Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৪৭

উন্মাদনা পর্ব ৪৭

উন্মাদনা পর্ব ৪৭
কায়নাত খান কবিতা

‘কীভাবে রোমিও? প্রতি পাঁচ বছর পর পর ৭২ টি করে বাচ্চা হারাচ্ছে। ১৬-২০ বছর বয়সী মেয়ে গুলোকে কিডন্যাপ করা হচ্ছে। দেশে এতো ড্রা’গ সাপ্লাই হচ্ছে। ধুন, গুম, ধ’র্ষ’ণ বেড়ে গেছে। পাচ বছরের বাচ্চা মেয়েটি ও নিরাপদ নয়। আর এই কু’কুর গুলো বলছে দেশ ঠিক আছে। ঠিক আছে মাই ফুট।
রেহমানের কথাগুলো শুনে রোমিও নিঃশব্দে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেল না সে। কিছু কিছু ক্ষত থাকে, যেগুলোতে শব্দ নয়, নীরবতাই সবচেয়ে উপযুক্ত উত্তর।
সাধারণ মানুষ কতটুকুই-বা জানে? তাদের চোখে পুলিশ মানেই যেন সবচেয়ে সমালোচিত, সবচেয়ে ঘৃণিত একটি পেশা। অথচ এই একই পুলিশ বাহিনীতেই এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে দু’সেকেন্ডও ভাবেন না। দায়িত্বের ডাকে হাসিমুখে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করেন, কারণ তাদের কাছে নিজের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দেশের নিরাপত্তা।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, কিছু ক্ষমতালোভী, নীতিহীন আর তোষামোদে অভ্যস্ত মানুষের কারণে সেই প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের ত্যাগ আড়ালেই থেকে যায়। তাদের সাহসের গল্প শিরোনাম হয় না, তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। আলো পাওয়ার অধিকার থাকা মানুষগুলো তাই নীরবে হারিয়ে যায় অন্ধকারের আড়ালে, আর ইতিহাসে জায়গা করে নেয় কেবল ক্ষমতার কোলাহল।
‘স্যার আপনি দেশকে ভালো বাসলে ও দেশ কিন্তু আপনাকে ভালোবাসবে না। প্রাণ ঠিকই নিয়ে ছাড়বে। এর থেকে ভালো দেশ পরিত্যক্ত করা।’
রোমিওর কণ্ঠে ছিল গভীর উদ্বেগ। কথাগুলো বলার সময় তার চোখে ভেসে উঠেছিলো এক অদৃশ্য ভয় একজন সহকর্মীকে হারানোর ভয়।রেহমান কোনো উত্তর দেয় না। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা লাল-সবুজের ছোট্ট পতাকাটি হাতে তুলে নেয়। কয়েক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে পতাকার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর অত্যন্ত যত্নে সেটিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে।কক্ষজুড়ে নেমে এলো এক গভীর নীরবতা।কিছুক্ষণ পর রেহমান কণ্ঠে বলল,
‘দেশটা কারো বাপের নয়। কোনো মন্ত্রী কিংবা প্রাইমিনিস্টারের ও নয়। দেশটা আমার, তোমার, আমাদের। জান দিতে হলে তাও দেবো। কিন্তু দেশ ছাড়বো না।’
কথাগুলো যেন শুধু রোমিওকে নয়, পুরো ঘরটাকেই শোনানো হলো।ঠিক সেই মুহূর্তেই কয়েকজন ডিউটিরত জুনিয়র অফিসার দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা যেন অজান্তেই রেহমানের শেষ কথাগুলো শুনে ফেলেছিল।

একে একে সবাই রোমিওর পাশে এসে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।পরক্ষণেই একসঙ্গে কপালে হাত তুলে স্যালুট জানায় রেহমানকে।
মুহূর্তটির ভারে ঘরের বাতাস যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠে।রেহমান দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেলে।সে জানে, ক্ষমতার বিশাল প্রাচীরের সামনে তার মতো একজন সাধারণ অফিসারের অস্তিত্ব খুবই ক্ষুদ্র। হয়তো এই লড়াইয়ে জয় তার ভাগ্যে লেখা নেই। হয়তো সত্যের পথ বেছে নেওয়ার মূল্য তাকে নিজের জীবন দিয়েই পরিশোধ করতে হবে।
তবু তার সংকল্পে কোনো ভাঙন নেই।প্রয়োজনে জীবন যাবে, রক্ত ঝরবে, নাম হারিয়ে যাবে সময়ের অতলে,কিন্তু নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার কথা সে কোনোদিনও ভাববে না।
রাত তখন প্রায় আটটা কিংবা নয়টা। বুড়িগঙ্গার বুকের ঠিক মাঝখানে অভীর ছোট্ট নৌকাটি স্থির হয়ে ভাসছিল তখন ও। চারপাশ নিস্তব্ধ। নদীর কালচে, ময়লা আর দুর্গন্ধমাখা পানির ওপর ভাঙাচোরা হয়ে ছড়িয়ে ছিল চাঁদের আলো। প্রতিচ্ছবিটা খুব স্পষ্ট ছিল না, তবু তার মাঝেও এক অদ্ভুত বিষণ্ন সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল।অভী নৌকার একপাশে রাখা কৃত্রিম আঙুলটি হাতে তুলে নিল। নিঃশব্দে সেটি আবার নিজের বাম হাতের সঙ্গে জুড়ে দিল। মুহূর্তেই যেন ক্ষতচিহ্নগুলো আবার আড়ালে চলে গেল, যেমন করে মানুষ নিজের ভাঙাচোরা অতীতকে প্রতিদিন হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে।

সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠে।
‘খোদা সবকিছু সবাইরে টাইম মতো দেয়!’
কথাগুলো বলেই সে বৈঠাটা হাতে তুলে নেয়।তারপর ধীর ছন্দে নদীর নিস্তব্ধ বুক চিরে নিজের বাসভবনের দিকে নৌকা চালাতে শুরু করে।আজকের অভী আর আগের অভীর মধ্যে ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। সময় তাকে বদলে দিয়েছে, জীবন তাকে শিখিয়েছে, আর অসংখ্য ক্ষত তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নীরব করে তুলেছে।কিন্তু সেই পরিবর্তন লক্ষ্য করার মতো কেউ ছিল না।হয়তো এই শহরে মানুষ শুধু মুখ দেখে, ভেতরের ভাঙন নয়।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে অভীর রাত প্রায় দশটা বেজে গেল। পথে একবার আস্তানায়, আরেকবার গ্যারেজে ঢুঁ মেরে দিনের সব হিসাব-নিকাশ গুছিয়ে নিল সে। সবকিছু নিশ্চিত করে তবেই ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলো।
দরজার সামনে এসে হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল একজোড়া মহিলাদের চপ্পলে।ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল,

‘এতো রাইতে আমার বাড়িতে কোন ছেমরি আইলো!’
পরক্ষণেই দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই যেন বজ্রপাতের মতো কিছু একটা মনে পড়ে তার।নিজের কপালে আলতো চাপড় মেরে অপ্রস্তুত হেসে উঠল সে।
‘বিয়া করা বউটার কথা ভুলে গেলাম।’
মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একচিলতে হাসি ফুটে উঠে তার।
দরজাটা ভেতর থেকে আটকে চারপাশে চোখ বুলাতে লাগল অভী। নতুন বউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে শব্দ ভেসে আসে অভীর মুখের হাসিটা আরও চওড়া হয়ে গেল।মনে মনে ভাবে, নতুন বউ বুঝি তার জন্য নিজের হাতে রান্না করছে!
সেই কল্পনা বুকে নিয়েই দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে।

কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকেই তার সমস্ত কল্পনা মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।দৃশ্যটা দেখে মনে হলো, এখানে রান্না নয়—সদ্য একটা ছোটখাটো যুদ্ধ শেষ হয়েছে।কড়াই একদিকে উল্টে পড়ে আছে, তেলের বোতল অন্যদিকে গড়িয়ে আছে। ভাতের পাতিল এক কোণে, আর সেদ্ধ ভাত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরেক কোণে। মসলা, হলুদ, পেঁয়াজের খোসা, সব মিলিয়ে পুরো রান্নাঘর যেন এক বিশৃঙ্খল যুদ্ধক্ষেত্র।
সেই যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আনন্দী এখনও প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কিছু একটা রান্না করার।
মাথা থেকে শুরু করে গাল, হাত, এমনকি শাড়ির আঁচল পর্যন্ত হলুদের হলদে দাগে ভরে গেছে। কোথাও কালচে কালি, কোথাও ময়দা, কোথাও আবার তেলের ছিটে।
দৃশ্যটা কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে দেখল অভী।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের কপালে হাত ঠেকাল।
এ মেয়ে রান্না করছে.নাকি রান্নাঘরের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।সেটাই বুঝে উঠতে পারল না সে।

‘আনন্দী!’
অভীর ডাক শুনে চমকে তার দিকে ফিরে তাকায় আনন্দী।
অভী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘তুই কী যুদ্ধে যাবি?’
অভীর কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না আনন্দী। সে অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে রইল।অভী ধীর পায়ে এগিয়ে এসে চারপাশে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
‘এইটা রান্নাঘর না-কি যুদ্ধের ময়দান? সব একদম ছারখার করে ফেলছিস!’
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে । তারপর খুব নিচু স্বরে বলে,
‘আমার খিদে পেয়েছে অভী। কাল থেকে কিছু খায়নি। ভাত খাবো!’
কথাটা শুনেই অভীর বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে।এই অনুভূতিটা তার অচেনা নয়। কারণ এমন দিন তার জীবনেও এসেছে অসংখ্যবার।

ছোটবেলা থেকেই অভী ছিল অনাথ। মাথার ওপর ছায়া দেওয়ার মতো কেউ ছিল না, ছিল না অভাবের সময় হাত ধরে পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো মানুষ। একটু বড় হয়ে যখন টিউশনি শুরু করেছিল, তখন থেকেই নিজের জীবনটাকে নিজের হাতেই টেনে নিতে শিখেছিল সে।
কিন্তু আয় যতটুকুই হোক, খরচের তালিকা ছিল অনেক বড়। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, প্রয়োজনীয় খরচ। সব সামলাতে গিয়ে তাকেও অনেক রাত খালি পেটে কাটাতে হয়েছে।
ক্ষুধার্ত মানুষের চোখের ভাষা অভী খুব ভালো করেই চেনে।
আর আজ সেই একই চোখ সে আনন্দীর মাঝে দেখতে পেল।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল আনন্দী যদি নিজের ভুলে তার ক্যারিয়ারটা নষ্ট না করত, তাহলে হয়তো আজ তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। হয়তো সে কোনো হাসপাতালের সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন বাঁচাত।কিন্তু ভাগ্য সবসময় মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত পথে হাঁটতে দেয় না।
অভী আর কিছু না বলে ফোন বের করে নোবেলকে কল দিয়ে বলল খাবার পাঠাতে।
‘আমার বউয়ের খিদে পেয়েছে। খাবার পাঠা।’

কল কেটে দিয়ে সে আবার আনন্দীর দিকে তাকায়।
তারপর খুব যত্ন করে আনন্দীর শরীরে লেগে থাকা কালো দাগগুলো হাত দিয়ে মুছতে লাগল। যে মানুষটা এতক্ষণ রান্নাঘরের বিশৃঙ্খলা দেখে বিরক্ত হয়েছিল, সেই মানুষটার চোখেই এখন ফুটে উঠেছে অন্যরকম এক মায়া।কিছুক্ষণ পর শান্ত কণ্ঠে বলল,
‘গোসল করতে হবে। চল!’
আনন্দী অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘একসাথে?’
‘ ইন্টু বিন্টু তো করতে দিলি না। গোসলডায় করি আয়!’
‘অসম্ভব!’
হঠাৎ করেই তীক্ষ্ণ স্বরে প্রতিবাদ জানিয়ে ওঠে আনন্দী। কণ্ঠে বিস্ময়, চোখেমুখে স্পষ্ট অনিচ্ছার ছাপ। কিন্তু তার আপত্তি যেন অভীর কর্ণগোচরই হলো না। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ঝুঁকে পড়ে আনন্দীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। অপ্রত্যাশিত সেই স্পর্শে আনন্দী স্তব্ধ হয়ে রইল, আর অভী দৃঢ় পদক্ষেপে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

ওয়াশরুমে ঢুকেই অভী কোনো কথা বলে না। দৃঢ় ভঙ্গিতে আনন্দীকে শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে পানির ধারা চালু করে দেয় সে। তারপর নিজেও সামান্য দূরে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায়।
বাইরে থেকে ভগ্নপ্রায় মনে হলেও ভেতরের সাজসজ্জা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। চকচকে মার্বেলের মেঝে, পরিপাটি দেয়াল আর আধুনিক ফিটিংস সব মিলিয়ে বোঝাই যায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জায়গাটি নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে।শাওয়ার থেকে ঝরে পড়া পানির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে দুজনের পোশাক ভিজিয়ে দিচ্ছিল। চারপাশে শুধু পানির একটানা শব্দ, আর তার মাঝেই নেমে এসেছিল এক অদ্ভুত নীরবতা।
আনন্দী মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইল। চোখ তুলে তাকানোর সাহস যেন তার হচ্ছিল না। লজ্জা, অস্বস্তি আর অপ্রস্তুত অনুভূতি মিলেমিশে তার ভেতরটা ভারী করে তুলেছিল। অন্যদিকে অভীর মুখ ছিল গম্ভীর ও সংযত। মুহূর্তটি যতটা নীরব, তার চেয়ে অনেক বেশি ভারী ছিল দুজনের মনের অগোচর কথাগুলো।
হঠাৎই অভীর দৃষ্টি গিয়ে থামে আনন্দীর মুখে। মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। চারপাশে ঝরে পড়া পানির শব্দ যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর বাস্তবতার ওপর নেমে আসে এক অদৃশ্য পর্দা।পরের মুহূর্তেই তার অবচেতন মন তাকে টেনে নিয়ে যায় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে।

জনমানবহীন একটি পুরোনো ভিলা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসছে অসংখ্য জলরেখা। ঘরের ভেতরে মৃদু আলো-আঁধারির নীরব আবহ। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী অপরূপ, শান্ত।
অভী কিছুটা দূরে নিশ্চুপ হয়ে তাকে দেখছিল। সময় যেন থমকে গেছে। ধীর পায়ে আনন্দী তার দিকে এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব ক্রমশ কমে আসতেই ঘরের নীরবতা ভেঙে কোথা থেকে ভেসে এল এক বিষণ্ন সুর।
“ তুমি যদি আমাকে কাছে এসে ভালোবাসো..কী জানি হয়..হৃদয়ে..কী করে তোমায় বোঝাবো..ভালো আর লাগে না!
এতো কেনো মায়া?
যত কাছে আমি..লাগে শুধু শান্তনা..অবুঝ ভালোবাসা.. জানে এই নয় খেলা..তবু এ মনে হয় ছাড়া তোমায় বাঁচবো না…..!”

অভী নিজের হাত বাড়াতে চাইল আনন্দীর পানে।ঠিক তখনই শাওয়ারের ঠান্ডা পানির একটি ফোঁটা তার চোখের পাতায় এসে পড়ে।অভী চমকে উঠে। কল্পনার ভিলা, বৃষ্টির রাত, সেই সুর সবকিছু মুহূর্তেই ভেঙে গিয়ে সে ফিরে এল বাস্তবে। সামনে এখনও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী, আর চারদিকে কেবল ঝরে পড়া পানির একটানা শব্দ।
শাওয়ারের পানির ধারা থামিয়ে অভী পাশের তোয়ালেটা হাতে তুলে নেয়। দরজার দিকে এগোতে এগোতে একবারও ফিরে না তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“ফ্রেশ হয়ে নে। না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
কথা শেষ করেই সে বাইরে চলে যায় ।অভীর পদধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার পরও আনন্দী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শাওয়ার বন্ধ হয়ে গেলেও শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়া শেষ কয়েক ফোঁটা পানি যেন তার অস্থির মনটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে চোখ বুজল। নিজেকে শান্ত করার এক নিঃশব্দ চেষ্টা।
তার মনের ভেতরেও যেন এক অচেনা ঝড় বইছে। অভীর অনুভূতির মতো হয়তো অতটা গভীর নয়, তবু সেই আলোড়নকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। অদ্ভুত এক সংকোচ, অজানা এক টান আর অসংখ্য অব্যক্ত প্রশ্ন তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

অবশেষে একটি তোয়ালে জড়িয়ে ধীর পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। ভেতরে বদলানোর মতো কোনো পোশাক ছিল না। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় আনন্দী। ঘর নিস্তব্ধ। অভীর কোনো উপস্থিতি নেই।নিঃশব্দে আলমারির সামনে এসে দাঁড়াতেই তার মুখটা মলিন হয়ে গেল তার।আবারও কি শাড়িই পরতে হবে?ভাবনাটুকুই যেন ক্লান্তি হয়ে নেমে এল মনে। এই গরমে সারাক্ষণ শাড়ি পরে থাকা যে কতটা অস্বস্তিকর, তা সে বেশ ভালো করেই জানে।একটু অনিচ্ছা নিয়েই আলমারির দরজা খুলল আনন্দী।পরক্ষণেই বিস্ময়ে তার ভ্রু জোড়া উঁচু হয়ে গেল।
ভাঁজ করে রাখা কয়েক সেট আরামদায়ক পোশাক। গেঞ্জি আর পাজামা। একে একে সেগুলো হাতে তুলে দেখল সে। মনে পড়ে গেল নিজের বাড়ির দিনগুলোর কথা। ঠিক এমন পোশাকই তো সারাদিন পরে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াত সে।

উন্মাদনা পর্ব ৪৬

অকারণেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
আর দেরি না করে পোশাকগুলো পরে নেয়আনন্দী। শরীরজুড়ে যেন মুহূর্তেই নেমে এলো এক স্বস্তির পরশ। দীর্ঘদিন পর নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারার অনুভূতিটা তাকে অদ্ভুত প্রশান্তি দিল।
ঠিক সেই সময়ই, পেছন থেকে ভেসে এলো অভীর কন্ঠস্বর
“পরের বার দরজা লাগাইস বাটুলি। এতো সুন্দর সুন্দর দৃশ্য চোখ বেশি সহ্য করতে পারে না!”

উন্মাদনা পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here