প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১
রোজ ও রুশা
বরাবরের মতো নাভান বাড়ি থেকে আবার বেড়িয়ে গেছে। বন্ধুমহল বাড়িতে বড়রা আসার আগেই সব স্বাভাবিক করে তুলেছিলো। হেরাও চায় না নাভান বা তার জন্য তাদের পরিবার ভেঙে যাক। তার ঠিক দুদিন পর এসেছিলো নাভান। সেদিন এর পর থেকে হেরার সাথে কথা বলে নি। আর বন্ধুমহলের সাথেও তেমন কথা হয় নি কাজের বিষয় ছাড়া। হেরাও নিত্যদিনের মতো চলছিলো। কিন্তু নাভান এর সাথে কথা না বলায় তার অস্থিরতা দিন কে দিন বেড়েই যাচ্ছে। বুঝ হবার পর থেকে যে মেডিছিন খায় হেরা, তা জাওয়াদ খান চেঞ্জ করে দিয়েছে ডাক্তার এর সাথে কথা বলে। হেরা বিরক্ত এই মেডিছিন এর জন্য। কই তার তো কোনো অসুখ নেই তাও কেন সব সময় তার মেডিছিন খেতে হয়। জাওয়াদ খান যেখানেই থাকুন প্রতিদিন ঠিক রাতে মেডিছিন এর কথা মনে করিয়ে দেয়। হটাৎ ডাক্তার জাওয়াদ খানকে ফোন দিয়ে মেডিছিন চেঞ্জ করতে বলে। তিনিও তাই করেন। কেটে যায় বেশ কিছুদিন। ***বর্তমাতে ____
অধীর মায়ের কোলে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে আছে। কাজল খান পরম মমতায় ছেলের চুলে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছেন— ঠিক যেমনটা করতেন ওর শৈশবে। সময় বদলেছে, মানুষটা বড় হয়েছে, কিন্তু মায়ের হাতের সেই চিরচেনা ওমে একটুও টান পড়েনি।
ঠিক পাশেই তৌহিদা তালুকদারের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে রোজ। মেয়েটা অভিমানে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। ভার্সিটি থেকে ফিরেই কে কার চেয়ে বেশি আদর কাড়তে পারে, তা নিয়ে ইদানীং দুটোর মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে। ঝিনুক, সৃজন আর রুশা ওদের এই কাণ্ড দেখে হেসে কুটিকুটি। পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে এক অদ্ভুত, শান্ত উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে।
কাজল খান যেভাবে রোজ আর রুশাকে নিজের আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন, বাইরে থেকে কেউ কোনোদিন ধরতেই পারবে না যে এদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। এই পরিবারে রক্তের বন্ধন নয়, ভালোবাসার টানটাই আসল পরিচয়।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো হেরা।
পরনে সাদা কুর্তি, কাঁধ বেয়ে নেমেছে খোলা চুল। হাতে একটা ছোট ট্রলি । ওর ফর্সা মুখে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা… যেন বাইরেটা ভীষণ শান্ত, অথচ বুকের ভেতর কোথাও কোনো এক তীব্র ঝড় বয়ে চলেছে।
হেরাকে দেখেই রোজ ঝটপট উঠে বসল,
“ তাহলে তুই সত্যিই যাচ্ছিস, হেরাপাখি?”
হেরা ঠোঁটের কোণে হালকা একটু হাসি ফুটে উঠলো । বড্ড মলিন সেই হাসি।
“ হুম। একটু দরকারি কাজ আছে রে। সব শেষ করে এক সপ্তাহের মধ্যেই চলে আসব।”
আসলে যাওয়ার কথা ছিল রুশারও। কিন্তু আচমকা প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে মেয়েটা দিনকয়েক ধরে ভার্সিটি যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। আর রোজের পাসপোর্টের ঝামেলার কারণে সে-ও যেতে পারছে না। রোজ এবার ঠোঁট উল্টে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল।
” বুঝছি, তুই একা একা নেপালে গিয়ে ওখানকার বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে মজা করবি, তাই তো?”
হেরা এবার আর কিছু বলল না, শুধু একবার রোজের চোখের দিকে তাকাল।
নাট্যশিল্পকলার কিছু জরুরি পেপারস নিয়ে আসা— এটা তো কেবলই একটা ছুতো, যাওয়ার একটা বাহানা মাত্র। আসল গল্পটা তো সম্পূর্ণ আলাদা। হেরা কোনো আনন্দ করতে যাচ্ছে না কোনো ডকুমেন্টস আনতে যাচ্ছে না , সে মূলত পালাতে যাচ্ছে। নিজের অবাধ্য অনুভূতির হাত থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে।
নেপালে ওর কিছু পুরোনো বন্ধু আছে, আর ফারুক সাহেব তো আছেনই। কটা দিন ওদের ওখানেই কেটে যাবে। সামনেই পরীক্ষা, তারপর সবাই মিলে বান্দরবন যাওয়ার একটা বড়সড় প্ল্যানও আছে। কিন্তু তার আগে… হেরার নিজের সাথে একটু একা থাকা বড্ড প্রয়োজন।
কারণ একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন প্রতিটা মুহূর্তে তাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
কেন নাভানের জন্য বুকের ভেতর এতখানি হাহাকার জমে থাকে? কেন লোকটা আশেপাশে থাকলে হৃৎপিণ্ডের গতি এতটা অগোছালো হয়ে যায়? কেন তার ওপর তীব্র রাগ হয়, আবার সেই অভিমানের আড়ালে তাকেই হন্যে হয়ে খুঁজতে ইচ্ছে করে? নাভান একটুখানি চুপচাপ থাকলে হেরার আকাশ কেন মেঘলা হয়ে যায়?
আর সবচেয়ে বড় ধাঁধা— এটা কি আসলেই ভালোবাসা? নাকি শুধুই এক অদ্ভুত অভ্যাস? নাকি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সেই সম্পর্কের অদৃশ্য এক মায়াজাল… যা চাইলেও ছিঁড়ে ফেলা যায় না? হেরা এই গোলকধাঁধার উত্তর চায়। আর সেই চরম সত্যের মুখোমুখি হতেই আজ সে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।
তৌহিদা জিহান দূর থেকে চুপচাপ মেয়ের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অলক্ষ্যে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মায়ের মন তো, হাজার লুকালেও চোখের ভাষা ঠিকই পড়ে ফেলা যায়। জাওয়াদ খান, কাজল খান— পরিবারের সবাই এখন নাভান আর হেরার সম্পর্কের জটিল সমীকরণটা জানেন। জিহান তালুকদার আর তৌহিদা তালুকদারও সবটা বোঝেন।
কী অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে বিয়েটা হয়েছিল, কীভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া দুটো মানুষ না চেয়েও একে অপরের জীবনের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল আষ্টেপৃষ্ঠে, তা কারো অজানা নয়। তবুও কেউ হেরাকে জোর করছে না, কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে না। বিশেষ করে জাওয়াদ খানের মনে একটা গভীর বিশ্বাস আছে— নাভান একদিন ঠিকই হেরার মনের সবটুকু জুড়ে নিজের অধিকার কাড়তে পারবে। তিনি হেরার চোখেও সেই নরম আলো দেখেছেন। সেখানে নাভানের জন্য একটা গোপন অনুরাগ লুকিয়ে আছে, খুব গভীরে, খুব গোপনে। শুধু মেয়েটা নিজেই এখনো নিজের হৃদয়ের ভাষা পড়তে শেখেনি।
তাই তাকে এই সাময়িক দূরত্বটুকু উপহার দেওয়া হলো। কারণ কিছু অনুভূতি খুব কাছ থেকে চেনা যায় না। একটু আড়ালে গেলেই স্পষ্ট বোঝা যায়— কার অনুপস্থিতি বুকের ভেতরটা সবচেয়ে বেশি শূন্য করে দেয়।
বিকেলের দিকে পুরো বন্ধু মহল মিলে হেরাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে বের হলো। ঝিনুক, সৃজন, অধীর, রুশা, রোজ— কেউ বাদ নেই।
শুধু একজন এই যাত্রার বিন্দুবিসর্গও জানে না। সে নাভান।
ইচ্ছে করেই তাকে এই খবরটা জানানো হয়নি। গত কয়েকদিন ধরে অফিসের কাজে সে এতটাই মগ্ন যে ঠিকমতো বাড়ি ফেরার বা খাওয়ার সময়টুকুও পাচ্ছে না। তার ওপর তিতিরকে নিয়ে ইদানীং নাভানের যে অদ্ভুত খামখেয়ালি আর বিরক্তি, তা দেখে বন্ধুদের সবাই মনে মনে বেশ চটে আছে। আর নাভানকে এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে মুখ গোমড়া করে থাকে; হেরার ওপর সব জোর খাটায় ঠিকই, কিন্তু মুখ ফুটে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা স্বীকার করে না।
তাই বন্ধুদের এই গোপন মিশন। তারা দেখতে চায়, হেরার এই হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ায় নাভানের ভেতরের মানুষটা কেমন করে রিয়্যাক্ট করে। পাথরটার বুক চিরে কোনো হাহাকার বের হয় কিনা, তা দেখার জন্যই এই ফাঁদ।
আর এই চমৎকার, বুদ্ধিদীপ্ত প্ল্যানটা যার মাথা থেকে এসেছে— সে আর কেউ নয়,জাতির দুলাভাই তুষার। এবার দেখা যাক, অহংকারী নাভানের মুখ থেকে আসল সত্যিটা কীভাবে বের হয়ে আসে!
রাত আটটার দিকে ক্লান্ত পায়ে বাসায় ফিরল নাভান।
উপরে নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে যখন সে নিচে নামল, ড্রয়িংরুমের কাছাকাছি আসতেই ওর পায়ের গতি কেমন যেন থমকে গেল। পুরো বাড়িটা আজ অস্বাভাবিক রকমের নিঝুম, থমথমে। কোথাও রোজের চিল-চিৎকার নেই, রুশার খিলখিল হাসির শব্দ নেই, নেই অধীরের চিরাচরিত কোনো ঝগড়াঝাঁটি। এমনকি হেরার সেই চঞ্চল উপস্থিতি, অনবরত বকবক কিংবা টুংটাং গিটার বাজানোর আওয়াজটাও আজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এই নিস্তব্ধতা নাভানের চেনা অভ্যাসের বাইরে।
ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল সে। তারপর নিজের চিরচেনা গম্ভীর, ভারী গলায় ডাক দিল।
“ পিপি মণি, ভাত দাও। খুব খিদে পেয়েছে।”
তৌহিদা তালুকদার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ওঁর ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে চিরচেনা মায়াবী এক চিলতে হাসি। পরম স্নেহে বললেন।
“ আজ তোর পছন্দের মাটন বিরিয়ানি করেছি রে, আব্বাজান।”
‘মাটন বিরিয়ানি’ শব্দটা কানে আসতেই নাভানের চোখের সামনে এক মুহূর্তের জন্য বহু বছরের পুরোনো, ধুলোবালি জমা এক সোনালী দৃশ্যপট ভেসে উঠল।
একটা ছোট্ট পরির মতো দেখতে মেয়ে… সিল্কি চুলে দুটো ঝুটি করা। চোখ দুটো তার তারার মতো জ্বলজ্বল করছে, মুখভর্তি এক আকাশ দুষ্টুমি আর মিষ্টি হাসি। আর সেই হাসির সাথে ঠোঁটের কোণে সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকা একটা ডাক—
“ লাভান বর! লাভান বর, লাভান বর!”
শৈশব থেকেই হেরা নামের এই মেয়েটা নাভানের জন্য একপ্রকার পাগল ছিল। শুধু যে ভালোবাসত, তা নয়; সে আক্ষরিক অর্থেই নাভানের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ঝুলে থাকত। বাড়িতে কেউ যদি এক মিনিটের জন্যও নাভানকে খুঁজে না পেত, তবে সবাই নিশ্চিত জানত সে কোথায় আছে। হেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ওর কাঁধে ঝুলে আছে, নয়তো কোলে চেপে বসে আছে, কিংবা বাদরের মতো গলা জড়িয়ে ওর পিঠে ঝুলে আছে বাগানের কোনো এক কোণে।
নাভান তখন থেকেই ভীষণ রাগী, গম্ভীর আর একরোখা স্বভাবের ছেলে ছিল। কিন্তু ওই ছোট্ট মেয়েটার অবুঝ জেদের সামনে তার সেই দুর্ভেদ্য রাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত। মেয়েটা এমন আকুল করে ডাকত যে নাভানের ভেতরের সবটুকু রুক্ষতা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যেত। তবে একটু পরেই হেরা যখন ওর গালে আদরের চুমু খেয়ে লালা দিয়ে ভরিয়ে দিত, তখন নাভান মুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে বলত।
“ কী করছিস এঞ্জেল! জীবাণু লেগে আমার গালে পিম্পল উঠবে তো!”
কিন্তু মুখের সেই কৃত্রিম বিরক্তির আড়ালে ঠোঁটের কোণের প্রশান্তির হাসিটা সে কোনোদিনই লুকাতে পারত না। আজ এত বছর পরও বিরিয়ানির সুবাস পেতেই নাভানের ঠোঁটের কোণে সেই একই রকম এক চিলতে হাসি আপনমনেই ফুটে উঠল।
বিরিয়ানি আর লাচ্ছি নিয়ে হেরা আর নাভানের মধ্যে ছোটবেলায় কী তুলকালাম যুদ্ধটাই না হতো! এই দুটো খাবার ছিল ওদের দুজনেরই অসম্ভব প্রিয়। এক প্লেট বিরিয়ানি আর এক গ্লাস লাচ্ছি সামনে এলে দুইজনের মধ্যে এমন কাড়াকাড়ি শুরু হতো, যেন ওটাই পৃথিবীর শেষ খাদ্য উপাদান!
হঠাৎই একটা বিশেষ বিকেলের স্মৃতি নাভানের অবাধ্য মনে কড়া নাড়ল।
তখন জাওয়াদ খান আর জিহাদ তালুকদাররা লন্ডন থেকে এসে সাময়িকভাবে রাশিয়ায় সেটেল হয়েছেন। সেদিনের সেই নরম বিকেলের আলো জানালা গলে ড্রয়িংরুমে এসে পড়েছিল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল গরম গরম মাটন বিরিয়ানির সুবাস, আর টেবিলের ওপর রাখা ছিল বড় জগ ভর্তি বরফ ঠান্ডা লাচ্ছি। ছোট্ট হেরা তখন থেকেই আস্ত একটা ঝড়। ওর একটাই অলিখিত নিয়ম ছিল— খেতে হলে নাভানের প্লেট থেকেই খেতে হবে, লাচ্ছি খেলে নাভানের গ্লাস থেকেই চুমুক দিতে হবে। নাভান যদি তাকে বাদ দিয়ে আগে অন্য কাউকে একচুল খাতির করে, তবে সেটা হবে হেরার জগতের সবচেয়ে বড় অবিচার!
সেদিন বাসায় কিছু মেহমান এসেছিলেন। তাঁদের সাথে এসেছিল শান্তশিষ্ট একটা ছোট্ট মেয়ে। মেয়েটা এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল। নাভান সৌজন্যবশত নিজের হাতের লাচ্ছির গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল।
“এই নাও, লাচ্ছি খাও।”
মেয়েটা হাসিমুখে এক চুমুক দিল। ব্যস, ওখানেই যেন হেরার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেল!
দূরে বসে থাকা হেরার মুখটা মুহূর্তে অভিমানে মেঘে ঢেকে গেলো, চোখ দুটো হয়ে উঠল বড় বড়। নিচের ঠোঁটটা উল্টে দিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল।
“লাভান বর, আমাকে না দিয়ে ওকে দিলে কেন?” তার পরপরই শুরু হলো কান্না। যে সে কান্না নয়, একেবারে আকাশ-পাতাল মাথায় তোলা তীব্র চিৎকার।
“ আমি কথা বলব না! কাট্টি! ও আমার লাভান বর না!”
বাড়ির বড়রা প্রথমে ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কেউ চকোলেট বাড়িয়ে দিলেন, কেউ কোলে নিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করলেন; কিন্তু হেরা আজ অদম্য। সে সোজা গিয়ে নাভানের মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখ দুটো নোনা জলে ভেজা, নাকটা রাগে টকটকে লাল, গাল দুটো ফোলা। হেরা জেদি গলায় বলল।
“গ্লাসটা দাও।”
নাভান বিরক্ত হয়ে বলল।
“ আমার গ্লাস দেব না। তুই তোরটা দিয়ে খা। তোর মুখের লালা গ্লাসে লেগে যায়।”
হেরা আরও জেদ ধরে বলল।
“না! আমি ওই গ্লাস থেকেই খাব!”
নাভান গ্লাস ছাড়ছে না, হেরা অন্য প্রান্ত থেকে হ্যাঁচকা টান দিল। দুইজনের এই অহংকারের টানাটানিতে ‘ছপাৎ’ করে পুরো গ্লাস ভর্তি ঘন লাচ্ছি ছিটকে গিয়ে পড়ল দুজনের গায়ের ওপর।
চারপাশ এক সেকেন্ডের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। নাভানের সাদা গেঞ্জিটা পুরো ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। আর হেরার গলা, ফর্সা গাল, ঠোঁট—সব জায়গায় লাচ্ছি মাখামাখি। হেরা কিন্তু তখনও দমেনি, রাগে কাঁপতে কাঁপতে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে।
নাভান সোজা দাঁড়িয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে এক দীর্ঘ, বিরক্তিকর শ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল।
‘এই পিচ্চিটার জন্য একদিন আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাব…।’
কিন্তু চোখ খুলে নিচে তাকাতেই ওর ভেতরের বিরক্তিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। হেরার নরম গালে, ঠোঁটের কোণে আর গলায় সাদা লাচ্ছি লেগে আছে। ছোট্ট মেয়েটা তখনো ফোঁপাতে ফোঁপাতে ভাঙা গলায় অভিযোগ করছে।
“তুমি ওকে কেন খাইয়েছো… তুমি না আমার লাভান বর?”
হেরার সেই অবুঝ জেদ আর অধিকারবোধ দেখে সেদিন নাভানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠেছিল। সে হুট করেই নিজের দুই হাতে হেরার তুলতুলে মুখটা ধরে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। তারপর একদম স্বাভাবিক, অথচ তীব্র এক অধিকারের ভঙ্গিতে হেরার গাল থেকে লাচ্ছিটুকু নিজের জিভ দিয়ে তুলে নিল। একবার, তারপর ঠোঁটের পাশ থেকে আরেকবার। শেষে যেন এক অদ্ভুত জেদের বশবর্তী হয়ে ওর গলার সমস্ত লাচ্ছি নিজের মুখে শুষে নিয়েছিল।
পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাচ্চাদের এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে। তার পরেই সেখানে হাসির একটা তোলপাড় রোল পড়ে গেল। বড়দের কেউ কেউ হেসে বলেই ফেললেন।
“ইসস! এরা বড় হয়ে যে কী করবে, আল্লাহ-ই জানেন!”
হেরা কান্না ভুলে একপলক অবাক চোখে নাভানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার মনে হলো, নাভানের গায়ে লেগে থাকা লাচ্ছিটুকুও তো তারই পাওনা! কিন্তু নাভানের সাদা গেঞ্জির ওপর খুব সামান্যই লাচ্ছি লেগে ছিল। হেরা নিচু হয়ে সেইটুকু খাওয়ার চেষ্টা করল, আর ঠিক তখনই—
‘কামড়!’
“ আহ্!” নাভান ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।
হেরার সেই ইঁদুরের মতো ছোট ছোট ধারালো দাঁত দুটো বসে গেছে নাভানের বুকের ওপর। এমনভাবে কামড়ে ধরেছিল যে মনে হচ্ছিল এক চিমটি মাংসই বুঝি উপড়ে নেবে। অথচ কামড় দিয়েই হেরা খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর চোখের মণি দুটোতে তখন এক অদম্য , জেদি সুখ— যেন ও নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পত্তিতে আজীবনের জন্য নিজের নামটা খোদাই করে দিল।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বড় হওয়ার পরও নাভান সেই কামড়ের দাগটা কখনো মুছে যেতে দেয়নি। বরং পরিণত বয়সে এসে সেই ক্ষতচিহ্নটার ওপরই একটা নিখুঁত ট্যাটু করিয়েছিল সে। কারণ, পৃথিবীর সবাই ভুলে গেলেও নাভান ভুলতে পারেনি।
আজ এত বছর পরও কিছু কিছু স্মৃতি মানুষের ভেতরে ঠিক আগের মতোই জীবন্ত, ঠিক আগের মতোই অমলিন হয়ে বেঁচে থাকে। সময়ের নির্মম ধুলোবালি তাদের স্পর্শ করতে পারে না; বরং বছর পেরোতে পেরোতে সেই সুপ্ত স্মৃতিগুলো আরও বেশি গভীর, আরও বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে হৃদয়ের দেওয়ালে গেঁথে যায়।
নাভান ঠিক সেরকমই এক অতল স্মৃতির সাগরে হারিয়ে গিয়েছিল। ওর চোখের সামনে বর্তমানের ডাইনিং টেবিলটা খাবারের ধোঁয়া ছাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা পড়ে ছিল বহু বছর আগের সেই এক মায়াবী বিকেলের আঙিনায়।
একটা ছোট্ট মেয়ে… এলোমেলো চুল, চোখভরা সীমাহীন দুষ্টুমি, মুখভরা মেঘের মতো অভিমান, আর বুকভরা একচ্ছত্র অধিকার।
হেরা।
তখন হেরা ছিল একটা জীবন্ত ঝড়। ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে ছুটে বেড়ানো একটা দুরন্ত, অবাধ্য বাতাস। কেউ তাকে খাঁচায় আটকে রাখতে পারত না, কেউ তাকে চুপ করাতে পারত না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পুরো বাড়িটা সে নিজের মাথায় তুলে নিত।
আর নাভান? নাভান ছিল সেই ঝড়ের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু, ওর সমস্ত পৃথিবীর ঘূর্ণি। হেরার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, ওর সবকিছু। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঠুনকো অজুহাতে নাভানের গলায় ঝুলে থাকা চাই-ই চাই। কখনও কাঁধে উঠে বসত, কখনও হাত ধরে টানত, আবার কখনও জোর করে নাভানকে ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়ে পুরো বাড়ি টহল দিত।
“ লাভান! দৌড়াও!”
“ আরও জোরে!”
“ আরও জোরে!”
ওর সেই মুক্তোঝরা হাসির শব্দে তখন পুরো বাড়ি গমগম করত। আর নাভান? সে মুখে চরম বিরক্তি প্রকাশের অভিনয় করলেও, মনে মনে ওই ছোট্ট মেয়েটার ওই হাসির জন্যই প্রতিদিন বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেত।
তবে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল হেরার সেই ভয়ংকর রকমের অধিকারবোধ। খুব ছোটবেলাতেই মেয়েটা কেমন করে যেন বুঝে গিয়েছিল— নাভান শুধু তার, আর অন্য কারো নয়। তাই কোনো মেয়েকে যদি নাভানের পাশে দাঁড়িয়ে দুটো কথাও বলতে দেখত, অমনি ওর মুখটা বেলুনের মতো ফুলে উঠত, চোখ দুটো রাগে চকমক করত, নিচের ঠোঁটটা অভিমানে কাঁপত। তারপর ঝড়ের বেগে ছুটে এসে সেই মেয়েটার মাঝখানে ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ত। নাভানের হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিংবা গলায় ঝুলে পড়ে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিত—
“এটা আমার লাভান বর!”
পুরো ঘর হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেত, কিন্তু হেরা মোটেও ইয়ার্কি করত না। সে সত্যিই ভীষণ রেগে যেত। আর কেউ যদি তখন ওকে নিয়ে তামাশা করত, তবে শুরু হতো নাটকের দ্বিতীয় অধ্যায়— কান্না, চিৎকার, বুকফাটা অভিমান আর মান-অভিমানের এক মহাকাব্য! এক সেকেন্ড আগে যে মেয়েটা হাসছিল, পরের সেকেন্ডেই সে হয়ে উঠত জলন্ত আগুন।
তাই তো নাভান ওকে শান্ত করার এক নিজস্ব ম্যাজিক পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিল। হেরা যখনই মাত্রারতিরিক্ত রেগে যেত, নাভান কোনো কথা না বাড়িয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিত। ওর চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিত, গাল দুটো টিপে দিত; আর মিরাকেলের মতো ঠিক দুই মিনিটের মধ্যেই সেই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় একদম শান্ত হয়ে যেত।
অথচ… আজ?
আজ সে চাইলে আর সেই অধিকার খাটাতে পারে না। এখন তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে এক বিশাল বয়স, নিষ্ঠুর সময়, রাশভারী অভিমান, হাজারো না-বলা কথা আর এক অদৃশ্য, দুর্ভেদ্য দূরত্ব। এখন হেরা তাকে চোখের সামনে দেখলে অলক্ষ্যে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এখন সে আর দূর থেকে ছুটে এসে নাভানের গলায় ঝুলে পড়ে না।
“লাভান বর” বলে পুরো বাড়ি মাথায় তোলে না। এখন সে নিজের চারপাশ জুড়ে একটা অহংকারের দেওয়াল তুলে রেখেছে, যে দেওয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে নাভান শুধু দূর থেকে চেয়ে থাকতে পারে— তাকে স্পর্শ করতে পারে না, তার মন অব্দি পৌঁছাতে পারে না।
তবুও… একটা জিনিস আজও একবিন্দু বদলায়নি। হেরা এখনও আগের মতোই বিস্ফোরক, আগের মতোই হুটহাট চটে যায়। এখনও আগের মতোই তার আকস্মিক উপস্থিতি চারপাশের বাতাসের তাপমাত্রা বদলে দেয়। শুধু পার্থক্য একটাই— আগে সে ছিল একটা মিষ্টি ঘূর্ণিঝড়, আর এখন সে একটা নিখুঁত মিসাইল; যা হুট করে এসে সরাসরি নাভানের বুকের বাম পাশে আঘাত করে, ওর ভেতরের সবটুকু নিয়ন্ত্রণ এলোমেলো করে দেয়, রাতের ঘুম আর মনের শান্তি কেড়ে নেয়। তারপর আবার ধুলো উড়িয়ে দূরে সরে যায়। কিন্তু বুকের ভেতর ক্ষতটা রেখে যায়, আগুনটা জ্বালিয়ে রেখে যায়।
আর ঠিক সেই কারণেই হয়তো, অজান্তেই নাভানের অবশ ঠোঁট গলে নামটা ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে আসে— “মিসাইল গার্ল…”
শব্দটা উচ্চারণ করতেই বুকের ঠিক মাঝখানটায় কেমন যেন একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে নাভান বাস্তবে ফিরে এলো। সে ডাইনিং টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে ধোঁয়া ওঠা মাটন বিরিয়ানি— তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। তৌহিদা জিহান নিজের হাতে প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছেন। আজকের বিরিয়ানিটার রঙ আর সুবাস এককথায় অপূর্ব হয়েছে, ঘরটা ম ম করছে গন্ধে। সাধারণ দিনে এমন খাবার দেখলে নাভানের চোখ চকচক করে উঠত, ক্ষুধার তীব্রতা বেড়ে যেত।
কিন্তু আজ… আজ কেমন যেন সবকিছু ফাঁকা লাগছে।
সেই সোনালী স্মৃতিটা মাথায় আসতেই নাভানের হাতটা মাঝপথেই জমে গেল। মুখের কাছে তোলা বিরিয়ানির লোকমাটা আর ঠোঁটের ভেতরে প্রবেশ করল না। ধীরে ধীরে হাতটা প্লেটের ওপর নামিয়ে আনল সে।
তারপর সে একবার চারপাশের শূন্যতার দিকে তাকাল। ঘরটা বড় বেশি নীরব, বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। যেন এই বাড়িতে সবচেয়ে জরুরি কিছু একটা আজ নেই। কেউ একজন অনুপস্থিত… যার চঞ্চল পায়ের শব্দে, যার অবাধ্য কণ্ঠস্বরে এই বিশাল অট্টালিকাটা সবসময় প্রাণবন্ত হয়ে থাকত।
নাভানের বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা, তীব্র অস্বস্তি আর শূন্যতা খামচে ধরল। সে আবার চারপাশে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর নিজের নিচু, গম্ভীর আর ভারী গলায় পিপি মণির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল—
“ পিপিমণি… সবাই কোথায়?”
প্রশ্নটা শুনে তৌহিদা জিহানের হাতের চামচটা এক মুহূর্তের জন্য মাঝপথেই জমে গেল। ওঁর চোখের মণি জুড়ে খুব ক্ষণিকের জন্য একটা অজানা আশঙ্কার ছায়া নেমে এলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললেন।
“ ওরা… ওরা একটু বাইরে গেছে রে আব্বাজান।”
নাভানের ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। পিপি মনির মুখের এই অতি-স্বাভাবিক কথাটা ওর ঠিক বিশ্বাস হলো না। সে ধীরে ধীরে হাতঘড়ির ডায়ালের দিকে তাকাল। রাত সোয়া আটটা। সময়টা দেখার পর বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা আরও জাঁকিয়ে বসল।
” এত রাত হয়ে গেল, অথচ বাড়িটা এমন নিঝুম? এখনও কেউ ফেরেনি?
ঠিক তখনই নাভানের বুকের ঠিক মাঝখানটায় অকারণ এক শূন্যতা হু হু করে নেমে এলো। মনে হলো, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ওর অজান্তেই ঘটে গেছে। আর সেই অদ্ভুত, থমথমে অনুভূতিটা ধীরে ধীরে ওর বুকের ভেতর একটা ভারী পাথরের মতো চেপে বসতে লাগল।
“সবাই কোথায় গিয়েছে ?”
তৌহিদা জিহান এবার অসহায় চোখে পাশে বসা কাজল খানের দিকে তাকালেন। কাজল খান পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন।
“বাইরে গেছে।”
নাভানের হাতের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল।
“ কারা?”
“ অধীর, সৃজন, রোজ, রুশা, তুষার… সবাই।”
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড।
নাভান পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে, কামানের গোলার মতো শান্ত স্বরে বলল।
“সবাই গেছে মানে? কোথায় গেছে?”
“এই তো, এসে পড়বে এখনই—”
“ আমি জিজ্ঞেস করেছি, কোথায় গেছে?” নাভানের কণ্ঠস্বরে কোনো চিৎকার ছিল না, কিন্তু সেই শীতল শান্ত স্বরটাই ড্রয়িংরুমের বাতাসকে এক লহমায় ভারী করে তুলল।
কাজল খান এবার আর কোনো লুকোছাপা না করে সরাসরি বললেন।
“হেরাকে নামিয়ে দিতে গেছে।”
নাভানের চোখের মণি তীব্র আক্রোশে সংকুচিত হয়ে এলো।
“কোথায় নামিয়ে দিতে গেছে?”
“এয়ারপোর্টে।”
নাভান কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন এই সহজ বাংলা শব্দটার অর্থ উদ্ধার করতে ওর মস্তিষ্কের খানিকটা সময় লাগছে। আর তার পর মুহূর্তেই—
ডাইনিংয়ের ভারী কাঠের চেয়ারটা সজোরে পেছনে ছিটকে গেল! মেঝেতে সেটার তীব্র ঘর্ষণের শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।
“What?”
ওর কণ্ঠের সেই সিংহগর্জন শুনে তৌহিদা জিহানের বুকটা ধক করে উঠল। সে ভিত গলায় বললো।
” হেরা নেপালে যাচ্ছে।
নাভান দাঁত চেপে ফুঁসে উঠল।
“হেরা নেপালে যাচ্ছে?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। সোফায় বসে জাওয়াদ খান আর জিহান তালুকদার এতক্ষণ রাজনীতি আর ব্যবসা নিয়ে জরুরি আলাপ করছিলেন, নাভানের এই আকস্মিক চিৎকারে তাঁরাও কিছুটা ভড়কে গেলেন। কারণ এই মুহূর্তে নাভানের চোখ দুটো যেভাবে জ্বলছে, তা দেখে যে কারোরই মেরুদণ্ড বেয়ে হিমশীতল স্রোত নেমে যাওয়ার কথা।
কাজল খান ধীরস্থির গলায় বললেন।
“ও নিজেই যেতে চেয়েছিল।”
“কে Permission দিয়েছে?”
শব্দগুলো নাভানের চোয়াল ভেঙে পিষে বের হলো।
চারপাশে এক লহমা নীরবতা। জাওয়াদ খান এবার নিজের গম্ভীর ও দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
“ আমরা দিয়েছি।”
নাভান খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে নিজের বাবার দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে তীব্র রাগ ছিল, অভিমান ছিল, আর ছিল বছরের পর বছর ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা এক পৈশাচিক ক্ষোভ।
“তোমরা দিয়েছো?” নাভান এক পা এগিয়ে এলো।
জাওয়াদ খান সোজা হয়ে বসে বললেন, “ হ্যাঁ।”
“ আমাকে না জানিয়ে?”
“সবকিছু কি তোমাকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে, শেহতাজ ?”
নাভান এবার এক টুকরো তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত হাসি হাসল। সেই হাসিতে আনন্দের লেশমাত্র ছিল না।
“ সবকিছুতে নয়, মিস্টার জাওয়াদ খান! কিন্তু হেরার ব্যাপারে সব কিছুতেই আমার অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল!”
সোফার ওপাশ থেকে জিহান তালুকদার একটু আমতা আমতা করে বললেন–
“দেখো শেহতাজ আব্বাজান, হেরা তো এই সম্পর্কটা মানতে চাইছে না। আর সে যদি নিজে থেকে না মানে, আমরা তো জোর করতে পারি না।”
নিজের ভাইয়ের এই তীব্র রাগ আর ভাতিজার এই মারকুটে রূপ দেখে এবার তৌহিদা তালুকদার বড্ড ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি নাভানকে শান্ত করার জন্য নরম গলায় বললেন–
“তোর এঞ্জেল একটু সময় চেয়েছে বাবা… একটু সময় দে, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“সময়?” নাভান তিক্ততায় ফেটে পড়ল।
“ অনেক বছর সময় পেয়েছে ও!”
পুরো ঘর নিস্তব্ধ। নাভান এবার সরাসরি তার বাবার চোখের দিকে চোখ রেখে চরম অধৈর্যর সাথে বলল–
“ ওই বেয়াদবের কাছে সম্পর্কের কোনো মূল্য না থাকতে পারে, কিন্তু আমার কাছে আছে। ও চাক বা না চাক, মরার আগের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি তোমার মেয়েকে আমার নামেই বাঁচতে হবে!”
জাওয়াদ খানও একজন ক্ষমতাশালী মানুষ, ছেলের এই চরম বেয়াদবিতে তিনিও তেজি কণ্ঠে গর্জে উঠলেন–
“ নাভান! ও যথেষ্ট অ্যাডাল্ট। ওর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমরা কোনো অন্যায় জোর খাটাতে পারি না।”
জাওয়াদ খানের এই কড়া কথার মাঝেই জিহান তালুকদার পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝখানে কথা বলে উঠলেন–
“ আরে জাওয়াদ, তুই ওর সাথে এমন করছিস কেন?”
জাওয়াদ খান ক্ষিপ্ত হয়ে বন্ধুকে থামিয়ে দিলেন–
“ জিহান, তুই আমাদের বাবা-ছেলের মাঝখানে জড়াবি না! আমি ওকে ছোট থেকে নিজের মেয়ের মতো বড় করেছি। আমার আম্মাজানের মনের বিরুদ্ধে কোনো কাজ আমি হতে দেব না!”
তীব্র রাগে আর অপমানে নাভান ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পাত্র আর খাবার এক ঝটকায় উল্টে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।
কাজল খানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি তো ভালো করেই জানেন, হেরার জন্য এই একরোখা ছেলেটার ফিলিংস কেমন! ছেলেটা ভালোবাসা প্রকাশ করতে জানে না, কিন্তু অধিকারের নামে পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে।
নাভান এবার বাঘের মতো গর্জে উঠল–
“ছোট থাকতে কেন তাহলে আমাকে ওর প্রতি এভাবে আসক্ত করিয়েছো? কেন উস্কে দিয়েছো? কেন আমাদের কবুল পড়িয়েছো?”
এবার আর কারো মুখে কোনো কথা বের হলো না। সবাই একদম নিশ্চুপ। কাজল রেখার আর তৌহিদা তালুকদারের সেই পুরোনো ছেলেমানুষী আর খামখেয়ালির কারণেই তো একদিন হুজুর ডেকে ঘরের ভেতর তারা স্বাক্ষী হয়ে নাভান আর হেরার ‘কবুল’ পড়ানো হয়েছিল। সেই থেকে নাভানের অবচেতনে হেরা মানেই ওর নিজস্ব সম্পত্তি।
জাওয়াদ খান কিছুটা দমে গিয়ে বললেন–
“সেটাই আমাদের ভুল ছিল। তখন তো আম্মাজান তোমার জন্য পাগল ছিল, আর এখন তো ও তোমায়।
তিনি আর কথা বাড়ালেন না, নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।
নাভান এক টুকরো নিষ্ঠুর হেসে বলল–
“এখন আমি আমার অধিকার জোর করে বোঝে নেব! আমায় নিজের মায়ায় পাগল বানিয়ে এখন সে নিজে দূরে গিয়ে সুস্থ থাকবে? শান্তিতে থাকবে? এটা তো আমি হতে দিতে পারি না। আর হ্যাঁ, আমাদের দুজনের মাঝখানে যেন তোমাকে আর কোনোদিন না দেখি!”
জাওয়াদ খান এবার ধমকে উঠলেন–
“নাভান! মুখ সামলে কথা বলো ! ওকে আমি আমার নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছি।”
নাভান চোখের পলক না ফেলে বাঁকা হেসে বলল–
“মেয়ের বাবা হতে চাইলে কিন্তু ফলাফল ভালো হবে না, মিস্টার মিনিস্টার সাহেব ।”
“ কী বলতে চাচ্ছো তুমি ?”
“ নয় মাস পর সোজা নানা বানালে বুঝবেন আমি কী বলতে চাচ্ছি!”
কথাটা বাতাসে ভাসতেই জাওয়াদ খান নিজের লালা আটকে গিয়ে বিষম খেয়ে কাশতে লাগলেন। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত বাকিদের চোখ যেন কোটর থেকে চড়কগাছ হয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো! একটা যুবক ছেলে নিজের বাবার সামনে দাঁড়িয়ে এত বড় নির্লজ্জ কথা বলতে পারে?
নাভান এবার আচমকা মাথা তুলল। ওর চোখ দুটো তখন আক্ষরিক অর্থেই আগুনের মতো জ্বলছে। সে তার বাবার দিকে চেয়ে বলল–
“ আর সবচেয়ে বড় কথা… নেপাল তোমার মেয়ের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা কি এই বয়সে এসে ভুলে গেছো?”
জাওয়াদ খান থমকে গেলেন। ওঁর মুখের সমস্ত রাজনৈতিক কাঠিন্য এক নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল।
“কী… কী হয়েছে নেপালে?”
“ ভুলে গেছো?”
নাভানের গলা এবার বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো–
“আমি কিন্তু ভুলিনি। সৈয়দ সাইফের কথা মনে আছে?”
জাওয়াদ খানের মুখের রঙ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন–
“ তুমি … তুমি কীভাবে এসব জানলে? ”
পুরো ঘরে তখন সুঁই পড়ার নীরবতা। নাভান হাত দুটো পকেটে পুরে বলল–
“ আমি শুধু এটাই বলতে চাচ্ছি, ওখানে ওর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ আছে।”
জাওয়াদ খান এবার স্পষ্টই অস্বস্তিতে পড়লেন, তাও নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বললেন, “সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।”
“ Hope so.” নাভানের চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে এলো,
“ ওর যদি একটা চুলও নড়ে, তবে কার কার সাম্রাজ্য ধ্বংস হবে, তা শুধু আমিই জানি।”
কথাটা বলার সময় নাভানের চোখে এমন এক আদিম হিংস্রতা ছিল, যা দেখে উপস্থিত কারো আর একটা শব্দও বলার সাহস হলো না।
তৌহিদা জিহান আবারও কাঁপা গলায় অনুরোধের সুরে বললেন–
“ শেহতাজ… একটু সময় দে না ওকে আব্বাজান ।”
ওঁর কণ্ঠে মিনতি ছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক চরম ভয়। তিনি জানেন, নাভান যখন এই টোনে কথা বলে, তখন তাকে থামানো কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
কিন্তু নাভান একটুও নরম হলো না।
“ আর কোনো সময় না। অনেক সময় দিয়েছি আমি।”
এই একটা চূড়ান্ত বাক্যের পরেই ঘরের পরিবেশ পুরোপুরি পাল্টে গেল। এই পুরো রণক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন জাওয়াদ খান। দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্ষমতার শিখরে থাকা একজন মানুষ, কিন্তু আজ তিনি শুধু একজন সাধারণ বাবা—যিনি নিজেরই বেপরোয়া ছেলের সামনে এক অদ্ভুত পরাজয়ের গ্লানি অনুভব করছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, তিতিরের পুরো ব্যাপারটা কী এবং নাভান কেন তিতিরকে নিয়ে এত অস্থির। তাই একদিকে যেমন ছেলের ওপর ওঁর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল, অন্যদিকে নিজের পিতৃসুলভ অহংকার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন।
জাওয়াদ খান একটু সামনে ঝুঁকে এসে এবার শেষবারের মতো কর্তৃত্ব খাটিয়ে বললেন–
“ আমার মেয়েকে ফেলে তুমি অন্য একটা মেয়েকে দিনরাত সময় দিচ্ছো । আমি এটা কোনোভাবেই মেনে নেব না, শেহতাজ ।”
বাবার মুখে এই তিতিরের খোঁচাটা শুনতেই নাভানের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেল। সে এক ইঞ্চিও না দমে সোজা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে চরম নির্লজ্জের মতো বলল–
“ ওকে সময় দেব? তাহলে যাও, আমাদের বাসর ঘর রেডি করো!”
জাওয়াদ খান ছেলের এই চরম ধৃষ্টতা আর বেয়াদবি দেখে আবারও একটা কাশির মতো শব্দ করে নিজেকে সামলালেন। তারপর ধমকের সুরে বললেন–
“ তুমি ভুলে গেছো নাভান, আমি তোমার জন্মদাতা হই!”
কিন্তু নাভান থামল না। বরং ওর কণ্ঠ আরও শীতল শোনাল–
“ কাকে সময় দিচ্ছি আর কেন দিচ্ছি, সেটা আমি মুখে বুঝিয়ে বলব না… কাজে দেখিয়ে দেব। তবে হ্যাঁ, হেরা নেপাল থেকে ফিরে আসার পর যেন সবকিছু তৈরি দেখতে পাই। বাসর ঘর যদি ঠিকঠাক রেডি না হয়, তবে কাল সকালের নিউজপেপারের হেডলাইন হবে— ‘চল্লিশোর্ধ্ব মন্ত্রী জাওয়াদ খান আবার বাবা হতে চলেছেন! ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে থাকতেও ঘরে এলো নতুন অতিথি!’”
এই কথাটা যেন ঘরের ভেতর একটা জ্যান্ত পারমাণবিক বোমার মতো ফাটল!
জাওয়াদ খান কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি পাথর হয়ে গেলেন। একজন ঝানু ব্যাবসায়ী হিসেবে জীবনে বহু বড় বড় প্রেসার তিনি এক তুড়িতে সামলেছেন, কিন্তু নিজেরই ২৫ / ২৬ বছরের ছেলের মুখ থেকে এমন ভয়ানক ব্ল্যাকমেইল তিনি এই জীবনে প্রথম শুনলেন! তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সোজা কাজল রেখার দিকে আঙুল তুলে তেজি কণ্ঠে চিল্লিয়ে উঠলেন,–
“এই কাজল রেখা! এই ছেলে কার? এই ত্যাদড় ছেলেটা আমার নাকি অন্য কারোর? হাসপাতাল থেকে বাচ্চা বদল করে আনিস নাই তো তুই? সত্যি বল আমাকে!”
নিজের স্বামীর মুখে এমন অবাস্তব কথা শুনে অ্যাডভোকেট কাজল রেখা চোখ ছোট ছোট করে এমন এক লুক দিলেন, যেন এখনই কোর্টে জাওয়াদ খানের নামে মামলা ঠুকে দেবেন! পাশে বসা জিহান তালুকদার এই গম্ভীর পরিস্থিতির মধ্যেও মুখ চেপে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। জাওয়াদ খান রেগেমেগে বন্ধুর কলার চেপে ধরে বললেন—
“এই জিহান! তুই হাসছিস কেন রে? সত্যি করে বল, এই ছেলে আমারই তো?”
জিহান তালুকদার এবার বন্ধুর কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললেন–
“ আরে ক্ষ্যাপা, ওইটা একদম তোর নিজস্ব ডিএনএ দিয়ে তৈরি খাঁটি মানব পুরুষ! আর ও তোর ছেলের চেয়েও বড় পরিচয়—ও আমার একমাত্র মেয়ের জামাই!
জিহান তালুকদারের কথা শেষ হতে না হতেই নাভান দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে বলল, “আমি কোনো ভুল ডেলিভারি নই, মিস্টার জাওয়াদ খান। আমি আপনারই তৈরি করা ভুল সিদ্ধান্তের এক চরম নিখুঁত ফল। আর হ্যাঁ, আজ থেকে আপনি আমার ‘শ্বশুর’, নট ফাদার! নিজের মেয়েকে যেভাবে সামলান, আজ থেকে এই আমাকেও সেভাবে সামলে নিয়েন!”
রাত তখন প্রায় পৌনে দশটা।
নাভান ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ওর চোখ দুটো তখন রক্তবর্ণ, চোয়াল শক্ত। মুখে জমে থাকা রাগ যেন যেকোনো মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হবে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে তার ব্যক্তিগত সেক্রেটারিকে কল দিয়ে ইমিডিয়েট নেপালের একটা প্রাইভেট ফ্লাইটের টিকিট রেডি করতে বলল।
ঠিক তখনই বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল ওদের পুরো বন্ধুমহল। ফোনটা কেটে পকেটে পুরতেই নাভানের চোখ গিয়ে পড়ল সৃজন আর অধীরের ওপর। ধপধপ করে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে সে কোনো কথা না বাড়িয়ে এক ঝটকায় দুজনের কলার একসাথে মুঠো করে চেপে ধরল!
“আমার অগোচরে, আমাকে না জানিয়ে কেন তোরা আমার বউকে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলি, হ্যাঁ?”
ওর গলার স্বর এতটাই কর্কশ আর হিংস্র ছিল যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ আর রুশা ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল।
“তোরা ওকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলি! অথচ আমাকে একটা বারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না?”
নাভানের হাতের মুঠো আরও শক্ত হলো, সৃজন আর অধীরের দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।
ঝিনুক দূর থেকে দেখছিল। সে জানত, নাভান রাগের মাথায় যতই পাগলামি করুক না কেন, নিজের বন্ধুদের সে কোনোদিন ক্ষতি করবে না। তবুও এই মুহূর্তের দৃশ্যটা বড্ড অস্বস্তিকর। সে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এসে প্ল্যানমাফিক গম্ভীর গলায় বলল–.
“ তুই শুধু নিজের রাগটাই দেখছিস নাভান, অন্য কিছু তোর চোখে পড়ছে না।”
নাভান রক্তচক্ষু নিয়ে ঝিনুকের দিকে তাকাল। ঝিনুক থামল না,ল–
“ একবারও কি তুই বুঝতে চেয়েছিস, হেরা ভেতর ভেতর কী ফিল করে? ওর ওপর দিয়ে কী যায়?”
চারপাশটা আবার চুপ হয়ে গেল। সৃজন এবার বেশ কায়দা করে নাভানের শক্ত হাতের মুঠিটা নিজের কলার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “বউ মুখে বললেই বউ হয়ে যায় না রে ভাই! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে এক ফোঁটা ভালোবাসা থাকা লাগে। সেটা তো তোদের মধ্যে নেই! তুই সবসময় শুধু তোর এই পশুপাখির মতো ‘অধিকার’ কেন দেখাস?”
অধীরও এবার সামনে এসে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে বন্ধুর প্রতি রাগ যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল গভীর হতাশা। সে সরাসরি নাভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল–
“একটা কথা বুকে হাত দিয়ে সত্যি করে বলবি ভাই? তুই কি সত্যিই হেরাকে ভালোবাসিস?”
প্রশ্নটা যেন পুরো অন্ধকার চত্বরটাকে এক ঝটকায় স্তব্ধ করে দিল। নাভান কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু ওর চোখের গভীরে হঠাৎ যে এক চরম আতঙ্ক, এক মহাসূন্যতা আর তীব্র এক অসহায়ত্ব ফুটে উঠল—সেটাই যেন বাকিদের জন্য এক অঘোষিত উত্তর হয়ে দাঁড়াল।
কারণ, হেরা চলে যাওয়ার পর থেকেই নাভানের বুকের বাম পাশটায় এক অদ্ভুত, না-বলা যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে, কেউ ওর জীবন্ত শরীরের ভেতর থেকে খুব মূল্যবান কিছু একটা টেনেহিঁচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।
এদিকে, হাজার হাজার ফুট ওপরে আকাশের বুক চিরে উড়ে চলেছে বিমান।
জানালার পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছে হেরা। নিচের চেনা শহরের আলোর বিন্দুগুলো ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল মেঘের আড়ালে। ওর কোলের ওপর খোলা রয়েছে একটা ডায়েরি। পাতার একদম ওপরে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা—
“ আমি কেন পালাচ্ছি?”
অনেকক্ষণ সে কলমের ডগাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মনের ভেতরের অবাধ্য অনুভূতিগুলোকে ধীরে ধীরে সাদা পাতায় কালির অক্ষরে রূপ দিতে শুরু করল:
“কারণ আমি বড্ড ভয় পাচ্ছি। অই অসভ্য গিটার ওয়ালা কে চোখের সামনে দেখলে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়, অভিমান হয়। আবার ও চোখের আড়াল হলে কেন যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ওনি যখন অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বলে, আমার ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। ওনি আমায় এতো গভীর ভাবে ছুলেও কেনো আমার শরীরে শিহরন জাগে। আমি তো ওকে সহ্যই করতে পারি না…”তাও কেনো আমার সাথে কথা না বললে, অস্থির লাগে। কেনো মনে হয় এই মানুষটার মাঝে আমার সব। কেনো মনে হয় এমন।
কলমটা হাত থেকে আচমকা থেমে গেল হেরার। সে জানালার বাইরে তাকাল। মেঘের অনন্ত স্তর ভেসে যাচ্ছে মহাশূন্যে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার লিখতে শুরু করল:
“ কিন্তু আমার প্রথম ভালোবাসার কথা মনে পড়লে কেন যেন বুকটা হাহাকার করে ওঠে? কেন আজকাল সেই প্রথম অনুভূতির স্মৃতির মাঝেও আমি ভুল করে নাভানের মুখটাই দেখতে পাই? এ কেমন দু টানা। আদো কি দুই জন কে ভালোবাসা যায়।
হেরার চোখ দুটো নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এলো। ডায়েরির পাতার ওপর টুপ করে একটা অশ্রুবিন্দু পড়ে কালির লেখাটাকে কিছুটা লেপ্টে দিয়ে একটা গোল দাগ তৈরি করল। হেরা চোখের জল মুছে আবার লিখল—
“ তাহলে কেন মনে হয় ও ছাড়া আমার এই জীবনটা সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ? আমার এই প্রথম অনুভূতিটা আসলে কী, আমি সেটাই এবার স্পষ্ট করে বুঝতে চাই।
কোনটা মায়া… কোনটা অভ্যাস… আর কোনটা সত্যিকারের ভালোবাসা…”
হেরা
ডায়েরিটা বন্ধ করে আলতো করে চোখ দুটো বুজল। সে নিজেকে কিছুটা সময় দেবে। নিজের হৃদয়কে শান্ত হয়ে শুনতে শিখবে। আর হয়তো নেপালের এই নির্জনতায় বসেই সে প্রথমবারের মতো নিজের কাছে স্বীকার করবে—নাভান শুধু তার জীবনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো মানুষ নয়; সে অতি গোপনে, অত্যন্ত ধীর পায়ে হেরার হৃদয়ের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলেছে।
এদিকে বাড়ির নিচে বন্ধুমহলের তর্ক যেন থামার কোনো লক্ষণই নেই। সৃজন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল–
“ তুই আমাদের বোনটার ওপর এত অধিকার ফলাচ্ছিস কেন রে নাভান? তিন অক্ষরের একটা ‘কবুল’ মুখে বললেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ভালোবাসা না থাকলে শুধু জোর জবরদস্তি করে কোনো সম্পর্ক টিকে থাকে না।
জাতির দুলাভাই তুষারও এতক্ষণে মাথা নেড়ে সৃজনের কথায় সায় দিলেন—
“ ঠিকই বলেছো শালাবাবু! নাভান, তুমি যদি ওকে ভালোই না বাসো, তবে হেরা চলে যাওয়ায় তোমার বুকের ভেতর এত অস্থিরতা কেন হচ্ছে?”
ঝিনুক এবার চূড়ান্ত চালটা চেলে বলল, “যে মানুষকে কেউ ভালোবাসে না, তার জন্য কোনো পুরুষ মানুষ এভাবে পাগলা কুত্তার মতো ছটফট করে না, নাভান।”
নাভান বিরক্তিতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল–
“ ভালোবাসা? ওই পিচ্চি মেয়ে ভালোবাসার ভ ” ছাড়া আর কিছু বোঝে? আর তোরা তিতিরের আসল ব্যাপারটা জানিস না বলেই আজ আমাকে এখানে দাঁড়িয়ে এত জ্ঞান দিচ্ছিস!”
সৃজন এক পা এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করার ভঙ্গিতে বলল—
“ তাহলে আজ আমাদের বুঝিয়ে বল! কেন তিতিরের জন্য তুই নিজের সবকিছু বাজি ধরতে পারিস, কিন্তু হেরার চোখের জলটা তোর চোখে পড়ে না? তুই কি সত্যিই হেরাকে ভালোবাসিস, নাকি তিতিরকে?”
নাভান কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর মাথা নিচু করে খুব হালকা, ভাঙা গলায় বলল–
“ ওকে আমি ভালোবাসি না…”
সবাই নাভানের এই একঘেয়ে উত্তরে চরম বিরক্ত হলো। কিন্তু নাভান যখন ধীরে ধীরে মাথা তুলল, ওর চোখের ভেতর তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড়। সে হিসহিসিয়ে বলল–
“No Love! কিন্তু ও আমার একান্ত, ‘অধিকার’। আর তোরা তিতিরের ব্যাপারে জানতে চাস তো? ওকে ফাইন, চল আমার সাথে।”
“কোথায়?” অধীর ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
নাভান গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল–
“চল, তোদের আজ এমন কিছু জিনিস দেখাব, যার পর তোদের এই মুখের সব বকবক বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো কথা না বলে গাড়িতে ওঠ!”
সবাই কৌতূহল আর আশঙ্কা নিয়ে এক এক করে নাভানের স্পোর্টস কারে গিয়ে বসল। নাভান গাড়ির এক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে সর্বোচ্চ গিয়ার তুলল। যে রাস্তা পার হতে সাধারণ মানুষের এক ঘণ্টা সময় লাগে, নাভানের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের কারণে সেই পথ মাত্র ৩০ মিনিটে পার হয়ে গেল। পেছনের সিটে বসা রুশা আর রোজ ভয়ে নিজেদের আত্মা হাতে নিয়ে খপ করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।
অবশেষে গাড়িটা এসে থামল এক নিঝুম, থমথমে জায়গার সামনে। চারপাশটা অন্ধকার, শুধু ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে চারপাশ।
গাড়ি থেকে নেমে সবাই যখন চারপাশের পরিবেশটা দেখল, ওদের সবার মুখের রঙ এক নিমেষে উবে গেল। এটা একটা বিশাল, আদিগন্ত বিস্তৃত ‘কবরস্থান’!
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০ (২)
“এখানে কেন এনেছিস? এগুলা কার কবর?
সবাই একসাথে তীব্র বিস্ময় আর এক অজানা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
নাভান কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু পকেটে হাত দিয়ে একটা বিশেষ কবরের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল—যে কবরের লুকিয়ে আছে নাভান আর তিতিরের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার আর ভয়ানক সেই রহস্যের চাবিকাঠি!
