Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৬১

মহামায়া পর্ব ৬১

মহামায়া পর্ব ৬১
তুশকন্যা

ঘন কালো ধোঁয়া আর পোড়া প্লাস্টিকের ঝাঁঝালো গন্ধে ল্যাবের পুরো আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। চারিদিকে নিখাদ অন্ধকার। কেবল বিস্ফোরিত সিপিইউ-এর ভাঙা কাচের মধ্য থেকে তখনও ছোট ছোট কিছু নীলচে স্ফুলিঙ্গ থেমে থেমে ছিটকে বেরোচ্ছে।
​কনক্রিটের শক্ত মেঝেতে আছড়ে পড়ে আনায়ার পুরো শরীরের হাড়গুলো বুঝি এক জায়গায় হয়ে গেছে। মাথাটা প্রচণ্ড ঝিমঝিম করছে, কানের ভেতর একটানা বাঁশির মতো শব্দ বেজেই চলেছে। ধোঁয়ার ঘ্রাণের তোড়ে সে কাশির দমক সামলাতে পারছে না কোনোমতেই। হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে কোনোমতে ওঠার চেষ্টা করতেই, কারো যন্ত্রণাক্লিষ্ট গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে আনায়া বলল,
​”জেইন… জেইন, তুমি ঠিক আছো?”

আনায়া ভাঙা গলায় অস্পষ্টভাবে ডেকে উঠল। অন্ধকারের মাঝেই হাতড়ে হাতড়ে জেইন তার মেঝেতে খসে পড়া চশমাটা খোঁজার চেষ্টা করছিল। কিছুটা দূরে খুড়খুড় শব্দ হতেই বোঝা গেল সে উঠে বসার চেষ্টা করছে। মারাত্মক কাশির তোড়ে জেইনের গলা যেন বুজে আসছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে সে যন্ত্রণায় প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“হোয়াট দ্য হেল ডিড ইউ জাস্ট ডু, আনা? তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ?”
​আনায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। বুকের ওপর এক অপার্থিব ভীতি আর আতঙ্কের বোঝা চেপে বসেছে। সে হাঁটুতে ভর দিয়ে জেইনের অবয়বের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় বলল,
“আমি… আমি ট্রেস-ব্যাকটা থামানোর চেষ্টা করছিলাম শুধু… তুমি তো বলছিলে কমান্ড কাজ করছে না, ওরা আমাদের লোকেশন পেয়ে যেত,তারপর পুলিশের কাছে…”
​—“তাই বলে মেটাল প্লাগ আর কুল্যান্টের ক্যাবল একসাথে টান মেরে ছেঁড়ে কেউ?”
জেইন অন্ধকারেই নিজের চুল খামচে ধরল। তার গলা ফাটানো রাগে আর হতাশায় ল্যাবের চারটে দেয়াল কেঁপে উঠল।

—“তোমার কোনো ধারণাও নেই, তুমি ঠিক কী নষ্ট করেছ! আমার চার বছরের ডেডিকেশন, দাদুর দেওয়া সেই কোডিং ডায়েরির সব কাস্টম প্রোটোকল, কোটি টাকার কাস্টমাইজড ড্রাইভার্স—এভরিথিং ইজ গন! সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে!”
​আনায়া অপরাধবোধে একদম চুপসে গেল। তার কাঁপতে থাকা হাত দুটো হাঁটুতে চেপে ধরে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে এই মুহূর্তে জেইনের বিশাল আর্থিক বা মানসিক ক্ষতির চেয়েও বড় একটা আতঙ্ক তার মাথার ভেতর হাতুড়ি পিটছিল।
​সে ভয়াতুর গলায় নীচু স্বরে শুধাল,
“জেইন… ওই ট্রেস-ব্যাকটা… ওটা কি থেমেছে? ওরা কি আমাদের আসল আইপি বা এই জায়গাটার এড্রেস পেয়ে গেছে?”
​কথাটা শুনতেই জেইনের রাগের উত্তাপ যেন এক মুহূর্তে ঠাণ্ডা জমে যাওয়া বরফে পরিণত হলো। বেসমেন্টের ওই কনক্রিটের ঠাণ্ডা মেঝেতে জেইন নিথর হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। পুরো ঘরে শুধু তাদের দুজন মানুষের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।​জেইন দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে নিজের কপাল চেপে ধরল। ভারী গলায় বলল,

“আই ডন্ট নো, আনা। তোমার এই ব্লাস্টের ঠিক আগের সেকেন্ডে কাউন্টডাউন থ্রি-তে ছিল। যদি মেলওয়ার বা কাস্টম প্যাকগুলো সার্ভারে পুশ হয়ে গিয়ে থাকে, তবে ওতো পাওয়াফুল একটা সিকিউরিটি টিম ইতিমধ্যেই হয়তো আমাদের বেসমেন্টের জিপিএস কোঅর্ডিনেট পেয়ে গেছে। আর যদি আমাদের ভাগ্য অবিশ্বাস্য রকমের ভালো হয়ে থাকে… তবে কপালগুণে হার্ডওয়্যার ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথেই প্রাইভেট নোডগুলো সাময়িকভাবে অফলাইন হয়ে গেছে।”
​আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলল। তার চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে গেল। জেইন কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের মধ্যেই দেয়াল হাতড়ে তার পকেট থেকে ইমার্জেন্সি লাইটারটা বের করল। লাইটারের ছোট হলুদ আলোটা জ্বলতেই ভেসে উঠল ধ্বংসস্তূপের কদর্য দৃশ্য। তিনটা দামি কার্ভড মনিটরের প্যানেলই ফেটে গেছে, কাস্টম সি-পি-ইউ এর জায়গাটা এখন একটা কয়লার স্তূপের মতো কালো হয়ে আছে। তার মাঝখান থেকে হালকা ধোঁয়া উঁকি দিচ্ছে।
​জেইন ধীরস্থিরে উঠে দাঁড়াল। দেয়ালের ইমার্জেন্সি ম্যানুয়াল ফিউজ বক্সটা খুলে একটা সুইচ নামিয়ে দিল। সাথে সাথে ব্যাটারি ব্যাকআপে থাকা দুটো ক্ষীণ হলুদ লাইট জ্বলে উঠতেই ল্যাবের ভেতরের দৃশ্য কিছুটা স্পষ্ট হলো।
​জেইন আনায়ার দিকে ফিরে তাকাল। তার সোনালী চুলগুলো ধোঁয়ায় কালো হয়ে আছে, জামায় পোড়া দাগ। আনায়াকে সে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখল, তারপর এক অদ্ভুত গম্ভীর সুরে তীব্র হতাশা নিয়ে বলল,

“তুমি ঠিক আছো?”
আনায়া ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে, কষ্ট চেপে বলল,
“আমি সত্যিই দুঃখীত, আমার জন্য তোমার সবকিছু… ”
জেইন ভারী শ্বাস ফেলে আনায়ার দিকে হাত বাড়াল। তাকে টেনে তুলতে তুলতে বলল,
“ইট’স ওকে, যা ধ্বংস হয়েছে তা তো আর ফিরিয়ে আনতে পারবো না আমি, তাই তোমাকে আমি কোনো দোষারোপ করতে চাইনা।”
আনায়াকে তুলে দাঁড় করিয়ে, জেইন নিজের ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকাল। পাশ থেকে আনায়া মিনমিন করে বলল,
“আমার কাছে একসাথে তো ওতোগুলো টাকা নেই, তবে হ্যাঁ, আমার কাছে বেশ কিছু টাকা এখনো জমানো আছে। আপাতত না হয় তুমি সেগুলোই…আর বাকিটা আমি খুব দ্রুত তোমায় দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।”
জেইন নিমজ্জিত সুরে বলল,

“আনা প্লিজ, ওসব লাগবে না আমার। আমার আর কিছুই বলার নেই।”
আনায়ার কাছে জেইনের কষ্টটা স্পষ্ট। এটাও বুঝতে পারছে, ছেলেটা ইচ্ছেকৃত ভাবে তার উপর কোনো রাগও ঝাড়তে চাইছে না। আনায়া মাথা নুইয়ে বলল,
“প্লিজ না করোনা, এমনিতেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। তুমি বরং…”
জেইন তার কথা শেষ হতে না দিয়েই বলল,
“এসব নিয়ে না হয় পরে কখনো কথা হবে।”
আনায়া জেইনের দিকে চেয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে—হয়তো ধোঁয়ার তোড়ে, নয়তো বুকের ভেতর চেপে রাখা সীমাহীন ভয়ের কারণে। ততক্ষণে জেইন ইশারায় তাকে উপরে যাওয়ার প্যাসেজটি দেখিয়ে দিয়ে শুষ্ক গলায় বলল,
“রাত ৩টা বাজে। এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়ো। যদি ওর সিকিউরিটি টিম কোনোভাবে আমাদের লোকেশন ট্রেস করে থাকে… তবে খুব শিগগিরই এই বাড়িতে কিছু অনাহূত অতিথি আসতে চলেছে। আর আমি চাই না তুমি এখানে থাকো।”
আনায়া স্তব্ধ বিমূঢ় হয়ে বলল,

“মানে?… আমি একাই…চলে যাবো। আর তুমি তাহলে…কি করবে?”
—“আমার চিন্তা করো না। আমি আমার দিকটা কোনোভাবে হ্যান্ডেল করে নেবো। এই ধরনের কাজকর্ম যেহেতু লুকিয়ে-চুরিয়ে করি, সেক্ষেত্রে নিজের সেফটির ব্যাপারেও আমার আগে থেকেই ভাবনা গুছিয়ে রাখা আছে। কিন্তু সমস্যা হবে, আমার সাথে যদি তুমি থাকো। এক্ষেত্রে হয়তো, বিষয়টা পুরোপুরি বিগড়ে যাবে।”
আনায়া স্পষ্ট বুঝতে পারল, জেইন মূলত কি বোঝাতে চাইছে। এমনিতেই বেচারার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে সে, এখন আর তার জীবন নিয়ে খেলার কোনো মানে নেই।
জেইন আবারও বলল,
“তুমি তোমার ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে উপরে চলে যাও, আমি কিছুক্ষণের মাঝেই আসছি; তোমায় বাড়িতে ড্রপ করে দেবো।”
​আনায়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। নিজের ব্যাকপ্যাকটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে, কাঁপা পায়ে স্পাইরাল সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

রাত ৩টা ৪৮ মিনিট। আনায়াকে তার বাসার সামনে পৌঁছে দিয়েই একপ্রকার কালবিলম্ব না করে চলে গেছে জেইন। পুরোটা পথ তাদের দুজন মানুষের ঠোঁটে কোণেই টু-শব্দটি ফুটে ওঠেনি। জেইনের বিষণ্ণ, পোড়া কপালে ফুটে ওঠা চরম হতাশা আর ল্যাবের সেই বিভীষিকা আনায়ার বুকের ভেতর তখনও তীব্র অপরাধবোধের কাঁটা ফুটিয়ে রেখেছিল তীব্রভাবে।

নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকে, ​গোপনে নিজের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল আনায়া। তবে এত সহজে হার মানার পাত্রী সে মোটেও নয়! হৃদযন্ত্রের অনবরত স্পন্দন আর কৌতূহল তাকে ক্ষণিকের জন্যও শান্ত হয়ে বসতে দিচ্ছে না। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাঁপটা দিয়ে এলো সে। এরপর সোজা বিছানায় বসে ব্যাকপ্যাক থেকে টেনে বের করল তার নতুন কেনা ম্যাকবুক।
​ল্যাপটপটি সে মূলত এই কাজের জন্যই একপ্রকার বিশেষ গোপনীয়তা বজায় রেখে একদম নতুন কিনেছিল। এতে তার নিজের কোনো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি, মেমোরি কিংবা তথ্য ইনক্লুড করা নেই। সম্পূর্ণ বেনামী এক ডিজিটাল অস্তিত্ব। আনায়া জানে, জেইনের কোটি টাকার সেটআপ আর ল্যাব যেখানে এক লহমায় ছাই হয়ে গেল, সেখানে তার এই একটা ম্যাকবুক দিয়ে সফল হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু নিজের জানা চোরা পদ্ধতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে সমস্যা কোথায়?

​বদ্ধ অন্ধকার ঘরে একটানা ম্যাকবুকের স্ক্রিনের নীলচে আলো আনায়ার চঞ্চল মুখে এসে পড়ছে। সে তার সমস্ত চেনা-জানা কোডিং প্রোটোকল, গোপন স্ক্রিপ্ট আর বন্ধুর থেকে শেখা সেই পুরোনো হ্যাকিং ট্রিকসগুলো একের পর এক অ্যাপ্লাই করে, ইন্টারনেটের মেকি রাস্তাগুলো খুঁজতে নিজের চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।
​পুরোটা রাত কেটে গেল কেবল তার এই খামখেয়ালি চেষ্টার পেছনে। একেক সময় স্ক্রিনে কোনো শুভ সংকেত দেখলে তার বুক আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠছিল, আবার পরক্ষণেই ব্যর্থতার লাল সিগন্যাল দেখে বিরক্তি আর রাগে সে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। কখনো বা চোখ ভেঙে আসা ঘুম আর হতাশায় সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়ছিল।
​ল্যাপটপের সাথে নানান কিচ্ছাকাহিনী আর বিড়বিড় করে বকবক করতে করতেই হঠাৎ একসময় সে খেয়াল করল, স্ক্রিনের টার্মিনালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ডাটা-এক্সট্র্যাকশন কাউন্টিং পার্সেন্টেজ রান হতে শুরু করেছে!

Progress: 12%… 34%… 58%…
​স্ক্রিনে পার্সেন্টেজের সংখ্যা বাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু এর ধীরগতি আনায়ার অধৈর্য মনকে আর সামলে রাখতে পারছিল না। শত চেষ্টা করেও সে ঘুম ধরে রাখতে পারছিল না। একপর্যায়ে ম্যাকবুকটি বিছানার ওপর খোলা রেখে, নিজেই গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে শুয়ে পড়ল আনায়া। ছটফট করতে করতে সময় গুনতে লাগল সে। একশো পার্সেন্ট পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় সময় গুনতে গুনতেই, কখন যে ক্লান্তিতে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল, তা নিজেই টের পেল না।

​বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে। ভোররাতের ধূসর আবছা আলো যখন জানালার পর্দা চুইয়ে ঘরে এসে পড়তে শুরু করেছে, ঠিক তখনই আচমকা আনায়ার ঘুমটা ভেঙে গেল।
​বিছানা ছেড়ে এক লাফে উঠে বসে, নিজের এলোমেলো চুলগুলো সামলে নেওয়ার আগেই সামনের খোলা স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সে একদম স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! চোখের মনি দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম!
​তার ম্যাকবুকের স্ক্রিনে অনবরত ফুটে রয়েছে একটি গোপন প্রাইভেট অ্যাকাউন্টের শত শত এনক্রিপ্টেড ফাইল ও ডাটাবেজ। যার মাথার ওপর বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে অ্যাকাউন্ট আইডেন্টিটি—‘V’ যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ মূলত ‘Vivian’
​ফোন নম্বর থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কললিস্ট, মেসেজ ল্যাব, এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড নোটিফিকেশন পর্যন্ত সবটাই এখন তার স্ক্রিনে সুবিন্যস্তভাবে ভেসে উঠেছে। ​চাপা উত্তেজনায় বিছানার ওপর একপ্রকার লাফিয়ে উঠল আনায়া। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভঙ্গিতে কিবোর্ডে হাত বাড়িয়ে দ্রুত স্ক্রিনের তথ্যগুলো ঘেঁটে দেখতে লাগল। তার ধুকপুক করতে থাকা বুক আর আচ্ছন্ন মস্তিষ্ক বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজের চোখের সামনের বাস্তবতাকে।
​আনায়া হতভম্ব হয়ে বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল,
“আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আমি কি এখনও ঘুমে ঢুলছি? এটা কীভাবে সম্ভব হলো? হাউ অন আর্থ ইজ দিস পসিবল!”

​নিজের চেতনার ওপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস না পেয়ে, আনায়া আচমকা নিজের দু-হাত তুলে নিজের দুই গালে কষে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল!
প্রথম কয়েক সেকেন্ড অসাড় থাকলেও, মুহূর্তেই থাপ্পড়ের স্পষ্ট ঝাাঁঝালো ব্যথা দুটো গালে ছড়িয়ে পড়তেই আনায়া চমকে গিয়ে থমথমে মুখে বসে রইল। না, এটি কোনো অলীক কল্পনা বা স্বপ্ন নয়! এটি বাস্তব!
বিস্মিত রমণী ভাবতে লাগল, জেইনের সেই ল্যাব ব্লাস্ট হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে তাদের মেলওয়্যার বা কমান্ডের যে জিরো-ডে অংশটুকু ব্যাকডোরে পুশ হয়ে গিয়েছিল, তাতেই হয়তো কাজ হয়ে গেছে। আর জেইনের সেই সিক্রেট প্রোটোকল আনায়ার এই ফ্রেশ ম্যাকবুকে রান হয়ে চূড়ান্ত এক্সেস পাইয়ে দিয়েছে।
​আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করল না আনায়া। চরম কৌতুহলে সে কেনীথ-এর এনক্রিপ্টেড ডাটাবেজ পেনিট্রেট করে তার ফোন নম্বর এবং অত্যন্ত পারসোনাল কললিস্ট থেকে শুরু করে ইনবক্স পর্যন্ত তল্লাশি শুরু করে দিল। আনায়া খুব ভালো করেই জানে, এটি তার মহাপুরুষের অতি-গোপন ও অত্যন্ত ব্যক্তিগত নম্বর। আর তার হ্যাকিং যখন শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে, তবে এই মানুষটার জীবনের সবচেয়ে লুকিয়ে রাখা পারসোনাল রহস্যগুলোও এখন তার হাতের মুঠোয়।​আনায়া খুশিতে গদগদ হয়ে এক চিলতে বিজয়ের হাসি হেসে মনে মনে ভেবে উঠল,
“আই মিন… সিরিয়াসলি? আমিও যে এত বড় মাপের এক জিনিয়াস হ্যা’কা’র, সেটা তো আমি নিজেই জানতাম না! কাজটা তো একদমই ইজি ছিল, অথচ সামান্য একাউন্ট হ্যা’ক করতে গিয়ে আমি কী না কী করে ফেললাম।”

​কিন্তু পর পর আধা ঘণ্টা ধরে স্ক্রিনের প্রতিটা ডাটাবেজ, চ্যাটলিস্ট আর ডায়ালগ হিষ্ট্রি উল্টেপাল্টে ঘেঁটেও আনায়া আশানুরূপ কোনো রসালো স্ক্যান্ডাল খুঁজে পেল না!
​পুরো কললিস্ট এবং চ্যাটিং প্যানেলের জায়গা জুড়ে কেবল কিছু প্রফেশনাল এবং জরুরি মানুষের আনাগোনা। হয় ইমানি, পাভেল কিংবা অন্য দু-একজনের সাথে অতি-সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনীয় কিছু কাজের কথা হয়েছে। প্রতিটি ফোন কলের স্থায়ীত্ব কয়েক সেকেন্ডের বেশি নয়। তবে চ্যাটলিস্টের একদম শেষের দিকে একটি অদ্ভুত আইডি তার নজর কাড়ল—‘Juli-The Icelolly’
​এই আইডিটির সাথে কেনীথের দীর্ঘ, ভুজুংভাজুং আড্ডার বিশাল এক আলাপচারিতা চলেছে। আনায়া চোখ ছোট ছোট করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপরই নিজের কাজকর্মের কথা ভেবেই তার নিজেকে গালি দিতে ইচ্ছা করল। কারণ, ওই জুলি নামক ছদ্মবেশী আইডিটা তো অন্য কেউ নয়… ওটা তো সে নিজেই!

​আনায়া গাল ফুলিয়ে গজ গজ করে উঠল। তার সেই তথাকথিত মহাপুরুষ নাকি চার-পাঁচটা গার্লফ্রেন্ড-জাস্টফ্রেন্ড নিয়ে বিন্দাস ঘুরে বেড়ায়! তা সেই লাস্যময়ী রূপসীদের সমাচার কোথায়? এখানে তো এমনকি সেই স্টিফেন নামের মেয়েটারও কোনো চিহ্নই নেই।
​কথাটা ভাবার শেষ হতে না হতেই, চ্যাটলিস্টের ওপরের দিকে দুটি বিশেষ আইডির ওপর আনায়ার দৃষ্টি আটকে গেল—একটি Stella Stephen এবং অন্যটি Michael Jack।
​আনায়া আর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে দুটো আইডির চ্যাট হিস্ট্রিই খতিয়ে দেখা শুরু করল। স্টেলা স্টিফেনের ইনবক্স খোলামাত্রই আনায়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! চ্যাটিং প্যানেলে কেনীথের রেসপন্স অত্যন্ত ক্ষীন এবং নিরুত্তাপ। অধিকাংশ মেসেজই সে স্রেফ সিন করে একপ্রকার ইগনোর করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, স্টেলা স্টিফেন নামের সেই মেয়েটার প্রতিটি টেক্সট যেন তীব্র পাগলামি, আদিখ্যেতা আর পাগলাটে ভালোবাসার গভীরতায় ভরপুর!
​নিজের একান্ত ব্যক্তিগত মানুষটার জন্য অন্য কোনো মেয়ের এমন উদগ্র পাগলামি, চাটুকারিতা আর সোহাগী কথাবার্তা দেখে আনায়ার সর্বাঙ্গ যেন এক লহমায় রি রি করে জ্বলে উঠল! সে নিজের চোয়াল শক্ত করল। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ দুটোকে সরু করে কিড়মিড় করে অস্ফুটে বিড়বিড় করে উঠল,

“তারমানে এই হলো আপনার আসল কাহিনী, তাই না? আমাকে এভাবে বোকা বানানো হচ্ছিল এতদিন? এই স্টেলা স্টিফেনের সাথে ওনার কিচ্ছু নেই! বরং এই ডাইনী মেয়েটাই ওনার পেছনে এমন আঠার মতো আঠা হয়ে ঘুরঘুর করে পাগলামি চালায়!”
​বলতে বলতেই আনায়া তড়িঘড়ি করে অন্য আইডি অর্থাৎ জ্যাক-এর সাথে কেনীথের চ্যাট কনভারসেশন প্যানেলটি অন করল। পুরো চ্যাটটা খুঁটিয়ে পড়ার পর নিজের চটপটে মস্তিষ্ক দিয়ে পুরো সমীকরণটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
​—“ওহ, আই সিইইইই! এটা নিশ্চয়ই ওই আহাম্মক মেয়েটার ভাই! ঠিকই আন্দাজ করেছি আমি! মেয়েটা ওনাকে চোখে হারায়, কিন্তু মেয়েটার ভাই আবার ওনাকে সহ্যই করতে পারে না! তাদের কথাবাত্রার ধরন দেখে একদম স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা কোনো পুরানো শত্রুতার রেশ। হুহ! যাক, ব্যাপার না! আমাকে বোকা বানিয়ে এতো বড় নাটক সাজিয়ে ছলনা করার ফল আমি ওনাকে হাড়ে-হাড়ে বুঝিয়ে ছাড়ব!”

​আনায়ার তীব্র বাসনা এবার কেনীথের ফোনের ভেতরের গ্যালারি সিকিউরিটিতে প্রবেশ করার। সে হন্যে হয়ে গ্যালারির আইকন ফাইলটি এনক্রিপ্ট করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু না! বাকি সব পারসোনাল মেসেজ ও কন্টাক্ট ক্র্যাক করা সম্ভব হলেও, গ্যালারির সেই শক্ত সিকিউরিটি প্যানেলে গিয়ে সিস্টেম বারবার রিজেক্ট করে দিচ্ছে। সেখানে ঢোকার কোনো পথই আনায়া বের করতে পারছে না।
​আনায়া হতাশ ও হতভম্ব হয়ে ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগল,
“কী ব্যাপার! এই সামান্য ফাইলটায় ঢুকতে আবার কীসের সমস্যা? ভেতরে না জানি আর কী কী অকাজ-কুকাজের নমুনা লুকিয়ে রেখেছে।”
​কিন্তু মূহূর্তেই ভেতরের সেই অদমনীয় কৌতূহলকে জোর করে থামিয়ে দিল আনায়া। কারণ সময় কম, আর ভোরের সূর্য প্রায় উঠে গেছে। মিষ্টি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আনায়া ধপ করে ম্যাকবুকের ডালটা আটকে বন্ধ করে দিল।
​বিছানায় হেলান দিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কুটিল বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে আবারও মনে মনে ছক কষতে লাগল,

“থাক গে যাক! যেটুকু হয়েছে, তাতেই আমার মিশন ওয়ান সাকসেসফুলি ডান! এবার আমাকে নামতে হবে আসল খেলায়। আমি এখন হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর—ওনার মাঝে কোনো গার্লফ্রেন্ড-জাস্টফ্রেন্ডের চক্করবক্কর নেই। সবটা বানিয়ে বানিয়ে স্রেফ আমাকে জ্বালানোর জন্য আর আমার সাথে খেলার জন্য এত ছলাকলা দেখিয়েছেন। আহহহ, ভাবতেই মাথাটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে; কত বড় বদমাশ উনি!”
আনায়া নিজের রাগ নিয়ন্ত্রনে সফল হলো। শয়তানিভরা এক গাল হেসে অস্ফুটে বলে উঠল,
“মিশন টু-তে আর নিজে কোনো ব্লাস্ট করব না… এবার সোজা আপনাকে ব্লাস্ট করে দেবো—প্রিয় বড় আব্বুর অসভ্য ফুত!”

রাতের জমাট বাঁধা আঁধার কেটে ভোরের আলো ফুটলেও, বিষাক্ত লালচে আলোয় ঘেরা এক বদ্ধ ঘরে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে স্টেলা।
​গতরাতে ভাই জ্যাক-এর সাথে তার রক্ত জল করা ঝগড়া হয়েছে। বিষয়বস্তু সেই একই পুরোনো সুর—স্টেলার একরোখা উন্মাদনা! সে জাহির করতে করতে আজ ক্লান্ত যে, ভিকে-কে সে কতটা ভালোবাসে। এই ভালোবাসার জন্য সে নিজের বাকিটা জীবন অপেক্ষা করে কাটিয়ে দিতে রাজি, কিন্তু এই নামটা মন থেকে মুছে ফেলা তার পক্ষে অসম্ভব।
​অন্যদিকে, ভাই হিসেবে জ্যাক তাকে বোঝাতে বোঝাতে আজ চরম ব্যর্থ। হাত-পা ধরে অনুনয় থেকে শুরু করে রাগের মাথায় বোনের গালে কষে থাপ্পড় বসানো—কোনোটাই বাদ রাখেনি সে। কিন্তু বিকারগ্রস্ত বোনকে কীভাবে বোঝাবে যে সে সাক্ষাৎ কোনো আগুনের সাথে খেলায় মেতেছে! যে আগুনে জ্বললে ছাইটুকুও অবশিষ্ট থাকে না!
​সারারাত তীব্র মানসিক অস্থিরতায় এক ফোঁটা ঘুমাতে পারেনি স্টেলা। উন্মাদ মস্তিষ্ক কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছিল না। শেষমেশ রুমের মাঝখানে রাখা ইজেলে ক্যানভাস বসিয়ে, রঙের জাদুতে এক বিশেষ পুরুষের প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেছে সে। যে পুরুষ আর কেউ নয়—স্বয়ং রকস্টার ভিকে।

​পুরো ঘর জুড়ে কৃত্রিম লালচে আলোর এক অদ্ভুত ছড়াছড়ি। ফ্লোরের এক কোণে পড়ে আছে একটি অর্ধেক খালি বিয়ারের বোতল আর ফাঁকা একটি কাচের গ্লাস। স্টেলার পরনে সর্ট ব্ল্যাক স্কার্ট আর স্লিভলেস টপস। তার রেশমি সোনালী চুলগুলো বিশৃঙ্খলভাবে কাঁধে-পিঠে ছড়িয়ে রয়েছে। চোখে-মুখে চরম ক্লান্তি ও মাতাল ভাব স্পষ্ট।
​একহাতে রঙের প্যালেট, যাতে ঘন পেস্টেল টেক্সচারের ছড়াছড়ি; অথচ অন্যহাতে কোনো ছবি আঁকার স্প্যাচুলা বা প্যালেট নাইফ নেই। তার বদলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে একটি ধারালো স্টিলের ছুরি! সেই ছুরির শানিত ফাল্ক দিয়েই পরম আবেশে সে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছে তার স্বপ্নের পুরুষের অবয়ব। মাঝে মাঝেই রক্তমুখী ছুরিটা প্যালেটে নামিয়ে রেখে, পাশে রাখা বিয়ারের বোতলটা তুলে এক-দুই ঢোক গিলে নিচ্ছে।
​ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো,

‘ঠক… ঠক…’
​বিয়ারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা স্টেলা বিরক্তি ও রাগে মুখ কুঁচকে ফেলল। নিখাদ ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উত্তর দিল সে,
“গেট দ্য হেল আউট অফ হেয়ার! বলেছি না কেউ ডিস্টার্ব করবি না আমার রুমের সামনে এসে। চলে যা সব!”
​কিন্তু সেই একই শব্দ আবারও প্রতিধ্বনি তৈরি করল দরজার পাল্লায়। এবার সহ্যের সীমা হারিয়ে ফেলল সে। চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল স্টেলা। হাতের রঙের প্যালেটটা ঠাস করে সটান ছুঁড়ে মারল নিচের দিকে। রঙের ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশের মার্বেল ফ্লোরে।
এলোমেলো চুলগুলো সামলানোর কোনো তোয়াক্কা না করে, টালমাটাল পায়ে সে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তীব্র ঝটকায় দরজাটা খুলেই, সামনের মানুষটির বুক বরাবর হাতের ধারালো ছুরিটা উঁচিয়ে ধরে চোখ দুটো হিংস্র করে বলল,
​”তোদের সাহস দেখে আমি অবাক হই! একবার বলেছি না ডিস্টার্ব করবি না? তাহলে? কেন আবার এসেছিস এখানে, হ্যা?”

​নেশায় ঢুলতে থাকা স্টেলা খেয়াল করেনি যে দরজার ওপাশে কোনো দাস বা সাধারণ ভৃত্য দাঁড়িয়ে নেই। প্রায় সাড়ে ছয় ফুট দীর্ঘ, বলিষ্ঠ দেহের হেনরিক তার সম্মূখে দাঁড়িয়ে।
দরজার ওপাশ হতে ভেতরের এই ধ্বংসলীলা আর মেয়েটার বিকৃত অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল হেনরিক। সে কিছু না বলে অত্যন্ত আলতোভাবে স্টেলার হাত থেকে চাকুটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু পরশ পেতেই স্টেলা আরও হিংস্র হয়ে উঠল।
​”শান্ত হও, স্টেলা…”

হেনরিক গম্ভীর কিন্তু সংবরণশীল গলায় তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল। তারপর পেছনে হাত বাড়িয়ে নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিল দরজার ভারী পাল্লাটা।
​হেনরিক স্টেলাকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার প্রখর দৃষ্টি গিয়ে থমকে গেল ঘরের মাঝখানের সেই ক্যানভাসটার ওপর। ​ক্যানভাসে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে তাদের চিরশত্রু ভিকে-র রাজকীয় অবয়ব। আর সেই চেহারাটিকেই নিজের ভালোবাসার রমণী এত পরম যত্নে এঁকে চলেছে। দৃশ্যটি দেখামাত্রই হেনরিকের বুকের ভেতর অনিয়ন্ত্রিত এক আক্রোশ আর পৈশাচিক ঈর্ষার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে, সে স্টেলার দিকে মুখ ফেরাল। ​স্টেলা তখন ছুরি হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে এক অদ্ভুত ছলাকলায় মেতেছে। বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ দিয়ে ছুলছে চাকুর ধারালো মেটাল। নেশাগ্রস্ত তোতলানো গলায় হেনরিকের দিকে না তাকিয়েই জানতে চাইল,

“কেন এসেছ এখানে? কী চাই তোমার?”
​হেনরিক একটা ভারাক্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলল,
“তোমাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখানোর ছিল, তাই এলাম।”
​কথাটা শেষ করতেই হেনরিক তার জ্যাকেটের ভেতরের গোপন পকেট থেকে কতগুলো প্রফেসিওনাল গ্লসি ছবি বের করে স্টেলার দিকে বাড়িয়ে দিল। স্টেলা ভ্রু কুঁচকে ছবিগুলো হাতে নিল। কিন্তু ছবির ফ্রেমগুলোর ওপর দৃষ্টি পড়তেই—মুহূর্তের মধ্যে তার মাতাল অবয়ব উবে গেল! এক থমথমে, পাথুরে বিস্ময়ে নিথর হয়ে গেল স্টেলার চারপাশ!
​ছবিগুলো রাতের বেলার কোনো এক নামজাদা রেস্তোরাঁর। যেখানে ভিকের সাথে এক পরমা সুন্দরী রমণীর কিছু একান্ত আর অভূতপূর্ব মুহূর্ত গোপনে ফ্রেমবন্দি করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—স্টেলার একমাত্র শখের পুরুষ ভিকে অতি-যত্নে ও আবেশে লাল গাউন পরা এক রমণীকে নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে! অন্য ছবিতে ফুটে উঠেছে ভিকের সেই মুগ্ধ, আচ্ছন্ন দৃষ্টি—যা দিয়ে সে অপলক চেয়ে রয়েছে মেয়েটির দিকে। আর শেষ ছবিগুলোতে ভিকে অত্যন্ত নত হয়ে মেয়েটির জুতো ঠিক করে দিচ্ছে, তো কখনো তাকে বুকে আগলে ধরে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

​স্টেলা যেন চোখের ভুল দেখছে। হতভম্ব হয়ে একের পর এক ছবি উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল সে। ছবিগুলো যে কোনো পেশাদার স্পাই দিয়ে গোপন কায়দায় তোলা, তা একদম স্পষ্ট। তবে কারণ যা-ই হোক, স্টেলার বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্কে চরম দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য কেবল এই ক’টি ফ্রেমি যথেষ্ট ছিল।
​ছবি দেখা শেষ হতেই উন্মাদকের মতো বিকট গর্জন করে উঠল স্টেলা। হাতের সমস্ত ছবি সে সজোরে ছুঁড়ে মারল সরাসরি হেনরিকের মুখের ওপর। ছবিগুলো বাতাসের তোড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিটে পড়ল ঘরের চারপাশে।
​সে বিকারগ্রস্তের মতো মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করতে লাগল,
“ফেইক! অল অফ দিজ আর ফেইক! এসব বানাবট মিথ্যে! কে এই মেয়ে, হ্যাঁ? এটা আমার ভিকে হতেই পারে না। আমি জানি ভিকে এসব কোনোদিন করবে না… নেভার! ও শুধু আমার… ও শুধুই আমার!”
​মুখের ওপর এভাবে ছবিগুলো ছুঁড়ে মারার পরও নিজেকে যথাসাধ্য স্থির রাখল হেনরিক। কিন্তু ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর চেপে রাখতে পারল না। সে গভীর রক্তচক্ষু তুলে রুক্ষ গলায় জার্মান সুরে বলল,

​”এটাই আসল সত্যি, স্টেলা। এটাই করেছে তোমার ওই তথাকথিত মহাপুরুষ ভিকে! যে লোকটা সারাজীবন মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকায়না বলে সবাই জেনে এসেছে, সে আজ এই মেয়েটির পায়ের কাছে বসে আছে। ছবিগুলো ছুঁড়ে ফেললে কেনো? আরেকটু ভালো করে দেখো!
যদিও আমরা এখনো জানতে পারিনি এই মেয়েটি আসলে কে… কিন্তু তবুও এসব দেখার পর কি তোমার মনে হয়, মেয়েটা সাধারণ কেউ? তোমার ভিকে নিশ্চিত কোনো সাধারণ মেয়েকে এতোটা গুরুত্ব দেবে না। এখন বলো, এরপরও কি তুমি এই অসভ্য ভিকের পেছনে কুকুরের মতো পড়ে থাকবে? এখনো নিজের জীবনটা এভাবে নষ্ট করবে?”
​স্টেলা মেঝে থেকে ছিটকে ওঠা চাকুটা কুড়িয়ে নিয়ে, এক ঝটকায় হেনরিকের গলার মিলিমিটার দূরে উঁচিয়ে ধরে হিসহিসিয়ে উঠল। চোখে তার বুনো হিংস্রতা আর রক্তের তৃষ্ণা,
​”মুখ সামলে কথা বলো, হেনরিক! না… আমি ওই মেয়েটাকে ছেড়ে দেব না। খুঁজে বের করো ওকে। যেকোনো মূল্যে ওকে খুঁজে বের করো। আমি ওকে শেষ করে দেবো! জানে মে”রে ফেলবো। নিশ্চয়ই ওই ধূর্ত মেয়েটাই কোনো গণ্ডগোল করেছে। নয়তো আমার ভিকে এমন করতেই পারে না। আমার ভিকে কোনোদিন এমন হতে পারে না!”

​বলতে বলতেই বিকারগ্রস্ত স্টেলার দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।​হেনরিক তার এই শোচনীয় রূপ দেখে কেবল একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল—কবে যে এই ভিকের ভূত স্টেলার মাথা থেকে নামবে, তা বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরও জানেন না!
​সে আর কালবিলম্ব না করে দরজার দিকে পা বাড়াল। যাওয়ার আগে ঘাড় ফিরিয়ে চরম কটাক্ষ আর তাচ্ছিল্যের সুর তুলে বলে গেল,
“এসব হাস্যকর পাগলামি বন্ধ করো, স্টেলা। ওই ভ্যাম্পায়ার শালা কোনোকালেই ভালো মানুষ ছিল না। ও কেবল তোমার অন্ধ চোখেই এক ভালোমানুষ! তবে আমি নিশ্চিত… এমন এক দিন খুব শীঘ্রই আসবে, যেদিন ওর এই ভুত তুমি নিজেই নিজের মাথা থেকে নামাবে, আর নিজের এই নষ্ট দিনগুলোর জন্য আফসোস করবে!”
​‘ধাড়াম!’ করে বন্ধ হয়ে গেল দরজার ভারী পাল্লা। পুনরায় সেই লালচে আলোর রুদ্ধ ঘরে একা হয়ে পড়ল স্টেলা। নিজের হাতের মুঠোয় থাকা ধারালো চাকুটা চরম আক্রোশে চেপে ধরল সে। মুহূর্তের মধ্যে চাকুর শানিত মেটাল স্টেলার ধবধবে ফর্সা হাতের তালু কেটে চামড়া চিরে ভেতরে ঢুকে গেল! টপটপ করে ফ্লোরে জমতে লাগল তাজা রক্ত!
​অথচ সেই মারাত্মক যন্ত্রণার কোনো তোয়াক্কা না করে, সে ক্ষিপ্ত ও উন্মাদের ন্যায় বিড়বিড় করতে লাগল,

“না… না! এটা হতে পারে না! আমার ভিকে কোনোদিন অন্য কারও হতে পারে না…”
​বলতে বলতেই সে নিজের হাতের তালু থেকে রক্তে ভেজা চাকুটা এক টানে খুব নির্মমভাবে বের করে আনল! মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে কাঁচা রক্ত গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
​স্টেলা সেই রক্তমাখা হাত নিয়েই পা বাড়াল ক্যানভাসের দিকে। ক্যানভাসে ফুটে থাকা ভিকের প্রতিকৃতির ওপর নিজেকে সঁপে দিল সে। উন্মাদের মতো ছটফট করতে করতে, ভিকের সেই আঁকা কাল্পনিক চেহারার ওপর নিজের হাত থেকে ঝরে পড়া তাজা রক্ত লেপে দিতে শুরু করল!
​পাগলের মতো কাঁপতে থাকা গলায় ফুঁপিয়ে বলতে শুরু করল,
“ইউ আর মাইন… রাইট? ইউ আর অনলি মাইন, ভিকে!”
​পরক্ষণেই সে রক্তমাখা ঠোঁট চেপে হিসহিস করে উঠল,

“তুমি একদম চিন্তা কোরো না… ওই মেয়েটাকে আমি ঠিক খুঁজে বের করব! ওকে খুঁজে বের করে নিজ হাতে কবর দেব আমি। আমি তো কখনো তোমাকে কোনোকিছু জন্য জোর করিনি, তাই না? কখনো না! আমি তোমার জন্য বছরের পর বছর কেবল নীরবে অপেক্ষা করে গেছি… তাহলে তুমি কীভাবে পারলে দু-দিনের একটা ফালতু মেয়ের এত কেয়ার করতে? আমি জানি না ওই মেয়েটা কে… কিন্তু ট্রাস্ট মি ভিকে, আমি ওকে খুঁজে বের করে চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেব। আমাদের রাস্তায় কোনো কাঁটা আমি রাখব না… আমি আর তুমি ছাড়া এই দুনিয়ার বাকি সবকিছু ধ্বং*স করে দেব!”
​কথাগুলো উন্মাদকের মতো বলতে বলতে হঠাৎ যেন স্টেলার স্তব্ধ মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ খেলে গেল। কী যেন একটা বিশেষ কথা মনে পড়ে গেল তার।
​আচমকা এক লহমায় নিথর হয়ে গেল স্টেলা। তার রক্তমাখা হাত ক্যানভাসের ওপর স্থির হয়ে রইল। চোখের মণি দুটি বিস্ময়ে বড় বড় করে, গভীরভাবে কপাল কুঁচকে ফেলল সে।
​বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে অস্ফুটে বিড়বিড় করতে শুরু করল,
“এক সেকেন্ড… এই মেয়েটাকে তো আমি চিনি! ইয়েস… ইয়েস! আই নো হার! এই মেয়েটাকে তো আমি আগে কোথাও দেখেছি।কোথায় যেন দেখেছি… কোথায়…”

​হঠাৎ নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে এক বিকট, ভৌতিক হাসিতে মেতে উঠল স্টেলা,
​”মনে পড়েছে! এই মেয়েটাকে তো আমি সেই রাতে ব্লাডেনের হেডকোয়ার্টারের সামনে দেখেছিলাম। ওর সাথে তো আমার কথাও হয়েছিল! তারমানে… তারমানে কি এটাই সেই মেয়ে?….আই মিন সিরিয়াসলি? হা-হা-হা!”

মহামায়া পর্ব ৬০

​কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থমকে রইল স্টেলা। তারপরই তার রক্তে রাঙানো ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম পৈশাচিক, বিষাক্ত হাসি। গা দুলিয়ে দুলিয়ে ঘরের ভেতর শয়তানের মতো হেসে উঠল সে। সেই হাসির শব্দের কাঁপনে যেন পুরো বেসমেন্ট কেঁপে উঠল।
​মিনিট দুয়েক পর সেই ভয়ঙ্কর হাসির রেশ থামতেই, স্টেলা ক্যানভাসের ভিকের প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে ঝুঁকে পড়ল। বিকৃত খুনে ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে উঠল,
​”সে তুমি যেই হও না কেন মেয়ে… আমার রাস্তার কাঁটা হয়েছো মানে—মরতে তো তোমায় হবেই!”⠀

মহামায়া পর্ব ৬২