাড়াল ড্রইংরুম ছেড়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে।

—“আরে, এটা কি করছেন…”
কেনীথ উত্তর দিল না; নিজের মতো সিঁড়ি বেয়ে ওপড়ে চড়তে লাগল। অন্যদিকে আনায়া কথা শেষ করারও ফুরসত পেল না। বরং বিস্ময় একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল,
“কিছু হলেই কাঁধে তুলে নেন। আপনার সমস্যা কি বলুন তো?”
আনায়ার উৎকন্ঠা চিৎকারে কেনীথ নিমিষেই ত্যক্ত-বিরক্ত হলো। হুট করেই রমণীকে কাঁধ থেকে খানিকটা নামিয়ে প্রশস্ত বুকের সাথে চেপে ধরল। আচমকা শরীরটা আলগা হতেই, পড়ে যাবার আশংকায় আনায়া ধড়ফড়িয়ে দাম্ভিক পুরুষের ঘাড়-গলা দুহাতে পেঁচিয়ে নিল। দুপা দিয়ে আঁকড়ে ধরল কেনীথের কোমড়-পিঠ। পরক্ষণেই যখন নিজের অবস্থান বুঝে হুঁশ হলো, ওমনি আনায়া কেনীথের মুখপানে চেয়ে থমকে গেল।

মহামায়া পর্ব ৫৭

পুরুষের বিদ্রুপাত্মক সূচালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে তাকিয়েই শুষ্ক ঢোক গিলল সে। আনায়া অযুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ পেল না। কেনীথ তার বলিষ্ঠ দু’হাতে শক্তকরে সর্পের ন্যায় আনায়ার পিঠ-কোমড় পেঁচিয়ে,নিজের সাথে চেপে ধরল। কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্য করে চাপা ত্যাক্ত সুরে বলল,
“ঝুলতে যখন এতোই ভালো লাগে, তবে ঝুলেই থাক—বাদর কোথাকার!”

মহামায়া পর্ব ৫৯