আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (৪)
অরাত্রিকা রহমান
অপরাহ্নের তীব্র সূর্যালোক বিদায় নেওয়ার পর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সূর্য্যি মামা বিদায় নিয়েছে আকাশ হতে। হসপিটালের করিডরটা এখন মোটামুটি ফাঁকা তবে জনসমাগম আছে ভালোই। হাসপাতালের করিডোরের কোলাহল পেরিয়ে ভিআইপি প্যাসেন্ট দের জন্য বরাদ্দ একটা ঘর অদ্ভুত শান্ত। সাদা দেয়ালের পাশে রাখা মনিটরটা মাঝেমধ্যে ক্ষীণ শব্দে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। পাশে ঝুলে থাকা স্যালাইনের বোতল থেকে স্বচ্ছ তরলটা ধীরে ধীরে নলের ভেতর দিয়ে নামছে টুপটাপ আওয়াজ করে।
বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে রায়ান। এক হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা,, কপালে তীব্র জ্বরের উষ্ণতা। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ। অথচ বন্ধ চোখের পাতার আড়ালে যেন ভীষণ ব্যস্ত কোনো স্বপ্নের ভেতর ছুটে বেড়াচ্ছে সে।
হঠাৎ তার ভ্রু কুঁচকে গেল। শ্বাসটা কয়েক মুহূর্তের জন্য দ্রুত হয়ে আবার ধীরে হলো। আঙুলগুলো অস্থিরভাবে চাদর আঁকড়ে ধরেছে। আচমকাই চোখ মেলে সোজা হয়ে বসে পড়ল রায়ান-“হৃদপাখি…!”
কয়েক সেকেন্ড শুধু হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকিয়ে রইল। অচেনা সাদা ছাদ। অচেনা দেয়াল। পাশে ঝুলতে থাকা স্যালাইনের বোতল। আর সেই একঘেয়ে টুপটাপ শব্দ।
-“মিরা…!” রায়ানের কণ্ঠটা এতটাই ক্ষীণ যে নিজের কানেই যেন পৌঁছাল না। রায়ানের মাথায় হঠাৎ অপারেশন থিয়েটারের বেডে মিরার অচেতন মুখটা ভেসে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠলো তার মস্তিষ্ক। ব্যস্ত হয়ে হাতের লাগানো ক্যানুলা এক টানে খুলে ফেলল। মুহূর্তে হাতের উপর পিঠটা রক্তাক্ত হয়ে গেল। রায়ান বেড থেকে নামতে উদ্যত হতেই তার মাথা সামান্য ঘুরে গেল। রায়ান নিজেকে সামলাতে বেডের পাশের স্যালাইন স্টেন্ড টা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে একজন নার্স ভেতরে ঢুকলেন। রায়ান কে দাঁড়ানো দেখে নার্স এগিয়ে এলেন তার দিকে এবং চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন-
“আর ইউ ওকে স্যার? এখন কেমন লাগছে আপনার? আপনি বসুন, আমি ডক্টর কে ডেকে আনছি। প্লিজ এখনি দাঁড়াবেন না, শান্ত হয়ে বেডে শুয়ে পড়ুন।”
রায়ানের মাথা ঝিমঝিম করছে তখনও। সে নার্সের দিকে তাকাল চোখ খোলার চেষ্টা করছ। চোখে তখনও ঘোর কাটেনি। আধো আধো বুলিতে মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“হাও.. ইজ মাই ওয়াইফ…? কোথায় আছে ও? কেমন আছে?”
নার্স তার কথা শেষ হওয়ার আগেই শান্ত গলায় বলল, “শুয়ে পড়ুন স্যার। এখন বেশি কথা বলবেন না। আমি ডক্টর কে ডেকে আনছি।”
কথাটা বলে নার্স বিছানার পাশে এগিয়ে গেল রায়ান কে ধরে বেড়ে বসানোর উদ্দেশ্যে। নার্স রায়ানের বাহু আঁকড়ে ধরতে চাইলে রায়ান এক ঝটকায় তার সরিয়ে নিল। উতলা হৃদয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। শরীরের অবস্থার তোয়াক্কা না করে হাঁটা ধরলো দরজা বরাবর।
নার্স ভীত কণ্ঠে তাকে থামাতে অনুরোধ করলো-
“Sir please calm down.. you need rest..”
রায়ান তার অনুরোধের পরোয়া না করে দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে অশান্ত গলায় বলল-
“I don’t need rest..I need my wife..! now…”
রায়ান নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে সোজা অপারেশন থিয়েটারের সামনে যেতে নিলে রাস্তায় হঠাৎ এক সুপ্রশস্ত কাঁধের সাথে তার ধাক্কা লাগলো।
-“সরি..! আই অ্যাম সরি..!”
অনুতাপ প্রকাশ করে রায়ানে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে এক জোড়া পরিচিত হাত তাকে আলিঙ্গন করলো।
-“রায়ান..তুই ঠিক আছিস ভাই?”
রায়ানের হুশ ফিরল। সে ঠিক করে খেয়াল করতেই দেখলো মাহির কে। মাহির অবাক হয়ে রায়ান কে দেখছে, কপাল সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, উপর আবার শুকনো রক্তের আভা। হাতে পিঠে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। চোখ মুখের অবস্থা বিধ্বস্ত। বাহ্যিক দৃষ্টিতেও বোঝা যাচ্ছে যে সে কোনো দিক থেকেই ঠিক নেই। রায়ান মাহির কে দেখে আশ্চর্য হলেও যেন নিজের স্বস্তির জায়গা পেল। ছেলেটা আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরলো মাহির কে।
মিরার খবর শুনে মাহির প্রায় এক ঘন্টা আগেই সোরায়া কে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছেছে। সোরায়া কে বাকিদের সাথে রেখে রায়ানের কাছে আসছিল সে। রায়ান একা ছিল তার কেবিনে তাই। রায়ান মাহির কে ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“তোর ভাবি কোথায় মাহির? কেমন আছে এখন? ও কি এখনো অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে আছে? ও কি চোখ খুলেছে? আমাকে ডেকেছে? আমার প্রিন্সেস..ও ঠিক আছে তো?”
মাহির রায়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“ভাবিকে আইসিইউতে অবসার্ভেশনে রাখা হয়েছে। প্রিন্সেস কেও ডক্টর রা অবসার্ভেশনে রেখেছেন।”
রায়ানের কান খাঁড়া হয়ে উঠলো। এক মূহুর্তে মাহিরের থেকে দূরে সরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“আইসিইউ..কোথায় আইসিইউ? আমি যাবো। আইসিইউ তে কেন রাখা হয়েছে? কিসের অবসার্ভেশন?”
মাহির রায়ানকে উত্তেজিত হতে দেখে তাকে বৃথাই শান্ত করতে চেষ্টা করলো-
“তুই শান্ত হ প্লিজ। এমন পাগলামী করলে কিচ্ছু ঠিক হবে না। ধৈর্য ধর একটু।”
-“আমি যাবো ওদের কাছে। আমাকে নিয়ে চল। এখনি।”
রায়ান মাহিরের কথা ঠিক কানে তুললো কিনা বলা মুশকিল। মাহির দেরি না করে রায়ান কে আইসিইউ রুমের সামনে নিয়ে গেলো। সেখানে সকলেই উপস্থিত সাথে সোরায়া ও। খালামনি হওয়ার খুশিতে খুশি হওয়ার সুযোগ নেই তার। আসার পর থেকে আপু আপু বলে কেঁদেই যাচ্ছে। রিমি তাকে আগলে রেখেছে নিজের বুকে সব ঠিক হয়ে যাবে বুঝানোর চেষ্টায়। রায়ান আইসিইউ রুমের সামনে আসতেই ডক্টর বেরিয়ে এলেন। রায়ান অধৈর্য হয়ে ডক্টর করে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার ওয়াইফ এর কি হয়েছে ডক্টর? কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলুন। প্লিজ কিছু লুকাবেন না। প্রয়োজনে আমি এখনই ওকে বাইরের দেশে কোনো বড় হসপিটালে নিয়ে যাবো। জাস্ট ওর কি হয়েছে আমাকে সত্যি টা বলুন।”
ডক্টর রায়ানের জ্ঞান ফিরেছে দেখে একটু স্বস্তি পেলেও তার নিজের প্রতি এমন অযত্ন দেখে তিনি বেশ নারাজ হলেন। ডক্টর রায়ানের সাথে তর্কে না গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললেন-
“আপনার ওয়াইফ ঠিক আছেন মিস্টার চৌধুরী। নাথিং টু ওয়ারি অ্যাবাউট। প্রসব যন্ত্রণার দরুন ক্লান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন। অনেকটা রক্ত ক্ষরণ হওয়ার জন্য শরীর বেশ দূর্বল ওনার। ২৪ ঘন্টা পর জ্ঞ্যান না ফেরা অব্দি কিছু বলা যাচ্ছে না। আপাতত প্যাসেন্টের জ্ঞ্যান ফিরার অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কিছু করণীয় নেই। সৃষ্টি কর্তার কাছে দোয়া করুন যেন ২৪ ঘন্টার আগেই জ্ঞান ফিরে আসে নয়তো আরো গভীর কোনো কমপ্লিকেশন দেখা দিতে পারে। তবে বলতে হবে, ভীষণ স্ট্রং মানসিকতার মেয়ে, হাল ছাড়েন নি। আমরা আশা করছি উনি রিকভার করে যাবেন।”
রায়ান কয়েক মূহুর্তের জন্য থমকে রইল। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে ছেলেটার। মাহির রায়ানের কাঁধে হাত রেখে তাঁকে সাহস দিলে রায়ান নিজের মন শক্ত করে প্রশ্ন করলো-
“আমি কি ওর সাথে একবার দেখা করতে পারি ডক্টর? প্লিজ।”
-“সরি মিস্টার চৌধুরী, আমার আইসিইউতে আউটসাইডার অ্যালাউ করতে পারি না। আই হোপ ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড। প্যাসেন্টের জ্ঞ্যান ফিরলে তাকে কেবিনে ট্রান্সফার করা হবে। তখন দেখা করতে পারবেন সবাই। আপনাদের আর কোনো প্রশ্ন না থাকলে আমাকে এখন যেতে হবে। আমার রাউন্ড চলছে।”
রায়ান হঠাৎ হকচকিয়ে উঠে ডক্টরের রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার মেয়ে.. ডক্টর আমার মেয়ে কেমন আছে? ওকে কেন অবসার্ভেশনে রেখেছেন? ওকেও কি ওর মায়ের সাথে আইসিইউ তে রাখা হয়েছে?”
শেষের প্রশ্ন টা করতেই রায়ানের গলা ভেঙে এলো। ডক্টর রায়ান কে আশ্বাস দিয়ে বললেন-
“কাম ডাউন মিস্টার চৌধুরী, ইউর বেবি ইজ কমপ্লিটলি ফাইন। শি ইজ হ্যালদি। শুরু তে একটু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ওর, হয়তো ডেলিভারির অনেকটা সময় সাফোকেশনের মধ্যে ছিল তাই। অক্সিজেন দেওয়ার পর এখন স্বাভাবিক আছে। অবসার্ভেশনে রাখার কারণ বেবির ডেলিভারিটা একটু আন-ইউজুয়াল তাই অনেক সেন্সিটিভ এখন ও। তবে বলতে হবে মেয়ে পুরো বাবা মায়ের মতোই স্ট্রং। এতো অস্বাভাবিকতার মাঝেও ফাইট করেছে আপনাদের সাথে। ওর কিছু দিন সময় লাগে পৃথিবীর আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে। এটা টেনশনের কোনো বিষয় নয়। আপনি চাইলে বেবির সাথে দেখা করতে পারেন। ওকে শিশু ওয়ার্ডের অবসার্ভেশনে রাখা হয়েছে। আপনি নার্স কে বললে নিয়ে যাবে সেখানে। আপনি নিজের খেয়াল রাখুন প্লিজ। টেক প্রপার রেস্ট। আমাকে যেতে হবে।”
রায়ান ডক্টরের বলা প্রতিটা শব্দ মনোযোগ সহকারে শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডক্টর চলে গেলে সোরায়া উঠে এসে রায়ানের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো চোখে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভাইয়া, আপু ঠিক হয়ে যাবে তো?”
রায়ান সোরায়ার দিকে কেবল তাকিয়ে রইল কোনো জবাব দিল না। মুখ দিয়ে যেন কিছুই বের হচ্ছেনা তার। মাহির রায়ানের দিকটা বুঝলো হয়তো। সে সোরায়া কে নিজের দিক টেনে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একটু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল-
“রায়ান, তুই প্রিন্সেস কে দেখেছিস? আমি তো এখনো আমার চাচ্চু কে দেখতে পারলাম না। ভাবেছি কি ডাক শিখাবো ওকে চাচ্চু নাকি খালু। জান তুমি কি বলো?”
সোরায়াকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন টা করতেই সোরায়া চোখের পানি দ্রুত মুছে বলল-
“আমি চাচি ডাক শুনবো না। আমাকে ও ছোট আম্মু ডাকবে। এটাই শিখাবো। খালা রা তো মায়ের সমান হয় তাই না। ওকে আমি পরীর মতো সাজাবো। হিহি। ওই হিসেবে আপনি ছোট আব্বু।”
মাহির সোরায়ার কথায় হেঁসে এর কপালে চুমু খেয়ে রায়ান কে উৎসাহ নিয়ে বলল-
“এই রায়ান, চল না ছোট্ট পাখি টাকে দেখে আসি।”
রায়ান মাহিরের কথায় প্রতি উত্তরে কেবল বলল-
“তোরা সবাই যা। আমি পরে দেখবো ওকে। ওর মায়ের জ্ঞ্যান ফিরুক আগে। দুজনে একসাথে দেখবো আমাদের প্রিন্সেস কে। ওর এমন অসহনীয় যন্ত্রণা ও কষ্টের ফল কে ওর আগে দেখার অধিকার আমার নেই।”
মাহির আর কিছু বলার সাহস করলো না। রায়ানের কথা শোনার পর তারা সকলে মিলে ছোট্ট অতিথিকে দেখতে চলে গেল। রামিলা চৌধুরী এবং রায়হান চৌধুরী বাচ্চার কাছেই বসে ছিলেন। দুজনের চোখেই দাদা দাদি হওয়ার খুশি স্পষ্ট। চট্টগ্রামে কেবল বাচ্চা হওয়ার আনন্দের দিকটাই জানানো হয়েছে এর বেশি কিছু বলার সাহস কেউ করে নি। এতো দূর থেকে কেবল টেনশন ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব না সুতরাং বললে হিতেবিপরীত হতো। তারাও চট্টগ্রামে নানা নানি হওয়ার খুশিতে আত্মহারা হয়ে মিষ্টি বিলাতে ব্যস্ত।
রাত গড়িয়ে গভীর রাত। আকাশে না চাঁদ আছে না তারা। প্রকৃতি ও যেন আজ আর সঙ্গ দিচ্ছে না। মিরা তখনও নিস্তব্ধ। হাসপাতালের করিডোরে সবকিছুই যেন স্বাভাবিক—নার্সদের ধীর পায়ের শব্দ, দূরে কোনো মেশিনের ক্ষীণ শব্দ, মাঝেমধ্যে কারও নিচু স্বরে কথা বলা। অথচ রায়ানের কাছে সময়টা যেন থেমে আছে।
চব্বিশ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণের সময়টা যেন প্রতিটি মুহূর্তে আরও দীর্ঘ হয়ে উঠছে। এই বারোটা ঘণ্টায় রায়ান খুব একটা বসেনি। কখনো হাসপাতালের সমজিদে নিরিবিলি এক কোণে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছে, কখনো দু’হাত তুলে দোয়া করেছে। কখনো চোখ বন্ধ করে বসে থেকেছে, আবার কখনো নীরবে চোখের পানি মুছে নিয়েছে। প্রতিবার দোয়া করতে গিয়ে তার কণ্ঠ আগের চেয়ে একটু বেশি কেঁপে উঠেছে। গত তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সে প্রায় জায়নামাজের উপর বসা।
শেষ রাতের নামাজের পর সে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মুখটা ক্লান্ত। অথচ ঘুম যেন তার চোখের কাছেও আসেনি। মুনাজাতে দু’হাত তুলে ধীরে ধীরে মিনতির সুরে সৃষ্টি কর্তার উদ্দেশ্যে বলল-
“হে আল্লাহ… আমি জানি না আমি কতটা ভালো মানুষ। আমি জানি না আমার দোয়া কবুল হওয়ার মতো কোনো আমল আমার আছে কি না। কিন্তু ওকে তুমি আর শাস্তি দিও না…”
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা আটকে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল-
“ওর তো কোনো দোষ নেই। আমি ওকে একা ছেড়েছি আমি আমার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়েছি এতে এই নিষ্পাপ মেয়েটার কি দোষ?”
পুরুষের সেই অতিবো গোপন ও মূল্যবান অশ্রু চোখ হতে গড়িয়ে পড়ল।
-“ওকে শুধু একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকাতে দাও খোদা। আমি আর কিছু চাইব না। সত্যি… আর কিছু না।”
দোয়া শেষ করেও সে হাত নামাল না। কয়েক মুহূর্ত পর খুব আস্তে বলল-
“ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও, আল্লাহ। ওর মুখ থেকে আবার ‘হাবি’ ডাক শুনতে চাই আমি… রহমত করো আল্লাহ।”
তারপর মাথা নিচু করে বসে রইল। কতক্ষণ কেটে গেল, সে জানে না। সিজদায় লুটিয়ে পড়লো সুগঠিত বৃহৎ দেহটা। হাসপাতালের ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ হতে তখনও ৯ ঘণ্টারও বেশি সময় বাকি। ফজরের আযান প্রতিধ্বনিত হতেই রায়ান নামাজে দাঁড়ালো।
ভোর ৪.৪০মিনিট। আইসিইউর ঘরটা তখনও নিস্তব্ধ।
মিরা নিঃশব্দে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ, মুখটা ক্লান্ত, ঠোঁট সামান্য শুকিয়ে আছে। পাশে মনিটরে তার হৃদস্পন্দনের রেখা নিয়মিত উঠানামা করছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মিরার ডান হাতের আঙুলটা খুব সামান্য নড়ে উঠল। এতটাই সামান্য যে প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই—সত্যিই নড়েছে, নাকি চোখের ভুল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার নড়ল আঙুলটা। ডিউটিতে থাকা নার্সের চোখ সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে গেল।
তিনি মিরার হাতের কাছে এসে নিচু হয়ে বললেন-
“ম্যাম? শুনতে পাচ্ছেন?”
কোনো উত্তর নেই। নার্স আবার ডাকলেন-
“ম্যাম, চোখ খুলতে চেষ্টা করুন।”
মিরার ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে চোখের পাতায় নড়াচড়া দেখা গেল। নার্স আর দেরি না করে ডাক্তারকে খবর দিলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ডাক্তার এসে মিরাকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। মিরা তখনও পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না। চোখ খুলে আবার বন্ধ করছে। চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করছে। ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন-
“মিসেস চৌধুরী, আপনি হাসপাতালে আছেন। ভয় পাবেন না। ধীরে ধীরে চোখ খুলুন।”
মিরা এবার একটু বেশি সময়ের জন্য চোখ খুলল।
তার দৃষ্টি ঝাপসা। সামনে থাকা মানুষগুলোকে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। ডাক্তার নার্সের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন-
“প্যাসেন্টের জ্ঞ্যান ফিরছে। ওনার হাসবেন্ড আর পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দিন।”
দরজা খুলে একজন নার্স বাইরে এসে চৌধুরী বাড়ির সকলের উদ্দেশ্যে বললেন-
“প্যাসেন্ট মিসেস মিরা রায়ান চৌধুরীর জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার বলেছেন এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। প্যাসেন্ট কে কেবিনে সিফ্ট করে দেও আ হলো সকলে দেখা করতে পারবেন।”
কেউ যেন কয়েক সেকেন্ড কথাটার অর্থই বুঝতে পারল না। তারপর রামিলা চৌধুরীর চোখ ছলছল করে উঠল।
তিনি দু’হাত তুলে শুধু বললেন-“আলহামদুলিল্লাহ…আমার মেয়েটা সুস্থ আছে। তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আল্লাহ।”
এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা ভয়টা যেন এক মুহূর্তে একটু হালকা হয়ে গেল। রিমি সোরায়া আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছে। কিন্তু রায়ান তখন সেখানে নেই। রামিলা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে রুদ্র ও মাহিরের দিকে তাকালেন।
-“রুদ্র, মাহির, তাড়াতাড়ি গিয়ে রায়ানকে খবরয়দে কেউ। ছেলেটা আমার অসহ্যকর জ্বালায় ভুগছে সেই কখন থেকে।”
মাহির রুদ্র কে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো- “কোথায় আছে ও? তুই জানিস?”
-“যেখানেই থাকুক, ওকে খুঁজে আন। ওকে বল ওর হৃদপাখির জ্ঞান ফিরেছে।”
একটু থেমে রামিলা আবার বললেন-
“একবার হসপিটালের মসজিদ টায় যা হয়তো ওখানেই আছে। খবরটা ওর কানে না পৌঁছানো পর্যন্ত শান্তি হবে না।”
মাহির রুদ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। রায়ানকে এই খবরটা দেওয়ার জন্য সে দ্রুত ছুটে গেল।
সালাম ফিরিয়ে মুনাজাত ধরতেই করিডোরের নীরবতা ভেঙে মাহির আর রুদ্র দৌড়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল রায়ানের দিকে। দুজনে রায়ান কে নামাজরত অবস্থায় দেখে মুচকি হেঁসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রায়ান মুনাজাত শেষ করতেই মাহির রুদ্র পর পর বলে উঠলো-
“মিরার জ্ঞ্যান ফিরেছে ভাইয়া!”
“ভাবির জ্ঞ্যান ফিরেছে রায়ান!”
কথাটা শুনেই যেন রায়ানের কান খাঁড়া হয়ে দাঁড়ালো। সে মাহির আর রুদ্রর দিকে এক পলক দেখে কাঁদো কাঁদো চোখে হেঁসে উঠে দাঁড়ালো। রুদ্র মাহির ছুট্টে এসে রায়ান কে জাপটে ধরলে রায়ান ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ও ঠিক আছে তো, তাই না?”
-“সব ঠিক আছে ভাইয়া।”
-“এবার সব ঠিক হবে। তুই শক্ত রাখ নিজেকে। আমরা তো আছি। বাকিটা সামলে নেব।”
এরপর সে আর কোনো প্রশ্ন করেনি। রায়ান রুদ্র আর মাহির কে ছেঁড়ে দৌড়ে হসপিটালের দিকে ছুটলো।
হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে মিরার কেবিনের দরজার সামনে এসে থেমে গেল। দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে রায়ান কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো। শ্বাস ফুলে উঠেছে। বুকটা দ্রুত উঠানামা করছে, চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম লাল। এতক্ষণ যে মানুষটা শুধু একটা খবরের জন্য অপেক্ষা করছিল, খবরটা পাওয়ার পরও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। দরজার কাঁচে ভেদ করে দৃষ্টি পাঁচ করতেই রায়ান মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখতে পেল। কি অপূর্ব সুন্দর সেই হাসি! রামিলা চৌধুরী মিরার হাত ধরে কেবল কেঁদে কেটে আহাজারি করে যাচ্ছেন। রিমি আর সোরায়া ও কম যায় না। বেচারি মিরা বুঝতেও পারছে না স্বান্তনা বাণী স্বরূপ তার কী বলা উচিত তাই কেবল হেঁসে তাদের মন রাখার চেষ্টা করছে। রায়ান মিরার মলিন মুখের হাঁসি দেখে অস্পষ্ট হাসলো। বুকের ভেতর কার হৃদস্পন্দন কয়েকটা বিট মিস করলো মনে হয়। রায়ান ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করলো-
“আমার হাঁসি কেড়ে নিয়ে কাঁদিয়ে ছেড়লো। আর এখন নিজে হাসছে। এই মেয়ের আমি কি করবো খোদা। আমাকে ধৈর্য দাও। মাত্র সুস্থ হয়েছে এখনি আবার অসুস্থ করা যাবে না।”
রায়ান শুধু তাকিয়ে রইল। তার মা রামিলা চৌধুরী, রিমি আর সোরায়া তখন কেবিনের ভেতরেই ছিলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানকে দেখে কেউ কিছু বললেন না। রামিলা শুধু একবার ছেলের চোখের দিকে তাকালেন দরজার কাঁচের ভেতর দিয়ে। সেই চোখে এতট সময়ের ভয়, ক্লান্তি, দ্বিধা আর অপেক্ষা একসঙ্গে জমে আছে। মিরাকে ইশারায় রায়ান কে দেখিয়ে দিয়ে বললেন-
“আমার ছেলেটাকে সেই প্রথম দিন থেকে কি জাদুতে বেধেছিস কে জানে। তোর কিছু হলে ছেলে আমার পাগল হয়ে যায়। চিনতেই পারি না এটা আমার সেই বেখেয়ালি ছেলেটা যে সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে কোনো এক সময় দেশ ছেড়ে চলে গেছিল। ২৪ ঘণ্টা পর তোর জ্ঞ্যান ফিরবে শুনে মসজিদে গেছিল আর এখন ১২ ঘণ্টার ও বেশি সময় হয়ে গেছে এখন তাকে ডেকে নিয়ে আসা হলো জায়নামাজ থেকে। এমন করেও কখনো ও তোকে ভালোবাসবে আমার জানা ছিল না। নিয়তি মানুষ কে কত কিছুর সম্মুখিন করে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তোরা সব বাধা বিপত্তি পার করে এখনো একে অপরের শক্তি হয়ে আছিস।”
রায়ান এবার অধৈর্য হয়ে দরজায় কড়া নাড়লো। রামিলা চৌধুরী মশকরা করে রিমি আর সোরায়া কে উদ্দেশ্য করে বললেন –
“হয়েছে হয়েছে, এই তোরা চল। নয়তো ছেলে আমার দরজায় ভেঙে ফেলবে।”
মিরাসহ রিমি সোরায়ার ও মুখ টিপে হেঁসে উঠলো। রামিলা চৌধুরী নিঃশব্দে রিমি আর সোরায়াকে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। রায়ানের দিকে একনজর দেখলেন মুচকি হেঁসে তবে কিছু বললেন না। রায়ান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল অবিলম্বে। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে রামিলা চৌধুরী একবার পেছনে তাকালেন। তারপর খুব আস্তে দরজাটা টেনে দিলেন।
রায়ান ভেতরে ঢুকে স্থির দাঁড়ালো। দরজাটা তার পেছনে নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ পুরো পৃথিবীটা যেন থেমে গেল তার জন্য। সামনে তার কাঙ্খিত নারী
শুয়ে আছে। গত দিনে যার চোখ খোলা রাখতে চিৎকার করেছে শতবার এখন তার চোখ দুটো স্পষ্ট খোলা।
রায়ান দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। এক পা-ও যেন আর এগোতে পারছে না। তার চোখ স্থির হয়ে গেল মিরার মুখের ওপর। এতক্ষণ ধরে যার জন্য সে দোয়া করেছে, কেঁদেছে, অপেক্ষা করেছে- এখন তার দিকে
চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। রায়ান ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এল, তারপর আরেক পা। কিন্তু মিরার কাছাকাছি আসার পরও সে কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন চোখ সরিয়ে নিলেই আবার সবকিছু হারিয়ে যাবে। মিরার মুখটা ক্লান্ত। চোখের নিচে অবসাদের ছাপ। ঠোঁট শুকিয়ে আছে। তবু রায়ানের চোখে সেসবের কোনো অস্তিত্ব নেই। তার কাছে মিরা ঠিক আগের মতোই বরং তার থেকেও বেশি সুন্দর ও জীবন্ত। কারণ আজ সে মিরাকে শুধু দেখছে না এমনটা নয়, আজ সে তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে দেখছে। রায়ানের চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। সে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল। তবে আজ আর পুরুষালি শক্তি বাধা পড়ে থাকার অবস্থায় নেই, কোনো অভিনয় করার ইচ্ছা নেই তার। দু একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল রায়ানের গাল বেয়ে। তারপরও চোখ সরল না। মিরার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, গত ১২ ঘণ্টার প্রতিটা ভয়, প্রতিটা দোয়া, প্রতিটা কান্না যেন এই এক মুহূর্তের কাছে এসে থেমে গেছে। মিরা রায়ানের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে অবাক। মনে মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে -“কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কি হাল হয়ে গেছে মানুষ টার।”
রায়ান খুবধীথে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। পায়ে শক্তি বলতে নেই। যেন এখনি ভেঙে পড়বে। মিরা নিজেও দুর্বল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের চোখ আটকে রইল একে অপরের চোখে। কোনো কথা নেই।
কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু দুটো চোখের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরবতা।
রায়ান ধীরে ধীরে মিরার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর আবার মিরার মুখ পানে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে মিরার হাত নিজের ভেজা গালে ঠেকিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো মিরার সামনে। মিরা ডুকড়ে কেঁদে উঠলো। কিন্তু একটা টু শব্দ করলো না। এবার তার চোখের পানি আর থামল না। রায়ান মাথা নিচু করে মিরার হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে সে চোখ বন্ধ করল। কাঁধ কেঁপে উঠল কঠোর দেহি মানবের। কিন্তু কান্নার শব্দ বের হলো না। মিরা শুধু তার দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। রায়ান খুব যত্ন সহকারে মিরার ক্যানুলা যুক্ত হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিনমিনে আওয়াজে বলল-
“আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম…জানো?”
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা ভেঙে গেল।
-“অনেক বেশি ভয় পেয়ে গেছিলাম..”
আর কিছু বলতে পারল না। শুধু মিরার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রইল। মিরার হাতে বৃথা করলো কিন্তু মিরা একটু আওয়াজ ও বের করলো না। ছেলেটার হাত থেকে এখন আর হাত সরানোর ইচ্ছে হলো না তার।
কখনো কখনো কাউকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এত গভীর হয়, যে সেখানে কোনো শব্দের প্রয়োজন হয় না।
রায়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। এতক্ষণ যে মানুষটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই মানুষটার মুখে হঠাৎ এমন এক স্বস্তি ফুটে উঠল, যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর প্রথমবার আলো দেখেছে। রায়ান শুধু একবার ফিসফিস করে বলল-
“হৃদপাখি আলহামদুলিল্লাহ বলেছ? আমাদের প্রিন্সেস এসেছে।”
মিরার চোখের কার্নিশ বেয়ে আরো য়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। ক্ষীণ আওয়াজে মিরা বলল-
“আলহামদুলিল্লাহ…”
তারপর আর অপেক্ষা করতে পারল না। রায়ান উঠে মিরা মুখের কাছে মাথে ঝুঁকিয়ে মেয়েটার কপালে ধীরে ওষ্ঠ ছোঁয়ানো। মিরা তৎক্ষণাৎ কেঁপে উঠে শক্ত করে ধরলো রায়ান কে। অতঃপর রায়ানের গালে নিজের কম্পিত হাত রেখে বলল-
“মামণি বলছিল, গত ২৪ ঘণ্টায় কিছু না খেয়ে ১২ ঘণ্টায়ই নাকি জায়নামাজে পড়েছিলেন। চোখ মুখের তো অবস্থা নেই। এভাবে যদি আপনার প্রিন্সেস এর সাথে দেখা করেন সে ভয় পাবে তো।”
রায়ান চুপ থেকে মিরার হাতটা নিজের গাল থেকে নিয়ে তাতে অসংখ্য চুমু দিল। মিরা রায়ানের পাগলামি দেখে হেঁসে উঠে আবার জিজ্ঞেস করলো-
” কি হলো? কথা বলছেন না যে, ১০ মিনিট ধরে টানা আমাকেই দেখে যাচ্ছেন। আপনার মেয়েকে দেখবেন না?”
অশ্রুভারাক্রান্ত রায়ানের স্নিগ্ধ চোখদুটি অবিরাম তাকিয়ে রইল মিরার দিকে। রায়ান মিরার কপালে অতি সাবধানতায় শিথিল কম্পিত ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল পুনরায়। এই স্পর্শের শেষ কোথায় তার জানা নেই। রায়ান বিড়বিড় করলো-
“আমি আমার মেয়ের মাকে দেখতে ব্যস্ত।”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (৩)
মিরা আবার হেঁসে উঠলো। রায়ান কাঁদো কাঁদো গলায় বললো-
“হাসবে না একদম। তোমার হাসি এখন আমার বিদ্রুপ মনে হচ্ছে। জান বেরিয়ে গেছিল আমার। তুমি হাসছো কিভাবে হ্যাঁ? ক্রিমিনাল বউ একটা..! আর কোনো দিন এমন করলে মরে যাওয়ার পর আবার মেরে ফেলবো। বলে দিচ্ছি।”
মিরা না চাইতেও রায়ানের এমন হাস্যকর আবলতাবল কথায় আরো জোড়ে হেঁসে উঠলো।
