Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫২
সুরভী আক্তার

কতকগুলো অভিযোগ মন গহীনে পুষে রেখেছিলো একবিংশী । আজ অভিমানে উগড়ে দিলো সবটা । হয়তো বেখেয়ালে । বলতে বলতে কান্নার তোপ বেড়েছে এক পর্যায়ে । লোকটার বুকের মাঝে জায়গা করে নিয়ে এখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে । এতক্ষণে রৌদ্রের বুকের জ্যাকেটের অংশ নোনা জলে ভিজে একাকার ।
তবুও হেরফের নেই তার । বরং চুপ থেকে মনযোগ দিয়ে শুনলো রমনীর সব অভিযোগ । মেনেও নিলো । থামানোর চেষ্টা করলো না আজ । নীরব রইলো বহুক্ষণ । মেঘার কান্না হেঁচকিতে রুপ নেয় । ফোঁপানি কমে আসতেই হেঁচকি ওঠে গলা চিরে । রৌদ্র ওর পিঠে আদুরে হাত বোলায় অনেকক্ষণ । শান্ত হতে দেয় রমনীকে । স্থির হতেই হীম শীতল কন্ঠে বলে…..

” সরি জান । খুব করে সরি । ভুল হয়ে গেছে আমার । আর কক্ষনো এ ভুল হবে না । অনেক দূরে থেকেছি, আর থাকবো না । আর একলা ছাড়বো না তোমায় । এবারের মতো ক্ষমা করে দাও , প্লিজ । এখন থেকে সবসময় ভালোবাসবো । আগলে রাখবো খুব করে ।
তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তর ভেসে আসে রমনীর রুদ্ধ কন্ঠ চিরে…
” পারবেন না আগলে রাখতে । আমি চলে যাবো !
” কোথায় যাবে আমায় ছেড়ে ?
” অনেক দূরে !
” কিন্তু আমি তো যেতে দেবো না তোমায় !
” আটকাতেও পারবেন না ।
” পারবো ! দেখে নিও ! সারাজীবন আটকে রাখবো ।
” জোর করবেন ? যেভাবে জোর করে বিয়ে করেছেন আমায় !
” জোর করে বিয়ে না করলে তোমাকে এভাবে নিজের করে পেতাম না । ওভাবে বিয়ে করাটা প্রয়োজন ছিলো । ওভাবে বিয়ে করেছি বলেই পেয়েছি তোমায় ।

” পেয়েছেন বুঝি ? কিভাবে পেলেন ?
” এইযে আমার বউ রুপে পেলাম !
” আমি আছি কদিনের জন্য । এ বাড়িতে থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে আমার । এরপর যদি কখনো চলে যাই , পারবেন আটকাতে ? আটকাতে না পারলে আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই একেবারে চলে যাবো ।
” খুব পারবো । কথা দিলাম ,, কোত্থাও যেতে দেবো না তোমায় ।
মেঘা কেমন ওষ্ঠ কামড়ে কেঁদে ওঠে । চোখ মুখ খিচে কান্না চাপে । হাত উঠিয়ে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রৌদ্র কে । ক্রন্দনরত স্বরে থেমে থেমে বলে….

” আমি চলে যাবো , রৌদ্র ! অনেক দূরে চলে যাবো ! আপনি কিছু জানেন না । কিচ্ছু না । আমাকে নিয়ে যাবে । এ বাড়িতে থাকতে দেবে না । এতদিন বাধ্য হয়ে এ বাড়িতে রেখেছিলো আমায় । কিন্তু এখন আর রাখবে না । চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে আমার । আমাকে যেতেই হবে । আমি যে ওর অবাধ্য হতে পারবো না । আমি চলে যাওয়ার আগে কেনো ফিরে আসলেন আপনি ? কেনো আমাকে এভাবে দূর্বল করে দিলেন ? আমি তো ঘৃণা করতাম আপনাকে । এতো বছর ধরে ঘৃণা করে এসেছি । তাহলে আমার এই ঘৃণা দূর্বলতায় রূপ নিলো কবে ? কেনো আমার কষ্ট হয় আপনাকে দেখলে ? বলুন না !

মেঘা কান্নার মাঝে অস্থির । ছটফট করে বুকের মাঝে লুকিয়ে থেকে । রৌদ্র ওর এহেন অবস্থা দেখে বিচলিত হয় । রমনীকে টেনে আলগা করে । কেঁদে কেঁটে একাকার সে । চোখ মুখ ভিজে জবজবে । এলোমেলো ক’গাছি খুচরো চুল ভেজা মুখে লেপ্টানো । বেপরোয়া লোকটা আঁতকে ওঠে তার একবিংশীর এহেন অবস্থায় । তড়িঘড়ি করে দু’হাতের আজলে রমনীর আদল আগলে নিয়ে শান্তনা দেয়….
” ওওওওও জাননন , লুক এট মি । লুক লুক,, প্লিজ কাম ডাউন । স্টপ ক্রাই । আ’ম রৌদ্র , সব জানি আমি । তোমাকে কোত্থাও যেতে দেবো না । ওকে ? কেঁদো না প্লিজ । আমি আছি তো । সারাজীবন তোমাকে আমার করে রাখবো । কেউ তোমাকে আমার থেকে নিয়ে যেতে পারবে না । তাইতো বিয়ে করেছি । তুমি শুধু আমার । এই রৌদ্রের রৌদ্রময়ী তুমি । নিজেকে বাঁচাতে তোমায় প্রয়োজন আমার । আমি কোথাও যেতে দেবো না তোমায় ।
মেঘা ওষ্ঠ উল্টে জানতে চায়…

” সত্যিই ?
” হান্ড্রেড পার্সেন্ট । তুমি আমার ,, হু ? শুধু আমার ‌। আমার হয়েই থাকবে ।
মেঘা শ্বাস ফেলে ওর বুকে মাথা নামিয়ে রাখে । চোখ বুজে নেয় ।
মেহমানরা চলে যাবেন । যাওয়ার আগে মেঘার সাথে দেখা করার জন্য তড়িঘড়ি করে উপরে উঠলো সারা । দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো । এপাশ ওপাশ তাকিয়ে গলা চিরে সশব্দে ডাকার আগেই চোখ পড়লো বারান্দায় । অমনি তড়াক করে আঁখি যুগল বৃহৎ হয়ে আসলো ওর । রৌদ্রের বুকে গুটিয়ে আছে মেঘা । সারা চরম আশ্চর্যান্বিত হলো । বিষ্ময়ে ঠোঁট ফাঁক হয়ে আসলো তার । অস্ফুটে কিছু বলার আগেই দুঠোঁটের মাঝে আঙ্গুল চেপে সারাকে চুপ থাকার ইশারা দিলো রৌদ্র । নিঃশব্দে ইঙ্গিত দিলো , যেনো শব্দ না করে । রৌদ্রের সাথে চোখাচোখি হতেই ভ্যাবাচ্যাকা খায় সারা ‌। থতমত দৃষ্টি নামায় দ্রুত । জিভে কামড় বসিয়ে মুহুর্ত কয়েক বাদ পিটপিট করে চোখ তোলে । মুখ গোল করে বিড়বিড়িয়ে বোঝায়….

” আমি চলে যাচ্ছি ।
রৌদ্র আলতো ঘাড় কাত করলো । সায় দিলো , আবারো ইশারা করে বোঝালো , যেনো নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । তাই করলো সারা । এক মুহুর্ত ও বিলম্ব করলো না । তড়িঘড়ি পায়ে দ্রুত কদমে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । দুটোর কান্ড দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো ফিক করে ।
রুম থেকে বেরিয়েই শাফাহ্ আর শিশিরের মুখোমুখি হয়েছে সে । শাফাহ্ ঘরে ঢুকছিলো , আর শিশির তার পাশের ঘরে । না চাইতেও ঐ লোকটার ঘরের দিকে যাচ্ছিলো সে । সারা কে হন্তদন্ত দেখে থামলো দু’জনেই । সারা শাফাহ্ কে বাঁধা দিয়ে চাপা স্বরে চটপট বলে….
” শাফাহ্ ,, আ…. এখন রুমে যেও না !
” কেনো ?
” না মানে , রুমে রৌদ্র ভাইয়া আছে । ওখানে যাওয়া টা ঠিক হবে না । এখন যেও না প্লিজ । নিচে যাও আপাতত ।
শাফাহ্ কিছুটা বুঝলো । তবে শিশির বুঝলো না । চোখ সরু করলো সে ।
মিনিট কয়েক পেরোয় । ব্যালকনিতে দুজনার মধ্যে পিনপতন নীরবতা । শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া বইছে । মেঘা একেবারে স্থির ।

রৌদ্র এবার আর স্ববির রইলো না । আলগোছে রমনীকে সরালো নিজের বুক থেকে । দাঁড় করালো মুখোমুখি । চোখ তুলে চায় একবিংশী । চোখের জলে ভেজা পুরো মুখশ্রী । বারান্দার মিটমিটে আলোয় ঝিকঝিক করছে দুধে আলতা চেহারা । চিকচিক করে জ্বলছে ভেজা ভেজা কপোল দুখানি ।
রৌদ্র আলগোছে ঠোঁট ঠেলে হাসে । কোমর ছেড়ে দুহাত তুলে রমনীর ভেজা চোখের পাপড়ি মুছে দেয় আলতো করে । ভেজা মুখশ্রী দুহাতের তালুর সাহায্যে মুছিয়ে দেয় ‌। অতঃপর দুই কপোলে আলতো করে হাত রেখে ঠোঁট নামিয়ে নরম আবেশে চুমু খায় দুচোখের পাতায় । অতঃপর আঁখি লতার সেই কাঁটা দাগে । মেঘা সুপ্ত অনুভূতিতে কুঁকড়ে যায় লোকটার ওষ্ঠাস্পর্শে ‌। সটান বুকে আলতো আঘাত করে বলে মেকি স্বরে….
” ইউ রাইনো ,, আপনি খুব খারাপ । খুব কষ্ট দিয়েছেন আমায় । আমি ঘৃণা করি আপনাকে !
হেসে ফেলে রৌদ্র । কিছুটা শব্দ করে হাসে ।

” আচ্ছা , ঘৃণা করিস আমায় ? এ কেমন ঘৃণা , যেখানে আমাকে ঘৃণা করেও আমার জন্য কাঁদছিস ? আমার বুকে মুখ লুকিয়ে আমার নামেই অভিযোগ করছিস ?
মেঘা মুখ বাঁকায় । বলে না কিছু ।
রৌদ্র ধীরে সুস্থে একবিংশীর কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে নেয় ‌। উল্টোদিকে রমনীর চোখ খোলা । সে বেপরোয়া লোকটার উহ্য অস্থিরতা বেশ পরিমাপ করতে পারছে । ‌রৌদ্র ধীরুজ স্বরে বলে…
” আই লাভ ইউ , জান । বিশ্বাস কর , খুব ভালোবাসি তোকে ! আর যন্ত্রণা দিস না আমায় !
” তুই বলছেন আবার !
” ওও সরি , আর বলবো না ।
” মদ খেয়েছেন ?
” একটুখানি !
” কথা দিন , আর কক্ষনো খাবেন না ।
রৌদ্র একটু বেকায়দায় পড়লো । কিয়ৎ কাল বাদ সায় দিয়ে বললো…

” খাইনি তো বহুদিন । ফিরে এসে আবার খাওয়া শুরু করেছি । আবার ছেড়ে দেবো । আর কক্ষনো খাবো না ।
” সিগারেট ও খাবেন না ! ঠোঁট পুড়ে কালো হয়ে গেছে ।
” আচ্ছা খাবো না ।
” বেপরোয়া হয়ে ঘুরবেন না আর !
” ঘুরবো না ।
” অবাধ্যতা ?
” ভুলে যাবো । তোমাকে পেলে ভুলে যাবো সব অবাধ্যতা ! পুরো বাধ্য হয়ে দেখাবো । বাধ্য স্বামী হয়ে যাবো তোমার । যা বলবে তাই শুনবো ।
মেঘা মুচকি হাসলো । আরো বললো….
” ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার , সব বাড়িতে করবেন !
” করবো ।
” মা, বাবা, এ বাড়ির সবার সাথে ভালোমতো কথা বলবেন ।
” বলবো ।
” বাড়িতে থাকবেন !
” থাকবো !
” রোজ রাত আটটার আগে বাড়ি ফিরে আসবেন !
” আসবো ! তবে একটা শর্তে !
” কি ?
” তোমাকে আমার সাথে থাকতে হবে ! আমার রুমে ! না শুনবো না ,, প্লিজ ।
আকস্মিক অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামালো রমনী । চিবুক ঠেকালো গলায় । উত্তর করলো না । রৌদ্র অপেক্ষায় থাকতে ব্যাকুল । তর্জনী দিয়ে একবিংশীর চিবুক উঁচিয়ে ধরলো সে । উৎকন্ঠায় হাঁসফাঁস করে বললো….

” প্লিজ ইভারা । আমি তোমাকে চাই । আর বারন শুনবো না । পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে , অপেক্ষা করেছি । অধীর আকুলতা নিয়ে সময় গুনেছি । এই পাঁচ বছর অনেক দূরে ছিলাম , সময় দিয়েছি তোমায় । দূরে থেকে নিজেকে পরিবর্তন করেছি । আর পারবো না !
একবিংশীর ভেজা মুখশ্রী রাঙিয়ে ওঠে । ভারী লজ্জা পায় সে । তবে বুঝতে দেয় না । ফের চোখ নামিয়ে এপাশ ওপাশ ঘন পলক ফেলে । দ্বিধাদ্বন্দ্বে ডুবেছে তার নির্মল হৃদয় । রৌদ্র ডাকে…
” ইভারা , প্লিজ । আপাতত শুধু রুমে শিফট করতে হবে । আর বেশি কিছু না ।
মেয়েটার নীরবতা দেখে মুচকি হাসে সে ।
” আই নো , সাইলেন্স গিভস কনসেন্ট ।
তাহলে আজ থেকে আমার বউ আমার কাছে থাকছে ?

” মোটেও না ।
” তাহলে ?
” জানি না !
” কে জানে ?
” কেউ না ! চুপ করুন ।
তৎক্ষণাৎ কথা মেনে চুপ করে রৌদ্র । দৃষ্টি করে তীক্ষ্ণ । গভীর চোখে দেখতে থাকে মেয়েটাকে । বড্ড আবেদনময়ী তার এই একবিংশী । যেমনটা ছয় বছর আগে ছিলো , তেমনটাই । বরং অনেকাংশে বেশি । এখন সে একবিংশী । রৌদ্র কে সামাল দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী । নতুবা তখন ছিলো না । তাইতো এতো প্রতিক্ষা । নিঃশব্দে শ্বাস টানে রৌদ্র ।

টুপ করে ঠোঁট ছোঁয়ায় কপালে । একটু থমকায় । পরক্ষনে খেই হারায় । একে একে বেসামালের ন্যায় পুরো মুখশ্রী জুড়ে অধর ছোঁয়ায় সে । রমনীর ওষ্ঠপূট স্পর্শ করলো বেশ কয়েকবার । এলোমেলো তার ওষ্ঠাস্পর্শ । মেঘা হতভম্ব । বেপরোয়া যুবক একবিংশীর ভেজা ভেজা পুরো মুখশ্রী জুড়ে ছোট ছোট বহু পরশ বুলিয়ে দিয়ে ক্ষণকাল বিরতি নেয় ! চোখ মেলে তাকায় রমনীর মুখ পানে । স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে মেয়েটা ‌। চোখাচোখি হয় গভীর ভাবে । বাঁধা দিচ্ছে না এই মেয়ে ! নড়ছেও না । তাহলে কি চাইছে ? ওর নীরব সম্মতি বুঝে রৌদ্র আরেকটু অগ্রসর হয় । অধর ছুঁই ছুঁই দুজনার । তিরতির করে কাঁপে ললিতাঙ্গ । এ বেলায় নিজেকে ধরে রাখতে গিয়ে বড্ড হিমশিম খেলো একবিংশী । লোকটার উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পড়ছে তার মুখের উপর । আর পারে না সে ,‌ যুবকের উদরের দু’পাশ খামচে চোখ খিচে নেয় । আটকে নেয় শ্বাস । তা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিচেল হাসে রৌদ্র । কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে….

“ ইউ ওয়ান্ট ইট ,, সুইটহার্ট ?
অগত্যা ঘোর ছুটে যায় রমনীর । অনেকটা ধারালো ভাবে রৌদ্রের কথাটা কানে বিধলো । শিরশির করে উঠলো সর্বাঙ্গ । কেঁপে উঠলো সে । তড়াক চোখ খুললো । লোকটাকে দূরে ঠেললো এবার । এক রাশ ভরা লজ্জায় মুড়িয়ে গেলো মেয়েটা । ঝিঁঝিঁ ধরলো নরম কায়ায় । নিজেকে ছাড়িয়ে পিছু ফিরে মুখ আড়াল করলো সে ।
” একদম না ।
রৌদ্র ভ্যাবাচ্যাকা খায় । নিজের কান্ডে কপাল চাপড়ায় । শুধরে নিয়ে ঝটপট বলে….
” ওওও গড ,, জিজ্ঞেস করে কি ভুল করলাম ?
আচ্ছা আরেকবার শুরু করি চলো । এবার আর জিজ্ঞেস করবো না । বেশি ভাব নিতে নেই । সুযোগ পেলে লুফে নিতে হয় । এবার লুফে নেবো । কড়ায় গন্ডায় লুফে নেবো একদম । একাংশেও ছাড় দেবো না ।

রাত অনেকটা । ঘুমোনোর প্রস্তুতি চলছে । বিছানার ব্যাকবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে বসে ল্যাপটপ ঘাটছে আদ্র । ওয়াশ রুম থেকে শাড়ি পাল্টে বেরোলো শিশির । শব্দ পেয়ে চোখ তোলে সে । নীল রঙের হালকা পাতলা সুতির একটা থ্রি পিস পড়নে মেয়েটার । হিজাব ছাড়া আজকাল বড্ড বেশি নজর কাড়ছে মেয়েটা ।
শিশির তাকিয়ে সোজাসুজি এসে বিছানার উপর থেকে বালিশ আর চাদর তুলে নিলো । এগোলো সোফায় দিকে । এতে চোখ কুঁচকায় আদ্র । ভরাট কন্ঠে পিছু ডাকে….
” এইইই ,, কোথায় যাচ্ছো ?
উত্তর নেই । আদ্র ল্যাপটপ রেখে নেমে পড়ে ব্যাস্ত হয়ে ।
” শিশির ,, বিছানায় এসে শোও !
“…….
” কি হলো ,, কথা কানে যাচ্ছে না ? বিছানায় আসতে বলেছি আমি ।
সোফায় বালিশ রাখে শিশির । শরীর এলিয়ে দেওয়ার আগে আদ্র গিয়ে হেঁচকা টানে ওকে দাঁড় করায় । চোখ রাঙিয়ে রেগে বলে….
” বেয়াদব ,,, কথা কানে যায় না তোমার ? জেদ দেখাচ্ছো কাকে এতো ? কথা বলছো না কেনো , হ্যাঁ ? চাইছো আমি জোরাজুরি করি ? আমাকে রাগিও না শিশির, ভালো হবে না এর ফল । চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ো ।

আদ্রের হুমকির বিপরীতে শিশির ওর হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় । বলে তেজ দেখিয়ে….
” হাত ছাড়ুন আমার । ছোঁবেন না । নাক গলাবেন না আমার বিষয়ে । জোরাজুরি তো অনেক দূর । শোবো না আমি বিছানায় । আমি এখানেই ঠিক আছি ।
তড়তড় করে রাগ ওঠে মস্তিষ্কে । রক্ত বর্ন ধারন করে আদ্রের দু’চোখ । ফের মেয়েটার কনুই ঠেসে নিজের দিকে টেনে আনে , পূরু কন্ঠে ধমকায়….
” তুমি বড্ড বাড়াবাড়ি করছো ! বিয়ে হয়েছে আমাদের !
” সেটাই তো আমার সমস্যা । কেনো হয়েছে এই বিয়ে ? কেনো আমাকে বিয়ে করেছেন আপনি ? আপনি বুঝতে পারছেন না ? অস্বস্তি হচ্ছে আমার ! স্টুডেন্ট আমি আপনার !
” তোমার এই বেয়াদবির জন্য বিয়ে করেছি আমি তোমায় ! বেয়াদব !! এই শোনো , তুমি এখনো আমার স্টুডেন্ট ? তবে শোনো, তোমার মতো বেয়াদব স্টুডেন্টকে বিয়ে করা আমার কর্তব্য ,, বুঝলে বেয়াদব ?
আদ্র মুখ ফসকে ভুলভাল গন্ডগোল বলে ফেললো । মুখ কুঁচকায় শিশির ।

” হোয়াট ?
” ইয়াহহ্ !
” পাগল হয়ে গেছেন ? হাত ছাড়ুন !
” বিছানায় গিয়ে শোও ।
” শোবো না ।
” আমাকে বাধ্য করিও না অন্য কিছু করতে । জোর করলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে , বলে রাখলাম ।
” ভয় দেখাচ্ছেন ?
” দেখাচ্ছি ! একটু ভয় ঢোকাও মনে ! আমি কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারি তোমার সাথে !
শিশির বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করলো না । আবারো সোফার দিকে এগোলো ‌। তা দেখে চরম রেগে যায় আদ্র । এবার আর কথা এগোয় না । এক হেঁচকায় রমনীর ফিনফিনে পাতলা দেহ খানা তুলে নেয় নিজের কবলে । ভড়কায় শিশির । আকস্মিক দিক দিশা খুইয়ে বেখেয়ালে লোকটার গলা জড়িয়ে ধরে । ততক্ষণে ওকে খাটে ছুড়ে মেরেছে আদ্র । কোমরে কিঞ্চিত ব্যাথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করলো সে । বেঘোরে ঝাড়ি মেরে বললো….

” উফফফ , খাটাস – দার্জাল লোক । মেরে ফেলবেন আমায় ?
” উঁহু , মারবো না । তোমায় মারলে আমি বাঁচবো কাকে নিয়ে ? তবে হ্যাঁ , খাট থেকে যদি এক পা নিচে নামিয়েছো , তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না , বলে রাখলাম । ফাউ হুমকি দিচ্ছি না ।
শিশির অবাধ্য হয়ে তড়তড়িয়ে খাট থেকে নামতে উদ্যত হয় । পা ঝুলিয়ে মেঝেতে নামানোর আগেই থমকায় ‌। লোকটার শাসানি গায়ে লেগেছে । পিটপিট করে অসহায় চোখে পিছু ফিরে তাকালো । জিজ্ঞাসা করলো বোকার মতো….
” নামলে কি করবেন ?
ভয়ে ভয়ে বলা এহেন বোকা বোকা স্বরে বড্ড হাসি পেলো আদ্রের । এমনকি সে হেসেও উঠলো । পরক্ষনে বহু কসরতে হাসি চাপলো ঠোঁট কামড়ে । বুকে হাত গুটিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো….
” নেমেই দেখো । যা করার বাকি রেখেছি । তাই করবো ।
ফোঁস করে উঠলো শিশির । মুখ ঝামটা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলো । দাঁত খিচে উচ্চারণ করলো…..
” অসভ্য !

সকাল সকাল ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসেছেন বাড়ির সকলে । রৌদ্র নামলো সবার শেষে । চোখে ঘুম এখনো । শাফাহ্’র পাশের চেয়ারটা ফাঁকা । রৌদ্র চোখ বুলিয়ে সবাইকে দেখে নেয় । আদ্রের একপাশে মেঘা , অন্যপাশে শিশির । তা দেখে চোখ মুখ খিচে আসে তার । তেড়ে এসে হুংকার ছাড়ে ধৈর্য রেখে….
” টুকটুকি , এই চেয়ারটাতে এসে বস । আমি ওখানে বসবো ।
চকিতে তাকালেন সবাই । শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে চায় । চোখ পাকাতেই তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে দেয় ‌। ধপ মেঘার পাশের ঐ চেয়ারটায় বসে পড়ে রৌদ্র । কাতর কন্ঠে বলে….
” MP ,, খাবার বেড়ে দাও ।
মেঘা এপাশ ওপাশ আড়চোখে তাকায় । রুবিনা কাবির এসে পরোটা তুলে দেন ছেলের পাতে । মেঘার প্লেট থেকে অমলেট তুলে নিয়ে খেতে শুরু করে রৌদ্র ।
আহিয়ানের অফিস আছে । সবার সামনে কিছু একটা বলার আছে ওর । উশখুশ করছে কথা তোলার জন্য । আর পারলো না চুপ থাকতে । খাওয়ার মাঝে সবার উদ্দেশ্যে মুখ খুললো……
” আমার একটা কথা বলার ছিলো !
বিকেলে তো সবাই বাড়িতেই থাকবে ! আমি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবো আজ । সবাইকে নিয়ে বেরোবে একটু । বাবা,বাবাই, মা,মনি – সবাই যাবেন !
তৌসিফ কাবির চোখ সরু করে প্রশ্ন করেন….

” কোথায় যাবে ?
” সেটা সারপ্রাইজ ! সবাইকে নিয়ে যাবো , গেলেই দেখতে পাবেন ।
সিরাত আগ্রহ নিয়ে একই প্রশ্ন করলো….
” সারপ্রাইজ ? কিসের সারপ্রাইজ ? কোথায় নিয়ে যাবে তুমি ?
আহিয়ান বউয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে । শীতল কন্ঠে বলে …..
” সারপ্রাইজ , বলে দিলে কি আর সারপ্রাইজ থাকে নাকি ? নিয়ে যাবো, তখন দেখে নিও ।
” কিন্তু ,, বিকেলে যাবে ? শিশির তো থাকবে না তাহলে ? দুপুরে তো ওর বাপের বাড়িতে যাওয়ার কথা ।
আদ্র মাঝ থেকে বললো….
” ডোন্ট ওয়ারি ,, সন্ধ্যার পর ওকে নিয়ে যাবো । জিজু কোথায় যেতে চাচ্ছে , সেখান থেকে ফিরে আসি আগে ।
রৌদ্রের বোধহয় পছন্দ হলো না । শিশির বাপের বাড়িতে ফিরে যাবে ? সন্দেহ কাটাতে ব্যাঙ্গ করে বললো….
” কুয়াশা বাপের বাড়িতে যাবে ? কিন্তু কেনো ? এই কুয়াশা , বাপের বাড়ি গিয়ে কি করবে ? বিয়ে হয়েছে তোমার । বিয়ের পর শশুর বাড়িতে থাকতে হয় ,জানো না ? বাপের বাড়ি যাওয়া হবে না । শশুর বাড়িতে থেকে নিজের স্বামীকে দেখে রাখো । তোমার স্বামী ভালো না !
আদ্র চোখ পাকায় । রৌদ্রের সম্বোধন টা ভালো লাগলো না ওর কাছে । গুরুভার কন্ঠে ধমকের সুরে বলে সে….
” রুডি , হোয়াট ইজ কুয়াশা ? কল’ড হার শিশির !
” আদ্র ,, হোয়াট ইজ মেঘ বুড়ি ? কল’ড হার মেঘা ! ওক্কে, ব্রো ?
রৌদ্রের ট্যারাব্যাকা ভ্যাঙানো স্বর । আদ্র চোখ সরু করে । ফোঁস করে শ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ে । এই ছেলে শোধরাবে না ।

কথা মোতাবেক বিকেলেই বাড়ি ফিরেছে আহিয়ান ।
ওর কথাতে বাড়িতেই ছিলেন সকলে । শুভ্র ও ফিরেছে তাড়াতাড়ি ।
বাড়ির সব সদস্য , মোটে তিনটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে কোথাও । পথ চিনিয়েছে আহিয়ান । বাড়ি থেকে বেরিয়ে মিনিট ত্রিশের মাথায় কোথাও একটা গন্তব্যে পৌঁছালো ওরা । উত্তরা চার নাম্বার সেক্টরে নতুন একটা এপার্টমেন্ট হয়েছে । গাড়ি থামলো তার সামনে ‌। খুব বড় নয় , তবে খুব ছোট ও নয় । নতুন একটা ফ্লাট । সব গাড়ি একে একে থামলো তার সামনে । প্রথম গাড়িতে আহিয়ান, সিরাত, রামিশা, মেহের আর শুভ্র । ওরা নামতেই নেমে পড়লো বাকিরাও । একজোট হতেই এপাশ ওপাশ চায় সকলে । আবাসিক এলাকা । ভীষণ শান্ত আর মোলায়েম আশপাশ । সিরাত এদিক ওদিক ফিরে ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে…..

” আহিয়ান , আমরা এখানে আসলাম কেনো ?
” তোমার সংসার দেখতে !
মেয়েটা বুঝলো না । এমনকি , কেউই বুঝলো না । সবার নির্বোধ মুখো ভঙ্গিমা দেখে আহিয়ান মৃদু হাসে । রামিশাকে এক হাতে আগলে অন্যহাতে সিরাতের কাঁধ জড়িয়ে নেয় সবার সামনে । বাড়ি মুখো হয়ে মাথা তুলে হাঁফ ছেড়ে বলে…..
” এটা আমাদের বাড়ি সিরাত ,, তোমার বাড়ি । আলাদা একটা সংসার চেয়েছিলে না ? এখানে হবে আমাদের সংসার ! তোমার সংসার । তুমি সাজাবে সংসার । আমি বাড়ি বানিয়েছি , তুমি শুধু সংসার টা সাজিয়ে নিও ।
” মানে ?
” আগে ভেতরে চলো । তোমার বাড়িতে সবার আগে তোমার পদার্পণ হোক ।
মেয়েটা এখনো অবুঝের মতো পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । আর কিছু না বলেই সবাইকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আহিয়ান । নতুন গড়া হয়েছে ফ্লাট । মার্বেলের উজ্জ্বলতায় ঝিকঝিক করছে পুরো বাড়ি । বিভিন্ন আসবাবে ভরপুর । দোতলা ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট । দেখেই স্তব্ধ হয়ে যায় সকলে । সিরাত একটা সংসার চেয়েছিলো । আর আহিয়ান তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এই বাড়িটা । আর অবশেষে উপহার দিয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে ।

সবটা খুলে বললো সে । কদিনের মধ্যে তারা এই ফ্লাটে শিফট করবে । সব আছে এখানে । শুধু ওদেরই কমতি । কাবির ম্যানসনে ওদের কিছু নেই । আছে টুকটাক জামাকাপড় । সেসব গুছিয়ে একেবারে শিফট হবে এ বাড়িতে ।
সবটা শুনে আরো বেশি স্তম্ভিত হয়ে যায় সকলে । বসার ঘরে বসেছেন তারা । কারোর দ্বিমতের কোনো অধিকার নেই । বড়জোর তারা মন্তব্য পেশ করতে পারবেন ।
এই বাড়িটা নাকি সিরাতের নামে । কিছু কাগজপত্র ওর হাতে ধরিয়ে দিলো আহিয়ান । নেওয়াজ বাড়ি থেকে সিরাত কে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো প্রায়শই । তাইতো আহিয়ান এ বাড়িটা ওর নামেই লিখে দিলো । এখন এটা ওর নিজের বাড়ি , ওকে বের করে দেবে কার সাধ্যি ?
সবটা শুনে চোখ ছলছল সিরাতের । বাকরুদ্ধ সে । কন্ঠে কথা আসছে না । সে ভরা চোখে চায় স্বামীর পানে । টুপ করে গাল বেয়ে পানি গড়ায় । আহিয়ান কেবলই মুচকি হেসে দুদিকে মাথা নাড়ে । সবার সম্মুখে দ্বিধাহীন স্ত্রীর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে….
” এই নাও তোমার সংসার ! এখানে এবার ইচ্ছে মতো সবটা সাজাও । বাড়িটাও তোমার , আর সংসার টাও । আমি আর রামিশাও । গুছিয়ে নাও তুমি । আমার মেয়ে , আমি আর আমার স্ত্রীর নতুন সংসার । পছন্দ হয়েছে ?
জল ভরা চোখে চেয়ে এক পশলা হাসে সিরাত ‌। মাথা ঝাঁকায় হ্যাঁ বোধক । খুশিতে আপ্লুত সকলে ।

এখানকার ঝামেলা চুকিয়ে শিশির কে নিয়ে শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে আদ্র । সন্ধ্যা গড়িয়েছে । সময় তখন সাতটা প্রায় । শহরের ব্যাস্ত রাস্তায় যানজট । ড্রাইভিং সিটে বসে যানজটে থেমে থেমে এক মনে ড্রাইভ করছে সে । পাশে শিশির বসা । জানালা পানে মুখ করে স্থির বসে এক মনে চেয়ে আছে বাইরের দিকে । আদ্র ক্ষণে ক্ষণে তাকাচ্ছে ওর পানে ‌। গাড়িতে ওঠার পর সেই শুরু থেকেই নীরবতা । কেউ কথা বলে নি ‌।
আদ্র দু একবার মুখ খুলতে উদ্যত হয়েও থেমে গেছে । চুপ থাকাই শ্রেয় । ট্রাফিকে গাড়ি আটকে রয়েছে মিনিট দুয়েক ধরে । স্টিয়ারিংয়ে দুহাত রেখে আঙ্গুল নাচাচ্ছে সে । জানালার কাচ গলিয়ে বাইরের দিকে কিছু একটা লক্ষ হতেই তড়িঘড়ি করে গ্লাস নামালো । ইশারায় ডেকে টুকটাক দু একটা কথা বলে কিছু কিনলো । টাকা পরিশোধ করে জানালা তুলে দিলো আবার । কাগজের ঠোঙা । ভেতরে বাদাম । টু শব্দও না করে শিশিরের কোলে ঠোঙাটা আলগোছে রাখলো সে ।
আড়চোখে তাকায় শিশির । ভেংচি কেটে ঠোঙাটা সরিয়ে রাখে ‌গাড়ির ফ্রটের গ্লাভ বক্সের দিকে ।
আদ্র গা ছাড়া ভাবে মেকি স্বরে বলে….

” পুরো কুড়ি টাকা দিয়ে কিনেছি । টাকা কি গাছে ধরে নাকি ? কেউ যেনো খেয়ে নেয় ।
” আমি কাউকে কিনতে বলিনি !
” তার বলার অপেক্ষা রাখি না আমি । চাওয়ার আগে সবকিছু তার সম্মুখে এসে যাবে ।
শিশির ভ্রু জড়ো করে । প্রসঙ্গ ঘেঁটে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে
….
” আমার হাতে একটা আংটি ছিলো । সেটা কোথায় ?
” নেই !
” কাল অবধি ছিলো । সকালে উঠে আর পাইনি !
” পাবেও না । অন্যের নামে পড়েছিলে ওটা । সরিয়েছি তাই । নতুন করে কিনে দেবো ।

শিশির দের বাড়ির বসার ঘরে সংকুচিত হয়ে বসে আছে আদ্র । এসেছে খানিক আগে । বেরোবে এক্ষুনি । থাকা হবে না । রেখে যাবে শিশির কে । এসেছে থেকে ইকরা কেমন করে দেখছে ওকে ।
ইকরা সব জেনে গেছে । ধারনা করতে বাকি নেই । ইতস্তত লাগছে এ পরিস্থিতিতে ।
আবিদের কাছ থেকে আরো শিওর হলো সে । ইকরা কে সব বলে দেওয়া হয়েছে ।
টুকটাক চা কফি খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়ালো আদ্র । আসার আগে সিফাতের জন্য অনেক চকলেট নিয়ে এসেছে । ছেলেটা খুশি মনে সব আগলে ধরে বসে আছে একপাশে । আজমিরা বেগম ও আছেন । আদ্র মুচকি হেসে তার থেকে বিদায় নিলো ।
এসেছে থেকে শিশির রুমে । বেরোয়নি একবারও । সে দোনামোনা করে ঘরে যায় । চিরচেনা সেই ঘরে জানালার কাছে মাথা এলিয়ে বসে আছে শিশির । স্থির সে , আদ্রের নরম ডাকে নড়েচড়ে উঠলো …
.
” শিশির ।
খাট থেকে নামলো মেয়েটা ।
” আমি যাচ্ছি ।
” হু ।
” যাচ্ছি !
নিচু স্বরে আবার বললো । শিশির প্রত্যুত্তর করলো না । খচখচ উথাল পাতাল মন নিয়ে পিছু ফেরে আদ্র । দরজা পর্যন্ত এগিয়ে আসে ‌। পা চলে না । কেমন হাঁসফাঁস লাগে । রমনীকে রেখে যেতে মন সায় দেয় না । থেমে পিছু ফেরে আবার । শিশিরের সাথে কাতর দৃষ্টিতে চোখাচোখি হয় । কেমন করে মলিন মুখে আবার বলে…..
” শুনলে তুমি ? যাচ্ছি আমি !
” যান !
” তুমিও চলো না ! এখানে থেকে কি করবে ?
” আজব ,, এটা আমার বাড়ি !
” কিন্তু ওটা আমার বাড়ি । আর তুমিও আমার । আমি সবকিছু আমার আমার চাই ।
চোখ নামালো শিশির । লোকটার মতিগতি বুঝে পায় না । কি যে বলে , কে জানে ! দ্বিতীয় বার চোখ তুলে তাকানোর আগেই হুট করে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেলো । আকস্মিক তেড়ে এসে শক্ত আলিঙ্গনে শিশির কে জড়িয়ে নিলো লোকটা । আর ধরে রাখতে পারে নি নিজেকে । তার এমন হুটহাট কান্ডে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে রমনীর অনুচ্চ তনু । চোখ জোড়া হয়ে আসে বৃহৎ । লোকটা তার কাঁধে মুখ গুজে নেয় । খোঁচা দাড়ির খোঁচায় শিরশির অনুভুতিতে শিউরে ওঠে মেয়েটা । গুড়িয়ে যায় সর্বশক্তি ।
আদ্র বলে দূর্বল গলায়…..

” রেখে যাচ্ছি আজ । ত্যারামো করবে না প্লিজ । নিজের খেয়াল রাখবে । আর লক্ষী মেয়ের মতো কাল ভার্সিটিতে চলে আসবে । তারপর সেখান থেকে আমাদের বাড়িতে । বিয়ে করেছি তোমায় , তোমাকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে । বুঝেছো ?

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫১

শিশির তাজ্জব , হতবাক । পাথরের ন্যায় জমে গেলো সে । আদ্র ছাড়ে ওকে । মুখোমুখি হয়ে ঠোঁট ঠেলে মুচকি হাসে । মেয়েটার বাম গালে আলতো চাপড় মেরে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় । ধীরুজ মোলায়েম স্বরে বলে…..
” আসছি ! আল্লাহ হাফেজ !

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৩