Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৫৪

মহামায়া পর্ব ৫৪

মহামায়া পর্ব ৫৪
তুশকন্যা

সময় যত গড়াচ্ছে, রাত ততই গভীর হচ্ছে। নিস্তব্ধ কেবিনে ঘুমন্ত রমণী খানিক নড়েচড়ে উঠতেই, কেনীথ অপ্রস্তুত হলো। সে নিজের হাতটা দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পূর্বেই অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিত এক কান্ড ঘটল। আনায়া হুট করেই টেবিল হতে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল; একইসাথে টেনে ধরল কেনীথের বলিষ্ঠ হাতখানা। এলোমেলো মুখাবয়বে সে ঘুমঘুম চোখেই চোখ রাঙিয়ে বলল,
“অসভ্য লোক! গোসল করতে গেলে বাথরুমে চলে আসেন; শান্তিতে ঘুমাতে নিলেও, ঘুমের ঘোরে চলে আসেন। আপনি কি আমায় স্বস্তিতে বাঁচতে দিবেন না?”
এলোমেলো ঢঙে কথা দুটো আওড়িয়েই, আনায়া হুট করেই কেনীথের হাতখানা আরেকটু সজোরে নিজের কাছে টেনে নিল। অতঃপর চোখের পলকে পুরুষের বলিষ্ঠ হাতের উপর মাথা রেখে, নিজ দু’হাতে কেনীথের হাতটাও জড়িয়ে ধরে অবোধ শিশুর ন্যায় ঘুমিয়ে পড়ল।
কেনীথ শুরুতে খানিক অবাক হলেও, পরক্ষণেই বুঝল আনায়া এখনো সম্পূর্ণ ঘুমের ঘোরে! কিন্তু এইমূহূর্তে মেয়েটা আদতে বললটা কি? কেনীথ চাপা বিস্ময়ের সাথে অস্ফুটে আওড়াল,
“আমি ওর বাথরুমে? কবে, কিভাবে? এর মানে কি ছিল?”
কেনীথ তার যথার্থ উত্তর খুঁজে পেল না। বরং তখনও সে খানিকটা মুগ্ধতা ও বিস্ময় নিয়ে একনাগাড়ে চেয়ে রইল,নিজের বলিষ্ঠ বাহু জড়িয়ে ঘুমাতে থাকা বেখেয়ালি রমণীর পানে।

মনিটর স্ক্রিণের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানব-মানবী। ইমানির চোখে-মুখে চরম বিস্ময়ের ছাপ। পাশে থাকা পাভেলও হতভম্ব। সেদিনের ঘটনায় কেনীথ তার কেবিনের সকল সিসিটিভির এক্সেস পুরোপুরি নিজের কাছে রেখে দিলেও, ইমানির নির্দেশে কৌশলে আরো একখান নতুন ক্যামেরা কেনীথের কেবিনের এককোণে অত্যন্ত আড়ালে লাগানো হয়েছে। যা সম্পর্কে কেনীথের কোনো অবগতি না থাকাটাই যেন, আজ দুজনকে এরূপ এক দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
মানব-মানবীর এমন মোহনীয় মুহূর্ত দেখে, ইমানি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়ানো পাভেলের মুখে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে দিল। তৎক্ষনাৎ পাভেল ছ্যাৎ করে উঠল। ইমানির হাতটা একলহমায় সরিয়ে দিয়ে চাপা স্বরে বলল,

“আমি দেখলে সমস্যা কোথায়?খালি তুই নিজেই দেখবি?”
ইমানি এখনো একই ঘোর হতে প্রত্যুত্তর করল,
“এটা কি স্বপ্ন? ওদের মাঝে তাহলে এসব চলছে? আর সব প্রবলেম ক্রিয়েট করছে, ভি? আনায়ার প্রতি অবসেসড হয়েও তা ও সবার সামনে প্রকাশ করতে নারাজ; এমনকি আনায়ার সামনেও! অথচ দেখো, মেয়েটাকে বকাঝকা করে এখন আবার কি সুন্দর কেয়ার করছে।”
বলেই ইমানি পাশে ফিরে পাভেলের দিকে তাকিয়ে একগাল মুচকি হাসল। পাভেল তার হাসিতে আরো কিছুটা দ্বিধান্বিত হলো। হঠাৎ চোখে-মুখে গম্ভীর্য নামিয়ে প্রশ্ন করল,
“তুই খুশি হচ্ছিস এসব দেখে?”
ইমানি সামান্য ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তো হবো না? এটা অবশ্যই খুশি হবার মতোই দৃশ্য। তুই খুশি নস?”
পাভেল একবুক ভারীশ্বাস ফেলে পকেটে দুহাত গুঁজে বলল,
“না, আমি হয়তো খুশি নই। হয়তো বা খুশি হতে চেয়েও পারছি না। অনেক কষ্টে ওরা দুজন আলাদা হয়েছিল; অথচ এই এক হওয়াটা আমাকে কোনো শুভ ইঙ্গিতই দিতে পারছে না। বরং পুনরায় আশঙ্কা জমছে—এবার হয়তো ওদের মাঝে কোনো একজনকে চিরতরে শেষ হতে হবে, নয়তো দুজনেই একসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
ইমানি তার কথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“ইডিয়েট, এসব কি বলছিস?”
পাভেল ইমানির দিকে তাকিয়ে শুষ্ক হেসে বলল,
“হয়তো ঠিকই বলেছি, মন থেকে তো চাইব না ওদের সাথে কখনো খারাপ কিছু হোক,ওরা কষ্ট পাক; ভাই কিংবা আনায়া দুজনকেই আমি সমান ভালোবাসি। কাউকেই চোখের সামনে ধ্বং-স হতে দেখতে চাইনা আমি। এই মিলনের সূচনা সবার জীবনে ঠিক কতটা সুখ বয়ে আনবে—তা তো উপরওয়ালাই ভালো জানেন!”
মুহূর্তেই ইমানির চোখে-মুখে গম্ভীর্যের আঁধার নেমে এলো। পাভেলকে আর আগ বাড়িয়ে কিছু বলার সুযোগ তার হলো না। ললাটে ভাজ ফেলে মুখটা ফিরিয়ে নিল সে। অপলকভাবে তাকিয়ে রইল স্ক্রিণের দিকে—যেথায় আনায়া এখনও তার আরাধ্য পুরুষের সান্নিধ্যে গভীরঘুমে তলিয়ে!

পরদিন মধ্যদুপুরের আরম্ভে; ক্যাম্পাসের নীরব এককোণে বেশ কিছু ভার্সিটি পড়ুয়া উচ্ছল অস্তিত্বের আড্ডা চলছে। বন্ধুদের নিয়ে বড়সড় এক গাছের নিচে একত্রে বসে আছে আনায়া। আনায়ার হাতে আজ জেইনের একখানা গিটার। গতকাল বাড়ি ফেরার পথে গল্পে গল্পে জেইন নিজের গিটারের কথা বলতেই, লারিসা-আইজেল আবদার করেছিল আজ যেন সে তার গিটারটা নিয়ে আসে। কথামতো জেইন করেছেও তাই।
এদিকে গিটার দেখেই শুরুতে আনায়াই অধিক উৎসুক হয়ে পড়ে। দেশে থাকতে প্রায়সই বন্ধু সায়েমের উৎসাহে সে গিটার বাজানোর সুযোগ পেতো। বাড়িতে অবশ্য এসব নিষেধ ছিল। অদ্ভুত এক কারণবশত তার বাবা গিটার জিনিসটাকেও প্রচন্ড অপছন্দ করত। কিন্তু এখন সময় অনেক বদলে গিয়েছে। সবসময় সকলের মনমর্জির খেয়ালে ডুবে থাকা আনায়া, জার্মানিতে এসে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছে—অথচ তাকে নিষেধাজ্ঞা দেবার মতো যেন এখানে কেউই নেই।

আনায়া আপাতত সেসব পুরোনো চিন্তায় ডুবে নেই। তার বন্ধুরা—লারিসা,জেইন কিংবা আইজেল নিজেদের আড্ডায় মেতে রইলেও, আনায়া ভেবে চলেছে ভিন্নকিছু। গতরাতে কতরাত করে বাড়ি ফিরেছে সেটা তার ঠিক মনে পড়ছে না। তবুও আনুমানিক হবে হয়তো বারোটা নাগাদ। যতদূর খেয়ালে আছে,সে কেনীথের কেবিনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল আর মাঝরাতে বাড়ি অব্দি পোঁছেও দিয়েছিল কেনীথ নিজেই। কিন্তু আজব বিষয়, সে ঘুমিয়েছিল কয়টায়? নির্দয় পুরুষের কেবিনে ঘন্টা কয়েক ঘুমানোর পরও লোকটা তাকে কিছু বলেনি? কাজকর্ম ফেলে ঘুমানোর জন্য বিরক্ত হয়ে দুটো ধমক দিলেও তো পারত!
ভাবতে ভাবতেই আনায়া বিরক্ত হয়ে উঠল,
“ধূর,এটা কেমন মাথা। কিছুই মনে পড়ছে না।”
এরিমধ্যে তার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে, শ্যামলা গড়নের কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট ব্রাজিলিয়ান রমণী লাারিসা বলে উঠল,

“কখন থেকে গিটার নিয়ে বসে আছো, একটা গান গাইলেও তো গাইতে পারো। তুমি তো বললে গিটারও বাজাতে পারো। আর গানের কথা কি বলব, ওটা তো আরো বেশি চমৎকার। শুধু সেসময় সেন্সলেস হয়ে সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছিলে। ভাগ্যিস প্রফেসর ভিকে সময়মতো ধরে নিয়েছিল, নয়তো সবার সামনেই ধুড়ুম!”
বলতে বলতেই আইজেল সহ সবাই হেসে উঠল। আনায়া কিছুটা লজ্জা পেলেও, সেও হেসে ফেলল।তবে পাশ থেকে জেইন কিছুটা রাশভারি কন্ঠে বলল,
“ও অসুস্থ ছিল তাই এমন হয়েছে,এটা নিয়ে মজা করা ঠিক না।”
হঠাৎ তার কথা শুনে,আইজেল বলল,
“ব্যাপার না জেইন, লারিসা মজা করেই বলেছে। আর আমরা তো সবাই ফ্রেন্ড, এইসব টুকটাক মজা করাই যায়।”
আইজেলের কথায় জেইন যেন গললো না বরং কন্ঠের গম্ভীরতা একই রেখে বলল,

“হ্যাঁ, তবুও এসব ঠিক না।”
জেইনের ভাবমূর্তিতে আইজেল কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে নিল। আঁড়চোখে কি যেন সন্দেহ করে একবার সে জেইনকে দেখল তো একবার তার পাশেই মাঝবরাবর জায়গা দখল করে অবস্থান করা আনায়াকে দেখল। খটকা তো বেশ কিছুদিন হতে লাগছে, তবে বিষয়টা এখনো ঠিক পরিষ্কার নয়।
এদিকে আনায়ার উৎসুক আনমনা দৃষ্টি তখন অন্যকোথাও বিচরণ করছে। বন্ধুদের মাঝে থেকেও যেন সে নেই৷ কিছু তো বিশেষ সে খুজে চলেছে। কিন্তু বন্ধুদের তাড়ায় সে অনুসন্ধান তাকে তক্ষুনিই বন্ধ করতে হলো। সব একত্রে চেপে ধরল তাকে; শুধু শুধু সময় নষ্ট না করে তার একবার গিটার বাজিয়ে গাওয়া উচিত। এমনিতেও একটু পর ব্রাঞ্চ টাইম শেষ হয়ে ক্লাসের ঘন্টা বেজে যাবে।
আনায়াও আর তাদের কথা ফেলতে পারল না। গান গাওয়াটা পরের বিষয়, আগে টুংটাং করে গিটারটা তো বাজিয়ে দেখুক—তার মুরোদ আদতে কতটুকু।

যথারীতি সে বেশ রয়েসয়ে গিটার বাজানোর চেষ্টা করল। শুরুরদিকে খানিকটা তালগোল পাকিয়ে ফেলতেই, পাশ থেকে জেইন তাকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে-বুঝিয়ে কিছুটা সাহায্যও করল। খুব একটা বেগ পেতে হলো না কাঙ্খিত সুরটুকু তুলতে। হয়তো ছন্দ কেটে গিয়ে বারবার এলোমেলো হচ্ছিল,তবে শেষ অব্দি আনায়া সফল হলো। তার প্রচেষ্টায় বন্ধুরা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল, আনায়া নিজেও মুচকি হাসল। হাসির তালেই হঠাৎ দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল দূর রাস্তায়।দূরত্বটা অবশ্য খুব একটা বেশি নয়; তবে রমণীর অস্থির চোখদুটো ঠিকই তার কাঙ্খিত মানুষটাকে খুঁজে পেল যথাযথ সময়।
ক্যাম্পাসের রাস্তা ধরেই এক ডিপার্টমেন্ট হতে অন্য ডিপার্ট্মেন্টের দিকে এগোচ্ছিল সেই তথাকথিত দাম্ভিক পুরুষ। আশেপাশের কোনোদিকে যেন তার নজর নেই। পরনে সেই একই কালো-ধূসর ফর্মাল আউটফিট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুনত্ব বলতে বিশেষ কিছু দৃষ্টিগোচর না হলেও, আনায়ার কাছে এই পুরো মানুষটাই যে বিশেষ!
পুরুষের গম্ভীর অস্তিত্বটুকু দৃষ্টিতে ধরা দেওয়া মাত্রই, মুহূর্তেই রমণীর ওষ্ঠকোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। কিসের রাগ আর কিসের অভিমান; একরাতের ব্যাবধানে সে যেন গতকালকের সবকিছু ভুলতে বসেছে।
আনায়া সুযোগ ছাড়তে নারাজ। কেনীথ তার দৃষ্টির সীমানা পেরোনোর আগেই, হঠাৎ আনায়া গিটারে সুর তুলল। বহুল পরিচিত এক পুরোনো গানের বিশেষ কিছু পঙক্তি, নিজ মনমর্জিতে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে গান ধরল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀’কাছে এলে যাও দূরে সরে
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀ কত দিন রাখবে আর একা করে
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀মনে টেনে নেও…!

হঠাৎ আনায়ার গানের সুরে তিন বন্ধুর ধ্যান ভেঙেছে। গানের ভাষা বোধগম্য না হলেও, আনায়ার গলায় এবারও এইগানটা শুনতে তাদের মন্দ লাগছে না! তাদের এই বিশেষ মনোযোগের মাঝেই আশেপাশের আরোকিছু উৎসুক দৃষ্টি আনায়ার দিকে নিবদ্ধ হলো। ভার্সিটির নানা দেশী লোকজন তাদের দেখছে; বিষয়টা নান্দনিক ও প্রশংসনীয় তাই!
কিন্তু একইসাথে আরো একজোড়া দৃষ্টি স্থির হলো আনায়ার পানে। কেনীথের পাজোড়া থমকে গিয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়তো নিজের ব্যস্ত সময়কে থামিয়ে সে মাঝপথে দাঁড়াত না। কিন্তু রমণীর এই কন্ঠস্বর তো তার পরিচিত।
প্রফেসর রূপের দাম্ভিক মানুষটা তার দিকে ফিরে তাকিয়েছে বোঝা মাত্রই আনায়া চোখদুটো অজানা লাজে সামান্য সরু হলো।চাপা মুচকি হাসিতে গালদুটোতে টোল পড়ল। গানের প্রতিটি শব্দ যাকে উৎসর্গ করে গাইছে,সে যে মুখ ফিরিয়ে তার দিকে চেয়েছে এতেই যেন আনায়া বিশ্বজয়ের খুশিতে তৃপ্ত!
আনায়া গিটারের সুর না থামিয়েই,মনের কল্পনায় পুরুষের লালচে বিশেষ অক্ষিদ্বয়ের স্মরণে—গানের বাকি অংশটুকুও স্বগতে গাইল,
⠀⠀⠀⠀⠀⠀
⠀⠀⠀⠀⠀ ⠀ আমি তোমার ওই চোখে চোখ রেখে
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀তুমি আমার এই চোখ চোখ রেখে
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀স্বপ্ন দেখে যাও, তবে
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀ভালোবাসা দাও ভালোবাসা নাও
⠀⠀⠀⠀⠀⠀⠀ভালোবাসা দাও ভালোবাসা নাও।
আনায়ার কন্ঠস্বর থেমে যেতেই, তিন বন্ধু তার প্রশংসায় গুনগান গাইল। কিন্তু রমণীর আঁড়চোখ তখনও দূরপ্রান্তের স্থির পুরুষটার দিকে নিবদ্ধ। কিছু সময়ের জন্য দুজনের চোখাচোখিও হলো বটে, তবে কেনীথ আর দাঁড়াল না। সেই একই গুরুগম্ভীর্য ভাবমূর্তি নিয়ে সে সম্মূখের দিকে এগিয়ে চলল। আনায়া তার স্বাভাবিক কান্ডেও খানিক মুচকি হাসল। কটাক্ষ করে মনে মনে আওড়াল,
“কত বড় বজ্জাত লোক! কখনো মচকাবেও না, ভাঙ্গবেও না।”
এরিমধ্যে বন্ধুদের মাঝ থেকে আইজেল, লারিসা দুজনেই বলে উঠল,
“তোমার গাওয়া এই গানগুলো খুব সুন্দর, কিন্তু সত্যি বলতে আমরা কিছুই বুঝতে পারিনা। এটা অবশ্য আমাদেরই ব্যর্থতা।”
তাদের কথা শুনে জেইনও একই সুরে মাথা নাড়াল। আনায়া তাদের অবস্থা দেখেও সামান্য মুচকি হাসল। একইসাথে বিড়বিড় করে অস্ফুটে আওড়াল,
“ব্যাপার না, যার বোঝার কথা সে হয়তো ঠিকই বুঝেছে।”

“হুউউউ, হুউউউ, হুইশশশশশশশ….!”
ভার্সিটি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পূর্বেই, কিছু ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে পার্কিং এরিয়ার দিকে এগোচ্ছিল কেনীথ। অবয়বে ব্যস্ততার স্পষ্ট ছাপ। কিন্তু হঠাৎ শিস বাজানোর শব্দে তার ব্যস্ত পা-দুটো স্থির হয়ে থেমে গেল। কারের চাবিটা হাতে চেপেই সে মুখটা পাশে ফেরালো। ধারণা ছিল এটা অবশ্যই কোনো অসভ্য স্টুডেন্টের কাজ। কিন্তু সেই অসভ্য স্টুডেন্টটা যে শেষমেশ আনায়া তা দেখে কেনীথ কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হলো। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল, ললাটে ভাজ পড়ল।
ততক্ষণে আনায়া গাড়ির আড়াল হতে হেলতে দুলতে শিস বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে এলো। বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে, কেনীথের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে একগাল মুচকি হাসল সে। দু-হাত হুডির পকেটে গুঁজে, হাসোজ্জল মুখে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“হাই ভাইয়া, কেমন আছেন?”
মুহূর্তেই কেনীথ তার চোয়াল শক্ত করে, দুপা এগিয়ে এল। আনায়া তার তেড়ে আসার ভঙ্গিতে ভেতরে ভেতরে ভড়কে গেলেও, মুখাবয়বে তা প্রকাশ করল না। বরং সেই একই খামখেয়ালি ভাবনা নিয়ে, মুচকি হেসে বলল,
“ভাইয়ায়য়য়হ আমার! ঠিক আছেন তো?”
কেনীথ তৎক্ষনাৎ ভারিক্কি গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“এসব কি ধরনের অসভ্যতা?”

—“আ…অসভ্যতা, আমি আবার কি অসভ্যতা করলাম?”
আনায়াকে অবুঝের মতো ভাবভঙ্গি করতে দেখে,কেনীথ আরো বেশি বিরক্ত হলো। চাপা স্বরে ধমকে উঠল,
“অসভ্যের মতো শিস বাজাচ্ছিলি কেনো?”
আনায়া অকপটে জবাব দিল,
“আপনাকে ইভটিজিং করছিলাম।”
মুহূর্তেই কেনীথের মেজাজ আরেকটু বিগড়ে গেল,
“এখানে ফাইজলামি করতে এসেছিস?”
হুট করে লোকটাকে এভাবে রেগে যেতে দেখে আনায়া সামান্য সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করল।
—“আচ্ছা সরি, আর শিস বাজাবো না।”
—“ভাইয়া ডাকতেও নিষেধ করেছিলাম আমি!”
আনায়া দাঁত চেপে কিঞ্চিৎ হাসার চেষ্টা করল। কিছু একটা ভেবে নিয়ে আবারও বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা…সরি সরি, ভাইয়া বলেও আর ডাকব না।”
থামতে না থামতেই, আনায়া রয়েসয়ে আবারও বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম মুরুব্বি, ভালো আছেন তো?”

একবার ভাইয়া তো একবার মুরুব্বি। কেনীথের ইচ্ছে করছে, আশপাশ থেকে যদি গাছের একখান মোটা ডান খুঁজে নিতে পারত—তবে এক্ষুনি এই মেয়েকে মেরে সোজা করে দিতো। যদিও এটা কেবলই তার উগ্র মেজাজের ভাবনা। সত্যিকার অর্থে আনায়াকে মা’রার কথা কল্পনাতেও সে ভাবে না।
কেনীথ আড়চোখে আশপাশটা দেখে নিয়ে, আনায়ার দিকে আরো দুপা এগিয়ে এসে, খানিকটা ত্যাছড়া সুরে সতর্ক করে বলল,
“ভালো হবি না, তাই না? কালকে ওতোগুলো প্রফের সামনে অপমানিত হওয়ার পরও তোর শিক্ষা হয়নি?”
এই পর্যায়ে আনায়া তার চোখদুটো ছোট ছোট করে রুক্ষ স্বরে বলল,
“হুমকি-ধামকি পড়ে দিবেন, এমনিতেও আমরা এখন আর মূল ক্যাম্পাসের ভেতরে নেই। তাই এখন আপনাকে আমি প্রফেসর হিসেবে মানতেও রাজি না।”
কেনীথ ভ্রু-যুগল শিথিল করে বলল,

“তোর সমস্যাটা কি, বলতো?”
আনায়া সপাটে জবাব দিল,
“আপনি!”
—“মানে?”
কেনীথ ভ্রু যুগল আবারও কুঁচকে ফেলল। আনায়া আনমনা হয়ে বলল,
“জানিনা।”
কেনীথ আর কোনো প্রশ্ন না করে, তাকে দুদন্ড স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখল। আজ আনায়ার ডিপার্টমেন্টে তার কোনো ক্লাসও ছিল না; যথারীতি মেয়েটা আজ ভার্সিটিতে এলেও শুরু হতেই একটা উড়ুউড়ু মশকরাজনক ভাবভঙ্গি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কেনীথ ভাবনা শেষে কোনো বিশেষ ভাবগম্ভীর্য না দেখিয়ে সোজা নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ এভাবে অবজ্ঞা করতে দেখে আনায়া হকচকিয়ে উঠল। দ্রুত ছুটে গিয়ে, কেনীথের পাশ ঘেঁসে পায়ের সাথে পা মেলাতে লাগল,

“আপনি এমন কেন?”
কেনীথ তার হাঁটার গতি বজায় রেখে একরোখা স্বরে উত্তর দিল,
“অহেতুক সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার কাছে নেই।”
আনায়া মুখ ভেঙচিয়ে বলে,
“তারমানে বলতে চাচ্ছেন, সবসময় আমিই শুধু শুধু সময় নষ্ট করি?”
—“তা নয় তো কি! পড়াশোনার নাম-গন্ধ নেই। সারাক্ষণ এদিক-সেদিক টইটই করে বেড়ানো।”
কেনীথের গম্ভীর প্রত্যুত্তরে আনায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
“এবার কিন্তু একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে! কি করেছি আমি হ্যাঁ? কখন কোথায় টইটই করে বেড়ালাম। তখন শুধু ওদের সাথে একটু গান গেয়েছি বলে, আপনি এভাবে কথা বলছেন? কোথায় প্রশংসা করবেন, অথচ তা না!”
কেনীথ থামল। গাড়ির কাছে প্রায় এসে পড়েছে। তার সাথে সাথে আনায়াও থামল। কেনীথ রমণীর মুখ ফুলিয়ে রাখা অবয়বের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“নেক্সট উইকে ক্লাসটেস্ট নেবো। শুধু রেজাল্টটা কোনোভাবে খারাপ হোক, তোর এমন হাল করব আমিইইইই!”
আনায়া চোখদুটো সরু করে, চুপসে যাওয়া মুখ করে বলল,
“আপনি কি আমায় গাধা ভাবেন? অবশ্যই আমি এক্সামে ভালো করব। আপনার নাম আমি কখনোই বদনাম হতে দেবো না। এক্সামের সাথে সাথে একদিন আমাদের বংশের নামও উজ্জ্বল করে ফেলব।”
কেনীথ তার কথায় ভ্রুটা আরেকটুখানি উঁচিয়ে তাকায়। আনায়া কিঞ্চিৎ হকচকিয়ে বলল,
“না মানে, আপনি তো আমার ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর। সেক্ষেত্রে আপনার নাম উজ্জ্বল করাটা তো আমার দায়িত্ব, তাই না? আপনার নাম উজ্জ্বল হলে আপনার বংশের নামও উজ্জ্বল হবে; আর আপনার আমার বংশ তো একটাই,তাই না? ওটাই বলছিলাম আরকি…”
কেনীথ আর কথা বাড়াল না। হাতঘরিতে সময়টা দেখে নিয়ে বলল,

“তোর হয়ে গেলে আমি আসি?”
আনায়া তড়িঘড়ি করে বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনাকে কি আমি আঁটকে রেখেছি নাকি?”
আনায়া গা ঝেড়ে কথাটা আওড়াল। কেনীথ চোখদুটো সরু করে তাকে একঝলক দেখে নিয়ে, গাড়িতে বসতে উদ্যত হলো। তবে হঠাৎ থেমে গিয়ে, পেছন ফিরে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোর ক্লাস তো শেষ। যাবি আমার সাথে?”
আনায়া তার প্রস্তাবে খানিকটা খুশি হলেও, এইমূহূর্তে আর কেনীথের সাথে যাওয়ার কথা ভাবল না। দুহাত নেড়ে বলল,
“না,না, এখন যাওয়া যাবে না। আমি ওদের বলে এসেছি, আমি শুধু পাঁচ মিনিটের জন্য একটা কাজে যাচ্ছি। দেরি হয়ে গেলে, ওরা আবার রাগ করবে। আমিও বরং আসি এখন।”
বলতে বলতেই আনায়া দুপা পেছাল। কেনীথও গাড়িতে বসে তা স্টার্ট দিতে উদ্যত হলো। কিন্তু ততক্ষণে আনায়া কি যেন ভেবে আবারও ফিরে এলো।

—“শুনুন,শুনুন!”
কেনীথ স্টিয়ারিংএ হাত চেপেই পাশে মুখ ফেরাল,
“আবার কি হলো?”
আনায়া তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে, নামানো কাঁচের জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে বলল,
“একটা সাহায্য করবেন প্লিজ?”
হঠাৎ তার অসহায়ত্ব মাখা মুখখানা দেখে কেনীথ ভ্রুযুগল কুঁচকে বলল,
“হুম, বল!”
আনায়া কোনোপ্রকার ভণিতা না করে কিছুটা রয়েসয়ে বলল,
“বলছিলাম যে, নেক্সট উইকে যে এক্সামটা নিবেন ওটার কোশ্চেন তো আপনিই করবেন, তাই না? তাহলে কোশ্চেনটা করার পর একটা কপি প্লিজ আমাকে পাঠিয়ে দিতে পারবেন? বেশি আগে না, পরীক্ষার আগেরদিন দিলেও চলবে।”
রমণীর এহেন কথায় পুরুষ হঠাৎ বাকরুদ্ধ হলো। মেজাজ বিগড়ে ধমক দেবে নাকি দুটো কথা বলে ঝাড়বে ঠিক বোধগম্য নয়। কেনীথ চাপা গম্ভীর্যের সাথে বলল,
“তুই জানিস, তুই কি বলছিস?”
আনায়া চোখদুটো পিটপিট করে বলল,
“রাগ করবেন না। প্লিজ স্যার, প্লিজজজজ!”
আনায়া দু-হাত জোর করে রঙঢঙ শুরু করল। কেনীথ দাঁত চেপে প্রত্যত্তুরে বলল,

—“একে তো স্যার ডাকছিস,তার ওপর এমন দুর্নীতিও করতে বলছিস?”
লোকটার কথার মূল উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব না দিয়েই, আনায়া ফটাফট উত্তর দিল,
“তাহলে কি ভাইয়া ডাকব, নাকি মুরুব্বি?”
—“তারাহ্!” কেনীথ চাপা স্বরে ধমকে ওঠে। আনায়া আবারও বলে,
“ধূর, সবসময় খালি এমন করেন।”
—“তো তোর কি মনে হয়? তোর কথা শুনে আমিও তোর মতো উল্টোপাল্টা কাজ করব? আরেকবার যদি এসব কথাবার্তা বলতে শুনেছি, সোজা ভার্সিটি থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্তা করব।”
মুহূর্তেই আনায়া তার মুখাবয়ব আক্রোশে খিঁচে নিল। বলল,
“বললেই হলো? নিজের যোগ্যতায় এখানে এসেছি, এসব উল্টোপাল্টা কাজ করলে জীবনেও আপনার বিয়ে হবে না।”
আনায়া হতে দৃষ্টি সরিয়ে, গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে কেনীথ অকপটে প্রত্যুত্তর করল,

—“না হোক বিয়ে। আমার বউ আছে!”
আনায়া নিজের খেয়ালে থেকেই রাগ ঝাড়ল,
—“আপনার বউয়ের মুখে ঠাডা পড়ুক!
কেনীথও সাথে সাথে ধমকে উঠল,
—“ঠাডা তোর মুখে পড়ুক। যা এখান থেকে!”

মহামায়া পর্ব ৫৩

বলতে না বলতেই বেশ অপমানজনক ভঙ্গিতে গাড়ির গ্লাসটা তুলে দিয়ে, সে রমণীর চোখের সামনে দিয়ে সাই সাই করে চলে গেল। আনায়া রাগে-অপমানে জ্বলতে জ্বলতে কিড়মিড়িয়ে উঠল,
“কতবড় চিন্তাভাবনা! কত কষ্ট করে এখানে চান্স পেয়েছি আমি, আর বলে কিনা আমায় এখান থেকে বের করে দেবে। সামান্য একটা প্রশ্ন চেয়েছি বলে এভাবে অপমান? খোদা তুমি বিচার কইরো; এই লোকের আসলেই কোনোদিন ভালো হবে না।”

মহামায়া পর্ব ৫৫