কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৭
লামিয়া রহমান মেঘলা
হিংসা মানুষ জন্মের সঙ্গে নিয়ে আসে না। জন্মের পর প্রতিটি মানুষই থাকে নিষ্পাপ, নির্মল। হিংসা কোনো জন্মগত প্রবৃত্তি নয়; সময়ের সঙ্গে মানুষ নিজেই নিজের ভেতর এর জন্ম দেয়।
অন্যের ভালো দেখে কষ্ট পাওয়া, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে না পারা, অন্যের সুখে নিজের মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠাই হিংসা।
এই হিংসা এক ভয়ংকর বিষ, যা অন্যকে ধ্বংস করার আগে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে সেই মানুষটিকেই, যে নিজের হৃদয়ে তাকে লালন করে। মানুষ বুঝতেও পারে না, কখন এই বিষাক্ত অনুভূতিই তাকে নিজের পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
আয়নার সামনে বসে আছে আহি। সেরিন নিজের হাতে যত্ন করে তাকে সাজিয়ে দিয়েছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আহির মুখে ফুটে উঠেছে তৃপ্তির মিষ্টি হাসি।
“ওয়াও, কী সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছো আমাকে তুমি, সেরিন!”
সেরিন মিষ্টি করে হেসে বলে,
“আপনি নিজেই তো অনেক সুন্দর, আপু।”
আহির ঠোঁটের কোণে আরও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
“তোমার হাতে সত্যিই জাদু আছে গো। যাও এবার, তুমি রেডি হয়ে নাও। ভাইয়া তোমাকে সাজানোর মাঝখানে দুবার এদিক দিয়ে ঘুরে গিয়েছে।”
সেরিন অবাক হয়ে তাকায়।
“কখন? আমি তো দেখলাম না!”
আহি মুচকি হেসে বলে,
“তুমি আর কী দেখবে! আমি দেখেছি। যাও এখন। নাহলে দেখা গেল, তোমাকে কেউ তুলে নিয়ে গেল।”
আহির কথায় সেরিনের গালজোড়া লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। মৃদু লজ্জায় নত হয় তার দৃষ্টি। যদিও সম্পর্কে আহি তার থেকে ছোট, বয়সের হিসেবে আহি অবশ্য তার চেয়ে বড়।
সেরিন লাজুক মুখে আহির ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
সেরিন বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সেখানে এসে উপস্থিত হয় শিমুল।
আহির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“বাহ, সুন্দর লাগছে তো তোমাকে।”
আহিও মিষ্টি হেসে উত্তর দেয়,
“হ্যাঁ, ভাবি। সেরিন সাজিয়ে দিলো।”
“ও। ভালোই লাগছে।”
আহি, শিমুলের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি রেডি হবে না?”
শিমুল তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“হ্যাঁ, নিচে কিছু কাজ ছিল। সেগুলো বাদ দিয়ে সাজতে বসলে তো আর চলবে না, বলো? আমিত এ বাড়ির বউ। কাজ কর্ম আমাকেই করতে হবে। বাড়ির বড় বউও সাজগোজে মগ্ন। এখন সবত আমাকেই সামলাতে হবে। ”
শিমুলের কথার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিতটা আহির বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকাল শিমুলের এমন কথাবার্তার অর্থ সে বেশ ভালোই বুঝতে পারে। তবুও অশান্তির আশঙ্কায় মুখে কিছুই আনে না।
সিকদার নিবাসে কোনো বউকেই ঘরের কাজ করতে হয় না। বানু মির্জা বাড়ির প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা লোক রেখেছেন। এই বাড়ির বউদের নিজেদের ব্যক্তিগত কাজটুকু ছাড়া আর কোনো কাজের দায়িত্ব নিতে হয় না।
প্রথমদিকে শিমুলের এমন কথাবার্তা আহি খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কিন্তু ইদানীং কেন জানি শিমুলের মুখে এ ধরনের কথার পুনরাবৃত্তি একটু বেশিই হচ্ছে।
আহি নীরবে শিমুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনের ভেতরটায় কথাগুলো নিয়ে এক অদৃশ্য অস্বস্তি ধীরে ধীরে জমাট বাঁধতে থাকে। তবুও সে চুপ করে থাকে। কারণ, কিছু কথা মুখে আনলেই যে শান্তির সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠতে পারে, সেই ভয়টা আহির বেশ ভালোভাবেই জানা।
সেরিন রুমে প্রবেশ করতেই আচমকা দুটো শক্ত হাত তাকে টেনে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল।
অপ্রস্তুত সেরিন খানিকটা ভীত চোখে পিটপিট করে তাকাল সামনে। তার বুকের ভেতরটা আচমকা কেমন ধক করে উঠল।
কায়ান।
কোনো বার্তা নেই, কোনো পূর্বাভাস নেই, আচমকাই কায়ান সেরিনের অধরযুগল নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের মাঝে আঁকড়ে ধরল। সেরিনকে কিছু বলার সুযোগটুকুও দিল না সে। তার অধর যেন সেরিনের সমস্ত অভিমান, সমস্ত অভিযোগ আর সমস্ত নীরবতা একসঙ্গে শুষে নিতে চাইছে।
প্রথমে খানিকটা অবাক হয়ে গিয়েছিল সেরিন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর কোনো বাধা রইল না। কায়ানের ভালোবাসার কাছে সমস্ত সংকোচ যেন ধীরে ধীরে গলে গেল। সেও দুহাত দিয়ে কায়ানের ঘাড় জড়িয়ে ধরল।
বেশ কিছুক্ষণ পর কায়ান ধীরে ধীরে সরে এলো সেরিনের কাছ থেকে।
সেরিনের বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় তার গালজোড়া লালচে হয়ে উঠেছে। চোখের পাতায় লজ্জার নরম ছায়া। কায়ান মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেরিনের ঘাড়ে নাক ঘষতে ঘষতে মৃদু স্বরে বলল,
“আজকাল খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না আপনার।”
সেরিন লজ্জা সামলে মৃদু স্বরে বলল,
“বিয়ে বাড়িতে কত কাজ, জানেন?”
“তাই বলে বরকে ভুলে যাবে?”
সেরিনের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
“কই, ভুলেছি?”
“ভুলেই গেছো।”
কায়ানের কোকড়া চুলের ভাঁজে নিজের আঙুলগুলো আলতো করে জড়িয়ে দিল সেরিন। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“ছাড়ুন, কেউ চলে আসবে।”
কায়ান যেন কথাটাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্বই দিল না। বরং আরও শক্ত করে সেরিনকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“আসুক। আমার বউকে আমি ধরেছি, তাতে কার কী?”
সেরিন লজ্জায় কায়ানের বুকের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“বড্ড বেহায়া আপনি। ছাড়ুন। মেহমান চলে আসবে। রেডি হয়ে নিন। আমিও গোসল করব।”
কায়ানের ঠোঁটে ফুটে উঠল দুষ্টু এক হাসি।
“আমিও যাই। সাহায্য করে দেব।”
সেরিন সঙ্গে সঙ্গে কায়ানের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিল।
“মোটেই না। দুষ্টু লোক একটা।”
কথাটা বলেই সেরিন দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
কায়ান সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক মুগ্ধ করা হাসি। তার চোখজোড়া তখনও সেরিনের চলে যাওয়ার পথেই স্থির।
কিছুক্ষণ পর গোসল সেরে বেরিয়ে এলো সেরিন।
তার পরনে মাস্টার্ড ইয়েলো রঙের একটি গাউন। তার সঙ্গে ডার্ক মেরুন রঙের ওড়না। উজ্জ্বল বাসন্তী হলুদের সঙ্গে গাঢ় মেরুনের অপূর্ব মিশেল যেন সেরিনের সৌন্দর্যকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গাউনের নরম কাপড় তার ফর্সা শরীরের সৌন্দর্যকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, যেন সকালের কোমল রোদ এসে তার শরীরে মিশে আছে। কোমর ছুঁয়ে নেমে আসা কালো কোকড়া চুলগুলো গোসলের পর আরও ঘন ও মসৃণ দেখাচ্ছে। কয়েকটি ভেজা চুলের গোছা আলতো করে কপালের পাশে এসে লুটিয়ে আছে। তার নির্মল মুখে তখন এক অদ্ভুত মায়া। ফর্সা ত্বকে লেগে থাকা পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুগুলো যেন মুক্তোর মতো ঝলমল করছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে তৈরি হতে শুরু করল সেরিন।
হাতে ঘড়ি পরল। গলায় সূক্ষ্ম একটি চেইন। তারপর একে একে কানে দুল পরতে লাগল সে।
আর তার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বুকের ওপর দুহাত গুঁজে নির্বাক দৃষ্টিতে সেরিনকে দেখছিল কায়ান।
সেরিন আয়নায় কায়ানের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। কানে দুল পরতে পরতে একবার তার দিকে ফিরে তাকাল।
“কী?”
কায়ান কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর এগিয়ে এলো সেরিনের কাছে।
সেরিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কায়ানের একটি হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। পরম মমতায় তার কপালে এঁকে দিল একটি চুম্বন।
তারপর গভীর, শান্ত কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমার নিয়তি, সেরিন। নিয়তির লেখা বদলানো যায় না।”
সেরিন ভ্রু কুঁচকে কায়ানের দিকে তাকাল।
“আচ্ছা, তাহলে আপনি কী করে জানলেন, আমার নিয়তিতে আপনিই লেখা ছিলেন?”
কায়ানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক বাঁকা হাসি।
সে সেরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
“যদি নিয়তি তোমায় আমার জন্য না লিখত, তবে আমি তা লিখে নিতাম। যে কোনো মূল্যে।”
কায়ানের কথাগুলো শুনে সেরিন কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
কী অদ্ভুত এই মানুষটা!
ভালোবাসার ভাষা হয়তো সবাই জানে না। কেউ কেউ ভালোবাসে নীরবে, কেউ ভালোবাসে স্পর্শে, কেউ বা সারাজীবন আগলে রেখে। আর কায়ান যেন ভালোবাসে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে।
সেরিনের মনে হলো, এই মানুষটা তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে, তা পরিমাপ করার মতো কোনো যন্ত্র বোধহয় পৃথিবীতে এখনো তৈরি হয়নি।
হয়তো কিছু ভালোবাসা কখনো মাপা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।
আর কায়ানের ভালোবাসা ঠিক তেমনই। সীমাহীন, গভীর এবং একান্তই সেরিনের।
আহিরের হবু শ্বশুরবাড়ি, অর্থাৎ জেহানদের বাড়ি থেকে ইতোমধ্যেই সকলে এসে পৌঁছেছে। বাড়িজুড়ে নতুন মেহমানদের আগমনে এক অন্যরকম ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। চারপাশে কথাবার্তা, হাসি আর আপ্যায়নের তোড়জোড়।
নিচতলা থেকে ভেসে আসা সেই শোরগোল কানে আসতেই সেরিন কায়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“পোশাক বদলে নিন। আমি নিয়ে যাই।”
কথাটা বলেই সেরিন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। উপস্থিত সকলে তখন নতুন মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন অতিথি বরণের আনন্দে মুখরিত।
অন্যদিকে, বাড়িরই একটি ঘরে বসে আছে শিমুল। তার হাতে ধরা একটি পোশাক। সামনেই বসে আছে জেবরান। দুজনের মুখের অভিব্যক্তি দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই মনোমালিন্য চলছে।
শিমুলের কণ্ঠে তখন অভিমান আর ক্ষোভের স্পষ্ট ছাপ।
“এই সামান্য পোশাকটুকু আনতেও বাধল তোমার?”
জেবরান যেন কথাটা শুনে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেল। শিমুলের মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখেমুখে ফুটে উঠল গভীর বিস্ময়।
“এটাকে সামান্য বলছ তুমি?”
কণ্ঠে অবিশ্বাস মিশিয়ে বলল সে।
“তুমি বলেছিলে লাল রঙের কিছু পরবে। আমি তো সেই কারণেই লাল রঙের ড্রেস নিয়ে এলাম। তুমি তো এমন ছিলে না, শিমুল। তুমি তো কখনো এমন করোনি।”
জেবরানের কথায় শিমুলের অভিমান যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। ঠোঁট বাঁকিয়ে সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
“হ্যাঁ, আগে করিনি। কিন্তু এখন করছি। একই বাড়িতে তোমার ভাইয়ের বউ, তোমার বোন সবাই দামি দামি পোশাকে সেজেছে। আর আমি?”
কথার শেষটুকুতে তার কণ্ঠ যেন আরও ভারী হয়ে এলো।
“এই পোশাক আমি পরব না।”
কথাটা বলেই শিমুল তার হাতে থাকা পোশাকটি ছুড়ে ফেলে দিল মেঝের ওপর।
জেবরান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা পোশাকটির দিকে। মুহূর্ত কয়েক যেন তার মুখ থেকে সমস্ত কথা কেড়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলে তাকাল শিমুলের দিকে।
কণ্ঠে তখন অভিমানের চেয়ে বেশি ছিল চাপা কষ্ট।
“এতটাও অবহেলার যোগ্য নয় পোশাকটি, শিমুল।”
কিছুক্ষণ থেমে সে ধীর স্বরে বলল,
“এটা কিনতে আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। তোমাকে সেরিন কিংবা আহিরের থেকে একেবারেই আলাদা লাগবে না এতে। বরং এই পোশাকটির দাম হয়তো ওদের পোশাকের থেকেও বেশি হবে।”
জেবরানের কণ্ঠে এবার একরাশ ক্লান্তি এসে ভর করল।
“যাই হোক, তোমার ইচ্ছে। তুমি কী করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। শুধু বাড়িতে মেহমান এসেছে, দয়া করে আমার সম্মানটা রেখো।”
কথাগুলো বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না জেবরান। নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা হঠাৎ করেই কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শিমুল স্থির হয়ে বসে রইল নিজের জায়গায়। রাগে তার সমস্ত শরীর যেন জ্বলছে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটুকুও যেন ক্রমশ আরও ভারী হয়ে উঠছে।
মেঝেতে পড়ে থাকা পোশাকটির দিকে একবার তাকিয়েও সে আর তুলল না।
ওভাবেই ঘরের মধ্যে বসে রইল শিমুল, নিজের রাগ আর অভিমানের কাছে নিজেকেই যেন নিঃশব্দে হারিয়ে দিয়ে।
সেরিন তার শাশুড়ির সঙ্গে নিচে দাঁড়িয়ে একে একে আগত সকল মেহমানকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছিল। বাড়িজুড়ে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ। নতুন মেহমানদের আগমনে চারপাশে ব্যস্ততা, হাসি আর আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে।
বানু মির্জা সেরিনের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“সেরিন মা, যা সবাইকে ডেকে আন। আহিকেও নিয়ে আসিস।”
সেরিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করে বলল,
“যাই, আম্মা বেগম।”
কথাটা বলেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল সেরিন।
তবে সেরিন সবাইকে ডাকতে যাওয়ার আগেই আহি তার বান্ধবীদের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেরিনকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখে আহি অবাক হয়ে বলল,
“ওহো, তোমাকেই তো আনতে যাচ্ছিলাম। তোমার ভাইয়া কই? আর শিমুল আপু আর জেবরান ভাই?”
সেরিন কিছু বলার আগেই আহি নিজেই কথাটার উত্তর দিয়ে বলল,
“সবাই হয়তো রুমে, সেরিন।”
সেরিন আর আহির কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ একটি ঘরের দরজা খুলে কায়ান বেরিয়ে এলো।
সেরিনের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে স্থির হলো কায়ানের দিকে। তার সার্টের কয়েকটি বোতাম তখনও লাগানো হয়নি। কায়ান যেন নিজের পোশাকের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন।
সেরিন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে এগিয়ে গেল।
“কী করেন, বাচ্চাদের মতো?”
মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক আপন করে নেওয়ার সুর।
কথাগুলো বলতে বলতেই সেরিন কায়ানের সার্টের একে একে বোতাম লাগিয়ে দিতে শুরু করল। কায়ানও আর কোনো কথা বলল না। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল সেরিনের সামনে।
দূর থেকে দৃশ্যটি দেখতে দেখতে আহি এবং তার বান্ধবীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে কানাঘুষা শুরু করল।
“বাবা, ভাইয়া এত রাগী ছিল যে আমরা তো ভয়ই পেতাম। যদিও ভালোও লাগত। দেখ এখন, বউয়ের কথা কত সুন্দর করে শুনছে।”
আহির মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল বান্ধবীদের কথা শুনে। তার চোখের সামনে যেন নিজের চেনা সেই রাগী ভাইটি আর নেই। সেরিনের সামনে কায়ানকে এখন অন্যরকম মনে হচ্ছে। আরও আপন, আরও কোমল।
অন্যদিকে, বাইরে থেকে ভেসে আসা বেশ কিছু মানুষের কথোপকথনের শব্দ শিমুলের কানে পৌঁছাল। কিছুক্ষণ আগেও ঘরের ভেতর রাগ আর অভিমানে বসে থাকা শিমুল অবশেষে উঠে দাঁড়াল।
ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে।
কিন্তু বাইরে পা রাখতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থেমে গেল সামনের দৃশ্যটিতে।
সেরিন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কায়ানের সার্টের বোতাম লাগিয়ে দিচ্ছে। আর খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আহি তার বান্ধবীদের সঙ্গে হাসছে। চারপাশে যেন আনন্দেরই ছড়াছড়ি।
শিমুল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
কেউ তাকে খেয়াল করল না।
কেউ বুঝল না, সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সেরিনের মুখে স্বস্তির ছাপ, কায়ানের চোখেমুখে শান্তি, আহির ঠোঁটে হাসি। চারপাশের প্রতিটি মানুষ যেন নিজের নিজের সুখটুকু নিয়ে বেঁচে আছে।
শুধু শিমুলের বুকের ভেতরেই যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা।
তার দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে হিংসার তীব্রতা আরও প্রকট হয়ে উঠল। অন্যের সুখের দৃশ্যগুলো যেন তার নিজের জীবনের অপূর্ণতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তার সামনে তুলে ধরছে।
কেন যেন মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি অন্য সবার কপালেই লেখা।
সেরিন সুখী। আহি সুখী। কায়ান সুখী।
সবাই যেন নিজের মতো করে ভালো আছে।
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৬
শুধু তার কপালেই বুঝি সুখ বলে কিছু নেই।
শিমুলের বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর হিংসা সেই মুহূর্তে আরও গভীর হয়ে উঠল। চোখের সামনে থাকা মানুষগুলোর আনন্দ যেন তার নিজের দুঃখের ওপর আরও একবার আঘাত করল।
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে শিমুল অনুভব করল, অন্যের সুখ দেখতে দেখতে তার নিজের ভেতরটা যেন ক্রমশ আরও অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।
