Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (৩)
অরাত্রিকা রহমান

এখন আগস্ট মাস। মিরাকে নয় মাসের ভরা পেটে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এখন। বাড়ির প্রতিটা মানুষের পাশাপাশি বাড়ির প্রতিটা দেওয়ালও হয়তো এখন তার খেয়াল রাখে। পাশাপাশি, সোরায়ার বায়নার জন্যই মাঝে মাঝে কলেজ শেষে সোরায়া আর মাহির মিরার সাথে দেখা করতে আসে। অতঃপর সোরায়ার পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগিতার হাজারটা নালিশ পৌঁছায় মিরার কানে মাহিরের তরফ থেকে আর মিরা প্রতিবার বড় বোন হিসেবে সোরায়া কে শাসন করে। যদিও তাতে সোরায়ার পড়াশোনায় লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, তবে সে মিরার সাথে ঐ সময়টুকু কাটাতে পছন্দ করে। মিরা মাহির আর সোরায়ার মধ্যকার সুসম্পর্ক দেখে বরাবরই সন্তুষ্ট হয়। অভিভাবকের জায়গা থেকে সে নিশ্চিন্ত যে তার বোন সুখে আছে, ভালো আছে, তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে আছে যে তার বোনকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। বাবা রায়হান চৌধুরীর সাথে রায়ান আর রুদ্র তিনদিন হলো বিজনেস ট্রিপে গেছে। মিরা বারংবার রায়ানের সাথে যেতে চাইলেও লাভের লাভ কিছু হয় নি। রায়ান তাকে এমন ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতিতে মোটেও কোনো লম্বা জার্নি করতে দিতে রাজি ছিল না। কাজের প্রয়োজন না থাকলে হয় তো সে নিজেও মিরাকে এই সময় একা ছেড়ে কোথাও যেত না। রায়ান যাওয়ার আগে মিরার ভালো মন্দের দায়িত্ব মা- রামিলা চৌধুরী ও ভাই বউ- রিমির উপর নেস্ত করে গেছে যেন মিরার কোনো রকমের অসুবিধা না হয়। যদিও এই ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ ছিল না তবে নিজের অনুপস্থিতিতে মিরার দিনযাপন সে নিজেও চিন্তা করতে পারে না। এই কয়েক মাসে মিরার খেয়াল রাখা যত্ন নেওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কি আর করার! তাকে যেতেই হতো। তীব্র অপেক্ষায় কোনোমতে তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে মিরার।
দিনের হিসেবে আজ তাদের বিজনেস ট্রিপের শেষ দিন‌। স্নিগ্ধ শোভন সকালবেলা, সূর্য স্বচ্ছ আকাশে চকচক করছে। মিরা রিমির সাথে বাগানে ছাউনির নিচে বসে আছে। রিমি বাদাম ছিলে মিরার মুখে তুলে দিতে দিতে বলল-

“কিরে? এমন থুম মেরে বসে আছিস কেন? সকালে ভাইয়া কল দিল, কথাও বললি না। ভাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলো তোর কিছু লাগবে নাকি তোর থেকে জেনে যেন ভাইয়া কে বলি, তখনও কিছু বললি না। এই কয়দিন তো পাগল হয়ে ছিলি, কবে আসবে, কবে আসবে…আর আজ ফিরছে তোর কোনো হেলদোলই নেই।”
মিরা রিমির কথায় তেমন পাত্তা দিল না। বাদাম চিবোতে চিবোতে হেয়ালি করে জবাব দিল-
“হেলদোল নেই কে বললো? চিন্তা করছি ঠিক কিভাবে স্বাগতম জানানো যায় আমার প্রাণের সুয়ামি কে। জাঁকজমকপূর্ণ একটা ওয়েল কাম না করলে কি আর হয় বল?”
রিমির মিরার কণ্ঠস্বর শুনে সন্দেহ হলো-
“ঠিক কি ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ওয়েল কামের কথা বলছিস?”
মিরা ঘাড় ঘুরিয়ে রিমির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“কি সুন্দর আমাকে একা রেখে চলে গেছিল। এখন ফিরছে কেন!? আমি বলছি ফিরতে? আমাকে কল করে কেন এখন?”
রিমি মিরার মাথায় হাত রেখে তাঁকে শান্ত করতে বলল-

“আহা, ভাইয়া কি অকারণে করে তোকে রেখে গেছে? এইটা তোর প্রেগনেন্সির লাস্ট মান্থ..কত ক্রিটিক্যাল তা তো জানিসই। এই সময় ভাইয়া তোকে নিয়ে যেতে চাইলেও মামণি ভুলেও তোকে যেতে দিতো না।”
-“তুই ওনাকে আর ডিফেন্ড করিস না। উনি চাইলে সব করতে পারে। আমাকেও ঠিক নিতে পারতো নিজের সঙ্গে কিন্তু ইচ্ছে করে নেয় নি।”
রিমির কপালে হাত। মিরা হঠাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“যাই হোক। ফিরছে যখন, বরের জন্য একটু সাজুগুজু করি গিয়ে। এই তিন দিন খুব বোরিং ছিল। একটু এন্টারটেইনমেন্ট এর দরকার। আমি যাই। তুইও রেডি হ গিয়ে। এতো বড় একটা গুড নিউজ কি এভাবে দেওয়া যায়?! রুদ্র ভাইয়ার তো আজ ঈদ লাগবে। ওঠ ওঠ.. তাড়াতাড়ি!”
রিমির সম্পূর্ণ মুখ লাল হয়ে উঠলো। সে মুখ নিচু করে লাজুক হাসলো মিরার কথা শুনে। অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে মিরার হাত শক্ত করে ধরে তাকে ধীরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল।

সকালের সময় সীমা ফুরিয়ে দিনের দৈর্ঘ্য এখন অপরাহ্নের দোরগোড়ায়। রায়হান চৌধুরী, রায়ান ও রুদ্র তিনজন সদর দরজা পার করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে। রামিলা চৌধুরী সোফার কুশন গুলো গুছিয়ে রাখছিলেন এমন সময়। রায়হান চৌধুরী দুই ছেলের সঙ্গ ছেড়ে দ্রুত স্ত্রীর কাছে গেলেন। রুদ্র রায়ান কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সেই দিকে ইশারা করতেই রায়ান বিরক্ত হয়ে রুদ্র কে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বললো –
“ধুরু, আগে এই ফাইলের ঝামেলা টা শেষ কর। এসব দেখলে এখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবো না‌। মনটা এমনিতেও বউ বউ করছে। তাড়াতাড়ি কাজ গোছা‌।”
এই বলে রায়ান নিজের হাতে থাকা ফাইল টা খুলে রুদ্র কে একটা জায়গায় দেখিয়ে বলল-
“এই জায়গার হিসেবটা ম্যানেজার কে বলবি সব ডকুমেন্ট সহ দেখাতে। এত টাকার গড় মিল তো হঠাৎ করে হওয়ার কথা না। আব্বুর কি এখন আর ওই শরীর আছে যে এসব দেখবে? আর আমি তো শুরু থেকেই ফ্যামিলি বিজনেসে নেই। সব টাই তোর। খেয়াল তো তোর রাখতে হবে নাকি?!”

“ঠাস..!” হঠাৎ ভেসে আসা তীক্ষ্ণ শব্দে রায়ানের সমস্ত মনোযোগ সেদিকে ধাবিত হলো। স্বাভাবিক ভাবেই শব্দের অনুসরণে সে খাবার টেবিলের দিকে তাকালো। মুহূর্তের জন্য সময়ের স্রোতে বাঁধা পড়লো! মিরা ঠিক সেখানটায় দাঁড়িয়ে। পড়নে তার নীল-সাদা রঙের মায়াবী মিশেল শাড়ি যেন মিরাকে ঘিরে এক টুকরো নির্মল আকাশ নামিয়ে এনেছে। নয় মাসের পূর্ণতার আভা নিয়ে শাড়ির ভাঁজ উপেক্ষা করে উঁকি দেওয়া গোলাকার উদর, মাতৃত্বের সেই পবিত্র সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে মিরা আজ অবিশ্বাস্য রকমের মোহনীয় রূপে ধরা দিচ্ছে রায়ানের দৃষ্টি সম্মুখে। নিজের সহধর্মিণীকে এতটা অপার্থিব সুন্দরও লাগতে পারে, তা রায়ানের কল্পনারও বাইরে ছিল। মিরা মুখ তুলে তাকাল রায়ানের দিকে। তার বড় বড় ডাগর চোখ দুটো এসে আটকে গেল রায়ানের চোখে। সেই দৃষ্টিতে ছিল দুষ্টুমির এক চিলতে হাসি, ছিল অব্যক্ত ভালোবাসার নীরব স্বীকারোক্তি। আসলে ইচ্ছা করেই সে এত জোরে শব্দ করেছিল—শুধু রায়ানের দৃষ্টি একবার নিজের দিকে টেনে আনবে বলে।
আর সে উদ্দেশ্য সফলও হলো।ৎচোখে চোখ পড়তেই রায়ানের গলা হঠাৎ শুকিয়ে এলো। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন তাল হারিয়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। মাথার ভেতর অদ্ভুত এক ঝিমঝিমে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তেই তার হাত ধরে থাকা ফাইলটা “ঠাস!” করে মেঝেতে পড়ে গেল। পায়ের নিচের জমিন যেন কেঁপে উঠলো। ঠিক সময়েই রুদ্র তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

—”আরে, কী হয়েছে ভাইয়া?”
কিন্তু রায়ানের কাছে কোনো উত্তর নেই। সে নির্বাক, নিথর দৃষ্টিতে শুধু মিরার দিকেই তাকিয়ে রইল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না—এটাই তার হৃদপাখি, এতোটা মনোমুগ্ধকর রূপে দাঁড়িয়ে। রায়ানের সেই বেহাল অবস্থা দেখে মিরা আঁচলের আড়ালে মুখ লুকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই লাজুক হাসিটুকু আরও কয়েক মুহূর্ত রায়ানের শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এরপর খুব ধীরে, সাবধানে পা ফেলে সে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল একটি বারের জন্যও রায়ান কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তার মাঝে দেখা গেল না। মিরাকে এভাবে হাঁটতে দেখে আচমকাই রায়ানের মনে উৎকণ্ঠা জেগে উঠল- ‘শাড়ি পরে ঠিকমতো হাঁটতে পারছে তো? যদি পা জড়িয়ে যায়?’
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে মিরার দিকে এগিয়ে যেতে পা বাড়াল। কিন্তু ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন রামিলা চৌধুরী—

“কী হয়েছে বাবা? সকালে কিছু খাসনি নাকি? মাথা ঘুরছে? পানি দেব?”
হঠাৎই বাস্তবে ফিরে এলো রায়ান। একটু হকচকিয়ে থমকে গেল সে। এই ফাঁকেই মিরা রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। রায়ান অসহায় দৃষ্টিতে শরীরটা সামান্য কাত করে রান্নাঘরের দিকে উঁকি দিল। যেন আর একবার… মাত্র একবার তার হৃদপাখিকে চোখ ভরে দেখে নেওয়া যায়। রায়ানের বেহাল অবস্থা দেখে রামিলা চৌধুরীর আর বুঝতে বাকি রইল না, ছেলেটার হঠাৎ কী হয়েছে। রায়ান তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে না বললো রামিলা চৌধুরীকে—
“তোমাকে যেতে হবে না, আম্মু। তুমি আব্বুর কী লাগবে দেখো। আমিই যাচ্ছি।”
কথা শেষ করেই আর কারও প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে সে মায়ের পাশ কাটিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। রামিলা চৌধুরী ছেলের চলে যাওয়া দেখে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুললেন। সবকিছু নীরবে লক্ষ্য করছিলেন রায়হান চৌধুরী। স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে মজা করে বললেন,
—”এটা যে আমারই ছেলে, সেটা বোঝার জন্য আর ডিএনএ টেস্টের দরকার নেই।”
রামিলা চৌধুরী ভ্রু তুলে স্বামীর দিকে তাকালেন।

—”হ্যাঁ, আপনার মতোই হয়েছে। বউকে জ্বালানোর স্বভাব পেয়েছে আপনার থেকে।”
কথাটা শুনে রায়হান চৌধুরী মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। সংসারের এমন ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন সবচেয়ে বড় সুখ। এদিকে মেঝেতে পড়ে থাকা ফাইলটা তুলে নিয়ে রুদ্র একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করলো,
—”আম্মু… রিমি কোথায়?”
রামিলা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে হাসলেন।
—”দুটো ছেলেই একেবারে বাবার স্বভাব পেয়েছে।”
তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
—”রিমি মিরার সঙ্গেই রান্নাঘরে আছে।”
রুদ্রের মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। ঘাড়ের পেছনে হাত বুলিয়ে সংকোচ নিয়ে সে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকেই এগিয়ে গেল। ছোট ছেলের চলে যাওয়া দেখে রামিলা চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,
—”ছোটটার মধ্যে তবু একটু লাজ-লজ্জা আছে। কিন্তু বড়টার তো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত কোনো সংকোচই নেই!”
কথাটা শেষ হতেই রায়হান চৌধুরী চুপিচুপি তার স্ত্রীর একেবারে পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর আলতো করে কাঁধে হাত রেখে আপন করে টেনে নিলেন।
হঠাৎ এমনটা হওয়ায় রামিলা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,

—”আরে, কী করছেন? বয়সের একটু তো খেয়াল আর কয়েক দিন পর তো দাদা হয়ে যাবেন।”
রায়হান চৌধুরীর মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। স্ত্রীর কপালের পাশে আলতো করে হাত রেখে শান্ত স্বরে বললেন,
—”দাদা হওয়া মানেই কি তোমার হাতটা ধরে দাঁড়াতে পারব না? বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় বাড়ে, মন কি আর বয়স্ক হয়? তাহলে ভালোবাসায় সমস্যা কি!? বয়স তো একটা সংখ্যা মাত্র। এসব খেয়াল করে লাভ নেই। আর লাভ ছাড়া তোমার স্বামী কিছু করে না। বিজনেসম্যান বলে কথা। ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে।”
রামিলা চৌধুরী অনিচ্ছার ভান করলেও ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে রায়ান এক মুহূর্ত থামল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন অকারণেই ধুকপুক করছে। অবশেষে তিন দিন পর এত কাছ থেকে মিরাকে দেখবে। মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল তার। রান্নাঘরে পা রাখতেই পরিচিত, স্নেহমাখা কণ্ঠে ডেকে উঠল—
“হৃদপাখি…?”
পরিচিত সেই ডাক কানে আসতেই রুটি বেলা থামিয়ে মিরা তৎক্ষণাৎ মুখ তুলল। দু’জনের চোখ এক হতে না হতেই সময় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
রায়ানের চোখে স্বস্তি, মুগ্ধতা আর বহু প্রতীক্ষার প্রশান্তি একসঙ্গে ভেসে উঠেছে। তবে সেই মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মিরার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রিমি বিস্মিত চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই রায়ানের পিছু পিছু রান্নাঘরে ঢুকল রুদ্র। এবার মিরা আর রিমি—দু’জনের দৃষ্টিই একসঙ্গে রায়ান থেকে সরে গিয়ে রুদ্রর ওপর স্থির হলো। রুদ্র খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাঁকারি দিল। পরিস্থিতিটা বুঝে রায়ান মুচকি হেসে বলল-

“আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? নিজের বউকে নিয়ে ফোট এখান থেকে।”
এরপর রিমির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—
“রিমি, তুমি রুদ্রর সঙ্গে যাও। এত দূর থেকে এসেছে, ওর কিছু লাগবে কি না দেখো।”
রিমি ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল রায়ানের কথায়‌। রুদ্রও আর দেরি করল না, দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রিমির কব্জি নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওরা দু’জন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই চারপাশে এক ভারী নীরবতা নেমে এলো। এখন রান্নাঘরে শুধু রায়ান আর মিরা। মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে না থেকে আবার রুটির লেচির দিকে মন দিল। মুখে যতই নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করুক, ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসিটা বারবার ধরা পড়ে যাচ্ছিল। তিন দিন পর স্বামীকে এত কাছে পেয়ে তারও ভীষণ ইচ্ছে করছিল সব অভিমান ভুলে দুটো কথা বলতে, একবার আলিঙ্গন করতে। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। হৃদয়ের কোনো এক দুষ্টু পোকা তাকে যেন উস্কানি দিচ্ছে- একটু ভাব না নিলে যেন মান থাকবে না। রায়ান এক গালে হেঁসে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল মিরার কাছে। মিরার এক হাত দূরে এসে থামল সে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নরম স্বরে বলল—

“এখনও কি আমার ওপর রাগ করে আছো?”
মিরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু বেলনটা ঘুরিয়ে যেতে লাগল। রায়ান হালকা হেসে মিরার পেছন থেকে মিরা কে নিজের আয়ত্তে আবদ্ধ করতে রান্নাঘরের স্ল্যাবের উপর দু হাত রেখে ভর দিয়ে দাঁড়াল। এখন আর সেই এক হাত দূরত্বের অস্তিত্ব নেই।
—”তিন দিন পর একটু জ্বালাতে চাইছি.. আর তুমি তো পাত্তাই দিচ্ছ না। শরীর ঠিক আছে তো আমার বউটার? খাটাও নি তো ওকে?”
কথাটা শুনে মিরার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠলেও সে মুখ নিচু করেই রইল। রায়ানের নিঃশ্বাস যথেষ্ট ভারী হয়ে এসেছে ইতোমধ্যে যা থেকে থেকে মিরের উন্মুক্ত ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। মিরার হাত রুটি ফেলতে গিয়ে বারংবার কম্পিত হচ্ছে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“সো, নোবাডি মিসড মি, রাইট?”
রায়ান এবার অতিরিক্ত মিরার কাছাকাছি এলে মিরা রায়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে গোমড়া মুখে বলল-
“এভাবে গায়ের উপর উঠে গিয়ে কথা বলতে হয় বুঝি? আমার কি কান নেই? অ্যান্ড ইয়াহ্, নোবাডি মিসড ইউ। গট ইট?”
রায়ান নিজের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মাথা উপর নিচ করে মিরাকে আপাদমস্তক একনজর দেখে মুচকি হেসে বলল-

“তা তো দেখতেই পাচ্ছি। মহারানির হঠাৎ শাড়ি পড়ার কারণ কি আর আমার অজানা? না বললেও বুঝে যেতাম- নোবাডি মিসড মি।”
মিরা রায়ানের কথা শুনে ভালোই বুঝলো তাকে খোঁচা মেরেই বলা হয়েছে কথাটা। মিরা গাল ফুলিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলো-
“আমার কাউকে মিস করার মতো সময় নেই, আরো অনেক কাজ থাকে আমার। আর আমি মোটেও কাউকে দেখাতে শাড়ি পড়ি নি। বিরক্ত না করে ঘরে গিয়ে ফ্রেস হন।”

এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে মিরা পুনরায় ঘুরে রুটি বেলার দিকে মনোনিবেশ করলো‌‌। রায়ানের মধ্যে খুব একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না। রায়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একদম নিঃশব্দে মিরার পেছনে দাঁড়াল। তারপর কোনো কথা না বলে আলতো করে মিরা দু বাহু আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের বুকে টেনে নিল। অতঃপর দু’হাতে মিরার ভারী, পূর্ণ গোলাকার পেট সযত্নে আগলে সামান্য ওপরে তুলে ধরতেই মিরার শরীরের সমস্ত ভার যেন এক নিমিষেই হালকা হয়ে গেল। মিরা অজান্তেই দু’চোখ বন্ধ করে ফেলল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, পৃথিবীতে ভালোবাসা হয়তো খুব জাঁকজমকপূর্ণ কোনো শব্দ নয়। কখনও কখনও ভালোবাসা মানে শুধু এইটুকুই—কোনো কথা না বলে কেউ এসে তোমার ক্লান্তিটা নিজের উপর তুলে নেবে। তার অন্তরোস্থল হতে ক্লান্তির এক তীব্র দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। কী অদ্ভুত এক প্রশান্তি! মিরার ঠোঁটের কোণে অচিরেই প্রসারিত হয়ে উঠলো একটুকরো তৃপ্তির হাসিতে। মিরা অজান্তেই স্থির হয়ে নিজের সকল ভার ছেড়ে রায়ানের প্রসস্থ বুকে হেলান দিয়ে দাড়াল। গত তিন দিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা, অভিমান, অপেক্ষা—সবকিছু যেন সেই একটিমাত্র আলিঙ্গনে ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ সে যেন নিজের একটা অংশ ছাড়া বেঁচে ছিল, আর এখন সেই হারিয়ে যাওয়া অংশটুকুই আবার ফিরে এসেছে। রায়ানের বুকের ধুকপুক শব্দটা ঠিক আগের মতোই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেই পরিচিত উষ্ণতা, পরিচিত গন্ধ, পরিচিত নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে মিরার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা বোধহয় এই দুটি বাহুর মাঝেই নিহিত। তার ভারী হয়ে ওঠা শরীরটা এখন আর একটুও ক্লান্ত লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে, রায়ান শুধু তাকে নয়, তাদের অনাগত সন্তানকেও নিজস্ব নিরাপদ বলয়ে আগলে রেখেছে।
রায়ান মিরাকে কয়েক মূহুর্ত ওইভাবে ধরে থেকেই অনুভব করতে পারছিল এতো গুলো মাস নিজের মাঝে এটা সত্তাকে ধারণ করা ঠিক কতটা কষ্টকর ছিল মিরার জন্য। রায়ানের দুচোখ মিরার জন্য সম্মান ও কৃতজ্ঞতার ভারে কোমল হয়ে এলো। রায়ান মিরার কাঁধে আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে ধীর আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো-

“It must have been hard for you to carry our baby alone right?”
মিরার মিটিমিটি নিজের চোখ খুললো। রায়ানের প্রশ্নে সে সন্তুষ্ট মনে হেঁসে বলল-
“কই না তো। একটুও না। আপনি আমাকে একা অনুভব করতে দিয়েছেন কখন? এই নয় মাস, আমার জীবনের সব থেকে সুখোময় একটা সময়কাল ছিল। তার একমাত্র কারণ আপনি। আমার মুড সুয়িং, অপারগতা, অসৌন্দর্যতা যখন আমি নিজে গ্রহণ করতে অক্ষম ছিলাম আপনি তখন আমাকে আমার থেকেও বেশি আপন করে সাদরে গ্রহণ করেছেন। আমাকে ওই সময় গুলো তে সামলেছেন যখন আমি নিজেই হাল ছেঁড়ে দিতে চেয়েছি। একটা মেয়ের জীবনে আর কি চাই! এতো কিছুর জন্য এইটুকু ভার বহন করাই যায় তাই না বলুন? ইউ ডিজার্ভ আ রিওয়ার্ড ফর বিং দ্যা বেস্ট হাসবেন্ড ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড, ডোন্ট ইউ?”
রায়ান মিরার বলা প্রতিটা কথা খুব গুরুত্বসহকারে শুনলো। আর পরবর্তীতে সর্ব প্রথম তার তরফ থেকে যে প্রতিক্রিয়া এলো তা মিরা আশা করে নি। রায়ান আলতোভাবে মিরাকে মুক্ত করে নিজের দিকে মুখোমুখি করে ঘুরিয়ে দাঁড়া করিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ওওও হ্যালো মিসেস..! এই অসৌন্দর্যতা টা আবার কি? আয়নায় নিজেকে দেখেছেন আপনি?”
মিরা অবাক হলো প্রথমে তবে প্রো মূহুর্তেই ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল-
“দেখেছি তো। মটু হয়ে গেছি অনেক। দেখুন, গাল গুলো কেমন ফুলে গেছে। হাতের মাংস কতো বেড়ে গেছে। পেট তো ফুলেছেই। আমার একটা পুরোনো ড্রেস ও হয় না। স্কিন কত ডাল হয়ে গেছে, এত্ত এত্ত চুল পড়ে। আমার বয়সই বা কত বলুন? এখনই যদি সব চুল পড়ে যায় আমাকে দেখতে ভালো লাগবে?”
রায়ান প্রচন্ড সিরিয়াস হয়ে মিরার মুখ নিজে দুহাতের তালুর মাঝে নিয়ে মিরার ফোলা ফোলা গাল ও গোটা মুখ ছোট ছোট চুমু যে ভরিয়ে দিয়ে বলল-
“বেশ হয়েছে মটু হয়েছো। আগের ওই ছোট্ট মুখে কয়েকটাই চুমু দেওয়া যেত এখন কতগুলো দিলাম দেখেছ? শরীরে জায়গা বেশি মানে আদর বেশি।”
মিরা রায়ানের এহেন নির্লজ্জতা মিশেল কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। রায়ান বুকে হাত রেখে হালকা করে তাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করলে রায়ান উল্টো মিরার হাত নিজের আয়ত্তে নিয়ে মিরার গোলাপ রাঙা ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। আচমকা আক্রমণে মিরা দুচোখ খিচিয়ে বন্ধ করে নিয়ে শক্ত করে রায়ানের শার্ট খামচে ধরলো। সময় গড়িয়ে মিনিটের কাঁটায় পৌঁছতেই মিরা তীব্র যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো-“উউউমম্, আআহহহ্ মাআআআ..!”

রায়ান সঙ্গে সঙ্গে মিরার ঠোঁট জোড়া মুক্ত করলো। ছেলেটার কপালে চিন্তার ভাঁজ। রায়ান হকচকিয়ে গেল-
“হুয়াট..ব্যাথা করছে? বেইবি..ঠিক আছো? হসপিটালে যেতে হবে?”
মিরা ব্যাথাতুর প্রতিক্রিয়ায় কেবল নিজের পেটের উপর হাত দিয়ে রেখেছে। রায়ান মিরাকে কোলে তুলতে গেল-
“ফাক ইট..লেটস গো টু দ্যা হসপিটাল। কাম অন বেইবি। কিছু হবে না। আমি আছি তোমার সাথে।”
রায়ান মিরাকে নিজের কোলে তুলতে গেলে মিরা তাকে বাঁধা দিল-
“আরে, এটা ল্যাবার পেইন না তো। উফফ্..কি পাগল লোকের পাল্লায় পড়েছি আমি।”
রায়ান অসহায়ের মতো মিরার দিকে তাকালো-
“ল্যাবার পেইন না তো ওভাবে চিৎকার করলে কেন? একটু চুমুই তো খাচ্ছিলাম। ছাড়া পেতে এমন করতে হবে? কলিজা শুকিয়ে গেছে আমার।”
মিরা আনমনে বিড়বিড় করলো-

“এখন তো আমারও মনে হচ্ছে প্রিন্সেসই আসবে। দেখলেন কেমন হিংসুটে? পাপা একটু মাম্মা কে আদর করছে তাতেই এতো জোড়ে কিক করলো। (নিজের ভেতরে থাকা অদৃশ্য সত্তার উদ্দেশ্যে বলল-) এই দুষ্টু, মাম্মা কি তার বরের থেকে একটু আদরও নিতে পারবো না তোমার জন্য? এমন হিংসুটে হলে হবে?”
রায়ান মিরার যুক্তি শুনে আরো চিন্তিত গলায় বলে উঠলো-
“হৃদপাখি? আচ্ছা, ও যদি প্রিন্সেস না হয়ে প্রিন্স হয় তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে ও আমাকে তোমাকে আদর করতে বাঁধা দিল..! মানে হয়তো ও চায় না ওর মাম্মা কে অন্য কেউ আদর করুক..! এমন হলে আমার কি হবে? আমার ছেলে যদি আমাকে হিংসে করে তখন?”
মিরা রায়ানের সিরিয়াসনেস দেখে শব্দ করে হেঁসে উঠলো- “হুমমম, হতেই পারে।”
রায়ান চট জলদি মিরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার পেটের উপর হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল-
“তুমি প্রিন্সেস বা প্রিন্স যেই হোও, পাপা এখনি ওয়ার্ন করে দিচ্ছি, আমার বউয়ের কোনো ভাগ হবে না। আর আমি ওকে এভাবেই আদর করবো। তার আদরেরও কোনো ভাগ হবে না। ওকে? ওকে ডিল!”
মিরা না চাইতেও জোরে হেঁসে উঠলো‌। রায়ান মিরাকে তার মজা নিতে দেখে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। দ্রুত মিরার ঠোঁটে আরেকবার ঠোঁট ছুঁইয়ে মুখ ফুলিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিরা নিজের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে পিছু ডাকলো-
“আরে যাচ্ছেন কোথায়! ডিল টা কি হলো! বলে যাবেন তো নাকি?”
রায়ানের আর চিহ্ন মাত্র নেই। মিরা হাঁসি মুখে এবার নিজের কাজে মন দিল।

রুদ্র রিমির হাত ধরে সোজা নিজেদের ঘরে নিয়ে এসেছে মেয়েটাকে। রুদ্র বিছানায় গিয়ে বসলে রিমি কিছু একটা ভেবে রুদ্রর জন্য এক গ্লাস পানি গড়িয়ে আনলো। কালো কাঁচের চুড়িতে ভরা আলোড়ন পূর্ণ হাতে ধরে থাকা পানির গ্লাস টার দিকে তাকালো রুদ্র। রিমি ঠিক খেয়াল করতে পারছে না রুদ্র পানি দেখছে না তার হাত। হঠাৎ রুদ্র রিমির হাত থেকে পানির গ্লাস টা নিজের হাতে নিয়ে সাইড টেবিলের উপর ঠেলে রাখলো। আর তারপরই রিমির হাতটা ধেরে তাকে এক ঝটকায় নিজের কোলে এনে ফেললো। রিমি আকস্মিকতায় চোখ বন্ধ করে রুদ্রর শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে আছে। রিমিকে ভয় পেতে দেখে রুদ্র তাকে অভয় দিয়ে বলল-
“আমার কোলেই টেনেছি। পড়ে যাও নি। ভয় কিসের!?”
রিমি রুদ্রর কথায় নিজের চোখ মিটিমিটি খুলতে তার চোখ রুদ্রর চোখে পড়লো। রিমি লজ্জায় অস্থির হয়ে উঠলো হঠাৎ। গাল দুটো কেমন অদ্ভুত লাল বর্ণ ধারণ করেছে। রিমি নিজের চোখ জোড়া সরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল-

“এএএ, এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
রুদ্র সোজা পাল্টা প্রশ্ন করলো- “কিভাবে তাকিয়ে আছি?”
রিমি উত্তর খুঁজে পেলো না। এই প্রশ্নের কি উত্তর হয় নাকি? রিমি একটু আরাম করে বসলো রুদ্রর কোলে। রুদ্র এখনো রিমির দিকে একই ভাবে পলকহীন চোখে তাকিয়ে। খুব সূক্ষ্ম কিছু দেখছে সে এমন মনে হচ্ছে। রিমি রুদ্রর গালে একটা আঙ্গুল ডাবিয়ে দিয়ে মজার ছলে বলল-
“এভাবে তাকিয়ে না থেকে বলুন আপনার কিছু দরকার কিনা। রায়ান ভাইয়া তখন বললেন, আপনার কিছু দরকার কিনা দেখতে। তো বলুন কি দরকার আপনার?”
রুদ্র নির্বিকার চিত্তে বলল-
“তোমার কিছু দেখতে হবে না। আমার দরকারি জিনিস আমার কাছেই আছে। দেখার কাজ আমার, তাই আমি দেখছি আমার যা দরকার।”
রিমি রুদ্রর কথায় মানে বোঝার চেষ্টা করলে তার মুখে একটা কুটিল ভাবনার ছাপ দেখা গেল। রিমি ভ্রু নাচিয়ে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো-
“দরকার যদি আমি হই তাহলে আপনি আমার সাথে কি করতে চাইছেন এখন হ্যাঁ?”
রুদ্র এবার মলিন মুখে রিমির নাম উচ্চারণ করলো-
“রিমি..!”
রিমি রুদ্র কে বেজার হয়ে দেখে তাকে উৎসাহিত করতে বলল-

“আরে এভাবে কেন ডাকছেন? মনে হচ্ছে আপনার হক কেড়ে নিচ্ছে আমি। এমন তো নয় এটা প্রথমবার হবে। এর আগেও অনেকবার হয়েছে। এমন গিল্টি ফিল করছেন কেন?”
-“ট্রিপে যাওয়ার আগের রাতের কথা কি আমি ভুলে গেছি নাকি? কত কান্না করেছ, আমাকে কত কথা শুনিছ! এখন কিছু চাইতে ভয় করা কি অস্বাভাবিক?‌”
রিমি সঙ্গে সঙ্গে বিপরীতে বলে উঠলো-

“বাহ রে, এমনি এমনি করেছি নাকি? আপনি আমার হাত বেঁধেছিলেন কেন? আমার ভয় করছিল। আর হাতে লেগেও ছিল।”
রুদ্র রিমির নালিশে লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। বেচারা ভাবছে সে তো কেবল একটু কালো বউয়ের কালো ভালোবাসা অভিজ্ঞতা করতে চেয়েছিল। এমন কিছু হয়ে যাবে তার তো খেয়াল ছিল না তখন। যদিও এখন সে অনুতপ্ত তবে রিমির কাছে সে অপরাধী হয়ে আছে। রিমি রুদ্রর মনমরা রূপ দেখে রুদ্রর দুগালে হাত রেখে নিজের দিকে করলো। মিষ্টি হাসি মাখা মুখে বলল-
“আচ্ছা এটা কথা বলার ছিল শুনুন না।”
-“কি!?”
-“আপনি না আগের থেকে এখন একটু বেশিই হ্যান্ডসাম হয়ে গেছেন।”

রুদ্র না চাইতেও রিমির এহেন কথায় হেঁসে উঠলো। রুদ্র এবার নিজেও রিমির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে তার গাল হালকা টেনে বলল-
“হুম, আমিও সেটাই খেয়াল করছি। আজকে তোমার মুখটা অদ্ভুত রকমের গ্লো করছে? আমাকে দেখে নাকি!?”
রিমি লাজুক হেঁসে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (২)

“উঁহু…এটা দেখে..!”
অতঃপর নিজের হাতের মুঠোয় লুকিয়ে রাখা পজিটিভ রেজাল্টের প্রেগন্যান্সির টেস্টার রুদ্রর হাতে দিয়ে তার
কানে কানে বলল-
“ইটস প্রেগন্যান্সি গ্লো..!”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here