এই অবেলায় পর্ব ৫১
সুমনা সাথী
কলরব কখন এসে দুজনের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়েছে, নিযানা বা কায়েফ কেউ তা খেয়ালই করেনি। সে গলা খাকারি দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকল,
“কায়েফ…!”
চমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে কান্না চেপে নিল নিযানা। কায়েফ পেছনে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে সহাস্যে বলল,
“আরে কলরব, আয় না! এসে আমাদের সাথে বস এখানে।”
নিযানা আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। কলরব একটু ইতস্তত করে শুকনো গলায় বলল,
“এখানে বসলে আবার কারো সমস্যা হবে না তো?”
“কার আবার সমস্যা থাকবে?”
কায়েফ কথাটা শেষ করতেই নিযানা তীব্র গলায় বলল,
“আমার সমস্যা আছে।”
তবে সে একবারও পেছনে কলরবের দিকে ফিরে তাকাল না। নিযানার অবহেলা আর অনীহা মুহূর্তেই কলরবের শিরা-উপশিরায় তীব্র জ্বলন ধরিয়ে দিল। বুকের ভেতর অসম্ভব এক যন্ত্রণা আর অসহ্য বোধ হতে লাগল তার। এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে হনহন করে চলে গেল। কায়েফ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিযানা নিচু গলায় বলল,
“তুমিও যাও কায়েফ। আমাকে একা থাকতে দাও।”
কায়েফ মৃদু হেসে আর কথা না বাড়িয়ে নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে চলে এলো। পুকুরপাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসার পথেই উঠোনে কুহুকে দেখে ডাক দিল,
“কুহু, শোন তো একটু।”
কুহু এগিয়ে এসে কায়েফের সামনে দাঁড়াল, “কী হয়েছে ভাইয়া? কিছু লাগবে তোমার?”
কায়েফ কিছু না বলে উঠোনের এক কোণে আপনমনে ঝাড়ু দিয়ে উঠোন পরিষ্কার করতে থাকা মেয়েটির দিকে ইশারা করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ওই মেয়েটা কে রে?”
সারাদিন ধরে কলরবের কোনো দেখা নেই। সকাল গড়িয়ে দুপুর পার হয়ে এখন নামতে চলেছে ধূসর বিকেল অথচ তার ফেরার কোনো নামগন্ধও নেই। অলেখা চিন্তায় আক্ষরিক অর্থেই আকুল হয়ে পড়েছেন। বাড়ির বাকি সবাইও কলরবের এমন খেয়ালি আচরণে বেশ বিরক্ত। কায়েফ, কাব্য থেকে শুরু করে সবাই দফায় দফায় চেষ্টা করেছে কিন্তু ফোনের অপর প্রান্তে শুধুই রিং হয়ে বেজে চলেছে। কলরব কারো ফোন রিসিভ করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করছে না।পুকুরপাড়ে থমথমে মুখে একা একা বসেছিল নিযানা। হাতে একটা ফোন। এটা আনতাসার থেকে নিয়েছে। কুহু ধীর পায়ে এসে নিযানার ঠিক গা-ঘেঁষে বসল। নিচু গলায় বলল,
“নিযানা, ভাইয়াকে তুই একবার একটা কল কর না? তুই ফোন করলে ভাইয়া ঠিকই ধরবে।”
নিযানা বিরক্ত গলায় বলল, “তোর ওই গুণধর ভাই কি কোনো কোলের বাচ্চা? সময় হলে পথ চিনে ঠিকই ফিরবে। এ নিয়ে এত চিন্তা করার কী আছে?”
“তাও তুই একবার অন্তত চেষ্টা করে দেখ না।”
“কুহু, অহেতুক বিরক্ত করিস না তো!”
“নিযানা, প্লিজ! শুধু আমার জন্য।”
পূর্বের দিগন্তে তখন ঘন মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। হু হু করে বয়ে চলেছে দামাল পুবালি বাতাস। বাতাসের তোপে চারপাশের গাছগাছালিগুলো যেন অস্থির হয়ে উঠছে। দিন শেষের ম্লান আলোয় গ্রামের পথঘাট ক্রমেই নিঝুম হয়ে আসছে। গ্রাম থেকে খানিকটা দূরে। নির্জন মেঠো পথের ধারে বিরাট এক তালগাছের নিচে একলা বসে ছিল কলরব। দুপাশে প্রকাণ্ড বিল। তার মাঝে মাঝে দু-একটা বিচ্ছিন্ন জনবসতি। তাও খুবই সীমিত। শান্ত নিস্তব্ধতায় ভাঙন ধরিয়ে পাশে রাখা ফোনটা ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠল। আননোন একটা নম্বর ভেসে উঠছে স্ক্রিনে। কোনো কিছু না ভেবেই কলরব ফোনটা কানে তুলল। অপর প্রান্ত থেকে নিযানার ঝাঁঝালো কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আবার কী নতুন নাটক শুরু করেছ, হ্যাঁ?”
কলরবের ভেতরে তর্ক করার ইচ্ছেটা আজ যেন হঠাৎ করেই উবে গেছে। নিরাসক্ত গলায় জবাব দিল,
“তুই কি ভুল করে কল করে ফেলেছিস নিযানা? তা-ই যদি হয়, তবে ফোনটা কেটে দে।”
মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল নিযানা। ছেলেটার কী হয়েছে? নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে শুধাল,
“কোথায় আছো তুমি?”
“আছি কোথাও একটা। তাতে তোর কী?”
“বাড়ি ফিরছ না কেন? মামি চিন্তা করছে।”
“সেটা মামির ভাবনা, তিনি ভাবছেন। তোর এত ভেবে মাথা ঘামানোর তো কিছু দেখছি না।”
“আমি মোটেও ভাবছি না। ওটা তোমার ভুল ধারণা।”
“হতে পারে।”
“কখন ফিরবে?”
“ইচ্ছে করছে না। হয়তো আর ওখানে ফিরবই না।”
“স্পষ্ট করে বলবে কোথায় আছো তুমি?”
কলরব উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, “বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে একটা রাস্তা আছে না, ওই যে বিরাট বটগাছটার পাশে? ওখানেই বসে আছি। জায়গাটা বেশ৷ মোটেও খারাপ লাগছে না। লোকজন ও দেখছিনা। সত্যি বলতে, আপাতত আমি আর কাউকে বিরক্ত করতে চাইছি না। এইখানে আসা নিয়ে আমার এখন তীব্র আফসোস হচ্ছে। যাই হোক, আমি ভালো আছি। কাল সকালে সোজা ট্রেনের টিকিট কেটে ঢাকা ফিরে যাব৷ আজ রাতে আর তোদের ওখানে উঠছি না। কাউকে অহেতুক চিন্তা করতে বারণ করে দিস। রাখছি।”
কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই খটাস করে কলটা কেটে দিল কলরব। নিযানা স্তব্ধ হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল। পাশেই বসে থাকা কুহু উৎকণ্ঠা নিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী বলল রে ভাইয়া? কোথায় আছে ও?”
নিযানা শুকনো গলায় বলল, “বলল মাইলখানেক দূরের ওই বটগাছটার পাশে বসে আছে। কাল সকালে নাকি সোজা ঢাকায় ফিরে যাবে। এর আগে আর এ বাড়িতে আসবে না।”
কথাটা শুনেই আতঙ্কে উঠল কুহু, “আসবে না মানে? আকাশের অবস্থা দেখেছিস তুই? কত জোরে বাতাস হচ্ছে৷ শীতের মধ্যে, কোথায় থাকবেও?”
নিযানা একবার মাথা তুলে মেঘগুলোর পানে তাকাল। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠান্ডায় জমে মরুক৷ কীভাবে যে এই বাঁদড় ছেলেটা মামুর মতো সরল মানুষের ঘরে পয়দা হলো, আল্লাহ জানে!”
কথাটা বলেই চট করে নিজের মুখটা চেপে ধরল নিযানা। অপরাধীর মতো মুখ করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ছিঃ! কীসব অসভ্য কথা বলছি আমি! সব তোর ওই অসভ্য ভাইয়ের সাথে থাকার কুফল!”
ঘরে ঢুকেই নবনী দেখল দিব্য তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই দুপুরে খাওয়ার পর শুয়েছে মানুষটা। অথচ সন্ধ্যে নামতে চলল, ওঠার কোনো লক্ষণই নেই। ঘুমন্ত দিব্যকে কেমন যেন ভীষণ শান্ত লাগছে। নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওর গা-ঘেঁষে ঝুঁকলো। তারপর বাহুতে হাত রেখে আলতো করে ডেকে উঠল,
“শুনছেন? আর কত ঘুমাবেন বলুন তো?”
দিব্য একটু বিরক্তি নিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। তাই দেখে নবনীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও দু-একবার ডাকতেই দিব্য একটু নড়েচড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙল। তারপর সোজা হয়ে বসে খানিকটা ঘুমজড়ানো গলায় বলল,
“কী হয়েছে, নবনী? অকারণে এভাবে ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করছ কেন?”
নবনী চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বলল, “আপনি কতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছেন, সেই খেয়াল কি আছে আপনার? সন্ধ্যে হতে চলল। এবার তো উঠুন। সারাদিন এভাবে ঘুমালে রাতে কী করবেন শুনি?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই নবনী কিছু বুঝে ওঠার আগে অনুভব করল, এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত তাকে টেনে নিয়েছে খুব কাছে! পরমুহূর্তেই সে গিয়ে পড়ল দিব্যর কোলের ওপর। দিব্য ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল,
“রাতে? রাতে তোমাকে জাগিয়ে রাখব…!”
দিব্যর উষ্ণশ্বাসের ছোঁয়ায় নবনীর সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল। নিজেকে ছাড়ানোর হালকা চেষ্টা করে বলল,
“পাগল হয়ে গেছেন নাকি আপনি? খেয়াল আছে আমরা কিন্তু নিজেদের বাড়িতে নেই!”
“তাতে কী?”
“ঘরে যে কেউ চলে আসতে পারে তো! ছাড়ুন বলছি।”
দিব্য গম্ভীর গলায় বলল, “ইদানীং দেখছি তোমার বেশ সাহস বেড়েছে। আমাকেই ধমকাচ্ছ?”
নবনী হেসে উঠে বলল, “অবশ্যই ধমকাব! কারণ এখন আমার দলে লোক বেশি। আমরা তিনজন আর আপনি একদম একা!”
“ওহ, তাই নাকি?”
নবনী খিলখিল করে হেঁসে উঠলো। দিব্য কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে ওর হাসিমুখটার পানে চেয়ে রইল। তারপর সাবধানে শাড়ি গলিয়ে নিজের উষ্ণ হাতটা এনে রাখল নবনীর উদরে। অনাস্বাদিত স্পর্শে এক অদ্ভুত আবেশে চোখ দুটি শক্ত করে বুজে ফেলল নবনী। দিব্যর গাঢ় কণ্ঠটা ওর কানে এলো,
“হ্যালো, মাম্মাম! শুনতে পাচ্ছ আমায়?”
নবনী চোখ মেলে চেয়ে বলল, “ও যে মেয়েই হবে, তা আপনাকে কে বলল? আর তাছাড়া ও তো এখনো পুঁচকে এতটুকু!”
নবনী হাতের দুই আঙুল ফাঁক করে অতি ক্ষুদ্র একটি আকৃতি বানিয়ে দেখাল। দিব্য নরম গলায় বলল,
“আমি মন থেকে চাই ও একটা মেয়েই হোক। ঠিক আরেকটা ছোট্ট দিয়ার মতো।”
“আমি কিন্তু একদম তা চাই না।”
“কেন?”
দিব্য অবাক হয়ে শুধাল। নবনী দিব্যর বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
“আমি চাই না অন্য কেউ এসেই আমার মেয়ের ভালোবাসায় ভাগ বসাক। ও ছেলে হয়ে এলেই বরং ভালো হয়!”
দিব্য কিছু বলার আগেই ছুটতে ছুটতে ঘরে এসে ঢুকল দিয়া। ঘরে ঢুকেই বাবা-মাকে এমন অবস্থায় একসাথে দেখে একমুহূর্তের জন্য হাঁ হয়ে গেল সে। নবনী লজ্জায় তড়িঘড়ি করে নামার জন্য দিব্যকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিতে লাগল, কিন্তু দিব্য সেসবে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নির্বিকার মুখে বসেই রইল। দিয়া এগিয়ে এসে গোল গোল চোখে জিজ্ঞেস করল,
“মাম্মা, পাপ্পা! তোমরা এটা কী করছ?”
নবনী দিব্যর দিকে গরম দৃষ্টিতে তাকাল। দিব্য অবশ্য তাতে একেবারেই বিচলিত না হয়ে দিব্যি হেসে জবাব দিল,
“আমি বেবিকে কোলে নিয়েছি।”
দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল! বলল, “কিন্তু বেবি কোথায়, পাপ্পা? এটা তো মাম্মা! মাম্মা তো আর বেবি নয়!”
দিব্য নবনীর পেটের দিকে ইশারা করে বলল, “বেবি তো এখন এখানে আছে, সোনা। মাম্মার পেটে। খুব শীগ্রই ও বাইরে চলে আসবে।”
দিয়ার ছোট্ট দুটো চোখে তখন একরাশ গভীর বিস্ময় এসে ভিড় করল। সে অবাক হয়ে শুধাল,
“সত্যি বলছ, পাপ্পা?”
নবনী হাত বাড়িয়ে দিয়াকে কোলে তুলে নিলো৷ মুহুর্তেই দিয়া কোল থেকে নেমে গেল। নবনী জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে, সোনা?”
দিয়া চিন্তিত মুখে বলল, “তুমি ওর ওপর আমাকে এভাবে বসালে বেবির ব্যথা লাগবে না, মাম্মা?”
মেয়ের কথায় দিব্য শব্দ করে হেসে ফেলল। নবনী দিব্যকে চোখের ইশারায় সরে যেতে বলতেই দিব্য ওকে ছেড়ে দিল। দিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। নবনী প্রায় ছো মেরে মেয়েকে দিব্যর কোল থেকে নিজের কোলে টেনে নিল। তারপর ওর তুলতুলে দুই গালে আদর করে চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“আমার লক্ষ্মী সোনা মাম্মা! এখন আর বেবির একদম ব্যথা লাগবে না। তুমি তো দেখছি এখনই একদম দায়িত্বসম্পন্ন বড় বোন হয়ে গেছ! কত বড়দের মতো কথা বলছ?”
দিয়া ছোট্ট মাথাটা নেড়ে বলল, “দাদু তো সব সময় বলে, আমি নাকি একটা বুড়ি! আচ্ছা পাপ্পা, বেবিটা কি আমার মতো একটা দিয়া হবে, নাকি ইহান আর ইভান মতো হবে?”
দিব্য হেসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কোনটা পছন্দ?”
দিয়া কিছুক্ষণ একদম চুপ হয়ে রইল। যেন ভীষণ গভীর কোনো জটিল ভাবনায় ডুবে গেছে! একটু সময় নিয়ে বলল,
“একটা বেবি হলেই হলো! আমি ওর সাথে খেলব। আচ্ছা মাম্মা, ও কি সবসময় আমাদের সাথেই থাকবে?”
নবনী বলল, “হ্যাঁ, সোনা, সবসময় থাকবে। তুমি ওকে আদর করবে তো?”
“হুম, খুব আদর করব!”
গম্ভীর আর সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাটা বলল দিয়া। মেয়ের এমন ভঙ্গি দেখে দিব্য আর নবনী দুজনই হাসলো।
বাতাসের তীব্র তোড়ে পথচলতি ধুলোবালির সাথে সাঁই সাঁই করে উড়ে যাচ্ছে শুকনো পাতার দল। বরফ শীতল হাওয়া শরীর জমিয়ে দিচ্ছে যেন। এর মাঝেই আবছা আলোয় ধেয়ে আসছে একটা চেনা অবয়ব। পরনে ধবধবে সাদা শর্ট কুর্তি আর কুচকুচে কালো জিন্স। একটা কালো চাঁদর জড়ানো গায়ে৷ ঝোড়ো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে ওড়া রেশমি চুলগুলো সামলানোর ব্যাকুল চেষ্টা তার। মেয়েটিকে চিনতে কলরবের বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না। সে নিজের হাত আঙুলে চেপে ধরা আধপোড়া সিগারেটটা এক ঝটকায় মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল। তবে ওঠেনি। একইভাবে বসে রইল। নিযানা এসে সটান দাঁড়াল ওর মুখোমুখি। কিন্তু কলরব একবার মুখ তুলে ওর দিকে তাকানোর সৌজন্যটুকুও দেখাল না। দুজনের মাঝে নিঝুম এক স্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল কিছুক্ষণ। নিযানা নীরবতা ভেঙে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“আকাশের অবস্থাটা তো নিশ্চয়ই চোখে পড়ছে? কানা তো নও তুমি! তাহলে এই অহেতুক জেদ চেপে এই ফাঁকা জায়গায় বসে থাকার মানেটা কী, শুনি? কাল সকালে সোজা ঢাকা চলে যেতে চাও, যেও। কেউ তো তোমায় পায়ে ধরে আটকে রাখেনি! কিন্তু এখন দয়া করে বাড়ি চলো।”
কলরবের ভাবলেশহীন ভঙ্গি দেখে মনে হলো, সে যেন নিযানার কথাগুলোর বিন্দুবিসর্গও শুনতে পায়নি। নিযানা বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
“কলরব! আমি তোমার সাথেই কথা বলছি কিন্তু!”
কলরব ধীরেসুস্থে মুখ তুলে তাকাল। নিরাসক্ত গলায় বলল,
“কিছু বলছিস আমাকে?”
নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কলরব অলস ভঙ্গিতে বসা থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাঁপটায় নিযানার অনাবৃত মুখমণ্ডল জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তার এলোমেলো রেশমি চুল। কলরব একদম কাছ থেকে মুগ্ধ চোখে দেখল সেই দৃশ্য। ভেতর থেকে এক প্রচণ্ড তাগিদ এলো হাত বাড়িয়ে ওর চোখের ওপর জমে থাকা চুলগুলো একটু আলতো করে সরিয়ে দেয়! কিন্তু বহু কষ্টে সেই অবাধ্য হাতটা আবার গুটিয়ে নিল সে। নিযানা বোধহয় ওর কোনো অনভিপ্রেত ছোঁয়া এড়াতে কিছুক্ষণের জন্য চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলেছিল। কিন্তু কোনো স্পর্শ না পেয়ে ধীরেসুস্থে আবার চোখ মেলল। কলরব চট করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
“কী দরকারে এত দূর কষ্ট করে এসেছিস, বল তো? চলে যা এখান থেকে! বিশ্বাস কর নিযানা, তোকে আর এক মুহূর্তও সহ্য হচ্ছে না আমার।”
নিযানা ঠোঁটের কোণে তিক্ততার হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ওহ্! এরমধ্যেই আমাকে এতটা অসহ্য লাগতে শুরু করেছে তোমার?”
কলরব রক্তচক্ষু মেলে তীব্র নজরে তাকাল ওর দিকে। নিযানা চমকে উঠে দেখল ওর চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে! পরমুহূর্তেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক ঝটকায় নিযানার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আনল কলরব। নিজের বলিষ্ঠ শরীরের সাথে নিযানার ছিপছিপে পাতলা শরীরটা একদম আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী চাস তুই শুনি, হ্যাঁ? কী এমন আছে কায়েফের মাঝে, যা আমার মধ্যে নেই? আজ সব কথা সোজা সাপ্টা বলবি নিযানা! কায়েফের সাথে তোর আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল, তাই না? শুধু যে কায়েফ তোকে একতরফা ভালোবাসত তা মোটেও সত্যি নয়। বরং তোরা দুজনই দুজনকে ভালোবাসতিস। ভুল বলছি আমি?”
কলরবের মুখ থেকে এমন অভিযোগ শুনে হতভম্ব হয়ে গেল নিযানা! বাকরুদ্ধ বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইল উন্মত্ত কলরবের দিকে। কলরব তখনো রাগে কাঁপছে। সে নিযানাকে আরও কাছে চেপে ধরে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলল,
“তাহলে এই পুরো নাটকে আমি ঠিক কে ছিলাম, বলবি? আমি তো কোনদিন তোদের জীবনের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে চাইনি! বরং সব ছেড়েছুড়ে সবসময় বহু দূরে সরে যেতে চেয়েছি। কিন্তু কেন আমাকে এতগুলো দিন মিথ্যা নাটকে ভুল বুঝিয়ে রাখা হলো? কেন আমাকে জোর করে মাঝখানে বলির পাঁঠা বানিয়ে রাখা হলো? আনসার মি!”
নিযানা কলরবের বাহুবেষ্টনী ভেঙে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে করতে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
“জাস্ট শাট আপ, কলরব! তোমার কি পুরো মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে? কায়েফের মতো একটা ছেলের সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে তুমি কীভাবে এত জঘন্য আর নিচু মানসিকতার ভাবনা ভাবতে পারলে? তোমার মাথায় কি এটাই ঘুরছিল যে কায়েফ আমাকে ভালোবাসে আর আমার সাথে ওর সম্পর্ক ছিল বলেই তুমি আমাকে ডির্ভোস দিয়ে মুক্তি দিতে চেয়েছিলে? সিরিয়াসলি কলরব? তোমার কাছে এটা সমাধান মনে হয়েছিলো? তুমি ভেবেছিলে তুমি আমাকে ডির্ভোস দিলে, আমি কায়েফ কে বিয়ে করবো?”
কলরব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “তাহলে কিসের এত জেদ তোর, বলবি? কেন কিছুতেই আবার আমার কাছে ফিরে আসতে চাইছিস না? হ্যাঁ, স্বীকার করছি আমি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলাম। তার জন্য কতবার ক্ষমা চেয়েছি, বল? গত কয়েকটা দিন ধরে পাগলের মতো তোর পেছনে পেছনে ঘুরছি। অনুশোচনায় জ্বলছি। এটাও কি তোর কাছে খুব কম মনে হচ্ছে?”
“কারণ যখন আমি সমস্ত কিছুর বিনিময়ে তোমার কাছে থাকতে চেয়েছিলাম, তখন তুমি আমাকে রাখোনি। আমি তোমাকে আকুল হয়ে বলেছিলাম, কলরব, তুমি আমাকে এভাবে ছেড়ে দিও না৷ আমি সত্যি মরে যাব! কিন্তু তুমি আমাকে মরার জন্য ছেড়ে দিলে। আমাকে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য একা ছেড়ে দিয়েছিলে। কতটা তীব্র যন্ত্রণায় দিনের পর দিন আমি আড়ালে পুড়ে ছাই হয়েছি, তুমি তার খবর রাখো? তোমার কি মনে হয়? বিয়েটা একটা ছেলেখেলা? যখন ইচ্ছে হবে খেলব, আর ভালো না লাগলেই সবটা গুঁড়িয়ে ভেঙে দিয়ে নতুন করে শুরু করবে?”
কলরব অধৈর্য হয়ে বলল, “আই অ্যাম সো স্যরি! স্যরি। প্লিজ, তুই শুধু একবার বল, তুই আমাকে ভালোবাসিস তো? ভালোবাসিস না, বল?”
বাতাসের দাপট হঠাৎ করেই যেন অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। কিন্তু ঠান্ডা তীব্র হয়েছে৷ ওদের অজান্তেই চারপাশে কখন যে কালচে অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এসেছে, তা টেরই পায়নি কেউ। শীতকাল হওয়ায় অন্ধকারের সাথে মিশেছে কুয়াশা। গ্রামের চারপাশ থেকে অচেনা সব রাতের প্রাণীর অদ্ভুত ডাক কানে আসছে। নিযানা নীরব রইল। এই অন্ধকারে নিস্তব্ধ পরিবেশটা কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল ওর। কলরবের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। ঠিক তখনই কলরবের পেছন থেকে একটা কড়া পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এই! তোমরা কেডা হে? এত রাইতে এইহানে দাঁড়াইয়া কী করতাছ, হ্যাঁ?”
নিযানাকে ছেড়ে দিয়ে কলরব চট করে পেছনে ঘুরে তাকাল। আবছা আলোয় দেখা গেল চার-পাঁচজন লোক কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে বেশ বড় একটা টর্চলাইট ছিল। সে মুহূর্তেই তীব্র আলোটা ওদের একদম চোখের ওপর জ্বেলে ধরল। লোকগুলোর মাঝখান থেকে মাথায় টুপি আর গায়ে পাঞ্জাবি পরা বয়স্ক একজন হুজুর গোছের লোক পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেডা তোমরা? আর এই রাইতের বেলা এই শুনশান জাগায় দুইজন কী করতাছ?”
কলরব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে শান্ত গলায় বলল,
“আমরা এই গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। এখানে আমার দাদুবাড়ি।”
লোকটা চোখ কুঁচকে সামান্য ভেবে বলল, “হেইডা তো বুঝলাম। কিন্তু এত রাইতে এই বিলের ধারে তোমরা দুইজন কী করতাছিলা, শুনি?”
কলরব আগের মতোই স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,
“বিশেষ কিছু না, এমনি।”
লোকগুলোর মাঝখান থেকে চাদর জড়ানো অন্য একজন লোক বেশ বাঁকা হেসে বলে উঠল,
“তাইলে কেমন কিছু? একখান তরুণ পোলা আর জোয়ান মাইয়া এই মাঝরাইতে এমন নির্জন জাগায় কী করে, হেইডা কি আমাগো বুঝতে বাকি আছে? তার উপরে আইবার সময় তো তোমাগো বেশ আপত্তিকর অবস্থাতেই দেখলাম! এই মাইয়া, কও তো এই পোলাডা তোমার কী হয়?”
নিযানার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে ছিল, তার ওপর অচেনা লোকগুলোর এমন অহেতুক জেরা আর নোংরা ইঙ্গিত ওর একদম সহ্য হলো না। সে বলল,
“কেউ না! ও আমার কিছুই হয় না।”
কথাটা শোনামাত্রই লোকগুলো আরও সন্দিহান চোখে দুজনের দিকে তাকাতে লাগল। সেই বয়স্ক লোকটা আবার চড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু না হইলে এই এত রাইতে এক পরপুরুষের লগে এইহানে কী করতে আইছ, শুনি? তোমাগো চালচলন কিন্তু মোটেই ভালো ঠেকতাছে না!”
কলরব পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা মুহূর্তেই আঁচ করতে পারল। মনে মনে নিযানার ওপর মারাত্মক চটে গেল। কত বড় একটা বোকা মেয়ে! এই বিপদের মুহূর্তে কেউ এমন ফালতু জেদ দেখায়? মেজাজটা চরম খারাপ হলেও সে নিজেকে আপ্রাণ সামলে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“আসলে আপনারা সম্পূর্ণ ভুল ভাবছেন। আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী।”
নিযানা চট করে কথার মাঝেই বলল, “মোটেও না! আমরা স্রেফ কাজিন।”
কলরব ক্ষুব্ধ চোখে নিযানার দিকে তাকাল। সত্যি সত্যি ইচ্ছে করছে মেয়েটার গালে ঠাটিয়ে দুটো চড় কষিয়ে দিতে! লোকগুলোর মধ্যে একজন বিশ্রীভাবে হেসে বলল,
“বুঝছি, বুঝছি! এই বয়স তো আমরাও বহুত আগে পার কইরা আইছি বাপু। কিন্তু তোমরা এক্কেরে ভুল জাগায় আইসা ভুল চাল চেলছ! আমাগো এই শান্ত গেরামে এইসব চরিত্রহীনতা আর নষ্টামি এক্কেরে চলবো না!”
নিযানা বিরক্তি চেপে নিয়ে বলল, “আশ্চর্য! আপনারা এখানে নষ্টামির কী দেখলেন, শুনি? কলরব, চলো এখান থেকে! নয়তো আমি একাই চলে যাচ্ছি।”
লোকগুলোর মাঝখান থেকে একজন পথ আটকে দাঁড়িয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
“উঁহু! অন্যায় কইরা এইভাবে এত সহজে পার পাইয়া কাইটা পড়তে পারবা না, বাছাধন!”
কলরব বলল, “আমি তো আপনাদের সহজ ভাষায় বলছি। আমরা বিবাহিত, স্বামী-স্ত্রী!”
“বাহ্! হে কইতাছে তোমরা ভাই-বইন, আর তুমি কইতাছ স্বামী-বউ! ধইরা ফালাইলে সব অন্যায়কারীরাই এমন হাবিজাবি কতা বানাইয়া কয়। আর কইডা সময় আটকাইয়া রাখলে তো শেষে কইবা, হে তোর মা, আর তুই হইলি ওর পেটের পোলা!”
লোকগুলো বিকট হাসলো। আরেকজন লোক বাঁকা হেসে যোগ করল,
“এইভাবে ফন্দি আঁইটা পার পাইতে পারবা না।”
কলরব ধৈর্য বজায় রাখার চেষ্টা করে বলল, “আপনারা যদি আমাদের কথায় বিশ্বাস না করেন, তবে আমাদের পরিবারের গুরুজনদের খবর দিন। তাহলেই তো সব সত্য জানতে পারবেন।”
“হাহ্! তোমাগো বাড়ির লোকজনও নিশ্চয়ই তোমাগো মতোই সুবিধাবাদী হইবো! তাই বাড়ির লোক ডাকনের আগেই আমরা এমন একখান পাক্কা ব্যবস্থা কইরা দিমু, যাতে জীবনে আর কোনোদিন বইন-ভাই কিংবা স্বামী-বউ সাজা লইয়া এমন নির্জন জাগায় আইসা নষ্টামি করতে না হয়! এক্কেরে ঘরে বইসাই সব করতে পারো। চুপচাপ আমাগো লগে চলো! শহরের পোলাপান এমনই হই। সব করে, বিয়া করতে কইলে ঝামেলা।”
নিযানা একটু ভয় পেল বোধহয়। বলল, “আপনারা এসব কী উল্টাপাল্টা বলছেন? কিসের ব্যবস্থার কথা বলছেন? দেখুন, আমি আপনাদের সাথে কোথাও যাব না!”
“ব্যবস্থা কইতে বিশেষ কিছুনা। তোমাগো এখনই কাজী ডাইকা চার হাত এক কইরা বিয়া দিয়া দিমু! ব্যস, ঝামেলা খতম।”
কথাটা শুনে নিযানা যেন আকাশ থেকে পড়ল!আর্তনাদ করে উঠে বলল,
“কখনোই না! অসম্ভব! আমি জীবনেও এই ছেলেটাকে বিয়ে করব না!”
লোকগুলোর মধ্য থেকে একজন তড়িঘড়ি বলে উঠল,
“ক্যান? এই মাত্র না তোমার লগের টায় কইল, তোমরা স্বামী-বউ? তাইলে অহন বিয়া করতে এত আপত্তি ক্যান, শুনি?”
হুজুর গোছের লোকটা কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন,
“চলো আমাগো লগে! যা কথা-বার্তা হইবার, হেইডা আমাগো বাড়িত গিয়াই হইবো। ওই যে বিলের ওপারে কইডা বাড়ি দেহতাছ না? হেইডা মোল্লাগো বাড়ি, মানে আমাগো ঘরদোর। চলো চলো। নষ্টামি ছুটাইতাছ। ধরা পইড়া আবার মিছা কতা কও!”
কলরব আর নিযানা দুজনের কেউই এখনো বাড়ি ফেরেনি। বাড়ির সবাই মোটামুটি চিন্তিত। আশপাশে খুঁজে দেখেছে৷ কোথাও নেই। ফোনের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি গায়েব। কায়েফ আপ্রাণ চেষ্টা করছিল অন্তত নিযানা বা কলরবের ফোনে একটা কল দেওয়ার। মোটামুটি হাঁটাহাঁটি করছিলো ও৷ বাড়ির পেছনের দিকের একটা একচালা ঘরের সামনে আসতেই কায়েফের কানে ভেসে এলো একটা আর্তনাদ,
“আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন। আপনার পায়ে পড়ি। আমাকে রেহাই দিন!”
কণ্ঠটা পরিচিত মনে হলো কায়েফের। থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই ও বুঝল, এটা তো ঊর্মির ঘর! বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল কায়েফের। সে দ্রুত পায়ে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা ছিল শতগুণ ভয়াবহ ও জঘন্য! ঊর্মির ছিপছিপে শরীরটাকে বিছানায় নিজের বলিষ্ঠ বুকের নিচে হিংস্রভাবে চেপে ধরেছে আশরাফুল! সে কদর্যভাবে ঝুঁকে আছে মেয়েটার অবশ হয়ে আসা দেহের ওপর। ঊর্মির সর্বশক্তি দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজেকে বাঁচানোর। তার ছটফটানিকে নিজের দুই হাতে কাবু করতে করতে আশরাফুল দাঁত বের করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“একদম চুপ। চেঁচামেঁচি করলে বদনাম তোর হবে। খুব বাড় বেড়েছে না তোর, মুখপুড়ি? শুনলাম ওই মরার বুড়ো নাকি কাল সকাল হলেই তোকে ওদের সাথে শহরে পাঠিয়ে দেবে! সেখানে নাকি তোর আবার বিয়ে দেবে! তা এতগুলো বছর তোকে যে এ বাড়িতে অন্ন দিয়ে খাইয়ে-পরিয়ে রাখলাম, তার পাওনা মেটাবে কে, হা? একটা রাত তো নিজের ইচ্ছেতেই আমাকে দিতে পারিস, বল?”
আশরাফুল ভেবেছিল মেয়েটা ভয়ে ও অপমানে একদম নিস্তব্ধ হয়ে থাকবে। কিন্তু ঊর্মি যে এভাবে নিজের মরণপণ শক্তিতে চেঁচামেচি শুরু করবে, তা সে ভাবেনি। রাগের মাথায় সে এক ঝটকায় ঊর্মির গায়ের শাড়িটা শরীর থেকে টেনে আলাদা করে ছুঁড়ে ফেলল। মুহূর্তেই প্রকাশ পেয়ে গেল মেয়েটার অরক্ষিত রূপ। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে তীব্র আর্তনাদ করে উঠল ঊর্মি। নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক ছটাকে জড়ো করে অনবরত ঠেলে সরানোর চেষ্টা করতে লাগল সেই পশুটাকে। আশরাফুল শাড়ির আঁচলটা দিয়ে ঊর্মির হাত আর মুখ বেঁধে ফেলার পাঁতারা করছিল, ঠিক তখনই দরজায় সজোরে করাঘাত পড়ল,
“শুনছেন? ভেতরে সব ঠিক আছে তো? আপনার কী কিছু হয়েছে?”
হুট করে বাইরে থেকে একটা বলিষ্ঠ পুরুষের কড়া গলা কানে আসতেই যেন নিভে আসা মোমের মতো নিমিষেই শরীরের শেষ বলটুকু ফিরে পেল ঊর্মি। ওদিকে দরজার আওয়াজে চকিতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল আশরাফুল। সেই সুযোগে ওকে সর্বশক্তিতে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ছিটকে দরজার কাছে চলে গেল ঊর্মি। আর সাথে সাথেই সজোরে খুলে দিলো দরজাটা! দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত, অর্ধনগ্ন আর থরথর করে কাঁপতে থাকা ঊর্মিকে দেখে কায়েফের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! সে সম্পূর্ণ হতভম্ব ও বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। তবে তার চেয়েও হাজার গুণ বড় ধাক্কা খেল, যখন ঘরের ভেতরে হাত দিয়ে জামা গোছাতে থাকা আশরাফুলকে স্পষ্ট দেখতে পেল! কায়েফের সেই অপলক দৃষ্টির পানে তাকাতেই নিজের বর্তমান অবস্থার বিভৎস রূপটা উপলব্ধি করতে পারল ঊর্মি। তীব্র লজ্জা, অপমান আর গ্লানি থেকে বাঁচতে এই মুহুর্তে ওর ইচ্ছে করল মাটির নিচে তলিয়ে যেতে! ব্যাকুল হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল ও। হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার বিফল চেষ্টা করল। কায়েফ চোখ দুটি মুহূর্তের জন্য বুজে পরক্ষণেই একরাশ ঘেন্না আর প্রচণ্ড ক্রোধ নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। রক্তচক্ষু মেলে আশরাফুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী হচ্ছেটা কী এখানে, হা? কী করার চেষ্টা করছেন আপনি?!”
টিনের বেড়া দেওয়া ছোট্ট একটা ঘর। আসবাবের নামে ঘরের ভেতর শুধুই একটা কাঠের খাট আর জীর্ণ একটা টেবিল। ঘরের দরজার বন্ধ করে দিয়ে কলরব ভেতরে প্রবেশ করতেই নজরে এলো নিযানা। সে কাঠের জানালার পাটে হাত রেখে অপলক চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। মুখে একরাশ গম্ভীরতা। এক অমলিন বিষাদ। অনেক বোঝানো, অনেক চেষ্টা। কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। রাত পৌনে এগারোটা অবধি যুক্তিতর্ক আর টানাপোড়েন চলার পর, শেষমেশ তাদের পুনরায় ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে দেওয়া হলো। রাত গভীর হয়ে যাওয়ায় আজকের রাতটা এই ঘরেই তাদের কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন উনারা। কলরব নিঃশব্দে এগিয়ে গেল নিযানার দিকে। নিযানা কিন্তু টের পেল না। নিশ্চল, নিথর হয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। কলরব কিছুটা ইতস্তত করে, আমতা আমতা গলায় নীরবতা ভাঙল,
“তখন তো কিছুই খেলি না। এখন কি সারা রাত এভাবে জেগে কাটাবি?”
কথায় যেন মোহভঙ্গ হলো নিযানার। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল সে। নিযানার সেই বিধ্বস্ত, রক্তিম মুখের পানে তাকাতেই কলরবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঘরের আবহে চোখ বুলিয়ে সে টেবিলের ওপর থেকে নিযানার গায়ের চাদরটা তুলে নিয়ে আলতো করে তার গায়ে জড়িয়ে দিল। নিযানা ভেজা কণ্ঠে শুধাল,
“আমি মাম্মা-আব্বুকে গিয়ে কী জবাব দেব?”
কলরব নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে উত্তর দিল,
“বলবি, যা হয়েছে সব তোর পাকনামির জন্যই হয়েছে। আর এখন এই জানালাটা বন্ধ কর তো। বাইরে থেকে প্রচণ্ড ঠান্ডা আসছে।”
নিযানার চোখে সংশয়, “তুমি ইচ্ছা করে এসব করেছ, তাই না? তোমার ফোনে কি আমাদের বিয়ের একটা ছবিও ছিল না? নাকি সত্যিই ফোনটা চার্জের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল?”
কলরব কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “দুটোই সত্যি! আর আমি ইচ্ছা করে এসব করতে যাব কেন বল তো? আমরা তো অলরেডি বিবাহিত ছিলাম। আর আমি কি তোকে ডিভোর্স দিতাম?”
নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়াতেই কলরব আলতো করে তার হাতটা চেপে ধরল। গভীর কণ্ঠে বলল,
“এভাবে পদে পদে আমাকে অবিশ্বাস করিস কেনো বল তো? আমার ওপর কি এতটুকুও ভরসা রাখা যায় না?”
নিযানা কোনো উত্তর দিল না। কলরব তাকে টেনেই বুক জড়িয়ে নিল। নিযানা আর সরার চেষ্টা করল না।কেবল কলরবের চোখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। কলরব ব্যাকুল হয়ে বলল,
“এখনো রাগ করে থাকবি?”
নিযানা তপ্ত গলায় বলল, “তবে আর কী করব? আই লাভ ইউ বলে তোমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ব? ওহ, দাঁড়াও… তুমি তো আজও আমাকে ভালোবাসার কথাটা স্পষ্ট করে বলোনি। সত্যি কি আমায় ভালোবাসো কলরব? নাকি সবটাই…!”
নিযানার কথা শেষ হওয়ার আগেই কলরব নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল ওর ললাটে। মুহূর্তেই নিযানা স্তব্ধ হয়ে গেল। বুঁজে নিলো চোখজোড়া। ঠিক পরক্ষণেই একটা ক্ষীন, আকুল কণ্ঠস্বরে কানে এলো ওর,
“আই লাভ ইউ। আমি তোকে ভালোবাসি।”
নিযানার বুকটা ধক করে উঠল। হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে গেল দ্বিগুণ। কলরব শান্ত চোখে চেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
“আর কিছু জানার আছে তোর?”
নিযানা শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। কলরব কয়েকবার চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না। নিযানার মায়াবী মুখের মোহময়তায় আটকে রইল তার দৃষ্টি। কাঁদলে ওকে আদুরে লাগে। আলতো হাতে নিযানার থুতনিটা ছুঁয়ে মুখটা খানিকটা ওপরে তুলল। নিযানার তুষারশীতল গালে কলরবের উষ্ণ নিশ্বাস এসে পড়ল। দুজনের নিশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে একে অপরকে। নিযানার গোলাপের পাপড়ির মতো তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটজোড়ার দিকে তাকিয়ে কলরব শুকনো ঢোক গিলল। কাতর কণ্ঠে শুধাল,
“একটা চুমু খাই?”
এক অজানা শিহরণে নিযানার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। যেন কানের পাশ দিয়ে উষ্ণ বাষ্প বয়ে গেল। কলরবের চোখের দিকে তাকানোর সামর্থ্য তার রইল না। লজ্জায় চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল সে। কলরব মৃদু হেঁসে নিচু গলায় বলল,
“না বললেও শুনছেটা কে! আজকের রাতটা আমার। আফটার অল বাসর রাত বলে কথা।”
পরক্ষণেই নিযানার কম্পিত ওষ্ঠপটে অনুভূত হলো জোরালো, পুরুষালি স্পর্শ। সময় যেন থমকে গেল সেই মুহূর্তটিতে। নিজের অজান্তেই নিযানা নিজেকে সঁপে দিল সেই আবেশে। কলরবকে আর দূরে ঠেলে দিতে পারল না তার মন। সময়ের সাথে সাথে বাড়ল হৃদয়ের আকুলতা, বাড়ল স্পর্শের প্রগাঢ় গভীরতা। কনকনে শীতের রাতে দুটো ব্যাকুল হৃদয় তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল একে অপরকে উষ্ণতায় ভরিয়ে দিতে।
এই অবেলায় পর্ব ৫০
কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে পুব আকাশে তখন সবেমাত্র কাঁচা সোনার মতো রোদ ফুটছে। রাতের হিমেল আমেজটাকে বিদায় জানিয়ে চারপাশের প্রকৃতি উঞ্চতা আহরোণ করছে। কলরব এপাশ-ওপাশ করে বুঝলো নিযানা নেই। চট করে উঠে বসলো ও। এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা কাগজ পেল ঠিক পাশে। কলরব খুলতেই হতভম্ব হয়ে গেল। কগজটাতে একটা লাইন লেখা,
“কাল রাতের জন্য স্যরি৷ আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে ডির্ভোস দিয়ে দেব৷”
