এই অবেলায় পর্ব ৫০
সুমনা সাথী
পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় নয়টা বেজে গেল ওদের। আরশাদ তালুকদারের ছোট চাচা কাশেম তালুকদার। উনার এক মাত্র ছেলে রফিকুল তালুকদার। রফিকুল তালুকদারেরও দুই ছেলে ছিল। তবে ছোট ছেলেটি মারা গেছে বছরখানেক আগে। মারা গেছে বললে ভুল হবে। জমিজমা নিয়ে গ্রাম্য রেষারেষির জেরে তাকে নির্মমভাবে খু’ন হতে হয়। রফিকুল তালুকদারের বড় ছেলে আশরাফুল তালুকদার নিজেই স্টেশনে এসে ওদের সবাইকে নিয়ে গেলেন। স্টেশন থেকে হেঁটে যেতে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। গ্রামে কোনো আকাশছোঁয়া মস্ত বিল্ডিং না থাকলেও, বিস্তর জায়গা জুড়ে চমৎকার একতলা একটা দালান বাড়ি আছে। এছাড়া বিশাল উঠানের তিন কোণ জুড়ে সারি বেঁধে রয়েছে কাঠ আর টিনের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সব ঘর। প্রতি বছর ঈদ কিংবা পারিবারিক কোনো বড় অনুষ্ঠানে আরশাদ তালুকদার পুরো পরিবার নিয়ে এইখানে ছুটে আসেন। বাড়ির একপাশে আবার রয়েছে বিশাল পুকুর। গ্রামে পৌঁছেই হাত-মুখ ধুয়ে সবাই মিলে রাতের খাওয়া শেষ করে নিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে নিজ ঘরে এসে ঢুকল দিব্য। দিয়া ইতিমধ্যেই বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা। নবনী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ঝোপঝাড়ের অন্ধকারের পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। দিব্য ধীর পায়ে পেছন থেকে এগিয়ে এসে আলতো করে নবনীর কানের কাছে ফুঁ দিল। আচমকা এই ছোঁয়ায় বেশ চমকে উঠল নবনী। আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“আল্লাহ!”
দিব্য হাসি মুখে বলল, “আরে ভয় পাচ্ছ কেন, আমি!”
নবনী নিজের বুকে হাত রেখে ধাতস্থ হয়ে বলল,
“এভাবে পেছন থেকে ভূতের মতো আসার কে আসে?”
“আমি আবার ভূতের মতো কখন আসলাম?”
নবনী নীরব রইল। তার চোখে-মুখে কেমন যেন আচ্ছন্নতা। দিব্য তার কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে, নবনী? এনিথিং রং? রাতে ঠিকমতো খেতেও গেলে না। এখন আবার এমন বিষণ্ণ মুখ করে একা একা দাঁড়িয়ে আছো।”
নবনী ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে নিচু গলায় বলল,
“কেমন মুখ করে?”
দিব্য চিন্তিত গলায় বলল, “তোমাকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। ইদানীং তুমি খাওয়া-দাওয়ায় ভীষণ অনিয়ম করছ। শরীরটা কি খারাপ লাগছে তোমার?”
নবনী বিছানায় পা তুলে বসল। গায়ে কম্বলটা টেনে দিয়ে শুয়ে পড়ে আড়ষ্ট গলায় বলল,
“এমনই ভালো লাগছিল না বলে খাইনি। তেমন কিছু না।”
দিব্য নিজেও আর কথা না বাড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। উষ্ণ কম্বলের ভেতরে ঢুকেই নবনীকে নিজের বুকের বাঁ পাশে টেনে নিল। নবনী স্বামী-বুকের ওমে গুটিয়ে গেল। দিব্য কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে, ওর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কেমন কিছু?”
নবনী প্রত্যুত্তরে চট করে কিছু বলতে পারল না। ভেতরের সমস্ত কথা যেন কেমন গুলিয়ে যেতে লাগল। মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ শূন্য মনে হলো তার। কীভাবে, কোন শব্দে অনুভূতিটা প্রকাশ করবে তা ভেবেই পাচ্ছিল না। অবশেষে বুকের ভেতরের তীব্র স্পন্দনটুকু সামলে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনি! আপনি আবারও বাবা হতে চলেছেন।”
কথাটা বলেই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে জমে গেল নবনী। আসলে এখানে ভয় পাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবুও এক অদ্ভুত আজব অনুভূতির মেঘ ওকে ঘিরে ধরেছে। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই সে মনে মনে সন্দেহ করছিল। মৌনিতায় তাকে বুদ্ধিটা দিলো। পরীক্ষার শেষের দিন সে একটু তাড়াতাড়ি বের হয়ে এসেছিল। দিব্য তাকে নিতে আসার আগেই ও একটা ওষুধের দোকান থেকে তিন-তিনটে প্রেগন্যান্সি কিট কিনে নিয়েছিল। কিন্তু এতসব ঝামেলার মাঝে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছিল না। আজ যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে তারা সবাই কয়েকদিনের জন্য গ্রামে চলে আসছে। তখন দুপুরের পরপরই টেস্ট করে নেয়।অবাক করা বিষয় হলো, তিনবারই টেস্টের ফলাফল এসেছে পজিটিভ! তখন থেকে এখন পর্যন্ত নিজের ভেতরে এত বড় একটা খুশির খবর ও কীভাবে চেপে রেখেছিল, তা একমাত্র নবনীই জানে। দিব্য অবশ্য প্রথমবারে নবনীর অস্পষ্ট কথাটা পুরোপুরি শুনতে পায়নি। সে নবনীর চুলে মুখ গুঁজে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কথা ঠিক বুঝলাম না, নবনী। কী বললে একটু স্পষ্ট করে বলো তো?”
নবনী একটা শুকনো ঢোক গিলল। নিচু গলায় বলল,
“বলছিলাম, বোধহয় দিয়ার খেলার সাথী হিসেবে খুব শিগগিরই নতুন কেউ একজন আসতে চলেছে।বিছানায় আমরা খুব দ্রুতই তিনজন থেকে চারজন হয়ে যাব।”
পুরো কথার অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেই যেন শীতল একটা তীব্র শিহরণ বয়ে গেল দিব্যর সমস্ত শিরা, উপশিরায়! এক অজানা, অনির্বচনীয় সুখানুভূতিতে এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল সে। কথাগুলো যেন ওর গলার কাছে এসে আটকে গেল হঠাৎ। বাকরুদ্ধতা কাটিয়ে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি… তুমি সত্যি বলছ, নবনী?”
দিব্যর প্রশস্ত বুক থেকে নিজের মাথাটা তুলে চাইল নবনী। অন্ধকারের মাঝেও সামনের মানুষটার প্রতিক্রিয়া বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। দিব্যর তো এই খবরে ভীষণ খুশি হওয়ার কথা, সে কি খুশি হয়নি? দিব্যর গভীর, বিস্ময়কর আর প্রতিক্রিয়াহীন চোখ দুটোর পানে চেয়ে বোকার মতো হালকা করে হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ল নবনী। দিব্য এক মুহূর্তও সময় নিল না। চট করে নবনীর মাথাটা পুনরায় নিজের বুকের সাথে সজোরে চেপে ধরল। আবেগঘন গলায় বলে উঠল,
“আই লাভ ইউ, নবনী!আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি!”
নবনীর হৃৎপিণ্ডে যেন বিদ্যুৎবেগে একটা তীব্র ধাক্কা লাগল! সে কি সত্যিই ঠিক শুনছে? এই কঠিন, গম্ভীর লোকটা আজ নিজ মুখে এত সহজে কথাটা বলে দিল? সেই বহু কাঙ্ক্ষিত তিনটি শব্দ। যা শোনার জন্য দিনের পর দিন অস্থির হয়ে থাকত নবনীর মন! নিজের অজান্তেই নবনীর চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোটা তপ্ত আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল দিব্যর শার্টের ওপর। আবেশে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আরেকবার বলুন… প্লিজ!”
দিব্য ওর মুখটা দু-হাতের আঞ্জলিতে তুলে নিয়ে চুমু খেল ললাটে। গভীর কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে আমি ভালোবাসি, নবনী! খুব… খুব… খুব ভালোবাসি! আমার নিজের অস্তিত্বের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি।”
নবনী খিলখিল করে হেসে উঠল। দিব্যর ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠল। দিব্য হঠাৎ উপলব্ধি করল, ওর নিজের চোখের কোণ দুটোও ভিজে উঠেছে! ইশ, এভাবে বোধহয় কত বছর ধরে মন খুলে কাঁদা হয়নি ওর। এক প্রচণ্ড, সুখানুভূতি এসে জড়িয়ে ধরেছে ওদের দুজনকে। এত ভালো কেন লাগছে আজ সব কিছু? নবনী দিব্যর বুকে মাথা গুঁজে আদুরে গলায় বলল,
“এই এতটুকু একটা কথা স্বীকার করতে আপনি এতদিন লাগিয়ে দিলেন? ভারি অহংকারী লোক তো আপনি!”
দিব্য শব্দ করে হেসে ফেলল, “তোমাকে তোমার উপহারের চমৎকার একটা রিটার্ন গিফট দিলাম! তুমি জানো না নবনী, নিজের অজান্তেই তুমি আমাকে কতটা কী দিয়েছ। আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছ, খুশি দিয়েছ, আবার মন খুলে হাসতে শিখিয়েছ,ভালোলাগার অনুভূতিগুলো নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছ। আমার ভেতরের ভাঙাচোরা মানুষটাকে তিল তিল করে জোড়া দিয়েছ তুমি, আমাকে চমৎকার একটা পরিবার উপহার দিয়েছ, আর আমার জীবনের সমস্ত অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় ভরিয়ে তুলেছ। আর আজ! আজ তো পৃথিবীর সবচাইতে সেরা উপহারটাও দিয়ে দিলে! আমি আসলে তোমায় ঠিক কীভাবে ভালোবাসব, তা বুঝে উঠতে পারছি না। আজ আমার সত্যি সব এলোমেলো লাগছে!”
নবনী দিব্যর বুকের তীব্র স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। নিজে মা হতে চলেছে জানার পর তার যতটুকু ভালো লেগেছিল, দিব্যর বুকে মাথা রেখে ওর মুখ থেকে এমন সহজ স্বীকারোক্তি শোনার পর তার চেয়ে দ্বিগুণ আনন্দ হচ্ছে। এই মানুষটা খুশি। এটায় যেন তার সবচেয়ে বড় খুশির কারন। নবনী এক হাতে চোখের কোণের জলটুকু আলতো করে মুছে নিয়ে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
“বাহ্! পেটে বাচ্চা আসতেই বুঝি বউয়ের প্রতি ভালোবাসার জোয়ার উছলে পড়ছে?”
দিব্য নবনীকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বলল,
“উঁহু, ভালোবাসা-বাসির প্রাতিষ্ঠানিক পর্ব তো অনেক আগেই শেষ, নবনী। এখন শুধু জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমায় এভাবেই ভালোবেসে যেতে চাই।”
“আপনি আমাকে সত্যি এত বেশি ভালোবাসেন?”
“হুমমমম…!”
নবনী কৌতূহলী গলায় বলল, “আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, আপনি আমাকে বেশি ভালোবাসেন নাকি দিয়াকে?”
“দুজনকেই সমান। তোমরা দুজন ঠিক আমার হৃৎপিণ্ড আর মস্তিষ্কের মতো। দুটোর যেকোনো একটা বন্ধ হয়ে গেলেই তো মানুষ আর বেঁচে থাকে না, তাই না?”
নবনী মৃদু হেঁসে বলল, “ধরুন, কোনো একটা কঠিন মুহূর্তে কখনো যদি আমার আর দিয়ার মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হয়, তখন আপনি কাকে বাঁচাবেন?”
কথাটা শেষ করেই চট করে মাথা তুলল নবনী। অন্ধকারের মাঝেও তীব্র কৌতূহল নিয়ে সটান তাকাল দিব্যর চোখের পানে। দেখা যাক, এই কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে মহাশয় দিব্য তালুকদার কী করেন! মনে মনে ভয়ে থাকলেও অদ্ভুত একটা পৈশাচিক আনন্দ খেলা করে গেল নবনীর মনজুড়ে। দিব্য অবশ্য মোটেও বিচলিত বা দ্বিধাগ্রস্ত হলো না। নবনীর চোখের দিকে চেয়ে পরমুহূর্তেই একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল,
“দিয়াকে।”
নবনী হেসে ফেলল, “জানতাম আমি! ভেবেছিলাম এই উত্তরটা দিতে আপনি এক সেকেন্ড সময়ও নেবেন না। অবশ্য তবুও সামান্য একটু সময় আপনি ভাবার জন্য নিলেন!”
দিব্য মৃদু হেঁসে নবনীর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলল,
“শোনো নবনী, তোমার আর দিয়ার মধ্যে কাউকে বেছে নিতে হলে, আমি সময় নিয়ে হলেও অবশ্যই দিয়াকে বাছবো। কিন্তু যদি কখনো আমার নিজের জীবন আর তোমার মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিতে হয়, তবে আমি এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে নির্দ্বিধায় তোমাকেই বাছবো। আর কিছু জানার বা বোঝার বাকি আছে, মিসেস তালুকদার?”
নিযানা, কুহু আর আনায়াকে একই সাথে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে তিনজনেই মাত্র পাশাপাশি শুয়েছে। ঘরের নিরবতা ভেঙে আনায়া নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা নিযানা, কুহুর মুখে শুনলাম তোমাদের নাকি ডিভোর্স হতে চলেছে?”
নিযানা শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ।”
আনায়া বেশ কৌতূহলী গলায় বলল, “সিরিয়াসলি? কিন্তু ট্রেনে তো সারা রাস্তা তোদের পাশাপাশি বসেই আসতে দেখলাম। দুজনের হাবভাব দেখে তো একবারও মনে হলো না তোদের মাঝে কোনো সমস্যা কিংবা দূরত্ব আছে!”
নিযানা হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও আমাদের তো আগে থেকেই একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, আনায়া। আমি সত্যিই চাই না ডিভোর্সের পর আমাদের সেই যোগাযোগ বা মুখ দেখাদেখিটাই একেবারে বন্ধ হয়ে যাক।”
আনায়া মৃদু মাথা নেড়ে আবারও প্রশ্ন করল, “তাহলে সত্যি বলতে ডিভোর্সের মূল কারণটা কী?”
“ব্যাস, আমাদের দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব। আর এমন ধোঁয়াশাপূর্ণ একটা সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর চেয়ে না থাকাটাই তো ভালো, তাই না?”
আনায়া আরও কিছু একটা বলতে যেতেই পাশে শুয়ে থাকা কুহু পাশ ফিরে শুলো। তারপর কথা কেটে দিয়ে বলল,
“মূল কারণটা হল ভাইয়া বা নিযানা, কেউই আসলে এই বিয়েটা মন থেকে করতে চায়নি। ভাইয়া অন্য কাউকে পছন্দ করত। আর এখন তোমরা দুইজনই দয়া করে ফিসফিসানি বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে পড়ো তো! আমার মারাত্মক ঘুম পাচ্ছে।”
আনায়া কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল, “ওহ, আই সি। ওকে, গুড নাই কুহু।”
কুহু বিরস গলায় বলল, “গুড নাইট।”
আনায়া অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুলো। নিযানাও আলতো করে নিজের চোখের পাতা দুটো বুজে ফেলল।
“কলরব, শুনুন!”
পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চট করে পেছনে ফিরে তাকাল কলরব। পেছন থেকে আনায়াকে হেঁটে আসতে দেখে সে কিছুটা অবাকই হলো। আশ্চর্য! মেয়েটা হুট করে তাকে এভাবে ডাকছে কেন? কলরব ভ্রু জোড়া কিছুটা কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু দরকার আপনার?”
আনায়া ধীরপায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কোথাও যাচ্ছ নাকি? বাই দ্য ওয়ে, তুমি কিন্তু আমাকে আপনি না বলে তুমি করে বলতে পারো।”
কলরব মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, ওপাশে বড় বড় অনেকগুলো খেজুর গাছ আছে? সকালে ওগুলো থেকে টাটকা রস নামানো হয়। আমি রস খাব বলেই ওদিকে যাচ্ছিলাম।”
“ওয়াও, খেজুরের রস! চলো আমিও তোমার সাথে যাব।”
কলরব না করল না। দুজনে পাশাপাশি গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর আনায়া একটু ইতস্তত করে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা কলরব, তুমি যে বিবাহিত আমি তো তা জানতামই না! আবার এর মধ্যেই শুনলাম তোমাদের নাকি ডিভোর্স হতে চলেছে? আচমকা এত বড় একটা সিদ্ধান্ত কেন নিলে?”
কলরব আড়চোখে তাকাল আনায়ার দিকে। এ আবার হুট করে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে উঠেপড়ে লাগল কেন! তবে মুখে কোনো অসন্তোষ না দেখিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আসলে ছোটখাটো কিছু জটিলতা আর ঝামেলা তৈরি হয়ে গেছে, এই আরকি।”
“তুমি কি নিযানাকে একদমই বিয়ে করতে চাওনি?”
কলরব হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “নাহ! একেবারেই না। আসলে সত্যি বলতে আমি ওকে কখনো সেভাবে পছন্দই করতাম না। আমার আগে অন্য একজনের সাথে সিরিয়াস প্রেম ছিল। কিন্তু আনফরচুনেটলি তার সাথে বিয়েটা আর হওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই বাধ্য হয়ে ওকে বিয়ে করতে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর বুঝলাম, আমাদের একসাথে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব না। ও আর আমি সম্পূর্ণ দুই মেরুর মানুষ।”
আনায়া মাথা নেড়ে বলল, “সো স্যাড! কিন্তু এতদিন ধরে একটা ছাদের নিচে একসাথে থেকেও কি তোমাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বোঝাপড়া তৈরি হয়নি? কিংবা একে অপরের প্রতি অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ? এতদিন থাকলে তো কিছুটা হলেও ভালোবাসা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তাই না?”
কলরব শুকনো হেসে উত্তর দিল, “নাহ্, তা হয়নি। আসলে কী জানো, আমি আমার এক্স-কে আজও এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি। এখনো মাঝরাতে হঠাৎ তার কথা মনে পড়লে বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। প্রচণ্ড কান্না পায়। নিযানাকে আর যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। আসলে প্রথম ভালোবাসার মানুষকে কি চাইলেই অত সহজে ভোলা যায়, বলো? আমার কথা বিশ্বাস না হলে কায়েফকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো। ওরও তো এককালে এক্স ছিল। ও ভালো বুঝবে!”
কথাটা শেষ করেই কলরব চট করে আনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করল। তারপর চোখে-মুখে দারুণ একটা অপরাধবোধ আর আফসোসের অভিনয় ফুটিয়ে বলল,
“ওহ স্যরি, স্যরি! আমি আসলে নিজের দুঃখে কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছি! কিছু মনে কোরো না। কায়েফের ওসব তেমন গভীর কিছু ছিল না। স্রেফ সামান্য একটু আকর্ষণের ব্যাপার ছিল আরকি!”
আনায়া বলল, “না না, এতে স্যরি বলার বা আমার কাছ থেকে কিছু লুকানোর তো কিছু নেই! কায়েফ নিজে থেকেই আমাকে ওর এক্সের কথা একদম খোলামেলা বলেছে। ও নাকি আগে একটা মেয়েকে ভালোবাসত। ও মূলত আন্টির মন রাখতেই আর ওনার জেদের কাছে মাথা নুইয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়েছে। তবে কায়েফ আমাকে স্পষ্ট কথা দিয়েছে। বিয়ের পর ও চেষ্টা করে ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক করে নেবে এবং আমার কোনো কিছুতেই কমতি রাখতে দেবে না। ও আগেই আমাকে সব সত্য বলে দিয়েছে যাতে পরে আমি ওকে ভুল না বুঝি। হি ইজ সাচ আ নাইস পার্সন। তাই না বলো?”
কলরব গলার স্বর করুণ করে বলল, “নাইস পার্সন তো অবশ্যই! কায়েফ ছেলে হিসেবে তো অসাধারণ। তবে বললেই কি আর মুখ ফুটে অত সহজে অত বছরের ভালোবাসা ভোলা সম্ভব, বলো? আমি তো নিজের জীবন দিয়ে হাড়হাড় হাড়ে বুঝি ব্যাপারটা! এই যেমন নিযানাকে তো তুমি নিজের চোখেই দেখেছ। কী মারাত্মক সুন্দর মেয়েটা! আর ওদিকে আমার সেই এক্স? নিয়ানার রূপের কাছে তো সে একেবারে নগণ্য, তুচ্ছ বললেই চলে! তাও আমি এত চেষ্টা করার পরও নিযানার সাথে একটা দিনও মন থেকে সংসার করতে পারলাম না। এখন চিন্তা করো, আমার তো তাও মাত্র বছর দেড়েকের রিলেশন ছিল। তাতেই আমার এই অবস্থা! আর ওদিকে কায়েফের তো ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা গভীর প্রেম! ও আদতে অতটা ভুলতে পারবে কি না, তা তো সময়ই বলবে। শেষমেশ আবার তোমাদের মিষ্টি সম্পর্কটার করুণ পরিণতিও আমাদের এই ভাঙা সম্পর্কের মতো না হয়ে দাঁড়ায়!”
কলরব একদম নিখুঁত সহানুভূতি আর আফসোসের অভিনয়টা করে কথাটা শেষ করল। এই পর্যায়ে আনায়ারা মুখে আর কোনো কথা ফুটল না। একটু আগে পর্যন্ত তার মুখে যে স্বাচ্ছন্দ্য আর হাসি ছিল, তা যেন উবে গেল। তার উজ্জ্বল মুখটা এক পশলা মেঘ জমে বিশ্রী রকমের বিরস আর বিষণ্ণ হয়ে উঠল। সে কোনো এক গভীর আর জটিল ভাবনায় তলিয়ে যেতে শুরু করল। ওদিকে পাশে দাঁড়িয়ে আনায়ার এই থমথমে ও বিষাদগ্রস্ত দশা দেখে কলরব মনে মনে বেশ আনন্দ আর তৃপ্তি পেল।
পুরো বাড়িতে খবরটা ছড়ানোর পর থেকে এক দারুণ হৈ-হুল্লোড় আর উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। আনন্দেই যেন পুরো উঠোন গমগম করছে। আরশাদ তালুকদার আর আফতাব তালুকদার আশরাফুলকে সাথে নিয়ে সোজা গ্রামের বড় বাজারে গিয়েছেন মিষ্টির আনতে। পুরো গ্রামে ঘুরে ঘুরে মিষ্টি বিলোবেন তিনি। তার তদারকি চলছে উঠোনের এক কোণে। রান্নাঘরের সম্পূর্ণ দায়িত্বে এখন ঊর্মি। সে এ বাড়ির ছোট ছেলের বউ। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়েছিল মেয়েটা। সে ছিল কাশেম তালুকদারের এক পুরোনো বন্ধুর নাতনি। বন্ধু মারা যাওয়ার পর কাশেম তালুকদার নিজেই তাকে নিজের নাতনির মতো স্নেহে ঘরে তুলে এনেছিলেন। আর বরাবরের মতো তাকে আশ্রয়ে রাখতে নিজের একমাত্র ছেলের ছোট ছেলে ইব্রাহিমের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন। তখন ঊর্মির বয়স অনেক কম। কথা ছিল কেবল নামে নামেই বিয়েটা পড়িয়ে রাখা হবে। বয়স হলে তবেই সংসার। কিন্তু বিয়ের কয়েকমাস পরেই ইব্রাহিম বিদেশে পাড়ি জমায়। এই ছোট বউয়ের প্রতি তার কোনো টান ছিল না। ঊর্মিকে সে সব সময় বাড়ির এক প্রকার কাজের লোক হিসেবেই দেখত। বিদেশ থেকে ফিরে এসে ঊর্মিকে তো পাত্তা দিলই না, বরং আরেকটা বিয়ে করে বসল। তবে নিয়তির কী নির্মম পরহাস। সেই দ্বিতীয় বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় জমিজমার শত্রুতার জেরে ইব্রাহিম খুন হয়ে গেল। তার সেই দ্বিতীয় বউ ইব্রাহিমের মৃত্যুর সাত মাসের মাথায় আবার অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিজের মতো ঘর-সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু যেতে পারেনি শুধু ঊর্মি। তার তো আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। এই ভিটে ছাড়া যে তার আশ্রয় দেওয়ার আর কেউ নেই! রান্নাঘরে একলা মনে কাজ করতে গিয়ে আচমকা ভাতের মাড় গালতে গিয়ে ওর হাত থেকে ভারী হাঁড়িটা ফসকে গেল। ফুটন্ত ভাতের মাড় আর কিছু গরম ভাত ছিটকে এসে পড়ল ওর নিজের হাতের ওপর। অসহ্য যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল ও,
“উফ, আল্লাহ!”
দূর থেকেই এতক্ষণ কলরব আর আনায়াকে হেঁটে যেতে দেখছিল কায়েফ। সেদিকেই যাচ্ছিল ও, ঠিক তখনই ওর নজর পড়ল উঠোনের এককোনে থাকা উন্মক্ত রান্নাঘর দাঁড়ানো ঊর্মির দিকে। মেঝেতে অনেকগুলো ভাত ছিটকে পড়ে আছে। ঊর্মি নিজের শরীরের পোড়ার তীব্র যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে এক অজানা, প্রচণ্ড ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ইশ! আজ যদি তার শাশুড়ির নজর পড়ে, তবে যে কী হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটবে! তারচেয়ে নিজের হাতটা যদি ভাতের হাঁড়ির ওপর ফেলে আরেকটু পুড়িয়ে ফেলা যেত, তবে হয়তো বকা খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যেত! কী একটা অবুঝ আতঙ্কে ঊর্মি যে-ই না হাতটা সেই ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির দিকে বাড়িয়ে দিতে গেল, কায়েফ এসে খপ করে করে ধরে ফেলল ওর হাতটা!
“কী করছেন আপনি? পাগল নাকি! হাত তো পুরো পুড়ে যাবে!”
কায়েফ উৎকণ্ঠিত গলায় বলে উঠল। হঠাৎ কোনো অচেনা পুরুষকে এভাবে হাত ধরতে দেখে ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল ঊর্মি। সামনে দাঁড়ানো এই তরুণকে সে চেনে না। তবে পোশাক-আশাক দেখে এটুকু সহজেই আন্দাজ করতে পারল সে এ বাড়ির একজন সম্মানিত অতিথি। বাড়ির অতিথিদের সামনে যেতে তাকে কড়া ভাষায় নিষেধ করে রেখেছেন তার শাশুড়ি জমেলা বেগম। সে এক ঝটকায় কায়েফের হাত থেকে নিজের হাতটা ছিটকে সরিয়ে নিল। তারপর মাথার ঘোমটাটা টেনে মুখটা একপ্রকার আড়াল করে ফেলল। কায়েফ নিজের এমন অনভিপ্রেত আচরণে কিছুটা বিব্রত বোধ করল। তবে মেয়েটার এই করুণ, আতঙ্কিত ফর্সা মুখটার পানে চেয়ে একটু নরম হয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার হাতে তো অনেকটাই পুড়ে লাল হয়ে গেছে। এখনই ফার্স্ট এইড বা ভালো কোনো মলম লাগাতে হবে। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি ভেতর থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।”
ঊর্মি ভয়ে ও শঙ্কায় তোতলাতে তোতলাতে বলল, “না না, তার কোনো দরকার নেই! আপনি… আপনি দয়া করে এখান থেকে চলে যান, প্লিজ!”
কায়েফ মনের ভেতরে একরাশ অবাক বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা ঠিক কী কারণে এত ভয় পাচ্ছে তা ওর মাথায় ঢুকল না। হয়তো অচেনা ছেলের সাথে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছে। পরনে সাদামাটা শাড়ি হলেও, শরীরে বিবাহিত নারীর কোনো চিহ্ন নেই। বয়সটাই বা কত হবে, বড়জোর উনিশ-বিশ! গ্রামের মেয়েরা কি এখনো এই যুগে এসে শাড়ি বা এতটা ঘোমটা টেনে ঘুরে বেড়ায়? জায়গাটা তো মোটেও অতটা অজপাড়াগাঁ বলে মনে হলো না। কায়েফ আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে ঘুরে চলে গেল। রান্নাঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হলেন জমেলা বেগম। মাটির দিকে চোখ পড়তেই বিকট আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি,
“হায় হায় রে! মুখপুড়ি আবার কী অলক্ষুণে কাণ্ড করেছে দেহো! এক হাঁড়ি আস্ত ভাত সব মাটিতে ঢেলে নষ্ট করল রে! একটা কাজও কি এই অলক্ষুণী সোজাভাবে করতে পারে না? হুদা হুদা ঘরের এতগুলো অন্ন এভাবে ধ্বংস করলি তুই!”
চোখে জল টলমল করে ওঠে ঊর্মির। সে ভীষণ ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আমি ইচ্ছা করে করিনি, আম্মা। হাত থেকে ফসকে..!”
কিন্তু জমেলা বেগমের রাগ তাতে বিন্দুমাত্র কমল না। তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক প্রকার তেড়ে এলেন। খপ করে শক্ত মুঠোয় ধরে ফেললেন ঊর্মির চুলের ঝুটি। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“ইচ্ছা করে না করলে এত বড় ক্ষতি হলো কী করে রে মুখপুড়ি? শুধু ওই মরার বুড়াটার দয়ায় তুই এখনো এই বাড়িতে টিক্যা আছোস, আর বসে বসে অন্ন ধ্বংস করতাছোস! বুড়া খালি চোখ বুজুক একবার, তারপর তোর এই মুখের চোপা আমি কীভাবে বের করি দেখিস!”
“কী হচ্ছেটা কী এখানে?!”
এমন এক পাশবিক দৃশ্য দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে কায়েফ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। জমেলা বেগম বেশ বিব্রত ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। চুল ছেড়ে দিয়ে একা একাই গজগজ করতে করতে ভাতের হাঁড়িটা একপাশে তুলে রাখলেন। তারপর মুখ ভার করে সেখান থেকে দ্রুত সরে গেলেন। কায়েফ নীরবে চোখের জল ফেলা মেয়েটার দিকে তাকাল। ভয়ে আর অপমানে ঊর্মির মাথা তখন চিবুকে এসে ঠেকেছে। কায়েফ সহজ গলায় বলল,
“আমি ভেতরে গিয়ে মলমটা নিয়ে এসেছি।”
ঊর্মি বেশ শক্ত গলায় বলল, “আমার কোনো ওষুধের দরকার নেই।”
কায়েফ কিছুটা জোর দিয়েই বলল, “দরকার আছে কি নেই, তা তো চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে। আমার কাছ থেকে নিতে না চাইলে সমস্যা নেই। আপনি নিজে পরে লাগিয়ে নেবেন। আমি মলমটা এখানেই রেখে যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই কায়েফ টিউবটা ঊর্মির পায়ের কাছে কাঠের পিঁড়িটার ওপর রেখে হনহন করে বেরিয়ে এলো। পুকুরপাড়ের সরু পথটা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আচমকা কায়েফের নজরে পড়ল নিযানা। বিশাল এক পুকুর, তার চারপাশটা বেশ চমৎকার ইটের শান বাঁধানো। শীতকাল হওয়ায় পুকুরের পানি খানিকটা নিচে নেমে গেছে। তাই প্রায় পনেরো-ষোলটা সিঁড়ি পেরিয়ে তবেই টলটলে পানির দেখা মেলে। একদম শেষ সিঁড়িটায় একলা বসে আছে নিযানা। ভীষণ উদাস আর বিষণ্ণ দৃষ্টিতে সে চেয়ে আছে পানির দিকে।ঘনঘন হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছে। মেয়েটা নীরবে কাঁদছে। কায়েফ ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে দাঁড়াল নিযানার ঠিক পেছনে। কারো উপস্থিতি টের পেয়েই নিযানা চট করে নিজের কান্নাটা চেপে ব্যাকুল শরীরটাকে একদম চুপসে নিল। পেছনে না তাকিয়েই ক্ষোভ চেপে বলল,
“অভি, তুই এখান থেকে চলে যা তো! আমার মেজাজ কিন্তু ভীষণ খারাপ হয়ে আছে।”
কায়েফ হালকা হেসে বলল, “আচমকা তোর মেজাজের আবার কী হলো?”
নিযানা মাথা তুলে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না, চট করে পুনরায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কায়েফ নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বসতে পারি?”
“বোসো।”
নিযানার পাশে শান বাঁধানো সিঁড়িতে বসল কায়েফ। কিছুক্ষণ নীরবতার পর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে বল তো? তারচেয়ে বড় কথা, এই অভিনবের বিষয়টা কী রে? তুই ওকে কী করে বিয়ে করতে রাজি হতে পারিস? কলরব বা বাড়ির বাকি কেউ হয়তো সবটা জানে না, তবে আমি তো জানি অভিনব আর তুই…!”
“ও আমার ছোট ভাই! আমরা স্রেফ ভাইবোন!”
তপ্ত গলায় কায়েফের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল নিযানা। কায়েফ মৃদু হাসল। অভিনবের চেয়ে বছর খানেকের বড় নিযানা। তার শারীরিক গড়নের কারনে বোঝা যায় না খুব একটা। ছোটবেলা থেকেই ওরা দুজন খুব ভালো বন্ধু। কায়েফকে বেশ কয়েকবার অভিনবের কথা বলেছে ও। নিযানা বিরক্ত হয়ে বলল,
“হাসবে না! বললাম না আমার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে?”
কায়েফ সিরিয়াস হয়ে বলল, “তুই আসলে চাসটা কী নিযানা? এসব কেন করছিস? আগে ডিভোর্স যাতে হয়, তার জন্য কাঁদতিস। আর এখন কি ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে বলে কাঁদছিস? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার? কলরব আবার কিছু করেছে? তোকে নতুন করে কোনো বাজে কথা বলেছে?”
এই অবেলায় পর্ব ৪৯
“আমি ওকে ভালোবাসি কায়েফ! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! কিন্তু এত কিছুর পর আমি আর কোনোদিন ওর কাছে ফিরতেও পারব না। ও কেন হুটহাট এমন সব কাণ্ড করে বল তো? কোনো কিছু করার আগে কেন একবারও ভেবে দেখে না এর পরবর্তী প্রভাবটা কী হতে পারে? সবসময় সবকিছু আমাদের নিজের মর্জি আর আবেগে হওয়া কি সম্ভব? জীবন তো আর ফোনের কোনো অ্যাপ নয় যে, মন চাইলে ইনস্টল করলাম আর ভালো না লাগলেই ডিলিট করে দিলাম!”
