Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২
রোজ ও রুশা

রাতের নিস্তব্ধতা ফালাফালা করে দিয়ে জাওয়াদ খানের হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। আলোর তীব্রতা নয়, বরং স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটা মাত্র বাক্য জাওয়াদ খানের বুকের ভেতরের অলিন্দ-নিলয় একলহমায় তছনছ করে দিল—
“মেয়ের বাসর ঘর রেডি করুন।”
মেসেজটার ওপর চোখ পড়তেই জাওয়াদ খানের মুখের রক্ত চটজলদি উধাও হয়ে গেল। ধমনীতে রক্ত চলাচল যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
যে ছেলেটা একদিন তাঁর আঙুল ধরে কাদা-মাটির পথ ধরে হাঁটতে শিখেছিল, আজ সেই ছেলের নামটা মনে আসতেই বাবার বুক কেঁপে উঠছে! সে কাঁপন কোনো ক্ষোভের নয়, বরং রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম আতঙ্কের। ছেলেটার ঐ নির্মম, ঠোঁটকাটা স্বভাব আর উদ্ধত আচরণের সামনে জাওয়াদ খানের সারা জীবনের অর্জিত মান-সম্মান আজ কাঁচের গ্লাসের মতো চুরমার হওয়ার মুখোমুখি।
তিনি খুব ভালো করেই জানেন—নাভান কোনো ফাঁকা হুমকি দেয় না। নাভান যা বলে, তা অন্ধকার নামার আগেই বাস্তব করে ছাড়ে।
হেরাকে নিয়ে ছেলেটার ভেতরের যে তীব্র, বিষাক্ত আর লাগামহীন উন্মাদনা—সেটা তো আর কেউ না জানুক তিনি জানে। তাই এই কালরাতে আর কোনো ঝুঁকি নেওয়ার স্পর্ধা জাওয়াদ খানের হলো না।
এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন নিজের স্ত্রী—প্রভাবশালী অ্যাডভোকেট এম. এল. এ. কাজল খানের সামনে। জাওয়াদ খানের কণ্ঠে কাঁপা কাঁপা অভিনয়—–

” আমার শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে, কাজল রেখা । মাথার ভেতর কেমন যেন ঘুলিয়ে উঠছে। আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ছি। দোহাই তোমার, ভোর হওয়ার আগে যেন কেউ আমাকে না ডাকে। আর তুমিও… তুমিও এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ো।”
রাজনীতি আর আদালতের মারপ্যাঁচ বোঝা কাজল খানের অভিজ্ঞ চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সংকীর্ণ হলো। এই হঠাৎ অসুস্থতার নাটকের পেছনে কোনো কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা লুকিয়ে থাকা রহস্য যে আছে, তা তিনি স্পষ্ট টের পেলেন। কিন্তু কিছু না বলে নীরব সায় দিলেন।
এরপর শুরু হলো জাওয়াদ খানের সেই গোপন আর পলায়ন পর্ব।
বোন এবং বোনজামাই—যাকে তিনি বন্ধু বলে মানেন, সেই জিহান তালুকদারকে হরেক রকমের মনগড়া অজুহাত বুঝিয়ে, মিথ্যার ঘেরাটোপে আটকে আগেই পাঠিয়ে দিলেন নিজ রুমের দিকে। তারপর কাজল রেখাকে অসুস্থতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের পাশে শুইয়ে রাখলেন, যাতে বাড়ির একটা পাখিও সন্দেহ না করতে পারে যে খান পরিবারের কর্তা আজ প্রলয়ের ভয়ে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে বেঁচে থাকতে চাইছে।
তবুও একদম শেষ মুহূর্তে, পালানোর ঠিক আগের ধাপে, ছেলেকে সামলানোর এই অগ্নিকুণ্ড সদৃশ্য দায়িত্বটা তিনি ঠেলে দিলেন অনুগত অধীর আর তার বন্ধুদের কাঁধে। জাওয়াদ খান গলার স্বর যতটা সম্ভব করুণ করে বললেন—–

” বাবারা … এদিকটা তোরা সামলিয়ে নিস রে। আমাদের শরীরটা বড্ড খারাপ…”
কথাটা মুখে প্রকাশ করলেও জাওয়াদ খানের আত্মা ভেতর থেকে তীব্র আতঙ্কে বিড়বিড় করে উঠল—
” হে আল্লাহ, আজকের এই অভিশপ্ত রাতে শুধু ছেলেটার বিষাক্ত নজর যেন আমার ওপর না পড়ে!”
রাত তখন প্রায় একটা।
পুরো প্রাসাদতুল্য বাড়িটা জমানো অন্ধকার আর শ্মশানের মতো নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে।
হঠাৎ, সেই গভীর নীরবতার বুক চিরে আকাশ থেকে নেমে এল এক কর্কশ, যান্ত্রিক গর্জন। খান বাড়ির নিজস্ব হেলিপ্যাড এসে ল্যান্ড করল । তীব্র বাতাস আর ধুলাবালির ঝড়ে চারপাশের গাছপালাগুলো যেন আর্তনাদ করে উঠল।
বিশাল সিংহদুয়ারের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল সেই উড়ন্ত যান। কাঁচের স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল নাভান। চোখেমুখে যেন বয়ে চলেছে এক কালবৈশাখী ঝড়। চিবুকের চোয়াল দুটো এত শক্ত হয়ে জমে আছে, যেন এখনই পাথর গুঁড়ো হয়ে যাবে। তার আস্ত অবয়ব থেকে হিংস্রতা আর আগুনের আঁচ ঠিকরে বেরোচ্ছে। আর তার কাঁধে? সেখানে শৃঙ্খলিত এক বুনো হরিণীর মতো ছটফট করছে হেরা।
মেয়েটা নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করছিল নাভানের জিম্মাদারি থেকে নিজেকে মুক্ত করার, প্রাণপণে লাফিয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যাওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা করেছিল সে।
কিন্তু নাভানের যে বাহু ইস্পাতের চেয়েও কঠিন, তার বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার মতো সাধ্য এই রাজকীয় বন্দিনীর ছিল না। হেরা সামান্য ছিটকে যেতেই, নাভান এক হিংস্র আর রুক্ষ টানে তাকে আবার নিজের চওড়া কাঁধে আছড়ে তুলল।
হেরা যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বন্দী। নাভানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, গাঢ় অন্ধকারের হাসি। ফিসফিস করে যেন এই কালরাতকে জানিয়ে দিল তার অমোঘ রায়—

” আজ পালানোর সব রাস্তা বন্ধ, মাই মিসাইল গার্ল।”
হেরা তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, কীভাবে ঝড়ের গতিতে ঘটনার মোড় বদলে গেল। নেপালে যাকে নানা কথায় শাসিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল নাভান, সে-ই কিনা কোনো কিছু না ভেবেই হেরাকে একরকম জোর করে তুলে নিয়ে এল নিজের প্রাইভেট জেটে! নীল আকাশের সীমানা পেরিয়ে তাদের গন্তব্য এখন—বাংলাদেশ, প্রাইভেট জেটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হেরার চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল। এই প্রাইভেট জেটের পেছনে, এই উগ্র অসভ্য গিটারওয়ালার ভেতরের রাজকীয় প্রতিপত্তির যে রূপ ফুটে উঠছিল, তা হেরার কল্পনারও বাইরে ছিল।

কিন্তু গল্প তো কেবল শুরু। নাভানের যে আর কতো রুপ দেখা বাকি ।
খান বাড়ির বিশাল আলো ঝলমলে ড্রয়িংরুমে তখন এক থমথমে অস্বস্তি। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অধীর, সৃজন, রোজ, রুশা, ঝিনুক আর তুষার। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে তারা, কিন্তু নাভানকে দেখামাত্র সবার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! প্রলয়ংকরী ঝড়ের মতো এমন উন্মাদ, রগে রগে আগুন জ্বলা রাগী নাভানকে তারা বহু কাল দেখেনি। জাওয়াদ খানের কাছ থেকে জানতে পারে নাভান আসছে। সেই থেকে সবাই চিন্তিত মুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
অধীর গলাটা একটু পরিষ্কার করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল— ঠিক তখনই নাভানের শকুনের মতো তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ঘুরে গেল ড্রয়িংরুমের কোণে অবস্থিত তার বাবা-মায়ের বন্ধ ঘরের দিকে।
কাঠের অতিব সুন্দর ভারী দরজা আটকানো। ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ নেই, যেন গভীর শ্মশানের নীরবতা সেখানে বাসা বেঁধেছে। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…

পরমুহূর্তেই নাভানের রক্তিম ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি। জাওয়াদ খান যে কালরাতের ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে অসুস্থতার সস্তা নাটক সাজিয়ে ঘরের খিল তুলেছেন, সেটা বুঝতে নাভানের এক মুহূর্তও সময় লাগল না।
ধীরে ধীরে মাথাটা সামান্য নিচু করল সে। বাবার বন্ধ দরজার দিকে অপলক চেয়ে থেকে একেবারে নিচু, ঠান্ডা ফিসফিসে কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল—
” বাঁচলেন আপাতত, মিস্টার জাওয়াদ খান। তবে রেহাই পাননি… আসল হিসাবটা তোলা রইল, পরে হবে।”
সেই ফিসফিসানি বাক্য যেন আস্ত ঘরের ওপর অমঙ্গলজনক অভিশাপের মতো ঝুলে রইল। পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, মনে হচ্ছিল ঘরের প্রতিটা মানুষ নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ পর্যন্ত থামিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ভয় এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে কেউ জোরে নিঃশ্বাস নিতেও সাহস পাচ্ছিল না।
সেই জমাট বাঁধা নীরবতার বরফ ভাঙল ঝিনুক।
ভয়ে তার বুকের ভেতর ঢোল বাজছিল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও বহু কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে কেঁপে ওঠা গলায় বলল—

“দো… দোস্ত! প্লিজ, এভাবে রাগ করিস না। দরকারেই তো গিয়েছে হেরা, আমরা জানি। আর তোকে না জানিয়ে গেছে এই পুরো ঘটনায় শুধু যে হেরার দোষ আছে, তা কিন্তু না। আমাদেরও হাত ছিল রে। আমরা… আমরা ইচ্ছে করেই তোকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি…”
নাভান ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল।
তার চাহনিতে প্রচ্ছন্ন ছিল এক পৈশাচিক হিংস্রতা আর শীতল আতঙ্ক। সেই চোখের দিকে তাকানো মাত্রই ঝিনুকের বুকের ভেতরের অবশিষ্ট সাহসটুকু মুহূর্তে জল হয়ে গেল। গলার স্বর নিজে থেকেই গুমড়ে আটকে গেল ভেতরে।
নাভান এক পা সামনে এগিয়ে এল। জুতো আর মেঝের ঘর্ষণে এক তীক্ষ্ণ শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। অত্যন্ত শীতল, কিন্তু ধারালো কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল—

“তোদের কী মনে হয়… এই মনগড়া বানোয়াট সত্যিটা বলে তোরা ক্ষমা পেয়ে গেলি? এক হাতে তালি বাজে না। তোদের সাথে যে বাবা ও যুক্ত ছিলো কি মনে করেছিস আমি জানি না।
সবাই যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, নাভানের স্পষ্ট কথায় স্তম্ভিত ঘরের প্রতিটি মানুষ। আসলেই তো! ভাবনাটা প্রথম মাথায় এনেছিল জাওয়াদ খান নিজেই—ঠিক যখন অধীরের মুখ থেকে জানতে পেরেছে নাভান নাকি তিতিরের সাথে সময় কাটাচ্ছে।
খবরটা শোনার পর থেকেই জাওয়াদ খানের ভেতরে এক জ্বলন্ত ক্ষোভের মেঘ জমেছিল। নিজের প্রাণপ্রিয় মেয়েটার মলিন, বিষণ্ণ মুখখানা তাঁর নজর এড়ায়নি। মেয়েটা যে তাঁর অবাধ্য, নির্লজ্জ ছেলের প্রেমে নিজের অজান্তেই হাবুডুবু খাচ্ছে, তা জাওয়াদ ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন; কিন্তু অভিমানী মেয়েটি তা স্বীকার করতে নারাজ।

তাই তো জাওয়াদ খানের এই কৌশল! চেয়েছিলেন হেরাকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিতে, যাতে দূরত্বের তীব্রতায় সে নিজের হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতির খোঁজ পায়, নিজের ভালোবাসাকে চিনতে পারে। কিন্তু বিধি বাম! সেই শুভপ্রচেষ্টা যে এভাবে উল্টো ঘুরে পুরো পরিস্থিতিকে হুলুস্থুল করে তুলবে, তা কে জানত!
এদিকে বন্ধু মহলও চেয়েছিল নাভানের ওই কঠিন ঠোঁট দুটো থেকে অন্তত একবার ‘ভালোবাসা’ শব্দটা আদায় করে নিতে। তাদেরও তো সেই একই চক্রান্ত ছিল। কিন্তু নাভান—সে যে সবটা আগে থেকেই বুঝে ফেলেছে!
সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেলেও নাভানের বুকের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতার ঝড়। রাগ আর অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে আসছে তার—যা-ই ঘটুক না কেন, হেরা তাকে একটা বার না জানিয়ে কীভাবে চলে যেতে পারল? এই না বলা বিদায়ের ক্ষতটাই যে এখন তার বুকের ভেতর তুষের আগুনের মতো তিলে তিলে জ্বলছে! নাভানের চোখের মনি দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল। রাগান্বিত স্বরে বলে——–

” আজ শুধু এই ‘মিসাইল গার্ল’-এর বিচার হবে। আর কাল! কাল তোদের সবার এক এক করে পাওনা চুকাব। জাস্ট… ওয়েট অ্যান্ড সি।”
তুষার নিজের অজান্তেই একটা শুকনো ঢোক গিলল। হেরা তার দিকে চেয়ে আছে কিন্তু তুষারের মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি স্বয়ং যমদূতও তার সামনে এসে দাঁড়াত, তার সঙ্গে তর্ক করা বা অনুনয় করা সহজ হতো, কিন্তু আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে থাকা এই নাভানের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মেলানো কোনো মানুষের কাজ নয়!
পরিস্থিতির ভয়াবহতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নাভানের কাঁধে চেপে থাকা হেরা আবার আর্দ্র গলায় আর্তনাদ করে উঠল—

“ও জাতীয় দুলাভাই! বাঁচান আমাকে! এই অসভ্য, গিটারওয়ালার হাত থেকে অন্তত আজকের মতো আমাকে বাঁচান!”
হেরা চিৎকার করলো।
তুষার মুখ ঘুরিয়ে কাশির ভান করতে শুরু করল। রোজ ভয়ে আর লজ্জায় মাথা নিচু করে মেঝের টাইলসের দিকে তাকিয়ে রইল। আর রুশা? সে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে কোনোমতে হাসি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার কাছে তো পুরো ব্যাপারটা কোনো হাই-ভোল্টেজ রোমান্টিক থ্রিলার সিনেমার মতো লাগছে! জাস্ট ড্রামাটিক, ভীষণ রোমান্টিক!
হেরা এবার চরম মরিয়া হয়ে চারপাশের নীরবতা চিরে চেঁচিয়ে উঠল—
“সৃজন ভাইয়া! অধীর ভাইয়া! রোজ! তোদের নাকি জানে জিগার ভাই হয় এই লোকটা,এমন ভান দেখাস ? এখন তোরা এভাবে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন, কেউ কিছু একটা বল!”
সবাই এক মুহূর্তের জন্য নাভানের দিকে তাকাল। কিন্তু নাভানের সেই রক্তচক্ষু আর থমথমে অবয়ব দেখে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই আবার সবার মাথা নিচু হয়ে গেল। এই মুহূর্তে সাক্ষাৎ আজরাইলরূপী নাভানের সামনে দাঁড়িয়ে তার মুখের ওপর কথা বলার মতো আত্মঘাতী সাহস এই রুমের কারোরই নেই।
অধীর বুকের ওপর বাঁ হাতটা রেখে তিনবার থুতু ফেলার নাটক করে নিজের ভেতরে জমে ওঠা ভয়ের ভূতটা তাড়ানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করল। তারপর তোৎলা বচনে, কাঁপা গলায় সাহস কুড়িয়ে বলে উঠল—

” ভা… ভাইরে… কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস রে আমার এত মিষ্টি, কিউটিপাই বোনুকে?”
নাভানের উত্তর একটাই।
” শাস্তি দিতে।”
অধীর কাঁপা কাঁপা গলায় আবার বলল—
” আমাদের সামনেই দে না ভাই… আমরাও তো ভাগীদার…”
নাভানের চোখে দুষ্টু অথচ ভয়ংকর এক ঝিলিক ফুটে উঠল।
“এটা বাসরের শাস্তি। আর এই শাস্তির অধিকার শুধু এই ঘারত্যাড়া মিসাইল গার্লের। তোদের শাস্তি কাল। নো টেনশন। আমি শাস্তি দিতে কৃপণতা করি না জানিস তো সবাই?
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।
হেরাকে কাঁধে নিয়েই সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটল। ধপ করে দরজা বন্ধ করলো নাভান । ভেতর থেকে লক করার শব্দ। অধীর দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিল।

“ভাই… দরজা খোল! আগে একটু আলোচনা করি!”
ভেতর থেকে শুধু নাভানের শক্ত গলা ভেসে এলো—
” আলোচনার সময় শেষ, অধীর। এখন রায় কার্যকর হয়ে গেছে!
দরজার ওপাশে কী হতে যাচ্ছে কেউ জানে না।
কিন্তু দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একটাই কথা বুঝে গেল— আজকের রাতটা শুধু হেরার জন্য নয়…
নাভানের রাগ থেকে কেউই রেহাই পাবে না।
ঘরের ভেতর যেন অদৃশ্য এক অস্বস্তি জমাট বেঁধে ছিল। প্রত্যেকের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার স্পষ্ট ছাপ। কেউ নিশ্চুপ হয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ অস্থির পায়ে এক কোণ থেকে আরেক কোণে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেসব কথার ভেতর প্রাণ নেই; আছে শুধু অনিশ্চয়তার ভার। হেরাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই অদ্ভুত দুশ্চিন্তা যেন ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এমন মুহূর্তে স্বাভাবিক মানুষ যেমন গম্ভীর হয়ে যায়, অধীর ঠিক তার উল্টো। পৃথিবীর সব মানুষ যদি দুঃখের দিনে দুঃখী হয়, তবে অধীর যেন জন্মেছে সেই নিয়ম ভাঙার জন্য। ছেলেটার অদ্ভুত এক স্বভাব—যত বড় বিপদ, তত বড় তার উদ্ভট মন্তব্য। আশপাশের মানুষ কাঁদছে, আর সে এমন কিছু বলে বসবে, যাতে মানুষ রাগ করবে নাকি হাসবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারে না। বন্ধুদের কাছে এটা নতুন কিছু নয়। বরং তারা জানে, অধীর যদি কোনো দিন সিরিয়াস হয়ে যায়, সেদিনই বুঝতে হবে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে গেছে।

দরজার হাতলটা আলতো করে ধরে সে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়াল, যেন কোনো নাটকের মঞ্চে নিজের সংলাপ বলার জন্য অপেক্ষা করছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে সে বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেই দীর্ঘশ্বাসেও নাটকীয়তার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, মুহূর্তের জন্য সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অধীর গলা পরিষ্কার করে কাতর স্বরে বলল——
” ভাই… তোর বাসর নিয়ে আমার কত স্বপ্ন ছিল জানিস? বাসরঘর আমি সাজাবো, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সালামি তুলবো । কত সুন্দর একটা বিজনেসের প্ল্যান ছিল আমার আর এখন দেখ, আমার পুরো বিজনেস এর প্ল্যান শেষ হয়ে যাচ্ছে!”
অধীর থামল, তারপর বুকের ওপর হাত রেখে আরও করুণ মুখে বলল——
” গিটারওয়ালা হিরো ভাই আমার… তুই যা-ই করিস, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বাসরটা ক্যানসেল কর ভাই । আমি আমার সংসার চাই না, বউ চাই না… আমি শুধু সালামির টাকাটা চাই!”
কথাগুলো শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই নীরবতা ভাঙল সৃজনের হাতের হালকা এক চাঁটিতে। ঠাস!

“এটা সিরিয়াস মুহূর্ত, সালা!”
অধীর মাথা চুলকে এমনভাবে তাকাল, যেন সে সত্যিই বুঝতে পারছে না তার অপরাধটা কোথায়!
” আমি তো সিরিয়াসই কথা বলছি। দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভাবছি। আমার ইনকামের সবচেয়ে বড় উৎসটাই তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে!”
কথাটা শুনে ডঃ তুষার ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। ঝিনুক মুখ ঘুরিয়ে ফেলল, কারণ সামনে তাকিয়ে থাকলে হাসি চেপে রাখা অসম্ভব। এই ছেলেটাকে নিয়ে রাগ করাটাও কঠিন। কারণ সে ইচ্ছে করে কাউকে বিরক্ত করে না; সে শুধু এমন এক অদ্ভুত মানুষ, যার মাথার ভেতর সবসময় অন্যরকম একটা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়।
বন্ধুদের মধ্যে প্রায়ই একটা কথা চালু ছিল—অধীরের মাথায় নিশ্চয়ই আলাদা কোনো যন্ত্র বসানো আছে। পৃথিবী যখন কান্নার সুর বাজায়, সেই যন্ত্র তখন হাসির সুর শুনতে পায়। তাই সবচেয়ে ভারী মুহূর্তেও সে এমন কিছু বলে বসে, যাতে মানুষের মন না চাইলেও একটু হালকা হয়ে যায়। সৃজন বিরক্ত মুখে বলল—-
“তুই মানুষ না, হাঁটাচলা করা একটা ঝামেলা।”
পকেটের দিকে তাকিয়ে বেচারা অধীর চুপ করলো। একটু শোক পালন করছে সে। যে ঘর কয়েক মুহূর্ত আগেও নিঃশব্দ উদ্বেগে ভারী হয়ে ছিল, সেখানে চাপা হাসির ঢেউ বয়ে গেল। দুশ্চিন্তা এক মুহূর্তের জন্য হলেও একটু সরে দাঁড়াল।

সবাই যখন বুঝে গেছে নাভানকে ডেকেও লাভ নেই তখন যে যার মতো চলে গেলো।
এদিকে নাভানের ঘরে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহ। বাইরে যতই হৈচৈ থাকুক, এই বিশাল কক্ষের ভেতর সব শব্দ এসে থেমে যায়। দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে ছড়িয়ে আছে আধুনিকতার ছোঁয়া, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই যেন জমে উঠেছে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
হেরাকে প্রায় টেনে বাথরুমের সামনে এনে দাঁড় করাল নাভান। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, ধুলোবালি আর টানাহেঁচড়ায় মেয়েটির গাল, হাত, ঘাড়—সব লালচে হয়ে উঠেছে। রাগে চোখ জ্বললেও নাভানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবারও এড়িয়ে যায়নি সেই লালচে দাগগুলো। সে খুব ভালো করেই জানে, ধুলোর প্রতি হেরার মারাত্মক অ্যালার্জি আছে। তাই হেরার প্রতিবাদ, কান্না কিংবা অভিমান—সবকিছু উপেক্ষা করেই তাকে গোসল করাতে পাঠানোই সবচেয়ে জরুরি মনে হলো তার।

“এ কী করছেন? আমাকে ছাড়ুন! আমি আমার রুমে যাব। আম্মু… আব্বু… বাবা… সুন্দরী মামনি!”
হেরা চেচিয়ে ডাকে সবাইকে। নাভানের গম্ভীর কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো নেমে এল।
” স্টপ, মিসাইল গার্ল। এই রুমটা সাউন্ডপ্রুফ। যতই চিৎকার করো, বাইরে কেউ শুনবে না। তাই শক্তি নষ্ট না করে শাওয়ার নিয়ে বের হও।”
হেরার বুকটা ধকধক করে উঠল। তবু মুখে সাহস দেখিয়ে বলল—
” আমাকে যেতে দিন।”
নাভান এক পা এগিয়ে এল। তার চোখের গভীরতা দেখে হেরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল—–
“এখন কোথাও যাওয়া হচ্ছে না মিসাইল গার্ল ”
” কেন করছেন এমন? ভালোবাসেনও না, আবার আমাকে আটকেও রাখেন! মানুষের মন নিয়ে খেলতে খুব ভালো লাগে আপনার?
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল—-

” আর একটা উল্টোপাল্টা কথা বললে কিন্তু আমি ভীষণ রেগে যাব।”
হেরা থমকে গেল।
” আ… আপনি…”
” আমার অনুমতি ছাড়া কোথাও চলে যাওয়ার শাস্তি তো পেতেই হবে। এখন ভালো মেয়ের মতো শাওয়ার নিয়ে বের হও।”
হেরা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাকেই তো সে নিজের অজান্তে ভালোবেসে ফেলেছে, কিন্তু তা প্রকাশ করে নি। আর যখন জানতে পেরেছে, এই লোক আর কেউ নয় তার গোপন প্রেমিক তখন তো খারাপ লাগার সাথে ভালোবাসার অনূভুতি ছুয়ে দিয়েছে তার মন প্রান। আর এই লোক ও যে তাকে অসম্ভব ভালোবাসে তাও তো হেরা এখন জানে। অথচ লোকটা কখনো নিজের অনুভূতি মুখে স্বীকার করে না। যেন ইচ্ছে করেই তাকে বিভ্রান্ত করে রাখে। তাই ঠিক করল, যেভাবেই হোক নাভানের মনের কথা সে বের করবেই।
মুখ নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল—

” আচ্ছা… আপনি বাইরে যান। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
নাভান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তত এই যুদ্ধের প্রথম ধাপটা জিতেছে সে।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর মিনিট গুনতে লাগল নাভান। দশ মিনিট… পনেরো… কুড়ি… তারপর তিরিশ মিনিট পেরিয়ে গেল। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দরজার সামনে এসে কড়া গলায় বলল—
” মিসাইল গার্ল! আর কতক্ষণ? বের হবে নাকি আমি দরজা ভেঙে ঢুকব?”
ভেতর থেকে অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না। তারপর লাজুক, কাঁপা গলায় ভেসে এল—
” আ… আমার কাপড় নেই…”
নাভান এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তারপর আলমারি থেকে একটি নতুন শাড়ি এনে দরজার ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে দিল।
“এটা নাও।”
হেরা সাবধানে হাত বাড়িয়ে শাড়িটা নিল। কিন্তু শাড়ি হাতে নিয়েই তার মুখ ছোট্ট হয়ে গেল।
” হায় আল্লাহ…আমি তো শাড়ি পরতে পারি না।
হেরা ভয়ে ভয়ে বলে উঠে —
” আ আ আমি শাড়ি পরতে পারি না অসভ্য গিটার ওয়ালা।
” বাইরে এসো আমি পরিয়ে দেই।
” নায়ায়ায়ায়া!
” তাহলে পরে ৫ মিনিটের ভিতর বের হবে। মেয়ে হয়ে শাড়ি পরতে পারে না। শাড়ি না পরে বের হলে আমি পড়িয়ে দিবো?
নাভান ফিসফিস করে বলে —

” ছোট বেলায় শাড়ি পরার জন্য কি বায়না করতি। ছোট বেলায় ওড়না দিয়ে শাড়ি পরতি আর এখন সৃতি ভুলার সাথে সাথে শখের জিনিস টার সাথে আমাক ভুলে গেলি । অসভ্য ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে একটা!
হেরা সবসময় বলতো নাভানকে, বিয়ের পর সব সময় শাড়ি পরে থাকবে, তার প্রিয় পোশাক শাড়ি। তার অনেক অনেক শাড়ি হবে। কিন্তু ক্লাস নাইনে উঠার পর থেকে সব শেষ। হেরা শাড়িটা নিজের গায়ে জড়িয়ে ফেলল । কোথাও ভাঁজ বেশি, কোথাও কম, কোথাও আঁচল ছোট —নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো!
ঠিক তখনই বাইরে নাভানের পায়ের শব্দ আর রুম খোলার শব্দ পেলো ! হেরা দরজা ফাক করে দেখে রুম একেবারে খালি। হেরা ওয়াশরুম থেকে দ্রুত বের হয়ে ভো দৌড়।
হেরা ভয় পেয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল। দরজায় হাত রাখতেই ডিজিটাল লকের লাল আলো জ্বলে উঠল।
টিক… টিক… টিক…
সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা অ্যালার্ম বেজে উঠল।
হেরার তো মনেই ছিলো না নাভানের রুমের লক দেয়া। বোঝলো নাভান জাওয়ার সময় দরজা লক করে গেছে।

​”ধুর! পাসওয়ার্ড লক মেরে আটকে দিল? এখন আমি এখান থেকে বের হব কীভাবে? আর ওই অসভ্য গিটারওয়ালা লোকটা গেল কোথায়?
​আল্লাহ এই জলজ্যান্ত যমের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও! কোনো একটা বুদ্ধি দাও, যেন কোনোমতে আজ বেঁচে ফিরতে পারি। লোকটার রাগ দেখে মনে হচ্ছে আমায় কাঁচা চিবিয়ে খাবে! দুরর,,, রাগাবো ঠিক আছে, তা বলে এতটা রাগানো কি ঠিক হলো? এখন যে এই রাগের শাস্তি হিসেবে লোকটা কী করে বসবে… ও গড, প্লিজ সেভ মি!”
হেরা তড়িঘড়ি করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। বিছানার নিচে ঢোকার উপায় নেই। বিশাল গোলাকার ডিজাইনের বেড মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে। বারান্দায় লুকোলে সহজেই দেখা যাবে। ওয়াশরুমেও আর থাকা যাবে না।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল বিশাল দুই পাল্লার আলমারির দিকে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেল সে।
“ওয়াও…”

এ যেন সাধারণ আলমারি নয়—একটা ছোট্ট বিলাসবহুল ঘর। দুই পাশে ঝুলন্ত পোশাক রাখার স্ট্যান্ড, মাঝখানে নরম কাঠের মেঝে, ওপরে সেন্সর লাইট, আর ভেতরে এতটা জায়গা যে অনায়াসে দু’জন মানুষ বসতে পারে।
হেরা কৌতূহলী হয়ে তাক গুলো পরীক্ষা করল। তাকগুলো আলগা, খুলে ফেলার মতো ব্যবস্থা করা। সে একে একে নিচ থেকে তাক কয়েকটি সাবধানে খুলে পাশে রেখে দিল। মুহূর্তেই ভেতরে বেশ বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে গেল। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“বাহ… আলমারির ভেতর আবার আলাদা একটা রুম! অসভ্য অহংকারী গিটার ওয়ালা আপনার ডিজাইন এর আলমারিটা কিন্তু আমার লুকানোর জন্য একদম পারফেক্ট হয়েছে!”
মুখ চেপে হেসে ভেতরে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল হেরা। নিজের হাঁটু জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলল—
“এখান থেকে আর বের হচ্ছি না দেখি অসভ্য অহংকারী গিটার ওয়ালা আমাকে কীভাবে খুঁজে বের করে!”
হেরা ভেবেছিল, নাভান হয়তো অনেক আগেই রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। তার কল্পনাতেও ছিল না, এই বিশাল ঘরের ভেতরেই আরেকটি গোপন কক্ষ থেকে নাভান তার প্রতিটি ছোট্ট পাগলামি নীরবে দেখছে। সেই দৃশ্য দেখে তার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছিল।

থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর বেগি হাতার কালো টি-শার্ট পরে নাভান ধীর পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বারান্দা বললে যেন ভুলই হবে—এ যেন ছোট্ট এক ছাদবাগান। নাভানের রুচি সবসময়ই ছিল অন্যরকম। এই বাড়ির প্রতিটি কোণ যেমন যত্নে সাজানো, তেমনি গাজীপুরের বাড়িটিও আরও ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যে নির্মিত। চারপাশজুড়ে সারি সারি টব, বাহারি ফুলের সমাহার, রাতের বাতাসে দুলছে বেলি, গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা আর অচেনা কত রঙিন ফুল। ফুলের মিষ্টি সুবাসে যেন পুরো বারান্দা এক স্বপ্নলোক হয়ে উঠেছে।
নাভান নিঃশব্দে বাগানের ভেতরে গেল। যত্ন করে কয়েকটি রজনীগন্ধার ডাঁটি ছিঁড়ল। তারপর লাল, সাদা আর হলুদ গোলাপ, বেলি, গাঁদা—নিজ হাতে একে একে তুলে ছোট্ট একটি বাঁশের ঝুড়ি ভরে নিল। ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল সে। যেন প্রতিটি ফুলের মাঝেই লুকিয়ে রেখেছে নিজের অজস্র না-বলা অনুভূতি।

এদিকে হেরা আলমারির ভিতর হেলান দিয়ে বসেছিল। অজান্তেই চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে। আধখোলা ঠোঁট, শান্ত নিঃশ্বাস, মুখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ—অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুম তাকে জড়িয়ে নেয়। মনে মনে সে ঠিক করে রেখেছে, আজ আর এখান থেকে বের হবে না। কাল যখন নাভান নিজেই বের হবে, তখন সুযোগ বুঝে তার পিছু নেবে। নিজের এই ছোট্ট পরিকল্পনা ভেবে ঘুমের মাঝেও যেন তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি লেগে ছিল।
রুমের আলো নিভে যেতেই বাইরে ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো জানালার ফাঁক গলে ভেতরে এসে পড়ল। সেই আলো ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে পুরো ঘরে এক নরম রূপালি আভা ছড়িয়ে দিল।
সেই আবছা আলোয় হেরাকে গুটিসুটি মেরে বসে হেলান দিয়ে থাকতে দেখে নাভানের বুকটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
মানুষ অনেক কিছু ভুলে যেতে পারে, কিন্তু স্বভাব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না—মনে মনে ভাবল সে। হয়তো হেরার স্মৃতির অনেকটাই আজ ঝাপসা, কিন্তু তার ছোটবেলার অভ্যাসগুলো যেন এখনও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।

ছোটবেলার প্রতিটি স্মৃতি যেন কাচের বাক্সে বন্দি করে রাখা কোনো রঙিন স্বপ্ন। নাভান সেই স্বপ্নের নাম দিয়েছে—আমার অক্সিজেন।
হেরা যখনই নাভানের ওপর অভিমান করত, ঝগড়া কিংবা লুকোচুরি খেলত, সবার আগে ছুটে গিয়ে লুকাত নাভানের রুমের আলমারিটার ভেতর। ছোটবেলায় পুতুলদের মতো ছোট হেরা অনায়াসেই আলমারির এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হেরা বড় হয়েছে। কিন্তু নাভান ভোলেনি সেই স্মৃতি। সে জানে, এই আলমারি কেবল কাঠের কোনো আসবাব নয়; এটি তার আর হেরার এক গোপন আশ্রয়। তাই তো নাভান পুরো আলমারিটা নতুন করে, আরও বড় করে বানিয়ে নিয়েছে—যেন স্মৃতিগুলো আবার প্রাণ ফিরে পায়।
আলমারির গায়ে হাত রেখে হঠাৎই মুচকি হাসে নাভান। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হেরার সেই প্রথম অনাবিল, মিষ্টি আবদার।

নাভান চিরকালই ছিল একটু রাশভারী কিন্তু কিউট এক ছেলে। আর হেরা? হেরা তো ছিল সত্যি সত্যি একটা পরীর মতো পুতুল! বয়স কম হলেও পরিবার থেকে নাভান একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছিল—কাউকে কথা দিলে বা প্রমিস করলে তা যেকোনো মূল্যে রাখতে হয়।
সেদিন পাশের বাড়ির একটা ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে খেলছিল নাভান। দূর থেকে তা দেখে হেরার কী কান্না! কেন নাভান অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে খেলবে? নাভান তো শুধুই তার! কিন্তু নাভান তখন বিরক্ত হয়ে উল্টো মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। হেরার কান্নার তোড়ে ঘর মাথায় ওঠার জোগাড়। শেষে উপায় না দেখে নাভানের মা কাজল রেখা এগিয়ে এসে হেরাকে কোলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়েছিলেন—
“আহা সোনা, কেঁদো না তো! বড় হলে নাভানের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিয়ে দেব প্রমিস। বিয়ে করলে নাভান আর কোনো মেয়ের সঙ্গে খেলতেই পারবে না, বুঝলে?
ছোট্ট হেরা কান্না থামিয়ে বড় বড় চোখ করে মায়ের দিকে তাকিয়েছিল। কি বুঝেছিল কে জানে! কিন্তু মায়ের কথাটা শোনামাত্র সে দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে মায়ের একটা গাঢ় মেরুন রঙের ওড়না বের করল। তারপর ওড়নাটা কোনোমতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে সোজা ছুটে গেল নাভানের কাছে।
তখনও নাভান পাশের বাড়ির মেয়েটার সঙ্গে খেলতে ব্যস্ত। হেরা তার আধো-আধো তোতলা গলায় ওড়নাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল—–

“বিয়ে কলবে লাভান বর? এই যে শাড়ি… শাড়ি পলিয়ে আমায় বিয়ে কলবে?”
নাভান বিরক্তি মুখে বলল–
“ সর তো, এঞ্জেল!”
“না! তুমি আগে বলো! চুন্দলি মা প্রমিচ কলেচে, বলো হয়ে বিয়ে দিবে তোমাল-আমাল! একন তুমি প্রমিচ কলো?”
নাভানের মেজাজ আর ঠিক রইল না। চোখ মুখ শক্ত করে দিল এক ধমক!
ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে হেরার ঠোঁট উল্টে চোখ ফেটে জল নামল—-
“অ্যাঁ… অ্যাঁ… লাভান বর বকা দিয়েচে!”
হঠাৎ হেরার এই কান্না দেখে অসহায় নাভান আর সামলাতে পারল না। বিরক্তি ভুলে হাঁটু মুড়ে বসে হেরার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল—-
“ আহা, চুপ কর এঞ্জেল! কাঁদে না তো!”
“ না, আমি কাঁদবো! তুমি আমায় বকা দিয়েচো !”
“আচ্ছা, আর বকা দেব না। চুপ কর তো, ভ্যাঁ ভ্যাঁ করিস না! ওই মেয়েটা তোকে দেখলে কী বলবে বল তো? বলবে এঞ্জেল পচা!”
হেরা সাথে সাথে চোখ দুটো মুছে তোতলা গলায় আবার শর্ত জুড়ল—-

“আচ্ছা, আমি কাঁদবো না। তাহলে তুমি বলো আমায় বিয়ে কলবে? প্রমিচ কলো?”
নাভান মুখ গাম্ভীর্য করে বলল—-
“ না! প্রমিস করা ভালো না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই হেরা আবার মুখ ভেংচে ‘ভ্যাঁ’ করে কেঁদে উঠল। উপায়ান্তর না দেখে নাভান তড়িঘড়ি করে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“ ওকে ওকে! প্রমিস, বিয়ে করব! হয়েছে? এবার চুপ কর!”
হেরা তাও ছাড়বার পাত্রী নয়। ভেজা চোখে নাভানের দিকে তাকিয়ে বলল—–
“ গড প্রমিচ কলো !”
নাভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বলল,
“ ওকে, গড প্রমিস!”
পুরোনো এই স্মৃতির ভেলায় ভেসে নাভানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। মনে মনে ভাবে—কী এক অদ্ভুত পাগলী মেয়ে ছিল হেরা! অথচ সেই মেয়েটাই আজ কত বদলে গেছে। কত দূরত্ব এখন দুজনের মাঝে, তাকে আজ আর পাত্তাই দিতে চায় না!
আলমারির দরজায় হাত রেখে নাভানের বুক চিরে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। হেরার যদি এই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো আবার মনে পড়ে যেত? সে কি আবারও আগের মতো নাভানের জন্য একগুঁয়ে পাগলামি করত?

নাভানের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তার খুব ইচ্ছে করে… ভীষণ ইচ্ছে করে তার সেই অধিকারপ্রবণ, অভিমানী এঞ্জেল পরী বউটাকে আবার আগের মতো নিজের করে ফিরে পেতে!
হেরার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নাভান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। রাতের নরম আলোয় তাকে যেন অবাস্তব সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিল, অমাবস্যার গভীর অন্ধকার ভেদ করে হঠাৎ পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে এই ঘরে।হেরার ফর্সা মুখ খানা হালকা অন্ধকারে ঝক ঝক করছে চাদের ন্যায়।
অবচেতনেই নাভানের ঠোঁটে ফিসফিস করে বেরিয়ে এল—
” মাশাআল্লাহ…”
তিনবার মনে মনে দোয়া পড়ে নিল সে। নিজের এই অমূল্য মানুষটিকে যেন কোনো অশুভ দৃষ্টি স্পর্শ করতে না পারে সেই প্রতিজ্ঞা ও করলো। নিজের এই চোখ দিয়ে শুষে নিলো প্রিয়সির আদোর মাখা শরীর খানা।
ঠিক তখনই ফুলভর্তি ঝুড়িটি পাশে রেখে সে ধীরে ধীরে একটি রজনীগন্ধার ডাঁটি হেরার নাকের কাছে ধরল।
মিষ্টি সুবাসে হেরা একটু নড়েচড়ে উঠল। চোখের পাতা কাঁপল। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই সে অবাক হয়ে দেখল—নাভান তার একেবারে সামনে বসে ।

দুজনের মাঝখানে যেন মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।
এত কাছে নাভানকে দেখে হেরা বিস্ময়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণ আগেও সে নিশ্চিত ছিল, নাভান ঘরে নেই। তাহলে… সে এলো কোথা থেকে?
নাভানের চোখে ছিল দুষ্টুমি মেশানো এক রহস্যময় হাসি। যেন সে অনেকক্ষণ ধরেই এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিল।
হেরা তড়িঘড়ি করে আলমারি দরজা খুজতে লাগলো কিন্তু নাভান যে অনেক আগেই আলমাড়ির দরজা খুলে দিয়ে সে আরাম করে বসে ছে দরজার সামনে । হেরাকে ছটফট করতে দেখে ফোনের ফ্লাস অন করলো নাভান —
নাভান ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগিয়ে এল। তার হাতে তখনও সেই ফুলের ঝুড়ি। রজনীগন্ধার সুবাসে পুরো ঘর ভরে গেছে।মৃদু হেসে সে বলল—-

“এত ভয় পাচ্ছ কেনো অক্সিজেন। ভেবেছিলে লুকিয়ে থাকলে আমি তোমায় খুজে পাবো না।
হেরা কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
রাতের নিস্তব্ধতা, নাভানের আনা ফুল, রজনীগন্ধার গন্ধ আর দুটি নীরব হৃদয়ের মাঝখানে জমে থাকা হাজারো না-বলা অনুভূতি— নাভান হেরাকে পরখ করতে আটকে যায় হেরার আর্কষনীয় স্থানে,শাড়ি পেচিয়ে উলোট পালোট করে পরেছে মেয়েটা যার দরুন মেয়ালি আর্কষনীয় স্থান উন্মুক্ত নাভানের সামনে। তার উপর চুলের পানি পরে ব্লাউজ ভিজিয়ে তা আরো নেশাক্ত করে তুলছে নাভানের চোখে , নাভান মাথা ঝারা দিয়ে তাকায় কিন্তু লাভ হয় না বেহাইয়া চোখ দুটু হেরার দিকে চলে যাচ্ছে। ফোন বিছানার উপর ছুটে মারে, এসির পাওয়ার আরো কমিয়ে দেয়। হেরা ভয় পায় নাভানের চাহনি দেখে। নাভান যে অস্থির হয়ে যাচ্ছে তা ভালই বোঝতে পারছে হেরা । কিন্তু হেরা তো সত্যি না জেনে নাভানকে গ্রহন করবে না। জবাব দিতে হবে তাকে। কেনো এতো লুকুচুড়ি! নাভান কেনো বলছে না সব সত্যি। কেনো এতো পাগলামি করছে কেনো তার ভুল ধারনা ভাঙছে না। রাগ হয় হেরার।

” আ ‘ আপনি স সরুন।
” হুস ” কই পালাবে আজ অক্সিজেন। শাস্তির কথা ভুলে গেছো।
নাভানের রাগ সম্পর্কে জানে হেরা তাই ভয়ে ভয়ে বলে।
” শা’ শা শাস্তি কি কি কিসের শাস্তি?
” আমার থেকে পালানোর শাস্তি। আজ এমন কিছু করবো ভুল কিছু করার আগে আমায় ১০০ বার মনে পরবে অক্সিজেন।
” কি” কি ‘কি করবেন।
” বাসর করবো অক্সিজেন।।
হেরা নিশ্চুপ। নাভান আবার বললো—–
“এভাবে তাকিয়ে থেকো না অক্সিজেন … আমার ভেতরের অন্ধকারটা তোমাকে নিজের করে নিতে চাইছে।
হেরা আমতা আমতা করে বলে—++
‘ আ আ আপনি কিছু করবেন না আমি অন্য কাওকে ভালোবাসি।
” হুসসস

নাভান হেরার কথাকে উপেক্ষা করে হেরার শরীরের প্রতিটি ভাজে তাকায়, নাড়ী দেহের আকর্ষণীয় স্থান উন্মুক্ত নাভানের সামনে। মাথা ঝারি দিয়ে নিজের নিষিদ্ধ অনূভুতি কে শক্ত করে নাভান। কিন্তু কোনো ভাবে নির্লজ্জ চোখ আজ তার সাথে কৃপাণতা না করে নিষিদ্ধ স্থানে চোখ দেয় । নাভান মনে মনে একটা সাইজ বলে।
” 34 অনেক আকর্ষণ, টাইম হয়েছে এখন। আমার তোমাকে বড় বানাতে হবে।
ছোট,করে বললো নাভান —
‘ আ আপনি কি বলছেন। কি করবেন আ ” আমার সাথে।
” তুমি যা ভাবছো তাই করবো,
” ম, মা মানে।
” হ্যাঁ আজ বাসর করবো।
দূরে ল্যাম্পপোস্ট এর আলো দরজার ফাঁক দিয়ে আসা নাভানের ধারালো মুখের অবয়ব আঁকা হচ্ছিল—যেন কোনো আদিম ভাস্কর্য। হেরা বুকের ভেতর আছড়ে পড়া তুফান সামলাতে না পেরে অবশেষে নাভানের চোখের দিকে সোজা তাকাল। সেই চোখে নিখাদ সংশয় আর একবুক জমানো প্রশ্ন। নাভানের হাব ভাব ভালো না দেখে ফট করে ফেরা নাভানকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য বলে —–

” আগে বলুন কে আপনি? সত্যি বলবেন? আপনি… আপনি কি আমার সেই গোপন প্রেমিক?”
হেরার গলায় জমে থাকা ভয়ের মেঘ ভেদ করে যে ইঙ্গিতটা বেরিয়ে এল, তাতে এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন স্থবির হয়ে গেল। হেরার তো স্মৃতির ক্যানভাসটা অস্পষ্ট হওয়ার কথা! আর নাভান? সে তো নিজের প্রতিটি অতীত চিহ্ন অতি সাবধানে আড়াল করে রেখেছিল। তবে কি হেরার এই সন্দেহের তির কেবলই অন্ধকারে ঢিল ছোড়া, নাকি অবচেতন মনের গভীরে জমে থাকা কোনো পুরোনো চেনার টান?
নাভানের পাথরের মতো শক্ত বুকে একঝলক অস্থিরতার কাঁপন উঠল। মেয়েটার এই ধূর্ত নজর আন্দাজে মারল, নাকি সত্যাভাস পেয়েছে? রাগ দেখিয়ে পরিস্থিতিটা নিজের আয়ত্তে নিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু বিষাক্ত রূপসীর এই ভিজা শরীর, ভিজে যাওয়া পোশাকের নিচে লুকানো শরীরের আবেদন আর চোখের মায়াবী চাহনি—সব যেন নাভানের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কঠোরতাকে এক নিমেষে গলিয়ে দিল। নিজেকে আড়াল করার জন্য সে মুখে টেনে আনল কঠিন, স্বাধিকারপূর্ণ এক শান্ত ভাব। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল—

“কে আবার? তোমার বর।
কিন্তু হেরার মনের ভেতরে চলতে থাকা ঘূর্ণিঝড় থামল না। সে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল, স্বর কাঁপা হলেও চোখে তীব্র অন্বেষণ—
“সত্যি বলুন, কে আপনি?”
নাভান একটুকুও বিচলিত হলো না। গম্ভীর, প্রতিধ্বনিময় গলায় একই জবাব দিল—
“তোমার বর।”
হেরা কাঁপা গলায় আবার বলল—-
“সত্যি বলুন… আপনি কে?”
নাভান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। দুজনের মাঝের দূরত্ব এতটাই কমে গেল যে হেরা নিজের শ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিল। নাভান নিচু স্বরে বলল—-
“আমি তোমার গোপন প্রেমিক কি না, জানার দরকার নেই। তুমি শুধু এটুকু মনে রাখো…”
বাংলায়— আমি তোমার বর। ইংরেজিতে—Husband.”
হিন্দিতে—পতি, উর্দুতে—শওহর। ভাষা চারটা… পরিচয় একটা।
নাভান থামল। চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল——
” তুমি পৃথিবীর সব ভাষা শিখে ফেলো… তাও উত্তর বদলাবে না। মিসাইল গার্ল!!
হেরা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নাভান আগেই বলে উঠল—
“তোমার সমস্যা হলো, তুমি ফালতু অতীত জানতে চাও। অথচ আমি চাই… তুমি বর্তমান পরিচয়টা মেনে নাও।”

ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে সে আরও বলল—-
“ডিকশনারি খুলে দেখো। কোথাও লেখা নেই—’গোপন প্রেমিক’ লাগবেই জীবনে । কিন্তু ‘বর’ শব্দটা সব ভাষায় আছে। আর লাগবেই লাইফে একটা মেয়ের জন্য।
আর মজার ব্যাপার জানো? গোপন প্রেমিককে মানুষ ভুলে যায়…”কিন্তু বরকে?”
নাভান চোখ সরু করে তাকাল—
“তার নাম ভুলে গেলেও… ভাগ্য কোনোদিন ভুলে না। মিসাইল গার্ল।
একই উত্তরের চক্রব্যূহে আটকে পড়ে হেরা আর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। হেরাতো শুধু জানতে চেয়েছে গোপোন প্রেমিক কি না সে ,বললে কি এমন হয়। এতো ভাষন দেয়ার কি আছে। সত্যি স্বীকার না করলে হেরাও মেনে নেবে না মনে মনে শপথ করলো – ভয় আর রাগের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ হেরার গলার স্বরকে শাণিত করে তুলল—

” আ… আমি আপনাকে কোনোদিন মানি না, মেনে নেব না!”
নাভান বুঝল, শিকার বড্ড বেশি চঞ্চল হয়ে উঠছে। পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সে এক পা এগিয়ে এল। চোখের মনি দুটো অন্ধকার আর কামনায় আরও গাঢ় হয়ে উঠল। একটা দুষ্টু, সর্বগ্রাসী হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। হেরার মাথা থেকে সরাতে এক ধরনের মাদকতাময় মজার সুরে বলে উঠল—
“তোর দিলের উইলে, তোর দিলের উইলে স্ট্যাম্প মেরে লিখে দেব রে—আমি তোর, আমি তোর, পেয়ার লাল রে…”পেয়ার লাল রে!
একটু থেমে, হেরার একদম কাছাকাছি এসে, নিঃশ্বাসের উত্তাপ তার তপ্ত গালে ছড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল—

” বাসর করোনি তো, তাই বুঝতে পারছ না আমি তোমার কে। আজ রাতে সেটা উদ্‌যাপন করলেই হাড়ে হাড়ে টের পাবে—তোমার ওপর আমার অধিকার কতটুকু। আর কে আমি!
কথাগুলোর ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম বাসনায় হেরার বুক ধক করে উঠল। ভয়ে আতঙ্কে নিজেকে যত পারল আলমারির পেছনের কাঠের দেয়ালের সাথে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু নাভান তাকে এতটুকু ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। তার চোখের চাহনিতে এখন শিকারকে কবজা করার এক আসুরিক প্রশান্তি।
“পজিশন ঠিক করো।”
হেরা তোতলাতে তোতলাতে বলল—-
“প… পজিশন মানে?”

” ইউনিক একটা জায়গায় আজ আমাদের বাসর হবে, মিসাইল গার্ল । আমার পজিশন ঠিক না করলে তোমাকে নিজের মধ্যে নিখুঁতভাবে শোষণ করব কীভাবে? এত দামি খাট থাকতে তোমার যে আলমারির অন্ধকারে বাসর করার শখ জেগেছে, সেটাকে অপূর্ণ রাখি কীভাবে, আমার অক্সিজেন?
কথা শেষ করেই নাভান রজনীগন্ধার ফুলগুলো একে একে ছিঁড়ে নিয়ে আলমারির কাঠের মেঝেতে ছড়িয়ে দিতে লাগল। সাদার ওপর ঝরে পড়া পাপড়িগুলো যেন নিঃশব্দ কোনো ধ্বংসের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল।
” নাও, ফুলের বাসর সাজানো কমপ্লিট।”
হেরা আশঙ্কায় আরও দূরে সরতে চাইলে নাভান এক চটুল দক্ষতায় আলমারির ভেতরের ওপরের তাকগুলো খুলে ফেলল। অনায়াসে হেরার এতটুকু কাছাকাছি বসে পড়ল সে, যে দুজনের শরীরের কোনো দূরত্ব আর রইল না। কিন্তু তাদের সম্মিলিত ওজনে আলমারির কাঁচের দরজায় একটা হালকা ঝনঝন শব্দ হলো, যেন কাঁচগুলোও এই বিপজ্জনক স্পর্শে কেঁপে উঠল।
হেরার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভয়ার্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে নাভান এক পরম তৃপ্তির হাসি হাসল। হিংস্র অথচ চরম ব্যাকুলতায় ঢাকা সেই হাসি। হেরার কানের কাছে মুখ এনে অন্ধকারের তীব্রতায় ডুবে যাওয়া কণ্ঠে বলল—
” উফফ অক্সিজেন… নিশ্চিন্ত থাকো, এই আলমারি আমাদের দুজনের এই বেসামাল রূপ, এই অনিয়ন্ত্রিত শক্তি—সবটুকু বহন করতে পারবে।”

হেরা বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। আলমারির বদ্ধ সুবাস আর নাভানের শরীরের এই উগ্র, গাঢ় অন্ধকার মায়ায় সে যেন ক্রমশ এক নিষিদ্ধ ফাঁদে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। নাভানের এম্ন রুপ আর আজোপ নির্লজ্জ কথা শুনে বাকরুদ্ধ, আর কতো রুম দেখবে এই লোকের হেরা। ভয়ে নাভানের দিকে অবাক হয়ে চেয়েছে বলে
নাভান আবার ধীরে বলল–
“এভাবে তাকিয়ে থেকো না… আমার ভেতরের সব শক্ত হয়ে থাকা দেয়াল ভেঙে পড়ে।
হেরা কষ্ট করে বলল—-
“আমি… আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি…”
নাভান শুধু চাপা স্বরে বলল,
“হুশ…
হেরা থামলো না —
” আমি আমার প্রথম ভালোবাসা জি ম্যান কে ভালোবাসি। আপনার মতো অসভ্য গিটার ওয়ালা কে কখনো মেনে নিবো না।
নাভান হাসে।
তারপর ফুলগুলো একে একে আলমারির ভেতরে ছড়িয়ে দিয়ে বলল—

“দেখো, তোমার পছন্দের মতোই সাজিয়ে দিলাম। এখন আর অভিযোগ থাকবে না।”
” আমি মানি না আপনাকে, সত্যি না বললে তো মানবো ও কোনোদিন!
খুব ধীরে সে ফিসফিস করে বলল—
“চুপ… কোনো কথা নয়, অক্সিজেন। শুধু এই মুহূর্তটা মনে রেখো। আমি চাই, আমার সমস্ত অনুভূতির মধ্যে তুমি থাকো… আর তোমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতরেও আমি।”
হেরা ছটফট করলো। নাভানের হাতে কামড়ে দিলো কিন্তু তাও ছাড়া পেলো না। ভয়ে কান্না করে দেয় হেরা। নাভান বিরক্ত হয়ে বলে উঠে।
“কান্না বন্ধ করো, মিসাইল গার্ল। এই গভীর রাতে তোমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস আমার স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। চোখের পানি আটকে শান্ত হয়ে বসো, কারণ আমার ভেতরের অন্ধকারটা যদি একবার তার নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে এই রাতটাও তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার সাহস পাবে না। দুই সেকেন্ড… মাত্র দুই সেকেন্ড লাগবে এই কান্নাকে অন্য কোনো শব্দে রূপান্তর করতে। তোমার এই অসহায় রূপটা আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আবার এটাই আমার সবচেয়ে বড় জেদ। তোমাকে নিজের করে পাওয়ার তীব্র ক্ষুধা আর তোমাকে দূরে ঠেলে রাখার এই মানসিক যুদ্ধটায় আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু জেনে রেখো, দিনশেষে জয়টা আমারই হবে। আমি হারতে আসিনি, মিসাইল গার্ল।”

কথাটা শেষ করেই নাভান আলতো টানে হেরার শাড়ির আঁচল ঠিক করে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। দু’হাতের নিরাপদ বৃত্তে আটকে গেল হেরা। এক হাতে তার কোমর জড়িয়ে রাখল, অন্য হাতটি ধীরে ধীরে উঠে এলো তার চুলে। হেরার মাথা নিজের কাঁধে হেলিয়ে দিয়ে নাভান চোখ বুজল। তার চুলের মিষ্টি গন্ধ আর পরিচিত উপস্থিতি যেন মুহূর্তেই তাকে অন্য এক অনুভূতির জগতে নিয়ে গেল।
বহু বছরের অপেক্ষা, অগণিত না-বলা অনুভূতি আর বুকের ভেতর জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা আজ একসঙ্গে হৃদয়জুড়ে ঢেউ তুলেছে। সে জানে, নিজেকে সংযত রাখা দরকার; হেরাকে ভয় নয়, বরং নিরাপত্তা আর ভালোবাসার অনুভূতিই দিতে চায়। তবু হৃদয়ের তীব্র টান তাকে বারবার বিচলিত করে তুলছে।
হেরা অপ্রস্তুত স্বরে কিছু বলতে যেতেই নাভান মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল—-
“হুসসস… এখন কোনো কথা নয়। শুধু এই মুহূর্তটুকু অনুভব করো। জানো তো, তোমার কাছে এলে পৃথিবীর সব শব্দ যেন হারিয়ে যায়। তোমাকে কাছে পেলে মনে হয়, বহুদিনের সব অস্থিরতা শান্ত হয়ে আসে। শুধু এভাবেই কিছুক্ষণ থাকো… তোমাকে আগলে রাখাটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় শান্তি, অক্সিজেন।”
কথাগুলো বলেই নাভান আরও যত্ন করে হেরাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল। বাইরে রাতটা ছিল একেবারে নীরব। সেই গভীর নীরবতার মাঝেই দুজনের না-বলা অনুভূতিগুলো নিঃশব্দে একে অপরের হৃদয়ে পৌঁছে যেতে লাগল।

হেরা যেন আরও ছোট হয়ে নাভানের বুকের ভেতর গুটিয়ে গেল। এমন পরিস্থিতির জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। নাভানের বেসামাল স্পর্শে তার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। কিছু একটা বলতে গিয়েও আর বলা হলো না। নাভান মৃদু স্বরে তাকে থামিয়ে দিল।
“চুপ… কোনো কথা না। শুধু অনুভব করো, আমি কতটা তোমার প্রতি আসক্ত। আমার হাত যখন তোমার কোমরে নেমেছে… তখন নিজেকে আর ভদ্র রাখতে ইচ্ছে করছে না। তুমি শুধু আমার বাহুতে শান্ত হয়ে থাকো… বাকিটা আমি সামলে নেব, অক্সিজেন। আজ তোমাকে এতটা কাছে চাই… যেন আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে শুধু তোমারই নাম থাকে।”
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে হেরা কান্নার শব্দ করতে চাইলে, নাভান আলতো করে তার মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে কোমোল অধোর জোগোলে নিজের গোলাপি ঠোঁট বসিয়ে দিলো । ভয় দেখানোর সেই মুহূর্ত যে তাকে এতটা বেসামাল করে তুলবে, তা যেন নাভান নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। হেরার প্রতি তার অস্থিরতা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। হেরার প্রতিটি ছটফটানি যেন তাকে আরও অস্থির করে তুলছিল।

“এ কি করছেন, অসভ্য গিটারওয়ালা?
আপনার এই উত্তপ্ত, অবাধ্য স্পর্শ… আমি তো তা চাইনি! বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি এমনটা চাইনি। বলুন তো, আপনার অনুভূতির পরিভাষায় কি একেই ভালোবাসা বলে? তবে কেন এই ছলাকলা? কেন এই অন্ধকারের বুক চিরে এমন আকুল স্পর্শ? কি প্রমাণ করতে চান আপনি? শুধু আপনিই আমার প্রতি দুর্বল, আর আমি নই?
শুনছেন, এই বেপরোয়া গিটারওয়ালা—আপনার এই তীব্র, মাতাল করা স্পর্শ যে আমার শরীর আর সহ্য করতে পারছে না! একটু একটু করে জমে থাকা সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমি যেন তলিয়ে যাচ্ছি এক অজানা অতলে। এ কেমন শিহরণ ছড়ালেন আমার শিরায় শিরায়? আমার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসছে, সব শক্তি হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি আমি…

আমায় ধরুন! আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরুন আমায়… নয়তো ছেড়ে দিন, দোহাই আপনার! নয়তো সত্যি যে আমি মারা যাবো। এই অদম্য, আদিম স্পর্শের ভার সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। অথচ অদ্ভুত এক মায়ার মন বলছে—এই রাত, এই অন্ধকার, আর আপনার এই গভীর স্পর্শ যেন আমার খুব চেনা… আপনি কি তবে বহু আগেই আমার অস্তিত্বের আরো গভীরে এসেছিলে ?”
কথাটা মুখ ফুটে আর বলতে পারে নি। নাভান তো বলার সুযোগ দেয় নি। এমন ভাবে হেরার ঠোঁট দুটু শুষে নিচ্ছে যেন। বহু বছরের তৃষ্ণার্থ।হেরা নাভানের শক্তির সাথে না পেরে ক্লান্ত হয়ে পরে।
সময় যেন থেমে গিয়েছিল। এক মিনিট, দুই মিনিট করে কখন যে আধঘণ্টা কেটে গেল, নাভান টের পেল না। হেরার ঠোঁটের স্বাদে নাভান নিজেকে হাড়িয়ে ফেলেছে যেনো। নাভানের চোখ বেয়ে একটা ফোটা জল পরলো হেরার ফর্সা গালে। হঠাৎই নাভানের যেন হুঁশ ফিরল। এতক্ষণ ধরে হেরার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তার বুক ধক করে উঠল।
সে তড়িঘড়ি করে হেরার দিকে ভালো করে তাকাল। মুখের রং ফ্যাকাশে, চোখ দুটো বন্ধ, শরীর একেবারে নিস্তেজ।

“অক্সিজেন …!” আতঙ্কভরা কণ্ঠে ডেকে উঠল নাভান। পরোক্ষনে রাগ হলো খুব। ,টানা ৩০ মিনিটের তীব্র, দমবন্ধ করা ঠোঁটের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভয়ে আর ক্লান্তিতে হেরা একসময় পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তার নিস্তেজ শরীরটা যখন নাভানের শক্ত, চওড়া বুকে ঢলে পড়ে, তখনো তার ঠোঁটে লেগে আছে নাভানের দেওয়া গভীর কামড়ের দাগ।
হেরাকে এভাবে সম্পূর্ণ অবশ আর নিজের নিয়ন্ত্রণে দেখে নাভানের ভেতর এক আদিম, অন্ধকার উন্মাদনা জেগে ওঠে। সে হেরার অচেতন মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে, তার এলোমেলো চুলগুলো একহাতে শক্ত করে মুঠো করে ধরে মুখটা খানিকটা উঁচিয়ে ধরে। তার তপ্ত, ভারী নিঃশ্বাস হেরার গলার চামড়ায় আছড়ে পড়ে।
নাভান তার নেশাক্ত, ধারালো চোখে হেরার বন্ধ চোখের পাতার দিকে তাকিয়ে গভীর ক্ষোভ আর তীব্র কামনায় ফিসফিস করে বলে——+

“You couldn’t even handle this petty torture on your lips? How on earth are you going to survive this untamed, wild version of me, missile girl? (এই সামান্য ঠোঁটের অত্যাচার সহ্য করতে পারিস নি? এই বেশামাল আমি টাকে কীভাবে সামলাবি, মিসাইল গার্ল? আমার ভালোবাসা তোকে ধ্বংস করে দেবে, তুই কি তৈরি সেই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য?)
ল্যাম্পপোস্টের আলো দরজার ফাঁক গলে ঘরের মেঝের ওপর এক ফালি মায়াবী ছায়া ফেলেছিল। সেই আলো-আঁধারিতে হেরার নিথর, অবশ শরীরটা নাভানের বুকের ওপর ঢলে পড়ল। জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে হেরার চোখে ভেসে থাকা সংশয় আর তীব্র অন্বেষণ তখন শান্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু নাভানের ভেতরে চলা ঝড়ের গতি একটুও কমেনি।
নাভানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক উন্মত্ত, অধিপতিসূচক হাসি। সে কথাটি শেষ করতেই আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
হেরার জ্ঞানহীন, নিস্তেজ ঠোঁট দুটোর ওপর সে নিজের শক্ত, উত্তপ্ত ঠোঁট দুটোকে ভারীভাবে চেপে ধরল। নাভানের এক হাত হেরার নমনীয় কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ভিজে যাওয়া শরীরটাকে নিজের বুকের সাথে তীব্রভাবে পিষে নিল—এমনভাবে, যেন এই অবশ অবস্থাতেও হেরা টের পায়, নাভানের অধিকারবোধ কতটা গভীর আর অন্ধকার।

হেরার অবশ হয়ে আসা উষ্ঠের রসে নিজের বছরের পর বছর জমে থাকা তৃষ্ণা মেটাতে মেটাতে নাভান গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল। স্পর্শটা মৃদু ছিল না, তাতে ছিল তীব্র ক্ষিপ্রতা আর নিজের করে নেওয়ার অন্ধ উন্মাদনা। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের উত্তাপ হেরার বরফশীতল মুখে আছড়ে পড়ছিল।
হেরার ঠোঁটে নিজের অধিপত্য বুনতে বুনতে নাভানের মনের গহীনে আকুল শব্দগুলো প্রতিধ্বনি তুলে উঠল—
‘জাস্ট একটু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে দে অক্সিজেন … আপাতত তোর ঠোঁটের এই সুধা পান করেই আমার বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা তৃষ্ণা মিটাই। জান কথা দিচ্ছি, তোর মনের সব অধরা আশা পূর্ণ করেই তোকে পুরোপুরি নিজের মধ্যে বিলীন করে নেব। আপাতত এই সামান্য ভুলটুকু আর একটুখানি অধৈর্যের জন্য অন্তত আজকের রাতটায় আমার ওপর রাগ করিস না, কলিজা… প্লিজ!
নাভানের বাঁধভাঙা শোষনে আর কামনাময় স্পর্শে ঘরটির বাতাস যেন আরও ভারী ও বিষাক্ত হয়ে উঠল। হেরা নিশ্চেত হয়ে পড়ে রইল তার বুকে, কিন্তু নাভান তাকে নিজের শরীরের আগুনে আঁকড়ে রইল এক অনন্ত অধিকারের মতো। অজ্ঞানরত হেরাকে নিজের করে একটু শোষণ করলো অবাধ্য নাভান। হ্যাঁ নাভান যে হেরার প্রতি বড্ড অবাধ্য। বির বির করে হেরাকে পাজা কোলে তোলে বলতে থাকে……

“আমি তোর অবাধ্য অক্সিজেন… আর এখন তোকে শুষে নেওয়ার সময়!
আমার এই বিধ্বংসী ছোঁয়া তোর জীবনের সব নিয়ম ওলটপালট করে দিক, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না—আজ ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু পরের বার না।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫১ (৩)

প্রস্তুত হ, অক্সিজেন ! নিজেকে শক্ত করে সামলে নে। কারণ যে তীব্রতা তোর বুকে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে, তা স্রেফ একটা ছোট্ট ট্রেইলর মাত্র… ‘পিকচার তো আবি বাকি হ্যায়!’
তোর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিয়ে এই মাতাল, অবাধ্য আমিটাকে কীভাবে সামলাবি, তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত কর।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (২)