আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০
অরাত্রিকা রহমান
“ইটস প্রেগন্যান্সি গ্লো..!”
রুদ্র বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকালো। সাদা স্বচ্ছ একটা কাঠির ঠিক মাঝ বরাবর দুটো লাল রঙা দাগ। তার কর্ণকুহড়ে রিমির উচ্চারিত “প্রেগন্যান্সি” শব্দ টা দীর্ঘক্ষণ যাবত বিরতিহীন ভাবে প্রতিধ্বনি তুলছে। রুদ্র তৎক্ষণাৎ নিজের মনের সর্বশেষ দ্বন্দ্ব টুকু সমেত রিমির চোখে চোখ রাখলে রিমি মুচকি হেঁসে পলক ফেলল তা নিঃশেষ করতে। রুদ্রর চক্ষু ক্ষেত্র পরিপূর্ণ হলো নোনা জলে। রিমির ছোট্ট মুখটা নিজের দুহাতের মাঝে বন্দী করে অতর্কিত স্নেহের পরশের বর্ষণ করলো সে। রিমি রুদ্রর এমন কান্ড তে কেবল খিলখিলিয়ে হেঁসে যাচ্ছে। রুদ্র হাঁপিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলো-
“তোমার শরীর ঠিক আছে? মাথা ঘুরে পড়ে টড়ে যাও নি তো? ডক্টরের কাছে গেছিলে? কবে জেনেছো? আমাকে বলো নি কেন?”
রিমি পুলকিত চাহুনিতে তার পিতৃ সুখে পাগল প্রায় স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল-
“আগে শ্বাস নিন। এখন আরো কতো দায়িত্ব বাড়বে। এখনি হাঁপিয়ে উঠছেন! এতো প্রশ্নের উত্তর একসাথে দিতে পারবো না। যেকোনো একটা জিজ্ঞেস করুন। যেটা না জানলেই নয়।”
রুদ্র নিজের খুশির বাঁধ বাধলো। অতঃপর একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টায় একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-
“তুমি ঠিক আছো?”
রিমি মুচকি হাসলো। এতো কৌতুহলের মাঝে এই প্রশ্ন হয়তো তার আশা ছিল না। সে সন্তুষ্টি ভরা ছলছল চোখে জবাব দিল-“হুম, ঠিক আছি। আপনার ভালোবাসা নিজের মধ্যে ধারণ করছি যে, খারাপ কি থাকা যায়?”
রুদ্র আলতো হাতে রিমিকে নিজের বাহু দ্বয়ের মাঝে লুকিয়ে নিল। রিমি রুদ্রর ডান হাত টা নিয়ে নিজের উদরের উপর রেখে রুদ্রর কানে কানে বলল-
“আমার অতি নগন্য জীবনের একমাত্র মূল্যবান প্রাপ্তি আপনি আর আপনার ভালোবাসা। আমাকে পরিপূর্ণ করার জন্য ধন্যবাদ।”
রুদ্র রিমির কথাগুলো ঠিক কতটা গুরুত্ব সহকারে শুনলো বলা মুশকিল। তার মনোযোগ তো তার হাত দ্বারা স্পর্শিত স্থানে। ছেলেটার হাত অদ্ভুত রকম কাঁপছে যেন সে ওখানে ছুঁয়ে দিলেই কিছু হয়ে যাবে। অথচ কি আশ্চর্যের বিষয়, এর আগে কতই না তার স্পর্শে শিহরিত হয়েছে সেই অংশ টুকু। রুদ্র নিজের দুচোখ বন্ধ করে তাদের অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করে রিমিকে বলল-
“ধন্যবাদ তো তোমার প্রাপ্য। তোমাকে ছাড়া এই অসম্পূর্ণ জীবনের আদতেও কোনো মূল্য থাকতো বলে আমার মনে হয় না। শুরু থেকে যা বলে আসছি আজও তাই বলবো, তুমি আমার পূর্ণতা। আমার প্রতি দিনের প্রয়োজন- আমার ডালভাত। ভালোবাসি.. ভীষণ রকম ভালোবাসি।”
রিমি বরাবরের মতো ডালভাত নামটা শুনে হেঁসে উঠলো-
“উফ্! আবার ডালভাত ডাকে! কি করতে যে আপনাকে ওইদিন বিরিয়ানি আর ডালভাতের তুলনা দিতে গেছিলাম! বাচ্চার সামনে এসব ডাকবেন না একদম। আমার একটা প্রেস্টিজ আছে তো নাকি?”
রুদ্র একগাল মুচকি হেঁসে বলল-
“ওকে ফাইন, ডাকবো না। এবার মিষ্টি মুখ তো করাবে নাকি? এত্ত বড় খুশির খবর দিলে তাও আবার শুকনো মুখে।”
রিমি রুদ্রর কোলে থেকে নামার চেষ্টা করে বলল-
“আপনিই তো টেনে আনলেন। মিষ্টি ফ্রিজে আছে। আপনি বসুন আমি আনছি।”
রুদ্র রিমিকে উঠতে না দিয়ে উল্টো আরো শক্ত করে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়ে বলল-
“আরে ধুর, ফ্রিজের মিষ্টি কে চেয়েছে তোমার কাছে? ওসব মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হবে। তুমি কি চাও তোমার বরের..!”
রুদ্রর কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রিমি নিজের হাত রুদ্রর মুখের উপর চেপে ধরে তার মুখ বন্ধ করে দিল। আর তারই সাথে মাথা তড়িৎ গতিতে না সূচক নাড়লো। রুদ্র রিমির হাতটা তার মুখের উপর থেকে সরিয়ে অবুঝ বালকের নেয় নিজের ঠোঁট জোড়া গোলা করে রিমির দিকে এগিয়ে দিয়ে বাচ্চাসুলভ কণ্ঠ নকল করে বলল-
“আমার সুগার ফ্রি মিষ্টি চাই.. চাই মানে চাই!”
রিমি রুদ্রর এমন নাটুকেপনা দেখে লজ্জায় মুখ টিপে হেঁসে রুদ্রর চাহিদা অনুযায়ী তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো হাতে গোনা কয়েক সেকেন্ডের জন্য। চোখের পলকেই রিমির দূরে সরে যাওয়াটা রুদ্রর সহ্য হলো না। সে তিরিক্ষি মেজাজে গর্জে উঠলো নিজের হক আদায়ের লক্ষ্যে –
“হুয়াট দ্যা হেল ওয়াজ দ্যাট!?”
-“হুয়াট দ্যা হেল আবার কি..!? মিষ্টি মুখ করালাম আপনাকে।”
রিমি নির্বিকার ভঙ্গিতে দেওয়া জবাবে রুদ্র আরো তেতে উঠলো-
“এটা মিষ্টি মুখ করানো হলো? মুখ মিষ্টি করাতে হলে মিষ্টি খেতে দিতে হয়। আর আমি তো মিষ্টি চেখে দেখার সুযোগ ও পেলাম না।”
-“সুগার ফ্রি হলেও মিষ্টি তো মিষ্টিই। বেশি খেলে শরীর খারাপ করবে তো। আর আমি তো মোটেও চাইব না আমার অনাগত বাচ্চার বাবার কিছু হোক। তাও এই অল্প বয়সে। তাই না বলুন?”
রুদ্র এবার বিরক্ত অনুভব করলো। ছেলেটার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। রিমির কোমর দৃঢ়তার সাথে জড়িত একটানে তাকে বিছানায় ফেলে তার উপর উঠে এলো রুদ্র। রিমি আকস্মিকতায় হতভম্ব। নিজের দুচোখ বন্ধ করে কেবল রুদ্রর শার্ট খামচে ধরে রেখেছে সে। রুদ্র রিমির দিকে এক নজর তাকিয়ে নিজের শার্টের বোতামে হাত রাখলো। রিমি একচোখ বন্ধ রেখে অপর চোখ মিটিমিটি খুলতে এই দৃশ্য দেখে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলো-
“এই না, সরি সরি। দিচ্ছি দিচ্ছি। এখন পাগলামি করবেন না প্লিজ।”
রুদ্র থমকে গিয়ে একনজর রিমির দিকে দেখলো। সে তো গরমের জন্য কেবল শার্টের বোতাম খুলছিল এর অন্য কোনো কারণ তো ছিল না। তবে রিমির ভয়ের সুযোগ সে নেবে না এতো সহজ সরল ছেলেও তো সে নয়। রুদ্র এবার ইচ্ছে করেই রিমিকে ভয় দেখিয়ে তাকে তাড়া দিল-
“দিচ্ছি বললে হবে না। দাও আগে।”
রিমি সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রর শার্টের কলার ক্ষুদ্র অংশ নিজের মুষ্টিমেয় করে তাকে নিজের উপর টেনে তার ঠোঁটে ঠোঁট মেলালো। রুদ্র অস্পষ্ট হেঁসে নিজের কাঙ্ক্ষিত মিষ্টান্নের স্বাধ আত্মসাত করতে উদ্যত হলো।
সন্ধ্যার সময় পেড়িয়ে এখন উজ্জ্বল আকাশ অন্ধকারে বদলে গেছে। চৌধুরী বাড়ি আবারো জমজমাট হয়ে উঠেছে। পরিবারে পর পর দুজন নতুন সদস্যের আগমনের খবরে রামিলা ও রায়হান চৌধুরীর যেন খুশির সীমা নেই। মিরার কাছ থেকে খবরটা শুনে রায়ানও বেশ খুশি হয়েছে রুদ্র আর রিমির জন্য। রাতের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে রায়ান নিজের ল্যাপটপ নিয়ে স্টাডি রুমে চলে গেছে। মিরা তখনো ড্রয়িং রুমে রামিলা চৌধুরী ও রিমির সাথে বসে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। রাত ১০ টার কাছাকাছি সময় হতেই মিরা হাত ঝাড়া দিয়ে উঠলো –
“আর বসের থাকতে ভালো লাগছে না। আমি ঘরে গেলাম মামণি।”
-“হ্যাঁ, অনেক রাত হয়েছে। রিমি..তুমিও মিরার সাথে নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। এই সময় রাত জাগা ভালো না। যত ঘুমাবে তত ভালো।”
রামিলা চৌধুরীর আদেশানুক্রমে রিমি মিরার হাত ধরে তাকে সাবধানে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে সে নিজেও ঘরে চলে গেল। মিরা স্বল্প আলোয় খেয়াল করে দেখলো জুলিয়েট ঠিক তার বিছানার মাঝামাঝি শুয়ে আছে আর রোমিও ও তার পাশেই শুয়ে আছে। জুলিয়েটের পেটের দিকে ৫টা ছোট বিড়াল ছানা একসঙ্গে লেপ্টে আছে। সুখী পরিবারের চিরন্তন সঙ্গা হয়তো ঠিক এমনটাই দেখে হয়। মিরা নিজের অজান্তেই মুচকি হাসলো। ঠিক পর মূহুর্তেই তার রায়ানের কথা মনে পড়লো। মিরা তার বেবি বাম্পের উপর হাত রেখে আনমনে বলল-
“সোনাই, মাম্মা ফাজলামো করার আর জায়গা পাচ্ছি না। চলো পাপাকে একটু জ্বালিয়ে আসি।”
নিজে নিজে বিড়বিড় করে মিরা স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়ালো।
রায়ান গোটা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ল্যাপটপ টা বন্ধ করে চেয়ারে গায়ে এলিয়ে দিয়েছে। তার এক হাত নিজের মাথা টিপতে ব্যস্ত। মিরা স্টাডি রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে রায়ানের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে স্তম্ভিত হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হলো শেষ কয়েক মাস যাবত রায়ানই কেবল তার খেয়াল রেখে গেছে। এমনকি সে নিজেও তা নিয়ে আনন্দিত ও নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। হয়তো আগের মতো ঠিক করে ছেলেটা কেমন আছে সে বিষয়েও তার জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠে নি তাকে। হবেই বা কি করে রায়ান তো এই বিষয়ে কোনো বিরোধ বা অভিযোগ করে নি। কিন্তু আজ রায়ান কে চোখের সামনে এতো টা ক্লান্ত দেখে মিরার বেশ অপরাধবোধ হচ্ছে। সে অনুতপ্ত কিছু একটা নিয়ে তবে ঠিক কি নিয়ে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। মিরা নীরবে পা ফেলে রায়ানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখলো। রায়ান চমকে উঠে মিরার হাত তৎক্ষণাৎ নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল। চোখ মেলে তাকাতেই মিরা হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলল –
“চোখটা বন্ধ রাখুন একটু। মাথা ব্যাথা বাড়বে নয়তো।”
রায়ান মিরার বলা কথার দিকে মনোযোগ দিল না। সে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলো-
“তুমি এখানে কেন এসেছ হৃদপাখি? ঘরে যাও। টেক রেস্ট। এই সময়টা অন্তত নিজের যত্নে অবহেলা কোরো না।”
মিরা কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিরা পেছন থেকে সরে গিয়ে স্টাডি রুমের বিছানায় বসে পড়লো। রায়ান ঘাড় ঘুরিয়ে মিরাকে পর্যবেক্ষণ করছে। মিরা বিছানার হ্যাড বোর্ডে বালিশ ঠেকিয়ে নিজে হেলান দিয়ে বসলো আরাম করে। মিরা রায়ানের দিকে দেখতেই তাকে অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু তুচ্ছার্থে তা অদেখা করে নিজের দু হাত ছড়িয়ে রায়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
-“আমার কাছে আসুন।”
রায়ান প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হলেও সময় নষ্ট না করে দ্রুত বিছানায় উঠে গেল। মিরা স্পষ্ট হেঁসে আদরের সাথে রায়ানের মাথা তার বক্ষবন্ধনী করে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। রায়ান নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। মিরা আলতো হাতে রায়ানের চুলগুচ্ছের সাথে খেলতে খেলতে ধীর কণ্ঠে অনুতাপ প্রকাশ করলো-
“আই অ্যাম সরি। আই অ্যাম সো সরি।”
রায়ান নিজের চোখ মেলল। মিরার হঠাৎ এমন দুঃখ প্রকাশের কারণ তার অজানা। রায়ান চিন্তিত হয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“সরি কেন বেইবি? কি হয়েছে? কোনো ভুল করে ফেলেছো? আমাকে বলো, আমি সব ঠিক করে দিবো। চিন্তার কিছু নেই।”
মিরার অনুভূতির বাঁধ ভাঙছে। অশ্রু ভীরে চকচকে চোখ জোড়া রায়ানের চোখে নিবদ্ধ। রায়ানের চিন্তার বেগ বাড়লো-
“এই! কি হয়েছে? কাঁদছ কেন বেইবি?”
মিরা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো-
“কারণ আমি সবসময় আপনাকে বিরক্ত করি, ভাব দেখাই। আমাকে সামলাতে সামলাতে আপনি এমনিতেই ক্লান্ত হয়ে যান আর তার উপর এত্ত এত্ত কাজ করতে হয় আপনাকে। আমি একটুও শান্তি দেই না আপনাকে। আমি ভালো বউ না।”
রায়ান হতবাক- “কি? এসব আস্তাগফিরুল্লাহ মার্কা কথা কে বলেছে তোমাকে পাখি? তুমি আমার কত্ত লক্ষ্মী একটা বউ। কে বললো তুমি ভালো বউ না? কাঁদবে না একদম। খুব বোকবো কিন্তু আমি মিরা..!”
রায়ান শান্ত ভঙ্গিতে কথা গুলো বলতে বলতে মিরার চোখের জল বিন্দু সমূহ কোমল স্পর্শে মুছে দিতে লাগলো। মিরা অপরাধ বোধে এবার কান্নায় ভেঙে পড়লো-
“আমি আরো কখনো বিরক্ত করবো না আপনাকে, একটুও জ্বালাবো না। আমি পাল্টে নেব নিজেকে। আই প্রমিস। আমি বাধ্য বউ হবো আপনার। আপনি প্লিজ আর এমন নিজের উপর চাপ নেবেন না। আমি আপনাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না। কত্ত ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে আপনাকে, এতো প্রেশার নিতে হচ্ছে আপনার। আর আমি কিচ্ছুই করতে পারি না আপনাকে হ্যাপি করতে।”
রায়ান এতোক্ষণে বুঝতে পারলো মিরার ইমোশনাল ব্রেক ডাউন হচ্ছে তাকে এতো কাজের প্রেশারে দেখে। যার দরুন এখন নিজেকেই সবকিছুর জন্য দোষী বলে মনে হচ্ছে তার। রায়ান মিরার এমন সরল মনোভাব দেখে আপ্লুত। রায়ান মাথা ঠান্ডা রেখে শান্ত গলায় মিরার দু গালে হাত রেখে তাঁকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো-
“মিরা, লিসেন টু মি বেইবি। তোমাকে কিচ্ছু পাল্টাতে হবে না। জাস্ট বি লাইক হাউ ইউ আর। আই লাভ ইউ ইন ইনিওয়েস। ট্রাস্ট মি, আমি ঠিক আছি সোনা। তুমি আমার একমাত্র হ্যাপিন্যাস। আর তুমি কিনা বলছো, তুমি আমাকে হ্যাপি করতে কিছুই করো না।”
মিরার ঠোঁট থুতনি কান্নার পরশে ভেঙ্গে আসছে। রায়ান মিরার কপালে ছোট্ট তবে দৃঢ় এক চুমু খেয়ে বলল-
“তুমি আমার জন্য কি করেছ, আর কি করছো তা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার এই দুনিয়ার কারোর নেই। আমার গোটা জীবন তোমার মাঝে। আর কি করতে চাও আমার জন্য? এর বেশি আর কি আশা করা উচিত আমার তোমার থেকে? কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একমাত্র উপায় কেবল এই সামান্য যত্ন টুকু। এটা বিরক্তি হলে আমি বিরক্ত হতে আগ্রহী। যদি জ্বালানোর মানুষ টা তুমি হও আমি জ্বলতেও আগ্রহী। বুঝেছ?”
মিরা ফুঁপিয়ে উঠছে থেকে থেকে। রায়ান মিরার বেবি বাম্পের উপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সেই দিকে এগিয়ে এসে মজার ছলে প্রশ্ন করলো-
“প্রিন্সেস, ডু ইউ এগ্রি উইথ মি? পাপা লাভস মাম্মা সো মাচ, ইউ নো দ্যাট রাইট?”
রায়ানের প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় সজোরে এক লাথি পড়লো মিরার উদরে-“উফফ্..!”
রায়ান গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁসে উঠলো-“বাচ্চা ও জানে ওর বাপ ওর মাকে কতটা ভালো বাসে শুধু ওর মাই বুঝলো না।”
মিরা এবার না চাইতেও শব্দ করে হেসে উঠলো। অতঃপর রায়ান মিরার কোমল বক্ষ যুগলের উপর মাথা ঠেকিয়ে দিল ক্লান্তিতে। আর মিরা রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো। কিছু টা সময় পর টেবিলের উপর রাখা রায়ানের ফোনে আওয়াজ হলো।
-“রায়ান…হাবি..! ঘুমিয়ে গেছেন?”
মিরা ধীর কণ্ঠে রায়ান কে ডাকলো। রায়ানের চোখ লেগেই এসেছে ঠিক তখন এমন ডাকে রায়ান সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে সাড়া দিল-“হুমমম..!”
-“আপনার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো মাত্র। এতো রাতে মেসেজ এলো! হয়তো ইম্পর্ট্যান্ট কিছু। চেক করুন না একবার..!”
রায়ানের আর ইচ্ছেই ছিলো না ফোন হাতে নেওয়ার। সে সোজা না করে দিল-
“অনেক কাজ করেছি এই কয়দিন। এখন আর পারবো না করতে কিছু।”
মিরার মনে হলো হয়তো কিছু গুরুত্বপূর্ণ হবে তাই সে জোড় প্রদান করলো –
“আরে, দেখবেন তো নাকি কে মেসেজ করলো?”
রায়ান মিরাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সিদ্ধান্তেই কায়েম রইল –
“আই’ম টায়ার্ড বেইবি। লেট মি স্লিপ। তুমি চেক করে নাও।”
রায়ান মিরাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করার মাধ্যমে ঘুমের সাগরে গা এলিয়ে দিলে মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়ানের ফোনটা সাইড টেবিল থেকে উঠিয়ে নিল। সে স্ক্রিন অন করতেই একটা মেয়ের অ্যাকাউন্ট দেখলো। মূহুর্তের ব্যবধানে মিরার মুখের ভঙ্গিমা পরিবর্তন হয়ে গম্ভীর হয়ে উঠলো। মেসেজটা খেয়াল করলো সে।
-“হ্যালো স্যার, সো সরি টু ডিস্টার্ব ইউ দিস লেইট। আর ইউ অ্যাভেইলেবল নাউ?”
মিরার বেশ বিরক্ত বোধ হলো মেসেজ টা পড়ে। মিরা ফোনের ক্যামেরা অন করে রায়ান এবং তার ওই মূহুর্তের ছবি তুলে ওই মেয়েকে সেন্ড করে হিংসাত্মক মনভাবে তার প্রতি উত্তরে লিখলো-
“নো মিস, হি ইজ নোট। স্যার ইজ স্লিপিং। ইটস লেইট, গো টু স্লিপ এ্যাজ ওয়েল।”
মিরা রেগে রায়ানের ফোনটা ভীষণ জোরে টেবিলের উপর রাখলো। রায়ান আচমকা শব্দে জেগে উঠলে মিরা রায়ানের মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে রেখে গম্ভীর গলায় বলল-
“ঘুমোন, ইম্পর্ট্যান্ট কিছু না।”
রায়ান ঘুমের ঘোরে আর সেই দিকে মনোযোগ দিল না। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেল। মিরাও নিজের কাজে বেশ আনন্দিত হয়ে রায়হানকে আগলে ধরে ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়লো।
খান বাড়িতে এক সুন্দর সকাল ঝিলিক পড়তেই যেন বাড়ির উজ্জ্বলতা দ্বিগুণ বাড়ে। কয়েক মাস হলো বাড়িতে নব বধূর আগমন ঘটেছে। সেই রেশ কাটতে একটু দীর্ঘ সময় তো লাগবেই। তবে বাড়ির নিয়ম নীতি অনেক পরিবর্তন ঘটেছে সোরায়ার আগমনের পর থেকে। এখন বাড়ির সকল কিছু সোরায়া কে কেন্দ্র করেই প্রদক্ষিণ করে। সীমা ও মাহিদ খান নিজের ছেলের থেকেও বেশি ভালোবাসেন সোরায়াকে। মাহির বরাবরই নিজের আদরের ভাগাভাগিতে অমত প্রকাশ করলেও এখন মানিয়ে নিয়েছে সে। হয়তো সেটা কেবলই সোরায়ার জন্য। কিন্তু মাহির নিজের পাওনা আদর টুকু ঠিক সোরায়ার থেকে আদায় করে নেয়। সোরায়া নিজেও তার এখনকার জীবন সর্বোচ্চ উপভোগ করছে। ৫ বছর বয়সে মা বাবা কে হারানোর পর সে নিজের একটা পরিপূর্ণ সুস্থ পরিবার পাবে তা সে নিজেও আশা করেনি। তবে এখন সে বুঝে গেছে- সৃষ্টি কর্তা আমাদের থেকে যা নেন তার দ্বিগুণ ফেরত দেন আমাদের। এটা হয়তো তারই প্রমাণ।
সকালের তীব্র আলোক রশ্মি বারান্দা হতে সরাসরি মাহির আর সোরায়ার ঘরের প্রবেশ করছে। বেলা এখন প্রায় ৭টা। ৯টায় দুজনকেই কলেজে যেতে হবে। আর ঠিক প্রতিদিনের মতো মাহির আজও সোরায়া কে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে রেখেছে। ছোটার চেষ্টাও ব্যর্থ।
সোরায়া ড্যাবড্যাব করে মাহিরের মুখ পানে তাকিয়ে আছে মাহিরের জাগার আশায়। তবে দীর্ঘক্ষণ হলো মাহির নিজের চোখ খুলতে নারাজ। সোরায়া এবার বিরক্তিতে মাহফিলের বুকে হাত রেখে তাঁকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকলো-
“স্যার, অনেক সকাল হয়ে গেছে। উঠবেন না?”
মাহির ঘুমিয়ে নেই। তবে সে চোখ বন্ধ রেখেই সোরায়া কে নিজের বুকের পাঁজরে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“উঁহু, আরেকটু সময় এভাবে থাকি।”
মাহিরের এই আরেকটু সময় আদোও শেষ হয় কিনা তার জানা নেই। সোরায়া ব্যস্ত হয়ে উঠলো এবার-
“আর কতক্ষন..!”
মাহিরও এবার বাধ্য হয়ে নিজেই চোখ খুলে তার বুকের কাছে গুটিয়ে থাকা সোরায়ার ছোট্ট অপরিপূর্ণ ঘুম কাতুরে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-
“যতক্ষণ না তুমি নিজে আমাকে উঠাবে..!”
সোরায়া নিজের মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাহিরের এই কথার মানে তার ভালো করেই জানা। সোরায়া মুখ উঠিয়ে মাহির কে কিছু বলার আগেই মাহির সোরায়ার ওষ্ঠ জোড়ায় নিজের ওষ্ঠপুট ডুবিয়ে দিল। সোরায়া প্রতিবাদে সামান্য নড়লো তবে সে জানে তার এই বিরোধীতা এখন কাজ করবে না। তাই সে পরো মূহুর্তেই একদম স্থির হয়ে গেল। দীর্ঘ পাঁচ মিনিট মাহির সোরায়ার ঠোঁট জোড়ায় নিজের রাজত্ব কায়েম করে তাকে মুক্তি দিলে সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করলো। মাহির সোরায়া কে এমন হাঁপাতে দেখে তার কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল-
“এখন অন্তত অভ্যাস করে নাও বউ জান। এভাবে হাপালে হবে? টেক ডিপ ব্রিথ।”
মাহির সোরায়ার কপালের কাছে ঘামে লেপ্টে থাকা ছোট্ট ছোট্ট চুল গুলো গুছিয়ে দিল আলতোভাবে। সোরায়া মাহিরের দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকালো আর বলল-
“কলেজের জন্য লেইট হয়ে যাবো আমরা। এমনিতেও ক্লাসে আমার ভীষণ ঘুম ঘুম পায় তাই জুঁই সব সময় খেপায় আমাকে। আর আপনি একটা রাত ঠিক মতো ঘুমোতে দিতে চান না আমাকে। অন্তত সকালে উঠতে দেবেন আমাকে।”
মাহির সোরায়ার নালিশ মনোযোগ সহকারে শুনে উত্তর করলো-
“আচ্ছা আমি জুঁই কে বলে দিবো যেন আমার বাচ্চা বউটা কে না খেপায় এরপর থেকে। ঠিক আছে?”
সোরায়া অবিশ্বাসে মাহিরের দিকে তাকালো। তার নজরে তীব্র দ্বিধা -“এই মানুষটার কি লজ্জা নেই?” তবে সে কিছু বলতে চাইলো না আর। মাহির নিজের কথায় আরো কিছু সংযোগ করে বলল-
“আর ঘুম পেলে আমার অফিস রুমে চলে আসবে। আমার কাছে ঘুমালে তো কেউ কিছু বলবে না তাই না।”
সোরায়া মাহিরের এমন উগ্রবাদী কথার কোনো পাত্তা না দিয়ে উঠে যেতে চাইলো মাহিরের কাছে থেকে। মাহির এবার আর আটকালো না। সে নিজেও উঠে গেল সোরায়ার সাথে। তার সাথে পিছু পিছু ওয়াশ রুমে ঢোকার চেষ্টা করতেই সোরায়া হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো-
“বাইরে থাকুনননন… আমি একা শাওয়া নিতে পারি।”
হঠাৎ চেচানোতে মাহির ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সোরায়া দ্রুত ওয়াশ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিতেই মাহির আনমনে বিড়বিড় করলো-
“ও খোদা, আমার এত্ত আদুরে বউটার মাঝে মাঝে কি হয়ে যায়? আমাকে প্রতিদিন সাথে নিতে সমস্যা কোথায় ওর? কি এমন বাড়তি দেখে ফেলবো যা দেখা হয় নি আমার?!”
সোরায়া হয়তো ওয়াশ রুমের ভেতর থেকেও শুনতে পেল তার কথাটা। সেও উল্টো জবাবে দিল-
“যেহেতু বাড়তি কিছু দেখার নেই, তাহলে সাথে নেব কেন আমি? সবই তো দেখেছেন। আর কি!?”
অতঃপর দুজন রেডি হয়ে কলেজে পৌঁছালো একসাথে। মাহির গাড়ি থেকে নামলে এক হাতে নিজের এবং অন্য হাতে সোরায়ার ব্যাগ নিয়ে। সোরায়ার দরজা খুলে সোরায়াকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার হাত ধরে কলেজের ভেতর প্রবেশ করলো। সোরায়ার মুখটা এখনও মলিন। তার ক্লাস করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই, তার এখন বিছানায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। মাহির সোরায়ার চোখ মুখ দেখে প্রতিদিনের মতোই অনুতপ্ত। সে জানে সোরায়ার জন্য এখন সব মানিয়ে নেওয়া একটু কঠিন হচ্ছে। মাহির সোরায়া মেজাজ ঠিক করতে তার সাইডে ঝুঁকে আশ্বাস দিয়ে বলল-
“বউয়ের এমন মনমরা মুখ দেখলে গোটা দিন খারাপ যাবে আমার। একটু হাসো না জান। প্লিজ। আচ্ছা ঠিক আছে আর তোমার ঘুম নষ্ট করবো না। আজকের রাত যত পারো ঘুমিও।”
সোরায়া সোজা হাঁটতে থেকে গম্ভীর মুখে বলল-
“আপনি প্রতিদিন এই কথা বলেন আর করেন ঠিক তার বিপরীত।”
মাহিরের মনে হলো দেয়ালে তার কপাল বাড়ি দিতে। সে কি করে বোঝাবে সে চেয়েও নিজের বিরোধীতা করতে পারে না। কিন্তু মাহির সোরায়ার শারীরিক আর মানসিক অবস্থার কথা মাথায় রেখেই তার উপর নিজের অধিকার ফলায় যদিও সেটাও খুব বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে সোরায়ার জন্য। কথা বলতে বলতে মাহির অফিস রুমের করিডোরে আসতেই প্রিন্সিপাল স্যার একজন তরুণ মহিলার সাথে কথা বলতে বলতে টিচার্স রুম থেকে বের হচ্ছিলেন। পথে দেখা হওয়ায় মাহির প্রিন্সিপালকে সালাম দিয়ে সেখানে দাঁড়ায়। সোরায়াও সালাম দেয়। আর মাহিরের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। মাহির এই নিয়ে তখন আর কিছু বলল না। প্রিন্সিপাল কথায় কথায় মাহিরকে কলেজের নতুন টিচার এর সাথে আলাপ করিয়ে দেন যিনি কাল বা পরশু থেকে কলেজে জয়েন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
-“ভালোই হলো তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল মাহির। ইনি হচ্ছেন মিলি এহসান। আমাদের কলেজের নতুন গনিতের টিচার। আর মিস মিলি, ইনি হচ্ছেন স্নিগ্ধ খান মাহির। আমাদের কলেজের ইংরেজির টিচার। উনি কিন্তু আপনার মতোই বিসিএস সম্পূর্ণ করেই টিচিং প্রফেশন চুজ করেছেন মাহির।”
মিলি-“আসসালামুয়ালাইকুম ভাইয়া। স্যার আপনাকে নিয়ে কথা বলছিলেন একটু আগে। আপনার বেশ সুনাম শুনলাম।”
মাহির ভদ্রতার সাথে হাসি মুখেই উত্তর করলো-“ওয়ালাইকুম আসসালাম ম্যাম। ওয়েল কাম টু আওয়ার কলেজ।”
সম্পূর্ণ কথোপকথনে সকলের মুখে হাসি দেখা গেলেও সোরায়ার মুখোভঙ্গি ছিল অদ্ভুত রকমের বিরক্তিকর। মূলতঃ মিলির মাহির কে ভাইয়া ডাকা তার পছন্দ হয় নি। যেখানে প্রিন্সিপাল মাহির কে স্যার হিসেবে পরিচয় করালেন সেখানে ভদ্রমহিলার মাহির কে ভাইয়া ডাকা সোরায়ার বেশ গায়ে লেগেছে। সোরায়া আগ বাড়িয়ে তাদের কথার মাঝে মিলিকে শুভেচ্ছা জানালো-
“আসসালামুয়ালাইকুম ম্যাম, আমাদের কলেজে আসার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।”
মাহির সোরায়ার ব্যবহারে খুশি হয়ে সোরায়ার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিল। সোরায়াও পোষা প্রাণীর মতো দাঁত বের করে হেঁসে মাহিরের দিকে তাকিয়ে মাহিরের হাত ধরে রাখলো নিজের হাতে। মিলি সোরায়ার সালাম নিল হাসি মুখে। এবং প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে প্রিন্সিপালের দিকে তাকালো হয়তো জানতে সোরায়ার পরিচয়। সোরায়া সেটা খেয়াল করে নিজ থেকেই মাহির কে ঠেলে বলল-
“ওহ ম্যাম এর তো আমাকে চেনার কথা নয়। মাহির, আমার পরিচয় দিবেন তো ম্যামকে নাকি?”
মাহির অবাক হলো। যে মেয়েকে বাসার চার দেয়ালের মাঝেও মাহির বলে ডাকানো যায় না সে কলেজে প্রিন্সিপালের সামনে তার নাম ধরে ডাকছে। মাহির আশ্চর্য হয়ে নিজের ভাষা বাড়িয়ে ফেলল যেন। এতে সোরায়ার মেজাজ খারাপ হয়ে দেরি হচ্ছে না। সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে একটু বেশি আদুরে ভাব নিয়ৈ বলল-
“আরে লজ্জা পাচ্ছেন কেন? ম্যাম জাজ করবেন না আমি সিয়র। বলুন আমি আপনার কি হই।”
মাহির চটজলদি বলে উঠলো-“মাই ওয়াইফ..!”
মিলি আশ্চর্য হয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলো-“হুয়াট..?”
সোরায়া এবার মাহিরের হাত টেনে নিজের হাতে পেচিয়ে খোঁচা মেরে দাঁত কটমট করে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
“সকালে খেয়ে আসেন নি? ম্যাম শুনতে পায় নি কি বলেছেন আপনি। জোরে বলুন,আমি কি হই আপনার?”
মাহির শুকনো ঢোঁক গিলে দ্রুততার সাথে বলল-
“আমার বউ, আমার বউ , ওর নাম সোরায়া। এই কলেজেই পড়ছে। ইন্টারমিডিয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।”
সোরায়া বানোয়াট হেঁসে মিলির দিকে এক নজর তাকিয়ে মাহিরের হাত থেকে নিজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের ক্লাস রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে যেতে যেতে বলল-
“আমি ক্লাসে যাচ্ছি। টিফিন টাইমে আমিই অফিস রুমে চলে আসবো আপনাকে আসতে হবে নি আমার কাছে।”
মাহির হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে কেবল প্রিন্সিপালের দিকে তাকালো। প্রিন্সিপাল স্যার মাহিরের অবস্থা দেখে নিজেও মিটিমিটি হাসছেন। তিনি মিলির উদ্দেশ্যে বললেন-
“চলুন মিস মিলি, আপনাকে কলেজ ঘুরে দেখাতে দেখাতে এই দুজনের প্রেম কাহিনী বলবো।”
মিলিও বিষয়টা মজার ছলেই নিলেন। প্রিন্সিপাল স্যার ম্যাডামকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আগে মাহিরের কাঁধে হাত রেখে ব্যঙ্গ করে বললেন- “হ্যাপি ম্যারিড লাইফ চ্যাম্প।”
ওনারা চলে গেলে মাহির সম্পূর্ণ ঘটনা একবার চিন্তা করলো। অতঃপর অজান্তেই হেঁসে উঠলো। আজ প্রথম সে সোরায়া কে জেলাস হতে দেখলো তার জন্য। মনে এক অন্যরকম অনুভুতি অনুভব হচ্ছে তার। বিশ্ব জয়ী কোনো রাজার মনোভাবে পা ফেলে অফিস রুমে চলে গেল সে।
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (৩)
ক্যালেন্ডারে আজ আগস্ট মাসের ২৬ তারিখ। মিরার জন্মদিন। তবে এর খেয়াল কারোই নেই এমনকি মিরার নিজেরও না। সকাল হতেই বাড়ির ছেলেরা নিজেদের কাজে বেরিয়ে গেছে। কিছু দিন পরেই রায়ান ইন্ডাস্ট্রিজ এর ওপেনিং। সাইটের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বেশ কয়েক দিন হয়েছে। এবার শুধু লোকসম্মুখে তা তুলে ধরার পালা। রায়ান এখন তার স্বপ্নের এতোটা কাছে তাই সে চায় না শেষ দিকে এসে কোনো প্রকার গোলমাল হোক। রায়ানের সাথে আজ রুদ্র ও গেছে সব কিছু ফাইনাল ওয়ারডিক দিতে।
