Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৫২

এই অবেলায় পর্ব ৫২

এই অবেলায় পর্ব ৫২
সুমনা সাথী

কাল রাতের আকস্মিক ঝড়টা যে তালুকদার পরিবারের ওপর এভাবে আছড়ে পড়বে, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। ঘটনার শুরুটা হয়েছিল কায়েফ আর আশরাফুলকে ঘিরে। আশরাফুলকে যখন কায়েফ একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নে কোণঠাসা করে ফেলছিল, ঠিক তখনই দিশাহারা আশরাফুলের শয়তানি মস্তিষ্ক চালিয়াতি করে বসে। নিজেকে বাঁচানোর শেষ পথ হিসেবে সে ঘর থেকে হুট করে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যায় এবং মুহূর্তেই বাইরের শেকল তুলে দেয়। তারপরই পুরো বাড়িসুদ্ধ মানুষকে সচকিত করে শুরু হয় তার বানানো চেঁচামেচি। কাউকে নাকি সে ঊর্মির সাথে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরে আটকে রেখেছে! কথাটা শুনেই উপস্থিত সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল দরজার ওপাশে। দরজা খোলার পর ঘরের ভেতর কায়েফকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সবাই একপ্রকার স্তব্ধ হয়ে যায়। যেন পরিচ্ছন্ন নীল আকাশে বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল! এরপর কত শত প্রশ্ন, তর্ক-বিতর্ক আর জেরা চলল, কিন্তু পরিস্থিতি এমন চাইলেও কেউ কায়েফ বা ঊর্মির কোনো যুক্তি বিশ্বাস করতে পারল না। রাতের অন্ধকারে আর কাজী ডাকা হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ দুপুরেই তাদের বিয়ে সম্পন্ন হবে। আর কাজ শেষেই বিকেলের ট্রেনে ঢাকা ফিরে যাবে তালুকদার পরিবার। সবেমাত্র বাড়ি ফিরে কুহুর মুখ থেকে এসব খবর শুনে থমকে গেল কলরব। মাথায় যেন একসাথে অনেকগুলো চিন্তা ভিড় করলো তার। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় শুধাল,

“নিযানা কোথায়? বাড়ি এসেছে না?”
কুহু নিচু গলায় বলল, “হ্যাঁ, আপু তো ভোর ভোরই বাড়ি চলে এসেছে।”
কলরব শুধু আলতো করে মাথা নেড়ে ভেতরের দিকে চলে গেল। কায়েফ আর ঊর্মির এই অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন নিয়ে বাড়ির সবাই এতটাই উদ্বিগ্ন ও ব্যতিব্যস্ত যে, কাল রাতে নিযানা আর কলরবের মাঝে কী ঘটে গেছে বা তারা কোথায় ছিল, সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুসরত কারো নেই। তবে আসল সমস্যা বেঁধেছে মাজহাকে নিয়ে। তিনি কিছুতেই এই বিয়ে আর পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। ক্ষোভে কেঁদে কেঁদে নিজের অবস্থা একবারে করুণ করে ফেলেছেন। আনতাসা, অলেখারা সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কোনো কিছুতেই তাঁর মন শান্ত করা যাচ্ছে না। বাড়ি জুড়ে একটা থমথমে নীরবতায় ছেয়ে আছে।
“চলুন নৌকা নিয়ে ঘুরে আসি।”
কানের এত কাছে হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠটা বাজতেই আঁতকে উঠল কুহু। ধক করে ওঠা বুকটা সামলে সামান্য পিছিয়ে গিয়ে অবাক চোখে তাকাতেই নজরে এলো অভিনব। কুহুকে অমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকাতে দেখে অভিনব একটু অপ্রস্তুত হওয়ার ভান করে বলল,

“আই মিন, বলতে চাইছি, চলুন নৌকা করে নদীটা থেকে একটু ঘুরে আসি।”
এমন একটা থমথমে, উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একটা মানুষ কীভাবে এতটা উদাসীন আর ফুরফুরে মেজাজে এমন কথা বলতে পারে, তা কুহুর মাথায় ঢুকল না। সে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে চড়া গলায় বলল,
“আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই অবস্থায় কে ঘুরতে যায়, বলতে পারেন?”
অভিনব বেশ সহজ সুরেই বলল, “কেন, শোনেননি? আজ বিকেলেই তো আমরা সবাই ঢাকা ফেরত চলে যাচ্ছি। তা আজ না গেলে নদীতে আর যাব কখন?”
“তো যাওয়ার দরকার নেই!”
“এভাবে বলবেন না তো! আমি ভীষণ কষ্ট পাব কিন্তু।”
অভিনব ঠোঁট উল্টে করুণ মুখ করার অভিনয় করল। কুহু চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
“তাতে আমার কী করার আছে?”
“তাহলে বরং একটু গান-বাজনার ব্যবস্থা করুন? বিয়ে বাড়ি বলে কথা। মরা বাড়ির মতো নিস্তব্ধতা ভালো লাগে বলুন? আমি খুব ভালো নাচতে পারি।”
কুহু আর কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। তার মেজাজ ততক্ষণে সপ্তমে চড়ে বসেছে। তীব্র বিরক্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল। ঠিক তখনই পেছন থেকে অভিনবের কণ্ঠ ভেসে এল,

“আমার সাথে কিন্তু আপনার আর কখনো দেখা হবে না।”
কুহুর পায়ের গতি কিছুটা শ্লথ হলো। অভিনব বলল,
“আমি নিযানাদের বাড়িতে মাত্র এক সপ্তাহের জন্যই এসেছিলাম। এখান থেকে ফিরেই লন্ডন চলে যাব ফুফুর বাসায়। ওখানে অনেক দিন থাকতে হবে।”
কথাটা শুনে কুহু থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল। গলায় সবটুকু ঔদাসীন্য ঢেলে দিয়ে বলল,
“তাতে আমার কী?”
অভিনব হালকা একটু হাসল। তার চোখের কোণে দুষ্টুমি। কুহুর দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে শুধাল,
“সত্যিই কিচ্ছু না? সিওর আপনি?”

পুকুরপাড়ের সানবাঁধানো ঘাটে নিথর হয়ে বসে আছে নিযানা। তার নিশ্চল দৃষ্টি থমকে আছে পুকুরের পানিতে। সকালে বাড়ি ফেরার পর থেকে আনতাসার সাথে আলাদা করে কথা বলার কোনো সুযোগ তার হয়ে ওঠেনি। তবে কিছুক্ষণ আগে পথচলতি একবার চোখাচোখি হয়েছিল। আনতাসা যেভাবে তীব্র আক্রোশ আর ক্রুদ্ধ নজরে তার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার পেছনের কারণটা নিযানার খুব ভালো করেই জানা। কিন্তু সময়ের এই কঠিন আবর্তে দাঁড়িয়ে কী করবে সে? চিন্তায় তার মাথার রগগুলো যেন ফেটে যাচ্ছে।আনতাসার মুখোমুখি হয়ে কী বলবে তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ পেছনে কারো পদশব্দ ও উপস্থিতি টের পেয়ে নিযানা বিরক্তিভরা গলায় বলল,
“অভিনব, একদম জ্বালাবি না বলছি! নয়তো এক থাবায় তোর চুল টেনে ছিঁড়ে দেব। তোকে না একবার বললাম আমার মেজাজ ভালো নেই?”
ঠিক তখনই একটা গভীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে এল। মুহূর্তেই নিযানার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সে মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা অভিনব নয়, কলরব! তড়িৎবেগে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। পেছনে তাকাতেই দেখল, কলরব ঘাট ধরে এক ধাপ নিচে নেমে এসেছে। তার চোখমুখ অস্বাভাবিক কঠিন। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা। ভয়ে নিযানা এক পা পিছিয়ে গেল। নিজেকে সামলে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে ডান হাতের তর্জনি উঁচিয়ে বলল,

“দে-দেখো…!”
কথাটা শেষ করার অবকাশই দিল না কলরব। নিশব্দে সে আরো এক ধাপ সামনে এগিয়ে এল। নিযানা আতঙ্কে সিঁড়ি বেয়ে আরও এক ধাপ পেছনে হটল। কলরব সামান্য ঝুঁকে শান্ত গলায় বলল,
“আঙুল নিচে, বেবি। কী হলো? হঠাৎ মুখ বন্ধ হয়ে গেল যে? মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না?”
নিযানা চট করে আঙুল নামিয়ে নিল। কলরব একদৃষ্টিতে বিঁধে রেখেছে তার দৃষ্টি। সেই চাওয়ার তীব্রতায় নিযানার ভেতরের সব অনুভূতি তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। আড়ষ্টতায় নিযানার দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। ছেলেটা এভাবে তাকাচ্ছে কেন? ভয়ে সে আবারও এক পা পেছনে যেতেই টের পেল ঘাট শেষ, থমকে আছে সিঁড়ির একবারে শেষ ধাপে! মুহূর্তেই পা পিছলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সে। তবে পড়ে যাওয়ার আগেই একজোড়া শক্ত হাত ছিটকে এসে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। শক্ত এক টানে নিযানাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল কলরব। নিযানা ভয়ার্ত আবেশে এক হাতে খামচে ধরল কলরবের বুকের টিশার্ট। কষে বুজে ফেলল চোখ জোড়া। ভয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তার স্পন্দন!

“নিজের হবু বরের সাথে কেউ তুই-তুকারি করে?”
কলরবের এমন প্রশ্নে চট করে চোখ মেলে তাকাল নিযানা। দেখল, কলরবের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলছে। নিযানা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“কেউ তো নিজের বউকেও তুই-তুকারি করে!”
সে আর কলরবের দিকে তাকাল না। চোখ সরিয়ে রাখল পুকুরের পানির দিকে। কলরব মৃদু হেসে বলল,
“ওহ, এই ব্যাপার? তা, কেউ তো আবার নিজের স্বামীকে ডিভোর্সও দিতে চায়!”
“কেউ তো তার বউকে ডিভোর্স দিতে চাইত।”
“কেউ তো এখনো চাইছে।”
“দোষ তো তারই!”
“অস্বীকার করছে কে?”

কলরব শান্ত। নিযানা আর কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। কিছুটা সময় নীরব থেকে কলরব নিচু স্বরে শুধাল,
“এত সাহস কীভাবে হলো তোর? কাগজে কী লিখে এসেছিস?”
নিযানা চিবুক উঁচিয়ে বলল, “বেশ করেছি!”
“তাহলে আমিও এখন কিছু একটা করি?”
কলরবের চোখের চাহনি আর গলার প্রচ্ছন্ন হুমকি বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না নিযানার। আতঙ্কে তার বুকটা ধক করে উঠল। আঁকড়ে ধরা টিশার্টটা আরও শক্ত করে খামচে ধরে তড়িঘড়ি বলে উঠল,
“একদম না, কলরব! আমি কিন্তু সাঁতার জানি না!”
কলরব ভাবলেশহীন মুখে বলল, “তাতে কী? ডুবে মরে যা!”
“আমরা তো উপরে গিয়েও কথা বলতে পারি৷”
“তাই নাকি? আমার সাথে? এত দিন পর আমার সাথে কথা বলতে কেউ আগ্রহী তবে?”
“মোটেও না!”
নিযানা আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে কলরব ব্যাকুল গলায় বলল,
“আমাকে একা ফেলে চলে আসলি?”
“তুমি নিজেও তো আমাকে ফেলে গিয়েছিলে।”
“আমি তোকে নিজের ঘরে রেখে গিয়েছিলাম!”
“ছেড়ে তো গিয়েছিলে!”

কলরব বলল, “তা কি? সব শোধ নেওয়া শেষ হলো? নাকি এখনো কিছু বাকি আছে?”
নিযানা বলতে গেল, “দেখো তু….!”
কথাটা শেষ করার আগেই নিযানা টের পেল, কলরবের শক্ত বাঁধনটা হঠাৎ আলগা হয়ে গেল! মুহুর্তে সে ছিটকে গিয়ে পড়ল পুকুরের বরফশীতল পানিতে। শীতল পানি তাকে চারপাশে বেষ্টন করে নিল। নিমেষেই তলিয়ে যেতে লাগল তার সমস্ত শরীর। নিঃশ্বাস আটকে এল আতঙ্কে। ঠিক পর মুহূর্তেই একজোড়া শক্তিশালী হাত তাকে শক্ত করে আগলে ধরে পানির ওপরে তুলে আনল। পানির ওপর ভেসে উঠতেই নিযানা প্রাণপণে দুই হাতে কলরবের গলা জড়িয়ে ধরল। হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল সে। প্রচণ্ড ভয় আর পুকুরের কনকনে ঠান্ডা পানিতে তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। কলরব ওকে ধরে শব্দ করে হাসছে! কলরবের ওই হাসি দেখে নিযানার মেজাজ একবারে সপ্তমে চড়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্ত গলায় বলল,
“কী করছ কী তুমি, হ্যাঁ?!”
কলরব নিযানার ভিজে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় উত্তর দিল,
“গোসল করছি। গোসল করা তো উচিত, তাই না?”

দিনটা শুক্রবার। জুম্মার নামাজের পর বেশ ছিমছাম আয়োজনেই কায়েফের বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেল। চারপাশের সবকিছু যেন এক বিভ্রান্তিকর ঘোরের মতো কেটে যাচ্ছে। বিয়ে শেষ হতেই কায়েফ সবার প্রথম দেখা করতে গেল আনায়ার সাথে। ওদের জন্য বরাদ্দ করা ঘরটিতে একা বসে ছিল মেয়েটা। আনায়া কাঁদছিল না ঠিকই, তবে তার সারা মুখে জমে ছিল পাহাড়সম বিষাদ আর থমথমে মেঘ। এমন পরিস্থিতিতে ওর মুখ ভার না থাকাটাই বরঞ্চ অস্বাভাবিক হতো। কায়েফ কিছুক্ষণ দরজার চৌকাঠে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। আনায়াই প্রথম নীরবতা ভেঙে নিচু স্বরে বলল,
“আসুন।”
কায়েফ ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কায়েফের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারল না আনায়া। হুট করেই ভেতর থেকে এক অবাধ্য অনুভূতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। যা সে এতক্ষণ পুরো প্রক্রিয়ার মাঝে কোথাও প্রকাশ করেনি। তার প্রচণ্ড ইচ্ছে করছে সামনের এই মানুষটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে। নিজেকে সামলে নিয়ে কায়েফ অত্যন্ত নিচু গলায় বলল,
“বসতে পারি?”
আনায়া আলতো করে মাথা নাড়ল। এরপর বেশ কিছুক্ষণ এক থমথমে নীরবতা গ্রাস করে রইল ঘরের পরিবেশ। নীরবতার ভেঙে কায়েফ বলল,

“সেদিনের সেই ‘উড়ন্ত পাখির ঝুলন্ত লেজ’ আইডিটা তা-তাহলে আপনারই ছিল? এমন অদ্ভুত একখানা নামের মানে কী, বলুন তো?”
আনায়া জোরপূর্বক হেসে লল, “আপনার সাথে একটু মজা করার জন্যই আইডিটা খুলেছিলাম। সেদিন মাম্মা আমাকে আপনার ছবি দেখাল, আপনার সব কথা বলল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ফেসবুকে আপনার নাম লিখে সার্চ করতেই আইডিটা পেয়ে গেলাম। এই আরকি।”
আনায়া সাধারণত এত নিচু বা নিস্তেজ স্বরে কথা বলে না। ওর এই নিঃশব্দ রূপ দেখে কায়েফের ভেতরে অপরাধবোধ ও অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠল। সে কথা ঘোরাতে বলল,
“আমি সেদিন জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনার সেই হারিয়ে যাওয়া বিড়ালটাকে পেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, দুদিন পর পেয়েছিলাম।”
কায়েফ মুখ নিচু করে বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি, আনায়া।”
“আপনি স্যরি বলবেন না প্লিজ। এতে আপনার তো কোনো দোষ ছিল না।”
কায়েফ আনায়ার দিকে তাকিয়ে শুধাল, “আপনি… আপনি সত্যি আমাকে বিশ্বাস করেছেন?”
আনায়া চোখ তুলে বলল, “কেন যেন আপনাকে এতটুকুও অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না।”
কথাটা শুনে কায়েফ কিছুক্ষণের জন্য পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। মাথায় আপাতত কোনো বাক্যই খুঁজে পাচ্ছিল না সে। আনায়াও আর কথা বাড়াল না। দৃষ্টি নামিয়ে নিচের দিকে চেয়ে রইল। অস্বস্তিকর পরিবেশটা কাটাতে কায়েফ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল,

“দুপুরে খাবেন তো? চলুন, নিচে চলুন।”
“একদম ইচ্ছে করছে না।”
“অন্তত খাবারের ওপর রাগ করবেন না।”
“আমার তো রাগ হচ্ছে না।”
কায়েফ দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল, “পারলে… পারলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।”
আনায়া নীরব রইল। কোনো উত্তর দিল না। কায়েফ যখন একপ্রকার ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আনায়া আচমকা বলে উঠল,
“আপনি কি এই বিয়েটা মেনে নিয়েছেন?”
কায়েফ দরজার কাছে থমকে দাঁড়াল। “আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
“মানে… আপনি ওই মেয়েটার সাথেই সংসার করবেন?”
“বিয়েটা তো হয়েই গেছে, আনায়া।”
আনায়া একদম নিস্তেজ গলায় বিড়বিড় করল, “ওহ।”
কায়েফ আর কথা বাড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়া অপলক চোখে চেয়ে রইল কায়েফের চলে যাওয়া পথের দিকে। আস্তে আস্তে তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল, নোনা জলে ভরে উঠল চোখের কোণ। আচমকাই ওর মন জুড়ে এক তীব্র উপলব্ধি নাড়া দিয়ে উঠল। এই ছেলেটাকে কি সে শুধু সাধারণ পছন্দই করত, নাকি পছন্দের গণ্ডি পেরিয়ে কখন যেন অনেকটা ভালোও বেসে ফেলেছিল?

দুপুরের পরপরই তাড়াহুড়ো আর থমথমে আবহের মধ্য দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো সবাই। এই পুরোটা সময় আনতাসা নিযানার সাথে একটা কথাও বলেননি। না কোনো ভালো কথা, না কোনো রাগ বা ক্ষোভ। একদম বরফের মতো জমাট বাঁধা, গম্ভীর এক মুখ করে রয়ে গেছেন তিনি। যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ঊর্মি শেষবারের মতো দেখা করতে গেল কাশেম তালুকদারের সাথে। বৃদ্ধ মানুষটা অনেকক্ষণ তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেন। ঊর্মির মস্তিষ্ক যেন কিছুতেই এই বাস্তবতাটা মানতে পারছে না। চারপাশের সবকিছুকে বিষাদময় এক ঘোর বলে মনে হচ্ছে তার। কিন্তু ঘোর কাটিয়ে যখনই কঠিন বাস্তবটা মনের ভেতর ধাক্কা মারছে, তখনই ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠছে সে। ভাবছে, এমনটা তো কিছুতেই হওয়া উচিত ছিল না! মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে বারবার ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা জানাচ্ছে। এটাকে অন্তত একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন বানিয়ে দাও! চলন্ত ট্রেনে কায়েফের মুখোমুখি সিটে বসেছে ঊর্মি, আর তার পাশেই নিযানা। আড়চোখে যতবার সামনে বসা নিস্তব্ধ কায়েফকে দেখছে ও, ততবার নিজের প্রতি এক পশলা তীব্র ঘৃণায় রি রি করে উঠছে ভেতরটা। তার জীবনটা এমন অভিশপ্ত কেন? যার জীবনেই সে যায়, তার জীবনটাই যেন ধ্বংস হয়ে যায়! ভাবতে ভাবতে আবারও দুটো চোখ নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এল তার। ঠিক তখনই চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা যেন এক পাক খেয়ে দুলতে শুরু করল! চেতনার আলো নিভে গিয়ে জানালার শক্ত লোহাটার ওপর ধপাস করে ঢলে পড়ল ঊর্মি। মাথাটা লোহায় লাগতেই এক বিকট শব্দ হলো। নিযানা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,

এই অবেলায় পর্ব ৫১

“ঊর্মি?! ঊর্মি, কী হলো তোমার?!”
নিযানা হন্তদন্ত হয়ে ওকে সোজা করে ধরে ডেকেই চলল, কিন্তু ঊর্মির কোনো সাড়াশব্দ নেই। এতক্ষণ জানালার বাইরে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা কায়েফের ধ্যান ভাঙল নিযানার চিৎকারে। সে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
নিযানা ভয়ার্ত কণ্ঠে কায়েফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও… ও তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে!”

এই অবেলায় পর্ব ৫৩