মহামায়া পর্ব ৬০
তুশকন্যা
পিঠে ব্যাকপ্যাকটা ঝুলিয়ে,কালো হুডির টুপিটা দিয়ে মাথাটা ঢেকে নিল আনায়া। অতঃপর আলগোছে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। আইজেল কিংবা সাবা—কেউই তার মাঝরাতের প্রস্থানের ব্যাপারে কুক্ষণেও কিছু টের পেল না।
বাহিরে ঝিরিঝিরি তুষার ঝড়ছে; চারপাশে শুনশান নীরাবতা, নিকষিত অন্ধকারে ঘেরা। অথচ মনের মধ্যে কোনো ভয়ডর না রেখেই, আনায়া একপ্রকার হেলে-দুলে নাচতে নাচতে রাস্তা ধরে এগোতে লাগল। গুনগুন করে গাইতে থাকল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀বিমার ম্যেরা দিল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀ত্যেরা জিনা হুয়া মুশকিল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀কারু কেয়া হায়য়য় রে!
গানের প্রতিটি শব্দের অর্থই যেন, তার চলতি জীবনদশার বাস্তবিক সারমর্ম। এরিমধ্যে হঠাৎ আনায়া উচ্ছল কন্ঠস্বর ও ছটফটে পা-জোড়া থেমে গেল। আচমকা তার বাড়ি এবং অতিক্রান্ত রাস্তাটুকু পেরিয়ে সামনে থেকে একটা গাড়ি এসে নিঃশব্দে রাস্তার একপাশে দাঁড়াল। রাস্তার দু’ধারের ল্যাম্পপোস্ট এবং সেই কালো গাড়ির হেডলাইটের আলো ব্যতীত এই আঁধারের আশেপাশে তেমন কোনো আলোকের উৎস্য নেই।
আনায়া কালো গাড়িটি দেখে যে খুব একটা বিচলিত হলো কিংবা ভয় পেল—ব্যাপারটা তা নয়। বরং অচিরেই তার ওষ্ঠকোণে এক চিলতে শুষ্ক হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও গান ধরল; সেই কালো গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল, পূর্বের ন্যায় একই ভঙ্গিমায় হেলে-দুলে হাত-পা ছুঁড়ে লাফাতে-লাফাতে গাইল,
⠀⠀আই ডোন্ট নিড নো-বাডি
⠀⠀এন্ড আই ডোন্ট ফিয়ার নো-বাডি
⠀⠀আই ডোন্ট কল নোবাডি বাট ইউ
⠀⠀মাই ওয়ান এন্ড অনলি!
⠀⠀⠀⠀⠀তামাল্লি হাবিবি বাশতা-ক
⠀⠀⠀⠀⠀তামাল্লি আনায়া তেন্দাহালাক
⠀⠀⠀⠀⠀ওয়া লাউ হাওয়ালেয়া কুল এল কুন
⠀⠀⠀⠀⠀বাকুন ইয়া হাবিবি মেহতাজলাক…
গাড়ির কাছে পোঁছেই রমণীর সুমিষ্ঠ কন্ঠস্বর থামল। সে গাড়ির জানালার কাঁচে হাত দিয়ে টোকা দিতেই, গ্লাসটা নিচে নামল। কালো ড্রেসআপে আড়ষ্ট আনায়া মুচকি হেসে, গাড়ির ভেতরের সেই নিকষিত অবয়বকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“হ্যালো ব্রাদার!”
মুহূর্তেই সেই যুবকের কালো অবয়বটি গম্ভীর নিরেট জার্মান সুরে প্রত্যুত্তর করল,
“এতো দেরি করে মানুষ? হাতে সময় কম। দ্রুত গাড়িতে ওঠো।”
কথামতো আনায়া নূন্যতম বিলম্ব না করে ঝটপট গাড়িতে চড়ে বসল। পাশে বসে থাকা ছায়ামানবও তখন গাড়িটা স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
“যা যা বলেছিলাম সব এনেছো তো?”
আনায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়াল,
“হু,হু।”
—“তাহলে চলো এবার।”
আনায়া তার কথার সাথে সুর মিলিয়ে, চাপা উত্তেজনা নিয়ে নিজের চটপটে ভাবনায় কুটিল হাসল। হাত উঁচিয়ে উৎসুক উৎকন্ঠায় অস্ফুটে বিড়বিড় করল,
‘খেলা হবেএএ। সবকিছু ব্লা’স্ট করব আজ; বিকজ আই’ম হিজ চেরি ব্লাস্ট!’
ঝিরিঝিরি তুষারপাত আর নিকষিত অন্ধকারের সীমানা ছাড়িয়ে কালো গাড়িটি এসে থামল একটি বেশ পুরোনো ধাঁচের, আভিজাত্যপূর্ণ জার্মান স্থাপত্যের বিশাল প্রাসাদসম বাড়ির সামনে। কালচে কাঠ,সোনালী ধাতব আর আধুনিকতার ছোঁয়ার সাথে ভিন্টেজ কারুকাজের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ছড়িয়ে রয়েছে পুরো বাড়িটিজুড়ে। স্তব্ধ নীরবতাকে খানিকটা কাঁপিয়ে দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিনটা বন্ধ হলো।
কালো হুডি পরা যুবকটি আগেভাগে গাড়ি থেকে নেমে পা বাড়াল বাড়ির পেছনের অংশের দিকে। ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরে, হালকা বিস্ময় নিয়ে চারপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে তার পিছু পিছু চলতে লাগল আনায়া। হাঁটতে হাঁটতেই খানিকটা মুগ্ধ গলায় বলে উঠল,
“ব্রো, তোমার বাড়িটা কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দর!”
কথাটা শুনে যুবকটি থমকে দাঁড়াল। পেছনে ঘুরে আনায়ার দিকে তাকাতেই নিজের মাথা থেকে হুডির টুপিটা নামিয়ে নিল সে। মুহূর্তেই আবছা আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল তার অবয়ব—সোনালী এলোমেলো চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, আর মুখাবয়বে জমানো চিন্তার ভাঁজ ঠেলে উঁকি দিল একটুকরো অমায়িক মুচকি হাসি। জেইন মৃদু হেসে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ, মিস প্রিটি গার্ল। চলো এবার, ভেতরে যাওয়া যাক।”
আনায়া কোনো কথা না বাড়িয়ে জেইনের সাথে পা মেলাল। জেইন বাড়ির পেছনের গ্যারেজ সদৃশ জায়গায় থাকা এক ভারী মেটালিক শাটার আলতো চাবির ছোঁয়ায় খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। সাথে সাথে আনায়াও সেই নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জেইন ক্ষিপ্র হাতে ভেতর থেকে শাটারটা আটকে দিয়ে দেওয়ালে রাখা সুইচে চাপ দিতেই চারপাশের গাঢ় নীল রঙের ডিম-লাইটগুলো জ্বলে উঠল। প্রথম দর্শনে জায়গাটিকে একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা সাধারণ একটি স্টোররুম বলেই মনে হলো আনায়ার।
আনায়া কৌতুহলবশত কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জেইন আড়চোখে তাকিয়ে হালকা স্বরে বলল,
“এটা আসল জায়গা নয়, আমাদের আরও কিছুটা ভেতরে যেতে হবে।”
আনায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে তার পিছু পিছু এগোতে থাকল। সরু একটা কনক্রিটের প্যাসেজ পেরিয়ে কিছুদূর এগোতেই জেইন তাকে নিয়ে এসে দাঁড় করাল একটি নিরেট কাঠের ওয়াক-ইন ওয়ালের সামনে। সেই কাঠের দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে টাঙানো রয়েছে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশাল এক প্রতিকৃতি।
আনায়া ভ্রু উঁচিয়ে জেইনের দিকে তাকাতেই জেইন শুষ্ক হেসে মাথা নাড়ল। সে ছবির খুব কাছাকাছি মুখ এগিয়ে নিয়ে গেল।
আইনস্টাইনের প্রতিকৃতির দুটো চোখের জায়গায় বসানো রয়েছে সূক্ষ্ম আইরিস স্ক্যানার। জেইন তার চোখের দৃষ্টি সেখানে স্থির করতেই একটি ক্ষীণ ‘বিক’ শব্দ হলো এবং সাথে সাথেই দেয়ালের মেকানিজম আনলক হয়ে গেল। জেইন আলতো হাতে কাঠের দেওয়ালে ধাক্কা দিতেই, তা একটি গোপন দরজার আকৃতির মতো ভেতর হতে সরে গেল। আর ভেতরের অন্ধকারের মাঝেই দৃশ্যমান হলো নিচের দিকে নেমে যাওয়া এক আঁকাবাঁকা স্পাইরাল সিঁড়ি।
আনায়া ঘোর লাগা চোখে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। জেইন তার দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“ভয় পেও না, নিচে চলো।”
আনায়া বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে না পেরে বলে উঠল,
“এটা কি পুরোটাই মাটির নিচে?”
”পুরোটা নয়, কিছুটা। আসলে বাড়ির মূল ভিন্টেজ আর্কিটেকচার বজায় রেখে ডিজাইনটাই এমন ক্রিয়েটিভভাবে করা হয়েছিল”—জেইন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে জবাব দিল।
আনায়াও নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। কিন্তু দুজনে সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখা মাত্রই পেছন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ভারী কাঠের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত কৃত্রিম পরিবেশ। আধো-অন্ধকার বেসমেন্টে জ্বলছে হাই-টেক আরজিবি স্ট্রিপ লাইটের লাল ও নীল রঙের আভা। সামনের দৃশ্য দেখে আনায়ার বিস্ময়াবিষ্ট চোখ দুটো আরও বড় বড় হয়ে গেল। তার ভাবনা অনুযায়ী এটি সাধারণ কোনো বেসমেন্ট নয়,বরং এট একটি আধুনিক প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য সাইবার-সিকিউরিটি কাস্টম ল্যাব!
বিস্ময় সামলাতে না পেরে আনায়া জিজ্ঞেস করে বসল,
“এই বয়সে এমন একটা সেটআপ তুমি বানালে কীভাবে? তোমার বয়সও কম, আবার বাড়িটাও বেশ বড়, ভিন্টেজ সাথে লাক্সারিয়াসও। তোমার বাবা-মা কি এসবের ব্যাপারে সত্যিই কিছু জানেন না? ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত না!”
জেইন হালকা হেসে উত্তর দিল,
“না, সত্যি বলতে আমার ড্যাড বা মম এর কিছুই জানেন না।”
—“সত্যি? কিন্তু কীভাবে সম্ভব? তুমি তো বলেছিলে তুমি তোমার ফ্যামিলির সাথেই থাকো! তাহলে তারা কি এই বাড়িতে থাকেন না? আর তুমি যে এত রাতে আমায় এখানে নিয়ে এলে, তারা টের পাননি? যদি বুঝে যান…”
—“উফ, বড্ড বেশি চিন্তা করো তুমি!”
জেইন আলতো করে হেসে বলল,
“মম-ড্যাড গতকাল জরুরি কাজে বার্লিনে গিয়েছেন বলেই তো আজ তোমাকে এখানে অনায়াসে নিয়ে আসতে পেরেছি। তবে হ্যাঁ, আমার এই সিক্রেট ল্যাবে আমি যখন খুশি তখন আসতে পারি। কারণ এখানে আসার দ্বিতীয় রুটটা আমার রুমের অ্যাটাচড বাথরুমের প্রোপার্টি লাইনের সাথে কানেক্ট করা। তবে মেইন এন্ট্রান্স দিয়ে আনার চেয়ে আমার মনে হলো তোমাকে এই সিক্রেট প্যাসেজ দিয়ে আনাটাই বেশি সেফ হবে।”
আনায়া মন দিয়ে জেইনের কথা শুনছিল। একটু ভেবে নিয়ে আবারও জানতে চাইল,
“ও আচ্ছা! কিন্তু এটা তো বললে না যে, পরিবারের অজান্তে এত বড় হাই-টেক ল্যাব কীভাবে বানালে তুমি? বাড়িটা তো বেশ পুরোনো আমলের মনে হচ্ছে, এটা কি তোমাদের পৈতৃক ভিটে?”
জেইন আনায়ার এই চঞ্চল কৌতুহল দেখে হালকা করে শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
“বাড়িটা মূলত আমার দাদুর তৈরি। আমি যখন খুব ছোট, তখন তিনি মারা যান। ট্রাস্ট মি, মাই গ্র্যান্ডফাদার ওয়াজ অ্যান অ্যাবসোলুট জিনিয়াস! যদিও জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানান তীব্র অসুস্থতার কারণে তাঁর মানসিক কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু ওনার প্রিয় নাতি হিসেবে আমার সাথে বন্ডিংটা ছিল খুব গভীর।
মম-ড্যাড এই বেসমেন্ট ল্যাবের ব্যাপারে কিছুই জানেন না কারণ এটা দাদুর নিজের হাতে গড়া একটা সিক্রেট প্লেস; যা তিনি আজীবন সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে দাদু আমাকে অনেকগুলো খামখেয়ালি ধাঁধা আর জিনিসপত্র দিয়েছিলেন। তখন সেগুলোকে খেলার সামগ্রী ভেবে এড়িয়ে গেলেও, কৈশোরে পা দিয়ে তার ফেলে যাওয়া একটা ম্যানুয়াল ম্যাপ আর সি-কোডিংয়ের নোটবুক আমার ভেতরের সকল সুপ্ত কৌতুহলকে উস্কে দেয়। তারপর থেকে একে একে সব ক্লু মেলাতে মেলাতে এই বিশাল বাড়ির নিচে আমি এই স্থানটার সন্ধান পাই। দাদুর মতো আমিও চেষ্টা করেছি এটাকে গোপন রাখতে, তাই মম-ড্যাড এখনও ভাবেন, আমি দরজা-জানালা বন্ধ করে রুমে বসে সারাদিন হয়তো টেক্সটবুক নিয়ে পড়ে আছি!
ওহ হ্যাঁ, আমি যে রুমে থাকি ওটাও কিন্তু একসময় আমার দাদুরই রুম ছিল। তার মৃত্যুর পর অনেক বছর সেটা বন্ধ পড়ে ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে রহস্যের সমাধান খুঁজতে আমি ঐ রুমে শিফট হয়ে যাই। আজ যদি সুযোগ হয়, তবে আমি তোমাকে আমার রুমটাও দেখিয়ে নিয়ে আসবো।”
আনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল,
“আরেহ বাহ, বেশ ইন্টারেস্টিং তো! সেদিন যদি ভুল করেও হ্যাকিং আর কাস্টম নেটওয়ার্কিং নিয়ে তোমার সাথে কথা না হতো, তবে তো জানতেই পারতাম না—এমন শান্ত-শিষ্ট চশমিশ একটা ভদ্রছেলের আড়ালে এত বড় একটা মাস্টারমাইন্ড লুকিয়ে আছে!”
জেইন ক্ষীণ হাসল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“মাস্টারমাইন্ড তো আমার তোমাকে মনে হচ্ছে। আমিও ভাবিনি, স্বাভাবিক একটা টপিককেও তোমার মতো মেয়ে হঠাৎ এতোটা কৌতুহল নিয়ে ঘেঁটে দেখবে। ওদিন আমাকে ওভাবে জেরা না করলে, আমি এসব তোমাকে বলতাম নাকি?”
আনায়া থমথমে মুখ নিয়ে চুপ রইল। মেয়েটার মুখাবয়ব হঠাৎ থমকে যেতেই, জেইন অপ্রস্তুত হয়ে মৃদু হেসে বলার চেষ্টা করল,
“আসলে, তুমি সেদিন হঠাৎ আগ্রহ নিয়ে জানতে চেয়েছিলে বলেই আমি তোমাকে এটার ব্যাপারে বলেছি। নতুবা সত্যিই অন্য কাউকে এই ল্যাবের কথা জানানোর কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।”
”হাহ! তুমি নিজেও জানো না তুমি আমার কত বড় উপকার করে দিচ্ছো।”
আনায়ার গলায় হালকা স্বস্তির ছাপ। রমণীর কন্ঠস্বর স্বাভাবিক হতেই জেইন ভারী শ্বাস ফেলল। এরিমধ্যে আনায়া আবারও কৌতুহল নিয়ে তাকে প্রশ্ন করল,
“আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
—“হু,বলো।”
—“আমি যতদূর জানি,তুমি নাকি একাই। মানে তোমার ভাইবোন নেই। তাহলে কেবল যে বললে, তুমি নাকি তোমার দাদুর সবচেয়ে প্রিয় নাতী ছিলে। তার মানে কি তোমার আরো ভাই-বোন আছে?”
জেইন তার এহেন প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। পরক্ষনেই ভাবল, মেয়েটা এমনই। সবকিছু হুটহাট জিজ্ঞেস করে ফেলতেও খুব একটা ভাবে না। বিষয়টাকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েই, জেইন বলল,
“আ…হ্যা, আমি ছাড়া আরো দুজন ভাইবোন আছে আমার।”
—“তোমার নিজের?”
জেইন আলতো করে মাথা নেড়ে বলল,
“নোপ, স্টেপ-সিবলিংস্!”
আনায়া কিঞ্চিৎ থতমত খেল। আশপাশ দেখতে দেখতে কি ছেড়ে কি প্রশ্ন করছিল, তা হয়তো খেয়ালেও নেই। সে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“আ…সরি,সরি, আমি হয়তো তোমায় অন্যকিছু জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম। তারপর কি রেখে যেন…”
—“ইট’স ওকে, আনা! এসব দেশে এগুলো নরমাল। ড্যাডের সাথে তার প্রথম পক্ষের ছেলে-মেয়ে মানে… আমার ঐ ভাইবোনদের তেমন যোগাযোগ নেই। মানে ওরাই রাখেনা। আর ওদের কালচার, লাইফস্টাইলও আমাদের থেকে অনেকটা ভিন্ন।”
জেইন সংক্ষেপেই বিষয়টাকে সমাপ্ত করল। অন্যদিকে হঠাৎ তাকে ‘আনা’ সম্মধনে আনায়া শুষ্ক হাসল। ফরেনারদের নাম উচ্চারণে বেচারাগুলোর কি হালটাই না হয়ে যায়!
জেইন এবার একটু গম্ভীর্য নিয়ে নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিল। চোখ দুটো সরু করে আনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব নিয়ে পরে কখনো বলব। আপাতত…সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আসল কথাটা তো বললে না! তুমি মূলত কার অ্যাকাউন্ট হ্যা:ক করতে চাইছ? খুব বিশেষ কেউ? নাকি অন্য কিছু?”
আনায়া হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তোতলে উঠে নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“না… মানে, তেমন বিশেষ কেউ নয়। তবে ধরে নাও, অনেকখানি তাই! লোকটা আমার চরম শ”ত্রু। আজ যদি আমাদের মিশন ওয়ান সাকসেসফুল হয়ে যায়, তবে বুঝে নাও—আমি জীবনযুদ্ধে চার ধাপ এগিয়ে গেলাম!”
আনায়া কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। জেইন বিষয়টাকে খুব একটা গুরুতর না ভেবে সামান্য হেসে বলল,
“তোমাকে আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম, কিন্তু তুমি দেখছি আমার ধারণার চেয়েও বেশ অদ্ভুত! সত্যি বলতে, তোমার বেশিরভাগ কথাই আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারি না। তার জন্য অবশ্য সরি!”
আনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল,
“দোষটা তোমার নয় জেইন, দোষটা আমারই। আমি নিজেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না আমি কী বলি আর কী চাই!”
কথোপকথনের মাঝেই জেইন তার সিক্রেট ল্যাবের মূল কন্ট্রোল ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল এবং সিস্টেমগুলো একে একে অন করতে শুরু করল।
কন্ট্রোল রুম বা কাস্টম ল্যাবটির ভেতরের আবহ সাধারণ আধুনিক ঘরের চেয়ে বেশ খানিকটা ভিন্ন। মাঝখানের বিশাল রাউন্ড ডেস্কে সাজানো রয়েছে পরপর তিনটি আল্ট্রা-ওয়াইড কার্ভড মনিটর। সিস্টেম চালুর সাথে সাথেই স্ক্রিনগুলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল লিনাক্স টার্মিনাল উইন্ডো; যেখানে সবুজ আর নীল রঙের হাজার হাজার কোডের লাইন অনবরত স্ক্রল করে যাচ্ছে।
ডেস্কের একপাশে লিকুইড-কুলিং সিস্টেমের একটি বিশালাকার কাস্টম সি-পি-ইউ; যেথায় কাচের আবরণের ভেতর দিয়ে নীল রঙের ট্রান্সপারেন্ট কুল্যান্ট প্রবাহিত হওয়ার দৃশ্য স্পষ্টত। তার চারপাশে সাজানো একাধিক হাই-রেসপন্স মেকানিক্যাল কিবোর্ড, কিছু কাস্টমাইজড থ্রিডি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, পোর্টেবল সিগন্যাল জ্যামার এবং হাই-গেইন ফ্রিকোয়েন্সি এন্টেনা। ঘরের এক কোণে মিনি সার্ভার র্যাকটি থেকে ক্রমাগত এক ধরনের গম্ভীর ইলেকট্রনিক শব্দ সরূপ গুঞ্জন ভেসে আসছে; যা জানান দিচ্ছে তাদের প্রাইভেট নেটওয়ার্ক গেটওয়ে এখন পুরোপুরি সক্রিয়।
জেইন মূল চেয়ারে বসে চটপট কিবোর্ডে কয়েকটি কম্যান্ড ইনপুট করল। মুহূর্তেই স্ক্রিনে একঝলক নেটওয়ার্ক ডায়াগনস্টিক তথ্য ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল।
জেইন এবার আনায়ার দিকে ফিরে পাশের রিভলভিং চেয়ারটি দেখিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“নাও, এবার শুরু করা যাক!”
আনায়া আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে জেইনের পাশে রাখা চেয়ারটিতে এসে বসল। জেইন মূল মনিটরের একটি ব্ল্যাঙ্ক ড্যাশবোর্ড আনায়াকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“তো বলো, তোমায় যা যা আনতে বলেছিলাম, এনেছো তো?”
আনায়া মাথা নাড়াল। জেইন আবারও বলল,
“তাহলে এবার টার্গেটের প্রাথমিক আইডেন্টিটি বা ইউজারনেমটা দাও? আমাদের প্রথম কাজ হলো প্রাইভেট এআই প্রোটোকল ব্যবহার করে টার্গেট ডিভাইসের এনক্রিপ্টেড পোর্টে এক্সেস নেওয়ার চেষ্টা করা।”
আনায়া ব্যাকপ্যাকের পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। চাপা উত্তেজনায় হাত দুটো তার সামান্য কাঁপছে। ফোনের স্ক্রিনে রাখা একটি নির্দিষ্ট নাম্বার বের করে সে জেইনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জেইন চশমাটা নাকের ওপর আর একটু ঠেলে দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সোশ্যাল প্রোফাইল কিংবা পাসওয়ার্ড প্যানেলের আশা করলেও, সেখানে শুধুই একটি আন্তর্জাতিক জার্মান মোবাইল নম্বর ভাসছে— +49 143 XXX XXX।
জেইন কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে আনায়ার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ব্যাস? এতটুকুই?”
আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“সরি, কিন্তু এরচেয়ে বেশি কিছু আমার কাছে নেই।”
জেইন ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, ব্যাপারটা আমি দেখছি। কিন্তু, তুমি কিন্তু এখনো আমাকে সবটা খুলে বলোনি। তুমি মূলত কি ধরনের মানুষের একাউন্ট হ্যাক করতে চাইছ, কিন্তু কিংবা উদ্দেশ্য…। এভাবে সবটা লুকাতে চাইলে, আমার নিজেরই কিন্তু কাজ করতে অসুবিধা হবে। আশা করি তুমি বুঝতে পারছো, আমি তোমায় কি বলছি?”
আনায়া ইতস্তত করে বলল,
“ব্যাপারটা লুকানো নয়,আসলে আমার বেশিকিছুর প্রয়োজন নেই। ঐ লোকটার কললিস্ট সহ আরো কিছু খুটিনাটি বিষয় আমায় দেখতে হবে। ব্যাস এইটুকুই!
আর…আর একটা সমস্যা হলো, উনি একটু হাই প্রোফাইল পারসন। তার প্রাইভেট সিকিউরিটি টিমও থাকতে পারে। আর হয়তো তারা অনেক বেশি স্ট্রংও। তো এটা তোমায় খেয়ালে রেখেই বাকিটা করতে হবে।”
—“লোকটা কি জার্মান?”
—“হু, জার্মান হিটলার উনি। সেলিব্রিটি টাইপের মানুষও বটে।”
জেইন শুষ্ক হাসল। ভাবতেও অদ্ভুত লাগছে, আনায়ার মতো মেয়েরও নাকি কোনো ম’হাশ’ত্রু থাকতে পারে;যাকে সে সরাসরি জার্মান হি’টলা’র বলে সম্মোধন করতেও দ্বিধা করছে না।
জেইন রমণীর কথা শোনার তালে কিছু কাজ এগিয়ে রাখল। অস্ফুটে বিড়বিড় করতে লাগল,
“শুধু একটা ফোন নম্বর দিয়ে… এতোকিছু… তার উপর লোকটাও নাকি হাই প্রোফাইল পারসন, দেখি কি হয়।”
আনায়ার কি যেন মনে পড়তেই হঠাৎ বলে উঠল,
“ওহ হ্যা, আরেকটা কথা। এই নাম্বারটা কিন্তু ওনার খুব ব্যক্তিগত নাম্বার সম্ভবত। একটু ঝামেলা করেই জোগাড় করতে হয়েছে। তাই আমার মনে হয়না, শুধু ফোন নাম্বার দিয়ে বিষয়টাকে হ্যান্ডেল করা তোমার জন্য খুব একটা অসম্ভব কিছু হবে না। তোমার উপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে।”
আনায়ার প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে কথাটা বলল; জেইন শুষ্ক হাসল,
“এখনো ঠিক করে কিছু বলতে পারছি না। তুমি যেভাবে আমার প্রতি বিশ্বাস রেখেছো, এমন বিশ্বাস সম্ভবত আমি নিজেও কখনো নিজের প্রতি রাখিনা।”
আনায়া হঠাৎ চিন্তায় শুকনো ঢোক গিলে ব্যাকপ্যাকের স্ট্র্যাপটা শক্ত করে চেপে ধরল। অপ্রস্তুত গলায় বলতে লাগল,
“সরি, তোমার কথামতো অতোকিছু তো জোগাড় করতে পারিনি। তবে অনুরোধ করব, তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো। আমার কাছে মূলত এতটুকুই আছে জেইন।আর তুমি না বললে, তোমার সিস্টেম দিয়ে যেকোনো এনক্রিপ্টেড পোর্টে এক্সেস নেওয়া সম্ভব? একটা ফোন নম্বর কি আইপি আর ডিভাইস ডিটেক্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়?”
জেইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনিটরের দিকে মুখ ফেরাল। তার আঙুলগুলো দ্রুত কিবোর্ডের ওপর চলতে শুরু করেছে।কিবোর্ডের ক্লিক-ক্ল্যাক শব্দে পুরো নিস্তব্ধ ল্যাবটা মুখরিত হয়ে উঠল।জেইন চাপা গম্ভীর্যের সাথে বলল,
”হ্যাঁ, যথেষ্ট, তবে কাজটা হাজার গুণ কঠিন!”
জেইন টাইপ করতে করতেই জবাব দিল,
“যদি সাধারণ কোনো মানুষ হতো, তবে আইএমএসআই ক্যাচার বা এসএসসেভেন প্রোটোকল বাইপাস করে দু- মিনিটে তার ফোন ইন্টারসেপ্ট করে ফেলা যেত। কিন্তু এখন তো দেখছি, এই নম্বরটি কোনো এনক্রিপ্টেড প্রাইভেট নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। ওটার নিজস্ব ফায়ারওয়াল আছে।”
জেইনের কথার শুনে আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সমস্ত মনোযোগ একত্রিত করে, সেখানে স্ক্রোল হতে থাকা কমান্ডের লাইনগুলো দেখে সে আনমনেই বলে উঠল,
“তুমি কি Nmap দিয়ে পোর্ট স্ক্যানিং করার পর জিরো-ডে এক্সপ্লয়েট রান করানোর চেষ্টা করছ?”
জেইন টাইপিং থামিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে আনায়ার দিকে তাকাল। তার নীলচে চোখে বিস্ময়ের ছাপ।
“হোয়াট? তুমি এনম্যাপ আর জিরো-ডে এক্সপ্লয়েটের নাম জানো? তুমি তো জাস্ট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্ট? নেটওয়ার্কিং আর এথিক্যাল হ্যাকিং নিয়ে তোমার এই এক্সপেরিয়েন্স বা নলেজ এল কোথা থেকে?”
আনায়া মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। Nmap হলো এমন এক ধরণের স্ক্যানার টুল, যা দিয়ে ডিভাইসের কোন কোন ডিজিটাল ব্যাকডোর বা সিকিউরিটি পোর্ট খোলা আছে তা পরীক্ষা করা হয়। আর জিরো-ডে এক্সপ্লয়েট হলো সিস্টেমের প্রস্তুতকারকদের অগোচরে থাকা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভেতরে ঢোকার এক বিশেষ গোপন কোড। অর্থাৎ, আনায়া জেইনকে শুধু এটাই জিজ্ঞেস করেছে যে—সে কি প্রথমে সিকিউরিটি ফায়ারওয়ালের কোন পথটা দূর্বল বা অরক্ষিত আছে তা খুঁজে বের করছে? আর এখন সেই গোপন পথ দিয়ে সরাসরি ভেতরে ঢোকার জন্য বিশেষ কোনো ডিজিটাল চাবি ব্যবহার করছে কি না!
আনায়া নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য হালকা কেশে উঠল। অতঃপর এক চিলতে শুষ্ক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আসলে…এসবের ব্যাপারে ঐ টুকটাক কিছু কিছু জিনিস আমিও জানি। না মানে, দেশে থাকতে আমার এক বন্ধু ছিল, রনক। ও এসব কোডিং আর সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকত। কিন্তু ব্যাপারটা তোমার মতোই; ওর এসব কাজকর্মের সম্পর্কে কেউ কিছু জানতো না। কিন্তু রনক-সায়েম দু’জনেই আমাকে খুব বিশ্বাস করতো। যার ফলে ওদের ভালো-মন্দ সব কাজেই আমি থাকতাম। মাঝেমধ্যে রনক যখন এসব নিয়ে কাজ করত, আমি চুপিচুপি ওর পাশে বসে এসব বোঝার চেষ্টা করতাম। কখনও বা জাস্ট কৌতূহল থেকে ওকে ছোটখাটো হেল্পও করতাম। সেই থেকেই টুকটাক জানা আর কি!”
জেইন আনায়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। আনায়ার এই অতি-কৌতূহল আর লুকোচুরির মাঝে কিছু একটা অস্বাভাবিকতা আছে, তা জেইনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে এড়ালো না। সে ঠোঁটের কোণে একটি সন্দেহজনক কিন্তু রহস্যময় মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। তবে আর কথা না বাড়িয়ে বলল,
“আই সি! আমার এখন সত্যি সত্যি তোমাকে নিয়ে টেনশন হচ্ছে।”
আনায়া হকচকিয়ে উঠল,
“মানে? আমাকে নিয়ে টেনশন? কিন্তু কেনো?”
জেইন তার মুখাবয়বের দিকে কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থাকার পর, হতাশাজনক সুরে বলল,
“আসলেই খুব অদ্ভুত তুমি। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে খুব সিম্পল একটা মেয়ে ভেবেছিলাম। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, আমার ধারণা ততটাই ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।”
আনায়া চোখ পিটপিট করে,মনে মনে বোঝার চেষ্টা করল,
“কই আমি তো এখনো তেমন কিছু করিনি। এই ছেলের চোখে আবার কি ধরা পড়ল কে জানে! বারবার এমনভাবে সন্দেহের চোখের কথা বলছে যেন আমি কি না কি!”
ততক্ষণে জেইনের কন্ঠস্বরে আনায়ার ধ্যান ভাঙল,
“তো দেখা যাক, তোমার বন্ধুর শেখানো ট্রিকস আর আমার এই বেসমেন্ট ল্যাব মিলে কতদূর যেতে পারে।”
জেইন আবার কাজে মন দিল। ল্যাবের মাঝখানের বড় স্ক্রিনে একটা বিশাল নেটওয়ার্ক নোড ম্যাপ খুলে গেল। আনায়া খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব দেখতে লাগল। জেইন টার্মিনালে দ্রুত কমান্ড ইনপুট করতে শুরু করল,
[+] Target Identifier: +49 143 XXX XXX
[+] Launching SS7 Signaling Intercept…
[!] Security Gateway Detected: Enterprise Defense AI (Active)
[+] Injecting Custom Payload via Port 443…
জেইন ডাবল মনিটরের একপাশে কাস্টম পাইথন স্ক্রিপ্ট রান করাল। একইসাথে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আনা, শোনো। টার্গেটের ফোনে সরসরি ঢোকার বদলে আমরা লোকটার ফোন অপারেটরের লোকাল টাওয়ারের ওপর একটা ভুয়া বেস স্টেশন বা মেকি সেল-টাওয়ার তৈরি করছি। এতে ওনার ফোনের সব ইনকামিং আর আউটগোয়িং ডেটা প্যাকেট আমাদের এই সিস্টেমের ভেতর দিয়ে পাস হতে বাধ্য হবে।”
আনায়া একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার এনক্রিপ্টেড ডেটা স্ট্রিম আসছে,একইসাথে তার বুক ধকধক করছে। কিন্তু মাঝপথেই একটি লাল ফায়ারওয়াল সেগুলোকে ব্লক করে দিচ্ছে।
”হচ্ছে না জেইন! ওরা প্যাক গ্র্যাবিং আটকে দিচ্ছে তো!”
আনায়া কিছুটা উত্তেজনার বশে বিকারগ্রস্তের মতো বলে উঠল,
”রিল্যাক্স! ওরা ডিফেন্স সিস্টেম অন করেছে!যদিও তোমার কথা শুনে যতটুকু ধারণা করেছিলাম, তার চেয়েও বহুগুণে বেশি স্ট্রং সিকিউরিটি প্যানেল মনে হচ্ছে এদের।”
জেইনের কথায় আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ঐ লোকের কোনো ভরসা নেই। বউ বলে তো মানেই না, এখন যদি এসব করতে গিয়ে ধরা পরি—তাহলে সোজা পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে বউকে জেলের ভাত খাওয়াতেও দ্বিধা করবে না, হিটলারটা!”
পরক্ষণেই আবার আতঙ্কিত রমণী ভাবতে লাগল,
“আমি ফেঁসে গেলে সমস্যা নেই, কিন্তু আমার জন্য জেইনকে জেল খাটতে হোক, এটা তো আমি কুক্ষণেও চাইনা।”
ওদিকে জেইনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। সে দ্রুত হাতে অন্য একটি মেকানিক্যাল কিবোর্ড টেনে নিয়ে বলল,
“আমাদের ডিকয় ট্রাফিক পাঠাতে হবে। মানে হাজার হাজার ভুয়া হ্যাকিং রিকোয়েস্ট এক সাথে পাঠাব, যাতে ওখানকার ফায়ারওয়াল বিজি হয়ে যায়। আর সেই ফাঁকে আমরা ব্যাকডোর দিয়ে ওনার আইক্লাউড আর প্রাইভেট মেসেজ ডাটাবেজে ঢুকে পড়ব।”
ঘরের কোণে থাকা সার্ভার র্যাকটি থেকে এবার উচ্চশব্দে ফ্যানের শব্দ হতে লাগল। প্রসেসর দুটো সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করছে। স্ক্রিনে পার্সেন্টেজ উঠতে শুরু করল,
Decryption Status: 23%… 45%… 67%…
আনায়ার বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ হচ্ছে। আর মাত্র কিছুটা সময়, তারপরই তার অধরা প্রশ্নের জবাব আর কাঙ্ক্ষিত ডাটাবেজ তার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। খুশিতে চোখ-মুখ তার ঝিলিক দিয়ে উঠল। আঁড়চোখে তা দেখে নিয়ে, জেইন শুষ্ক হাসল,
“খুব খুশি মনে হচ্ছে।”
আনায়া চাপা উল্লাসে চোখ-মুখ খিঁচে বলল,
“খুশি হবো না? বয়সে ছোট বলে লোকটা আমাকে ঠিকমতো দাম দিচ্ছিল না, এবার আমি দেখাবো কতধানে কত চাল,ভাত,পাঁউরুটি এন্ড প্রায়োরিটি।”
অতি ব্যক্তিগত নাম্বার হওয়ায় জেইন যদিও এখনো জানতে পারেনি, আনায়া বারবার কার কথা বলছে, কিন্তু আনায়ার এমন নাটকীয় কথাবার্তা শুনে তার বেশ মজাই লাগছে। ততক্ষণে আনায়া উৎফুল্ল হয়ে, হাত-পা খিঁচে মুখটা স্ক্রিনের দিকে বাড়িয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে দু লাইন গাইতেও শুরু করেছে,
⠀⠀⠀⠀⠀তামাল্লি হাবিবি বাশতা-ক
⠀⠀⠀⠀⠀তামাল্লি এনায়া তেন্দাহালাক
⠀⠀⠀⠀⠀ওলাউ হাওয়ালেয়া কুল…..”
—“খুব ট্যালেন্টেড তো তুমি! এটা আবার কি গান গাইছো, আরাবিক?”
আনায়ার কন্ঠস্বর থেমে গেল। স্ক্রিন থেকে নজর না সরিয়ে বলল,
“জানিনা, হতে পারে। ইমরান হাশমির গান এটা। কিন্তু আমার সবচেয়ে পছন্দের।”
জেইন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হু ইজ ইম্যান হাসিমি?”
নামের এরূপ বিকৃতিতে আনায়ার চোখমুখ ভচকে গেল, চাপা গম্ভীর্যের সাথে বলল,
“উনি মহাপুরুষ। আর আমি তার একনিষ্ঠ ভক্ত!”
বলেই আবার মনে মনে বিড়বিড় করল,
“আমার নিরামিষ স্বামীটা যদি ওনার মতো হতো! ইশশ, না জানি কতোই ভালো হতো!
গোলামের ফুত মহাপুরুষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতে-পাতে আস্ত একটা নিরামিষ!”
ততক্ষণে জেইন কিছু একটার আশংকায়, ভাবুক আনায়াকে সতর্ক করল,
“এখনোই এতো খুশি হইও না! মনে হচ্ছে কিছু একটা গড়বড়… ”
জেইনের কথাটাও শেষ হওয়ার ফুসরত পেল না। ঠিক তখনই,
‘বিইইইইপ… বিইইইইপ… বিইইইইপ…’
পুরো ল্যাবের শান্ত নীল-লাল আলো হঠাৎ নিভে গিয়ে চারপাশের দেয়ালে ব্লিঙ্ক করতে শুরু করল তীব্র আতঙ্কজনক রক্ত-লাল বকন লাইট! মনিটরের স্ক্রিনে ভেসে থাকা সমস্ত সবুজ কোড কেটে গিয়ে একবিশাল লাল রঙের ওয়ার্নিং মেসেজ ফুটে উঠল,
[!] CRITICAL WARNING: Trace-Back Protocol Initiated!
[!] Host Network Compromised by AI Defense System [F.I.R.E.B.I.R.D.S]
[!] Origin IP Tracking: 98% Complete.
[!] Counter-Intrusion Payload Uploading in T-minus 15 Seconds…
জেইনের ফর্সা মুখের সমস্ত রক্ত এক লহমায় যেন চুষে নেওয়া হলো! চশমার পেছন থেকে তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে আতঙ্কিত গলায় চিৎকার করে উঠল,
“শিট! শিট! শিট! আনা, এটা কোনো সাধারণ সিকিউরিটি টিম না! এটা তো মিলিটারী গ্রেড অ্যাক্টিভ ট্রেস-ব্যাক এআই! কিন্তু তুমি তো বললে শুধু…ওহ শিট, কি ভেবেছিলাম আর এখন এটা কি হচ্ছে! ওরা আমাদের সিস্টেম হ্যাক করে আমাদের লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলেছে! পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে ওরা আমাদের আইপি আর এড্রেসও পেয়ে যাবে!”
আনায়া যেন সটান আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময়ের হতভম্ব হয়ে, তখন তখনই অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগল,
“মানে? মানে? মানে? এড্রেস-লোকেশন পেয়ে যাবে? আমাদের ধরে ফেলবে? তারপর পুলিশে দিবে? আমাদের জেলে থাকতে হবে? না না, এটা কি করে হয়। বাবা জানতে পারলে মেরে ফেলবে আমায়। পড়াশোনার নাম করে বিয়ে ভেঙে দিয়ে জার্মানিতে এসেছি। এখন যদি জানতে পারে, তার মেয়ে অকাজ করতে গিয়ে জেলের ভাত খাচ্ছে… না না, ভাত না। এদেশে তো ভাতও দেয়না মনে হয়। তাহলে দেশের এক মন্ত্রীর মেয়ে বিদেশের জেলে বসে ঐসব পঁচা পাঁউরুটি খাচ্ছে—এটা শুনলে তো বাবা নিশ্চিত স্ট্রোক করবে! হায় খোদা, এখন আমি কি করবো? আমি ভালো হয়ে যাবো, তবুও এই যাত্রায় বাঁচিয়ে নাও আমায়। আমি জেলে যেতে চাইনা। আমি জেলের পঁচা পাউরুটি খেতে চাইনা। কক্ষণো না!”
জেইনের মাথা কাজ করছে না; পাগলের মতো হন্তদন্ত করছে সে। আনায়া নিজেও বুঝতে পারছে না, ভয়ে আতংকে আঙ্গুল কামড়াতে কামড়াতে সে কিসব বকতে শুরু করেছে।
সবশেষে আনায়া কিছুক্ষণের জন্য থামতেই, জেইন সবকিছু ভুলতে বসে চাপা আতংকের সাথে বলল,
“মনে হয় তেমন কিছুই হতে চলেছে। আমরা ধরা পড়ে গিয়েছি সম্ভবত।”
”কিহ? কি বলছ তুমি?… জেইন, বন্ধ করো! এখনই বন্ধ করো সব!”
আনায়ার গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। পুরো শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল তার। রমণী ধরেই নিয়েছে,’ধরা পড়লে স্বামী তার জীবনেও তাকে আস্ত ছেড়ে দেবে না।”
অথচ তার মাথায় তখনও কেবল একটাই চিন্তা—না, ধরা পড়া যাবে না! কোনোভাবেই না!
জেইন উন্মাদের মতো কিবোর্ডে আঙুল চালাতে লাগল,
“আমি কিল-সুইচ রান করার চেষ্টা করছি! কিন্তু ওরা আমার টার্মিনাল লক করে দিয়েছে! কোনো কমান্ড কাজ করছে না!”
ততক্ষণে কম্পিউটারের স্পিকার থেকে একটা কর্কশ যান্ত্রিক ভয়েস কাউন্টডাউন শুরু করল,
“Ten… Nine… Eight…”
আনায়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ভীতি আর আতঙ্কে তার মস্তিস্কের চিন্তাশক্তি যেন অচল হয়ে গেল। জেইনকে কিবোর্ডে অনবরত পাগলের মতো প্রেস করতে দেখে এবং স্ক্রিনের কাউন্টডাউন থামছে না দেখে সে চরম এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসল।
”নায়য়য়য়! থামাও এসব!”
আনায়া আর কিছু না ভেবে, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সি-পি-ইউ এবং মনিটরের পেছনে থাকা মোটা মোটা সব পাওয়ার ক্যাবল, লিকুইড-কুলিং পাইপ আর হাই-ভোল্টেজ প্লাগ একসাথে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে আছড়ে খুলে ফেলল!
মুহূর্তের মধ্যে কাস্টম সি-পি-ইউ এর লিকুইড-কুল্যান্টের ক্যাবল ছিঁড়ে ভেতরের কেমিক্যালের সাথে হাই-ভোল্টেজ মেটাল সার্কিটের সরাসরি শর্ট-সার্কিট ঘটে গেল!
স্পার্ক…বিকট এক ছাৎতত রূপক শব্দ! পাওয়ার সাপ্লাই ক্যাপাসিটরগুলো একসাথে ওভারলোড হয়ে বিকট এক ধামাকায় ব্লাস্ট করল! সিপিইউ-এর কাচের ডোর চুরমার হয়ে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে বেরিয়ে এল চারপাশে। একটি তীব্র নীল-সাদা আলোর আগুনের গোলা আর ধোঁয়া একসাথে পুরো ল্যাবটাকেই যেন গিলে নিল।
বিস্ফোরণের ধাক্কায় আনায়া আর জেইন দুজনেই ছিটকে গিয়ে পেছনের কনক্রিটের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। অকস্মাৎ ধাক্কায় জেইন মাথায় আর আনায়া তার দুহাতে প্রচন্ড চোট পেল। রমণীর কোমরটা যেন তখুনি মটকে গিয়েছে। কোমড়ে হাত চেপে চোখদুটো মেলতেই, আনায়া আরো বেশি হতভম্ব হলো।
মহামায়া পর্ব ৫৯
চোখের সামনে ল্যাবের সমস্ত স্ক্রিন এক লহমায় নির্জীব, কালো হয়ে যাচ্ছে। পোড়া প্লাস্টিক আর কেমিক্যালের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে গেল চারপাশ। ভাঙা চশমার আড়ালে জেইন চোখ মেলে তা দেখতেই যেন, তার সমগ্র সত্তা বুকফাটা কষ্টে একপ্রকার চূর্ণবিচূর্ণ হলো। অথচ ফ্লোরে পড়ে থাকা দুজন নিজেদের ঠিকমতো সামলানোর আগেই, নিকষিত ধোঁয়ায় তোপে একত্রে কাশতে শুরু করল। ঘুটঘুট অন্ধকারের মধ্যে কেবল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর দুজনে হাঁপাতে থাকা নিঃশ্বাসের শব্দ অবশিষ্ট। এরিমধ্যে অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবে আনায়া আচমকা কষ্ট-বিস্ময় সংমিশ্রিত ক্রন্দিত সুরে, মটকে যাওয়া কোমড়টা চেপে ধরে সম্মূখের বিধ্বস্ত ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বলে উঠল,
“আআয়য়য়, সাব ফাট গেয়া!”
