প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (২)
রোজ ও রুশা
নেপালে আসার পর থেকেই হেরার ভেতরে যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতা বাসা বেঁধেছে। চারপাশের সবকিছুই তার কাছে একই সঙ্গে পরিচিত আবার অপরিচিত মনে হয়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা কুয়াশা, দূরে কোথাও ঝর্ণার নিরন্তর শব্দ, হিমেল বাতাসের স্পর্শ—এসবের ভেতরে এমন কিছু লুকিয়ে আছে যেন, যা তার হৃদয়ের গভীরে চাপা পড়ে থাকা কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে বারবার জাগিয়ে তুলতে চায়। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো ধরা দেয় না। যতবার সে তাদের ছুঁতে যায়, ততবারই অদৃশ্য কোনো দেয়াল সামনে এসে দাঁড়ায়। মনে হয়, তার মস্তিষ্কের কোথাও কেউ ইচ্ছে করেই একটা দরজা বন্ধ করে রেখেছে, আর সেই দরজার ওপাশেই লুকিয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
আজ বাড়িটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। ফারুক সিকদার
কে সবাই ফারুক সাহেব বলেই ডাকে। ছোট থেকে সাহেবদের মতো চলফেরা করতেন তিনি। মজার ছলের নামটা এখন তার খাতা কলমে ব্যাবহার হয়। বাইরে যাওয়ার পর যেন পুরো বাড়ির ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। সেই নীরবতার মাঝেই হেরার চোখ আবার গিয়ে আটকালো আলমারির ভেতরে রাখা পুরোনো ডায়রিটার উপর। বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল। এই ডায়রিটা দেখার পর থেকেই তার মনে হচ্ছে, এর পাতার ভেতরে এমন কিছু লেখা আছে যা শুধু একটা রহস্য নয়, বরং তার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
ডায়রিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ বহু বছর আগের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি তার মাথার ভেতর ঝলকে উঠল।
তখন সে ক্লাস নাইনে পড়ত। নেপালের সেই সময়টাতে তার জীবনটা যেন দুঃস্বপ্নে ভরে গিয়েছিল। এলাকার এক কুখ্যাত উন্মাদ যুবক তাকে নিয়মিত অনুসরণ করত। স্কুলে যাওয়ার পথে, বাজারে, এমনকি বাড়ির আশপাশেও লোকটা তাকে উত্ত্যক্ত করত। প্রথমে হেরা ভয় পেত, তারপর বিরক্ত হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। লোকটার চোখে এমন এক বিকৃত অধিকারবোধ ছিল, যা হেরার শরীর শীতল করে দিত।
একদিন সীমা ছাড়িয়ে গেল সবকিছু।
সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন লোকের সাহায্যে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল সেই পাগল মানুষটা নেপালের মাফিয়া সাইফ । ভয়ে, আতঙ্কে, অসহায়ত্বে হেরার পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল। সাহায্যের জন্য চিৎকার করেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে আবির্ভূত হয়েছিল এক অচেনা ছায়ামূর্তি।
মাথায় হুডি, সারা শরীর কালো পোশাকে ঢাকা, মুখে মাস্ক, চোখে কালো চশমা। তার পরিচয় বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না। শুধু একটা জিনিস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—তার পিঠে ঝোলানো ছিল একটি গিটার।
এরপর যা ঘটেছিল, তা আজও হেরা ভুলতে পারেনি।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকটা সেই উন্মাদ মানুষটাকে এমনভাবে পরাস্ত করেছিল যে সে মাটিতে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। যেন ঝড় এসে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছে। হেরা ভয়ে কাঁপছিল, আর সেই অচেনা মানুষটা একবারও নিজের পরিচয় দেয়নি। শুধু নিশ্চিত করেছিল সে নিরাপদ আছে এখন , তারপর রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল।
সেদিনের পর থেকে হেরা বদলে গিয়েছিল।
সে প্রায় ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিল। বাইরে বেরোতে ভয় লাগত। মানুষের ভিড়, অচেনা মুখ, রাস্তা—সবকিছু তাকে আতঙ্কিত করত। কিন্তু সেই অচেনা মানুষটার কথা সে ভুলতে পারেনি। কতবার যে মনে মনে ভেবেছে, যদি আর একবার দেখা হতো! অন্তত একটা ধন্যবাদ তো বলতে পারত।
দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল।
তার ঘরের জানালা থেকে দূরের ঝর্ণাটা স্পষ্ট দেখা যেত। প্রতিদিন বিকেলে সে জানালার পাশে বসে ঝর্ণার শব্দ শুনত। একদিন সেই ঝর্ণার গর্জনের মাঝেই ভেসে এলো গিটারের এক অপূর্ব সুর।
প্রথম দিন সে অবাক হয়েছিল।
দ্বিতীয় দিন অপেক্ষা করেছিল।
তৃতীয় দিন থেকে সেই সুর তার দিনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।
সন্ধ্যা নামলেই সেই গিটারিস্ট বসে গিটার বাজাত। পাহাড়ি বাতাস সেই সুর বয়ে নিয়ে আসত হেরার জানালার কাছে। হেরা কখন যে সেই সুরের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল ঝর্ণার কাছে। সেখানে গিয়ে কাউকে পায়নি।
কিন্তু একটা পাথরের উপর একটা খরগোশ এর গলায় ঝুলানো ছিল একটি ছোট্ট চিঠি। বুঝাই যাচ্ছিলো শিকারি খরগোশ!
প্রথমে হেরা ভেবেছিল হয়তো কাকতালীয় ব্যাপার। কিন্তু পরদিন আবার গেল। আবার একটি চিঠি। তারপর আরও একটি।
চিঠিগুলোতে কখনো জোর করে ভালোবাসার কথা ছিল না। ছিল অদ্ভুত এক যত্ন, এক নিঃশব্দ আশ্বাস।
একদিন একটি চিঠিতে লেখা ছিল—
*** তুমি উড়তে ভালোবাসো, তাই না? উড়ো। যত দূর ইচ্ছে উড়ো। পৃথিবী দেখো। আকাশ ছুঁয়ে ফেলো। তোমার ডানার দায়িত্ব আমার নয়, কিন্তু তোমার ডানায় যেন কেউ আঘাত করতে না পারে, সেই দায়িত্ব আমি নেব। তোমার আঁচলে ধুলোর দাগ লাগার আগেই আমি ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে যাব।****
শব্দগুলো পড়ে কেন যেন হেরার চোখ ভিজে উঠেছিল।
সেই দিন থেকেই চিঠিগুলোর জন্য অপেক্ষা করা শুরু করতো হেরা । নিত্য নতুন চিঠির জন্য।
সেই অচেনা মানুষটা কখনো সামনে আসেনি। কখনো নিজের নাম বলেনি। কখনো মুখ দেখায়নি। অথচ তার লেখা প্রতিটি শব্দ ধীরে ধীরে হেরার হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নিতে লাগল। হেরা জানত না লোকটার নাম। জানত না তার পরিচয়। জানত না সে দেখতে কেমন। শুধু জানত, তার পিঠে একটা গিটার থাকে।
সেই কারণেই নিজের মনে তাকে একটা নাম দিয়েছিল হেরা—
* ** জি ম্যান ***
গিটারের সুরে যার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল।
গিটারের সুরে যার জন্য প্রথমবার তার হৃদয় কেঁপে উঠেছিল। গিটারের সুরে যে অজান্তেই তার জীবনের প্রথম ভালোবাসা হয়ে উঠেছিল। আর আজ… নাভানের দিকে তাকালেই কেন যেন সেই পুরোনো অনুভূতিগুলো জেগে ওঠে হেরার।
জ্বরের ঘোরে বলা কথাগুলো, নেপালের ঘটনাগুলো, সেই রহস্যময় আচরণ, আর এই ডায়রির অস্তিত্ব— প্রিয়য় হটাৎ মেসেজ,যা হচ্ছে মেনে নে। সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, মনে হচ্ছে হেরার কাছে। হেরার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। নাভানই কি তার জি ম্যান? যে মানুষটাকে সে একসময় না দেখেই ভালোবেসেছিল?
হেরা যতবার নাভানের দিকে তাকায়, ততবারই তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জন্ম নেয়। অস্বস্তি—কারণ সে যতই নিজেকে বোঝাতে চায় যে সবকিছু কাকতালীয়, ততই যেন বাস্তবতা তাকে অন্য কিছু বিশ্বাস করাতে চায়। নাভানের রাগ, তার অদ্ভুত অধিকারবোধ, তার রহস্যময় আচরণ, বুকের ট্যাটু, গিটারের প্রতি অসামান্য টান—সবকিছু যেন কোথাও না কোথাও গিয়ে মিলে যায় তার বহুদিনের পরিচিত সেই অদেখা মানুষটার সঙ্গে। অথচ এটা মেনে নেওয়া তার জন্য সহজ নয়। কারণ জি ম্যান ছিল তার জীবনের প্রথম অনুভূতি, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম হৃদস্পন্দনের কারণ। যে মানুষটাকে না দেখেই সে ভালোবেসেছিল, যার চিঠির প্রতিটি শব্দ বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মতো। সেই মানুষ আর নাভান—এই দুজনকে এক মানুষ হিসেবে ভাবাটাই তার কাছে অসম্ভব মনে হয়।
তবুও অসম্ভব জিনিসটাই যেন ধীরে ধীরে সম্ভব হয়ে উঠছে।
ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে বিছানার উপর রাখা কালো লক করা ডায়রিটার দিকে তাকিয়ে রইল হেরা। ডায়রিটা এখনো বন্ধ। রহস্যের মতোই বন্ধ। বছরের পর বছর ধরে নিজের ভেতরে অসংখ্য গোপন কথা লুকিয়ে রাখা এই ডায়রিটাই হয়তো আজ তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
প্রিয় বলেছিল, পাসওয়ার্ড ডায়রির মধ্যেই আছে। খুঁজে বের করতে পারলে খুলবে। না পারলে অপেক্ষা করতে হবে বিশতম জন্মদিন পর্যন্ত।
কিন্তু হেরার আর অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই।
সে ডায়রিটা হাতে তুলে নিল।
মলাটের উপর অসংখ্য স্টিকার, আঁকিবুঁকি আর কালো কালি দিয়ে লেখা অদ্ভুত সব শব্দ ছড়িয়ে আছে। প্রথম দেখায় অর্থহীন মনে হলেও, ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় কেউ যেন ইচ্ছে করেই সেগুলোকে ধাঁধার মতো ছড়িয়ে রেখেছে। হেরা একের পর এক শব্দ পড়তে লাগল। কিছু উল্টো। কিছু বাঁকা।
কিছু এত ছোট যে চোখ কুঁচকে না দেখলে বোঝাই যায় না। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা জায়গায়।
এক কোণায় শুধু একটা অক্ষর—
“অ”
আরেক পাশে—
“ক”
অন্যদিকে—
“সি”
আরও একটু দূরে—
“জে”
“ন”
অক্ষরগুলো পাশাপাশি নেই।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
কিন্তু কেন জানি না, হেরার মনে হলো এগুলো আলাদা নয়। এগুলো একসাথে একটা শব্দ। একটা পরিচিত শব্দ। একটা অনুভূতি। একটা ডাক। একটা স্মৃতি।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠল। ফিসফিস করে নিজের অজান্তেই বলল—
*** মাই অক্সিজেন…***
শব্দটা মুখ দিয়ে বের হতেই সে থমকে গেল।
হেরার আঙুল কাঁপছিল। মনে পড়ে গেলো নাভানের অক্সিজেন বলে সম্মোধন করাটা। হেরা যেমন মেয়ে এতো কিছু চোখের সামনে দেখেও যে সে ২০ তম জন্মদিন এর জন্য অপেক্ষা করবে তেমন ন্যাকামি তার ভিতির নেই, অদেখা,নিষিদ্ধ জায়গার প্রতি তার টান বরাবর বেশি। তার সাথে ন্যাকামি শব্দ যায় না। নিজেকে সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতি ভাবে। তাই তো সবাইকে মিথ্যা বলে নেপালে এসেছে কিছু ক্লু পায় কি না।
সে ধীরে ধীরে লকের দিকে তাকাল।
হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে গেছে। যদি ভুল হয়?
যদি না খোলে? আর যদি খুলে যায়? অদ্ভুত এক ভয় আর কৌতূহল একসাথে চেপে বসল তার উপর।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে পাসওয়ার্ড দিল। মাই অক্সিজেন।
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর… ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। শব্দটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু হেরার কাছে সেটা বজ্রপাতের মতো শোনাল। ডায়রির লক খুলে গেছে।
সত্যিই খুলে গেছে। তার নিঃশ্বাস যেন বুকের মাঝখানেই আটকে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে স্থির হয়ে বসে রইল।
বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এতদিনের রহস্য এতদিনের অপেক্ষা। এতদিনের অজানা প্রশ্ন।
সবকিছুর দরজা যেন এইমাত্র খুলে গেল।
কাঁপতে থাকা হাতে ধীরে ধীরে মলাটটা সরাল হেরা।
তার বুকের ভেতর তখন শুধু একটাই অনুভূতি—
ভয়। কারণ সে জানে না পরের পাতায় কী আছে।
কিন্তু তার অনুভূতি বলছে, সেখানে শুধু কিছু লেখা নেই। সেখানে লুকিয়ে আছে তার হারিয়ে যাওয়া অতীত। লুকিয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য। লুকিয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে হয়তো চিনত, অথচ আজ আর মনে করতে পারে না।
আর কোথাও না কোথাও সেই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাভান। অহংকারী। রাগী। রহস্যময় অসভ্য গিটার ওয়ালা । অসহ্য সেই মানুষটা। যাকে দেখলেই তার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। হেরা ধীরে ধীরে প্রথম পাতাটা উল্টাল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার অজান্তেই অতীতের বন্ধ দরজাগুলো নীরবে খুলতে শুরু করল… প্রথম পাতায় একটা ছবি ছিল।
ছবিটা খুলতেই হেরা কিছুক্ষণ নড়তে পারল না। একটা ছেলে—পিঠে গিটার ঝুলানো, চোখে এমন এক আত্মবিশ্বাস, যেন পৃথিবীর কোনো ঝড়ই তাকে ভাঙতে পারে না। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা মেয়ে, মুখভরা হাসি। সেই হাসির মধ্যে এমন এক নির্ভরতা, যেন এই ছেলেটা থাকলেই পৃথিবীর সব ভয় মিথ্যা হয়ে যায়, সব অন্ধকার থেমে যায়, আর জীবনটা নিরাপদ হয়ে ওঠে।
হেরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত টান অনুভব করল। কেন জানে না, কিন্তু এই মুখটা… এই চোখটা… কোথাও না কোথাও সে যেন আগে দেখেছে।
পরের পাতাটা উল্টাতেই দেখা গেল একটা দৃশ্য।
মেয়েটা একটা মেরুন রঙের ওড়না ছেলেটার হাতে দিচ্ছে। ছেলেটা ওড়নাটা ধরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আছে, যেন শুধু কাপড় না—কোনো অনুভূতি স্পর্শ করছে। তারপর সে ধীরে ধীরে ওড়নাটা মেয়েটার মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে, এমনভাবে যেন সেটা কোনো সাধারণ কাজ না, বরং একটা নীরব প্রতিশ্রুতি।
আরেক পাতায়—
মেয়েটা রেগে গিয়ে ছেলেটার বুকে কামড় বসিয়ে দিয়েছে।
ছেলেটা চোখ বন্ধ করে আছে।
কিন্তু কষ্টে না। বরং এমন এক শান্ত ভঙ্গিতে, যেন সেই ব্যথাটাও তার কাছে ভালোবাসারই আরেকটা রূপ।
হেরা থমকে গেল। তার আঙুল পাতার উপরেই জমে গেল। কারণ এই দৃশ্যগুলো অচেনা নয়। একদমই অচেনা নয়।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে একটা চাপ সৃষ্টি হলো। ঠোঁট শুকিয়ে গেল। চোখের সামনে এক ঝলক ভেসে উঠল একটা বুক—সেই অহংকারী গিটারওয়ালা ছেলের বুক, আর সেখানে থাকা ট্যাটু… সেই একই অনুভূতি… সেই একই উপস্থিতি…
তার মাথার ভেতর হঠাৎ করেই তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল।
সে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল। এসব যে হেরা আর নাভানের তা হেরা বুঝতে পারছে। কিন্তু অতীতের কিছু হেরা কখনো দেখে নি। আর না কেউ তাকে দেখিয়েছে।
“কেন… আমি কিছু মনে করতে পারছি না?”—
তার ভেতরের একটা কণ্ঠ যেন ভেঙে পড়ল।
মনে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়ে গেছে।
খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
এমন কিছু, যেটা তার পরিচয় পর্যন্ত বদলে দিতে পারে।
কিন্তু যতই চেষ্টা করছে, কিছুই ধরা দিচ্ছে না।
এই না পারার যন্ত্রণা মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়—কারণ হারানো মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি সবসময় ছায়ার মতো এড়িয়ে যায়।
হেরা ধীরে ধীরে পরের পাতাটা উল্টাল।
আর সেখান থেকেই শুরু হলো সত্যের সবচেয়ে ভারী দরজা খোলা। পাতার মাঝখানে গাঢ় কালিতে লেখা—
*** পরি বউ এর লাভান বর****
****** জি ম্যান,,,,,,,,,,,
লেখার নিচে যেন কোনো অদৃশ্য মানুষের কণ্ঠস্বর লুকিয়ে আছে, যা শুধু পড়ার জন্য না, অনুভব করার জন্য লেখা।
তারপর একের পর এক বাক্য—
“তুই যেদিকেই তাকাবি , আমি সেখানেই থাকি—দৃষ্টির বাইরে, কিন্তু কখনো দূরে না। আমি কোনো রূপে আসি না… আমি সব রূপেই তোর পাশে থাকি। শেষ নিঃশ্বাসের আগ পর্যন্ত… আমি হারিয়ে যাব না। কারণ তুই শুধু আমার না… তুই আমার শ্বাস।” আমার অক্সিজেন ****
হেরা পড়তে পড়তে থেমে গেল।
এই কথাগুলো যেন লেখা না, বরং কোনো মানুষের বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে আনা অনুভূতি।
তার চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল।
মেয়েটার সরল অনুভূতি, ছেলেটার ভয়ংকর গভীর ভালোবাসা—সবকিছু একসাথে তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ করেই ভেসে উঠল কিছু ভাঙা স্মৃতি।
একটা দরজায় কড়া নাড়া।
একটা ছায়া দাঁড়িয়ে থাকা।
একটা গিটার বাজানো শব্দ।
আর একটা কান্না ভেজা কণ্ঠ—
“ তুই যতবার হারিয়ে যাবি… আমি ততবার তোকে খুঁজে নেব।”
হেরা কেঁপে উঠল।
এই তেজ … এই অনুভূতি… এই অধিকার… এটা কি নাভানের তার অসভ্য অহংকারী গিটার ওয়ালার ?
হঠাৎ তার সব সন্দেহ একসাথে জেগে উঠল।
” জি ম্যান… গিটার ওয়ালা……
একই মানুষ?
নাকি সে নিজেই নিজের ভেতর বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে?
তার ভেতর রাগও উঠল। ভয়ও উঠল।
আর সবচেয়ে বেশি উঠল—অবিশ্বাস।
“কেন আমাকে কিছু বলা হয়নি?”—তার ভেতর থেকে ক্ষোভ বেরিয়ে এলো।
“কেন সবকিছু লুকানো?
হেরার চোখ ভিজে গেল, কিন্তু সেটা দুর্বলতার না—এটা ভাঙা বিশ্বাসের।
সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই ভালোবাসা সাধারণ কিছু না। এটা পাহারার মতো। এটা আসক্তির মতো না… এটা দায়িত্বের মতো। যেন কেউ প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব লুকিয়ে শুধু একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথায় ভেসে উঠল নাভানের মুখ।
সেই শান্ত কিন্তু কঠিন চোখ।
সেই অদ্ভুত নীরবতা।
সেই সব সময় দূর থেকে দেখা দৃষ্টি।
হেরা বুঝতে পারছিল না কেন তার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
কেন বুকের ভেতর এত ব্যথা হচ্ছে। মনে পরলো জী ম্যান এর ***
চিঠির প্রতিটি শব্দে এমন এক ভালোবাসা ছিল, যেটা অধিকার চায় না, কিন্তু পাহারা দেয়। সামনে আসে না, কিন্তু ছায়ার মতো পাশে থাকে। নিজের নাম বলে না, কিন্তু প্রতিটা বিপদের আগে এসে দাঁড়ায়।
হেরা বুঝতে পারে তার ধারনা ঠিক তার প্রথম অনুভূতি সে আর কেউ না তার বর যাকে সে পছন্দ করতো না যার অহংকার ধুলোর সাথে মিশাতে গিয়েছিলো বাংলাদেশে । এ যেন এক পরিকল্পনা মাফিক কাজ মনে হচ্ছে। হেরার রাগে চোখ থেকে পানি পরছে। কেন এতো লুকুচুরি! কেনো। এভাবে নাভান তাকে ঠকাচ্ছে সব ধাধার মতো লাগছে। নিজের মনে মনে ঠিক করলো সে সব জানবে সব।
অভিমানি হেরা তো জানে না তার অসুস্থতার কথা –একটা এক্সিডেন্টে সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে যে তাই তো এতো কিছু –
ডাক্তারের ভাষায়, তার স্মৃতিগুলো হারিয়ে যায়নি। সেগুলো শুধু ভয়ের দেয়ালের আড়ালে বন্দি হয়ে আছে। একসাথে সবকিছু মনে পড়ে গেলে তার মস্তিষ্ক আবারও সেই পুরোনো ট্রমায় ফিরে যেতে পারে। তাই ধীরে ধীরে, ভালোবাসা দিয়ে, পরিচিত অনুভূতি দিয়ে, পুরোনো স্মৃতির টুকরো দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
আর সেই কাজটাই এতদিন ধরে করে গেছে নাভান।
নিজের পরিচয় লুকিয়ে।
নিজের কষ্ট লুকিয়ে।
নিজের ভালোবাসা লুকিয়ে।অভীমানি হেরা জানবে কবে। কি কি করেছে নাভান তার জন্য। আর সে কি সত্যি মেনে নিতে পারবে নাভান কে। হেরার কেনো যেনো এখন মনে হচ্ছে প্রিয় সব টা জানতো। আর নাভানের ব্যাপারে যে এতো কিছু বলেছে তা কি আদো সত্যি নাকি তা জানতে হবে। এখন মনে হচ্ছে তাকে বাংলাদেশ নিয়ে জাওয়া একটা প্ল্যান ছিলো। মনে মনে শপথ করলো এবার যেই গেম তার সাথে খেলেছে নাভান এখন হেরা খেলবে সত্যি জানবে এখন। এখন তো বুঝেছে নাভান তার গোপন প্রেমিক। এখন জমমে ভালো। দেখবে কে করে এই প্রেমের বাজিমাত।
হেরার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
কারণ আজ সে প্রথমবার উপলব্ধি করল— তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, সবচেয়ে বড় ভালোবাসা এবং সবচেয়ে বড় অপেক্ষার নাম একটাই।
নাভান।
ডায়রির পাতাগুলো যেন আর কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য, প্রতিটা আঁকিবুঁকি যেন হেরার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির একটা একটা দরজা খুলে দিচ্ছিল। অথচ সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যগুলো এত ভারী ছিল যে তার বুকের ভেতরটা ক্রমশ শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। মানুষ যখন নিজের অতীত সম্পর্কে কিছু জানতে পারে, তখন সে অবাক হয়। কিন্তু যখন নিজের অতীতকে সামনে দেখেও চিনতে পারে না, তখন তার ভেতরে যে অসহায়ত্ব জন্ম নেয়, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। হেরা ঠিক সেই অনুভূতির মধ্যেই ডুবে ছিল।
ডায়রিটা নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল সে। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই গিটারওয়ালা ছেলেটার ছায়া। ডায়রির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা সেই অদৃশ্য উপস্থিতি। একটা মানুষ কীভাবে এত বছর ধরে কাউকে ভালোবেসে যেতে পারে? কীভাবে আড়াল থেকে তার প্রতিটা হাসি, প্রতিটা কান্না, প্রতিটা বিপদ পাহারা দিতে পারে? কেন পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল নাভানের চোখ দুটো। সেই চোখ, যেগুলোতে সে সবসময় একটা অদ্ভুত কষ্ট দেখতে পেত। আগে মনে হতো হয়তো নাভান এমনই। কিন্তু আজ বুঝতে পারছে, সেই কষ্টের পেছনে কত বছরের অপেক্ষা লুকিয়ে ছিল।
আবার ডায়রিতে চোখ বুলায় সে
ঠোঁটের আর্ট , মনে পরে নাভানের বুকেও সেম এই ট্যাটু করা। অই পেজ এর নিচে অনেক টুকু ফাকা, তার পরের লেখাটা পড়েই হেরার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
” আচ্ছা যদি সে আমাকে ভুলেও যায় ”
— এই লাইনটা যেন তার হৃদয়ে ছুরি হয়ে বিঁধল। কারণ নাভান ঠিক এটাই জানত। হয়তো সে অনেক আগেই বুঝেছিল একদিন হেরা তাকে ভুলে যাবে। তবুও সে স্মৃতিগুলো আগলে রেখেছিল। একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে এমন করতে পারে? বোকা হেরা তো জানে না সত্যি অতীতের নাভানকে সে ভুলে গেছে। তাই তো প্রেমিক পুরুষের এতো আহাজারি।
জানালার বাইরে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে। দূরের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিটাও যেন আজ হেরার মনের মতো হয়ে উঠেছে। অর্ধেক দৃশ্যমান, অর্ধেক অদৃশ্য। অর্ধেক মনে আছে, অর্ধেক হারিয়ে গেছে।
ডায়রির আরও কয়েকটা পাতা উল্টাতেই একটা ছবিতে এসে তার দৃষ্টি আটকে গেল। ছবিটা স্পষ্ট না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে দূরের একটা ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। তার দিকে তাকিয়ে দূরে বসে গিটার বাজাচ্ছে একটা ছেলে। ছবির নিচে লেখা—
“আজও সামনে যাইনি। ওকে দেখেছি। ও হাসছিল। আমি দূর থেকে দেখেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো প্রিয় মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব লুকিয়ে রাখা। কিন্তু আমি পারছি। কারণ ওর হাসিটা আমার কাছে আমার পরিচয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
তার পাশে কয়েকটি লাইন।
“পরীর ঐ রূপের ঝলকে হইলাম উদাসী!!
সব ছাড়িয়া তাই তো আমি তারে ভালোবাসি
পরীর লাইগা জীবন আমার!!
পরীর লাইগা জীবন আমার বাজী রাখতে চাই
নাইরে নাইরে নাইরে আমার বাঁচার উপায় নাই!!
নাইরে নাইরে নাইরে আমার বাঁচার উপায় নাই
চাইরে চাইরে চাইরে আমি পরীডারে চাই!!
হেরার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সে হঠাৎ উপলব্ধি করল, নাভান শুধু তাকে ভালোবাসেনি। নাভান তার জীবনটাকেই নিজের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে। এই ভালোবাসার মধ্যে কোনো দাবি নেই, কোনো শর্ত নেই, কোনো জোর নেই। আছে শুধু নিঃশব্দে আগলে রাখার এক অসম্ভব ক্ষমতা। কিন্তু কেনো এতো লুকুচুড়ি হেরার জানা নেই।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই মাথার ভেতর তীব্র একটা ঝাঁকুনি অনুভব করল হেরা। তার জি ম্যান এর কথা মনে পরছে কিন্তু ছোট বেলার কথা কেনো মনে পরছে না। আর ছোট বেলার কথা জিজ্ঞেস করলে বাবা তাকে ছোট বলে ব্যাখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যায়। আর যখন সে ওইসব কথা মনে করতে যায় তখন তার মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা অনূভব করে।
নেপালের সেই পাহাড়ঘেরা শহরে রাতটা ধীরে ধীরে নেমে এসেছে। বাইরে ঘন কুয়াশা, দূরের ঝর্ণার একটানা শব্দ, আর হিমেল বাতাসের ভেতর হেরার বুকের অস্থিরতা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—তার ছোটবেলার কোনো স্মৃতি কেন তার মনে নেই, আর কেনই বা বাবা সব প্রশ্ন এড়িয়ে যান। এই লুকোচুরি তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছিল, কিন্তু সে আর নিজেকে থামাতে পারছিল না। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তার চিন্তার ভাঙন ঘটে। দরজা খুলতেই সে এক মুহূর্তে থমকে যায়—সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাভান। গম্ভীর মুখ, পকেটে ঢোকানো দুই হাত, সাদা গেঞ্জি- কালো শার্ট আর কালো প্যান্টে এক অদ্ভুত ভারী উপস্থিতি নিয়ে সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন এই ঘরটাও তার প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য। হেরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে না, তারপর ধীরে ধীরে তার ভেতরে চাপা রাগ জমে ওঠে—কারণ এই লুকোচুরির কেন্দ্রবিন্দু যেন এই মানুষটাই।
“ আপনি এখানে কেন এসেছেন?”—হেরার কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে আগুন লুকানো।
নাভান এক পা এগিয়ে আসে, চোখ স্থির, কণ্ঠ কঠিন।
“তোর সাহস কীভাবে হয় আমার অনুমতি ছাড়া বাইরে বের হওয়ার? তার উপর দেশ ছেড়ে চলে এসেছিস?
হেরা এক মুহূর্ত চুপ থাকে, তারপর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি আসে।
“ আপনি কে যে আপনার অনুমতি নিতে হবে?”
এই কথাটা শেষ হতেই নাভানের মুখ শক্ত হয়ে যায়। মুহূর্ত দেরি না করে সে সামনে এগিয়ে আসে। হঠাৎ করেই হেরার মুখ বরাবর থাপ্পড় পড়ে—একটা, তারপর আরেকটা, তারপর আরও—চারটা থাপ্পড়ে পুরো ঘরটা যেন থমকে যায়। হেরা পিছিয়ে যায় না, শুধু গাল ধীরে ধীরে লাল হয়ে ওঠে। তার চোখে বিস্ময় নেই, আছে শুধু তীব্র রাগ আর লুকুচুড়ির আগুন। নাভান ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে–
“এত মুখে মুখে তর্ক করবে না। মিসাইল গার্ল!!
হেরা দাঁত চেপে সামনে এগিয়ে আসে, কণ্ঠ কাঁপছে না কিন্তু চোখ জ্বলছে।
“কি করবেন আপনি? আবার মারবেন? একশো বার মারেন, হাজার বার মারেন। আমি তর্ক করবোই। কেনো এসেছেন।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১
(কাউকে ভালোবাসার মানে কেবল তাকে বালোবাসি বলা নয়। নিজের করে পাওয়া নয়; বরং নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েও অপর প্রান্তের মানুষটাকে সুরক্ষিত রাখা। নাভান এখানে কোনো সাধারণ প্রেমিক নয়, সে একাধারে রক্ষক এবং শিক্ষক। সে হেরাকে শুধু ভালোবাসেনি, নিজের অধিকার ও শাসনের বেড়াজালে তাকে পৃথিবীর সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থেকে আড়াল করে রেখেছে। মানুষের বাহ্যিক আচরণ অনেক সময় নিষ্ঠুর হতে পারে, কিন্তু সেই নিষ্ঠুরতার গভীরে যে কতটা রক্তক্ষরণ আর নিঃশব্দ বিসর্জন লুকিয়ে থাকে—নাভানের চরিত্রটি তারই এক অস্থির ও জীবন্ত উদাহরণ।)
