Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (২)
অরাত্রিকা রহমান

রাত গভীর হয়েছে। ১০.৩০ এর কাছাকাছি ঘড়ির কাটা। রায়ান মিরার জন্য জন্মদিনের সারপ্রাইজ প্রস্তুত করতে গিয়ে অফিসে আর পা রাখতে পারেনি। গত কাল আমেরিকার মূল অফিসের বড় বড় শেয়ার হোল্ডার দের সাথে বোর্ড মিটিং বসবে। তাই আজ বাংলাদেশের অফিসের বোর্ড মেম্বার দের সাথে সেই বিষয়ে আলোচনা করা আবশ্যক। দুজনে আর চৌধুরী বাড়িতে ফিরে যায় নি। আজকের রাতটা নিজেদের বাড়িতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুজন। রায়ান বেডরুমের কাউচের বসে ভিডিও কনফারেন্সে মিটিং করছে এমন সময় মিরা হাতে করে একটা আম আর বেদানা প্লেটে করে নিয়ে এলো। তার হাতে একটা ফ্রুটস কাটার ছুড়িও আছে। কোনো রাজ্যের মহারানি ভাব নিয়ে মিরা গটকম করে হেঁটে ঠিক রায়ান সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার দিকে ফলের প্লেট আর ঘুড়িটা এগিয়ে দিল।

রায়ান মিরাকে এক পলক দেখে তার হাত থেকে ফলের প্লেট আর ছুড়ি টা নিয়ে নিজের ল্যাপটপের পাশে রাখলো। কোনো প্রকার প্রশ্ন বা উত্তর পর্বের প্রয়োজন হলো না তার। মিরা আওয়াজ না করে রায়ান একপাশে গিয়ে বসে রায়ানের কোলে নিজের পা তুলে দিল। রায়ান নিজের মনোযোগ ভঙ্গ করলো না তাতে‌। সে মিটিং এ সবার সাথে কথা বলার পাশাপাশি মিরার পা হালকা হাতে টিপে দিতে লাগলো। মিরা রায়ান কে ইশারায় ডেকে ফলের দিকে ইঙ্গিত করলে রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো-
“এভরিওয়ান…কিপ কুয়াইট ফর আ মোমেন্ট। আই উইল কাম ব্যাক ইন আ মিনিট।”
রায়ানের আদেশানুক্রমে সকলে স্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান মিরার পা দুটো সযত্নে কাউচের উপর রেখে বেরিয়ে গেল। মিরা ভ্রু কুঁচকে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো। এক মিনিট পর রায়ান টিস্যু তে নিজের হাত মুছতে মুছতে ঘরে ফিরলো। ল্যাপটপের সামনে বসে কানের এ্যায়ার পড্সে মিউট ছাড়িয়ে বলল-
“ক্যারি অন। আই অ্যাম ব্যাক।”

এই বলে ল্যাপটপের পাশে রাখা হল গুলো কেটে প্লেটে সাজাতে শুরু করলো। মিরা শুধু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে। রায়ান কথা বলার পাশাপাশি ফল কাটার শেষ করে মিরাকে ইশারায় নিজের কাছে ডাকলো। মিরা কাউচ ঘেঁষে ঘেঁষে রায়ানের দিকে গেলে। রায়ান কনফারেন্স চলাকালীনই মিরাকে কাটা চামচে গেঁথে ফল খাওয়াতে লাগলো। মিরা বাধ্য মেয়ের মত চুপ চাপ সেগুলো মুখে পুরে খেতে থাকলো। মিটিং চলাকালীন মিরার খাওয়া শেষ হলে সে রায়ানের সাথে কাউচেই বসে রইল। রায়ান মিরাকে কাউচে অস্বস্তিতে দেখে ইশারায় তাকে বারবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে বললেও মিরা সরলো না। এক পর্যায়ে রায়ানের কোলে পা তুলে রেখে কাউচের বিপরীত দিকে মাথা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। রায়ান মিটিং শেষ করে ল্যাপটপ টা বন্ধ করে মীরার দিকে তাকাতেই দেখলো মিরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদু ঠোঁট প্রসারিত হলো তার। রায়ান তার কোল থেকে মিরার পা সরিয়ে মিরাকেই কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল আরাম করে। মিরাকে বিছানায় নির্বিকার শুয়ে থাকতে দেখে রায়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠলো যেন মুগ্ধতায়।

-“মাশাআল্লাহ.. মাশাআল্লাহ..!”
বিড়বিড় করে। রায়ান মিরার দিকে হালকা ঝুঁকে এলো। দুষ্টু হেসে মিরার নাক চেপে ধরে রাখলো ৫-৬ সেকেন্ড। মিরা শ্বাস নিতে না পেরে ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ হাত পা ছুড়ে ছটফট করে উঠলে রায়ান কিছুই হয় নি এমন এক ভাব নিয়ে মিরাকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“আরে কি হয়েছে আমার পাখির? খারাপ স্বপ্ন দেখেছ হয়তো। কিছু হবে না। আমি আছি তো। ঘুমাও ঘুমাও..!”
মিরা পরিচিত সেই বিশ্বস্ত আওয়াজ শুনে ঘুমকাতুরে আধ বোজা চাহুনিতে রায়ানের দিকে একনজর তাকিয়ে রায়ান কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আবারো চোখ বুজে শুয়ে পড়লো তার বুকে। রায়ান নিজের মনে এক কুটিল হাসির রেখা টেনে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে তার কপালে ঠোঁট ছোয়ালো।

-“মি.. মিটিং শেষ?”
মিরা চোখ বন্ধ রেখেই প্রশ্ন করলো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে। রায়ান ও তার উত্তর করলো-
“হুম শেষ, সরি… এতো লেইট করার জন্য। ঘুমিয়ে পর হৃদপাখি।”
মিরা এবার চোখ খুলে রায়ানের দিকে তাকিয়ে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল-
“হাবি…আমার না খুব ভয় করছে?”
রায়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে-
“ভয়! কিসের ভয় তোমার?”
মিরা তার মাথা নিচু করে রায়ানের বুকের উপর শায়িত রেখেই আনমনে বলতে শুরু করলো-
“ডেলিভারির ডেট যত এগিয়ে আসছে ততই মনে কেমন একটা ভয় কাজ করছে‌। আচ্ছা..সব ঠিক ঠাকই হবে তো? যদি আমার কিছু..!”

-“ওই ওই, চুপ..! খেয়ে দেয়ে আর কাজ না থাকলে বলো আমাকে, অফিসের কিছু ফাইল চেক করতে দিয়ে যাবো কাল থেকে। তাহলে হয়তো এসব আজগুবি অনর্থক চিন্তা ভাবনা আর মাথায় আসবে না।”
মিরার মনের সন্দেহ প্রকাশে তৎক্ষণাৎ বাঁধা দিল রায়ান। মিরা আর কিছু বলার সাহস করলো না। একদম চুপ করে গেল। এখন আর নিজের ভয়ের কথাও বলতে চাইছে না সে। রায়ান মিরার মনের ঝড়ের প্রকোপ বুঝতে পেরে নিজের থেকে আগত বাড়িয়ে বলল-
“তোমাকে যে চুপ থাকতে বলছি ভয় তো আমারও করছে।”
মিরা রায়ানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো-
“আপনার কিসের ভয়?”
রায়ান মিরার চোখে চোখ রাখে স্বাভাবিক ভঙ্গিমাতেই বলে গেল-
“ভাবছি.. কিছু দিন পর তোমার এই ফোলা পেট আর দেখতে পাবোনা, খেলতে পারবো না, প্রিন্সেস এর সাথে কথা বলা হবে না, তোমার এমন খিটখিটে মেজাজ আর সহ্য করতে হবে না, তোমার মুড সুয়িং গুলো উপভোগ করা হবে না। আমার দিন কাটবে কি করে তাহলে? কোনো এন্টারটেইনমেন্ট ই থাকবে না। সেটাই ভয়ের কারণ।”

মিরা মনযোগ দিয়ে রায়ানের সম্পূর্ণ কথা শুনে নিজের চোখ ছোট ছোট করে নিল। সে সন্দেহে রায়ান কপালে আর গালে নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তার তাপমাত্রা পরিমাপ করে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল-
“জ্বড় তো আসে নি। তাহলে এইসব কি আবল তাবল বলে যাচ্ছেন আপনি?”
-“ভুল কি বলেছি? এটা কত্ত বড় একটা ভয়ের জায়গা আমার ধারণা আছে?”
-“আরে, আমার পেট কি এমনি এমনি ফোলা? যখন আর ফোলা থাকবে না তখন আপনার হাতে আপনার প্রিন্সেস তো থাকবে। আস্তো একটা এন্টারটেইনমেন্ট ডাউনলোড করতে যাচ্ছি আমি আপনার জন্য। আর আপনি কি বলছেন? আমি খিটখিটে?”
রায়ান হঠাৎ চমকপ্রদ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলল-
“ওহ তাই তো। তখন তো এক সাথে দুই জনের মুড সুয়িং সহ্য করতে হবে আমার। আল্লাহ আমার ধৈর্যে কুলোলে হয়..!”
মিরা রায়ানের কথায় এবার বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে চাইলে রায়ান অট্টহাসি দিয়ে তাকে জাপটে ধরে রাখলো নিজের বুকে।

-“ছাড়ুন আমাকে। থাকবো না আমি আপনার সাথে। আর মুড সুয়িং সহ্য করতে হবে না কারো।”
রায়ান মিরার দুগাল তার দুই হাতে চেপে মিরার ফোলানো ঠোঁটে টুক করে ছোট্ট চুমু খেয়ে তার মাথা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে আদুরে স্বরে বলল-
“ভয় পেয় না। যাই হোক না কেন, আমরা দুজনে সেটা ফেইস করবো। একসাথে। ঠিক আছে? টেনশন করবে না একদম। কিচ্ছু উল্টো হবে না। হলেও তোমার হাবি সেই উল্টো কে পাল্টে দেবে। ডোন্ট ওয়ারি। উই উইল ফাইট অ্যান্ড ইনজয় ইট টুগেদার।”
মিরার অশান্ত মন রায়ানের কথায় শান্ত হলো। দুজনে একে অপরকে আলিঙ্গন করে ঘুমের নাউয়ে গা এলিয়ে দিল।

সকালের কোমল আলো ধীরে ধীরে জানালার পাতলা পর্দা ভেদ করে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সোনালি রোদের নরম রেখাগুলো বিছানার সাদা চাদরের ওপর এসে থেমেছে, যেন নতুন দিনের সূচনাকে নিঃশব্দে ঘোষণা করছে। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখিরা কিচিরমিচির করে উঠছে, আর জানালার ফাঁক গলে আসা শীতল বাতাস পর্দাকে আলতো দোল খাইয়ে দিচ্ছে। রায়ানের ঘুম অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছিল। আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো নয়। দুপুরে আমেরিকার ম্যানেজিং বোর্ড আর শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং। নিজের এতো দিনের স্বপ্নের বাস্তবিক রূপান্তরের শুরু হবে আজ। এসবের আগে একবার সাইট ভিজিটও করতে হবে। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত আজ হিসেব করে চলতে হবে তাকে। ইতোমধ্যেই ঘুমের জন্য দেরি হয়েছে খুব।
স্নান সেরে বেরিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করল রায়ান। গাঢ় ধূসর স্যুট, সাদা শার্ট, কব্জিতে ঘড়ি—সবকিছুই পরিপাটি। অথচ মাঝেমধ্যেই তার দৃষ্টি ঘুরে যাচ্ছিল বিছানার দিকে। সেখানে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে মিরা। নয় মাসের ভারী গর্ভ তাকে আরও শান্ত, আরও কোমল করে তুলেছে। এক হাত নিজের পেটের ওপর আলতো রাখা, এলোমেলো চুলগুলো মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অজান্তেই রায়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কতটা পথ পেরিয়ে আজ এই মানুষটা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আশ্রয় হয়ে উঠেছে!
জুতো পরে নিচু হয়ে মোজা ঠিক করছিল সে, এমন সময় বিছানায় হালকা নড়াচড়ার শব্দ হলো। মিরার ঘুম ভাঙল। অর্ধনিদ্রার ঘোরে ভারী চোখ দুটো কষ্ট করে খুলে সে প্রথমেই রায়ানকে দেখল। পুরোপুরি তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,

— “কোথায় যাচ্ছেন?”
রায়ান মোজা টেনে ঠিক করতে করতেই মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— “গুড মর্নিং.. যাচ্ছি তো অফিসে সোনা। অনেক কাজ জমে আছে। দুপুরে একটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে বলেছিলাম তো তোমাকে। তার আগে সাইটেও যেতে হবে একবার। দেরিই হয়ে গেছে।”
কথাগুলো শুনে মিরা আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে উঠে বসল বিছানায়। ভারী শরীরটাকে সামলে বসতেই এক হাত স্বভাবতই গিয়ে থামল নিজের গোল হয়ে ওঠা পেটের ওপর। আঙুলগুলো স্নেহভরে বুলিয়ে দিল সেখানে। মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে এলো। অনেকক্ষণ নীরব থেকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— “যেতেই হবে… তাই না?”
রায়ান জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “হ্যাঁ। আমাকে ছাড়া এসব কাজ হবে না, পাখি।”
ঘরের ভেতর আবারও নেমে এলো একরাশ নীরবতা।
সেই নীরবতা ভেঙে কিছুক্ষণ পর মিরা আবার বলল,
— “আজ… না গেলে হয় না?”

এইবার রায়ান আর দূরে থাকল না। ধীরে ধীরে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। মিরার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। কয়েক মুহূর্তেই বুঝে ফেলল—এটা কোনো জেদ নয়, কোনো অভিমানও নয়। মাতৃত্বের শেষ প্রহরে এসে অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে। প্রিয় মানুষটাকে চোখের আড়াল করতেও যেন বুক কেঁপে উঠছে তার। এই সময়টাতে মনের ভেতর অকারণ ভয় বাসা বাঁধে, ছোট ছোট অনিশ্চয়তাও পাহাড়সম মনে হয়।
রায়ান আলতো করে তার গালে হাত রাখল। বুড়ো আঙুল দিয়ে গালটা আস্তে করে ছুঁয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,

— “কী হয়েছে, হৃদপাখি? কোনো সমস্যা? খারাপ লাগছে?”
মিরা ধীরে ধীরে রায়ানের হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে বন্দি করে ফেলল। মাথা নাড়ল।
— “উঁহু… তেমন কিছু না। ভালো লাগছে না। আপনি চলে গেলে… এখানে একা একা লাগবে।”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠটা কেমন ভেঙে যাচ্ছিল। যেন সামান্য কথার আড়ালেও লুকিয়ে আছে অসংখ্য অপ্রকাশিত অনুভূতি। রায়ানের বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মিরার হাতটা তুলে নিয়ে হাতের পিঠে গভীর মমতায় একটি চুমু খেল। তারপর শান্ত, আশ্বাসভরা কণ্ঠে বলল,
— “রাত অবধি একটু ম্যানেজ করে নাও, পাখি। এখন ওই বাড়িতে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আবার অফিস যাওয়ার মতো সময় নেই। রাতে কাজ শেষ করেই তোমাকে নিয়ে বাইরে ডিনার করব। তারপর একসাথে ফিরব। কেমন?”
মিরার মুখে তবুও নিশ্চিন্ততার ছাপ ফুটল না। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আবারও বলল,
— “মিটিংটা… ঘর থেকে করা সম্ভব না? আই প্রমিস, কালকের মতো মিটিংয়ের মাঝে আর জ্বালাবো না। শুধু… আমার সঙ্গে থাকুন, প্লিজ।”

অনুরোধভরা কণ্ঠটা যেন রায়ানের সমস্ত দৃঢ়তাকে নরম করে দিল। সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। মাথার ভেতর দ্রুত হিসেব কষতে লাগল। অফিসে তার উপস্থিতি আজ জরুরি। বিদেশি বোর্ড মেম্বারদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক, সাইট পরিদর্শন—কোনোটাই এড়ানো সম্ভব নয়। আবার মিরাকে একা রেখে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারছে না। এই অবস্থায় সারাদিন একা থাকলে মেয়েটা আরও অস্থির হয়ে পড়বে। আর সে নিজেও অফিসে বসে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না। কিছুক্ষণ ভেবে অবশেষে মৃদু হেসে বলল,
— “আচ্ছা… একটা ব্যবস্থা করি। আমি এখন অফিসে বেরিয়ে যাই। তারপর বাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করে দিই। সে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে ওই বাড়িতে। সেখানে সবাই থাকবে, তোমারও একা লাগবে না। সেটা পারবে তো?”
মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মন চাইছিল না। একটুও না। তবুও বাস্তবতার কাছে অনুভূতিগুলোকে হার মানাতেই হলো। খুব আস্তে মাথা নাড়ল সে।

— “আচ্ছা…”
রায়ান বুঝল, এই সম্মতির ভেতরেও লুকিয়ে আছে অনিচ্ছা। সে আর সময় নষ্ট করল না। ঝুঁকে প্রথমে মিরার কপালে দীর্ঘ একটি চুমু এঁকে দিল। তারপর আদরভরে হাত রেখে তার ভরা পেটের ওপরও একটি চুমু খেল। মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল,
— “বেবিকে নিয়ে দুষ্টুমি করবে না কিন্তু। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ড্রাইভার কে পাঠিয়ে দেব। রাতে তাড়াতাড়ি ফিরেও আসব।”
মিরা নিঃশব্দে তার হাতটা আরও একবার চেপে ধরল।
রায়ান শেষবারের মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ঘর আবার নিস্তব্ধ। শুধু বিছানায় বসে থাকা এক অন্তঃসত্ত্বা নারী নিজের গোল হয়ে ওঠা পেটের ওপর হাত রেখে বন্ধ দরজার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, তার প্রিয় মানুষটা শুধু ঘর থেকেই নয়, যেন দিনের সমস্ত উষ্ণতাটুকুও সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেছে।
রায়ান বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরটা যেন মুহূর্তেই প্রাণহীন হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে তার কণ্ঠের উষ্ণতা ছড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ আর নিস্তব্ধতা। মিরা ধীরে ধীরে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর অল্প কিছু শুকনো খাবার আর ফল খেয়ে সোফায় এসে বসল। সামনে টেলিভিশন চলছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল না সেখানে। বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সময়টা আজ ইচ্ছে করেই এগোতে চাইছে না।
এদিকে—
রায়ান ইন্ডাস্ট্রিজ বিশাল নির্মাণ প্রকল্পের সাইটে গাড়ি থামতেই সবাই একসঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

—”গুড মর্নিং, স্যার।”
রায়ান সংক্ষিপ্ত মাথা নাড়ল।
—”মর্নিং। রিপোর্ট।”
একটার পর একটা ফ্লোর ঘুরে দেখল সে। কোথাও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নির্দেশ দিল, কোথাও ডিজাইনের ছোটখাটো পরিবর্তন করতে বলল। তার চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। সব কাজ শেষ করে সে সরাসরি হেড অফিসে পৌঁছাল। নিজের কেবিনে ঢুকেই কব্জির ঘড়ির দিকে তাকাল। মিটিং শুরু হতে আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি। সে ফোন বের করে ড্রাইভারকে কল করল।
—”হ্যালো, ড্রাইভার কাকা?”
—”জি, বড় বাবা।”
—”আমি এখন মিটিংয়ে ঢুকব। আপনি এখনই একটু আমার নতুন বাড়িতে যান। মিরা ম্যাডামকে নিয়ে সরাসরি চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। আপনার উপর দায়িত্ব দিচ্ছি। সাবধানে গাড়ি চালাবেন প্লিজ।”
—”জি বড় বাবা। আমি এখনই রওনা হচ্ছি।”

কল কেটে রায়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে মিরার নম্বরে কল দিল। রিং…একবার..দু’বার তিনবার…কেউ ধরল না। রায়ান ভ্রু কুঁচকে আবার কল দিল।
—”কি অদ্ভুত কল ধরছে না কেন? পিক আপ, হৃদপাখি…।”
নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল সে। কিন্তু এবারও একই ফল। কলটা কেটে গেল। ঠিক তখনই কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তানভীর ভেতরে উঁকি দিল।
—”স্যার, আমেরিকার বোর্ড মেম্বাররা অলরেডি অনলাইন আছেন। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
রায়ান বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আর একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। No Answer. মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি খেলে গেল। তবুও নিজেকে বোঝাল,
“হয়তো মিরা ফোনের কাছে নেই।”
রায়ান একটা মেসেজ সেন্ড করে ফোনটা পকেটে রেখে সে কনফারেন্স রুমের দিকে হাঁটল।
ওদিকে…
ফোনটা যখন বিছানার ওপর পড়ে অবিরাম কাঁপছিল। মিরা তখন ওয়াশ রুমে ছিল। বাড়ি ফিরতে হবে তাই শাওয়ার নিতে গেছিল। ভেতর থেকে ফোনের আওয়াজ শুনে তাড়া হুড়ো করে ঘরে প্রবেশ করতে নিলে ভারী শরীরটাকে সামলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ল। ফোনটা ঠিক বিছানার অপর পাশে। তাড়াহুড়ো করে এক পা বাড়াতেই তার পা ভেজা টাইলস এর উপর পিছলে গেল।

—”আআআআআ…!”
সবকিছু যেন এক নিমিষে ঘটে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে হোঁচট খেল মিরা। নিজেকে সামলানোর জন্য মরিয়া হয়ে পাশের টেবিলটা ধরতে চাইল। কিন্তু আঙুলগুলো টেবিলের কিনারা ছুঁয়েও শক্ত করে ধরতে পারল না।পরের মুহূর্তেই একটা ভারী শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। মিরার শরীর মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে গিয়ে সে দুই হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও, ভারী পেটের জন্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। তীব্র ব্যথায় তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

—”আ… আল্লাহ…মাআআআআ..”
কাঁপতে কাঁপতে পেটের ওপর দু’হাত চেপে ধরল সে।
মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। বিছানার ওপর রাখা ফোনটা তখনও একটানা বেজেই চলেছে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—”হাবি Calling…!”
কাঁপতে থাকা হাতটা ফোনের দিকে বাড়াল মিরা।
কিন্তু দূরত্বটা যেন হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেছে।
আঙুলগুলো মেঝের ওপর অসহায়ভাবে ছুঁয়ে গেল, অথচ ফোনটা আর ধরা হলো না। কলটা কেটে গেল।
ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই মিরার কষ্টভরা ক্ষীণ স্বর ভেসে উঠল—

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০

—”রা… রায়ান…আআআআ”
চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু। আর ঠিক সেই সময়, কয়েক কিলোমিটার দূরে কনফারেন্স রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানের বুকের ভেতর হঠাৎ অকারণ এক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। যেন কোনো অদৃশ্য আশঙ্কা তাকে নিঃশব্দে সতর্ক করে দিচ্ছে—কোথাও যেন কিছু একটা ভীষণ ভুল হয়ে গেছে।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (৩)