Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

নিস্তব্ধতায় মোড়া রাত। গোটা ঘরজুড়ে শুধুমাত্র ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া, আর কোনো শব্দ নেই। নরম তুলতুলে বালিশে নাকমুখ ঘষলো তিতির। ঘুমের ঘোরেও বড্ড অচেনা লাগলো জায়গাটা। মাথার তীব্র যন্ত্রনা উপেক্ষা করে পিটপিট করে তাকালো মেয়েটা। অন্ধকার গোটা কামড়া। ছোট্ট একটা লাল রঙা ড্রিম লাইটের মিহি আলোয় ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র আবছা চোখে পরলো তার। কিছু একটা মনে হতেই লাফিয়ে উঠলো । বাঁ পাশটা অবশ হয়ে আছে একপ্রকার। ব্যাস্ত চোখ খুঁজলো তমা কে। কত বাজে এখন! হুড়মুড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে সুইচবোর্ড হাতড়ে বের করলো। তাতে সময় লাগলো বেশ খানিকটা।
আলো জ্বলতেই কুঁচকে এলো চোখজোড়া। অচেনা ঘরটা। সাজানো গোছানো ছিমছাম পুরো। তিতির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখের সামনে ভেসে উঠলো, সন্ধ্যা রাতের সেই দৃশ্যগুলো। কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিলো তাকে আর তমাকে। মূল টার্গেট যে আদতে সে ছিলো এটা না বোঝার কিছু নেই। তিতির ছুটে গিয়ে বদ্ধ দরজায় ঠকঠক করে উঠলো। জোরে জোরে শব্দ করে ডাকলো কাউকে। সাড়া পাওয়া গেলো না কারোরই৷ তমাকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো লোকগুলো। সে-ই বা কোথায় কে জানে!

ঈশান দাত কিড়মিড় করে উঠলো ছবি আর মেসেজ টা দেখা মাত্রই। মেয়েগুলোকে এতবার বলা সত্ত্বেও বাড়ির বাইরে বের হয়ে এসেছে। এতো বড় বোকামি কি করে হলো! ঘাম ছেড়ে দিলো গোটা শরীরটায়। অমিত ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ঈশানের হাতের ফোনের ছবিখানা ওরও দৃষ্টিতে পরেছে। ফ্যাকাসে হয়ে এলো বেচারার মুখটা। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,
—’ স্যার, ওই এক্সিডেন্টের সময় ম্যাডাম কলে ছিলো। ম্যাডাম হয়তো ভয় পেয়েছিলো, আপনার কিছু হয়েছে কি-না। ‘
ঈশান হাতের সেলফোনটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও, থেমে গেলো। মাথা টা দপদপ করে উঠছে রাগে। ইয়াজ মির্জার দ্বারা সব সম্ভব। তিতির এখনো ঘুমের ঘোরে। মেয়েটার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করতে না বসলে হয়। তিতির কে পেতে মরিয়া ইয়াজ মির্জা। এরকম সুযোগ জীবনে দ্বিতীয় বার আর পাবে কি-না সেটার নিশ্চয়তা কি। শরীর কেঁপে উঠলো ঈশান। অবশ লাগলো নিজেকে। তার তিতির কে সে ব্যাতিত, অন্য পুরুষ নোংরা ভাবে স্পর্শ করবে এটা ভাবতেই বল হারালো হাঁটুর। তক্তপোশের ওপর বসে পরলো ধপ করে। হাতজোড়া তক্তপোশের ওপর ঠেকিয়ে দূর্বল গলায় বললো,

—’ আমার বাড়িতে যোগাযোগ করো, অমিত। সাজিদ, নাঈমের সাথেও যোগাযোগ করো। ‘
অমিত মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের ফোন নিয়ে বেরিয়ে গেলো ভাঙাচোরা ঘরটা থেকে। তৎক্ষনাৎ টুংটাং শব্দ করে আরও একটা মেসেজ আসলো। ঈশান কম্পিত হাতে সেটা চালু করতেই চোখে পরলো তমা কে। চোখবুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছেলেটা। কি এমন ঘটেছিলো যার কারণে মেয়েদুটো এভাবে বাড়ির বাইরে বের হয়ে এসেছে! মিনিট দশেকের মাথায় ঘরে ঢুকলো অমিত। গম্ভীর হয়ে আছে মুখটা। জানালো সবই। নারায়নগঞ্জ সিটি হসপিটালের নাম করে কল করেছিলো কেউ একজন। ওই মূহুর্তে এতো গভীরে ভাবার মতো অবস্থা ছিলো না কারোরই। ঈশান বুঝলো সেটা। তার এক্সিডেন্টের সময় তিতির টা যদি কলে না থাকতো,তাহলেই এরকম একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটতো না। তিতির হয়তো ফোন কলটাকে বিশ্বাসও করতো না। বাঁ পাশের ব্যাথাটা বাড়ছে মনে হচ্ছে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসবে শীগ্রই। চটজলদি প্রপার মেডিকেল ট্রিটমেন্ট নেওয়া দরকার। যদিও তার সহ, তার সকল লোকদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে এসব সামলানোর।
ঈশান থ মেরে বসে রইলো। কতক্ষণ সময় গড়িয়ে গেলো সেটা হয়তো নিজেও জানে না সে। হিসেব মেলালো বহু কিছুর। পরশু সোমবার। আইনের হিসেবে তাকে কোর্টে তোলার দিন ওটা। এর আগেই ঘেরে ঘ হয়ে গেলো সবটা। অমিত এগিয়ে এলো দু কদম। শান্ত গলায় অনুরোধ করে উঠলো,

—’ স্যার, অনেক হয়েছে। এবার সামনে আসুন। কালকের হেডলাইন না হয় হলেন। ম্যাডাম কে বাঁচাতে ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার ছাড়া গতি কি আর? ‘
ঈশান মুখ তুললো না। ডান হাতের মুঠোতে রিভলভার টা চেপে বসে আছে। দৃষ্টি, ধুলো লেগে থাকা জুতোর দিকে। রাজ্যের চিন্তা ফর্শা পুরুষালি মুখটাতে। অমিতের কথাটা সে নিজেও ভাবছে। ঈশান নিজেও শীতল গলায় বললো,
—’ বউয়ের খাতিরে সব যুক্তি জলে যাক, অমিত। ইয়াজ মির্জার লোকেশন আজ ভোর হওয়ার আগে চাই আমার। লোকজন তৈরি থাকতে বলো। আমার বউ আর বোনের গায়ে একটা আঁচড় যদি লাগে, আমি কারোর পরোয়া করবো না। কাউকে ছাড়বো না। কলিজা কেটে শু য়োর কে খাওয়াবো। ‘

তিতির কে একজন মহিলার তত্তাবধানে নিয়ে আসা হয়েছে একটা আলাদা কামড়ায়। বদ্ধ, ছোট্ট একটা ঘর। শুধু প্রবেশের জন্য ছোট্ট একটা দরজা ছাড়া আর কোনো ফাঁকফোকর নেই। দিন নাকি রাত– এ ঘরে থাকলে, বোঝা মুশকিল। বাইরের শব্দও কানে আসবে না, এ ঘরে কি হচ্ছে বাইরের মানুষ ক্ষুনাক্ষরেও টের পাবে না। ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় একটা লম্বা টেবিল। তবে টেবিলের ঠিক মাঝ বরাবর, ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ অবধি কাচের দেয়াল টানা। এপাশে বসে টেবিলের ওপাশের মানুষটার মুখ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। মহিলাটি অতি আদরের সাথে তিতিরকে এই চেয়ারটায় বসতে বলে দরজা আঁটকে বের হয়ে গেলো। টিমটিমে আলো জ্বলছে। কাঁচের ওপাশ টা একদম অন্ধকার। নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ আর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু হচ্ছে না এখানে।

সময় পার হলে, ঘড়ির কাটা সেকেন্ড থেকে মিনিটে এসে ঠেকতেই দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো। ওপাশের দরজা খুলে গিয়েছে। আলো জ্বালা হয়েছে। এইটুকুন আলোতেও তিতির দেখতে পেলো ওপাশের বলিষ্ঠ শরীরের পুরুষটিকে। থমকালো সে। ভ্রু জোড়া অস্বাভাবিক কুঁচকে এলো। তবে মুখে বললো না কিছু। সরু চোখে খেয়াল করতেই কাঁচের দরজার ফাঁক গলিয়ে, বুঝতে পারলো মানুষটির মুখটি কালো কাপড়ে ঢাকা। সম্ভবত চোখজোড়া শুধু বের করে রাখা। তবে এই কাঁচের কারণে সে চোখজোড়া স্পষ্ট বুঝতে পারলো না সে।
চেয়ার টানার বিরক্তিকর একটা শব্দ হলো। তিতিরের এপাশ থেকে সেই মহিলা টি এসে একটা কাগজ রেখে গেলো তিতিরের সামনে। ঝুঁকে তাকতেই আধো অন্ধকারে বড় অক্ষরগুলো নজরে এলো। তার আর ঈশানের ডিভোর্স লেটার।

—’ ওয়েলকাম, ওয়েলকাম তিতিরপাখি। ওয়েলকাম মির্জা ম্যানসনে। ‘
দেয়ালের ওপরে এদিকটায় একটা ছোট্ট বক্সমতো। সপটা থেকেই আওয়াজ শুনতে পারা যাচ্ছে ওপাশের মানুষটার। বেশ ভারি কন্ঠস্বর।
—’ ইয়াজ মির্জা? ‘ বিরবির করে বলে উঠলো তিতির। তবে এই বদ্ধ ঘরের ভিতর ওইটুকু শব্দই বেশ তীক্ষ্ণ শোনালো। কানে গেলো ইয়াজের। চাপা হাসলো।
—’ পরিচয় না দিতেই চিনে গেলেন, মিস রেহনুমা? ‘
—’ মিসেস দেওয়ান বলুন। মিস নেই আর, সেটা জানেন নিশ্চয়। ‘
—’ আমার কাছে আজীবন তুমি মিস থাকবে, তিতিরপাখি। ‘
—’ সেটা আপনার ইচ্ছে। আমি তার ধার ধারবো কেনো! ‘
ইয়াজ মির্জা খানিকটা শব্দ করেই হাসলো। লোকটার মুখটা স্পষ্ট দেখতে না পারলেও, সেই মেকি হাসিটা ঠাহর করতে পারলো তিতির। হাসিটা কেমন অন্যরকম লাগলো। এতক্ষণের ভয় ভয় অনূভুতিটা আচমকাই কেটে গেলো কেনো জানি। লোকটা তার সমানে আসছে না। এমনকি এতক্ষণ একটা মহিলা দেখভাল করেছে তার। সে-ই মহিলাই জানিয়েছে এরকম আরেকটা কামড়ায় রাখা হয়েছে তমা কে। এখনো ঘুম ভাঙেনি তার। ওষুধের প্রভাব না-কি রয়েই গিয়েছে। লোকটা কোনো ধরনের অ শালীন স্প র্শ এখন অবধি করেনি। তাদের নিয়ে আসার সময়ও গায়ে হাত লাগানো হয়নি। ব ন্দুক মাথায় ঠেকিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। তিতিরের সাহস হলো বড্ড। শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো। হাতের কনুই টেবিলে ভর করে ঠান্ডা গলায় বললো,

—’ কি চান আপনি? ‘
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ান বলেনি? ‘
তিতির একপেশে হাসলো। ইয়াজের ওপাশে বেশ বড় একটা মনিটর। তিতির তাকে স্পর্শত দেখতে না পেলেও, সে পারছে দেখতে। মেয়েটার চোখেমুখে কি ভীষন দৃঢ়তা। তিতির বাঁকা গলায় বললো,
—’ আপনার মনে হয়, সে আমার কাছে আসলে এসব ফালতু বিষয় নিয়ে আলাপের সময় হয় আমাদের? ‘
—’ না হওয়ারই কথা। আপাদমস্তক একটা মিথ্যাবাদিকে বিয়ে করেছো তুমি। তা জানো? ‘
—’ করলে করেছি। তাতে আপনার সমস্যা কি? ‘
—’ সমস্যা যদি কারোর হয়, সেটা তো আমারই। ‘
—’ কারণ? ‘
—’ তোমাকে ভেঙেচুরে চাইলাম আমি। ঈশান কিভাবে পেয়ে গেলো? ‘
—’ আমি ওর ভাগ্যে ছিলাম। খোদা আমাদের তৈরি করেছেন একে অপরের জন্য। ‘
হুংকার দিয়ে উঠলো মানুষটা। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ তুমি আমার।’
—’ আপনার স্বপ্নে। ‘
—’ এতদিন ছিলে। আজকের পর থেকে বাস্তবেও তুমি আমার। ছুঁ য়ে অনূভব করবো। শুধু আমি করবো।’
তিতির হাসলো। হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে কাগজগুলো তুলে নিতে নিতে বললো,
—’ এসব ফালতু কাগজ আবার আমার সামনে নিয়ে এসেছেন! সই যে আমি করবো না। এটা টের পাননি?

—’ সইও করবে। আমাকে বিয়েও করবে। আমার সাথে বি ছানায়ও যাবে। আর আমার আ’দরে চিৎকার করে কাঁদবেও। সুখের কান্না। ‘
কপালে আঙুল ডললো তিতির। উদাস গলায় বলল,
—’ সে তো ঈশান আরশাদ দেওয়ান কাছে থাকলে রোজ কাঁ’দি। সুখের কান্না। সকাল, বিকেল, রাত…সময় -অসময়! লোকটা আমি বলতে উ ন্মাদ, জানেন তো। ‘
কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পরলো ইয়াজের। তিতির কি ইঙ্গিত করলো সেটা বুঝতেই।
এক পেশে হেসে ফিচেল সুরে বললো,
—’ আমি এখন গিয়ে তোমাকে ছুঁ য়ে দিলে, বাঁধা দিতে পারবে তুমি? তোমার ঈশান পারবে তোমার সন্ধান করতে? তোমাকে বাঁচাতে? ও আসতে আসতে ওর বউকে আমি টে স্ট করে ফেলতে পারি। ‘
ঘৃনায় চোখমুখ কুঁচকে এলো তিতিডের। তবে ইয়াজের কথা সত্য। ওরকম পুরুষ মানুষ একবার কাছে এলে, সে মুখে যতই বলুক, বাঁধা দেওয়ার শক্তি মোটেই পাবে না। ইয়াজ বুঝলো তিতিরের নরবতার মানে। হাস্কিস্বরে বললো,

—’ আমাট পা রফরমেন্স তোমার হাসবেন্ডের ঢের বেটার। ট্রাস্ট মি। পুরো স্যা’টিসফাইড করে দেবো, স্বামীকে ভুলে যাবে। এতটুকু ভরসা করতে পারো। একবার বি’ছানায় স্বইচ্ছায় গিয়েই দেখো। আমার সাথে তালে তাল মিলিয়েই দেখো। ‘
তিডির ভয় পেয়েছে এটা বুঝতে দিলো না, তবে সাহস হারালো না সে, আর না তো নিজের ভয় টুকু বুঝতে দিলো ইয়াজকে।
ইয়াজের তালে তাল মিলিয়ে নিজেও বাঁকা গলাতেই বললো,
—’ নেহি চাহিয়ে মুঝকো তেরি সেকেন্ড হ্যান্ড জাওয়ানি! থ্যাংক ইউউউ… আমাকে কি পাগলা কু কুরে কামড়েছে? নাকি আপনাকে? ঈশান আরশাদের বউ কে বিছানায় নিতে চাইছেন? একটু বেশিই দুঃসাহস দেখিয়ে ফেললেন না? তাগড়া পুরুষ থেকে, পথে পথে হাততালি দেওয়া পাবলিক হওয়ার এতো শখ! সো ব্যাড…’
দাঁতে দাঁত পিষে জোরে জোরে শ্বাস টানলো ইয়াজ। রাগা যাবে না মোটেই, নিজেকে এটাই বুঝ দিলো হয়তো।
তিতিরের অপমানটুকু শান্ত ভাবেই হজম করে নিলো সে। ছোট্ট একটা বেল চেপে বাইরের লোকদের ইশারা করলো কিছু একটা। তৎক্ষনাৎ ওদিকটায় আরেকটা দরজা খুলে গেলো। দরজা খুলতেই তিতিরের কানে এসে লাগলো অতি পরিচিত কন্ঠের চিৎকার। তমা! আঁতকে উঠলো মেয়েটা।

—’ তমাকে কি করেছেন আপনি? আমাকে বলা হয়েছে ও ঠিক আছে। তাহলে এসব কি?’
—’ ঠিক তো থাকতই। ঠিকই রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি আমার বাধ্য থাকবে। সেটা তো হচ্ছে না। তাই দু’জন তাগড়া পুরুষ পাঠিয়েছি ওর ঘরে। ‘
—’ আমার বোনকে…’
—’ উহু উহু। আগেই ভুল বোঝা যাবে না কিন্তু। আমার নিদের্শ ছাড়া ওকে কেউ ছোবে না আপাতত। মেয়েটা ভয়েই চেচাচ্ছে। তবে তুমি কথা না শুনলে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। বুঝতেই পারছো।’
পাশের রুম থেকে তমা’র আ র্তনাদ শুনতে পাওয়া গেলো আরেকদফা। শিরদাঁড়া বেশে শীতল স্রোত নেমে গেলো তিতিরের। টেবিলের ওপাশের মুখোশধারী বলিষ্ঠ দেহের মানুষটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো সে।
ইয়াজ মির্জা শব্দহীন হাসলো, মুখের মুখোশটা টেনেটুনে ঠিকঠাক করে বললো,
—’ সিদ্ধান্ত একান্তই তোমার, তিতিরপাখি । ঈশান কে ডিভোর্স দিতে সই টা করবে, নাকি তোমার বোনটাকে দশ জনে ছিড়েখুঁ ড়ে খাবে, সেটার সু খ চিৎকার সহ্য করবে। লাইভ টেলিকাস্টও করতে পারি তুমি চাইলে…চয়েজ ইজ ইও্যরস্! তোমাকে আমার বি ছানাতেও এভাবেই নেবো, জোর করেই। কি আর করার,নিজ থেকে তুমি না এলে।’
তিতিরের চোখজোড়া ভিজে উঠলো এ যাত্রায়। ডিভোর্স পেপারের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদেও ফেললো। কান্না চেপে শুধালো,

—’ আমি আপনার নজরে পরলাম কি করে? ‘
ইয়াজ সময় নিলো না। উত্তর করলো সাবলীল ভাবেই।
—’ তোমাকে খু’ন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওই রুপ, মাশাআল্লাহ। ঘায়েল করে দিয়েছো। উল্টো আমিই খু ন হয়ে গিয়েছি। ‘
—’ কত বছর আগের সেটা? ‘
—’ বছর ছয়। ‘
—’ বহুদিন। অনেক ভালোবাসেন তো তাহলে। ‘
—’ সন্দেহ আছে? ‘
—’ তাহলে ছোটপুর সাথে কাহিনি করলেন কেনো? ‘
—’ জেলাস? ‘
—’ ধরুন হচ্ছি। ‘
ইয়াজ চুপ করে রইলো খানিকক্ষণ। তারপর বলে উঠলো,
—’ ঈশান কে বাজিয়ে দেখতে। ‘
—’ কতগুলো মেয়ের সাথে শু য়েছেন? ‘
প্রশ্নটা ঝোকের বশেই করে ফেলেছে তিতির। ইয়াজ এই প্রথম ইতস্তত করলো বোধহয়। গম্ভীর হলো মুখটা। নিকষ অন্ধকার নামলো মুখটাতে। দেখে মনে হবে অপরাধবোধ জাগ্রত হচ্ছে।

—’ গুনি নি। ‘
—’ শেষ কবে মেয়েদের নিয়েছেন বি ছানায়? ‘
—’ গতকাল।’
বিদ্রুপের হাসি তিতিরের সুশ্রী মুখজুড়ে। ইয়াজও বাধ্যের মতো উত্তর করে যাচ্ছে। মেয়েটার মুখের ঘৃনা উপচে পরতে দেখলো।
—’ এই নোংরা চরিত্র নিয়ে, কোন মুখে বলছেন আমাকে চান? সাহস হয় কি করে? ‘
—’ বহু সাহস আমার। ভালোবাসি তোমাকে।’
শব্দ করেই হাসলো মেয়েটা। সহজে থামতে চায় না সে হাসি। যেনো এই মূহুর্তে কোনো অত্যন্ত হাসির কৌতুক শুনেছে সে। হাসতে হাসতে দু’হাতে মুখ ডললো সে। ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলো,
—’ আপনি আর ভালোবাসা? ভালোবাসা মানে কি, সেটা বোঝেন? দিনের পর দিন অন্য মেয়েদের সাথে শু য়ে এসে, আমাকে এ-সব শোনাচ্ছেন? সব বি ছানায় নেওয়ার ধান্দা!’
—’ তাহলে তাই। তোমাকে বি ছানাতেই নিতে চাই আমি। আর তুমি আমার দোষ দেখছে। তোমার হাসবেন্ডের বেলায় শব দোষ মাফ? ‘
—’ ভাই – বোন সবই তো এক গোয়ালের গরু। আর কিছু পারেন না পারেন, ভালোবাসার দোহাই দিয়েই হোক, কিংবা জোর-জবরদস্তি ছলনা করে। ধান্দা ওই একটাই। ‘
ইয়াজ তিতিরের একটা অপমানও সম্ভবত গায়ে লাগাচ্ছে না। এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে দাড়ালো মাঝখানের ওই পার্টিশনের এখানটায়। খালি চোখেই তিতিরকে দেখা গেলো স্পষ্ট। বলাবাহুল্য তিতিরেরও চোখে পরলো ওপাশের মানুষটাকে। এতক্ষণ দুরত্ব আর অন্ধকারের জন্য যেটা বোঝা যাচ্ছিলো না। এখন সেটা যাচ্ছে। তিতির ঘাড় উচিয়ে দেয়ালের মাঝামাঝি আটকে রাখা একটা মাঝারি বক্সের দিকে তাকিয়ে ব্যাঙ্গ গলায় বললো,

—’ এইটুকুন একটা ঘর, তার মাঝখানে এরকম কাঁচের ঘোলা দেয়াল টেনে রেখেছেন, আবার একই টেবিলের এপাশ ওপাশে বসেও, আপনার কন্ঠস্বর শুনতে হচ্ছে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাহায্য! আর মুখ তো কালো কাপড়ে ঢেকে রেখেছেনই। নিজের মুখ দেখাচ্ছেন না কেনো? বি ছানায় নিলে তো সবই দেখাবেন, নাকি তখনও মুখে কালো কাপড়ে ঢেকে রাখবেন! মুখ দেখাতে লজ্জা! হাস্যকর।
হিসহিসিয়ে উঠলো ইয়াজ,
—’ আগে আমার বিছানায় কাতরাও তুমি, তারপর না হয়… ‘
—’ দারুণ চরিত্র, কনফার্ম জান্নাতি পুরুষ।
একজন পুরুষ মানুষ কাপড় খু লে, চারজন মেয়েকে একসাথে,নিজের ক্ষমতা জাহির করবে, অথচ নিজের মুখ কাউকে দেখাবে না ! ভীষন পর্দা শীল পুরুষ আপনি। এতো লজ্জা নিয়ে, নারী হওয়া উচিত ছিলো আপনার। চাইলে সার্জারী করে নারী হতে পারেন, খরচ আমার। হবেন? ‘
—’ নাহ, এইরকমই ঠিক আছি। তোমাকে কাঁ দাতে পারলেই জীবন সার্থক। বিশ্বাস করো। ‘
—’ তবে তো নিদারুণ অপূর্ণতা নিয়ে খুব শীগ্রই দুনিয়া ছাড়তে হবে। ‘
—’ আমাকে কে মা’রবে? তুমি? না-কি তোমার খু’নি হাসবেন্ড? ‘
ঈশানকে খু’নি বলায় যথাপরং বিরক্ত হলো তিতির। মুখের হাসি হাসি ভাবটা কেটো গেলো তৎক্ষনাৎ। এতক্ষণের মতো সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করতে পারলো না। ইয়াজ পিছিয়ে দাঁড়ালো।

—’ তোমার স্বামী তার ওই দু’খানা হাত দিয়ে তোমাকে শুধু আদর করে,এটাই ধারনা তোমার। নাহ? সেটা কতটা ভুল, জানো কি? তার হাতে কতগুলো মার্ডার হয়েছে, জানা আছে তোমার? ‘
তিতির থমকায়। ইয়াজের কন্ঠস্বরে ভীষন দৃঢ়তা। ঈশান খু ন করেছে! কেনো? কি কারণে? তবে যে অবিশ্বাস সে এতোদিনেও করেনি, আজকে ইয়াজ মির্জার মতো একটা কালপ্রিটের কথায় সে অবিশ্বাস জাগবে না তার মনে। ইয়াজ বোধহয় জানে সেটা। সুতরাং কথা বলে সময় নষ্ট করলো না। তিতিরের চোখজোড়া ধাঁধিয়ে দিয়ে সে যে খানটায় দাঁড়িয়ে তার ঠিক পিছনের দেয়ালটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। ইয়াজের কন্ঠস্বর ছাপিয়ে সেখানটায় চালু হয়ে গেলো একটা ভিডিও। সিনেমা হলের মতো গমগমে শব্দে চকিত পিছন ঘুরলো মেয়েটা। চমকালো ভয়াবহভাবে। পরপর গু লির শব্দ হলো। একবার দু’বার নয়। পরপর সাত সাতটা গু লি চললো একটা মানুষের ওপর। রাতের অন্ধকারে কোনো এক নদী তীরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ঝাঁঝড়া হয়ে গেলো ছেলেটার বু ক। লুটিয়ে পরলো মাটিতে। র ক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা টা জায়গা। মানুষটাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বু কে পা চেপে ধরলো রি ভলবার হাতের সেই মানুষ টি। চোখের পলকে লা শটা ফেলে দেওয়া হলো নদীতে। আর এই ছয় মিনিটের ভিডিও তে গোটা টা জুড়ে ঈশান আর একটা অচেনা ছেলে। কি নি’ষ্ঠুর মৃ’ত্যু দিলো ছেলে টাকে।

তিতির আর চোখ আঁটকে রাখতে পারলো না ওদিকে। গা গুলিয়ে উঠলো তার। ঝুঁকে বসে হড়বড়িয়ে বমি করে ফেললো। ইয়াজ ব্যাস্ত হলো বড্ড। তিতিরের দেখাশোনার জন্য বরাদ্দ করা মহিলাটিকে চেঁচিয়ে আদেশ ছুড়লো ভিতরে আসার। মহিলা আসলে, তিতিরকে বসানো হলো চেয়ারে। পানির ছেটা দেওয়া হলো মুখে। দূর্বল লাগছে মেয়েটার। এরকম একটা নৃ শংস ঘটনার সাক্ষী হলো সে! ইয়াজ চিন্তিত গলায় আরও কিছু শুধাবে তার আগেই এপাশ থেকে গর্জে উঠলো তিতির। টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাসটা, সামনের পাঁচিলের দিকে সজোরে ছুড়ে দিলো, ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো জিনিসটা।
—’ আমি বিশ্বাস করি না এসব। ‘
—’ চোখ থাকতেও অন্ধ বলবো তাহলে? ভিডিওটা আবার চালু করি? কোনো ধরনের এআই নয় এটা। আবার দেখে নিশ্চিত হলে না হয়। ‘

—’ নাআ…’
পুনরায় চেঁচিয়েই উঠলো মেয়েটা। ইয়াজ বাঁকা হাসলো।
—’ আরও এরকম অজস্র প্রমান আছে। লাগবে? স্বামী ভক্ত হওয়া ভালো। এতোটাও নয়, মিসেস দেওয়ান। এখন নিশ্চয় এটা বলিয়েন না, আপনার স্বামীর নিশ্চয় কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ছিলো! কি এমন গুরত্বপূর্ণ কারণ বলুন তো। যার কারণে একটা মানুষকে খু ন করতে হয়। তাও আবার এতোটা নৃ শংস ভাবে! যে মানুষ কি-না একজন বিজনেসম্যান। বিজনেসের খাতিরে মানুষ খু ন করতে হয় বুঝি? হ্যা? আপনার যুক্তি কি বলে? ‘
তিতির জবাব দিতে পারে না। মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। পুনরায় পেট গুলিয়ে উঠছে তার। মাথায় এসে ভিড় জমায় ঈশানের কথাগুলো। লোকটা দিনের পর দিন কি লুকিয়ে রেখেছে, যার জন্য এতোটা ভয় পেতো। সে ভুল বুঝবে কি-না, ছেড়ে যাবে কি-না। এসবের ভয়! এটাই সে-সব?
—’ তুমি চাইলে এরকম গোটা বিশেক ভিডিও দেখতেই পারি। ‘
—’ চাই না। ‘
—’ তাহলে বলো, একজন খু’নি যে কি-না একের পর খু’ন, রে প করে যাচ্ছে তার সাথে সংসার করবে, নাকি জীবনটা গুছিয়ে নেবে সে পাপের থেকে সরে গিয়ে।’
—’ কোথায় সরে গিয়ে, আপনার কাছে? ‘
—’ কোনো পূন্যবান ব্যাক্তির কাছেও যেতে পারো, যে কি-না তোমাকে বড্ড ভালোবাসে।’
—’ তাতে তো আপনার কোনো লাভ হলো না। ‘
—’ আছে এমন কোনো পূন্যবান লোক, যাকে মনে হচ্ছে এখন? যার ভালোবাসা পায়ে ঠুকে এই বিশুদ্ধ পুরুষের গলায় ঝুলে গিয়েছিলে? থাকলে যা-ও না হয় তার কাছে, নইলো আমি তো আছিই। দিনশেষে তোমার ভালোবাসার কমতি টা হবে না। ‘
তিতির স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো টেবিলের দিকে। ইয়াজের শেষ কথাটায় অবচেতন মন ইঙ্গিত দিলো কিছু একটা। একনজর দেয়ালে সেটে থাকা সাউন্ডবক্সে দিয়ে তাকালো সোজাসুজি। সম্ভবত মিনিট দুয়েক কোনো কথা বললো না মেয়েটা। ঈশানের কর্মকান্ডের শক, নাকি অন্য কিছু তা মুখ দেখে বোঝা গেলো না।

—’ তমা…তমা? ‘
জানালার এদিকে চাপা মেয়েলি ডাকে নড়েচড়ে বসলো মেয়েটা । বিছানা থেকে উঠে গিয়ে কান ঠেকালো বদ্ধ জানালায়… আরেকদফা ডাক পরতেই নিঃশব্দে খুলে ফেললো জানালা। তীব্র উত্তেজনায় পানি চলে এলো চোখে। চোখমুখ ফুলে আছে দুজন রমনীরই। তিতিরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে একটা পৌঢ় মহিলা। মহিলা এদিক-ওদিক করছে ব্যাস্ত মুখে। তিতির আর সময় নষ্ট করলো না, দ্রুত হাতে খুলে ফেললো দরজার তালা। মহিলা টা একপ্রকার ঠেলে ভিতরে নিয়ে এলো তিতির কে। দরজা লাগালো তৎক্ষনাৎ। তমা ঝাপিয়ে পরলো বোনের ওপর। হু হু করে কেঁদে উঠলো দু’জনেই। তখন তমার আর্তনাদ শুনে কি ভয়টাই না পেয়োছিলো তিতির। ওদিকে তমারও একই অবস্থা বলা চলে। ইয়াজ মির্জা তিতির কে কোথায় রেখেছে, কি অবস্থায় আছে তা না জানা অবধি কি করে শান্ত থাকতো দুজনে!
রাতের শেষ ভাগ এখন। ইয়াজ মির্জার কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে, তিতির নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে এসেছিলো আরও ঘন্টা খানেক আগে। তার আদেশে তিতিরকে আবার কামড়ায় বন্ধ করে ইয়াজ মির্জা বেরিয়েছে এইখান থেকে। আশেপাশে কড়া পাহারায় রেখে গিয়েছে মেয়ে দুটোকে। দু’জন দু’জনকে এভাবে অক্ষত অবস্থায় দেখে হাফ ছাড়লো যেনো। ইয়াজ যে খারাপ কিছু ঘটায় নি মেয়েদের সাথে সেটাও জানালো একে অপরকে। তমার নজর গেলো অদূরে দাড়িয়ে থাকা মহিলা টির দিকে। সে যতদূর জানে এই মহিলাও ইয়াজের বেতনভুক্ত মানুষ। তাহলে তিতির এখানে এলো কি করে! সেই প্রশ্নের জবাবও দিলো তিতিরই। ব্যাস্ত গলায় বললো,

—’ পালাবো আমরা। ‘
—’ পালাবি মানে ? কিভাবে? ‘
—’ উনি সাহায্য করবেন আমাদের। ‘ মহিলা টিকে ইশারা করে বললো তিতির। তমা অবিশ্বাসের নজরে তাকালো মহিলার দিকে।
—’ উনি তো..।’
তমাকে বুঝিয়ে দিলো তিতিরই। উনি ইয়াজ মির্জারই লোক। তবে বাধ্য হয়ে আছেন এখান টায়। তার স্বামী এককালে ছিলো ইয়াজ মির্জার আন্ডারে। তার মৃত্যুর পর ইয়াজই আবার নিয়ে এসেছে তাকেও। তার ছেলে নাকি এখানে কাজ করে বছর ধরে। সেই ছেলের জন্য এখানে আসতে। তবে মাসখানেক আগে জেনেছেন অন্য সত্য। তার স্বামী সন্তান দুজনেই বহু আগে মারা পরেছে ইয়াজ মির্জার হাতে। আটকা পরেছে সে নিজেও।
মহিলা একটু অধৈর্য হলো। তিতির তমার দিকে এগিয়ে এসে, নিচু গলায় আকুল হয়ে বলে উঠলো,
—’ আর দেরি করা যাবে না, ম্যাডাম। ভোর হলে এখানকার লোকজন বাড়বে। বাইরের পাহারাদার ভিতরে চলে আসবে। তখন আর বের হতে পারবেন না।’

তিতির একহাতে চেপে ধরলো তমার কবজি। মাথা ঝাকিয়ে কদম মেলালো মহিলাটির পিছন পিছন।
ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে আশেপাশে। পিছনে একটা ছোট্ট দরজা দিয়ে একদমই শব্দহীন বেড়িয়ে এলো তিনজন। তিতির তমা দুজনেই আশ্চর্য হলো। এতো সহজে বের হতে পারবে এটা কল্পনায়ও ছিলো না তাদের। তবে মহিলার এখানকার সবকিছুই একদম নখদর্পনে তা স্বীকার করতেই হলো। এবং নিঃসন্দেহে ইয়াজ মির্জার বিশ্বস্ত সেটার প্রশ্নের অবকাশ রাখে না। এদিকটা ফাঁকা পরে আছে। মহিলার কাছ থেকে জানতে পারা গেলো, পরিত্যাক্ত এই গেটের চাবি একমাত্র তার কাছেই থাকে। এখান দিয়ে সোজা জঙ্গলের মাঝ বরাবর পার হয়ে শীতলক্ষ্যার কিনারা ঘেঁষে বেরিয়ে যেতে হবে। তিতির বা তমা কারোরই ফোনই সঙ্গে নেই। সুতরাং বিপদে পরলে সাহায্য চাওয়ার মতো কোনো অবস্থা থাকবে না। ঘুটঘুটে অন্ধকার এখনো। দিনের আলো ফোঁটার আগে পার হতে হবে এদিকটা। তমা, তিতির দুজনেই দেরি করলো না আর। মহিলা একটা ছোট্ট টর্চ হাতে ধরিয়ে দিলো দু’জনের। তিতির আবেগে ভাসলো এ যাত্রায়। মহিলা কে জড়িয়ে ধরলো কৃতজ্ঞতায়।

—’ কেনো করলেন এতো বড় উপকার জানা নেই। নিজেকেই বা কেনো এরকম বিপদে ফেললেন? ইয়াজ মির্জা জানতে পারলে রেহাই দেবে না আপনাকে। আমার জন্য আপনি…’
মহিলা আলতো হাত বুলিয়ে দিলো তিতিরের চুলে। অসহায় গলায় বললো,
—’ আমার আর হারানোর মতো কি-ই বা আছে? ওই নরপি শাচের হাতে তোমাদের মতো দু’টো মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যেতে দেখবো ? তুমি কি মনে করো, ওরা তোমাদের আজকের মতো না ছুঁয়ে কাটিয়ে দেবে দিনের পর দিন? একদম না। ছিড়েখুঁ ড়ে খেতো একদম। আমার একটা মেয়ে ছিলো, তাকেও এভাবে শেষ করেছে। এখন আমি বৃদ্ধ মানুষ। ওদের কবজায় দিনের পর দিন।। কেনো পালাই না, তার কারণ এখান থেকে পালিয়ে আমার আশ্রয় নেই আর। ইয়াজ মির্জা ফের মেরেই ফেলবে। তার চেয়ে ভালো, এখানে একটা আশ্রয় আর তিনবেলা ভাত তো জুটছে। তোমরা চলে যাও, এমন সুযোগ আর পাবে না। আমি জানিয়েছি তোমাদের দুজনকেই ঘুমের ওষুধ দিয়েছি আমি। সে কারণে পাহারাও এতো টা স্থিতিশীল। আলো ফোটার আগে চলে যাও। কোথা দিয়ে যাবে, মনে আছে তো? ‘

মাথা ঝাকালো তিতির। মনে আছে । সময় নষ্ট করার মানেই হয় না আর। সময় দেখতে পারলে ভালো হতো। তবে এই মূহুর্তে সে উপায় নেই। মহিলাকে বিদায় দিয়ে বোনের হাত ধরে পা বাড়ালো অন্ধকারের পথে।
আধঘন্টার মধ্যে জঙ্গলের আঁকাবাকা পথ পেরিয়ে তমা- তিতির যখন খোলা আকাশের দেখা পেলো তখনও রাতের আঁধার কাটেনি। যতটা দূর ভেবেছিলো ততটাও দূর নয় মোটেই। এদিকটা থেকে লোকালয় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে অনেকটা দূরে। শহর কি-না বোঝা গেলো না।। তবে আলো জ্বলছে সেদিকটায়। নদীতে মালবাহী নৌকাগুলোও চোখে পরছে। জেলেরা সকাল সকাল বেরিয়ে পরেছে জীবিকার তাগিদে। দু’জনেই আরও মিনিট চল্লিশ হাঁটার ওপর সত্যিই মানুষ জনের দেখা পেলো। শহরের মূলকেন্দ্র না হলেও, শহরের শুরু সম্ভবত এখান থেকেই। গলা শুকিয়ে কাট হয়ে এসেছে। এতো ভোরে স্থানীয় জেলেদের ছাড়া আর কোনো সাধারনত মানুষকে চোখে পরছে না। আর না তো কোনো দোকানপাট এখনো খুলেছে! এই এরিয়া জলদিই পার হয়ে যাওয়া দরকার। তারা পায়ে হেঁটে আর কতই বা দূরে আসতে পেরেছে। দিনের আলো ফুটেছে মানে খুব সম্ভবত ইয়াজ মির্জার কানে পৌছে গিয়েছে তাদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। আর তাই যদি হয়, লোক লাগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবে না লোকটা। আর এখনো বেশিদূর যে যেতে পারেনি তারা, এটা নিঃসন্দেহে টের পাবে লোকটা।

—’ ম্যাডাম রা দু’জনেই ওখান থেকে শেষ রাতের দিকেই পালিয়ে গিয়েছে, স্যার। ‘
অমিতের মুখে এরকম একটা তথ্য শুনে ঈশানের খুশি হওয়া উচিত নাকি, বিরক্ত বুঝে এলো না। তারই বেশি দেরি হয় সবেতে, নাকি মেয়েটাই বেশি এডভান্স মাথায় খেললো না। এই এক রাতের মধ্যে কত কি-ই যে ঘটে গেলো। বিরক্ত মুখ, কাঁধ টা নাড়ালো ঈশান। ব্যাথায় টনটন করছে, এখনো অবধি হসপিটালের ট্রিটমেন্ট কপালে জুটলো না। আর না তো বউয়ের মুখ দর্শন। কোথায় একটু ভেবেছিলো, এখন অন্তত এতদিন পর বউয়ের দেখা পাবে। তা নয়। ত মেয়ে পাখির মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করতে ব্যাস্ত। ঈশান বিরক্ত মুখেই আদেশ ছুড়লো।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬

—’ গোটা এলাকা স্ক্যান করে ফেলো। বেশিদূর যেতে পারবে না। সহি সালামতে দুজনকে নিয়ে আসবে আমার কাছে। জঙ্গলের ওই রাস্তা দিয়ে গিয়েছে মানে, জেলেপল্লিতে উঠবে। কুইক। ‘
ঈশানের বলতে দেরি, তবে তার লোকদের দ্রুত পায়ে রওনা দিতে দেরি হলো না। ইয়াজ মির্জার ডেরার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ঈশান। ভিতরের সবকটাকে এরইমধ্যে শু য়িয়ে দিয়েছে তার লোকজন। তবে চিন্তার ছাপ সরছে না তার মুখ থেকে। যতক্ষণ অবধি তিতিরকে নিজের হেফাজতে নিতে না পারছে আর ইয়াজ মির্জার সাথে আরেকদফা মুখোমুখি না হচ্ছে ততক্ষণ মোটেই শান্তি পাবে না সে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৭