Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (৩)

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (৩)

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (৩)
রোজ ও রুশা

ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশটা তখন একপেশে উত্তেজনায় কাঁপছে। টিভির সুবিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে নাভানের নিখুঁত, ধারালো চোয়াল আর গাম্ভীর্যে ভরা চাহনি। নেপালের বাড়ির মেইন গেটের বাকি সব সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো, সচল কেবল একটিই। সেখানে ঠিক কী ঘটছে, তা দেখার জন্য ঘরের প্রতিটি মানুষ যখন উদ্বেগে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে, ঠিক তখনই রুশা তার ফোন থেকে সেই লাইভ ফুটেজটা কানেক্ট করে দিল ড্রয়িংরুমের বড় স্ক্রিনে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই রুশার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সোফায় এক সজোর লাফ মেরে, দুই হাত শূন্যে তুলে সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—

“ জয়! আমাদের চকলেট হিরোর জয়! আহা, কী লুক! কী ব্যক্তিত্ব! আই এম ফিদা! একেবারে আমার কল্পনার নায়কের মতো!
রুশার স্বভাব সবারই জানা। দিনরাত উপন্যাস গিলে মেয়েটার মাথা পুরো চাটনি হয়ে গেছে! স্ক্রিনে নাভানকে ওভাবে এন্ট্রি নিতে দেখে সে নিজের কল্পনার দুনিয়ায় হারিয়ে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধীর চট করে দুই কানের ওপর হাত দিয়ে মুখ বাঁকাল। তার বুকের বাঁ দিকটায় কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর জ্বলুনি শুরু হয়েছে—ঠিক যেন কেউ এক বাটি তাজা কাঁচা মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে! মনে মনে গজগজ করে উঠল সে—
” আরে ভাই, কী এন্ট্রি! পুরোটাই “ আমিই ভিলেন, আমিই হিরো ” টাইপ! ৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশ থেকে নেপাল! ভালোবাসা একেই বলে—বউকে ভালোবাসি না বলেও কী সাংঘাতিক টান!
অধীর নজর ফেরাল রুশার দিকে। গায়ের রং আর পুতুলের মতো মিষ্টি গোলগাল চেহারার জন্য সে ভালোবেসে মেয়েটাকে ‘লাল গোলাপি’ বলে ডাকে। কিন্তু সেই লাল গোলাপি এখন নিজের হবু বরকে ফেলে ভাসুরের প্রেমে গলে জল! অধীর নিজের ভেতরের হিংসাটা চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে, মেয়েদের মতো মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল–

“ জয় তো হবেই! তবে প্রেমের, ভালোবাসার জয় না, গ্যারান্টি দিয়ে বলছি… থাপ্পড়ের জয় হবে! তোমার ওই চকলেট হিরো এখন সামনে যাকে পাবে, তাকেই চড় মারবে!
রুশা চোখ কপালে তুলে, দুই গালে হাত দিয়ে বলে উঠল—
“ আহা! এই লাইভ টেলিকাস্ট উনি থাপ্পড় মারতে যাবেন কেন, শুনি? একটু পজিটিভ কিছু ভাবুন না! মারামারি বাদ দিয়ে একটু রোমান্সও তো হতে পারে? উফ, নাভান ভাইয়ার রোমান্টিক চোখ দুটো দেখেছেন?
অধীর এবার পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বলল–
“ ভাই তো আমার! তাকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ চেনে না, লাল গোলাপি! ওইটা রোমান্টিক চোখ না, ওটা হচ্ছে বজ্জাতির এক্স-রে দৃষ্টি! বেটা যে কত বড় একগুঁয়ে, তা আমি হাড়ে হাড়ে জানি!
রুশা সোফা থেকে এক লাফে নেমে অধীরের একদম বুকের সামনে এসে আঙুল উঁচিয়ে হুমকি দিল–

“ খবরদার! একদম আমার চকলেট হিরোর নামে বাজে কথা বলবেন না বলে দিলাম! লাইভে ওনাকে দেখে আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে, আর আপনি হিংসায় জ্বলে ছাই হয়ে হাবিজাবি বকছেন!
অধীর দুই কানে হাত দিয়ে, আসমানের দিকে মুখ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠল–
“ নাউজুবিল্লাহ! এ কী অলক্ষুণে কথা শুনতে হলো আমাকে! আরে চুপ করো মহিলা! উনি সম্পর্কের বিচারে তোমার ভাসুর হয় ! আর ভাসুরের নিজের ছোট ভাই—এই যে হিরোর মতো সুপুরুষ, বাংলার অন্যতম হ্যান্ডসাম তরুণ তোমার সামনে জীবন্ত দাঁড়িয়ে আছে, তাকে হিরো না বানিয়ে তুমি ভাসুরকে হিরো বানিয়ে দিচ্ছেন? এ তো মহা অন্যায়! সমাজ এটা মেনে নেবে না, আর না মেনে নেবে আমার পাঠক-পাঠিকারা! কি নিন্মবিত্ত চিন্তাভাবনা!
রুশা এক হাত দিয়ে অধীরকে ঠেলে সরিয়ে নাক সিটকাল–
“ধুর! এই সরুন তো এখান থেকে! আপনার ভাই হওয়ার অনেক আগে থেকেই উনি আমার ক্রাশ, আমার হিরো, আমার একমাত্র ড্রীম বয়!

“ ড্রীম বয়??
অধীরের চোখ দুটো প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম! শার্টের কলারটা একটু টেনে ধরে সে বলল–
“ তাহলে আমি কী? আমি কি রাস্তার পাশের ট্রাফিক পুলিশ? যে সাইডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু গাড়ি যাওয়া-আসা দেখব?
“ আপনি হলেন কাঁচা আম!”
রুশা জিভ কেটে ভেংচি কাটল–
“একদম টক আর কাঁচা! চিবোলেই দাঁত টকে যায়। আর নাভান ভাইয়া হলো ডার্ক চকলেট… একদম রয়েল!
অধীরের হিংসার পারদ এবার থার্মোমিটার ফাটিয়ে চূড়ায় উঠে গেল। সে হিংসায় লাল হয়ে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করতে লাগল। তারপর হঠাৎ থেমে, চুলে হাত বুলে এক দেবদাস-টাইপ স্টাইল মেরে বলল–
“ আচ্ছা, একটা লজিক্যাল কথার উত্তর দাও তো, ম্যাডাম লাল গোলাপি! ওই নাভান ভাইয়ের চকলেটি ভাবটা কোথায় দেখছ তুমি? চোখ দুটো কি রিফ্লেক্টর চশমা দিয়ে ঢেকে রেখেছ? ওনার চেহারায় তো কেবল চণ্ডী রূপ! আর আমার দিকে দেখো… এই চোখ, এই চুল, এই অ্যাটিটিউড—আমার মধ্যে কি তুমি কোনো ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি বা বাটারস্কচ ফ্লেভারও দেখতে পাচ্ছ না? অন্তত একটা বাটারস্কচ?
রুশা একমুহূর্ত অধীরের দিকে আপাদমস্তক তাকাল। যেন মহাকাশ থেকে আসা কোনো অদ্ভুত প্রাণীকে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করছে! তারপর অত্যন্ত করুণার ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

“ফ্লেভারের কথা বলছেন? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে চকলেট চাটতে গিয়ে মে
“ কীইইই!”
অধীর বুকে হাত দিয়ে এমনভাবে তিন কদম পিছিয়ে গেল, যেন ওপরে সোজাসুজি বাজ পড়েছে!
“ আমাকে মাছি? আমাকে চকলেটে পড়া ল্যাংড়া মাছি বললে? ওগো দয়াল, আমাকে তুলে নাও! নয়তো এই ভাসুর-ভক্ত মহিলাকে একটু সদবুদ্ধি দাও! এই কিউট এতিমের দিকে মুখ তুলে তাকাও। নিজের ভাই আমার প্রেমে কি সাংঘাতিক ব্যাঘাত দিচ্ছে। এমন সুন্দর হ্যান্ডসাম ভাই যাতে কারো না হয় খোদা! আমিন!
রুশা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আবার টিভির দিকে ঘুরে বসে বলল–
“বেশি নাটক করবেন না তো! ওই দেখুন, স্ক্রিনে চকলেট হিরো একটু হাসলেন! উফ, কী যে হ্যান্ডসাম! আমার তো মনে হচ্ছে আমি টিভিতে গিয়ে ঢুকে পড়ি!
অধীর টিভির দিকে তাকাল। নাভান স্ক্রিনে খুব হালকা একটা কুটিল হাসি হেসেছে। অধীর ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে উঠল–

“ হ্যান্ডসাম না ছাই! নির্ঘাত বাঁপাশের দাঁতে পোকা ধরেছে, তাই মুখ বাঁকিয়ে ব্যথা সামলাচ্ছে। আর এই মহিলা ভাসুরের পোকা খাওয়া হাসিতেই ফিদা! কাল থেকে আমিও রোদে মুখ কালচে করে পোড়া বেগুন হয়ে এসে দাঁড়াব, দেখি চকলেট হিরো কাকে বলে!
রুশা এবার গজগজ করতে করতে পাশ থেকে সোফার বিশাল একটা কুশন তুলে নিল–
“কী বললেন? আপনি আমার আইডলকে পোকা খাওয়া দাঁত বললেন? আপনার এত সাহস?
অধীর অমনি সোফার পেছনে লুকিয়ে পড়ে মাথাটা একটু বের করে বলল—
“সত্যি কথাই তো বললাম! ভাসুরের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে একটু নিজের হবু বরের দিকে তাকাও , লাল গোলাপি! এই যে একখানা কোহিনূর হীরা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে রোজ ফাও ডায়লগ দিচ্ছে, এর তো কোনো মূল্যই দিলেন না!”

“কোহিনূর হীরা না আপনার মাথা!”
রুশা কুশনটা ঘুরিয়ে সজোরে অধীরের দিকে ছুড়ে মারল।
অধীর ‘ওমা’ বলে হাঁসের মতো মাথা নিচু করতেই কুশনটা গিয়ে পড়ল দেয়ালের দামি পেইন্টিংয়ের ওপর।
“বাপরে বাপ! মহিলা তো দেখছি সাক্ষাৎ লেডি সিংহী! ভাসুরের নামে একটা সত্যি কথা বলতেই একদম সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ছুড়ে মারল!”
অধীর সোফার পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল।
“ মিসাইল তো সামান্য! আপনি আর একটা বাজে কথা বললে আমি ওই কোণার ফ্লাওয়ার ভাসটা আপনার মাথায় ছুড়ে ভাঙব! সাইড হন, আমাকে শান্তিতে লাইভ দেখতে দিন!”
রুশা রিমোটটা হাতে নিয়ে একদম টিভির কাছাকাছি গিয়ে বসল।
অধীর সোফার পেছন থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসল। হিংসায় তার মুখটা তখন হাঁড়ির মতো কালো। সে চুপিচুপি গিয়ে রুশার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে কানের কাছে বিকট শব্দে চেঁচিয়ে উঠল—
“ওই দেখ! ওই দেখ! থাপ্পড় মারবে! তোমার চকলেট হিরো এখন হিরোইনকে থাপ্পড় মারতে হাত তুলবে! হা হা হা!”

রুশা লাফিয়ে উঠে কান চেপে ধরল–
“ আরে ধুর! কোথায় থাপ্পড়? ওটা তো রোমান্টিক ভঙ্গিতে চুল সরিয়ে দেওয়ার পোজ!
“ কিসের চুল সরানো? দেখো তো ভালো করে লাল গোলাপি!
অধীর প্রায় নাচতে নাচতে বলল-
“ চুল সরানোর নামে ফাইভ-ফিঙ্গার থাপ্পড় দেবে এখন! দেখতে থাকো, ভাসুরের রোমান্স দেখতে গিয়ে এখন কেমন ছ্যাঁকা খাও! ইস, আমার কী আফসোস হচ্ছে! ওই বেটাকে দেখা ছেড়ে দাও লাল গোলাপি, আমায় দেখো! আমি কখনো ছ্যাঁকা দেব না, অলটাইম রোমান্স দেখাব!”তাও লাইভ টেলিকাস্ট! আমার লাল গোলাপি!
“ আপনি থামবেন? নাকি আমি সত্যি সত্যি রিমোটটা আপনার কপালে বসিয়ে দেব?”
রুশা রিমোট উঁচিয়ে ধরল।

“ মারো ! মেরেই ফেলো আমাকে!”
অধীর বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল—
“ আমি মরে গেলে অন্তত এই অপবাদ নিয়ে বাঁচতে হবে না যে, আমার হবু বউ আমার চেয়ে আমার বড় ভাইকে বেশি হ্যান্ডসাম মনে করে! ক্রাস খায় হিরো বলে। আমায় সামনে লাইভ রেখে ওই টিভির লাইভ দেখছে! ওগো বিধাতা, এই কালপ্রিট ভাসুর-ভক্তকে তুমি ক্ষমা করো!”
“ আপনি একটা মহা হিংসেকুটে! কাঁচা আমের আঠা!”
“ আর আপনি হলেন ভাসুর-প্রেমী লাল গোলাপি দেবী!”
দুজন দুজনের দিকে চোখ বড় বড় করে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রুশা রিমোটটা শক্ত করে চেপে ধরেছে, আর অধীর সোফার ওপরের অন্য কুশনটা ঢাল বানানোর জন্য টেনে নিয়েছে।
ঠিক তখনই—ঠাস !
টিভির স্ক্রিনে সশব্দে একটা থাপ্পড় এর শব্দ হলো হেরার গালে বসিয়ে দিল নাভান! রুশা গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল টিভির দিকে। তার সদ্য ক্রাশ খাওয়া ভিলেন-হিরো দুলাভাই একি কাণ্ড ঘটিয়ে বসল! লুকটা তো দারুণ ছিল, কিন্তু কাজটা কী করল! ড্রয়িংরুমের সবাই হা হয়ে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে।
রুশা হতভম্ব হয়ে অধীরের দিকে তাকিয়ে হাতে থাকা কুশনটা ছুড়ে মারল। অধীর কুশনসহ ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ে হেসেই খুন!
অধীরকে ওভাবে হাসতে দেখে রুশা মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল–

“ আপনি নিশ্চয়ই কু-দোয়া করেছিলেন, তাই এমন হয়েছে! আমার হিরোর লুকের সাথে এই থাপ্পড় মোটেই যায় না! সব আপনার অলক্ষুণে দোয়ার ফল। আপনি যা বলবেন তাই হয়! এক কাজ করবেন, ফুটবল খেলার সময় আপনি আর্জেন্টিনার সাপোর্ট করবেন, আর বলবেন জয় যেন আর্জেন্টিনারই হয়!”
অধীর ফ্লোরে শুয়েই হাত দুই উঁচিয়ে বলল—
” হেই লাল গোলাপি, তুমি না বললেও আমি সেই দোয়াই করব! বিকজ আর্জেন্টিনা ইজ মাই ফেভারিট টিম!”
তাদের এই নন-স্টপ বকবকানিতে ড্রয়িংরুমের সবার ধৈর্য তখন শেষের পথে। ঝিনুক এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে রেগেমেগে চিৎকার করে উঠল,
“এই, থামবি তোরা? মারামারি বন্ধ করবি? ওদিকে ৪টা থাপ্পড় খেয়ে বেচারির অবস্থা কাহিল, আর তোরা দুজন তাই নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছিস!”
ঝিনুকের ধমক খেয়ে অধীর ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রহস্যের হাসি হেসে বলে উঠল,
“ আহা, নো চিন্তা! উপরে দিয়ে একটু শাসন করতেই হয়, ভেতরে গিয়ে ঠিকই আদর করে পুষিয়ে দেবে! কিন্তু আফসোস… সেই দৃশ্য দেখার ভাগ্য তো আর আমাদের এই সিসিটিভি ফুটেজে হবে না!
” আপনার সাথে আমার কথা বলা বন্ধ লাইভ টেলিকাস্ট।
” এই না না কি বলো, লাল গোলাপি দরকার হয় বলো একদিন টয়লেটে না যেতে চেপে চুপে কন্ট্রোল করতে পারবো কিন্তু কথা বলা ছাড়া থাকতে পারবে না এই কিউট অধীর।

হেরার চোখ থেকে তখন টপটপ করে পানি ঝরছিল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে, যেন সেখানে এখনও সেই অনাকাঙ্ক্ষিত থাপ্পড়ের দাগ লেগে আছে। অন্য সময় হলে সে নিশ্চয়ই আগুন হয়ে যেত, তর্কে তর্কে পুরো বাড়ি মাথায় তুলত। কিন্তু আজ কেন যেন নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছিল না। বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত আর অচেনা অনুভূতিগুলো তাকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। তবুও নাভান যেন তার এই দুর্বলতা বিন্দুমাত্র বুঝতে না পারে, সেই চেষ্টায় রাগী ও কাঁপানো গলায় বলে উঠল—
” কী হলো? আপনি এখানে এসেছেন কেন? আবার অধিকার ফলাতে?”
নাভান কোনো উত্তর দিল না। হেরার চোখের কোণে জমে থাকা ওই একফোঁটা জল দেখেই যেন তার ভেতরের সমস্ত কঠোরতা আর আভিজাত্যের দম্ভ কোথাও হারিয়ে গেল। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও রাগে অন্ধ হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, সে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে একবার শুধু হেরার দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল না কোনো অহংকার, ছিল না কোনো জেদ; বরং ছিল এক অদ্ভুত, গভীর অপরাধবোধ।
তারপর কোনো কথা না বলে সে হেরাকে পাশ কাটিয়ে সোজা তার রুমে ঢুকে গেল।
হেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। লোকটার চলাফেরা আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল, এই রুমটা তার বহু বছরের চেনা। যেন ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি জিনিসের সাথে তার এক গোপন ও গভীর পরিচয় আছে। রুমে গিয়ে সোজা লাগেজ খুলে একটা তোয়ালে বের করল নাভান, তারপর দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে ভেজিয়ে দিল দরজা। হেরা বোকার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

” এ কেমন মানুষ রে বাবা? কিছুক্ষণ আগেও যে লোকটা সপাটে চার-চারটে থাপ্পড় বসিয়ে দিল, সে-ই এখন এক নিমেষে কেমন বদলে গেল? আমার চোখের জল দেখেই কি এই অসভ্য গিটারওয়ালার সমস্ত রাগ গলে পানি হয়ে গেল? ওর ঢং দেখে সত্যি গা- পিত্তি জ্বলে যায়! এত বড় অ্যাক্টিংবাজ পুরুষ আমি জীবনে দেখিনি। আগে থেকে বোঝা উচিত ছিলো , সেই অহংকারী ‘জী-ম্যান’-এর তড়পানো রাগটা এই অসভ্য গিটারওয়ালা হিরোর মধ্যে দেখি কেন? আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল—জী-ম্যান আর এই গিটারওয়ালা আসলে একই লোক!
দূর ছাই! লোকটার সাহস তো কম নয়, আমার গালে ব্লাশন স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে কেমন ধীরপায়ে ডেং ডেং করে আমারই ওয়াশরুমে ঢুকে গেল!
হেরা রে, তুই কত বোকা! তোর চোখের সামনে ওই জী-ম্যান যে অসভ্য গিটারওয়ালার রোল-প্লে করে গেল, তুই কিনা বিন্দুমাত্র ধরতে পারলি না? আবার নিজেকে চালাক ভাবা হয়! নিজের ভালোবাসাকে চিনতে না পারার অপরাধে তোর নামে তো আস্ত একটা মামলা ঠুকে দেওয়া উচিত!
আরে দূর, আমি কেন মামলা খাব? যত নষ্টের গোড়া তো এই অসভ্য গিটারওয়ালা। মামলা খেলে তো ওই বেটাই খাবে। যা নাটক করতে পারে, সত্যি বলছি—সিনেমা বা নাটকের নায়ক হলেও পারত, কেউ ওর এই আসল রূপটা ধরতে পারত না!

কিন্তু চান্দু, তোমার এই লুকুচুরি খেলা আমি ফাঁস করেই ছাড়ব। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!
ওয়াশরুমের ভেতর দাঁড়িয়ে নাভান শাওয়ার অন করল। বরফশীতল পানি মাথা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল তার শরীরে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের আগুন নিভছিল না। চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পাচ্ছিল হেরার কাঁপতে থাকা মুখ, ভেজা চোখ আর ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর সেই ব্যর্থ চেষ্টা।
হঠাৎ এক তীব্র রাগে আর আত্মগ্লানিতে সে পান্স বসাল টেপে। টেপের মুখ খুলে মুহূর্তে পানির ছিটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রডের ঘর্ষণে নাভানের হাতের চামড়া ছিলে গিয়ে টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল পানির সাথে। চিকন লাল স্রোতে সেই রক্ত মিশে তলিয়ে যাচ্ছিল। নিজের ওপরই চরম রাগ হচ্ছিল তার। সবসময় এমনই হয়!

হেরাকে আঘাত করলে সেই ব্যথা শেষ পর্যন্ত ঘুরে এসে তার নিজের শরীরেই রক্তক্ষরণ ঘটায়। হেরার গালে লাল দাগ পড়লেও ভেতরে ভেতরে তছনছ হয়ে যায় সে নিজেই। কিন্তু সেই নির্মম সত্যটা কেউ জানে না, আর সেও কাউকে বুঝতে দেয় না—বিশেষ করে হেরাকে তো নয়ই।
অনেকক্ষণ পর যখন নিজেকে কিছুটা সামলাতে পারল, তখন শাওয়ার বন্ধ করল নাভান।
এদিকে হেরা বিছানার এক কোণে বসে বিরক্তিতে ফুঁসছিল। লোকটা এতক্ষণ ধরে ভেতরে করছে কী? তার রুমে ঝড়ের গতিতে এসে তাকে গায়ে হাত তুলে, উপেক্ষা করে, আবার তারই ওয়াশরুমে ঢুকে বসে আছে! হেরা বাইরে অপেক্ষা করছিল আর মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছিল। নাভান বের হলেই আবার ঝগড়া শুরু করবে, আজ তাকে চরম কটু কথা না শুনিয়ে ছাড়বে না।
অবশেষে ওয়াশরুমের দরজা খুলল। হেরা মাথা তুলে তাকাতেই থমকে গেল।
নাভান কোমরে শুধু একটা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে। ভেজা চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে তার চওড়া, প্রশস্ত কাঁধে। সেখান থেকে ফোঁটাগুলো গড়িয়ে নামছে তার সুগঠিত বুকের ভাঁজে। মুখে আগের সেই হিংস্র কঠোরতা নেই, বরং লেগে আছে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর শান্ত কাঠিন্য। হেরা তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল।

কেন যেন বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিকভাবে ধকধক করে উঠল তার। নিজের অকারণ অস্বস্তি লুকাতে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শক্ত গলায় বলল—
“আপনার মতো অসভ্য আর নির্লজ্জ লোক আমি জীবনে দুটো দেখিনি!”
নাভান এক জোড়া ঘন ভ্রু তুলে তাকাল।
“কেন? আমি আবার কী করলাম?”
হেরা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, আর একটা কথা বাড়ালেই লোকটা হয়তো তার স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসিতে কোনো উল্টো উত্তর দেবে। আর সেই উত্তর শুনলে তার নিজেরই অস্বস্তি হাজার গুণ বেড়ে যাবে।
রুমের ভেতর এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। বাইরে পাহাড়ি দুপুর গড়িয়ে বিকেলের নরম আলো পরছিল রুমের জানালা দিয়ে। বাইরের সব ঠিক থাকলেও এই ছোট্ট ঘরের ভেতর আরও গভীর কিছু জন্ম নিচ্ছিল। অভিমান, রাগ, অস্বীকার—সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত অনুভূতি।
নাভান চুপচাপ হেরার দিকে তাকিয়ে রইল। আর হেরা? সে মুখ ফিরিয়ে থাকলেও বুঝতে পারছিল, সেই দৃষ্টি এখনও তার ওপরই স্থির। কেন যেন আজ সেই দৃষ্টিটা আর আগের মতো বিরক্তিকর লাগছিল না। বরং অজান্তেই তার হৃদয়ের দেয়ালে ছোট্ট একটা কম্পন তুলে দিচ্ছিল। এমন এক কম্পন, যার নাম সে এখনও জানে না… কিংবা হয়তো জানে, শুধু স্বীকার করতে চায় না তাকে না বলার কারনে। তাকে দু টানায় ফেলার জন্য।
হেরা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল—

“কী ব্যাপার? এত নাটক করছেন কেন? কোথায় আপনার সেই দম্ভ? কোথায় আপনার টাকা-পয়সার গরম? নিজের দেশ ছেড়ে আমার দেশে এসেছেন কেন?” আর আপনার ওই ন্যাকা রানী কোথায়। কেনো এসেছেন?
নাভান বুকের ওপর হাত রেখে গম্ভীর কিন্তু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“আমার অক্সিজেন লাগবে, তাই এসেছি।”
” কী?”
” হ্যাঁ। ডাক্তার বলেছে, আমার বাঁচার জন্য বিশেষ ধরনের অক্সিজেন দরকার। পুরো পৃথিবী খুঁজে দেখলাম, একমাত্র তোমার কাছেই সেই অক্সিজেন মজুত আছে। গ্যাস সিলিন্ডারে গ্যাস একবার ভরলে যেমন অনেকক্ষণ চলে, তেমনি তোমার কাছ থেকে একটু অক্সিজেন নিতে পারলে আমি অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা টিকে থাকব।”
নাভানের নির্লজ্জ কথা শুনে হেরার রাগে গাল লাল হয়ে উঠল। সে কটমট চোখে তাকিয়ে বলল—
” তাহলে তো হাসপাতালের পাশে না গিয়ে সামনেই একটা মুরগির ফার্ম আছে, সেখানে যান! যত অক্সিজেন লাগে নিয়ে নিন! আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।”
হেরা নাভানের হাত ধরে সরাতে চায়, কিন্তু নাভান এক চুলো নড়ে না। হেরা দাঁত চেপে আবার বলল—
“দেখুন, আপনি এখান থেকে যান, আমি শেষবারের মতো বলছি। আপনার কিন্তু খুব খারাপ কিছু হয়ে যাবে।
হেরার হাতের সেই অবাধ্য চেপে ধরা স্পর্শের সাথে সাথে নাভানের পুরো শরীরে যেন একটা প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক তরঙ্গ বয়ে গেল।

এই মেয়েটার স্পর্শ বিপজ্জনকভাবে বাজে… অসম্ভব বাজে!
যেভাবে নিজের তুলতুলে নরম দুটি হাত দিয়ে নাভানের টানটান হয়ে ওঠা, ফুলে-ফেঁপে ওঠা শিরাগুলোর ওপর চেপে বসে আছে, তা নাভানকে উন্মত্ততার শেষ সীমানায় নিয়ে যায়। অসভ্য মেয়েটার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই—তার এই আপাত-নির্দোষ অথচ মারাত্মক ছোঁয়ায় নাভানের শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় রক্ত কোন প্রলয়ঙ্করি বেগে ছুটতে শুরু করে! ধমনীগুলো যেন ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। প্রতিটি কোষে এক এক বুনো আর গাঢ় উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়ে দেয় এই অবাধ্য স্পর্শ।
নাভান হেরার কব্জিটা শক্ত করে ধরে এক হেঁচকায় তাকে নিজের বুকের সাথে পিষে ফেলল। হেরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাভানের ভেজা শরীরের মাতাল করা সুবাস আর গড়িয়ে পড়া জলবিন্দুগুলো হেরার জামা ভেদ করে ত্বকে গিয়ে কামড় বসাল।
নাভান কোনো সুযোগ দিল না। সে হেরার গলায় নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল, যেন দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত কোনো এক দানব আজ তার শিকার খুঁজে পেয়েছে। গভীর, তীব্র এক একটা দীর্ঘশ্বাসে হেরা শিউরে উঠছিল বারবার। নাভানের তীক্ষ্ণ নাক আর ভেজা ঠোঁট ঘাড় আর গলার স্পর্শকাতর ভাঁজে অনবরত ঘষে যেতে লাগল। হেরার ভেতরের সমস্ত প্রতিবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে গেল; মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাওয়া অবশ করা অনুভূতির চোরা স্রোতে তার দুই পা যেন পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো অবশ হয়ে আসছিল। কিছুক্ষণ আগের প্রাগৈতিহাসিক বকবকানি, ক্ষোভ—সব হুট করে স্তব্ধ হয়ে গেল সেই মায়াবী আতঙ্কে।
পায়ের শক্তি পুরোপুরি হারিয়ে হেরা যখন হাঁটু গেড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই অসীম নিষ্ঠুরতায় নাভান তাকে ছেড়ে দিল।

কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে, কোনো শব্দ না করে সে তার ভেজা শরীর থেকে আলগা করে ছুড়ে ফেলল টাওয়াল । শার্ট নিয়ে পরতে লাগলো । মোদ্দা কথা সে রেডি হচ্ছে।
হেরা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। তার বুকের ভেতরের রাগটা ফুঁসে উঠতে চাইছে, কিন্তু এই পিশাচপুরুষটা তাকে কোনো স্পেস দিচ্ছে না। এই লোকটার বিষাক্ত, মাতাল করা ছোঁয়া হুটহাট তাকে পঙ্গু করে দেয়, সমস্ত চেতনা স্তব্ধ করে দেয়।
হঠাৎই আধো-আলোর মাঝে নাভান আবার হেরার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখে কেবল তৃষ্ণা নয়, ছিল এক গভীর, ভয়ঙ্কর অধিকারবোধ আর প্রচ্ছন্ন রাগ। হেরার চোখের মণি স্থির হয়ে এলে, নাভান নিচু ঝংকারে, অন্ধকারের সাথে মিশিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—
” There is no law in this world, no curse strong enough to tear me away from you. I am not a story in your life; I am the silence within your breath—the one you will only feel when it stops, and then you will know I was there.” (এই দুনিয়ার কোনো আইন, কোনো অভিশাপ নেই আমাকে তোর থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। আমি তোর জীবনের গল্প না, আমি তোর শ্বাসের ভেতরের নীরবতা—যেটা থামলে তুই টের পাবি আমি ছিলাম।)
কথাগুলো বলেই প্রচ্ছন্ন রাগ প্রকাশ পেলেও পরক্ষণেই হেরার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে নিজের গুণগুণ সুরে গেয়ে উঠল—

Saat samundar paar main tere
Peechhe peechhe a gaya
Main tere peechhe peechhe a gaya
Zulmi teri jaan
O Zulmi teri jaan tere
Kadamon ke neeche a gaya
Saat samundar paar main tere
Peechhe peechhe a gaya
গানের সুরটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল নাভানের পুরো চেহারা!
এক ঝটকায় হেরার কবজি শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল সে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মানুষটা সুর তুলে গান গাইছিল—সেই মানুষটার মুখে এখন একফোঁটা রসিকতার ছাপও নেই!
চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো এক হিংস্র রাগে জ্বলছে। শার্টের বোতামের ফাক দিয়ে হিমশীতল ঠান্ডা বুকের স্পর্শ লাগলো হেরার কোমল দেহে। নাভান ফিসফিসিয়ে বললো —

” What do you think, মিসাইল গার্ল ? তোর সাথে আমার এমন কোনো relation না, যে ইচ্ছা হলো মজা করলাম, ইয়ার্কি করলাম, তারপর ভুলে গেলাম! Don’t push your luck.!
হেরা কিছু বলার আগেই তার কব্জির ওপর নাভানের আঙুলের চাপ আরও গভীর ও কড়া হয়ে উঠল।
” আমার জিনিসে কেউ হাত দিলে আমি সহ্য করি না। আর তুই…?”
সে এক মুহূর্ত থামল। তারপর হেরার ভীতিপ্রদ চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে অন্ধকার হিমশীতল সুরে বলল—
” তোর নামের সাথে আমার নাম জড়িয়ে গেছে বহু আগে। এটা কোনো খেলা না। এটা আমার obsession… আমার weakness… আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার একান্ত ব্যাক্তিগত অধিকার!
হেরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নাভান তার মুখোমুখি হয়ে আবার বলল—
” একদিন যদি দেখি আমার এই অধিকারটায় কেউ নড়চড় করছে, বিশ্বাস কর, I can destroy everything. আমি মানুষ ভালো , কিন্তু সীমার বাইরে গেলে কী করতে পারি সেটা আমিও জানি না!”

কথাগুলো শুনে হেরার বুক কেঁপে উঠল।
হেরার মাথার ভেতর সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। নেপালে হঠাৎ তার সামনে আবির্ভাব হওয়া, তার সম্পর্কে অবিশ্বাস্য সব তথ্য জানা, কখনো ক্ষণিকের জন্য নরম হওয়া, আবার পরের মুহূর্তেই ডার্ক অবতারে বিস্ফোরিত হওয়া—সবকিছু যেন একটা জটিল ধাঁধা। আর সেই ধাঁধার নাম নাভান।
হেরা মনে মনে দোয়া পড়ে নিজেকে শক্ত করল। সমস্ত ঘৃণা আর তেজ এক ছটফটে গলায় ঢেলে কঠিন ভাষায় বলে উঠল —
” মি. শেহতাজ খান নাভান! আমাকে কি নির্জীব কোনো মমির পুতুল মনে হয় আপনার? ভুল ভাবছেন—আমি রক্তমাংসের স্বাধীন একজন মানুষ! গায়ের জোর দেখিয়ে আর যাই হোক, সব কিছু আদায় করা যায় না। এই বিয়ে আমি কোনোদিন মন থেকে মানিনি, আর মানবও না! আমি কোথায় যাব, কার সঙ্গে মিশব—তার কোনো জবাবদিহি আমি আপনাকে করতে বাধ্য নই! তাই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার এই ব্যর্থ চেষ্টা বন্ধ করুন। আমাকে বাধ্য করবেন না; সীমা অতিক্রম করলে এই তথাকথিত বিয়ের পরিণতি হবে শুধুই ডিভোর্স! ভালোবাসাহীন কোনো ছায়াবাজি সম্পর্ক হতে পারে না, আর এমন কিছু আমি মেনে নিবো না । আমি যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক এবং সচেতন একজন নারী, তাই আপনার মতো মানুষকে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে পুরোপুরি অসম্ভব। সো, লিভ! আমার জীবন থেকে এখনই সরে দাঁড়ান!”

হেরার মুখ থেকে “ডিভোর্স” শব্দটা বের হওয়া মাত্রই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ভারী হয়ে জমাট বেঁধে গেল!
কয়েক সেকেন্ড আগেই যে নাভান স্থির অবস্থায় শান্ত হচ্ছিল, “ডিভোর্স” শব্দটা তার ভেতরের সুপ্ত শয়তানটাকে পুরোপুরি জাগিয়ে তুলল। তার চেহারার দৃশ্যপট এক পলকে পাল্টে গেল—সেখানে ফুটে উঠল এক অন্ধকার, হিংস্র আর ক্রূর ডার্ক রূপ!
নাভান কোনো চিৎকার করল না। বরঞ্চ তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, পৈশাচিক হাসি।
“Divorce…?”
শব্দটা তার মুখ থেকে যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। সে ধীর কিন্তু শিকারি চিতাবাঘের মতো পায়ে হেরার দিকে এগোতে লাগল। শাওয়ারের পরা ভেজা শরীর মুহুর্তে গরম উষ্ণতায় ছেয়ে গেলো।
হেরা এক পা পিছাতে চাইল, কিন্তু তার আগেই নাভান এক ঝটকায় তার দুই কবজি মুঠোয় নিয়ে তাকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করাল!

“You think you can divorce me, মিসাইল গার্ল ?”
নাভানের শিতল বুক হেরার কোমল শরীরের সাথে পুরোপুরি লেপ্টে গেল। দুটো শক্ত হাত দেয়ালে চাপ দিয়ে সে হেরাকে নিজের দেহের খাঁচায় পরম নিষ্ঠুরতায় বন্দি করে ফেলল।
হেরার ঠান্ডা পিঠ দেয়ালে আর সামনে নাভানের উত্তপ্ত, কামাতুর ও হিংস্র শরীর। নাভানের বরফশীতল শরীর , কড়া পারফিউম আর ভেজা ত্বকের অদ্ভুত পুরুষালি ঘ্রাণ হেরার পঞ্চেন্দ্রিয়কে মুহূর্তেই অচল করে দিল।
“তুই ভাবিস তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?”
নাভান একদম হেরার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল। তার তপ্ত, ভারী শ্বাস হেরার ঘাড়ে আর কানের লতিতে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছিল।

“Don’t test my fucking patience! তুই নেপালে পালিয়ে এসে ভেবেছিলি আমার হাত থেকে বেঁচে যাবি? তোকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে কী শাস্তি দেব, ধারণা আছে তোর?”
হেরা কাঁপা চোখে নাভানের রাগান্বিত চোখের দিকে তাকাল। নাভান হেরার থুতনিটা এত শক্ত করে চেপে ধরল যে হেরার মুখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। নাভান দাঁতে দাঁত চেপে বিষাক্ত গলায় বলল—
“নেপাল থেকে তোকে সোজা বাংলাদেশে নিয়ে যাব। আর সেখানে গিয়ে এমন এক ঘরে তোকে বন্দি করে রাখব, যেখানে তুই ছাড়া আর কেউ থাকবে না। তোর এই ‘ডিভোর্স’ আর ‘মুক্তির’ ভূত কীভাবে মাথা থেকে নামাতে হয়, তা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। এমন ব্যবস্থা করব যেন পুরো দুনিয়া ঘুরে এলেও তুই আর কোনোদিন অন্য কোনো পুরুষের দিকে তাকানো তো দূরের কথা, মুখ ফুটে ‘ডিভোর্স’ শব্দটাও উচ্চারণ করতে না পারিস! তোর এই রক্তমাংসের শরীর, তোর এই স্বাধীন জীবন—সবকিছুর ওপর শিকল পরাব আমি। তোকে এমনভাবে আমার বুকে পিষে রাখব যে শ্বাস নেওয়ার জন্য তোকে আমার কাছেই ভিক্ষা চাইতে হবে!”
“ছ-ছাড়ুন আমাকে! আপনি একটা আস্ত শয়তান!” হেরা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল।
“শয়তান?” নাভান পৈশাচিক হাসল। সে হেরার পিঠের জামার চেইন এক টানে খুলে কুচকুচে কালো তিলটায় নরম চামড়ায় নিজের ভেজা মুখটা ডুবিয়ে দিল এবং কোনো দয়া না দেখিয়ে গভীর এক কামড় বসাল!
“আহ্!” হেরা ব্যথায় আর এক অচেনা, তীব্র কামনার অনুভূতির ধাক্কায় চোখ বন্ধ করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল নাভানের পেশিবহুল শক্তপোক্ত হাত।

রুমের ভেতরের এই উত্তপ্ত আবেশ দুটো আত্মাকে যেন আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল। নাভান যেনো সব আজ প্রকাশ করে দিচ্ছে। কিন্তু ভালোবাসি শব্দ না বলে। হেরা এবার একটু ভয় পায়। এতো টা রাগিয়ে দেয়া উচিত হয় নি। সেতো জানে এই লোক এর রাগ কেমন।
নাভান হেরার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের শার্ট এর বোতাম খুলা নগ্ন বুকের বা পাশে, যেখানে হৃদপিণ্ডটা পাগলের মতো আছাড় খাচ্ছিল, সেখানে শক্ত করে চেপে ধরল।
“গালে থাপ্পড় খেয়ে কাঁদছিলি না? একবার এখানে হাত দিয়ে দেখ! You drive me fucking crazy! তোকে আঘাত করার পর এখানে কীভাবে রক্তক্ষরণ হয়, তুই তার একবিন্দুও বুঝবি না! তোকে ছেড়ে একা থাকাটা আমার জন্য প্রতি সেকেন্ডে মরণযন্ত্রণা! আর তুই আমাকে ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিস?”
কিন্তু না প্রথমে কিছুটা জোরে বললেও পরে আর বলতে পারে না নাভান মনে মনে বেক্ত করে কথা। চোখ দিয়ে যেনো হেরাকে অনেক কিছু বুঝাতে চায়। অভিমানি হেরা এমনি অভিমান করেছে আবার এখন নাভান এমন করছে। নাভান তো জানে না তার পিচ্চি বউ টা সব ঘেটে ঘুটে জেনে ফেলেছে।
নাভান এক হাত দিয়ে হেরার চুল শক্ত করে ধরে তার মুখটা নিজের ঠোঁটের এক মিলিমিটার দূরত্বে এনে থামাল। নাভানের তপ্ত শ্বাস হেরার ভেজা ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল।

“Say it again, অক্সিজেন … Say ‘divorce’ one more time, and I swear to God, বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার আগেই আজ রাতে তোকে পুরোপুরি নিজের করে নেব, যেন কাল সকালে উঠে তুই আর নিজের অস্তিত্ব খুঁজে না পাস!”

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (২)

বাইরে তখন পাহাড়ি রাত নেমে এসেছে। হিমেল বাতাস আর কুয়াশা জানালার ফাঁক দিয়ে তাদের ভেজা উত্তপ্ত শরীরগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছিল। আর সেই নির্জন ঘরে, দুটো উন্মাদ আত্মা এক অপরকে অস্বীকার করার চরম লড়াইয়ে হেরে গিয়ে এক গভীর, ডার্ক আর উত্তপ্ত কামনার আবেশে তলিয়ে যাচ্ছিল… যেখানে পালানোর আর কোনো পথ বাকি রইল না!

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২