আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (২)
অরাত্রিকা রহমান
মিরা রাগ করে উপরে নিজের ঘরে চলে গেলে রায়ানও অবিলম্বে মিরার পিছনে ছুটলো। মিরা ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করতে যাবে রায়ান দরজা আঁটকে দাঁড়ায়।
-“আমি বললাম তো আমি আবার অনেক গুলো কাপ কেক এনে দেব। তবুও এতো রাগ করতে হবে?”
মিরা দরজা বন্ধ করতে নিজের শক্তি প্রয়োগ করে বলল-
“আপনার আনতে হবে না আমি হোম ডেলিভারি নিয়ে নেব। এখন যান এখান থেকে। আমার মাথা ঠিক নেই, বেয়াদবি করে বসবো। পরে নিজেরই খারাপ লাগবে এই ভেবে যে, কেন ওমন ব্যবহার করেছি আপনার সাথে। তাই বলছি চলে যান প্লিজ। আমি সামলে নেব নিজের মুড সুয়িং। আর কামড়ানোর জন্য সরি।”
রায়ান হাইপার হয়ে উঠলো-
“হুয়াট দ্যা হেল আর ইউ টকিং এ্যাবাউট? আমি তোমার হাসবেন্ড, তোমার ভিতরে আমার বাচ্চা। তোমার মুড সুয়িং আমি সহ্য করবো না তো কে করবে? মিরা..আমি এখন সত্যিই খুব সিরিয়াস। লেট মি ইন..লিভ দ্যা ডোর!”
মিরা অবশেষে দরজা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। রায়ান ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে মিরার সামনে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মিরা মুখ উঠিয়ে রায়ানের দিকে দেখার শ্রম টুকু করতে চাইলো না। রায়ান নিচু চাহনিতে মিরাকে পরোখ করছে।
-“আমার দিকে তাকাও হৃদপাখি।”
মিরা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল-
“মাথা ঘুরছে আমার। উপরে দেখতে পারবো না।”
রায়ান তাকে জোড় করলো বরং নিজে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসলো। এবার মিরা রায়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে রায়ান মিরার চোখে মুখে একটা অজানা চিন্তার রেখা খেয়াল করলো। রায়ান শান্ত গলায় মিরার দু গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলবে তোমার হয়েছে কি? তোমার মনে কি চলছে তা যদি তুমি মুখ ফুটে না বলো আমার পক্ষে সেটা অনুমান করা কঠিন হবে পাখি। টেল মি হুয়াট’স বদারিং ইউ? হঠাৎ এতো খিটখিটে মেজাজের কারণ কি?”
মিরা রায়ানের শান্ত ভাব দেখে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলো-
“আমি খিটখিটে? আমার কি হচ্ছে আমি নিজে বুঝতে পারছি না আপনাকে কি বুঝাবো আমাকে বলুন। এখন বেবির ৬ মাস চলছে বেবির কোনো মুভম্যান্ট নেই। এই বিষয়টা কি আপনাকে একবারও ভাবায়? না, ভাবায় না। কিন্তু আমাকে ভাবায়। আমি প্রতিটা মূহুর্তে ভাবি, বাচ্চা টা আমার ভেতরে আছে তবে আমি ওকে অনুভব করতে পারছি না কেন! আপনি কি বোঝেন এটা কতটা ফ্রাস্ট্রেটিং? বুঝবেন কি করে.. প্রেগন্যান্ট তো আমি আপনি না।”
রায়ান মিরার কথা শুনে হতবাক। রায়ান মোটেও আশা করে নি প্রেগন্যান্সির কোনো একটা বিষয়ে মিরা এতটা দুঃশ্চিন্তায় ভুগছে যে আশেপাশের ছোটো ছোটো বিষয় গুলো এখন তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রায়ান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মিরাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো-
“মিরা.. লাস্ট টাইম চ্যাকাপের সময় ডক্টর এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের যা বলেছেন তা কি ভুলে গেছো? শি সেড, প্রথম প্রেগন্যান্সির সময় অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা বেবির মুভমেন্ট দেরিতে অনুভব করতেই পারে। ইটস টোটালি ফাইন। তাছাড়া ডক্টর নিজে বলেছেন আমাদের বেবি যথেষ্ট হ্যালদি আছে ওর বয়স অনুযায়ী। তুমি প্যানিক কেন করছো?”
মিরা রায়ানের কথায় মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মুখ নিচু করে নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“কিন্তু আমি তো ওকে ফিল করতে চাই। আপনাকেও ফিল করাতে চাই যে ও কতটা বড় হয়েছে আমার ভেতর। কেন নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় না ও? ওকি বোঝে না আমি কতো করে চাইছি ওকে অনুভব করতে?”
রায়ানের হৃদস্পন্দন স্থির হলো। মিরা যেই অনুভূতির কথা বলছে, ওই মূহুর্ত গুলোর জন্য সে কতই না কল্পনা করেছে। কিন্তু চেয়েও কখনো মিরার সম্মুখে তা উপস্থাপন করার সাহস হয়নি তার। বরাবরের মতোই তার মনে হয়েছে তার কল্পনার বিষয়বস্তু মিরার মনে কষ্ট দিতে পারে তাই এতোটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে সে। তবে শেষ রক্ষা বোধ হয় আর হয় নি। রায়ান মিরার বেবি বাম্পে হাত রেখে দৃষ্টি স্থির করলো সেখানে। মিরা সম্পূর্ণ চুপচাপ কেবল বসে আছে। মিরা গোটা শরীর হঠাৎ ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। রায়ান ধীরে মিরার কমল উদরের দিকে ঝুঁকে গিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোয়ালো সেখানে, অতঃপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে নরম কণ্ঠে মিরার ভেতরের অদৃশ্য ছোট্ট আত্মার উদ্দেশ্যে বলল-
“প্রিন্সেস..পাপা জানে, ইউ আর কাম্প্লিটলি ফাইন। কিন্তু মাম্মা তো সেটা মানতেই চাইছে না। তুমি একটাবার সাড়া দিয়ে মাম্মা কে বোঝাও তো তুমি ঠিক আছো। তোমার মাম্মা কাউকে বিশ্বাস করছে না, আমাকেও না ডক্টর কেউ না। তুমি সাড়া দিলে ঠিক মানবে। ক্যান ইউ মুভ, মাই গার্ল?”
মিরা বাকা নজরে দেখলো রায়ানের দিকে। চোখের জল এবার গড়িয়ে পড়লো বলে! রায়ানের কথাগুলো শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ যেন অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল। দু’জনেরই নিঃশ্বাস আটকে আছে।
হঠাৎ— মিরা তার পেটের ভেতর থেকে একদম স্পষ্ট একটা নড়াচড়া অনুভূতি পেল। তারপরই ছোট্ট একটা মৃদু লাথি। মিরার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। বিস্ফারিত চোখে নিজের পেটের দিকে তাকালো সে। ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। অবিশ্বাসে কাঁপা হাতে নিজের পেটে রায়ানের হাতের উপর হাত রাখল সে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ভয় তাকে গ্রাস করে রেখেছিল, সেই ভয়ের জায়গায় এখন অবিশ্বাস্য আনন্দ। মিরার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো, কণ্ঠ স্বর জড়িয়ে এলো তার-
“”রা… রায়ান…” মেয়েটার গলা কম্পিত হচ্ছে। “বেবি কিকড..! আপনি কি ওকে ফিল করতে পেরেছেন?!…”
কথাটা বলতেও যেন তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না।
ঠিক তখনই আবারও আরেকটা ছোট্ট ধাক্কা অনুভূত হলো তার-“আহহ্..” মুখ থেকে মৃদু আড়তোনাদ বেরিয়ে এলো মিরার। রায়ানের হাত তখনও মিরার বেবি বাম্পের ওপর রাখা। সেই নড়াচড়াটা এবার তার হাতের তালুতেও স্পষ্ট ধরা পড়ল। সে থমকে গেল। চোখের পলকে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ঠোঁট কাঁপতে লাগল, কিন্তু আনন্দে কোনো শব্দ খুঁজে পেল না যা তার অনুভূতি প্রকাশ করতে সক্ষম। কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিরার উদরের উপর রাখা নিজের হাতের দিকে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এটা সত্যিই ঘটেছে। পরের মুহূর্তেই তার মুখ জুড়ে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা এতদিনের সব অপেক্ষাকে হার মানায়। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রুবিন্দু-
“আলহামদুলিল্লাহ…” ফিসফিস করে বলল সে। তার কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা আর সীমাহীন আনন্দের মিশেল। রায়ান তাড়াতাড়ি মাথা তুলে মিরার দিকে তাকাল। মিরার চোখেও তখন টলমল করছে জল। দু’জনের চোখে চোখ পড়তেই আর কোনো ভাষার প্রয়োজন রইল না। রায়ান মৃদু হেসে আবারও আলতো করে পেটের ওপর হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজের ঠোঁটের স্পর্শে স্নেহের পরশ এঁকে দিল।
-“থ্যাংক ইউ, প্রিন্সেস…” তার গলায় আবেগ জমে উঠল। “পাপার কথা শোনার জন্য। এভাবেই মাঝে মাঝে মাম্মাকে জানিয়ে দিও তুমি ভালো আছো। তাহলে আমরা কেউ অকারণে ভয় পাবো না। ওকে?”
কথা শেষ হতেই যেন ছোট্ট প্রাণটা আবারও একটুখানি নড়ে উঠল। মিরা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
“আমি…কি স্বপ্ন দেখছি? ও সত্যিই আমার মাঝে নড়ছে, তাই না?”
রায়ান কোনো উত্তর দিল না। শুধু মিরার কপালে দীর্ঘ, শান্ত একটি চুম্বন এঁকে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। সেই আলিঙ্গনে ছিল স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর নতুন জীবনের প্রথম স্পষ্ট সাড়ার অনির্বচনীয় সুখ। মিরা আদুরে গলায় রায়ানের কাছে এবার আবদার রাখলো-
“হাবি…এখন যদি আপনার খুব কাজ না থাকে চলুন না একটু ঘুরতে যাই। আমার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে।”
এই মূহুর্তে মিরা রায়ানের কাছে তার প্রাণ টুকু চাইলেও হয় তো রায়ান নির্দ্বিধায় দিয়ে দিত, এ আর এমন কি। রায়ান মিরাকে রেডি হতে বলল। আর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই তারা বেরিয়ে পড়লো ব্যক্তিগত একটু সময় কাটাতে।
দুজনে একটা শপিং মলে ঢুকেছে প্রায় ১৫ মিনিট হয়েছে। মিরা প্রয়োজনীয় টুকটাক কিছু জিনিস কেনাকাটা করেছে নিজের জন্য আর অন্যদিকে রায়ানের এই পুরোটা সময়ই কিডস স্যাকশনের কালেকশন দেখতে দেখতে পার হয়েছে। মিরাকে বেবির জন্য অগ্রিম কেনাকাটা করার জন্য মানাতে পারেনি বলে তার মন সামান্য বেজার। তবে মিরার কথা হলো বেবি যখন আসবে তখন কিনলেই হবে আগে থেকে কেনাকাটা করে লাভ কি! রায়ান তবুও সেই দিকেই মনোযোগ দিয়ে রেখেছিল। মিরা একদিকে নিজের জন্য লিপস্টিকের শেড দেখছিল তখনি, রায়ান একটা ছোট্ট বাচ্চার জামা উঠিয়ে মিরার কাছে নিয়ে গেল।
-“হৃদপাখি…দেখ। এটা অনেক প্রিটি না? এটা নেই হ্যাঁ?”
মিরা বাকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“রায়ান, আপনার কি হয়েছে বলুন তো? প্রিন্সেস প্রিন্সেস বলছেন দেখে যে সত্যি সত্যি প্রিন্সেসই আসবে তার কি কোনো মানে আছে? যদি ছেলে হয়? এই জামা কে পড়বে?”
-“সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমি জানি খোদা আমাকে আরেকটা মা দেবেন।”
মিরা তুচ্ছার্থে হেঁসে বুকে আড়াআড়ি করে হাত বাঁধলো-
“আচ্ছা..? এমন কেন মনে হচ্ছে আপনার? যদি ছেলে হয়?”
রায়ান হেয়ালি করে বলল-
“হলে হবে। এমন তো নয় একটা বাচ্চাতেই থেমে যাবো আমরা। কখনো না কখনো মেয়ে তো হবেই।”
মিরা রায়ানের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। রায়ান বানোয়াট হেঁসে নিজের পক্ষে যুক্তি দেখাতে বলল-
“আরে রেগে যাও কেন পাখি? আমি বলছি তো আমাদের মেয়েই হবে। ট্রাস্ট মি। দেখলে না কেমন প্রিন্সেস বলে ডাকতেই নড়ে উঠলো! আমি সিওর আমাদের ছোট্ট রায়া আসতে চলেছে।”
মিরা রায়ানের কথা শুনে অনাগ্রহ দেখিয়ে আবারো নিজের কাজে মন দিয়ে বলল-
“আপনার যুক্তি শুনে যুক্তি নিজেই ছুটি নিয়ে চলে গেল। এখন চুপচাপ এটা যেখান থেকে উঠিয়ে এনেছেন সেখানে রেখে আসুন। আর আমাকে হ্যাল্প করুন ভালো একটা শেড চুজ করতে।”
রায়ানের মুখ মলিন হয়ে গেল। বেচারা মুখটা ছোট্ট করে জামাটা পুনরায় আগের জায়গায় রেখে এলো। মিরা আনমনে মুচকি হাসলো রায়ানের কর্মকাণ্ড দেখে। রায়ান নিজের মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে মিরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
-“হাবি.. দেখুন তো। কোনটা ভালো মানাবে? কোনটা নেবো?”
রায়ান এক নজর মিরার দিকে তাকিয়ে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“যেটা আমার গালে ভালো মানাবে সেটা।”
মিরাকে শুনিয়েই বলতে তো চাইছিল তবে এখন তার মন মেজাজ ঠিক নেই কিন্তু মিরা রায়ানের বিষন্ন মুখে বিড়বিড় করা দেখে ঠিকই বুঝলো রায়ানের মন ভালো করতে এখন ঠিক কি করা প্রয়োজন। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু দুষ্টু বুদ্ধি পাকিয়ে হাতের সব চেয়ে গাঢ় লাল রংয়ের লিপস্টিক টা ঠোঁটে লাগিয়ে নিল। অতঃপর রায়ান কাছে গিয়ে ছেলেটার শার্টের কলার টা শক্ত করে খামচে ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে রায়ানের গালে ঠোঁট ছোয়াল। রায়ান হকচকিয়ে উঠলো। মিরা রায়ানের গালে তার ঠোঁটের ছাপটা দেখলো। মিটিমিটি হাসছে সে। রায়ান মিরার হঠাৎ এমন কাজে সে চমকিত হয়ে নিজের গালে হাত রেখে মিরার দিকে দেখতেই মিরা দাঁত দেখিয়ে হিহি করে হেঁসে বলল-
“এটা একদম পারফেক্ট। আমি এটাই নিবো।”
রায়ান পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে সঙ্গে সঙ্গে মিরাকে উৎসাহিত করলো-
“আরে একটা লিপস্টিক দিয়ে কি হবে? আরো কয়েকটা দেখ। ট্রায় আনাদার ওয়ান..!”
মিরা খুব ভালো করেই বুঝলো রায়ানের উদ্দেশ্যে। মিরা নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল-
“আমার আর দরকার নেই তো। আপনি নিজে কতো ব্রেন্ডেড লিপস্টিক কিনে আমার ড্রিম রুম সাজিয়েছেন মনে নেই? ওগুলো তো পড়েই আছে। আর লাগবে না।”
রায়ান এবার বিরক্ত হয়ে হঠকারিতায় মুখ ফুটে বলেই ফেলল-
“তোমার না লাগুক আমার লাগবে। আমার আরো চুমু চাই। কিনো আর না কিনো, ট্রায় করতে সমস্যা কই?”
রায়ানের এমন ঠোঁট কাটা কথা শুনতেই মিরার গলা দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। মিরা চট জলদি রায়ানের মুখে হাত দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে বলল-
“আল্লাহ..! চুপ করুন। কেউ শুনলে কি মনে করবে?”
রায়ান মিথ্যা হাত তার মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল-
“এখানে আমাদের আশে পাশে কেউই নেই। কে শুনবে?”
-“নির্লজ্জ লোক কোথাকার! কেউ না শুনুক আপনার বাচ্চা তো আপনার এই সব ঠোঁট কাটা কথা বার্তা শুনছে। লজ্জা করুন একটু..!”
রায়ানের মুখশ্রীতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না উল্টো সে কুটিল হেঁসে মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিল মিরাকে আর তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল-
“কি আজব! লজ্জা করবো কেন? আমরা নির্লজ্জতার সব সীমা অতিক্রম করেছি বলেই, ও তোমার পেটে।”
মিরা দ্রুত রায়ানের থেকে দূরে সরে এলো লজ্জায়। রায়ান আর বাড়াবাড়ি করলো না। নিজেদের কেনাকাটা শেষে শপিং মলের ভিতর এক কোণায় খুব ভাইরাল আইস্ক্রিম ছিনিয়ে নেওয়ার খেলাটা মিরার নজরে পড়লো। ওমনি তার শখ জাগলো সেও খেলবে। রায়ান তখন ফোনে তার ম্যানেজার এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। মিরা রায়ানর শার্ট টেনে ইশারায় নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করলে রায়ান তাতে বাধা দিল না। মিরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে গেম টা খেলতে শুরু করলো। মাত্র ৫ মিনিট হয়েছে, মিরা আইস্ক্রিম বিক্রেতার ছলনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ইদানিং তার এমনিতেই ধৈর্য সীমা একটা সুতোর সমান সূক্ষ্ম হয়েগেছে তার মাঝে এই রকম খেলা বলা চলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। এক পর্যায়ে মিরা বিরক্ত হয়ে গেল। সে হতাশ চাহুনিতে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান তখনও নিজের ফোনে ব্যস্ত। মিরা রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তার হাত আঁকড়ে ধরে আইসক্রিম বিক্রেতার দিকে ইশারা করলেন রায়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের পকেটে থেকে ওয়ালেট বের করে মিরার হাতে দিয়ে দিল। মিরা অবাক হলো সে রায়ানের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে রায়ান নিজ থেকে ওয়ালেট থেকে আইসক্রিম বিক্রেতার সামনে কয়েক হাজার টাকা এগিয়ে দিল। এরপর আর কিছুই বলার প্রয়োজন পড়লো না। সেই আইস্ক্রিম বিক্রেতা সম্মানের সাথে মিরার দিকে একটা আইসক্রিম কোণ এগিয়ে দিলেন। মিরা খুশি খুশি সেটা নিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত চুমু দিল রায়ান ফোনে কথা বলার মাঝেই তা সসম্মানে গ্রহণ করে নিল। পাশের কিছু মেয়ের রায়ানের এমন ব্যক্তিত্ব বেশ পছন্দ হলো। তারা নিজেদের মাঝেই কথা বলাবলি শুরু করলো-
“এমন একজন আমাদের জীবনে থাকলে কি এমন হয়ে যেত রে দোস্ত?”
-“আজ কেউ নেই বলে টাকার গরম দেখাতে পারি না।”
মিরার কান থেকে এই সাইড কমেন্ট গুলো এড়ালো না। মিরা রায়ানের তোয়াক্কা না করে ওই মেয়েগুলোর দিকে এগিযে গিয়ে তাদের আত্মশক্তি বৃদ্ধি করতে খোঁচা মেরে বলল-
“হাই গার্লস, জীবনে কারো থাকা খুব একটা ন্যাসেসারি না। নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। অন্যের বরের দিকে নজর দেওয়া ভালো কাজ নয়।”
মিরার কথা গুলো মেয়েগুলোর গায়ে ফোস্কা ফেলল হয় তো। রায়ান এইটা খেয়াল করে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ম্যানেজার কে ফোন রাখতে বলল-
“ওকে ওকে, ড্রাপ দ্যা কল নাউ। আই উইল কল ইউ লেটার।”
রায়ান মিরার দিকে এগিয়ে গেলে মিরা রায়ানের চিড় চিড়ে মেজাজে রায়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“এমন হ্যান্ডসাম বর নিয়ে আর বেরই হওয়া যাবে না দেখছি। বেডা একটু বেশিই জ্যান্টালম্যান।”
মিরা মনের কথা মনে রেখে মুখে অন্য কিছুই বললো-
“এরপর থেকে সাথে আর নিয়েই আসবো না কাউকে। আই নিড নো ওয়ান।”
এই বলে সে তিরিক্ষি মেজাজে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। রায়ান আর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো ঠিক বুঝেতেই পারলো না কি হলো মিরার। রায়ান হাঁফ ছেড়ে মিরার পিছু যেতে নিলে এক মূহুর্তের জন্য থেমে ওই মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল-
“শি ইজ রাইট সিস্টার। শি নিডস নো ওয়ান। এ্যান্ড আই অ্যাম দ্যা নো ওয়ান।”
এই বলে পত্নী নিষ্ঠো ভদ্রলোক নিজেও সেই স্থান ত্যাগ করলো।
রাতে-১০টা
মিরা এখন আর রেগে নেই। তার যথেষ্ট কারণও আছে সেটা দুজনের কথা শুনেই বুঝতে পারবেন হয়তো।
-“হাবি, আরেক রাউন্ড হয়ে যাক তবে?”
মিরার আবদারে রায়ানের আপত্তিকর উত্তর এলো- “নো..!”
-“প্লিজ হাবি..জাস্ট আরেকটা রাউন্ড..!”
মিরা উৎসুক চাহুনিতে নিজের আবদার বহাল রাখলো।
রায়ান মিরার দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো- “তোমার ক্লান্ত লাগছে না? অলরেডি ৫ রাউন্ড খেলা হয়েগেছে। তার পরও আরেক রাউন্ড চাই..!”
-“হ্যাঁ চাই, আমার আরেকবার চাই।”
মিরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতি উত্তর করলো নিজের চাহিদার সপক্ষে। তবে রায়ানও নাছোড়বান্দা। সে গম্ভীরতা বজায় রেখে মিরাকে শাসনের স্বরে বলল-
“একটুও না..! উই আর নট গোয়িং ফর আনাদার রাউন্ড। ঘুমাও এখন।”
মিরা রায়ানের গম্ভীর কণ্ঠ নিজের জন্য ভীষণ অপছন্দ করে। সে ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে তাকে শাসানোর চেষ্টায় বলল-
“আপনি আরেক রাউন্ড খেলবেন নাকি আমি মামণির ঘরে চলে যাবো। কোনটা?”
রায়ান হতাশ। তার হাত নিজের কপালে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার আবদার মেনে নিল-
“ঠিক আছে চলো। এটা লাস্ট বার।”
মিরা এবার সন্তুষ্ট মনে দাঁত বের করে হেঁসে বলল –
“ওকে ফাইন..!”
কি মনে হচ্ছে? কি খেলছে তারা? তারা মোটেও সেটা খেলছে না যেটা সবাই ভাবছেন। মূলত দুজনে এখন রক প্যাপার সিজার খেলছে বেস্ট ওহ ফাইভ এর নিয়মে। তবে এই গেমের রুলস সব মিরার তৈরি যেমন- সে হারলে সে রায়ানের হাতে চিমটি কাটবে, আবার রায়ান হাড়লেও রায়ানের কপালে টোকা পড়বে। সুতরাং মূলত বিষয়টা হলো খেলার নিয়ম মিরা হাড়তে পরবে না।সেই তখন থেকে রায়ান নিজেকে বাঁচাতে মিরাকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা বাচ্চামি কেও পাড় করে গেছে তবে মিরা নিজের জিৎ উপভোগ করছিল এটাই বড় কথা। অবশেষে শেষ রাউন্ড টাও তাদের খেলা শেষ হলো। কথা অনুযায়ী তারা শুয়ে পড়লো ঘুমাবে বলে। কিছু টা সময় যেতেই মিরা রায়ানের বুক থেকে মুখ তুলে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“হাবি..আমি যদি আর্শোলা হতাম, আপনি কি তবুও আমাকে ভালোবাসতেন?”
রায়ানের চোখ বন্ধ। সে চাইছিল না মিরার এমন আজগুবি কথার প্রশ্রয় দিতে তার উত্তর করে। মিরা রায়ান তখনও ঘুমায় নি বুঝে অসহায় ভাবে নিয়ে বলল-
“আপনি ঘুমিয়ে নেই। তবুও আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না। আমি কি তাহলে আর ইমপোর্ট..!”
মিরা এর বাড়তি কিছু বলার আগেই রায়ান সুউচ্চ স্বরে বলল- “অফ কোর্স বেইবি.. আমি তবুও তোমাকে ভালো বাসতাম।”
মিরা ঠিক কি উত্তর আশা করছিল বা ঠিক কি উত্তরে সে খুশি হতো তবে রায়ানের এই উত্তর টা সে ঠিক হজম করতে পারলো না। সে মনে মনে চিন্তা করলো রায়ানের মতো সুঠামদেহী সুশ্রী চেহারার পুরুষ একটা আর্শোলার সাথে.. ছিঃ ছিঃ..! মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের উদ্দেশ্যে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো-
“কিহ..?! আর আমি যদি ছেলে হতাম, আপনি কি তবুও আমাকে ভালোবাসতেন?”
রায়ান এবার নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে ধৈর্য ধারণ করলো। মিরার মাথা আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে তার কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বলল-
“আল্লাহর দোঁহায় লাগে ঘুমাই যাও, সোনা বউ আমার। অনেক রাত হইছে। এই ছোট্ট ব্রেইনে এমন নাসা ইনস্টিটিউট এর লেভেলের প্রশ্ন ঘুরলে মাথা হ্যাং করবে। এতো ভাবতে হয় না। ঘুমাও। আই লাভ ইউ দ্যা ওয়ে ইউ আর।”
মিরা ফ্যালফ্যাল করে রায়ানের মুখপানে তাকিয়ে রইল। আর সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের কাছ থেকে সরে এসে বলল-
“আপনি অনেক জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আমার ভালো লাগছে না। দূরে জান।”
রায়ান থ মেরে গেল। একটু আগে মিরা নিজেই তার গায়ের সাথে গা মিশে শুয়েছে- তার নাকি এভাবে শুলে ঘুম ভালো হয় আর এখন তারই মুখে এই উক্তি শুনে তার নিজের মাথাই হ্যাং করছে। প্রেগন্যান্সির কমপ্লিকেশন শারীরিকের থেকে মানসিক দিক থেকেই বেশি। অন্য সকল দিন হলে রায়ান মিরাকে জোড় করেই নিজের কাছে টানতো। কিন্তু এখন সে নিজেও জানে একটু পর মিরা পুনরায় নিজের থেকেই তার গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়বে। আর হলো ও তাই, মাঝ রাতে মিরা ঘুমের ঘোরে নিজেই রায়ানের দিকে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে রইল।
মাস দুয়েক পর~
কোনো এক পড়ন্ত দুপুর~
ইদানিং রায়ানের কাজের চাপ বেড়েছে। আমেরিকারর মেইন অফিসটা সে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চাইছে যার জন্য একটা অগোছালো পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে তার কর্মস্থলে। সেখানকার এমপ্লয়ি দের সাথে একটা লম্বা মিটিং শেষে রায়ান নিজের ফোন টা হাত নিতেই দেখলো প্রায় ৮-১০ টার মতো মিসড কলস এসেছে তার ফোনে মিরার নাম্বার থেকে। মূহুর্তে রায়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এতো গুলো কল কোন কারণে ? এমন প্রশ্নের উদয় হতেই রায়ান মিরাকে কল ব্যাক করলো। রিং এক থেকে দুইবার বাজতেই মিরা রিসিভ করলো ফোনটা তবে তার কোনো সাড়াশব্দ নেই অপরপাশ থেকে তাই রায়ান নিজের নীরবতা ভঙ্গ করলো-
“আজ এতো গুলো মিস কল একসাথে..ব্যাপার কি মিসেস? কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছিল নাকি?”
মিরা রায়ানের প্রশ্নের তোয়াক্কা না করে নিজের বক্তব্য ব্যক্ত করলো-
“হাবি…আপনি আমাকে ভালো বাসেন না..!”
আজ রায়ান মিরার কথায় অবাক হলো না বরং নিজের ধৈর্য ধরে রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“এমন কেন বলছো পাখি? কি হয়েছে?”
মিরা রায়ানের এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করলো-“কতটা ভালোবাসেন আমাকে?”
-“আরে, অনেক ভালোবাসি। তুমি জানো সেটা বেইবি।”
ফোনের অপর দিক থেকে রায়ানের জবাব শুনেও মিরা জোড় পূর্বক নিজের কথায় আটকে রইল-
“উঁহু, বাসেন না।”
রায়ান বুঝলো হয়তো মিরা চাইছে সে মিরার কথার গুরুত্ব দিক। তাই নির্বিকারে সে মিরার কথায় সম্মতি দিল-
“আচ্ছা ঠিক আছে বাসি না। তুমি যা বলবে তাই। পরে বলো আর কি?”
মিরা কিছু সময়ের জন্য চুপ করে গেল। তার বড্ড একা একা লাগছে এতো বড় ফাঁকা বাড়িতে মূলত তাই মেজাজের এই হাল। রায়ানের মেনে যাওয়াতে তার বিরক্তি বাড়লো-
“আমার না মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। অনেক বেশি ওভার থিন্কিং হচ্ছে।”
মিরা উত্তেজিত হয়ে রায়ান কে সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি দিল।
রায়ান বুঝতে পারছে মিরার এমন হঠাৎ মুড সুইং এর সময়টা তার সাথে থাকা উচিত অথচ সে পারছে না। শারীরিক বিভিন্ন হরমোনাল, ও মানসিক চাপে গর্ভবতী মায়েদের এমন অনেক সময় পাড় করতে হয় যা চাইলেও স্বাভাবিক একজন মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। মূলত এসব কারণেই অনেক মায়েরা গর্ভাবস্থায় মানসিক ভাবে ডিপ্রেশড হয়ে পড়ে যা কখনোই কাম্য নয়। রায়ান নিজ দায়িত্ব বুঝে মিরাকে ঠান্ডা করতে শান্ত গলায় বলল-
“ওকে চিল আউট। কিছু খাবে তুমি? আমায় বলো।”
-“না।”, মিরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলো। তবে রায়ান বুঝে নিল মিরার চাইছে যেন সে নিজ থেকে কিছু অর্ডার করে তার জন্য। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রায়ান একটু বুদ্ধি খাটিয়ে প্রশ্ন করলো-
“চকলেটস অর্ডার করে দেই?”
-“করে দিন..!” এবারও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো মিরার দিকে থেকে। রায়ান মুচকি হেঁসে তাকে আস্বস্ত করলো-
“আচ্ছা ঠিক আছে করে দিচ্ছি।”
রায়ান ফোন তুলে অর্ডার করতে নিল। কিন্তু তখনই মিরা কিছু একটা ভেবে রায়ানের উদ্দেশ্যে ভারী কণ্ঠে বলল-
“না থাক, বাদ দিন। আমি খাবো না।”
রায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল কোথাও একটা-
“আরে অদ্ভুত তো, কেন খাবে না?”
মিরা এবার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-
“চকলেট না আইস্ক্রিম অর্ডার করে দিন।”
রায়ান কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ের আবার কখন মুড সুইং হবে তার কোনো সময় সীমা নেই তাই রায়ান একটু সতর্ক থাকলো নিজের সিদ্ধান্তে-
“ঠিক আছে, আমি দুটোই অর্ডার করে দিচ্ছি।”
মিরা খুশি হলো। চোখে তার অন্যরকম একটা তৃপ্তির ঝলক-
“ভালো তো আপনি আমাকে বাসেন..!”
রায়ান তুচ্ছ জ্ঞ্যানে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো মিরার কথায়-
“হয়েছে হয়েছে, বুঝেছি। আর বলতে হবে না।”
তবে মিরা পরক্ষনেই নির্বিকার ভাব নিয়ে বলল-
“কিন্তু আপনি আর কেয়ারই করেন না। কি অর্ডার করবেন এটাও জিজ্ঞেস করতে হয়? নিজের থেকে করা যায় না? আপনি আমার পরোয়া করেন না। যাই হোক আই লাভ ইউ।”
এই বলেই সে কল কেটে দিল। রায়ান তার হাতের ফোনটার দিকে মুচকি হেঁসে তাকালো। স্ত্রীর এমন খোঁচাখুঁচি প্রেম নিবেদন বরাবরই তাকে অদ্ভুত রকমের আনন্দ দেয়। রায়ান নিজের ফোন টা টেবিলের উপর রেখে পুনরায় নিজের ল্যাপটপে মনযোগ দিতে দিতে বলল-
“আই লাভ ইউ মোর মাই হার্টবার্ড।”
রাত~১০টা
এক টানা মোট ৭ টা মিটিং এরপর রায়ান ক্লান্ত হয়ে নিজের কেবিনে ফিরলো। পড়িহিত কোর্ট টা একটানে খুলে কাউচের উপর ছুঁড়ে ফেলে গলার কাছ থেকে আটশাট করে বাধা টাইটা সে হাত দিয়ে টেনে কিছুটা হালকা করলো। শার্টের উপরের দুটো বাটন খুলে ঠাস করে বসে পড়লো নিজের চেয়ারে। হাত দ্বারা মাথা টা চেপে ধরলো নিজের- খুব বেশি প্রেশার নেওয়া হয়ে গেছে তা সেও বুঝতে পারছে। তখনি তার চোখে পারলো তার অযত্নে ফেলে রাখা ফোনটা। রায়ান তার টেবিলের রাখা তার আর মিরা একটা কাপল ছবি ফ্রেম বন্দি করে রেখেছিল। সেই দিকে চোখ যেতেই রায়ানের মিরার কথা মনে পড়লে। চোখজোড়া জলজল করে উঠলো তার, ঠোঁট অজান্তেই প্রসারিত হলো। রায়ান হাঁফ ছেড়ে টেবিলে থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিল। আর মিরাকে কল লাগালো। মিরা এমন সময় রায়ানের কল দেখে একটু অবাক হলেও হাঁসি মুখে ফোনটা রিসিভ করলো।
-“হ্যালো..!”
রায়ান মিরার কণ্ঠ শুনতেই নিজের চেয়ারে গা ছেঁড়ে দিয়ে স্বাভাবিক গম্ভীর থমথমে গলায় মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“মুড অফ। এক্সোস্টেড লাগছে খুব। একটু ভালো কিছু বলো।”
মিরা রায়ানের গলায় আওয়াজ শুনে একটু চিন্তিত হলো। সচরাচর রায়ানের কণ্ঠ এমন শোনায় না। মিরা পাল্টা প্রশ্ন করলো না। রায়ানের চাহিদা টুকু পুরণ করা এখন জরুরি মনে হলো তার। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লম্বা নিঃশ্বাস নিল। আর উৎসুক ও আহ্লাদী কণ্ঠে বলল-
“হাবিইইই..কি করছেন আপনি? কখন আসবেন আমার কাছে? অনেক মিস করছি তো। আপনার প্রিন্সেস ও খুব মিস করছে আপনাকে। উই মিস ইউ, উই লাভ ইউ। উম্মাহ উম্মাহ..!”
মিরার একটানা এমন আদরে রায়ানের ক্লান্তি সব দূর হলো। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে সে মুচকি হাসলো। মিরা অপর পাশ থেকে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল –
“ব্যাটার লাগছে এখন?”
রায়ান নিজের ওষ্ঠপুট দাঁতের মাঝে সামান্য কামড়ে ধরে অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে বলল-
“উঁহু, কই? লাগছে না তো। আবার ট্রায় করো।”
মিরা রায়ানের দুষ্টু বুঝে গলায় গাম্ভীর্যতা এনে বলল-
“ডোন্ট বি সো পিকি..! মনে মনে যে আপনার লাড্ডু ফুটছে তা আমি জানি। মাথা শান্ত রেখে কাজ করুন। হতাশ হবেন না। আমি সব সময় আপনার পাশে আছি।”
মিরার কথায় রায়ানের ব্যস্ত মন শান্ত হয়ে এলো। সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের কোর্টটা হাতে নিতে নিতে বলল-
“বউ বলেছে সে আমাকে মিস করছে। এখন কিভাবে কাজ করবো? বাড়ি ফিরছি..! কিছু লাগলে বলো নিয়ে আসবো ফেরার পথে।”
মিরা শব্দ করে হেঁসে উঠলো। অতঃপর শান্ত গলায় বলল-
“আপনার প্রিন্সেস ফুচকা খাবে।”
রায়ানের বুঝতে আর বাকি নেই মিরা কি বোঝাতে চাইলো তাকে। সে তবুও হেয়ালি করে মিরার দুষ্টুমিতে তার সঙ্গে দিল-
“আর প্রিন্সেসের মাম্মা কি খাবে?”
মিরা ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রায়ানকে উস্কে দিতে বলল-
“প্রিন্সেসের পাপা আছে কি করতে?”
দুজনেই দুদিক থেকে লাজুক হাসলো। রায়ান অফিসের করিডোর পার করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
“ওয়েট ফর মি বেইবি। আই এ্যাম কামিং।”
রায়ান অফিস থেকে ফিরতেই মিরা লাফিয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো-“আই মিসড ইউ হাবি..!”
রায়ান হাসি মুখে মিরাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“আই মিসড ইউ মোর বেইবি।”
মিরা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞাস করলো- “ফুচকা?”
রায়ান পিছন থেকে তার হাত ঘুরিয়ে এনে মিরার সামনে এনলো। মিরা এক নজর ফুচকার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল-
“বাইরে গিয়ে খেতে পারলে আরো ভালো হতো।”
রায়ান মিরার কাঁধে হাত রেখে তাঁকে সান্ত্বনা দিল-
“আর মাত্র দেড় দু মাসের ব্যাপার বেইবি। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
প্রকৃতি ভালো জানে সব কি সত্যিই ঠিক হয় কিনা! তবে বাস্তবতা অবশ্যই আশাহত করে। মা হওয়া কি সহজ? মোটেও না। তবে এই যাত্রা সহজ করার ক্ষমতা কেবল গর্ভবতী মায়ের আপন জনদের আছে। মিরা নিজের বাস্তবতা মেনে নিল তবে তখনই সে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“এমন তো নয় যে বাড়িতে রোড সাইডের ফিল নেওয়া যাবে না, তাই না?”
রায়ানের ভ্রু কুঁচকে এলো। সে এক কদর মিরার থেকে দূরে গিয়ে বলল- “তুমি যা ভাবছো তা হবে না।”
মিরা শয়তানি হাসি দিয়ে মায়াবী মুখ করে বলল-
“হাবি প্লিজ, আমার জন্য এইটুকু করতে পারবেন না আপনি?”
ব্যাস এখানেই হার হলো রায়ানের। এই কথার উপর কিছু বলার সাহস কি কোনো বর করবে? অতঃপর মিরা রায়ানকে ফুচকা ওয়ালা হিসেবে সাজিয়ে নিল। যে সে ফুচকা ওয়ালা নয়, কোটিপতি হ্যান্ডসাম ফুচকা ওয়ালা। মিরা রায়ানের মাথায় আর কোমরে গামছা বেঁধে দিল, সুন্দর করে টেবিল সাজিয়ে দিল। এরপর শুরু হলো তাদের অভিনয়। রায়ান মিরাকে নিজ হাতে ফুচকা বানিয়ে দিতে লাগলো। মিরা প্রথম ফুচকা টা বড় হা করে মুখে পুরে নিয়ে আমোদ করে চিবোতে চিবোতে নিজের দুচোখ মাঝে মাঝে খুলছে আর বন্ধ করছে যেন স্বাদটা ঠিক তার মনে ধরছে না। মিরা রায়ানের দিকে খেয়াল করে মিটিমিটি হাসলো। রায়ান পলকহীন মিরার মুখশ্রী দেখে যাচ্ছে কতই না ভাব মূর্তি সেই গোলগাল মুখটায়। ছেলেটার প্রেমিক মন বেশ বিনোদন পাচ্ছে। মিরা মুখের ফুচকা টা শেষ করে সম্পূর্ণ স্ট্রিট ভাইব নিতে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“মামা, আরো ঝাল দেন। ঝাল হয় নি।”
-“হুয়াট…?! মামা..!”
রায়ান আচম্বিতিতে বড় বড় চোখ করে মিরার দিকে তাকালে মিরা জিভ কেটে নিজের কথার ব্যাখ্যা দিতে তাড়াহুড়ো করে বলল-
“আরে, আপনাকে না তো। আপনার মধ্যকার যেই ফুচকা ওয়ালা জাগ্রত হয়েছে তাকে সম্বোধন করলাম।”
রায়ানের মেজাজ তেতে উঠলো- সব ছেঁড়ে মামা ডাক শুনতে হবে বউয়ের থেকে! রায়ান খেপে গিয়ে বলল-
“ওই ছেমড়ি, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে আমাকে মামা লাগে?”
মিরা একটু ভয় পেল বোধহয়। সে সামান্য ঠোঁট ফাকা করে হেঁসে আনমনে রায়ানের কথায় সম্মতি দিল-
“জি, জি, তা তো ঠিকই, তা তো ঠিকই। আপনাকে কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই মামা টাইপ লাগে না।”
-“আচ্ছা ভাইয়া, ভাইয়া আরেকটু ঝাল দেন।”
রায়ান ফুচকার টকের বোল থেকে চামচ তুলে মিরার দিকে তেড়ে আসার ভাব নিয়ে বলল-
“মাথায় মারবো কিন্তু এখন। আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে আমার চোখের সামনে সারাদিন টইটই করে আমাকে ভাইয়া ডাকা হচ্ছে এখন?”
মিরা নিজের মুখ ফুলিয়ে নিল। রায়ানের শাসন তার একদম গায়েসয় না। রায়ান মিরার ৮ মাসের ফোলা পেটের দিকে আঙুল তাক করে জিজ্ঞেস করলো-
“এটা কার বেবি?”
মিরা সোজা উত্তর দিয়ে ফেলল-
“আমার..”
রায়ানের ব্রেন সেলস মনে হয় ব্লাস্ট করে যাবে এখন। সে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“তোমার বেবি কি আকাশ থেকে পড়েছে? তোমাকে বেবি টা দিয়েছে কে শুনি?”
মিরা মুখ নিচু করে ঠোঁট কামড়ে বলল-“আপনি..!”
-“তো আমি কি তোমার?”
মিরা এবার কেঁদেই ফেলল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রায়ানের বুকের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“হাবি…!”
ব্যাস, ওমনি রায়ানের মেজাজ গেল ঠান্ডা হয়ে। সে উপরের ঝাড়বাতির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল-
“হে আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও।”
মিরা অনুতপ্ত হলো নিজের কর্মে। হঠাৎ করেই মিরার পেটে সজোরে একটা লাথি পড়লো। মিরা আর্তনাদ করে উঠলো-“উফফ্!”
রায়ান চিন্তিত হয়ে উঠলো-“কি হলো..!? হসপিটালে যেতে হবে? খারাপ লাগছে হৃদপাখি? আমাকে বলো..।”
মিরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বলল-
“আপনার বাচ্চা আপনার হয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করছে ভেতর থেকে। কি জোরে লাথি মাড়লো। উফফ্, এমনি যে সাড়া দিন অলসের মতো চুপ করে শুয়ে থাকে একটা ফোঁটাও নড়ে না আপনার সাথে কথা হলেই ইচ্ছে মতো হাত পা ছোঁড়ে।”
মিরা রায়ানের মন বোলাতে হেঁসে হেঁসে কথা গুলো বললেও রায়ান মিরার চোখে মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ও ব্যাথার অনুভূতি দেখতে পেল। সে ইচ্ছে করলেও এই ব্যাথার ভাগ নিতে পারবে না সে জানে। এই অপারগতাই তার অসহ্য লাগে। কত ভালোই না হতো যদি প্রেগন্যান্সির প্রতিটা প্রতিবন্ধকতা সে মিরার থেকে ভাগাভাগি করে নিতে পারতো! কিন্তু এই মহান ক্ষমতা খোঁজে কেবল মহান মেয়ে জাতি কেই দিয়েছেন। রায়ান মিরার কথায় বিশ্বাস করেছে বোঝাতে হাঁটু গেঁড়ে মিথ্যা পেটে বরাবর বসতে বলল-
“যেহেতু আমার এতো গুরুত্ব, আমি বললে নিশ্চয়ই আমার প্রিন্সেস বুঝবে। আমাকে কথা বলতে দাও।”
মিরা অবাক চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান মিরার ফোলা পেটে হাত রেখে আলতো করে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯
“মাম্মা কে এভাবে কষ্ট দিতে নেই প্রিন্সেস। আমাদের কাজ তো মাম্মা কে আগলে রাখা, তাই না? আমারা মাম্মাকে সব সময় সেফ রাখবো, কখনো কষ্ট দেব না। বি জ্যান্টাল উইথ হার, ওকে? পাপা নয়তো খুব অভিমান করবে তোমার উপর। তোমার মাম্মা তোমার পাপার খুব মূল্যবান সম্পদ। মাম্মা আর পাপা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
