আমার আলাদিন পর্ব ৬২
জাবিন ফোরকান
সকাল সকাল ইযানকে গোসল করিয়ে, খাইয়ে গুছিয়ে দিয়েছে ইরাম। ছেলে ব্যস্ত দাদীর সঙ্গে খেলায়। এর মাঝেই দ্রুত তৈরি হয়ে নিল সে। আলমারি থেকে নতুন একটা গোলাপী শাড়ি বের করল। এই শাড়িটা তার অন্যান্য শাড়ির থেকে আলাদা। আধুনিক এবং ট্রেন্ডি ফ্রেইল ডিজাইনের। তার পছন্দ নয়, সাইবান পছন্দ করে কিনে এনেছিল। একবারও পড়া হয়নি। তাই আজ সেটা পড়ল। আয়নায় নিজেকে দেখল। নাহ, খুব একটা মন্দ লাগছেনা। চুল আঁচড়ে ছেড়ে দিয়ে হালকা একটু ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম মেখে নিল মুখে। এমন সময়ে রুমের জাকুযির দরজাটা খুলে গেল। অপর প্রান্তে দৃশ্যমান হলো সাইবান। উদাম শরীর, টপটপ করে পানি গড়িয়ে নামছে বুক বেয়ে। শুধু একটা কালো তোয়ালে প্যাঁচানো কোমরে। চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বেখেয়ালি ভাবেই রুমের ভেতর ঢুকল সে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ানো ইরামকে রেখে থমকাল। গাঢ় চোখে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল অর্ধাঙ্গিনীকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আয়নায় তার প্রতিফলন দেখে খানিকটা লজ্জাবোধ করল ইরাম।
“কি দেখছ?”
প্রশ্নটা না করে পারলনা রমণী। সাইবান দুই বাহু বুকে বেঁধে এতটা নরম দৃষ্টিতে তাকাল যে তাতে অন্তর গলে যেতে বাধ্য। তার ফুলেফেঁপে ওঠা মাংসপেশী চোখে লাগল বেশ। গলায় খানিকটা আবেদনময় কর্কশ ভাব নিয়ে সে বলল,
“আমার অর্ধেক দুনিয়াকে।”
ইরাম উথলিত হলো। ঝট করে পিছনে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“অর্ধেক কেন? বাকি অর্ধেক কে?”
সাইবান লম্বা দুই পায়ে ইরামের সন্নিকটে পৌঁছে গেল। এতটা কাছ থেকে তার শরীরী উত্তাপ ছুঁয়ে গেল রমণীকে, দারুণভাবে। মুখ লুকিয়ে ফেলতে চাইলেও সম্ভব হলোনা। সাইবান তার চিবুক ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে ফিসফিস করল,
“সাহরান আলাদিন। আমার পোটলা।”
ইরাম টুকটুকে হলো। তার সেই অভিব্যক্তিতে হৃদয় আন্দোলিত হলো সাইবানের। ঝুঁকে সেই রাঙা গালে নিজের ভেজা ঠোঁট ছুঁয়ে দিল সে, আঁকতে লাগল আদুরে ভালোবাসার চিহ্ন। ইরাম খানিকটা কেঁপে উঠল, পরক্ষণেই ফিক করে হেসে ফেলল। সাইবানের বুকে হাত ঠেকিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আর কোর্টে পৌঁছাতে হবেনা। জলদি আসো।”
এটুকু বলেই ইরাম রীতিমত ছুটে পগারপার হলো। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসল সাইবান। বউ তার ঠিকই বলেছে। আর কয়েক মিনিট পাওয়া গেলে আজ আর আদালতে যাওয়া হতনা। মাথা ঝেড়ে সে ক্লজেট থেকে নিজের পোশাক বের করে নিল।
ইরাম নিচে নেমে ডাইন ইন টেবিল থেকে ব্রেড এবং জ্যাম দিয়ে ছোট একটা স্যান্ডউইচ বানিয়ে দ্রুত খেয়ে নিল। সকালে ইযানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় চা বাদে কিছু মুখে দেয়া হয়নি। জ্যাম স্যান্ডউইচের শেষ কামড় মুখে পুরেছে ঠিক এমন সময়েই পদশব্দ ভেসে এলো তার কানে। মাথা তুলে তাকাতেই বিস্মিত হলো ইরাম। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে সাইবান। তবে আজ, ছেলেটাকে বেশ অন্যরকম দেখতে লাগছে। পরিধানে একটা গোলাপী শার্ট আর ঢোলা গোলাপী প্যান্ট। তাকে হাঁটু ছেঁড়া জিন্সে দেখে অভ্যস্থ রমণী। একদিক না একদিক দিয়ে ছেঁড়া থাকবেই, এটাই নাকি ফ্যাশন! তবে আজকে অনেক পরিপাটি। চুলগুলোও জেল দিয়ে হালকা এলোমেলো রেখে আঁচড়ানো। ইরাম তার আগাগোড়া গোলাপী অবয়ব থেকে চোখই সরাতে পারলনা। কারণ তার নিজের শাড়িটাও যে একই বর্ণের! তবে কি সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিলিয়ে পড়েছে?
ইরামের ঠোঁটে সূক্ষ্মতর হাসির রেখা ফুটল। সাইবান নিচে নামতেই ভ্রু তুলে সে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ ম্যাচিং করার শখ হলো যে?”
সাইবান তার দিকে এক নজর তাকাল। পরক্ষণে পরনের গোলাপী শার্টে হাত বুলিয়ে তীর্যক হেসে উত্তর করল,
“যাতে জজ সাহেবা দেখতে পারেন আমাদের মধ্যে কত মিল মহব্বত!”
এবার শব্দ করে না হেসে পারলনা ইরাম। এই ছেলে তাকে গুরুতর মুহূর্তেও বিনোদন দিতে পিছপা হয়না। সাইবান আশেপাশে তাকিয়ে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে ইরামের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ঝুঁকে কানে কানে বলল,
“কেমন লাগছে আমাকে?”
ইরাম এবার লজ্জাবোধ করলনা। বরং দুহাত স্বামীর কোমরে জড়িয়ে পাল্টা ফিসফিস করে জানাল,
“আমার আমার লাগছে।”
পা সামান্য উঁচু করে সাইবানের গালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে ইরাম পুনরায় বলল,
“মাই পিংকি পুঁকি!”
ভ্রু কুঁচকে হিসিয়ে উঠল সাইবান, এক হাতে ইরামের কব্জি খামচে ধরে বলে বসল,
“বেডরুমে চলুন প্লীজ।”
ইরাম এবার তার কাঁধে আলতো চড় দিয়ে হাতটা ধরে পাল্টা টান দিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা ধরল।
“তুমি গেঞ্জি। জমিদার না যে আদালত তোমার বাড়িতে বসবে।”
“গেঞ্জি বলবেন না তো!”
“আচ্ছা। গোলাপী গেঞ্জি বলব এখন থেকে।”
“আপনি কি চান আমি শার্ট খুলে খালি গায়ে কোর্ট কাচারিতে যাই? দেখবেন, পরে মৌমাছিরা ছেঁকে ধরলে আপনিই জেলাস হয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবেন।”
“উফ! এত কথা কীভাবে বলে একটা মানুষ?”
“আল্লাহ মুখ দিয়েছে কথা বলতে। মুখ দিয়ে কথা না বলে কি পোটলার মতন হাগব?”
“অ্যাই! তুমি শুধু আমার কুচুপুকেই পাও সবসময়? কি শত্রুতা তোমার ওর সাথে?”
“এতই চরম শত্রুতা যে ওটাকে পার্মানেন্টলি আমার বাসায় হাগানোর জন্য কোর্ট কাচারিতে দৌঁড়ে মরছি।”
“আলাদিন!”
সমস্ত গাড়ির পথটাই দম্পতির মাঝে খুনসুঁটি হয়ে চলল। কিন্তু আদালতের যত কাছাকাছি পৌঁছাল, ততই গম্ভীরতা বাড়ল।
আজও কাঁটায় কাঁটায় দশটায় এজলাসে বসলেন বিচারক ফারহানা ইয়াসমিন। একের পর এক মামলা ডাকা হলো। প্রায় এক ঘণ্টা বাদে অবশেষে ইরাম আর অরণ্যর মামলার নম্বর এলো। পেশকার ঘোষণা করতেই বিবাদী পক্ষের উকিল শিশির চৌধুরী এবং অরণ্যর উকিল বিচারকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মহিলা সেই উকিলের নাম অর্চি বড়ুয়া। প্রথমদিন জানা হয়নি। পরবর্তীতে আলোচনার সময় জানা গিয়েছে। বেশ তাগড়া উকিল। এই যাবৎকালে হেরেছেন হাতে গোণা দুইটি কেইস। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা এবং অভিব্যক্তিতে সেই প্রভাব স্পষ্ট। অরণ্য পিছনের বেঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখে যাচ্ছে দৃশ্য। তার মাঝে বিনোদনের কমতি নেই। তবে ক্ষণে ক্ষণে চোখ ফিরিয়ে সাইবান আর ইরামকে দেখতে ভুল করছেনা। উভয়ের পোশাক না চাইতেও অসংখ্য দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। ফারহানা নিজের টেবিলে জমা দেয়া কাগজপত্রসমূহ দেখে বললেন,
“বিবাদীপক্ষের লিখিত জবাব পাওয়া গিয়েছে। আপনারা কিছু উপস্থাপন করতে চান?”
শিশির চৌধুরী এগোলেন। দৃঢ় গলায় বললেন,
“জি মহামান্য। বাদী পক্ষ দাবী করেছে জৈবিক পিতা হওয়া সত্ত্বেও বাদীকে নিজের শিশুর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমার শুধু একটাই প্রশ্ন, শিশুর বয়স বর্তমানে নয় মাস। তাহলে এই নয় মাস বাদী কোথায় ছিলেন? কেন এতদিন পরে তার মনে হলো যে আদালতের শরণাপন্ন না হলে ন্যায়বিচার পাবেন না?”
“এটা নিয়ে আপনাদের বক্তব্য কি?”
মাথা ঘুরিয়ে অর্চির কাছে জানতে চাইলেন ফারহানা। অর্চি বেশ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ এক এগিয়ে জানালেন,
“এর উত্তর আমরা অবশ্যই দেব মহামান্য। তবে তার আগে আমি একটি বিষয় আজ আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। আর বিষয়টি অবশ্যই এই মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি মহামান্য অনুমতি দেন তবে পেশ করি?”
ফারহানা মাথা দোলালেন,
“অনুমতি দেয়া হলো।”
সঙ্গে সঙ্গে নীরব সতর্ক হয়ে উঠল। পিছনে হেলে ইরাম এবং আলাদিনকে কিছু বলল। অপরদিকে অর্চি ইশারা করতেই একজন এগিয়ে একটি ট্যাব জমা দিল পেশকারের কাছে। পেশকার বিচারকের টেবিলে সেটি রাখতেই ফারহানা হাতে নিয়ে দেখলেন একটি সিসিটিভি ফুটেজ দৃশ্য। অর্চি কঠোর গলায় বললেন,
“মহামান্য, আপনি যে দৃশ্যটি দেখতে পাচ্ছেন সেটি গত শুনানির দিনের আদালতের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ। যেখানে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, বিবাদীপক্ষের বর্তমান স্বামী মিস্টার সাইবান আলাদিন অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে আমার মক্কেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি আমার মক্কেলের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছেন। আমার আদালতের কাছে এটাই প্রশ্ন, এমন একজন পুরুষ যিনি নিজের আচার আচরণে সংযত নন, পশুর মতন অপরপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তিনি একজন পিতা হিসাবে কতটুকু দায়িত্বশীল হতে পারে? এই ঘটনাই প্রমাণ করে গত নয় মাস শিশুটি নিজের মায়ের বর্তমান বাড়িতে কতটা অবহেলা এবং কর্তব্যহীনতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। বাদী পক্ষ এই নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। আমরা এই আইন বহির্ভূত আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং মহামান্যর কাছে বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা আশা করছি।”
এজলাসজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। অন্যান্য মামলার প্রার্থীদের অতি হালকা গুঞ্জন থাকলেও এখন তা সম্পূর্ণ মিইয়ে গিয়েছে। ফারহানা বেশ মনোযোগ দিয়ে হাতের ট্যাব দেখলেন। চশমা খানিকটা ঠিকঠাক করে অতঃপর সামনে তাকালেন। শিশির চৌধুরী কিছু বলছেন না। একদম নিটল দাঁড়িয়ে আছেন। ফারহানা তার দিকে খানিক সন্তুষ্ট দৃষ্টিতে তাকালেন। অহেতুক যুক্তি পাল্টা যুক্তি তিনি পছন্দ করেন না। যা করার সরাসরি করতে পছন্দ করেন। তাই জোর গলায় বললেন,
“মিস্টার সাইবান আলাদিন, সামনে আসুন।”
ইরাম তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত হয়ে সাইবানের দিকে তাকাল। কিন্ত স্বামীর মাঝে বিশেষ কোনো ভীতি দেখলনা। নীরব তাকে চোখের ইশারা করল। সাইবান সেদিকে একনজর তাকিয়ে পরক্ষণে বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলো। ফারহানা বরফকঠিন দৃষ্টিতে তাকে দেখলেন। এক লহমার জন্য সাইবান এবং ইরামের পোশাকের দিকে তার নজর গেল, কিন্তু এই বিষয়ক কোনো মন্তব্য তিনি করলেন না। সাইবান হেঁটে পাশের কাঠগড়ায় দাঁড়াল। পুরাতন কাঠ, হালকা ভাঙা, ঘুণে ধরেছে। পিছনে দুহাত বেঁধে শিরদাঁড়া টানটান করে সে সামনে তাকাল। ফারহানা চশমা খুলে হাতে ধরে সাইবানকে দেখলেন।
“আপনি বিবাদীর বর্তমান স্বামী?”
“জি।”
একটুও কন্ঠ কাঁপলনা সাইবানের। ফারহানা দৃষ্টি সরালেন না। দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন,
“আপনার সঙ্গে আপনার বর্তমান স্ত্রীর আগের পক্ষের সন্তানের সম্পর্ক কেমন?”
“যেমন সম্পর্ক একজন বাবা এবং ছেলের মাঝে থাকা উচিত।”
“নিজেকে বাবা বলে দাবী করছেন?”
“জি। করছি।”
“একজন পিতার আচরণ সংযত হওয়া উচিত নাকি না?”
“তখনি সংযত হওয়া উচিত যখন…”
“হ্যাঁ নাকি না?”
কঠোর হলো ফারহানার কন্ঠস্বর। সাইবান এবার একটুখানি থমকাল,
“হ্যাঁ। সংযত হওয়া উচিত।”
“আপনি সংযত থেকেছেন?”
“না।”
“বাদী পক্ষ আপনার গায়ে হাত তুলেছে?”
“না…কিন্তু উস্কানি দিয়েছে!”
“হাত তুলেছে নাকি না?”
সাইবানের হাতের মুঠো শক্ত হলো। কন্ঠ নত করে জবাব দিল,
“না।”
ফারহানা কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকলেন। অতঃপর দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললেন,
“যখন আপনি একজন পিতা, তখন আপনার সকল অনুশাসন পালন করা বাধ্যতামূলক। আদালত প্রাঙ্গণে হাঙ্গামা বাঁধানো আপনার জন্য মাইনাস পয়েন্ট। উস্কানির বিপরীতে নৈতিকতা বজায় রাখতে না পারাটা একজন মানুষ হিসাবে ব্যর্থতা।”
সাইবান একদম চুপ করে রইল। ক্রমশ শক্ত হলো তার হাতের মুঠো। পাল্টা কিছু বলার আশায় হাসফাঁস করতে লাগল অন্তর। শুধুমাত্র ইরামের আতঙ্কিত এবং আশান্বিত চাহুনির কারণে সে কিছুই বললনা। অন্যথায় জিজ্ঞেস করত, উস্কানি দেয়াটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে কিনা। অবশ্য তার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হলনা, ফারহানা অর্চির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এবং, বাদীকেও বলে দেবেন, আদালত জানে এক হাতে তালি বাজে না। সিসিটিভি ফুটেজ শুধুমাত্র সেখান থেকেই শুরু হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে মিস্টার আলাদিন বাদীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আদালতের সিসিক্যাম একটা নয়। আমাকে ভিন্ন ফুটেজ দেখতে বাধ্য করবেন না। উভয় পক্ষ সংযত হোন। একটা নয় মাসের শিশুর কাস্টাডি নিয়ে আলোচনা চলছে, এখানে রাজনীতির দরকার নেই।”
ফারহানার শেষ কথাগুলো শুনে ইরাম বুকের ভেতর আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা অবশেষে ফেলতে পারল। সাইবান কাঠগড়া থেকে নেমে এলো। একদম নিঃশব্দে পুনরায় ইরামের পাশে দাঁড়াল। তবে এবার আগ বাড়িয়ে তার হাতটা ধরলনা। শিশির চৌধুরী দ্রুতই মামলার গতিপথ ঘুরিয়ে দিলেন,
“মহামান্য, আমি বাদী পক্ষের কাছে প্রশ্নের জবাব চাচ্ছিলাম। আমরা জানতে চাই গত নয় মাস কেন কাস্টাডির প্রয়োজন মনে করেননি বাদী? সঙ্গে এটাও জানতে চাই গত নয় মাস তিনি নিজের সন্তানের সামান্যতম ভরণপোষণ দিয়েছেন কিনা কিংবা খোঁজখবর নিয়েছেন কিনা।”
“কারণটা খুব সহজ। যদি যোগাযোগ নাই রাখা হয়, সাক্ষাৎ করতে নাই দেয়া হয় তবে কীভাবে করা হবে? জোর করে? আমার মক্কেল বারবার ব্যর্থ হয়েই আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।”
অর্চি প্রতিবাদ করল। মাঝখানে হাত তুলে উভয়কে থামিয়ে দিলেন ফারহানা। সামনের কাগজে কিছু লিখতে লিখতে বললেন,
“এই সম্পর্কিত বিষদ আলোচনা পরবর্তী শুনানিতে করা হবে। বাদী পক্ষকে নিজেদের উপস্থাপন করার নির্দেশ দেয়া হলো। আর বিবাদী পক্ষ পরবর্তী শুনানিতে শিশুকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত থাকবেন।”
ইরামের বুকটা চেপে এলো। অপরদিকে অরণ্যর চেহারায় কাঠিন্য ফুটল। সাইবানের অভিব্যক্তিজুড়ে শুধুই শূন্যতা। এছাড়া বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা গেলনা। দ্বিতীয় শুনানি সেখানেই সমাপ্ত হলো। ফারহানা এবার খুব বেশি দেরী করলেন না। আটদিন পরের তারিখ দিলেন। সেদিন আর বিষদ কিছু হওয়ার সুযোগ ঘটলনা নীরবের তড়িৎ কার্যক্রমের কারণে। সাইবান আর ইরামকে সোজা হাঁটিয়ে একেবারে গাড়িতে তুলে বাড়ির পথে পাঠানোর পরেই সে দায়িত্বে ক্ষান্ত দিল। অরণ্যর সঙ্গে সাক্ষাৎ তো দূরে থাক, চোখাচোখি করার সুযোগটাও হলোনা।
সাইবান আর ইরাম যখন বাড়িতে পৌঁছাল তখন ভরদুপুর। মাথার উপর গনগনে সূর্য যেন আগুন ঢালছে। গাড়ির ভেতরে এসি থাকায় গরমটা ঠিক টের পাওয়া যাচ্ছেনা। কোর্ট থেকে বেরোনোর পর সারাটা রাস্তা একটাও কথা বলেনি সাইবান। বিষয়টা তার স্বভাববিরুদ্ধ। ফারহানার সঙ্গে কথোপকথনের পর থেকেই ছেলেটা কেমন চুপ করে গিয়েছে। যদিও সাইবানের বিষদ দোষ আছে, এই নিয়ে সে অভিমানও করেছিল, তবুও স্বামীর জন্য কেমন মায়া হলো তার। পৌঁছানোর পর সাইবান গাড়ি থেকে বেরোতেই ইরামও পিছন পিছন বেরোল। কিন্ত বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগেই পিছন থেকে সাইবানের হাত টেনে ধরে বলল,
“চলো, একটু বাগান থেকে হেঁটে আসি।”
হঠাৎ এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রস্তাবে সাইবান অবাক হলো। কিন্ত স্ত্রীকে বারণ করার সাধ্য তার নেই। অগত্যা দুজন ধীরপায়ে হেঁটে বাড়ির পিছনের বাগানে গেল। দুপুরের তপ্ত গরমের বাগানটা শীতল। তারা প্রবেশ করতেই শনশনে হাওয়া খেলে গেল চারিদিকে, সবুজ পাতাগুলো নড়ে উঠল। একটা গাছে চাইনিজ কমলা ধরেছে। যেন এক গাছে কয়েক সূর্য ধরেছে এমন দেখাচ্ছে সেটা। ইরাম সেই গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর মুখোমুখি হলো সাইবানের। ছেলেটার দৃষ্টি আকাশের দিকে। যেখানে তীব্র আলোকচ্ছটার কারণে তাকিয়ে থাকাটাও দুষ্কর। অথচ সাইবান চেয়ে আছে নিষ্পলক। ইরাম তার একটি হাত ধরে লম্বাটে শিরা উপশিরা পূর্ণ আঙুলের মাঝে নিজের নমনীয় আঙুলগুলো পুরল। বলল,
“আমি তোমাকে একটা উপহার দিতে চাই।”
এবার সাইবানের মনোযোগ আকর্ষিত হলো। মাথা নত করে সে অবাক নয়নে তাকাল অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। অস্ফুট স্বরে বলল,
“উপহার?”
“হুম।”
ইরাম নিজের হাতে ঝোলানো পার্স থেকে ছোট্ট একটা জিনিস বের করল। মখমলি বাক্স। সেটা খুলতেই সূর্যের আলোয় কিছু একটা চকচক করে উঠল ভেতরে। সাইবানের চোখজোড়া বি*স্ফারিত হলো। বিহ্বল হয়ে সে দেখল ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটি আংটি। সিলভার রঙের পাতলা ব্যান্ড, তার উপর হালকা সবুজাভ একটি চারকোনা স্টোন বসানো। জিনিসটা রূপোর, স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে। ইরাম আংটিটা তুলে ধরল। সাইবান অজান্তেই খানিক ঝুঁকে দেখল, আংটির ভেতরে ছোট্ট অক্ষরে খচিত,
—মাই আলাদিন।
এত সূক্ষ্ম কাজ যে চোখ ফেরানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। সাইবানের বুকের ভেতর ঝড় উঠল। তীব্র আবেগের ঘূর্ণি উলোট পালট করে ফেলল সবকিছু। ভ্রুজোড়া কুঁচকে এলো তার তীব্র অনুভবের আলোড়নে। ইরাম অপর হাতে সাইবানের হাত নিজের হাতে তুলে নিল। বরিশালের শো তে সে দেখেছে, সাইবান নিজের আংটি শো অফ করতে খুব পছন্দ করে। সেখানেই মনে মনে একটি প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল সে। বিয়ের পরের প্রথম উপার্জনের টাকা দিয়ে সাইবানের জন্য কিছু একটা করবে। সেই কিছু একটা গড়তে গড়তে তার এতগুলো মাস লেগে গেল। ধীরে ধীরে সাইবানের বাম হাতের লম্বাটে অনামিকায় রুপার আংটিটা পরিয়ে দিল ইরাম। দৃশ্যটা এত আবেগঘন যে সাইবান অনুভব করল তার চোখজোড়া টলটলে হয়ে এসেছে। ইরাম তার আংটি পড়ানো হাতটা তুলে অনামিকায় আলতো চুমু দিয়ে বলল,
“আর কেউ তোমায় আমার কুচুপুর বাবা হিসাবে কবুল করুক বা না করুক, আমার তোমাকে সাত কবুল আলাদিন।”
বাক্যগুলো হৃদয়ে গিয়ে লাগল। সাইবান ঝাপসা দেখতে পেল চোখে। প্রথমবারের মতন সে শব্দ হারিয়েছে। কিছুই উচ্চারণ করা সম্ভবপর হলোনা তার পক্ষে। দুবাহু বাড়িয়ে শক্তভাবে ইরামকে জড়িয়ে ধরল। আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল অর্ধাঙ্গিনীকে নিজের বুকের মাঝে। ইরামও তার পরনের গোলাপী শার্ট আঁকড়ে ধরল। ফিসফিস করে কানে কানে বলল,
“তুমি হয়ত কুচুপুকে জন্ম দাওনি, কিন্তু তুমিই ওর বাবা। আমার কুচুপু শুধুমাত্র তোমাকেই বাবা ডাকবে, তুমি দেখে নিও।”
“চুপ! চুপ করুন! আর কত পাগল করবেন আমায়?”
সাইবান ভাঙা গলায় বলল, ইরামের কাঁধে মুখ গুঁজে ফেলল। তার পেটানো ভারী শরীরটা জড়িয়ে ইরাম দাঁড়িয়ে রইল। মৃদুমন্থর বাতাসে, রৌদ্রোজ্জ্বল প্রকৃতি তাদের আবেগের জালে মুড়িয়ে নিল। ঠিক এখানটায় দাঁড়িয়ে, প্রথমবারের মতন ইরাম উপভোগ করল, হয়তবা এই মানুষটার হাত ধরে সে লড়ে যেতে পারবে, যতটা লড়া প্রয়োজন।
“মাই প্রেশিয়াস?”
আলাদিনের ভাঙা মৃদু কণ্ঠের বিপরীতে ইরাম বলল,
“হুম?”
“আমার কোন সওয়াবের প্রতিফল আপনি? বলতে পারেন?”
বলা হলোনা ইরামের। শুধু অনুভব করা হলো। কিছুক্ষণ আগের আদালতের মুহূর্তটি বুঝি শুকনো পাতার মতন উড়ে গেল হৃদয় থেকে। কারণ ইরাম জানে, এই ছেলেটা পাশে থাকলে কষ্ট তাকে আর কোনোদিন ছুঁতে পারবেনা। তার আলাদিন শুধু তার স্বামী নয়, তার সন্তানের পিতা, তার রক্ষক এবং তার সৌভাগ্যের নিশ্চায়ক।
তিনদিন পর।
শয়নে, স্বপনে এমনকি গোসলখানায় পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা সাইবান নিজের অনামিকায় শোভা পাওয়া রুপার আংটিটা দেখে যায়। গতকাল তো জিমে যাওয়ার সময় হাঁটতে হাঁটতে আংটিটা এমন মনোযোগ দিয়ে দেখছিল যে আরেকটু হলে ম্যানহোলেই পড়ে যেত! একটুর জন্য রক্ষা পেয়েছে পাশের এক পথচারী ধরে ফেলায়। সেই ঘটনা অবশ্য বাড়িতে কাউকে বলেনি। সুগন্ধা জানতে পারলে পরবর্তী পাঁচ বছরের খোড়াক পেয়ে যাবে। আর ইরামের কানে গেলে তো হয়েছেই! নিজের দেয়া আংটি নিজেই আবার বক্সে ভরে সিন্দুকে তালা দিয়ে রেখে দেবে। আপাতত সেটা হোক সাইবান চাচ্ছেনা। আপাতত মানুষজন মনে করছে তার উপর জ্বীনের আঁছড় আছে। কারণ আংটিতে চোখ পড়লেই হুটহাট মুচকি মুচকি হাসছে সে। আজ বিকালে প্র্যাকটিসেও টিমের ছেলেগুলো কেমন সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সে যার যা ইচ্ছা ভাবুক! বউয়ের জিনিস স্বামী দেখবে, চব্বিশ ঘণ্টা কেন আটচল্লিশ ঘণ্টা দেখবে, বুকের ভেতর ঢুকিয়ে বসে থাকবে তাতে কার কি?
এখনো ঠিক এই ধারণাটাই খেলা করছে সাইবানের মাথায়। দাঁড়িয়ে আছে সে স্টেজের উপরে। একটি পার্টি ক্লাব। মিউজিকের তীব্র শব্দ খেলা করছে বাতাসে। লাল নীল বাতির চকচকে আস্ফালনে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। সময়টা প্রায় মাঝরাত। সাইবান বর্তমানে আছে নিজের শো তে। আজকে একটু বেশিই উত্তেজনা কাজ করছে তার ভেতর। রিমিক্স বক্সটায় আঙুল চালালেই তার অনামিকার আংটিটা চকচক করে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। বেশ লাগছে তার। ইতোমধ্যে ঘেমে উঠেছে সে। পরনের একটা ঢোলা বেসবল জার্সি লেপ্টে আছে গায়ে। তাতে শারীরিক কাঠামো বেশ ভালো চোখে পড়ছে। চুলগুলো লেপ্টে আছে ঘাড়ে এবং কপালে। ভ্রুতে চিকচিক করছে পিয়ার্সিং। মন্থর আলোয় তাকে অতুলনীয় দেখাচ্ছে। স্টেজের সামনে দাঁড়ানো তরুণ তরুণী সকলে উন্মাদের মতন তালে তালে নাচছে আর গাইছে। সাইবান এখন তার শো তে নতুন একটা নিয়ম করেছে। স্টেজের উপরে কাউকে অ্যালাউ করা হয়না। সেখানে গেট দিয়ে দুজন সিকিউরিটি স্টাফ দাঁড়িয়ে আছে। সাইবান তাই নিজের মতন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে সবকিছু। মাইক্রোফোনে মিউজিকের তালে তাল মিলিয়ে গেয়ে উঠলেই তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে সকলে।
ঠিক কতক্ষণ পেরিয়েছে সাইবান জানেনা। টিমের একটা ছেলে তার ঘর্মাক্ত শরীর দেখে পানির বোতল ছুঁড়ে দিল। সেটা হাতে নিয়ে সাইবান চুমুক দিয়ে আড়চোখে সামনে তাকাতেই একটি অদ্ভুতুড়ে দৃশ্য চোখে পড়ল তার। ক্লাবের একদম শেষ মাথায়, এক কোণায় দেয়াল ঘেঁষে দন্ডায়মান এক ব্যক্তি। পরনে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা একটি কালো ওভারকোট। চোখে রিমলেস চশমা, হাতে ড্রিংকসের গ্লাস। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছায়ায় মিশে একদৃষ্টে স্টেজের উপরে থাকা সাইবানকে দেখে যাচ্ছে। একটুও ভুল হলোনা চেনায়। উপস্থিত, অরণ্য মির্জা সওদাগর।
উভয়ের মাঝেই দৃষ্টি বিনিময় হলো দূর থেকে। অতঃপর একপাশে ঝুঁকে টিমের ছেলেটার কানে কানে কিছু একটা বলল সাইবান। গলা থেকে হেডফোন খুলে নিল। মিউজিকের ভলিউম বাড়িয়ে দিল, ক্লাবের লাইট আরও কমিয়ে দেয়া হলো। ছায়া এবং ধোঁয়ার মতন দেখা যাচ্ছে সবকিছু। এর মাঝেই সাইবান ব্যাকস্টেজে চলে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে ক্লাবের একদম পাশ ঘেঁষে ভিড় এড়িয়ে সোজা হেঁটে পৌঁছাল অরণ্যর কাছে। অরণ্য সবেমাত্র নিজের ড্রিংকসের গ্লাস শেষ করে আরেক গ্লাসে হাত দিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই সাইবানের শক্তিশালী হাত তার কব্জি চেপে ধরল। ভ্রু তুলে ফিরে তাকাল অরণ্য, চোখে ভাসাল অহেতুক কৌতূহল। যেন সাইবান তার কাছে কি চায় বুঝতে পারছেনা। কোনো কথা না বলেই অরণ্যকে টেনে ক্লাবের বাইরের দিকে হাঁটা দিল সাইবান। অরণ্য প্রথমটায় তাল মেলাতে বেগ পোহাল, হোঁচট খেল একটা। কিন্তু দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। বাইরের করিডোরের কাছাকাছি আসতেই মিউজিকের তীব্র আওয়াজ কমে এলো। অরণ্য ঘড়ঘড়ে গলায় জিজ্ঞেস করল,
আমার আলাদিন পর্ব ৬১
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস রে পাগলা?”
সাইবান অশুভ হাসল, মাথা কাত করে একনজর পিছনে দৃষ্টিপাত করে জানাল,
“কাজী অফিসে। আজ বিয়েটা সেরেই ফেলি, কি বলিস?”
