এই অবেলায় পর্ব ৫৩
সুমনা সাথী
ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেল ওদের।
তালুকদার বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই নবনীর মুখটা ভার। ভেতরে ভেতরে কী যে ঘটে চলেছে, তা কোনোভাবেই মাথায় ঢুকছে না দিব্যর। ভেবেছিল রাতে অন্তত অফিসের জরুরি জমে থাকা কাজগুলো একটু শেষ করবে, কিন্তু নবনীর থমথমে মুখের ভঙ্গি দেখে সেই আশায় এক বালতি জল ঢালতে হলো তাকে। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে দিব্য ধীর পায়ে এগোলো মেয়ের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে দেখল, নবনী প্লেট হাতে নিয়ে একপ্রকার পিছু ছুটে খাওয়াচ্ছে দিয়াকে। আর দিয়া স্বভাববশত সারা ঘর জুড়ে তোলপাড় করে দৌড়াদৌড়ি করছে। নবনী তাকে বারংবার এক জায়গায় থিতু হয়ে বসার অনুরোধ করছে কিন্তু মেয়ে তো শোনার পাত্রীই নয়! সারা দিনের ক্লান্তিতে নবনীর মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। কঠোর কণ্ঠে ধমকে উঠে বলল,
“দিয়া! মাম্মা কিন্তু ভীষণ রেগে যাচ্ছে!”
দিব্য ঘরে ঢুকে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “নবনী, কী হয়েছে?”
নবনী সে কথার প্রত্যুত্তর করলো না। দিব্যকে পাত্তা পর্যন্ত দিল না। আবারও প্লেট হাতে দৌড়াতে থাকা দিয়ার পিছু ছুটল। দিয়া খাট ঘুরে সোজা এসে লুকাল দিব্যর পেছনে। দিব্যর কোমর জড়িয়ে ধরে মাথাটা সামান্য বের করে বলল,
“মাম্মা… দিয়ার একদম খেতে ইচ্ছে করছে না!”
কথাটা শোনামাত্র নবনীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে প্লেটটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে কর্কশ কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে, একদম খেতে হবে না! আর কোনো দিন তোমার খাওয়ার পেছনে এভাবে ধাওয়া করব না আমি! আমারও ভীষণ খিদে পেয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি!”
কথাটা বলেই নবনী হন্তদন্ত হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দিব্য যে তাকে ডেকে থামাবে বা কিছু জিজ্ঞেস করবে, সেই সুযোগটুকু পর্যন্ত পেল না। পরমুহূর্তেই ফুঁঁপিয়ে কেঁদে উঠল দিয়া। দিব্য তড়িঘড়ি করে হাঁটুগড়ে বসে পড়ল মেয়ের সামনে। তাকে আলতো করে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বলল,
“কী হয়েছে সোনা? আমার প্রিন্সেস কাদছে কেন, হুম?”
দিয়া দিব্যর শার্ট খামচে ধরে ফুঁঁপিয়ে ফুঁঁপিয়ে বলল,
“পা-পাপ্পা, দিয়া তো একটু অ্যাক্টিং করছিল! মাম্মা খুব… খুব এংরি হয়ে গেল! দিয়াকে বকে দিল…!”
দিব্য মেয়ের চোখের কোণের পানিটুকু মুছে দিতে দিতে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“একদম না সোনা! মাম্মা মোটেও তোমায় বকেনি। আসলে মাম্মা এত দূর থেকে জার্নি করে এসেছে তো। খুব খিদেও পেয়েছে তার। তাই নিজে একটু খেতে গেল। দেখবে এখুনি চলে আসবে!”
“না… না! মাম্মা সত্যি খুব এংরি হয়ে গেছে! দিয়াকে বকে দিয়েছে। আর কোনো দিন খাইয়ে দেবে না বলেছে!”
দিয়ার কান্না থামতেই চাইছে না। দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিয়ার মুখটা দুহাতের আজলায় নিয়ে বলল,
“আমার দিকে তাকাও তো সোনা। একদম কাঁদে না। আচ্ছা, আমায় একটা কথা বলো তো। তুমি যখন অনেকক্ষণ স্কুল ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখো তখন তোমার কাঁধে খুব ব্যথা করে, তাই না?”
দিয়া আলতো করে দুপাশে মাথা নেড়ে কান্না থামাল। এখন তার কৌতূহলী চোখ দুটো দিব্যর পরবর্তী কথার অপেক্ষায় স্থির হয়ে আছে। দিব্য বুঝিয়ে বলল,
“আবার ধরো, যখন তুমি তোমার প্রিয় ডলটাকে অনেকক্ষণ হাতে ধরে রাখো তখন হাত ব্যথা করে, তাই না? তেমনি মাম্মার পেটের ভেতরেও তো একটা মিষ্টি বেবি আছে। মাম্মা তাকে বহন করে অত দূর থেকে বাড়ি আসলো। তার ওপর ট্রেনে তুমি আবার কতক্ষণ মাম্মার কোলে ঘুমিয়েছিলে! সব মিলিয়ে মাম্মা ভীষণ টায়ার্ড হয়ে গেছে সোনা। আর ক্লান্ত শরীরে তার ভীষণ খিদেও পেয়েছিল। তাই একটু রেগে গেছে। আচ্ছা, তুমিই না বলেছিলে বেবি এলে তাকে অনেক আদর করবে?”
দিয়া এক হাতে গালে জমা পানি টুকু মুছে বলল, “হ্যাঁ!”
দিব্য বলল, “এখন তো বেবি মাম্মার পেটের ভেতরেই আছে? তাই আমাদের দুজনেরই উচিত মাম্মার খুব খেয়াল রাখা। বেবির জন্য মাম্মা আজকাল অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই আমাদের উচিত মাম্মাকে একটু কম বিরক্ত করা, কেমন? দিয়া তো গুড গার্ল। একদম বড়দের মতো বোঝে! বেবি না আসা পর্যন্ত সে আরও আরও গুড গার্ল হয়ে থাকবে, তাই না?”
দিয়া বাধ্য মেয়ের মতো উপর-নিচ মাথা নাড়ল।তারপর হুট করে চোখ গোল গোল করে শুধাল,
“পাপ্পা, বেবিরও কি দিয়ার মতো ভীষণ খিদে পায়?”
দিব্য হেসে বলল, “হ্যাঁ, পায় তো!”
“ও কী খায়?”
“মাম্মা যা যা খায়, বেবিও ঠিক সেটাই খায়।”
দিয়া যেন একটা বড় রহস্য আবিষ্কার করল! মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
“এই জন্যই মাম্মার অত বেশি খিদে পেয়েছিল? আর মাম্মা এত এংরি হয়ে গেল? পাপ্পা, আমি কি মাম্মাকে গিয়ে একটা স্যরি বলে দেব?”
দিব্য মৃদু হেঁসে বলল, “আপাতত তোমাকে এই খাবারটা শেষ করতে হবে। পাপ্পা আজ তোমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেবে। খাবে তো?”
দিয়া মাথা নেড়ে চটপট বিছানায় গিয়ে বসল। দিব্য টেবিল থেকে প্লেটটা তুলে এনে মেয়ের সামনে বসল। অনেক দিন পর আবারও নিজের হাতে মেয়েকে খাওয়াতে লাগল সে। ভেতরে ভেতরে তার নিজের মধ্যেও একটা অদ্ভুত আনন্দ আর প্রশান্তি খুঁজে পেল।
জ্ঞান ফিরতেই ঊর্মি দেখতে পেল সে অচেনা একটা ঘরে শুয়ে আছে। ঘরের এক কোণে জ্বলছে হালকা সবুজ রঙের নিভু নিভু ডিম লাইট। সেই স্নিগ্ধ আলোয় পুরো ঘরের রূপটা নজরে আসতেই চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল সে। বেশ আধুনিক আর চমৎকার সব দামি আসবাবপত্রে সুসজ্জিত পুরো ঘর। এটা কার ঘর? ওই ছেলেটার? ভাবল সে। চট করে নামটা মনে করতে পারলো না। হ্যাঁ, কায়েফ! ঠিক তখনই আচমকা ঘরের মেইন লাইটটা জ্বলে উঠতেই একটা পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আপনি উঠে পড়েছেন?”
কায়েফ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঊর্মির সামনে খাবারের ট্রেইটা রাখল। শান্ত গলায় বলল,
“খেয়ে নিন।”
কপালে কেমন যেন ভারী ঠেকতেই হাত দিয়ে ঊর্মি টের পেল সেখানে ব্যান্ডেজ করা। কায়েফ তা দেখে বলল,
“ট্রেনের জানালার লোহায় লেগে কেটে গিয়েছিল।”
ঊর্মি কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে কেবল মাথা নাড়ল। এই মুহূর্তে ঠিক কেমন অনুভূতি হওয়া উচিত, তা সে একদম বুঝে উঠতে পারছে না। একরাশ আড়ষ্টতা আর তীব্র বিব্রতবোধে তার পুরো অস্তিত্ব যেন গুটিয়ে আসছে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আর কেউ নয়। তার বিবাহিত স্বামী! এই অকাট্য সত্যটুকুই তাকে তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কায়েফ অবশ্য নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার ভেতরেও এক অজানা অস্বস্তি খেলা করছে। ঊর্মিকে চুপচাপ পাথরের মতো বসে থাকতে দেখে সে আবার বলল,
“কী হলো, খাচ্ছেন না যে? ভাইয়া বলল আপনার শরীর নাকি ভীষণ খারাপ। ঘুম আর পুষ্টিকর খাবার, দুটোই এখন আপনার খুব দরকার। বসে থাকবেন না। রাত কিন্তু অনেক হলো।”
ঊর্মির যে খেতে ইচ্ছে করছে না, তা নয়। সত্যি বলতে কাল রাত থেকে পেটে এক দানা পানিও পড়ে নি। পেটের ভেতর খিদের তীব্র মোচড়। তবুও কায়েফের উপস্থিতি সেই খিদের চেয়েও বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই দরজায় টোকা দিল ইভান,
“চাচ্চু, আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
কায়েফ কিছু বলার আগেই, ইহান সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ইভান তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
“মাম্মা না বলেছিল কারো রুমে ঢোকার আগে নক করতে?”
ইহান বলল, “এটা তো আমাদের চাচ্চুর ঘর!”
“তাতে কী হয়েছে?”
কায়েফ দুই ভাইকে থামিয়ে দিয়ে, মৃদু হেসে বলল, “কী হয়েছে বল তো? তোদের কিছু চাই?”
ইভান গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “দাদি আপনাকে ডেকেছেন চাচ্চু। উনি খুব অসুস্থ বোধ করছেন। বলেছেন আপনাকে এখনই আমাদের সাথে যেতে।”
কায়েফ বসা থেকে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। তবে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একটু থমকে দাঁড়াল। ঊর্মির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনি খাবারটা শেষ করে নিন।”
কথাটা বলেই সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কায়েফ ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই ঊর্মির জমাট বাঁধা সব জড়তা যেন একমুহুর্তে উবে গেল! থমকে থাকা খিদেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই সে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে খাবারের ট্রেই থেকে খেতে শুরু করল।
“তুমি ঠিক কী চাইছ, নিযানা?”
খাবার খেতে থাকা হাতটা থমকে গেল নিযানার।ডাইনিং টেবিলে পরিবারের সাথে খেতে বসেছে সে। তখনই হুট করে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন আনতাসা। নিযানা নিজের ভেতরের জড়তাটুকু সামলে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ঠিক বুঝলাম না, মাম্মা।”
আনতাসা চোখ-মুখ শক্ত করে বললেন, “ওখানে যাওয়ার সময় থেকে দেখছি। তোমাকে আমি ঠিক কী বলেছিলাম? তুমি কলরবের আশেপাশেও ঘেঁষবে না! তাও তুমি তার কাছে কেন গিয়েছিলে?”
“না গেলে ও সারা রাত রাস্তায় বসে থাকত।”
মাথা নিচু করে, ক্ষীণ গলায় কথাটা বলল নিযানা। আনতাসা এবার উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন,
“তো? তাতে তোমার কী যায় আসে? তুমি আমাকে কী কথা দিয়েছিলে, সব ভুলে গেছ?”
নিযানা আর মাথা তুলল না। দৃষ্টি টেবিলে রেখেই নিচু গলায় বলল,
“মাম্মা, আমি কলরবের সাথেই থাকতে চাই। আমি ওকে ডিভোর্স দিতে চাই না।”
“নিযানা!”
একপ্রকার ধমকে উঠলেন আনতাসা। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি,
“কীসব বাজে কথা বলছ, হ্যাঁ? এক সপ্তাহ পর তোমার পরীক্ষা। আর তুমি এসব আজেবাজে চিন্তায় ডুবে আছ! তোমাকে কি আমি এসবের ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক করিনি?”
নওয়াজ চৌধুরী এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিলেন। তিনি খাওয়া থামিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“আহ্ আনতাসা! কী করছ কী? মেয়েটা খাচ্ছে তো। ও তো ছোট মানুষ। না বুঝে ভুল করে ফেলেছে। সোনা, মাম্মাকে একটা স্যরি বলে দাও তো।”
“আব্বু, আমি…!”
নিযানা কিছু একটা বলতে যেতেই নওয়াজ চৌধুরী তাকে থামিয়ে দিয়ে মিষ্টভাষে বললেন,
“আমি সব জানি, সোনা। তুমি নিযানা নওয়াজ চৌধুরী। আমার এই এত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, এই অঢেল সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, সবই তো তোমার জন্য।তোমাকে এসব মানায় না। ভালো করে ভেবে দেখো আগে। সময় দাও নিজেকে। দেখবা সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তুমি তোমার আব্বুকে ভালোবাসো তো?”
নিযানা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। নওয়াজ মৃদু হেসে বললেন,
“তাহলে এখন ওসব ভুলে মন দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও। পরীক্ষাটা শেষ হলেই আমরা সবাই মিলে লন্ডন থেকে তোমার ফুপির বাড়ি হয়ে ঘুরে আসব। দেখবে মন একেবারে ভালো হয়ে যাবে। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও।”
নিযানার গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে এলো। সে থালা ঠেলে দিয়ে বলল,
“আমার আর খেতে ইচ্ছে করছে না। গুড নাইট, আব্বু।”
কথাটা বলেই দ্রুত ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল নিযানা। হন্তদন্ত হয়ে নিজের ঘরের দিকে হনহন করে চলে গেল। নিযানা দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতেই নওয়াজ চৌধুরীর চেহারার সহমর্মিতা একমুহুর্তে মিলিয়ে গেল। তিনি চরম ক্ষুব্ধ চোখে আনতাসার দিকে তাকালেন,
“আমি তোমাকে বারবার বারণ করেছিলাম গ্রামে যেতে! এই ঝামেলাটা তুমি নিজ হাতে বাড়িয়েছ। তাই এর সমাধানও তোমাকেই করতে হবে। এখনই আরশাদ তালুকদারকে ফোন করো। বলো, অতি দ্রুত যেন তিনি এই বিষয়টা মিটিয়ে ফেলেন। নয়তো এর পরিণাম কিন্তু ভীষণ খারাপ হবে!”
খাবারের শেষ লোকমাটা মুখে তুলতে গিয়েই নবনীর হাতটা থমকে গেল। বিশাল ডাইনিং টেবিলে আপাতত আর কেউ নেই। চারপাশটা খাঁ খাঁ করছে। ঠিক তখনই আচমকা দিয়ার সাথে একটু আগে করা তার রূঢ় ব্যবহারের দৃশ্যটা স্মৃতিতে ভেসে উঠতেই ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠল। একমুহুর্তে চোখ দুটো অশ্রুতে ছলোছলো হয়ে এলো তার। সে কী করল এটা? সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বাচ্চাটার ওপর এভাবে খেপে গেল কেন? অপরাধবোধে বুকটা ভারী হয়ে আসতেই নবনী খাবারের প্লেটটা ঠেলে রেখে সোজা ঘরের দিকে ছুটল।
ঘরে ঢুকেই দিয়াকে দেখতে না পেয়ে ব্যাকুল চোখে দিব্যর দিকে তাকিয়ে শুধাল,
“দিয়া কোথায়?”
দিব্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার জবাবের অপেক্ষা না করেই নবনী পাশের ঘরের দিকে ছুটে গেল। ঘরে ঢুকতেই খাটের ওপর ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট পুতুলটাকে দেখতে পেল সে। দৌড়ে গিয়ে মেয়ের মাথার কাছের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নবনী। কান্নার বেগ সামলাতে পারল না। সশব্দে ফুঁঁপিয়ে উঠল,
“সোনা আমার। আই অ্যাম সো স্যরি! মাম্মা খুব পঁচা হয়ে গেছে। সামান্য একটা কারণেই তোমাকে কষ্ট দিল! মাম্মাকে ক্ষমা করে দাও সোনা। মাম্মাকে ভুল বুঝো না প্লিজ…!”
মেয়ের তোশকে মুখ গুঁজে বেশ কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদল নবনী। ধীরে ধীরে মনটা কিছুটা শান্ত হলে সে উঠে দাঁড়াল। ঝুঁকে পড়ে দিয়ার কপালে ও গালে গোটাকয়েক গাঢ় চুমু একে দিল। তারপর পা টিপে টিপে ফিরে এলো নিজেদের ঘরে। ঘরে ঢুকতেই বিছানায় শুয়ে ফোন দেখতে থাকা দিব্য মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল,
“খেয়েছ তুমি?”
নবনী কেবল মাথা নাড়ল। ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দিব্যর পাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। তবে দিব্যর দিকে পিঠ ফেরানো। দিব্য ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে পেছন থেকে আলতো করে নবনীকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু জড়িয়ে ধরতেই সে অনুভব করল নবনীর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। কাঁদছে মেয়েটা? দিব্য একটু অবাক হয়েই বলল,
“এই নবনী? কাঁদছ তুমি? আশ্চর্য, হঠাৎ কাঁদছ কেন?”
নবনী তপ্ত কণ্ঠে বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি। আমি সত্যি বুঝতে পারছি না আমার কী হয়েছিল! অল্পতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলাম। দিয়া তো সবসময় এমনই করে। ও তো ছোট! আমি কেন ওর ওপর ওভাবে রিঅ্যাক্ট করতে গেলাম? ও কত কষ্ট পেয়েছে, তাই না?”
দিব্য তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “ও একটু কষ্ট পেয়েছিল ঠিকই। তবে আমি ওকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছি।”
শুনেই নবনী তড়িৎ বেগে ঘুরে ব্যাকুল গলায় শুধাল,
“কী বুঝিয়েছেন? ও কি খুব কাঁদছিল? নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করছিল! আপনি ওকে ওই ঘরে একা রেখে এলেন কেন? প্লিজ, ওকে এই ঘরে নিয়ে আসুন না! অন্তত আজকের রাতটার জন্য হলেও নিয়ে আসুন!”
দিব্য মৃদু হেসে বলল, “ওকে, ওকে! রিল্যাক্স নবনী। আমি এখনই ওকে নিয়ে আসছি। তুমিও না। মাঝে মাঝে একদম বাচ্চা হয়ে যাও!”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দিব্য ঘুমন্ত দিয়াকে কোলে করে নিয়ে ফিরে এলো। নবনীর পাশে সাবধানে শুইয়ে দিতেই নবনী আঁকড়ে ধরে বুকে টেনে নিল মেয়েকে। দিয়াও ঘুমের ঘোরেই মায়ের বুকে লেপ্টে গেল। নবনী মেয়ের গালে নরম চুমু খেয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। দিব্য একপাশে শুয়ে মুগ্ধ চোখে মা-মেয়ের এই দৃশ্যটুকু দেখে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল। আবছা অন্ধকারের মাঝেও সে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল তাদের পানে। তার যে সেই অপূর্ব দৃশ্যপট থেকে চোখ সরাতেই মন চাইছে না!
কায়েফ যখন ঘরে ফিরল, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটার ঘর ছুঁয়েছে। টিকটিক শব্দে মেপে চলেছে সময়। এক পা, দু-পা করে ঘরের ভেতরে পা বাড়াতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। মেঝের এক কোণে যত্নে রাখা খাবারের ট্রে। চোখ দুটো সামান্য ওপরে উঠতেই বুকের ভেতরে একটা মৃদু আলোড়ন সৃষ্টি হলো ওর। বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে ঊর্মি। শাড়ির আঁচলটা কিছুটা লুটিয়ে পড়েছে চারপাশে। বোঝা যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার কাছে হার মেনে কোনো একসময় ক্লান্তি নেমে এসেছিল তার চোখের পাতায়। কায়েফ এগিয়ে গিয়ে মেঝের ট্রে-টা তুলতে গেল। ঠিক তখনই তার নজর আটকে গেল ঊর্মির ঘুমন্ত মুখে। কৃত্রিম কোনো সাজসজ্জার প্রলেপ নেই। কেবল স্নিগ্ধতায় মেয়েটাকে অপার্থিব বলে মনে হচ্ছে। পরনের লাল শাড়িটা খানিকটা এলোমেলো। শাড়ির ভাঁজ সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে আছে ফর্সা উদরের কিছুটা অংশ। আকস্মিক সেই অনাবিল রূপ দেখে কায়েফের হৃদস্পন্দন থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই এক অদ্ভুত সংকোচে চোখের দৃষ্টি নামিয়ে নিল সে। অত্যন্ত সন্তর্পণে, যেন পবিত্রতা রক্ষার দায়ে, আলতো হাতে ঊর্মির শাড়ির আঁচলটা টেনে ঢেকে দিল উন্মুক্ত স্থানটুকু।
এই অবেলায় পর্ব ৫২
তার একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ঘরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। ট্রে-টা একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানার দিকে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল কায়েফ। শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে এক অদৃশ্য জড়তা আর দ্বিধা তাকে বেঁধে ফেলল। ঊর্মির কোনো সম্মতি সে নেয়নি। কাল ভোরে ঘুম ভেঙে এই সান্নিধ্য যদি মেয়েটার মনে সামান্যতম অস্বস্তি কিংবা সঙ্কোচের জন্ম দেয়? নিজের মনের সাথে লড়াই করে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। ঘরের মূল আলোটা নিভিয়ে জ্বালিয়ে দিল মৃদু ড্রিম লাইট। সেই ম্লান নীলাভ আলোর আবহে বিছানা থেকে একটা বালিশ আলতো করে তুলে নিয়ে সে এগিয়ে গেল সোফার দিকে। নিজেকে ছড়িয়ে দিল সোফার স্বল্প পরিসরে। এক বুক দ্বিধা আর একরাশ প্রচ্ছন্ন অনুভূতির বারুদ চেপে রেখে।
