আমার আলাদিন পর্ব ৬১
জাবিন ফোরকান
ভালোবাসা শব্দটার অর্থ কি? ভালোবাসা কাকে বলে? মানুষ ঠিক কখন বুঝতে পারে সে কাউকে ভালোবাসে? প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা নেই ইরামের। বুকের মাঝে একটা ভোঁতা যন্ত্রণা হলো তার। নিজেকে অনুভূত হলো দিক ভোলা নৌকার মতন। যে হাজার বছর ধরে আবেগের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে, কিন্ত ভালোবাসার তীরে পৌঁছাতে পারছেনা।
সাইবান ইরামকে আরেকটু শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। মিশিয়ে ফেলল নিজের বুকের সঙ্গে। কাঁধে মাথা গুঁজে দীর্ঘ প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করল অর্ধাঙ্গিনীর অস্তিত্বে মিশ্রিত সুবাসটুকু।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি। খুব খুব ভালোবাসি মাই প্রেশিয়াস।”
ইরাম বরফ হয়ে রইল। সাইবানের প্রত্যেকটা কথা তার অন্তরের সিলমোহর অঙ্কিত দরজায় বুঝি দারুণভাবে কড়াঘাত করে গেল। সাইবান থেমে নেই। তার কাঁধজুড়ে শুষ্ক চুমুর বহর ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“ছোটবেলায় ভালোবাসা কাকে বলে বুঝতাম না। শুধু আপনাকে বুঝতাম। আপনি আমার এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করাও দুষ্কর। আজও আপনি সেই মানুষটাই রয়ে গিয়েছেন। অনেক দুঃসাহস করেছি আমি, আপনাকে ছাড়া বেঁচে থাকার ঠুনকো চেষ্টা চালিয়েছি। তবে এখন বুঝতে পারছি, সেই বেঁচে থাকা ছিল জীবনের প্রয়োজন, অস্তিত্বের প্রয়োজন, মনের খুশি নয়। আমার সবটুকু খুশি, সুখ, অনুভূতি শুধু আপনাতেই সীমাবদ্ধ।”
স্তব্ধ ইরাম। প্রতিক্রিয়া করতেও আজ ভুলেছে সে। একনাগাড়ে শুধু শুনেই যাচ্ছে ওই কণ্ঠনিঃসৃত প্রত্যেকটা বাণী। সাইবান তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। অতঃপর আবেগে ভারী হয়ে আসা গলায় বলল,
“আপনার গায়ে ফুলের টোকা পড়লেও আমার অন্তর জ্বলে যায়। আপনার চোখের এক ফোঁটা অশ্রু আমার বুকে শিলাবর্ষণ ঘটায়। আপনার সামান্যতম ক্রোধ আমার রাতের ঘুম উড়িয়ে দেয়। আপনার একটুখানি বেদনা আমার অন্তর বিরহের জলোচ্ছ্বাসে ভাসায়। আপনি আমার অতি শখের মানুষ, অতি আদরের অস্তিত্ব। বলুন, এত এত অনুভূতি বুকে চেপে রেখে কীভাবে বাঁচা যায়?”
অতঃপর ইরামের কানে ঠোঁট ছুঁয়ে সাইবান ফিসফিস করল,
“এই ভালোবাসা সুগারের মতন। কম থাকলেও সমস্যা, বেশি থাকলেও সমস্যা।”
একটু থেমে সে যুক্ত করল,
“এত ভালোবাসা আমার ছোট্ট হৃদয়ে সংবরণ করা যে আর সম্ভব নয়, ব্যথা হয়।”
ইরাম মন্ত্রমুগ্ধের মতন প্রতিটা আবেদন শুনল। এই পর্যায়ে এসে সে প্রশ্ন না করে পারলনা,
“তোমার হৃদয়টা এত ছোট কেন?”
“কারণ এখানে শুধু আপনাকে রাখার জায়গা আছে। আপনিই ভরে রেখেছেন এই হৃদয়ের আনাচ কানাচ।”
এরপর আর কি বলা যায় ইরামের জানা নেই। মাথা কাত করে সে স্বামীর দিকে তাকাল। সাইবান হাত বাড়িয়ে সযত্নে তার কপালে ছড়িয়ে পড়া চুলের গোছা কানের পিছনে গুঁজে দিল। ঝুঁকে এসে নাকে নাক ছুঁইয়ে দিল। তার গভীর উষ্ণতা ভরিয়ে তুলল ইরামকে। এই ছেলেটা তাকে ভালোবাসে। সত্যিকারে ভালোবাসে! ভাবতেই মনটা কেমন আনচান করে উঠল রমণীর।
“আপনাকে এক্ষুণি আমার ভালোবাসার বিনিময় দিতে হবেনা। শুধু এটুকু ওয়াদা করুন, আজীবন আলাদিনের হয়েই থাকবেন। ভবিষ্যতে যত পরিবর্তনই আসুক না কেন, যাই ঘটুক না কেন, আপনি এবং পোটলা আমার, শুধু আমার!”
নিজের একটি হাত তুলে আলতো করে সাইবানের গাল স্পর্শ করল ইরাম। সেই স্পর্শে মোমের মতো গলে গেল সাইবান। চোখজোড়া বুঁজে এলো তার। ইরাম ফিসফিস করে বলল,
“আমরা শুধু তোমার, আলাদিন।”
এই একটা ভরসা বাক্যই দরকার ছিল সাইবানের। বুকের ভেতর আটকে রাখা শ্বাসটাকে ছাড়ল সে। জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল অর্ধাঙ্গিনীর পানে। ইরাম গভীর চোখে দেখল তাকে, পুনরায় বলল,
“তবে তুমিও আমায় ওয়াদা করো, এবার থেকে সংযত হবে। আমাদের ছেলের ভবিষ্যৎ আমাদের উপরে নির্ভর করছে। আমার জন্য না হোক, অন্তত ওর জন্য, পারবেনা পোটলার আব্বু?”
হিসিয়ে উঠল সাইবান, যেন ইরামের সম্বোধনটা তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। এ ভয়ংকর এক মধুর যন্ত্রণা। ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ আগ্রাসী ভঙ্গিতে সাইবান জবাব দিল,
“ওই নামে ডেকে কিছু বলবেন, আর আমি সেই আশা পূরণ করব না?”
মৃদু হাসল ইরাম। আদুরে ভঙ্গিতে সাইবানের গাল টেনে দিয়ে বলল,
“গুড বয়।”
“আই ওয়ানা বি ইওর ব্যাড বয় রাইট নাউ।”
থমকাল ইরাম, কৌতূহল নিয়ে শুধাল,
“মানে?”
“শুধু পোটলার আব্বুতে আজকাল মন ভরে না, পুটলির আব্বু লিস্টে যুক্ত হলে মন্দ হয়না।”
“আলাদিন!”
ইরাম প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ পেলনা। এর আগেই সোফা থেকে তাকে সটান নিজের কোলে তুলে ফেলল সাইবান। ওই অবস্থায়ই উঠে দাঁড়াল। ইরাম তার কাঁধ আঁকড়ে ধরল ভারসাম্য রক্ষায়। হাওয়ায় ভাসতে থাকা পা দুটো ছোঁড়াছুঁড়ি করেও বিশেষ লাভ হলনা। মুক্তি তো মিললই না বরং সাইবানের কুটিল হাসি কানে ঠেকল।
“যেহেতু রাতারাতি বদলে যাব গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে না, সেহেতু আপনাকে পাকাপোক্তভাবে আমার সাথে বেঁধে ফেলার ব্যবস্থাটা দ্রুতই করতে হচ্ছে।”
“আলাদিন। খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! আমি এখনো তোমার সাথে পুরোপুরি অভিমান শেষ করিনি। নামাও আমাকে! নামাও!”
“নাহলে কি করবেন?”
“চিৎকার করে লোক জড়ো করব।”
তীর্যক হাসল সাইবান। ইরামকে আরেকটু উপরে তুলে নিজের বুকে ঠেকিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। ঝুঁকে কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে অস্ফুট স্বরে জানাল,
“করুন। লোকে জানুক আমি আপনাকে কতটা কঠিনভাবে ভালোবাসি।”
ইরামের উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকে উষ্ণতার লাল পরত পড়ল। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। পারলনা সে সইতে। লজ্জায় সাইবানের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে ফেলল। যেন লোকাতে চাইছে নিজের সমস্ত অনুভূতি। সাইবান নিজের অর্ধাঙ্গিনীর প্রতিটা প্রতিক্রিয়া, শারীরিক প্রকম্পন উপভোগ করছে প্রাণভরে। সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল সে। তবে বেডরুম পর্যন্ত যাওয়ার ধৈর্য্য হলোনা। এর আগেই মুখ নামিয়ে ইরামের ঠোঁটের মায়াবী ছোঁয়ায় হারিয়ে ফেলল আপন সত্তাকে।
সকালের রোদ চুঁইয়ে পড়ছে মেঝেতে। গলিত স্বর্ণের আভায় চারপাশে শোভা পাচ্ছে রাজকীয় দৌরাত্ম্য। সেই হাস্যোজ্জ্বল আভা ছুঁয়ে গেল সাইবানের বদ্ধ চোখের পাতা। কাঁপল তার আঁখিপল্লব। অতঃপর ধীরে ধীরে চোখ মেলল সে। উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে আসতে সামান্য বেগ পোহাল। দুই বাহু তুলে আরমোড়া ভাঙার চেষ্টা করতেই টের পেল তার বুকে লেপ্টে আছে নমনীয় এক শরীর। তার শরীরী ঘ্রাণ নাকে যেতেই তৃপ্ত হলো অন্তর। সাইবান মুখ নামিয়ে তাকাল। চাদরের আচ্ছাদনে তার খোলা বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে অর্ধাঙ্গিনী। চোখেমুখে রাজ্যের প্রশান্তি। গভীর নিদ্রায় স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছে সে। সাইবান সুখ সুখ অনুভূতি টের পেল। ইরামকে শক্তিশালী বাহুর মাঝে আবদ্ধ করে সময় নিয়ে দেখতে লাগল। ওই বদ্ধ চোখের পাতা, শ্যামলাভ মুখ, পরিস্ফুটিত ঠোঁট, গোলগাল চিবুক তার বুকে নতুন করে মোহের আগুন ধরিয়ে দিল। ঝুঁকে ছোট ছোট চুমু আঁকতে লাগল সে। আপনমনে বিড়বিড় করল,
“যতবার মনে হয় এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা যায়না, ততবার নতুন করে আপনার প্রেমে পড়ি। কি জাদু করেছেন আমায়?”
“আইগু!”
সাইবানের ভালোবাসার প্রহরে বিশ্রীভাবে হস্তক্ষেপ করল ভিন্ন একটি শব্দ। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। নিজের ক্রীবের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইযান। তার ছোট্ট শরীরটা ভয়ানকভাবে দুলছে। সাইবান তাকাতেই ধপাস করে আবার বসে পড়ল ক্রীবের ম্যাট্রেসের ওপর। একা একা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনা সে। এখনো শেখেনি। সাইবান চোখ ওল্টাল,
“রাতে পারিসনি তাই সকালে প্রতিশোধ নিচ্ছিস? বেশ করেছি তোর মাকে ধরেছি। আমার বউকে আমি ধরব, ছুঁবো, আদর করব, ভালোবাসবো, চুমু দেব। কি করবি তুই? ডায়পারে হেগে সেই গু মজা করে খা!”
বলেই ইরামকে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল সাইবান। নেহায়েত ভীষণ ক্লান্ত তাই ইরামের গভীর ঘুমটা এত সহজে ভাঙলনা। চোখ পিটপিট করে স্বামীর বুকের উষ্ণতা পেয়ে আবারও তলিয়ে গেল নিদ্রার জগতে। অপরদিকে ইযান ক্রীবে বসে এমন অপমানজনক দৃশ্য দেখে বেজায় চটল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতে রাগান্বিত শব্দ করল,
“বা…গু! আম…বা গু!”
“তুই গু! তোর চোদ্দ গুষ্টি গু! উফ, সরি। তুই তো আমারই গুষ্টি। তাহলে, তোর ডি এন এ দানবীরের গুষ্টি গু!”
“বা…! অ্যা! উয়াআ!”
এবার হাত পা ছুঁড়ে কেঁদেই ফেলল ইযান। কিছুতেই সহ্য করবেনা সে এমন অপমান। এবার সাইবান ভড়কে গেল। ইরামকে আস্তে করে নিজের বুক থেকে সরিয়ে বিছানায় শুইয়ে পাশে বালিশ দিয়ে উঠে গেল। পরনে শুধু সাদা ট্রাউজারটা আছে তার। উদাম শরীরে সকালের রোদ প্রতিফলিত হতেই উজ্জ্বল ফর্সা চন্দনের মতন ত্বক চিকচিক করে উঠল। লম্বা দুই পা ফেলেই ক্রীবের কাছে পৌঁছে গেল সে। গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে থাকা ইযানকে তুলে ধরল, বাঁকা হেসে বলল,
“ওরে নাটকবাজ!”
“উয়াআ!”
“হুশ, চুপ! এত জেলাস ছেলে হয় আগে জানতাম না। অবশ্য তোকে কি বলছি, মম আর ড্যাডকে একসাথে লুতুপুতু করতে দেখলে আমারও মটকা ফেটে যেত। তাই বলে তুই তোর ডি এন এ দানবীরের উপর একটুও যাবি না? পুরোটাই আমার ফটোকপি? জঙ্গলটা জানলে এই শোকে বনবাসী হয়ে যাবে রে।”
“উ…বা।”
ইযানের কান্না থামল। দুহাত বাড়িয়ে সে সাইবানের বুকের সঙ্গে লেপ্টে গেল। চুপটি করে সেখানেই পরে রইল। এবার বিনোদনের ছায়া সরে তার পিতার চেহারায় নমনীয়তা ভর করল। ইযানকে বুকে চেপে দোলাতে দোলাতে হাঁটতে লাগল সাইবান। বারান্দার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মন্থর শীতল বাতাস ছুটে এলো। তার একটি বাহু জড়িয়ে গেল ছেলের ছোট শরীরজুড়ে। যেমন করে বটগাছ পরিশ্রান্ত পথিকদের ছায়া দেয়, তেমন করেই সে আড়াল করে নিল সন্তানকে, আশ্রয়দাতা বটগাছ হয়ে। ঝুঁকে ইযানের চোখ থেকে অশ্রুটুকু মুছে দিয়ে চুমু গেল গালে। ঠোঁট ছুঁয়ে রেখে গভীর কন্ঠে শুধাল,
“তুই কবে আমায় পুরোটা বাবা বলে ডাকবি রে, পোটলা? বেশি দেরি করিস না, তোর বাবার সব আছে শুধু ধৈর্য্য ছাড়া।”
বেশ সকালেই গোসল সেরে পবিত্র হয়ে নতুন সালোয়ার কামিজ গায়ে জড়িয়েছে সুগন্ধা। ইনকোর্স পরীক্ষা আরো আগেই শেষ। ফাইনাল পরীক্ষার আগের ছুটি চলছে তাই ভার্সিটি যাওয়ার ঝামেলা নেই। আজ সে মন্দিরে পূজা দিতে যাবে বলে ঠিক করেছে। কাছাকাছি কোনো মন্দির নেই। যেতে হলে কিছুটা দূরে যেতে হবে, বাড়ি থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ। সামিয়াকে গতকাল জানাতেই তিনি বলেছেন গাড়ি নিয়ে যেতে। সকাল সকাল তাই সব কাজকর্ম আগেভাগে গুছিয়ে রেখেছে সে। নাস্তা এবং দুপুরের রান্না উভয়েই শেষ। ইরাম টুকটাক কাজ করে বেড়ে খাওয়াতে পারবে সবাইকে তাতে কোনো ঝামেলা নেই। তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
আগামীকাল ইযানের কাস্টাডি মামলার দ্বিতীয় শুনানি। গোটা পরিবার চিন্তায় আছে। সুগন্ধাও তো পরিবারটার বাইরে নয়। ইরাম আর সাইবানের জন্য চিন্তা হচ্ছে তার। মনের শান্তি এবং কল্যাণের জন্য আজ সৃষ্টিকর্তার দুয়ারে প্রার্থনা করবে বলেই এমন চিন্তাভাবনা। মিনিট ত্রিশেক বাদে একটা বাজারের মতন জায়গায় ড্রাইভারকে থামতে বলল সুগন্ধা। এটা মূলত পূজাসামগ্রীর বাজার। তাজা তাজা ফুল, পিতলের থালা – বাসন থেকে শুরু করে প্রসাদের মিষ্টি পর্যন্ত ক্রয় বিক্রয় করা হয় এখানে। তবে ফুল, পবিত্র পাতা এসবের সম্ভারটাই বেশি। সুগন্ধা ফুল কিনবে। তাই সেদিকেই গেল। হাতে বেশকিছু টাকা আছে তার। সাইবানদের বাড়িতে সে ঠিক বেতনভোগী কাজ করেনা। থাকে পরিবারের একজন হয়েই। তবে মাসে মাসে হাতখরচ দেন সামিয়া। আর বিভিন্ন উৎসবে, যেমন ঈদ, বৈশাখে মোটা অংকের সালামি পাওয়া যায়। এই যেমন গত ঈদে বাড়ি না থাকলেও আহমদ ঠিক মনে করে সুগন্ধার জন্য পোশাক এবং সালামি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সবকিছু জমিয়ে রাখে সুগন্ধা। বিশেষ কোনো কাজ ছাড়া তেমন খরচ তাকে করতে হয়না।
পূজার জন্য বেশকিছু ফুল আর তৈজসপত্র দরদাম করে নিল সুগন্ধা। দোকানি সব সাজিয়ে দিল,
“৩২০ ট্যাকা দিদি।”
“আবার বিষ লাগাইতেছেন ক্যান মিয়া? বরাবর ৩০০ দিতেছি।”
বলেই সুগন্ধা নিজের কাঁধে ঝোলানো ছোট্ট একটা পাটের ব্যাগে হাত ঢোকাল। কিন্তু সে টাকা বের করার আগেই পিছন থেকে ভিন্ন একটি হাত এগিয়ে এলো, একটা দুশো আর একটা একশো টাকার নোট ধরা তাতে।
“নিন। আর জিনিসগুলো দিন।”
কন্ঠটা কানে যেতেই হকচকিয়ে উঠল সুগন্ধা। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই মুখোমুখি হলো শ্যামবর্ণ মুখখানির। আজ চোখে রয়েছে ভিন্ন গোছের একটি চশমা। দন্ডায়মান অনুরাগ সিনহা।
চোখ পিটপিট করল সুগন্ধা। ক্ষণিকের জন্য বিশ্বাস হলোনা দৃশ্যটা। অনুরাগের পরনে নীলচে জিন্স আর ঢোলা সাদা শর্ট পাঞ্জাবী। চোখের কালো ফ্রেমের চশমার কারণে তাকে আজ বেশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং জ্ঞানবান দেখাচ্ছে। যেটা তার পেশার সাথে একদম মানানসই। অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর। সুগন্ধা নিজেকে সামলে নেয়ার আগেই দোকানদার অনুরাগের টাকা নিয়ে জিনিসপত্র প্যাকেট করে দিল। থলেটা হাতে নিয়ে থ হয়ে সুগন্ধা অনুরাগের দিকে তাকাল,
“আপনে? এইহানে?”
মৃদু হাসল অনুরাগ। আঁচড়ানো চুলে হাত বোলালো। তাতে কেশগুচ্ছ এলোমেলো হয়ে কপালে ছড়িয়ে পড়ল।
“কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে এসেছিলাম। ভাবিনি তোমায় দেখতে পাব।”
“পূজার জিনিস?”
“হুম। আজ আমাদের বাড়িতে ছোট করে পূজার আয়োজন করেছে মা। সেজন্য। তা তুমি কোথায় যাচ্ছিলে? মন্দিরে?”
“হয়।”
ইতস্তত করল সুগন্ধা, হাতের প্যাকেটের দিকে চেয়ে বলল,
“কাজটা আপনে ঠিক করেন নাই। যেখানে সেখানে নিজের টাকা উড়ান ক্যান? দাঁড়ান, আমি টাকা দিয়া দিতাসি আপনারে।”
নিজের ব্যাগ থেকে তড়িঘড়ি করে টাকা বের করল সুগন্ধা। ঠিক তখনি অনুরাগ বেখেয়ালে হাত বাড়িয়ে তার মুঠো চেপে ধরল। ওই সামান্য স্পর্শে সুগন্ধার মনে হলো তার শরীরে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গিয়েছে। অনুরাগের অবশ্য তাতে বিশেষ খেয়াল নেই। সে স্থির চেয়ে বলল,
“আমার টাকা। আমি যেখানে ইচ্ছা সেখানে উড়াব। যার পিছনে ইচ্ছা তার পিছনে খরচ করব। তুমি বলার কে মেয়ে?”
সুগন্ধার হৃদস্পন্দন থমকাল। বুকের মাঝে অনুভূতির জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ল। মনে হলো চোখে রঙিন চশমা পড়েছে। চারিদিকে শুধু রঙের মেলা। অনুভূতির দারুণ রং। শক্ত একটি ঢোক গিলল সে। অনুরাগের মুঠোয় তার হাতটা কাঁপল ভীষণ। টের পেয়ে তৎক্ষণাৎ নিজের হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল অনুরাগ। তার চেহারা হালকা লালচে হলো। মুখ লুকিয়ে সে বলল,
“স…সরি।”
সুগন্ধা কিছু বলতে পারলনা। হাতের মুঠোর মাঝে দুমড়ে মুচড়ে ফেলল টাকার নোটগুলো। অনুরাগ ইতিউতি তাকাল। অতঃপর অস্বস্তিভাব লোকাতে জানাল,
“তোমার বানিয়ে দেয়া চুড়িগুলো মায়ের ভীষণ পছন্দ হয়েছে।”
সুগন্ধার নিষ্পাপ দৃষ্টিমাঝে বুঝি হাজার তারার বর্ষণ ঘটল। এক লহমায় সহজ হয়ে গেল সে। অজান্তেই অনুরাগের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
“ওমা তাই?”
“হুম। বেশ প্রশংসা করল তোমার কাজের। বলল, মেয়েটাকে বলিস আমার জন্য আর কয়েক জোড়া বানিয়ে দিতে।”
“অবশ্যই দিমু। আপনে শুধু বলেন আপনার মায়ের কি কি পছন্দ। প্রাণী, ফুল?”
“প্রাণীর মধ্যে তো ময়ূর পছন্দ। আর ফুল পদ্ম।”
“একদম দারুণ ডিজাইন হইব এগুলা দিয়া। আপনে শুধু দেখতে থাকেন।”
“ওকে। দেখার আশায় রইলাম তাহলে। বায় দ্যা ওয়ে, তোমার কি ফুল পছন্দ?”
“জুঁই।”
কথোপকথন করতে করতেই কেনাকাটা সেরে নিচ্ছিল অনুরাগ। এবার সে একটা ফুলের দোকানের সামনে থামল। এক ঝাঁকা ভর্তি তাজা জুঁইয়ের দিকে আঙুল তুলে দোকানিকে কি যেন বলল। সুগন্ধার অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। সে ঘুরে ঘুরে আশেপাশে ঝুলে থাকা ফুলের মালাগুলো দেখছে। পছন্দ হলে কব্জিতে জড়িয়ে একটা দুটো ছবিও তুলে নিচ্ছে। অনুরাগ জুঁই ফুলের ছোট্ট একটা তোড়া কিনে ফিরে তাকাল। সুগন্ধা আপন জগতে ব্যস্ত। মেয়েটা ভীষণ অদ্ভুত। উঁহু, বলা উচিত দিলখোলা। অতিরিক্ত চিন্তা নেই, বাড়াবাড়ি নেই। এই পৃথিবীর আনাচে কানাচে নিজের খুশি খুঁজে নিতে জানে। অনুরাগ পায়ে পায়ে সুগন্ধার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঝুঁকে দেখল মেয়েটা নিজের তোলা ছবিগুলো পরখ করে দেখছে।
“আমি তুলে দেব?”
সুগন্ধা চকিতে পিছনে তাকিয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে অনুরাগের হাতে নিজের ফোন ধরিয়ে দিল।
“দেন দেন।”
মুচকি হাসল অনুরাগ। হাতের জুঁই ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নাও। এটা ধরে পোজ দাও।”
বরফে পরিণত হলো সুগন্ধা। মাথা নুইয়ে প্রসারিত আঁখি মেলে ফুলের তোড়াটা দেখল। সকালের স্নিগ্ধ সূর্য তার সমস্ত অস্তিত্বে নিদারুণ উষ্ণতা ঢেলে দিল। দুহাতে নিজের কামিজ আঁকড়ে ধরল সে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“ফুল খুব দামী উপহার। যারে তারে দিতে নাই।”
অনুরাগ মাথা কাত করে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ব্যক্ত করল,
“যাকে তাকে দিচ্ছি না। এক টুকরো সবুজ প্রকৃতিকে সাদা রং মাখিয়ে দিচ্ছি।”
সুগন্ধা কেমন অনুভব করবে নিজেও বলতে পারবেনা। তবে এটুকু সে নিশ্চিত, এমন প্রগাঢ় অনুভূতি এর আগে সে কোনোদিন কারো জন্য অনুভব করেনি। কখনো একজন পুরুষের উপর এমন দৃষ্টিতে তাকায়নি যে দৃষ্টিতে সে অনুরাগকে দেখছে। কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে ফুলের তোড়া গ্রহণ করল সুগন্ধা। সে যতটা অস্বাভাবিক, অনুরাগ ঠিক ততটাই স্বাভাবিক। আর সেই বিষয়টাই সুগন্ধার অন্তরকে পোঁড়াল। সে কেন একজনের সৎ, অনুভূতিহীন আবেদনকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেনা? সবকিছুতেই কি অতিরিক্ত কল্পনা করে ফেলছে?
অনুরাগ কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ছবি তোলার জন্য। সুগন্ধা প্রথমটায় বিহ্বল হয়ে রইল। উন্মাদ হয়ে ওঠা হৃদযন্ত্রকে সামলে কীভাবে পোজ দেবে বুঝতে পারলনা। শেষমেষ তোড়া থেকে একটা জুঁই ফুল তুলে নিজের কানে গুঁজল। মিষ্টি হেসে তাকাল সামনে। অনুরাগ ফোন উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুগন্ধা শুধিয়ে বসল,
“কেমন লাগতেছে আমাকে?”
অনুরাগ প্রথমবারের মতন থমকাল। স্বর্ণাভ আভায় সুগন্ধাকে অতুলনীয় দেখাচ্ছে। মেয়েটা আহামরি সুন্দরী নয়। নাকটাও হালকা বোঁচা। গোলগাল চেহারা। অথচ ফুলের সাগরমাঝে তাকে অপ্সরার চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে ওই ঘন কেশরাশি। আজও বিনুনী পাকিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে সুগন্ধা। আর সেই কাজকালো চুলের মাঝে না চাইতেও অনুরাগের চোখ বারংবার আটকে যাচ্ছে। সত্যিকারেই মেয়েটা অতুলনীয় নাকি অনুরাগের চোখেই এমন লাগছে? অজান্তেই ফোনের ক্যামেরা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে উত্তর করল,
“কংক্রিটের বুকে জন্মানো এক ফুলের কলির মতন। প্রাকৃতিক এবং নির্ভেজাল।”
নিজের কথায় নিজেই হতবাক হয়ে রইল অনুরাগ। বুঝে ওঠার আগেই ফোনে একের পর এক ফ্রেমবন্দী করল সুন্দর মুহূর্তটুকু। সুগন্ধা শুধু ড্যাবড্যাব চোখে একনাগাড়ে চেয়েই রইল। তার অবয়ব ছবিতে ফুটে উঠল শিল্পীর হাতে আঁকা সুনিপুণ চিত্রের মতন। সেই চিত্রপটে তাকিয়ে অনুরাগ বিষণ্নতা অনুভব করল। এই অনুভূতি, এই আবেগ, এই মুগ্ধতা যে তার বড্ড চেনা! চায়না সে। দ্বিতীয়বার চায়না ওই একই আগুনে দগ্ধ হতে। তাই সহসাই চেহারার ভাব বদলে ফেলল সে। অনেক হয়েছে এসব ঘোরাঘুরি। কাজে মনোযোগ দেয়া উচিত। দ্রুত পায়ে হেঁটে সে সুগন্ধার কাছে গিয়ে ফোন ফেরত দিল। না চাইতেও খানিকটা দৃঢ় গলায় বলে বসল,
“হয়ে গেছে।”
সুগন্ধা তার হঠাৎ পরিবর্তনে অবাক হলেও বিশেষ মন্তব্য করলনা। ফোন ফিরিয়ে নিয়ে ছবিগুলো দেখল।
“ধ…ধন্যবাদ। আমি…আমি তাইলে আর আপনারে আটকাই না রাখি। গেলাম।”
বলে সোজা গাড়ির দিকে হাঁটা দিচ্ছিল সুগন্ধা। কিন্তু হুট করে অনুরাগ পিছন থেকে ডাকল,
“এই মেয়ে, শোনো?”
থামল সুগন্ধা। অনুরাগ হেঁটে তার কাছে দাঁড়াল। নিজের ওয়ালেট থেকে একটা হাজার টাকার নোট বের করে সুগন্ধার হাতে ধরিয়ে দিল। মেয়েটি বেশ অবাক হলো এবার।
“এইটা আবার কিসের টাকা? আর কিছু তো কিনি নাই আমি।”
“চুড়ির টাকা।”
সুগন্ধা সম্পূর্ণ জমে গেল। চোখেমুখে অবিশ্বাস ফুটিয়ে দেখল অনুরাগকে। ক্ষণিকের জন্য তার মনে হলো, এ তার চির পরিচিত অনুরাগ নয়। ভিন্ন কেউ। অনুরাগ আনমনে পাশে তাকিয়ে বলল,
“তোমার পারিশ্রমিক। বেশকিছু পেইজে দেখেছি, কাছাকাছি দাম পরে। তাছাড়া তুমি কাঁচামাল কিনবে, সেটারও খরচ আছে। সো, কিপ ইট। ইউ ডিজার্ভ ইট।”
“আমি চুড়ি বিক্রি করি না!”
সুগন্ধার কেন যেন রাগ হলো। টাকার নোটটা সে মুঠো পাকিয়ে ধরে রাখল। অনুরাগ নিচে তাকিয়ে পরক্ষণে তার মুখপানে চেয়ে জানাল,
“জানি। তবুও। তুমি এটা রাখলেই খুশি হব। আসছি। ওই বাড়িতে গেলে দেখা হবে।”
আমার আলাদিন পর্ব ৬০
অনুরাগ আর দাঁড়ালনা। হেঁটে বাজারের ভেতরে গায়েব হয়ে গেল। সুগন্ধা গাড়ির সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। যতক্ষণ না অনুরাগ চোখের আড়াল হয়। অতঃপর দৃষ্টি নত করে হাতের মাঝে ধরা মুচড়ে যাওয়া টাকার দিকে তাকাল। পরিহাসের হাসি ফুটল পাতলা ঠোঁটজুড়ে। আপনমনে সে বিড়বিড় করল,
“হায়রে বোকা মন! কি ভাবছিলি? বামন হইয়া চাঁদের নাগাল পাবি? আরে তুই তো বামনও না। সে আকাশের তারার টুকরা, সেইখানে তুই রাস্তায় পইড়া থাকা ফুল যেইটা মাড়াইয়া মানুষ ফিরাও তাকায়না।”
