Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৫৯

মহামায়া পর্ব ৫৯

মহামায়া পর্ব ৫৯
তুশকন্যা

পা দিয়ে সপাটে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে, কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল কেনীথ। দুহাতে কাঁধ জড়িয়ে বুকের ওপর এখনো সেই অবাধ্য রমনী ঝুলে আছে। বেড অব্দি পৌছাতেই আনায়ার পিঠে-কোমড়ে সমানভাবে দুহাত রেখে, আলতোভাবে ঝুঁকে তাকে বেডে শুইয়ে দিল সে। কিন্তু তখন তখনই সে আনায়ার থেকে সরে এলো না। বরং কিছুটা সময় একই ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে স্থির রইল; আনায়া মানুষটার এতো নিকটস্থ সংস্পর্শে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো; ঘাবড়ে গেল। দ্রুত কেনীথের ঘাড় হতে হাতদুটো ছাড়িয়ে বালিশের সাথে গা ঠেকাল।
ততক্ষণে কেনীথ আলতোকরে তার মুখাবয়বে লেপ্টে থাকা চুলগুলো আঙ্গুলের স্পর্শে সরিয়ে দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বলল,

“আর লাফালাফি করতে হবে না। এখন চুপচাপ রেস্ট কর। নিজের ঠিকঠাক খেয়াল রাখিস। আর যদি কোনো প্রবলেম হয় তবে…”
কেনীথ থামল। আনায়া সুক্ষ্ম এক আশা নিয়ে বসে রইল বিশেষ কিছু শোনার আকাঙ্খায়। অথচ আশাতে জল ঢেলে দিয়ে পাষণ্ড পুরুষ বলল,
“প্রবলেম হলে তোর ফ্রেন্ডদের জানাস। সমস্যা চেপে রেখে লাভ নেই।”
আনায়া মেজাজটা ত্যক্ত হলেও, সে আনমনে মাথা নাড়ল। ততক্ষণে কেনীথ তার থেকে সরে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ একটা টাওয়াল আর ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে ওয়ারলেস হেয়ারড্রায়ারটা নিয়ে এলো। আনায়া সবটাই সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের সাথে দেখে গেল। কেনীথ তার সংস্পর্শে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, রমণীর কাঁধ চেপে কিছুটা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিল। কেনীথ যেমন নিশ্চুপ, তেমনি আনায়াও। আনায়া ইচ্ছে করেই কিছু বলছে না। বরং সে নিজের মতো মনে মনে হিসেব কষে যাচ্ছে। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরুষ তার চুলগুলো যত্নসহকারে টাওয়াল দিয়ে মুছে দিতে লাগল।
মোছামুছির কার্যক্রম শেষ হতেই,আচমকা বেখেয়ালিতে কেনীথ তার চুলগুলো হাতের সাহায্যে কিছুটা এলোমেলো করে দিতেই, আনায়া বিরক্তিসূচক শব্দ করে উঠল,

“ইহ্! এটা কি করছেন। আমি বাচ্চা না।”
কেনীথ ভ্রু কুঁচকে দুদন্ড স্থির রইল। তারপর হঠাৎ হেয়ার ড্রায়ারটা আনায়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“দ্যান ওকে, এবার বাদবাকিটুকু তুই নিজে কর।”
আনায়া হেয়ার ড্রায়ারটা হাতে নিয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে কেনীথের পানে মুখ দৃষ্টি ফেরাল। মানুষটার মুখাবয়বে বিরক্তির আভাস দেখে, কাচুমাচু হয়ে বলল,
“সরি, আপনিই করে দিন।”
কেনীথ তার হাত থেকে হেয়ারড্রায়ারটা নিয়ে ধীরস্থিরে চুলগুলো ঠিকমতো শুঁকিয়ে দিতে লাগল। এতক্ষণ চুপচাপ থেকে আনায়া অস্থির হয়ে উঠেছিল।লোকটা তার পাশেই আছে, অথচ সে কোনোকথা না বলে এতক্ষণ কিভাবে চুপ করে আছে?
যথারীতি আনায়া আর কোনো ভণিতা না করে বলল,

“আপনি তো এখন চলে যাবেন, তাই না?”
কেনীথ পেছন হতে নিরেট স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
“আমার উপস্থিতি অসহ্য লাগছে? বারবার চলে যাবার কথা কেন বলছিস? সময় হলে একাই চলে যাব আমি।”
পুরুষের থমথমে মেজাজে আনায়া থতমত খেয়ে বলল,
“একটু বেশিই বুঝেন আপনি। আমি এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম।”
কেনীথ তার অভিব্যক্তিতে পাল্টা স্বরে শুধালো,
“তুই ঠিকঠাক বড় হবি কবে?”
বিছানায় বাবু-আসনে বসে থাকা আনায়া গা দোলাতে দোলাতে বলল,
“আমি তো বড়-ই ৷ পুরো দুনিয়ায় একমাত্র আপনিই শুধু আমায় ছোট ভাবেন। যদি আমি ওতো ছোটই হতাম,তবে কি আর বাবা আমায় বিয়ে দিতে চাইতো? মাঝে এসে ঝামেলাটা তো আপনিই লাগালেন। তখন যদি রেহান ভাইয়ের সাথে আমার বিয়েটা ঠিকমতো হতে দিতেন, তাহলে এতোদিনে আমার একটা-দুটো বাচ্চাও থেকে যেতো।
যেহেতু আপনি আমার ভাই হোন, সেক্ষেত্রে ওরা আপনাকে মামা বলেও ডাকতে পারতো। কিন্তু আপনি তা হতে দিলেন না। নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোকে পৃথিবীর আলো দেখতে দিলেন না। বড়ই নিষ্ঠুর মামা আপনি!”
কেনীথের হাতদুটো থেমে গিয়েছে। সে স্তম্ভিত হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। একটা সময় পর হেয়ারড্রায়ারটা অফ হয়ে যেতেই, আনায়ার হুঁশ হলো।

—“কি হয়েছে?”
অবোধের ন্যায় নড়েচড়ে পেছনে মুখ ফেরাতেই, থমথমে অবয়বটাকে দেখে আনায়া থতমত খেয়ে গেল। চোখের পাপড়ি ঝাপটে শুষ্ক ঢোক গিলে, হাসার চেষ্টা করে বলল,
“সরি সরি, আমি মজা করছিলাম। বিশ্বাস করুন, জাস্ট একটু মজা করেছি আরকি। শুধু এক্টু!?”
আনায়া নিজের দু’আঙ্গুল এক করে পরিমানটুকু পুরুষকে অনুধাবন করানোর চেষ্টা করল। অথচ কেনীথ ততক্ষণে হেয়ারড্রায়ার সহ সবকিছু গুছিয়ে রেখে,সোজা রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়া ফ্যালফ্যাল করে তার প্রস্থানটুকু চেয়ে চেয়ে দেখল।
পুরোপুরি সংবিৎ ফিরে পেতেই, নিজের চুলগুলো দু’হাতে টেনে ধরল সে। চোখ-মুখ খিঁচে নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে বলল,
“নালায়েক! কোথায় কি বলতে হয় কিচ্ছু হুঁশে থাকে না। বলতে বলতে কতদূর বলে ফেলেছিস, অসভ্য একটা!”

একটা হটব্যাগ নিয়ে কিছুক্ষণের মাঝেই রুমে ফিরে এলো কেনীথ। তার থমথমে গম্ভীর্য দেখে, বিছানায় ব্ল্যাঙ্কেট মুড়িয়ে বসে থাকা আনায়া এবার একদম চুপচাপ। এইজন্য সে বেশি কথা বলতে চায়না। বলার সময় আর হুঁশ থাকে না কোথায় কি বলে ফেলছে। কিন্তু আপাতত মনে হয়না, আগ বাড়িয়ে লোকটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করাটাও ঠিক হবে না।
কেনীথ তার কাছে এসে নিঃশব্দে হটব্যাগটা এগিয়ে দিতেই আনায়া বলল,
“এতোকিছুর প্রয়োজন ছিল না। এইটুকু আমি করে নিতে পারতাম।”
কেনীথ কিছু বলল না। চুপচাপ গিয়ে রুমের সোফার গা এলিয়ে বসল। হাটুতে দু’হাত ঠেকিয়ে একত্রিত করে, গম্ভীর এক ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আইম গিভিং ইউ এক্স্যাক্টলি ফাইভ মিনিটস, ইউ মাস্ট বি স্লিপ বাই দেন!”
আনায়া বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“পাগল নাকি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কেউ ঘুমাতে পারে নাকি? আমি আনায়া, কোনো নবিতা নই।”
কেনীথের গম্ভীর মেজাজে সুক্ষ্ম ভাজ পড়ল, সে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“হু দ্য হেল ইজ নবিতা?”
আনায়া তার সূচালো প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“আ…নবিতা হলো ঐ যে ডোরিমনের সাথে থাকে না, ঐ নবিতা। আচ্ছা এসব বাদ দিন না, আমার যখন ঘুম আসবে আমি না হয় তখনই…”
—“আই টোল্ড ইউ, ফাইভ মিনিটস!”
আনায়ার মেজাজ বিগড়ে গেল। রাগে মুখ ফুলিয়ে, হটব্যাগটা পেটে চেপে ধরে আচমকা শুয়ে পড়ল। চোখ দুটো বোজার আগে, ঝাঁঝালো স্বরে চেঁচিয়ে বলল,
“পারব না আমি পাঁচ মিনিটে ঘুমাতে। আমি সাত মিনিটে ঘুমাবো!”
শুরুতে কন্ঠস্বর উচ্চ হলেও, শেষাংশে তা ক্ষীণ হলো। নিজের জেদ দেখাতেই যে রমণীর এরূপ আচরণ তা আর কেনীথের বুঝতে বাকি নেই। সে সাদা ব্ল্যাঙ্কেট মোড়ানো শরীরটার দিকে চেয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। চাপা স্বরে অস্ফুটে আওড়াল,
“বুদ্ধি-শুদ্ধি, আদব-কায়দা বলতে কিচ্ছু নেই মেয়েটার।”

বেশ দীর্ঘ সময় পর আড়মোড়া ভেঙে আনায়ার ঘুম ভাঙ্গল। হাত-পা ছড়িয়ে হঠাৎ পাশে মুখ ফেরাতেই আবার বেশ কিছুটা অবাক হলো। বালিশের পাশে একগাদা চকলেট-চিপস সহ আরো না জানি কতকিছু গুছিয়ে রাখা। আনায়া দ্রুততর সেসব এলিয়ে দেখল, বেশিরভাগ খাবারই অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসম্মত। আনায়া সেসব দেখে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“এসব কি উনি রেখে গিয়েছেন? সিরিয়াসলি?”
বলতে না বলতেই সে যখন দেখল, শুধু ডার্কচকলেট বাদে কোনো কিছুই তার জুতসই নয়—তখনই কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করল,
“এই লোকটা সবকিছুতেই বেশি বেশি করে। এতোকিছু কে আনতে বলেছিল? এসবের বেশিরভাগই তো আমি গিলতে পারব না। এসব জিনিসও কি মানুষ খায়?”
আনায়া থামল। পরক্ষণেই মুখটা চুপসে একা একাই বলতে লাগল,
“এতো মিষ্টি একটা বউ আমি, কোথায় মিষ্টি মিষ্টি জিনিস আনবে—তা না! নিরামিষ কোথাকার!”
আনায়ার এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ সিঁড়িতে ধুড়ুমধাড়াম শব্দ করে তার ঘরে আইজেল-সাবা’র হানা পড়ল। তাদের দুজনকে এভাবে রুমে আসতে দেখে আনায়া খানিকটা চমকে উঠল। পাশে ফিরতে না ফিরতেই আইজেল বলল,

—“আনায়া তুমি ঠিক আছো?”
—“কি রে তোর কি হয়েছে? এসব কি শুনেছি আমি?”
দুজনের এরূপ অভিব্যক্তিতে আনায়া আরো বেশি হতভম্ব হলো। এরা দুজন কি শোনার কথা বলছে?
আনায়ার আশংকার মাঝেই, আইজেল তার কাছে এসে বসে পড়ল। দুজনের অবয়ব দেখে এইটুকু স্পষ্ট যে তারা ভার্সিটি থেকেই সরাসরি এখানে হানা দিয়েছে।
আইজেল আনায়াকে একবার পরখ করে নিয়ে বলল,
“তুমি কি ঠিক আছো? শুনলাম তুমি নাকি খুব অসুস্থ হয়েছিলে… ”
বলতে না বলতেই আইজেলের নজর পড়ল আনায়ার পেটে চেপে রাখা হটব্যাগের দিকে। সে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তোমার পিরিয়ড হয়েছে?”
আনায়া মাথা নাড়াল। আইজেল আবারও বলল,
“এইজন্য ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছো?”

—“হ্যাঁ, কিন্তু ছুটি নেওয়ার ব্যাপারে তোমায় কে বললো?”
আনায়া মনে মনে ভাবছে,সে তো ছুটি বলতে তেমন কোনো অনুমতি নিয়ে আসেনি। অন্যদিকে তার সূচালো প্রশ্নের উত্তরে সাবা বলল,
“না জানার কি আছে, তোর এ খবর পুরো ভার্সিটি জানে।”
এ কথা শুনে আনায়া যেন আরো বেশি হতভম্ব; মাথাটা একপ্রকার ভনভন করতে লাগল।
—“পুরো ভার্সিটি জানে মানে? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
সাবার অভিব্যক্তিতে আইজেল কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে, আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“ওর কথা বাদ দাও। আমি তো প্রায় অনেকক্ষণ তোমার জন্য ক্লাসে অপেক্ষা করছিলাম। তুমি যখন এলে না তখন বেশ চিন্তা হচ্ছিল। পরে ভাবলাম ঠিক আছে, ক্লাস শেষ করে তোমায় খুঁজতে যাবো। কিন্তু তার আগেই একজন অফিস স্টাফ এসে তোমার স্টুডেন্ট নাম্বার জানিয়ে বলল, তুমি নাকি অসুস্থ তাই বাড়ি চলে গিয়েছো।”
আনায়া অবাক হয়ে আইজেলের কথাগুলো শুনল। মনে মনে ভাবল,
“এইকাজটা নিশ্চিত উনিই করেছেন। নয়তো স্টাফ কি করে আমার ব্যাপারে জানলো।”
ততক্ষণে আইজেল আরো বলল,

“এখন কি তুমি সুস্থ? গতমাসেও তো দেখলাম তোমার এই টাইমে অবস্থা খুব একটা ভালো থাকে না। বিষয়টা যখন এতোটা ক্রিটিকাল তবে ভালো ডক্টর দেখিয়ে প্রপার ট্রিটমেন্ট নিচ্ছো না কেনো?”
আনায়া প্রত্যুত্তর করার আগেই পাশ থেকে সাবা বলল,
“আর ট্রিটমেন্ট। আঙ্কেল-আন্টি বোধহয় ওকে পুরো দুনিয়া বেটে খাইয়েছে। তবুও কোনো উন্নতি নেই।”
সাবার ত্যাছড়া কথার ধরনে আইজেল বিচলিত নয়। সে জানে সাবা মেয়েটা এমনই। তবে তার বলা কথাটায় আইজেল ভ্রু-যুগল কুঁচকে শুধালো,
“মানে?”

—“এসব প্রবলেম ওর ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি; নতুন কিছু নয়। প্রতিমাসেই ওর অবস্থা এমন হয় যেন মরতে বসেছে। যতদূর জানি, আঙ্কেল-আন্টি শুরু থেকেই ওর এসব প্রবলেমের জন্য দেশ-বিদেশের নানান ধরনের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু তাতেও তেমন লাভ হয়নি।”
বিষয়টা যেন আইজেলের বোধগম্য হলো। সাবার দিক থেকে নজর ফিরিয়ে আনায়ার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা চোখ-মুখ চুপসে মাথা নুইয়ে বসে আছে। আইজেল বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে, ভারী শ্বাস ফেলে বারান্দার দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। আনায়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“এই অবস্থায় ওতোগুলো কাপড় কেনো ধুতে গিয়েছো? একটু সুস্থ হয়ে নিতে তারপর না হয় এসব…”
আনায়া তার কথা শুনে সাথে সাথে বারান্দার দিকে তাকাল। বারান্দায় তার সকালে পরিহিত সব কাপড়-চোপড় সহ, গত দুদিন ধরে আলসেমিতে ফেলে রাখা সব জামাকাপড়ই সেথায় ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে ঝুলছে। যা দেখে আনায়ার রীতিমতো বেশম খাওয়ার উপক্রম। দু-চোখ বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হতেই, মনে মনে সে আওড়াতে লাগল,
“হায়য় খোদা! আমাকে ঘুম পাড়িয়ে এতোগুলা জামাকাপড় ধুয়ে রেখে গিয়েছেন উনি?”
আনায়ার সুযোগ হলো না আইজেলের প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করার। তার আগেই সাবা বলল,
“এই মেয়ে কোনোদিনও ভালো হবে না। ওর এসব খামখেয়ালী কাজকর্মের জন্যই ওর এই অবস্থা।”
আনায়া সত্যিই তখন তাজ্জব বনে বসে রইল। এবার সবগুলো সুত্রকে ধীরেধীরে মনের অন্তরালে এক করতে লাগল সে। হয়তো সে নিজেই ভুল কিংবা তার সব ধারণা ভুল—রহস্য যেটাই হোক না কেনো এর একটা না একটা সমাধান তো বের করতেই হবে।

রাত বেশ গভীর। ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়ে দুটো ছাড়াতে চলল। অথচ বদ্ধ ঘরে অস্থির-উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠা রমণীর চোখে ঘুম নেই। পরনে কালো হুডি-টাউজার। মাঝরাতে কোথাও একটা যাবার জন্যই তৈরি হয়েছে সে। তবে এখনো সেই কাঙ্খিত সময়টুকু না আসায়, ঘন্টা ধরে ঘরের মধ্যে পায়চারি করে চলেছে আনায়া। পেটের যন্ত্রণা-ব্যাথা সবটাই যেন তার ভাবনার ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে গিয়েছে। সে নিজেকে নিয়ে ভাবছে না। ভাবছে তার এই মোক্ষম পদক্ষেপে সে ঠিক কতটুকু সফল হতে পারবে।
সময়ের সাথে সাথে আনায়া অস্ফুটে বিড়বিড় করে মিলিয়ে যাচ্ছে নানান সব যোগসূত্র কিংবা সমীকরণ,
“না, আমি যেটা সচক্ষে দেখেছি তা হয়তো পুরোপুরি সত্য কিংবা বিভ্রম। হতে পারে সম্পূর্ণ আমার ভুল ধারণা। যদিও একবারের জন্য ভেবে নেই উনার গার্লফ্রেন্ড-জাস্টফ্রেন্ড বলতে সবটাই আছে, উনি ওনার গার্লফ্রেন্ডকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চুমু খেতেও দ্বিধা করেননা, তবুও কেনো আমার জন্য উনি এতোকিছু করছেন? কেনো? বারবার কেনো আমার প্রতি সেই একই দায়িত্ববোধ, কেয়ার কিংবা শাসন করা তার মাঝে ফুটে উঠছে? কেনো? কেনো? স্বার্থ ছাড়া তো জগতের কেউ কিছুই করে না। কিন্তু আমার জন্য এতোকিছু করার পেছনে ওনার কি স্বার্থ?”

—“তাহলে তুই যে আমায় এতো ভালোবাসিস, এতে তোর কি স্বার্থ আছে?”
আচমকা গুরুগম্ভীর কন্ঠে এরূপ প্রশ্ন শুনে আনায়া ধড়ফড়িয়ে চমকে উঠল। পাশে তাকিয়ে দেখল, তার বদ্ধ অন্ধকার ঘরে ক্লজেটের কোণে হেলান দিয়ে, কালো পোশাক পড়ুয়া তার কাল্পনিক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চেহেরাটা কেবল অল্পই স্পষ্ট হয়েছে।
আনায়া বুকে হাত চেপে হাঁপিয়ে বলে উঠল,
“আপনি? এতোরাতে এখানে কিভাবে এলেন?”
—“তোর মাথা থেকে বেরিয়েছি।”

উত্তরটা শুনে আনায়া খুব একটা অবাক হলো না। চোখে-মুখে একই চিন্তারছাপ রেখে বলল,
“এতোদিন পর কেনো এলেন? আগে আসা উচিত ছিল। আপনার রিয়েল ভার্সন আমার জীবন তেজপাতা বানিয়ে দিচ্ছে। কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না আমি।”
কাল্পনিক ভিভিয়ান নির্লিপ্ত একখান ভাবমূর্তি নিয়ে বলল,
“আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিলি না বোধহয়।”
আনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোনটা?”
—“আমাকে উন্মাদের মতো ভালোবাসার পেছনে তোর স্বার্থ কি?”
আনায়া দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিল,
“আপনাকে ভালোবাসার পেছনে আমার একটাই স্বার্থ—আপনাকে আমার চিরকালের জন্য চাই; শুধুমাত্র নিজের করে চাই। চিরকাল আপনার উপর শুধু আমার অধিকার থাকবে, আর কারোর না।”
ভিভিয়ান এক চিলতে মুচকি হাসল। পরক্ষণেই বলল,
“তাহলে ভেবে দেখতে পারিস, হয়তো ও নিজেও এমন কিছুই চাইছে। কিন্তু স্বীকার করছে না।”
আনায়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল,

“ও বলতে, আপনার কথা বলছেন?”
—“হ্যাঁ,ঐ একই তো দুজন।”
—“তা ঠিক, কিন্তু আপনি ঠিক কি বলতে চাচ্ছেন?”
—“এটাই যে, আমি নিজেও হয়তো তোকে ভীষণ ভালোবাসি কিন্তু কোনো এক বিশেষ কারণে আমি চাইছি না আমাদের দূরত্বটুকু মুছে যাক, আমরা চিরকাল এক হয়ে বাঁচি। আই থিংক ইটস সামথিং লাইক দ্যাট।”
কাল্পনিক ভিভিয়ানের অকপটে দেওয়া জবানে, আনায়া জটিল দ্বিধায় ডুবে যায়। মাথাটা নুইয়ে কিছুটা ভেবেচিন্তে বলে,
“ঐ ঘটনার জন্যই কি আপনি চান না আমরা দুজন এক হই, কিংবা আপনার অতিরিক্ত দম্ভ…এমন কিছুই কি এসবের মূল কারণ?”

—“মনে তো হয়না। যদি এমনটা হতো তবে এখন হঠাৎ তোর এতো কেয়ার করা,শাসন করা, অধিকার খাটানো—এসবের প্রসঙ্গ আসতো না।”
আনায়া বিষয়টা আরেকটু গভীর ভাবে বোঝার চেষ্টা করে বলল,
“তারমানে এখানে বড়কোনো জটলা আছে, তাই তো?”
—“উমম…রহস্য রহস্য।”
—“কিন্তু সেটা কি?”
ভিভিয়ান সামান্য হেসে বলল,
“সবটা আমিই বলে দিলে তোর কাজটা কি শুনি? নিজের রাস্তা নিজে খুঁজে নে, আমি চললাম।”
—“আরে কোথায় যাচ্ছেন? শেষবারের মতো তো একটু সাহায্য করে দিন।”
বলতে না বলতেই আনায়ার সম্মূখ হতে কাল্পনিক ভিভিয়ান উধাও হলো। আনায়া আক্রোশে চোখ-মুখ খিঁচে নিল। নিজের মস্তিষ্ক ও কাল্পনিক সেই সত্তাকে একত্রে তাচ্ছিল্য করে বলল,
“একটাও কোনো কাজের না। ছিঃ ডিজগাস্টিং!”
বলতে না বলতেই আনায়া আবারও নিজের মতো ভাবতে শুরু করল। ঘরের ভেতর পায়চারি করতে করতে আওড়াল,

“গতবছর তাকে আমি চিনেছিলাম আমার পাগল প্রেমিক হিসেবে, যে আমার জন্য সবকিছু করতে পারে। অথচ একবছরের ব্যবধানে আমার পুরো ধারণাই ভুল হলো? এটা কি করে সম্ভব? অবশ্যই এখানে কোনো রহস্য আছে। এই প্যাচ রহস্য যাই থাকুক না কেনো, সবকিছু টেনেহিঁচড়ে বের করবো আমি। তারপর দেখি, উনি আমার হাত থেকে কোথায় পালায়!”
আক্রোশে চাপা স্বরে কথাটা বলে দিলেও, আনায়া জানে বিষয়টা এতোটাও সহজ নয়।
সত্যিই কি সব রহস্যের সমাধান করতে পারবে সে? কে জানে? মাথার মধ্যে চিন্তার পোকার দল যেন তাকে একপ্রকার কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তবে আপাতত সে অপেক্ষায় রয়েছে একটি বিশেষ ফোন কলের। মধ্যরাত হোক কিংবা ভোর-রাত; একবার ফোনে সেই বিশেষ কল-টা বেজে উঠলেই সম্ভবত এই নিশুতি রাতের কনকনে ঠান্ডার মাঝে, গোছগাছ করে বাড়ি হতে বের হবে আনায়া।
না! তার এই বিশেষ পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা সম্পর্কে কেউই কিছু জানে না। হোক সে আইজেল কিংবা সাবা। মাথার মধ্যে যে জট পাকিয়েছে সে,তার সব খোলাসা তাকে নিজরেই করতে হবে।
আনায়া দু-হাত একজোর করে, গম্ভীর মেজাজে বিড়বিড় করতে লাগল,
“শুধু একবার কাজ হয়ে গেলে, সব কনফিউশান দূর হয়ে যাবে। শুধু একবার,শুধু একবার সফল হয়ে যাই, তারপর ঐ লোকের জিন্দেগী গরম তেলে ডুবিয়ে ফ্রাই করব আমি। মিথ্যে বলে ভণ্ডামি করা ছাড়িয়ে দেবো ওনার। শুধু একবার, শুধু একবার। কিন্তু কোনোভাবেই ধরা পড়া যাবে না। যা করতে হবে ভেবেচিন্তে, একদম গুছিয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে করতে হবে।”

বলতে না বলতেই আনায়ার নজর পড়ল ক্লোজেটের পানে। আনায়া কি যেন একটা ভেবে আনমনেই মুচকি হাসল। যে হাসির রেশ ধরে রেখেই, সে পা বাড়াল ক্লোজেটের দিকে।
মধ্যরাতে চুপিসারে ক্লোজেট খুলে একঝটকায় সবগুলো কাপড়চোপড় একপাশে সরিয়ে দিল আনায়া। মুহূর্তেই আড়াল হতে ক্লোজেটের বিস্তৃত সাদা দেয়ালে দৃশ্যমান হলো এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য। গতকয়েকদিন ধরে নিজ ক্যামেরায় চুপিসারে তোলা প্রিয় আরাধ্যের পুরুষের একের পর এক ছবি সেই শ্বেতশুভ্র কাঠের দেয়ালে ঝুলছে। একইসাথে দেখা যাচ্ছে লাল-হলদু স্টিকিনোটে লেখা নানান সব পঙক্তি। যেখানে কেবল রমণীর অন্তরালের একটি কথাই জাহির হচ্ছে—ভিকে নামক নির্দয়, ধুরন্দর কিংবা পাষণ্ড পুরুষটা কেবল তার!শুভ্র হার্ডবোর্ডের ঠিক মাঝ বরাবর দৃশ্যমান হয়েছে কেনীথের রকস্টার-রূপের এক গম্ভীর মুখাবয়বের ছবি—যেটা বাদবাকির তুলনায় খানিকটা বড় আকৃতির। এই ছবিটা বেশ কষ্ট করে জোগাড় করেছে সে। এমনিতেও এই লোকের অতিরিক্ত হাই-সিকিউরিটির জন্য, বিশেষ কোনো ছবিই অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায় না।
আর ঠিক এই বিশেষ ছবির উপরেই লাল মার্কার দিয়ে বড় বড় করে লেখা, ‘TOGETHER FOREVER MINE’
তাছাড়া আশেপাশে অসংখ্য ছবির সাথে ছোট্ট ছোট্ট করে লেখা VK, Vampire-Kenneth, Viviana কিংবা পুরুষের আরো সকল নাম-বিশেষ।
আনায়া বুকে দু-হাত গুঁজে আনমনা হয়ে সেসব একনাগাড়ে দেখতে লাগল। গুনগুন করে স্পষ্টত সুমিষ্ট স্বরে গাইতে লাগল,

⠀⠀⠀⠀‘Cross my heart, hope to die
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ my lover, I’d never lie
⠀⠀⠀⠀ said, “Be true”, I swear I’ll try
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ the end, it’s him and I
⠀⠀⠀⠀ out his head, I’m out my mind
⠀⠀⠀⠀ got that love, the crazy kind
⠀⠀⠀⠀⠀⠀am his, and he is mine,
⠀⠀⠀⠀ ⠀the end, it’s him and I’
রমণীর কন্ঠস্বর থেমে গেল। পরক্ষণেই সেই রক্তিমাভ ওষ্ঠকোণে মারাত্মক তীর্যক হাসি ফুটিয়ে তুলল আনায়া। সেই হাসি বিস্তৃত হলো তার বিদ্রুপাত্মক গা দোলানোর তালে। বোর্ডের নানান অংশে লেখা ‘V-Tara’ ‘Kenneth & Aanya’ ‘Mr & Mrs Ehsan’ এরূপ উন্মাদের মতো কার্যকলাপ দেখে আনায়ার নিজেরই যেন ভীষণ মজা লাগছে।
আনায়া বুক হতে হাতদুটো আলগা করে, ক্লোজেটের দুপাশে দু’হাত ঠেকায়; সহসাই খানিকটা ঝুঁকে পড়ল সম্মূখে। কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর, চাপা আক্রোশের সাথে জোড়ালো গলায় বলল,

⠀⠀⠀⠀’যে ভালোবাসায় যন্ত্রণা আর বিচ্ছেদ নেই,
⠀⠀⠀⠀সে আবার কেমন ভালোবাসা? পূর্ণজন্মে বিশ্বাসী
⠀⠀⠀⠀নই আমি, একজনমে আপনাকে চেয়েছি মানে
⠀⠀⠀⠀শত বিচ্ছেদের পরও—আপনি শুধুই আমার!’
আনায়া তাচ্ছিল্য করে নিঃশব্দ হাসিতে একপ্রকার ফেটে পড়ল। মাথার মধ্যে ধুরন্ধর বুদ্ধিগুলো যেন একপ্রকার কিলবিল করছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ফলাফল কি হতে চলেছে, সেসবের পরোয়া না করেই আনায়া তখন খুশিতে আত্মহারা।
খুশির চোটে আচমকা অদ্ভুত ঢঙে বাচ্চাদের ন্যায় একপায়ের উপর ভর করে দাঁড়াল সে; ডান হাতটা হুডিতে গুঁজে, বাম হাতটা মাথার ওপর উঁচিয়ে তুলল। ধীরস্থিরতে গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে অস্ফুটস্বরে বলতে লাগল,
“মাইন! মাইন! ইউ আর জাস্ট ফাকিং মাইন, হানিপাই! ভিভান আমার, ভিভিয়ান আমার, কেনীথ আমার, ভিকে আমার। যতরূপেই দুনিয়ার কাছে ধরা দিন না কেনো, দিনশেষে আপনি শুধু আমার!
আপনি চান বা না চান, আমার ধ্যানে-জ্ঞানে, স্বপ্ন-কল্পনায়, বিচ্ছেদ-যন্ত্রনায়, সবকিছুতেই আমি শুধু আপনাকেই চাই!”

‘তামাল্লি হাবিবি বাশতা-ক….’—আচমকা ফোনটা বেজে উঠতেই আনায়া প্রকৃতিস্থ হলো। দ্রুত পেছনে ফিরে বিছানার উপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিল। উত্তেজনায় আনায়ার হাত-পা একপ্রকার কাঁপছে। সে কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরল,
“কাজ হয়ে গেছে? এখন কি বেরোবো আমি?”
রমণীর উৎকন্ঠা অভিব্যক্তি। জিজ্ঞাসার প্রত্যুত্তরে বিশেষ কোনো এক পুরুষালী কন্ঠস্বর তাকে নানান নির্দেশনা দিতে লাগল। আনায়া তার কথামতো হু-হা করে মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ পরই আশানুরূপ বার্তাতে তার ওষ্ঠকোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। আনায়া আর কথা বাড়াল না। ফোনটা কানে রেখেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত দুইটা দশ বাজে। আগুন্তককে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তাহলে আমি এখন বাড়ি থেকে বেরচ্ছি। তুমি তৈরি থেকো।”

মহামায়া পর্ব ৫৮

যেমন কথা তেমন কাজ। আনায়া আগপাছ কিছু না ভেবেই ফোনটা কেটে দিল। অতঃপর তড়িঘড়ি করে গোছাতে লাগল কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। নিজের কালো ব্যাকপ্যাকটায় সাদা ম্যাকবুক তথা ল্যাপটপটা তুলে নিল। একইসাথে নিজের ফোন ও কিছু প্রয়োজনীয় ছোটখাটো ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জাম।
পরনারীর সাথে পুরুষের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের পর আনায়া যে দুর্ধর্ষ নীরবতা পালন করছিল, তা একপ্রকার জগতের সকলের কাছে ছলনা সরূপই। মূলত মুখাবয়ব তার গম্ভীর বিষন্নতায় ডুবে রইলেও, এইসব পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার ব্যবস্থা সে পূর্বেই একটু একটু করে গুছিয়ে রেখেছিল। আপাতত সবটাকে একত্রিত করে পরিকল্পনাকে সফল করার পালা!

মহামায়া পর্ব ৬০