Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৫
সানজিদা আক্তার মুন্নী

শিকদার বাড়ির আকাশে আজ এক ভিন্ন আবহাওয়া। দেখতে দেখতে গোটা একটা মাস কেটে গেছে। নাজহা আর তৌসিরের যমজ সন্তানদের বয়স আজ পূর্ণ হলো এক মাস দশ দিন। বাড়ির চারপাশের জীবন স্বাভাবিক ছন্দে বয়ে চললেও, তৌসির আর নাজহার সম্পর্কের মাঝে জমে থাকা বরফের চাঁইটা এখনো ঠিক আগের মতোই অটল, একটুও গলেনি। অথচ ঠিক এই মুহূর্তে, বাড়িরই অন্য এক প্রান্তে জন্ম নিতে শুরু করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপাখ্যান, যার প্রতিটি পরত হয়ে উঠতে চলেছে ভালোবাসার নতুন এক সংজ্ঞা।
টানা এক মাস শ্রীলঙ্কায় অফিসের কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ততার পর আজ বাড়িতে পা রাখল ধ্রুব। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ফ্রেশ হওয়ার সামান্য সময়টুকু নেওয়ার ইচ্ছাও তার হয় না। সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। দুপুর গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা যখন তিনটে ছুঁইছুঁই, ঠিক তখন ইকরা কয়েকবার টানাটানি আর জোরাজুরির পর অবশেষে তাকে ঘুম থেকে তোলে। ধ্রুবকে গোসলে পাঠিয়ে সে নিজে ছুটে যায় রান্নাঘরে, ধ্রুবর জন্য এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি বানাতে।

হাতে গরম কফির মগ নিয়ে রুমে ঢুকতেই ইকরার পা থমকে যায় দরজার সামনে। ধ্রুব সদ্য গোসল সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার পরনে শুধুই একটা কালো রঙের শর্টস, শরীরের উপরিভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত। তার ভেজা এলোমেলো চুল থেকে টুপটুপ করে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার চওড়া কাঁধ বেয়ে পেশিবহুল বুকের ওপর। এক মুহূর্তের জন্য ইকরার নিঃশ্বাস আটকে আসে, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে ওঠে অচেনা এক আবেশে, মনে হয় এই দৃশ্য সে ঠিক এই প্রথমবার দেখছে।
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে কফির মগটা ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দেয়। ধ্রুবর সুগঠিত শরীরের দিকে চোখ কুঁচকে খানিকটা তাচ্ছিল্য আর সন্দেহমিশ্রিত সুরে ইকরা বলে ওঠে, “বডি তো দেখি আগের চেয়ে বেশ দারুণ বানিয়েছ, ওখানে গিয়ে কি জিম-টিম করছিলে নাকি, নাকি সুন্দরী কোনো রমণীর পাল্লায় পড়েছিলে, ওহ পড়বে আর কী, সাথে করেই তো নিয়ে এসেছ।”

ইকরার এই তির্যক খোঁচার পেছনে আছে সুস্পষ্ট এক কারণ। ধ্রুবর সঙ্গে এবার এসেছেন এক নারী ক্লায়েন্ট, নাম সাবা, বয়স ছাব্বিশের কাছাকাছি। ধ্রুবর বসের অত্যন্ত কাছের মানুষ হওয়ায় বস নিজেই মেয়েটিকে শিকদার বাড়িতে ধ্রুবর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। আর ইকরার কাছে এই ব্যাপারটি অসহনীয়। ধ্রুবর আশেপাশে অন্য কোনো নারীর অস্তিত্ব সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
ধ্রুব তার অভিমানী, ঈর্ষায় জ্বলতে থাকা মুখের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে হাত বাড়িয়ে কফির মগটা নেয়, তারপর মগে আলতো এক চুমুক দিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “রমণীর প্রেমে এই ধ্রুব পড়ে না, এমনকি ইকরার প্রেমেও না।”
কথাটা শুনে ইকরার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠে। তবে বাইরে এই কম্পনের এতটুকু প্রকাশ ঘটতে দেয় না সে। উল্টো সে বুকে দুই হাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে ঠোঁটে ফুটিয়ে তোলে এক মলিন হাসি। ব্যালকনির বাইরে বিস্তৃত ফাঁকা আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে আনমনে বলে ওঠে, “আমার প্রেমে আমি নিজে ছাড়া কেউ পড়েনি, আর কোনোদিন পড়বেও না।”
ধ্রুব আড়চোখে তার বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে স্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “যদি কেউ পড়ে?”
এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে চমকে উঠে ইকরা তার দিকে ফিরে তাকায়। পরক্ষণেই নিজের ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তোলে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি, বলে, “যে পড়বে সে নিশ্চয়ই আস্ত একটা বোকা, নয়তো গাধা, আর নয়তো বদ্ধ পাগল।”

কফিতে আরও এক চুমুক দিয়ে ধ্রুব শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করে, “হয়তো কেউ পড়বে, অথবা হয়তো অলরেডি পড়ে গেছে।”
কথাটা বাতাসে ভেসে থাকে খানিকক্ষণ। মনে হয় এই মুহূর্তে ঘরের ভেতরের সমস্ত অক্সিজেন থমকে গেছে। কিন্তু ইকরা তা নিছক মজার ছলে উড়িয়ে দেয়। হাসতে হাসতে বলে, “বাদ দাও এসব কথা, আমি অন্য একটা কথা বলতে এসেছিলাম।”
এতে ধ্রুব বলে,’ বল! ”
ইকরা বলে, “আমি কিছুদিনের জন্য একটু নিজের বাড়ি যাব, তুমি ছিলে না বলে নানিজান যেতে দেননি, আর আমিও বাচ্চাদের মায়ায় পড়ে যাইনি, এখন দু-এক মাস ওখান থেকেই থেকে আসব ভাবছি, আজ বিকেলেই রওনা হব।”
কথাটা ধ্রুবর কানে পৌঁছাতেই তার মাথার ভেতরে মুহূর্তেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এক মাসের দীর্ঘ দূরত্ব শেষে আজই সে বাড়ি ফেরে, আর আজই ইকরা চলে যেতে চাইছে। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে হাতের কফির মগটা সজোরে ব্যালকনির দেয়াল লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে সে। ঠাসসস করে তীব্র এক শব্দে মগটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়তেই ইকরা ভয়ে শিউরে ওঠে, স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায় সে। ধ্রুবর চোখমুখ রাগে টকটকে লা হয়ে গেছে ও গর্জে ওঠে, “কেন এখন যাবি তুই, এতদিন পর আমি ফিরলাম আর এখনই তোর যাওয়ার ভূত চাপল, না, তোর কোথাও যেতে হবে না, তোর তো সবসময় নিজের মর্জি মতো চলার অভ্যাস।”

ইকরা এবার বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে। তার জেদও কম কিছু নয়। পালটা জবাব ছুঁড়ে দিয়ে সে বলে, “তোমার এই বিষয়টা আমি একেবারেই বুঝি না, ভালো কথার মধ্যে এমন হুট করে রেগে যাও কেন, আর আমার থাকা না থাকায় তোমার কী এমন আসে যায়, তোমার এই অকারণ রাগ দেখানো আচরণগুলো আসলেই খুব বিরক্তিকর, ধ্রুব ভাই।”
ভাই ডাকটা কানে বাজতেই ধ্রুবর ভেতরের রাগ নিমিষেই বারুদে রূপান্তরিত হয়। এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে সে একেবারে ইকরার মুখোমুখি দাঁড়ায়। ইকরার চোখের গভীরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সে ফিসফিস অথচ কঠিন স্বরে বলে, “হ্যাঁ, আমি তো এখন তোর কাছে বিরক্তিকর হয়েই যাব, আগে তো আমার সাথে একটু থাকার জন্য মরে যেতি, আর এখন কী হলো যে এত বিরক্ত লাগছে, আর আমাকে ভাই ডাকিস কোন সাহসে, আমি তোর জামাই, আমাদের বাচ্চা হলে কি তারা আমাকে বাপ না ডেকে মামু ডাকবে যে তুই আমাকে ভাই ডাকছিস, তোর সমস্যাটা কী ইকরা, এক আছাড় মেরে মাইরা ফেলবো এখন।”
ইকরা ভয় পায় না, বরং ধ্রুবর জ্বলন্ত চোখের দিকে কিছুক্ষণ পালটা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পেছন ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। যেতে যেতে কড়া গলায় ছুঁড়ে দেয়, “আমি যাব মানে যাবই, আর ভুলে যেও না বিয়ের পর তুমি নিজেই আমাকে কী বলেছিলে, আমার ওপর এত অধিকার খাটাতে এসো না, আমি তোমার বউ হলেও তোমার এভাবে আমার সাথে কথা বলার কোনো রাইট নেই, আর এই যে রাগ দেখিয়ে ঘর নোংরা করেছ, এটা চুপচাপ নিজে পরিষ্কার করে নিও।”

ইকরা কথাগুলো শেষ করে যেই না অভিমানে পা বাড়াতে যায়, অমনি ধ্রুব বিদ্যুৎবেগে খপ করে চেপে ধরে তার নরম, ফুলের পাপড়ির মতো কোমল হাতটা। ধ্রুবর সেই শক্ত হাতের বাঁধনে ইকরার নাজুক কব্জিটা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এক শক্ত হ্যাঁচকা টানে ইকরাকে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয় সে, এতদিনের সমস্ত দূরত্ব, সমস্ত অভিমান, সমস্ত না-বলা কথা এক নিমেষে ঘুচিয়ে দিতে চায় এই একটি টানে। ইকরার নাজুক পিঠখানা সজোরে ধাক্কা খায় ধ্রুবর অনাবৃত, পাথরের মতো শক্ত, উষ্ণ বুকে। ধ্রুবর বুকের গভীর হৃৎস্পন্দন, ধুকপুক, ধুকপুক শব্দ ইকরার পিঠ ভেদ করে সরাসরি তার নিজের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়। এক ঝলক শিহরণ বিদ্যুতের মতো ছুটে যায় ইকরার শিরদাঁড়া বেয়ে, পায়ের আঙুল পর্যন্ত। রাগে-অভিমানে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে, ছটফট করতে থাকে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো। কিন্তু ধ্রুব তার সরু কোমরটা এক হাতে সাপের কুণ্ডলীর মতো পেঁচিয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলে, এমন নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে, এতটুকু ফাঁক থাকলেই ইকরা হাওয়া হয়ে মিলিয়ে যাবে। অন্য হাতে ইকরার ঘাড়ের ওপর অগোছালো ভাবে ছড়িয়ে থাকা ঢেউখেলানো কালো চুলগুলো অতি যত্নে সরিয়ে দেয় সে, ঠিক কোনো মূল্যবান রেশমি চাদর সরিয়ে নেওয়ার মতো।

তারপর ও উন্মুক্ত ঘাড়ে গভীরভাবে নিজের উষ্ণ ঠোঁট জোড়া ছুঁইয়ে দেয় ধ্রুব। তার এই স্পর্শ আগুনের ফুলকির মতো, ইকরার সমস্ত শরীরে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে অচেনা এক অনুভূতির শিখা। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে সে, “এত কাহিনি করিস না ইকরা। তুই খুব ভালো করেই জানিস, তোর প্রতি আমার টান ঠিক কতটা তীব্র, কতটা পাগল করা। যাওয়ার পর থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় তোকে কল দিতাম, কাজের ফাঁকে একটুখানি বিরতি পেলেই তোর গলার স্বর শোনার জন্য পাগল হয়ে যেতাম। রাতের পর রাত ঘুম আসত না, শুধু তোর মুখটা ভাসত চোখের সামনে। তুই নিজেই তো বলেছিলি, এত টান নাকি ভালো না। আর এখন তুই-ই এসব কাহিনি করছিস? আমার মেজাজটা এখন খুব ভালো, আমি তোর সাথে সংসার করার জন্য পুরোপুরি তৈরি। প্লিজ, সময়টা নষ্ট করিস না। আমাদের ভবিষ্যতের সুন্দর প্ল্যানগুলো এভাবে ভেস্তে দিস না। আমি তোর সাথে সত্যিই ভালো থাকতে চাই, তোকে নিয়ে একটা ছোট্ট সুখের সংসার সাজাতে চাই। আর তোর এই সাবাকে নিয়ে যে এত মাথাব্যথা, সেটা আমি বুঝেছি। আগামীকাল সকালেই ওকে হোটেলে শিফট করে দেব। এবার খুশি?”
ধ্রুবর গলার স্বরে মেশানো এই আকুলতা, ভালোবাসামাখা কথার এই উষ্ণ স্রোত ইকরার ভেতরে জমে থাকা অভিমানের বরফ পাহাড়টাকে মুহূর্তেই গলিয়ে নদী করে দেয়। শান্ত, ভেজা চোখে মাথা নেড়ে সে ফিসফিসিয়ে বলে, “তোমার ইচ্ছে।”

সেই দুটো ছোট্ট শব্দে লুকিয়ে থাকে সহস্র সম্মতির সুর, একজন স্ত্রীর সম্পূর্ণ সমর্পণের অঙ্গীকার।
ধ্রুব এবার আলগোছে ইকরার থুতনিতে দুটি আঙুল রেখে তার মুখটা অতি সন্তর্পণে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়, ঠিক কোনো নাজুক গোলাপকুঁড়ি তুলে ধরার ভঙ্গিতে। ইকরার দীঘল কালো চোখের ঘন পাপড়িগুলো লজ্জায় নুয়ে পড়েছে, তার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে অজানা এক আশঙ্কায়, নাকের ডগায় জমে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ধ্রুব কিছুক্ষণ শুধু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে, এই প্রথমবার দেখার অনুভবে, এই মুখটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। তারপর অতি নিবিড় আদরে সে ইকরার নরম, ফুলে ওঠা গালে এঁকে দেয় একটা দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত চুম্বন। আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় ইকরার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা যেভাবে পড়ে তৃষ্ণার্ত পৃথিবীর বুকে, ঠিক সেভাবেই। আজ আর কোনো দূরত্ব নয়, কোনো ছাড় নয়, কোনো সংকোচ নয়, কোনো ভান নয়। ইকরাকে নিজের দিকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে নিয়ে ধ্রুব মনের সমস্ত ইচ্ছেটুকু, সমস্ত জমে থাকা ভালোবাসা ঢেলে দেয় নিজের স্পর্শে, ইকরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে গভীরভাবে, প্রগাঢ়ভাবে, অধিকারবোধের সমস্ত তীব্রতা নিয়ে।

চুম্বনের এই মৌতাত আবেশের মাঝেই ধ্রুবর সতর্ক দৃষ্টি এক ঝলক চলে যায় দরজার দিকে। দরজা ভেতর থেকেই লক করা, ইকরা ঢোকার সময়ই খেয়াল করে লাগিয়ে দিয়েছিল। নিশ্চিন্ত হয়ে ধ্রুব আবারও ইকরার ঠোঁটে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, এবার আরও গভীরভাবে, আরও দীর্ঘসময় ধরে। ইকরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে যায় বালির প্রাচীরের মতো। তার কোমল দুইহাত আপনাআপনিই জড়িয়ে ধরে ধ্রুবর চওড়া, শক্তপোক্ত কাঁধ, আঙুলগুলো খামচে ধরে ধ্রুবর পিঠের চামড়া। ধ্রুবর প্রগাঢ় ভালোবাসার প্রতিটি স্পর্শে তার সারা শরীর তরতর করে কেঁপে উঠছে, বসন্তের হাওয়ায় দুলতে থাকা কোনো কচি পাতার মতো, বাতাসে দুলতে থাকা কোনো নাজুক ফুলের পাপড়ির মতো। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা তার এমন জোরে ধুকপুক করছে, মনে হচ্ছে বুকের খাঁচা ভেদ করে বেরিয়ে আসবে যেকোনো মুহূর্তে।

কিছুক্ষণ পর ইকরার ঠোঁট থেকে নিজেকে অনিচ্ছায় ছাড়িয়ে নিয়ে ধ্রুব মুখ নিয়ে যায় তার কানের একদম কাছটাতে। ভেজা উষ্ণ নিঃশ্বাস ছেড়ে নেশাতুর, ভাঙা কণ্ঠে সে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ভালোবাসি, মনের একদম অন্তস্তল থেকে তোকে ভালোবাসি। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুই, প্রতিটি হৃৎস্পন্দনে তুই। আজ আমি তোকে এমনভাবে স্পর্শ করব, যাতে আমার ছোঁয়া তোর শরীরের আবরণ ভেদ করে সরাসরি তোর আত্মায় গিয়ে পৌঁছায়। আমার প্রতিটি স্পর্শ তোর বুকে এমন এক শিহরণ জাগাবে, যা তুই কোনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারবি না, কোনো কবিতায় লিখতে পারবি না। আমার ভালোবাসার আবেগে তোর মন আজ চিৎকার করে উঠবে, বলবে, আমাকে সম্পূর্ণ তোমার করে নাও, তোমার সমস্ত সত্তায় মিশিয়ে দাও আমাকে। ভেবে দেখ ইকরা, কতটা গভীরতা দিয়ে তোকে ছুঁলে তুই এমন ছটফট করবি আমার জন্য, কতটা মমতায় ভরিয়ে দিলে তুই আমার বুকে মুখ লুকাবি লজ্জায়। খুব ভালোবাসি তোকে, বড্ড বেশি ভালোবাসি, এতটা যা আমি নিজেও মেপে উঠতে পারি না।”
ধ্রুবর এই নেশাধরানো কথাগুলো শুনে ইকরা পাথরের মতো জমে যায়। তার বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে অস্বাভাবিক জোরে, তার রক্তের প্রতিটি কণা ছুটছে অসম্ভব গতিতে ধমনী বেয়ে। তার হাতের সরু, নাজুক আঙুলগুলো অল্প অল্প করে থরথর করে কাঁপতে থাকে, ঠোঁটে জমে ওঠে অজানা এক তৃষ্ণা। ধ্রুব ধীর, স্থির হাতে ইকরার শরীর থেকে আবরণ সরিয়ে নিতে থাকে।ইকরার চামড়ায় গোধূলির লাল আভা এসে পড়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। ইকরার কানের কাছে মুখ নিয়ে সে আবারও ফিসফিসিয়ে বলে, তার নিঃশ্বাস উষ্ণ, তার কণ্ঠ গম্ভীর, “কাঁপিস না, জান। তুই কাঁপলে আমি আরও বেসামাল হয়ে যাব, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব।”

কথাটা শেষ করেই ধ্রুব ইকরার চুলের একাংশ আলতো করে চেপে ধরে নিজের ঠোঁট জোড়া তার ঠোঁটে ডুবিয়ে দেয়, কোনো তৃষ্ণার্ত পথিক মরুভূমির বুকে এক টুকরো ঝর্ণা খুঁজে পাওয়ার মতো। ইকরাও চোখ বুজে ধ্রুবর মাথার পেছনে, ঘাড়ের কাছে দুই হাত রেখে নীরব সম্মতি জানিয়ে দেয়, আঙুল দিয়ে ধ্রুবর চুলগুলো আলতো করে খেলাতে থাকে। এই নিঃশব্দ সম্মতিটুকু পেয়ে ধ্রুবর ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে খানখান হয়ে যায়, ভালোবাসার বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় সমস্ত যুক্তি। এক টানে সে ইকরাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যায় সাদা চাদর বিছানো নরম বিছানার দিকে, মনে হবে সদ্য বিবাহিত বর তার নববধূকে নিয়ে যাচ্ছে ফুলশয্যার ঘরে। বিছানায় ইকরাকে যত্নে শুইয়ে দিয়ে তার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরে সে ইকরার গলায় মুখ গুঁজে দেয়।

ইকরার গলায় ধ্রুবর ঠোঁট নামতেই ইকরা অবচেতনেই আরামে গলাটা টান করে নেয়, চোখ বন্ধ করে ফেলে ঘন কালো পাপড়ির নিচে। মোচড়াতে থাকে সে অবিরাম, হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায় বারবার, কিন্তু সে চেষ্টায় প্রতিরোধ কম, আহ্বান বেশি। ধ্রুব একটুও ছাড় দেয় না তাকে। ইকরার সারা গলায়, কণ্ঠায়, কাঁধের কাছে সে ভালোবাসার লাল চিহ্ন এঁকে চলে একের পর এক, প্রতিটি চিহ্ন একেকটা নীরব প্রতিজ্ঞা, প্রতিটি দাঁতের ছাপ একেকটা অলিখিত চুক্তি, “তুই শুধু আমার, শুধুই আমার।” ইকরা জোরে শ্বাস ছেড়ে কাতর গলায় বলে ওঠে, “ধ্রুব ভাই, একটু তো ছাড়ো! লাগছে তো!” কিন্তু ধ্রুব ছাড়ে না, ছাড়ার কোনো ইচ্ছেও তার নেই। এভাবেই সে ইকরার সর্বাঙ্গে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ, ভেজা স্পর্শ ছুঁইয়ে দেয়, তার সমস্ত সত্তাকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নেয় নিবিড় আদরে। ইকরার প্রতিটি নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসে অস্ফুট আর্তনাদ যা আসলে আহ্বান, চোখের কোণে জমে ওঠে সুখের অশ্রুবিন্দু।

বিকেলের এই নিভৃত সময়টায়, বাইরে যখন সবাই কর্মব্যস্ত, কেউ অফিস থেকে ফিরছে, কেউ বাজারে যাচ্ছে, কেউ চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, তখন এই দুজন মানব-মানবী ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে নিজেদের প্রশান্তিতে সম্পূর্ণ মগ্ন হয়ে ওঠে। উন্মাদনায় লিপ্ত হয় দুটি প্রাণ, দুটি অন্তর, দুটি আত্মা, দুটি নদী মিশে গিয়ে হয়ে যায় এক মহাসমুদ্র। ইকরা ধ্রুবকে সর্বতোভাবে সঙ্গ দেয়, তার প্রতিটি স্পর্শের জবাবে ফিরিয়ে দেয় আরও গভীর ভালোবাসা, সে যথেষ্ট পরিণত এক নারী, স্বামীর ভালোবাসাকে গ্রহণ করতে জানে পূর্ণ সমর্পণে। ঘরের চার দেয়াল সাক্ষী হয়ে থাকে তাদের এই প্রথম সম্পূর্ণ মিলনের, বিছানার সাদা চাদর হয়ে ওঠে তাদের ভালোবাসার ইতিহাসের পাতা।
কিছুক্ষণ পর
চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে মাগরিবের সুমধুর আজান।

ইকরা ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরে বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে। তার এলোমেলো চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে আছে অগোছালো মেঘের মতো, ঠোঁটের কোণে লেগে আছে তৃপ্তির এক মিষ্টি আভাস, সারা মুখে সদ্য ভালোবাসার লাল আভা, সদ্য ফোটা গোলাপ ভোরের শিশিরে ভিজে থাকার মতো। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে চিকচিক করছে, ঘাড়ের কাছে ভালোবাসার লাল চিহ্নগুলো এখনো তাজা।
ধ্রুব ইতিমধ্যেই গোসল সেরে ফিরে এসেছে। তার ভেজা চুল থেকে টুপটাপ ফোঁটা পানি পড়ছে বুকের ওপর। সে ইকরাকেও গোসলের জন্য ডাকছে বারবার। কিন্তু ইকরার শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই, তার প্রতিটি পেশি ব্যথায় টনটন করছে অথচ মনটা ভরে আছে এক অনির্বচনীয় শান্তিতে। চোখ বন্ধ রেখেই সে ক্লান্ত, নেতিয়ে পড়া কণ্ঠে বলে, “ধ্রুব ভাই, আমার জন্য ওষুধ নিয়ে আসো। শরীরে ব্যথা করছে, যাও না, প্লিজ।”
ধ্রুব বিছানায় উঠে আধশোয়া হয়ে ইকরার পাশে বসে হাত বাড়িয়ে তার এলোমেলো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দেয়, তারপর ঘামে ভেজা কপালে আলতো একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিয়ে বলে, “তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি গিয়ে আনছি এক্ষুনি।”
ইকরা চোখ বুজেই কপট অভিযোগের সুরে, ঠোঁট ফুলিয়ে জবাব দেয়, “তুমি আমার সারা শরীরে দাঁত বসিয়ে দিয়েছ! দেখো তো, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এখন এসব! ঠিক আছে, আমি উঠছি, তুমি মলম জাতীয় কিছু নিয়ে আসো তাড়াতাড়ি।”

ধ্রুব ইকরার সেই ফোলা ঠোঁটে আরও একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে হেসে বলে, “এগুলো তো ভালোবাসার চিহ্ন রে, মলম দিয়ে মুছে ফেলবি নাকি? এগুলো তো আমার সিগনেচার!”
ঠিক তখনই দরজায় কেউ কড়া নাড়ে, ঠক ঠক ঠক করে! মুহূর্তেই ঘরের এই স্বপ্নালু রোমান্টিক আবহটা এক ধাক্কায় ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুজনেই চমকে ওঠে, বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো। ধ্রুব তাড়াহুড়ো করে গায়ে একটা সাদা শার্ট জড়িয়ে নেয়, বোতাম লাগানোর সময়টুকুও পায় না ঠিকমতো। গোসলের সময় হাতের কাছে কিছু না পেয়ে কোমরে ইকরার সুতির ওড়নাটাই জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল সে। এই বেসামাল, অগোছালো অবস্থাতেই কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলতেই সে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং বিবিজান! ধ্রুবর বুকটা ধক করে ওঠে।
ধ্রুবকে এই বেমানান, লেপ্টানো অবস্থায় দেখে বিবিজান একবার আড়চোখে ভালো করে তাকে আপাদমস্তক পরখ করে নেন, ভেজা চুল, খোলা বোতাম, কোমরে জড়ানো মেয়েলি ওড়না, ঘাড়ের কাছে কিছু আঁচড়ের দাগ। তিনি সন্দিগ্ধ, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, “ইকরা কই? ও না বলল বাড়ি যাবে? গাড়ি রেডি আছে অনেকক্ষণ ধরে, বল তাড়াতাড়ি আসতে।”

কথা শুনে ধ্রুবর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে যায়, কপালে ঠান্ডা ঘামের বিন্দু জমতে শুরু করে। আমতা আমতা করে, জিভ জড়িয়ে জবাব দেয় সে, “ও তো, আসলে, যেতে পারবে না, বিবিজান।”
বিবিজান ভ্রু কুঁচকে আরও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলেন, “কেন? কী হয়েছে ওর?”
ধ্রুব তোতলাতে তোতলাতে, চোখ নামিয়ে জবাব দেয়, “ওর তো জ্বর এসেছে হঠাৎ। দেখো, কীভাবে শুয়ে আছে বেচারি।”
বিবিজান ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখেন, ইকরা বিছানায় গা ঢাকা দিয়ে গলা পর্যন্ত ব্ল্যাংকেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। এ দেখে তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ান না, তাড়াতাড়ি ধ্রুবকে এক পাশে ঠেলে সরিয়ে ধুপধাপ পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েন নাতনির অসুস্থতার খবর শুনে। ধ্রুবর তো এখন ভীষণ অস্বস্তির অবস্থা, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আরও বেড়ে যায়, বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটা লাফাতে থাকে খরগোশের মতো। সেও উৎকণ্ঠায় উনার পিছু পিছু এগিয়ে যায় ছটফট করতে করতে।
বিবিজান স্নেহভরে ইকরার ঘামে ভেজা কপালে হাত রাখেন, কিন্তু নাহ, জ্বর টর তো কিছুই নেই, কপাল বরং স্বাভাবিকের চেয়েও শীতল, ঘামে ভেজা। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় তাঁর অভিজ্ঞ মনে। গলা চেক করার জন্য এক টানে ইকরার গা থেকে ব্ল্যাংকেটটা সরিয়ে নেন তিনি। ভয়ে আর লজ্জায় ধ্রুব সঙ্গে সঙ্গে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলে, ভাবটা এমন যে চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্যটা মিথ্যে হয়ে যাবে, ম্যাজিকের মতো সব ঠিক হয়ে যাবে!

বিবিজানের চোখে পড়ে ইকরার সারা শরীরে সারি সারি লাল দাগ, গলা থেকে কণ্ঠা, কণ্ঠা থেকে বুক, বুক থেকে কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত ভালোবাসার চিহ্নগুলো, ঠিক সাদা দুধের সরের ওপর লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো, সাদা ক্যানভাসে লাল রঙের নকশা আঁকা বেপরোয়া তুলির আঁচড়ের মতো। ইকরা তড়িঘড়ি ব্ল্যাংকেট টেনে নিজেকে ঢেকে নেয় গলা পর্যন্ত, তার সারা মুখ এখন লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, চোখ বন্ধ, কান দুটো গরম হয়ে গেছে, তার তো আগুন লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা।
বিবিজান পুরো কাহিনিটা এক নিমেষে বুঝে ফেলেন। তিনি ধ্রুবর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকান এবং তার পিঠে সপাটে একটা কষে থাপ্পড় মেরে গজরাতে গজরাতে বলেন, “খেয়ে ফেলতে চেয়েছিলি নাকি রে হারামজাদা! এত কামড় ক্যান! এত উত্তেজনা তোমার! কী অবস্থা করেছিস দেখ!”
ধ্রুব পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে, মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলে, “ঐ, অনেক দিন পর পর তো, না মানে, এমনি, মানে বুঝতেই তো পারছ!”

কথা বলতে বলতেই ধ্রুব ইকরাকে চোখের ইশারায় সতর্ক করে দেয়, যাতে বিছানার সাদা চাদরের ওপর লেগে থাকা রক্তের দাগটা সে দ্রুত ঢেকে ফেলে। ইকরাও ইশারার মর্ম বুঝে নিয়ে চটজলদি নিজের বালিশটা টেনে সেটা কৌশলে আড়াল করে দেয়। নয়তো বিবিজান ঠিকই বুঝে ফেলতেন যে আজই ওদের প্রকৃত বৈবাহিক জীবনের সূচনা হয়েছে, এতদিনের অপেক্ষার পর আজই তারা সম্পূর্ণ হয়েছে একে অপরের হয়ে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ইকরা গলায় খানিকটা কৃত্রিম তেজ এনে বলে, “নানিজান, আমায় কিছু ওষুধ দাও তাড়াতাড়ি। তোমার নাতি একদম শেষ করে দিয়েছে আমায়! সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে!”
বিবিজান গজগজ করতে করতে, ধ্রুবর দিকে একটা শেষ ধারালো দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বলেন, “আচ্ছা, আনছি আনছি! আর তুই! তোরে পরে দেখমু আমি!” এই বলে তিনি ধুপধাপ পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান, দরজাটা টেনে দিয়ে যান পেছনে।

উনি বেরোতেই ধ্রুব বিদ্যুৎবেগে দৌড়ে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দেয়, ছিটকিনি টেনে দেয় দুবার নিশ্চিত হয়ে। তারপর দীর্ঘ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে আসে বিছানার দিকে। ইকরাকে আলতো করে দুই হাতে কোলে তুলে নিতে নিতে ঠোঁটে এক লাজুক, মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলে, “আইনস্টাইনের নাতনি! তুই তো আমারে আজ এমন কট খাওয়ালি, এখন এই মুখটা আমি কোথায় লুকাব বল তো!”
ইকরা ধ্রুবর গলা জড়িয়ে ধরে তার লজ্জামিশ্রিত সেই মায়াবী হাসিটা ছড়িয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়, , “রাখো, আমার বুকেই রাখো তোমার সেই মুখখানা। এখানেই তো সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।”
এ কথা বলে সে দু’হাতে ধ্রুবর গলা আরও নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে, তারপর ধ্রুবর গলার নরম চামড়ায় আলতো করে দাঁত চেপে একটা দীর্ঘ, ভালোবাসামাখা চুমু এঁকে দেয়, প্রতিশোধের মতো, ভালোবাসার জবাবের মতো, নীরব অঙ্গীকারের মতো। ধ্রুব চোখ বুজে এই স্পর্শটুকু অনুভব করে গভীরভাবে, তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এক মিষ্টি শিহরণ। বাইরে এখনও ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের শেষ সুর, জানালা দিয়ে ঢুকছে সন্ধ্যার প্রথম বাতাস মৃদু শীৎকারের মতো। আকাশের প্রথম তারাটা মিটিমিটি হেসে সাক্ষী হয়ে থাকে তাদের এই নতুন যাত্রার, দুটি অপূর্ণ মানুষ থেকে একটি সম্পূর্ণ দম্পতি হয়ে ওঠার।

শিকদার বাড়ির তৌসিরের ঘরটায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে এক অভাবনীয় মায়াবী চাদর হয়ে। বাইরে আকাশের গায়ে এখনো লেগে আছে গোধূলির শেষ রঙটুকু, কমলা আর গোলাপির মাঝামাঝি এক অপূর্ব আভা। দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠস্বর। নাজহার অবস্থা বেশ ভালো নয় এখন৷ এখন নাজহার মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় চল্লিশটা দিন কীভাবে একটা ফুলের মতো মেয়েকে ভেতর থেকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। তার চোখের নিচে জমে উঠেছে ঘুমহীন রাতের কালশিটে দাগ, ঠিক কে একজন কালো কাজলের রেখা টেনে দিয়েছে যত্ন করে। ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া ক্লান্তির রেখা, চিবুকের নিচে সদ্য গজিয়ে ওঠা এক অলক্ষ্য দৃঢ়তা, মাতৃত্ব যাকে এনে দিয়েছে উপহার হিসেবে। তার এলোমেলো চুলের গোছা কপালে এসে পড়েছে, তার একটাও সরানোর ফুরসত তার নেই। তার দুটো হাত এখন আর তার নিজের নয়। সে হাত এখন তিনটি ছোট্ট প্রাণের সম্পত্তি, যাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি কান্নার সুর তার হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে না-দেখা এক সুতোয় বাঁধা।

বাচ্চাদের চল্লিশ দিন বয়সটা বড়ই অন্যরকম, বড়ই রহস্যময়। এই সময়টাকে বলা যায় দুই জগতের সন্ধিক্ষণ। নবজাতকের সেই টানা ঘুমের ঘোর কেটে গেছে ধীরে ধীরে, অথচ পৃথিবীটাকে চেনার সাধ্য তাদের এখনো হয়নি। এই বয়সে শিশুরা বলতে গেলে এক অলক্ষ্য সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এক প্রান্তে মাতৃগর্ভের উষ্ণ, অন্ধকার, নিরাপদ, তরঙ্গহীন জগৎ, যেখানে দশটা মাস তারা কাটিয়েছে মায়ের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানিকে সঙ্গী করে। অন্য প্রান্তে এই আলো-বাতাস, শব্দ-গন্ধ, রঙ-স্পর্শে ভরা বিশাল পৃথিবী, যেখানে প্রতি মুহূর্তে নতুন কিছু শেখার আছে, বোঝার আছে, ভয় পাওয়ার আছে, ভালোবাসা আছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছোট্ট প্রাণগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে খাপ খাইয়ে নিতে চাইছে নতুন জগতের সঙ্গে।

দিনের অধিকাংশ সময় তারা কাটায় এক আধো-জাগরণে, এক আধো-স্বপ্নে। চোখের পাতা কখনো ভারী হয়ে বুজে আসে, ঠিক কোনো না-দেখা পালক তাকে টেনে নিচ্ছে গভীর ঘুমের রাজ্যে। কখনো আবার পিটপিট করে খুলে যায় চারপাশের আলো-ছায়ার নাচন দেখতে। ছাদের সিলিং ফ্যানের ধীর আবর্তন, দেয়ালে দুলতে থাকা পর্দার ছায়া, জানালার বাইরে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে আসা আলোর কণা, এই সবই তাদের কাছে এক একটি বিস্ময়ের বিষয়, এক একটি অজানা রহস্য। পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর কানে এলে তারা ছোট্ট মাথাটা ঘোরানোর ব্যর্থ চেষ্টা চলে, নরম ঘাড় সেই ভার বহন করতে পারে না বিধায় আবার এলিয়ে পড়ে বালিশে, আর ছোট্ট মুখে ফুটে ওঠে এক নিরীহ অসহায়তা। পেটের ভেতর গ্যাস জমে উঠলে হঠাৎ হঠাৎ কান্নার ঢেউ ওঠে। ক্ষুধা পেলে ঠোঁট দুটো আপনা থেকেই চুকচুক করতে শুরু করে। মনে হয় মায়ের বুকের সন্ধানে ছোট্ট একটা জাদুকরী কম্পাস তাদের ভেতরে বসানো আছে, যা কোনোদিন ভুল দিক নির্দেশ করে না।
তিনজনেরই এখন এক অভিন্ন জেদ, এক অভিন্ন আবদার। বুকের ওপর ছাড়া কিছুতেই তারা ঘুমাবে না। নাজহা হাজারবার চেষ্টা করেছে দোলনায় শুইয়ে দিতে, নরম তুলতুলে বিছানায় রাখতে, বালিশের পাশে সাজিয়ে দিতে, কিন্তু প্রতিবারই একই ফল। কোল থেকে নামানোর মুহূর্তেই ছোট্ট শরীরটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে ওঠে, হাত-পা সজোরে ছুঁড়ে দেয় শূন্যে। তারপর শুরু হয় সেই আকাশ-বাতাস কাঁপানো কান্না, যা থামানোর একটাই উপায়, আবার সেই বুকের উষ্ণতায় ফিরিয়ে নেওয়া। মায়ের বুকের ধুকপুকানি, শরীরের তাপ, আর চেনা ঘ্রাণ মিলে তৈরি এই ত্রিবেণী সঙ্গমই তাদের মনে করিয়ে দেয় হারানো গর্ভের কথা। সেখানে দশটা মাস তারা কাটিয়েছে নিরাপদ নিশ্চিন্তে, যেখানে ছিল না ক্ষুধা, ছিল না তৃষ্ণা, ছিল না আলো-অন্ধকারের ভেদ।

এখন নাজহার দোটানার শেষ নেই, কাকে রেখে কাকে বুকে তুলবে সে! দুটো হাত, এক বুক অথচ সন্তান তিনজন। প্রকৃতির এই হিসাব সে কীভাবে মেলাবে? গণিতের সব সূত্র তার কাছে হার মেনে যায়। ছেলে দুটোকে সে কোনোরকমে সামলে নেয়, একজনকে ডান পাশে, আরেকজনকে বাম পাশে চেপে ধরে। দুই বুকের দুই পাশে তারা ঠিক দুটি ছোট্ট পাখির ছানা, ডানার নিচে জড়ো হয়ে থাকা। কিন্তু মেয়ে তৌশি মায়ের বুকের একচ্ছত্র অধিকার চায়, মাঝখানের এই সিংহাসনটা তার একার। ভাইদের সঙ্গে সে ভাগাভাগি করতে রাজি নয়। তার ঘ্যানঘ্যানানি এমনই যে বুকের ঠিক মাঝখানে না রাখলে থামেই না। মনে হয় সে ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে জীবনে নিজের অংশটুকু আদায় করে নিতে জানতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে নাজহা মেয়েকে তুলে দেয় তৌসিরের কাছে। কারণ সে জানে, একজন বাবার বুকই একটি মেয়ের প্রথম নিরাপদ আশ্রয়, প্রথম রাজপ্রাসাদ।

মাগরিবের পর একটু আরাম করতে তৌসির ঘরে ঢোকে ক্লান্ত পায়ে। এই ঘরটাই তার জান্নাত, এই ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে তার সব সুখের ঠিকানা। ঘরে ঢুকে সে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় আর দিতেই সে গভীর একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নাজহা ছোট্ট তৌশিকে এনে তার বুকের ওপর তুলে দেয়। মেয়ের ছোট্ট শরীরটা বাবার বুকে বসানোর সময় তার আঙুলগুলো এক মুহূর্তের জন্য তৌসিরের বুকে ঠেকে যায়। এই মুহূর্তটুকু বিদ্যুতের মতো, দুজনের চোখে চোখ পড়ে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। শুধুমাত্র নাজহা কণ্ঠে কৃত্রিম গাম্ভীর্য মিশিয়ে বলে, “নিন, ওকে একটু রাখুন। আমি দেখি ছেলে দুটোকে ঘুম পাড়াতে পারি কি না।”

মেয়েকে বুকের ওপর পেয়ে তৌসিরের চোখে অবিকল হাজার প্রদীপ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। এই ছোট্ট নরম তুলতুলে প্রাণটাকে বুকে নিয়ে সে আকাশের চাঁদ হাতে পায়, সাত রাজার ধন এক পলকে তার হয়ে যায়। তৌশির ছোট্ট শরীরটা তার বুকের ওপর এমনভাবে খাপ খেয়ে যায়, মনে হয় ঠিক প্রকৃতি এই মাপেই তাকে গড়েছিল, বাবার বুকের ঠিক মাঝখানটুকু ভরে দেওয়ার জন্যই। তৌশিও বাবার বুকের উষ্ণতা চিনতে ভুল করে না। জাদুমন্ত্রের মতো তার সব ঘ্যানঘ্যানানি এক নিমেষে থেমে যায়, তার ছোট্ট শরীরটা শিথিল হয়ে আসে, শ্বাসের ছন্দ ধীরে ধীরে গভীর হয়ে ওঠে। ছোট্ট নরম হাতের মুঠোয় সে বাবার পাঞ্জাবির একটা অংশ শক্ত করে খামচে ধরে। এই নিরাপদ আশ্রয়টুকু কেউ কেড়ে না নেয়, তারই এক নীরব প্রতিরোধ, এক নিরুচ্চার ঘোষণা হলো, এই বুক আমার, এই বুক শুধুই আমার।আর এটাই হলো বাচ্চাদের গ্র্যাস্প রিফ্লেক্স, যা কিছু হাতের নাগালে আসে তাকেই আঁকড়ে ধরার সহজাত প্রবৃত্তি। মায়ের গর্ভ থেকে শিশুরা এই একটি বিদ্যা নিয়ে জন্মায় বিনা শিক্ষায়।

বাবার বুকের ওম গায়ে মেখে তৌশি গলা দিয়ে ছাড়ে মিষ্টি কিছু অস্পষ্ট শব্দ। উহ-আহ, গু-গা, অ্যাঁ-হুঁ শব্দগুলো করে সে কোনো এক অজানা ভাষায়, অচেনা কোনো ভাষায় তার বাবা কে সে ভালোবাসার কথা বলছে, নালিশ জানাচ্ছে, গল্প শোনাচ্ছে। এটা আসলে হলো কুইং, যা ভাষা শেখার প্রথম পাঠ, শব্দ দিয়ে অনুভূতি প্রকাশের প্রথম মহড়া। তৌসির নিঃশ্বাস চেপে শোনে এই শব্দগুলো। এক একটি শব্দ সে সঞ্চয় করে রাখতে চায় বুকের সিন্দুকে, আজীবনের জন্য।
হঠাৎ ছোট্ট মাথাটা একটু তুলে বাবার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা চালায় তৌশি। মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ সেন্টিমিটার, এটুকুই তো তার সম্পূর্ণ দৃষ্টিসীমা। এর বেশি দূরের সবকিছু তার কাছে ধোঁয়াশা, অস্পষ্ট, রহস্যময় এক কুয়াশার আড়াল। প্রকৃতির কী অপূর্ব ব্যবস্থা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা! ঠিক ততটাই দূরত্ব, যতটা মায়ের কোলে থাকলে মায়ের মুখ থেকে থাকে, আর যতটা বাবার বুকে থাকলে বাবার মুখ থেকে থাকে। সৃষ্টিকর্তা নিজে হাতে ঠিক করে দিয়েছেন, সন্তান প্রথমেই মা-বাবার মুখটাই স্পষ্ট দেখতে পায়, আর কোনো মুখ নয়। বাইরের পৃথিবী তার কাছে এখনো অবান্তর, তার পৃথিবী এই দুটি মুখের বৃত্তে বন্দি, এবং এটাই যথেষ্ট। কিন্তু তার চল্লিশ দিনের নরম ঘাড় বেশিক্ষণ এই ভার বইতে পারে না। তার ছোট্ট মাথাটা এলিয়ে পড়ে তার বাবার বুকে, আর ছোট্ট গালটা বাবার বুকে ঘষে ঘষে সে খুঁজে নেয় নিজের সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গাটুকু, নিজের সিংহাসনটুকু। তৌসির এ দেখে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার এই ছোট্ট পুতুলটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে চোখ বুজে পড়ে থাকে। এই মুহূর্তটুকু সে জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে কিনে রাখতে চায়, সময়ের ঘড়িকে থামিয়ে দিতে চায় এই বিন্দুতেই।

কিন্তু সুখের মধ্যেও এক বড় আফসোস তার বুকের ভেতর দানা বেঁধে ওঠে। ঠিক কাঁটার মতো, যা সরানো যায় না, অথচ যার অস্তিত্ব প্রতিটি নিঃশ্বাসে টের পাওয়া যায়। ছেলে দুটোর কাছে সে ঠিকমতো ঘেঁষতেই পারে না। ওরা যখন তার দিকে তাকায়, ওদের সেই নীলচে, কালচে-সবুজ মেশানো অবুঝ চোখের স্থির চাহনি তৌসিরের কলিজায় গিয়ে বেঁধে তীরের মতো। ওই চোখগুলোতে এখনো লেগে আছে বেহেশতের রঙ, ওই চোখে এখনো আছে ফেরেশতাদের প্রতিফলন। চল্লিশ দিনের এই ছোট্ট প্রাণেরা এখন মানুষের মুখ চিনতে শিখছে ধীরে ধীরে। বিশেষ করে যে মুখগুলো তারা বারবার দেখে, যে কণ্ঠস্বর বারবার শোনে, যে ঘ্রাণ বারবার ঘ্রাণে পায়। ওরা এখন চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারে খানিকটা সময়, পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে এলে সেই দিকে মাথা ঘোরানোর চেষ্টা করে। প্রিয়জনের মুখ দেখলে ছোট্ট হাত-পা নেড়ে উত্তেজনা প্রকাশ করে বলতে চায় হয়তো, তুমি এসেছ! আমি তোমাকে চিনি! তুমি আমার আপন!

এই তো দুদিন আগের কথা বড় ছেলেটা একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। মনে হচ্ছিল সে কোনো এক অজানা রহস্য পাঠ করছে বাবার মুখে, ঠিক আদিম কোনো ভাষায় বাবার সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত সে। তারপর হঠাৎ করেই ছোট্ট ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল এক মিঠা হাসি। সেই হাসি দেখে তৌসিরের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছিল ছেলেটাকে বুকে তুলে নেওয়ার জন্য, তার ছোট্ট কপালে হাজারবার চুমু খাওয়ার জন্য, বুকের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সে পারেনি। নাজহার ভয়ে পারেনি।
এখন তার বুকে তৌশি ঘুমিয়ে আছে, আর নাজহার কোলে অন্য ছেলেটা দুধ খাচ্ছে। নাজহা এক অসাধারণ দক্ষতায় দুই ছেলেকে একসঙ্গে সামলাচ্ছে। ব্রেস্ট পাম্প দিয়ে একজনের জন্য ফিডারে দুধ ভরে রেখেছে সে আগেভাগেই সেই ফিডার দিয়ে নাদের কে খাইয়েছে, আর তুরাব কে সরাসরি বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। এই বয়সের শিশুরা প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর ক্ষুধায় ছটফট করে, একবারে ষাট থেকে নব্বই মিলিলিটার দুধ খায়। তিনজনের হিসাবটা যোগ করলে নাজহার শরীর যে কী দিয়ে চলছে, সে হিসাব বোধহয় আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তার শরীর এক অক্ষয় প্রস্রবণ, যা থেকে অবিরাম বয়ে চলেছে জীবনের ধারা, তিন-তিনটি ছোট্ট প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

মায়ের বুকে মুখ গুঁজে থাকা তুরাব আপনমনে দুধ টেনে যাচ্ছে অক্লান্ত পরিশ্রমে। তার ছোট্ট গালটা ছন্দে ছন্দে ফুলে-নেমে যাচ্ছে তার ছোট্ট নাকের ডগাটা মায়ের বুকে ঠেকে গেছে, তবু তার মুখের ভেতর দুধের ধারা অব্যাহত। মাঝেমধ্যে সন্তুষ্টির ছোট্ট শব্দ তার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। তার একটি ছোট্ট হাত মায়ের বুকের ওপর নিশ্চল হয়ে আছে, আরেকটি হাত নাচছে শূন্যে, মনে হচ্ছে সে খুঁজছে আরেকটি ধরার জিনিস, আরেকটি আঁকড়ে ধরার অবলম্বন। আর নাওয়াব ফিডারের অপেক্ষায় ছোট্ট হাত-পা শূন্যে ছুঁড়ে চলেছে অনবরত। তার গোলাপি পা দুটো বাতাসে আঁকছে না-দেখা বৃত্ত, ছোট্ট পায়ের আঙুলগুলো কুঁকড়ে-খুলে যাচ্ছে বারবার। তার ঠোঁট দুটো অনবরত চুকচুক করছে, ছোট্ট গোলাপি জিভটা বেরিয়ে আসছে বারবার ঠোঁটের ফাঁকে। তার ছোট্ট কপালে ফুটে উঠছে ভাঁজ, চোখ দুটো কুঁচকে যাচ্ছে অস্থিরতায়। যেকোনো মুহূর্তে এই কান্নার বাঁধ ভাঙবে, নাজহা জানে। তাই সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে ফিডারটা তুলে নেয়, ছেলের ঠোঁটে ঠেকিয়ে দেয় নরম রাবারের নিপল। সঙ্গে সঙ্গেই তার ছোট্ট মুখে ফুটে ওঠে অসীম তৃপ্তির এক অভিব্যক্তি। মনে হয় সে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছেছে আপন ঠিকানায়।

তৌসির চোখ খুলে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। এই দৃশ্যটুকু সে চোখের ভেতর গেঁথে নিতে চায় চিরকালের জন্য, বুকের গভীরে খোদাই করে রাখতে চায় অনন্তকালের জন্য। আহা, তার নাজহার কত কষ্ট! একজন মায়ের এই নীরব সংগ্রামের কি কোনো তুলনা হয়? দুনিয়ার কোন যুদ্ধক্ষেত্রে এত নিঃশব্দ বীরত্বের ইতিহাস লেখা আছে? নাজহা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না, দু’দণ্ড বসে খাওয়ার সময়ও তার নেই, নিজের যত্ন নেওয়া তো বহু দূরের কথা। চুল আঁচড়ানোর ফুরসতটুকুও পায় না সে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার সময়ও নেই। তিন-তিনটে শিশুর তিন রকম ঘুমের ধরন, তিন রকম খাওয়ার সময়, তিন রকম কান্নার সুর, তিন রকম প্রয়োজনের চাহিদা। কেউ ঘুমালে আরেকজন জেগে ওঠে, একজনের কান্না থামতে না থামতেই অন্যজন সুর ধরে। রাত-দিনের কোনো ভেদ নেই এই ঘরে, আছে শুধুমাত্র এক অবিরাম পালাক্রম, এক অন্তহীন চক্র। ঘড়ির কাঁটা এই ঘরে অন্য নিয়মে চলে। এখানে সময়কে মাপা হয় দুধের ফিডারে, ডায়াপার বদলের হিসাবে, কান্নার সংখ্যায়, হাসির মুহূর্তে। যে মেয়ে বাবার বাড়িতে রানির মতো ছিল, যাকে চোখের পাতায় করে রাখা হতো, , আজ তার সংসারে এসে সেই মেয়ের এমন নাজেহাল অবস্থা। এই দৃশ্য দেখে তৌসিরের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে, চোখের কোণ ঝাপসা হয়ে আসে। সে চায় ছুটে গিয়ে নাজহার সব ক্লান্তি নিজের কাঁধে তুলে নিতে, তার সব ঘুম নিজের চোখে চালান করে দিতে। কিন্তু এইসবের সাহসও তার হয় না। সে শুধুমাত্র চোখ দিয়েই ভালোবাসে, চোখ দিয়েই আদর করে, চোখ দিয়েই ক্ষমা চায় নাজহার কাছে।
তৌসিরকে এভাবে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে নাজহা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কণ্ঠে খানিকটা রাগ মিশিয়ে সে বলে ওঠে, “এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

তৌসির ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে চোখ দুটো একটু সরু করে বলে, “নাহ, দেখছি আমার সুখ খোঁজার জিনিসে আমার ছেলেমেয়েরা কীভাবে ভাগ বসাচ্ছে।”
কথাটা কানে যেতেই নাজহার কটমট চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “মুখ বন্ধ করুন, বেহায়া কোথাকার!”
তৌসির হেসে ফেলে নাজহার এই আপত্তিতে। হাসতে হাসতে সে মেয়ের লালচে চুলে আলতো হাত বুলিয়ে দেয়। মেয়ের চুলের দুধ-দুধ ঘ্রাণ তার নাকে এসে ঠেকে, তার বুকটা ভরে ওঠে অন্যরকম এক তৃপ্তিতে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে সে বলে, “আমি তো সত্যি কথাই বললাম। হিংসে হয় নাজহা, বুঝলি? বড্ড হিংসে হয়। তুই বুঝবি না এই হিংসের মানে। তোর বুকের ওপর ওরা রাজত্ব করে, আর আমি দূর থেকে সেই রাজ্যের প্রজা হয়ে চেয়ে থাকি তুই বুঝবি না এই হিংসার মানে ”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বুকের ওপর ঘুমিয়ে থাকা তৌশি ঘুমের ঘোরেই ছোট্ট ঠোঁট নাড়িয়ে দিয়ে ফেলে এক অভাবনীয় হাসি। তার ছোট্ট গালে গর্ত পড়ে, ঠোঁটের কোণে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা লালা।
আর এতেই তৌসিরের বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই গলে জল হয়ে যায়। তার সব অভিযোগ, সব আফসোস, সব হিংসে, সব এই এক টুকরো হাসির কাছে হার মেনে যায়, আত্মসমর্পণ করে বসে। সে ধীরে ধীরে মেয়ের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দেয়,তার ঠোঁটে লেগে যায় মেয়ের নরম চামড়ার উষ্ণতা, সেই দুধ-দুধ ঘ্রাণ।

রাতের আকাশটা এখন মনে হচ্ছে কেউ কালো কালিতে মুছে দিয়েছে। ঘন মেঘের চাদর ঢেকে রেখেছে চাঁদ-তারা সব কিছু। শিকদার বাড়ির প্রাচীন দেয়ালঘেরা অন্দরমহলে ঘড়ির কাঁটা সবেমাত্র দশটার ঘর ছুঁয়েছে, অথচ চারদিকে নেমে এসেছে এমন এক থমথমে নিস্তব্ধতা, ঠিক গোটা বাড়িটাই দমবন্ধ করে কিছুর অপেক্ষায় বসে আছে।
তৌসির দের ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে হলুদ আলোর ছোট্ট নাইট বাল্বটা। এই মৃদু আলোয় বিছানায় ছড়িয়ে থাকা তিনটি ছোট্ট প্রাণ অবিকল তিনটি ফুটন্ত ফুল। ছোট্ট তৌশির ঠোঁটের কোণে লেগে আছে দুধের সাদা দাগ, ঘুমের ঘোরে মাঝে মাঝেই তার নরম ঠোঁট দুটো নড়ে উঠছে মনে হচ্ছে এখনো মায়ের বুকের দুধ চুষছে সে। দুই ছেলে একে অপরের গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে, বড়টার একটা হাত ছোট ভাইয়ের পেটের ওপর এলিয়ে পড়ে আছে গভীর নির্ভরতায়।

নাজহা ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়। তিনটি ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার ক্লান্ত চোখ দুটোতে মমতার ঢেউ খেলে যায়। ঝুঁকে এক এক করে তিনটি কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় সে। তৌশির নরম গালটায় একটু বেশি সময় ঠোঁট রেখে দেয়, মনে হয় এই স্পর্শটুকু সঞ্চয় করে রাখতে চায় বুকের গভীরে। তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, দরজাটা টেনে দেয় সন্তর্পণে, যাতে সামান্য শব্দও এই ঘুমের রাজ্যকে ভেঙে না দেয়।রান্নাঘরের এসে, নিজের রাতের খাবারটুকু কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে সে এখন নিজের ঘরে ফিরে। ক্লান্তিতে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, পায়ের পাতা টনটন করছে সারাদিনের ধকলে। ওড়নার আঁচলটা কোমরে গুঁজে সে বিছানার চাদর ঠিক করতে ব্যস্ত। বালিশের কোণা সোজা করে, চাদরের ভাঁজ মেলে দিতে দিতে তার মনটা কোথায় নিরুদ্দেশে হারিয়ে যায়।

তৌসির এখনো ফেরেনি। রোজকার মতোই দেরি। নাজহা মনে মনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক রেখা ফুটে ওঠে ক্ষণিকের জন্য। ফিরুক না ফিরুক, তাতে তার কী আসে যায়। এই বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে সে তো এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ, যেখানে কেউ এসে না ভিড়লেও দিন চলে যায়, রাত পোহায়।
ঠিক এই মুহূর্তে, কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন বিবিজান।
তাঁর পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি, মাথায় লম্বা ঘোমটা টানা, চোখে চিরচেনা কঠিন দৃষ্টি যেটার সামনে দাঁড়ালে এই বাড়ির যেকোনো মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা একটি শাড়ি গাঢ় লাল, ঠিক সদ্য ফোটা জবার পাপড়ির মতো টকটকে। শাড়ির জমিনে সোনালি জরির কারুকাজ ঘরের হলুদাভ আলোয় চিকচিক করে উঠছে, ঠিক মনে হচ্ছে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে আছে সারা কাপড়ে।
অসময়ে বিবিজানকে দেখে নাজহার কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে সঙ্গে সঙ্গে। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায় উনার দিকে, চোখে মুখে তার স্পষ্ট অসন্তোষ। এই মহিলা আবার এত রাতে কী চান তার কাছে?
বিবিজান ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে নাজহার সামনে দাঁড়ান। বাতাসে ভেসে আসে তাঁর গায়ে মাখা আতরের চেনা গন্ধ। হাতের শাড়িটা নাজহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঠখোট্টা গলায় তিনি বলেন, “নে, এই শাড়িটা পরে রেডি থাক। আজ চল্লিশ দিন পার হলো, বৈবাহিক মিলনের সময় চলে এসেছে। তৌসির ফিরে তোকে একদম নতুন বউয়ের মতো দেখবে।”

কথাটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাজহার সারা গা রি রি করে ওঠে। রাগে তার ফর্সা মুখখানি টকটকে লাল হয়ে ওঠে, কানের লতি পর্যন্ত রক্ত জমা হয়ে পড়ে। সে ফুঁসে উঠে বলে, “কিসের মিলন? আপনার নাতির সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই! এসব শাড়ি নিয়ে যান, গিয়ে নিজে পরে বসে থাকুন। আমাকে দিয়ে এসব হবে না।”

এ কথা শোনামাত্রই বিবিজানের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলে ওঠে ঠিক কেউ ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎবেগে তাঁর হাত এগিয়ে যায় নাজহার চোয়ালের দিকে। শক্ত আঙুলে চেপে ধরেন তিনি নাজহার নরম চোয়াল। বৃদ্ধা হয়েও তাঁর হাতে রয়েছে অস্বাভাবিক জোর, মনে হচ্ছে কোনো গুপ্ত শক্তি তাঁর পেশিতে ভর করেছে। সেই চাপে নাজহার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়, তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসতে থাকে। বিবিজানের কণ্ঠস্বর এবার হুংকারে পরিণত হয়, “যা বলছি চুপচাপ শোন! ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে তৈরি হয়ে আয়, নয়তো কোন জিন কোন দিকে উসকে দিতে হয়, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। দশ মাসের বেশি সময় হয়ে যাচ্ছে, তুই আমার নাতিকে নিজেকে ছুঁতে দিস না। ও থাকবে কীভাবে? ওর কি কোনো চাওয়া পাওয়া নেই? নখরামি করবি না একদম, চুপচাপ রেডি হয়ে যা!”
ভয়ে ও আতঙ্কে নাজহার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে ওঠে। জিনের নাম শুনে তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা এক স্রোত নেমে যায় নিচ থেকে ওপরে। সে নিজেকে ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করে, দুই হাতে বিবিজানের কব্জি ঠেলে সরাতে চায়, কিন্তু বিবিজানের লোহার মতো শক্ত আঙুলের বাঁধন থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না।
বিবিজানের সরাসরি হুমকির সামনে নাজহা একপ্রকার হার মানতে বাধ্য হয়। তার চোখ ছলছল করে ওঠে, কিন্তু বিবিজানের সামনে এই অশ্রু ঝরানোর সাহস তার নেই। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে জলটুকু চোখের ভেতরেই আটকে রাখে।

বিবিজান নিজেই ওকে টেনে নিয়ে যান আলমারির সামনে। জোর করে ওর গায়ের সাদামাটা সুতির থ্রি পিসটা খুলিয়ে পরিয়ে দেন সেই লাল রঙের ভারী শাড়ি। শাড়ি পরানোর ভঙ্গিটাও মনে হয় এক নীরব ষড়যন্ত্র। কুঁচি বসানো হয়েছে একটু নিচু করে, আঁচলটা রাখা হয়েছে সরু ভাঁজে, নাজহার সরু কোমরের বাঁক আর ফর্সা পিঠের কিছুটা অংশ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। নাজহা নিজের হাত দিয়ে আঁচল টেনে ঢাকতে চায়, কিন্তু বিবিজান ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে সেই হাত সরিয়ে দেন। বোঝাতে চান, “লজ্জা রেখে দে আজ রাতে, আজ লজ্জার দিন নয়।”
এরপর তিনি আয়নার সামনে বসিয়ে দেন নাজহাকে। ওর লালচে কালো লম্বা চুলগুলো নিজের হাতে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দেন, তারপর যত্ন করে খোঁপা বেঁধে দেন মাথার পেছনে। খোঁপায় গুঁজে দেন সাদা বেলি ফুলের একটা ছোট্ট মালা, যার সুবাসে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। তার ঠোঁটে বুলিয়ে দেন হালকা লাল রঙের প্রলেপ। কানে ঝুলিয়ে দেন সোনার লম্বা ঝুমকো, যা নড়াচড়ায় মৃদু শব্দ তোলে ঝুমঝুম, ঝুমঝুম। হাতে পরিয়ে দেন কাচের লাল চুড়ি এক গোছা, প্রতিটি চুড়ি পরানোর সময় একটা করে ঝনঝন শব্দ ওঠে মনে হয় এক এক করে বন্ধ হচ্ছে মুক্তির দরজা।

নাজহা চুপচাপ বসে থাকে পাথরের মূর্তির মতো। তার ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছে ক্ষোভের আগুন, অথচ বাইরে সে নিঃশব্দ, নিস্তেজ। আয়নায় নিজের এই সাজানো রূপ দেখে তার নিজেরই নিজেকে অচেনা লাগে। আয়নার ভেতরের ওই মেয়েটা কে? এই টকটকে লাল শাড়িতে সাজা, কপালে টিপ পরা, খোঁপায় বেলি গোঁজা এই নারী কি সত্যিই সে? এ সম্ভবত সে নয়, এ বোধহয় অন্য কোনো নববধূ, যাকে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে কারো ভোগের জন্য। এই ভাবনাতেই তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আরেকটু ভারী হয়।

বিবিজান সাজানো শেষ করে সন্তুষ্ট চোখে একবার তাকিয়ে দেখেন নাজহাকে। তাঁর ঠোঁটে ফুটে ওঠে ক্ষণিকের এক অচেনা প্রশান্তি, ঠিক এক দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে বিজয়ীর তৃপ্তি। তারপর ঘরের এক কোণে রাখা পিতলের ধুনুচিতে ধরিয়ে দেন সুগন্ধি লোবান আর গোলাপজলে ভেজানো কাঠের গুঁড়ো। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘর ভরে ওঠে এক মাদকতাময় গন্ধে, যে গন্ধ নাকে গেলে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। জানালার পর্দাগুলো ভালো করে টেনে দিয়ে, বিছানার চাদর ঠিক করে দিয়ে, বালিশের পাশে কয়েকটা লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেন তিনি। সবশেষে নাজহার দিকে একটিবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিঃশব্দে দরজা টেনে বেরিয়ে যান।
দরজা বন্ধ হওয়ার এই মৃদু শব্দ কানে যেতেই নাজহার বুকের ভেতর মনে হলো বাঁধ ভেঙে যায়। এতক্ষণ আটকে রাখা রাগ ও অপমান একসাথে বেরিয়ে আসতে চায়। তার ফর্সা মুখখানি রক্তবর্ণ ধারণ করেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে অপমানে। সে দুই হাতে খোঁপাটা ধরে টানতে যায়, কিন্তু কী ভেবে হঠাৎ থেমে যায় শেষ মুহূর্তে। এই সাজ ভেঙে ফেললেই আর কী হবে? বিবিজান আবার এসে হয়তো আরো ভয়ংকর কিছু করবেন। জিনের হুমকির কথা মনে পড়তেই তার হাত দুটো নেমে আসে নিজের কোলে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে সোফায় গিয়ে বসে পড়ে। কাচের চুড়িগুলো একবার ঝনঝন করে বেজে ওঠে, সেই শব্দটা ঘরের নীরবতায় মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে। ধুনুচির ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে সিলিংয়ের দিকে, লোবানের গন্ধে মাথাটা ভারী হয়ে আসছে ক্রমশ।

তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় এসব কিছুর পেছনে নিশ্চয়ই তৌসিরেরই হাত রয়েছে! নাহলে বিবিজান এত রাতে হঠাৎ কেন এসব করতে আসবেন?বৈবাহিক মিলন হয়নি বিবিজান জানলেন কীভাবে? তৌসিরই নিশ্চয়ই উনার কাছে গিয়ে নালিশ ঠুকেছে, বলেছে নাজহা কাছে আসতে দেয় না, শরীরের চাহিদা মেটাচ্ছে না। এই ভাবনায় তার সমস্ত রাগ এখন গিয়ে জমা হচ্ছে তৌসিরের ওপর একটাই বিন্দুতে। ভেতরে ভেতরে সে ঠিক করে নেয় আজ তৌসির ঘরে ঢুকলেই তার সাথে হিসাব চুকিয়ে ফেলবে চিরতরে।
কিছুক্ষণ পর।
তৌসির ঘরে ফিরেছে। সারাদিনের ক্লান্তি তার কাঁধে ভর করে আছে বোঝার মতো। সাদা পাঞ্জাবির কলার একটু কুঁচকে গেছে ঘামে-ধুলোয়, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। খাওয়া-দাওয়া সে আজ কুঠুরে সেরে এসেছে, বাড়িতে ঢুকে সরাসরি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। রোজকার রুটিন অনুযায়ী সে ধীর পায়ে, হেলেদুলে এগোয়। মনে মনে সে জানে, আজও তার জন্য মেঝেতেই বিছানা পাতা থাকবে। নাজহা গত কয়েকদিন ধরে তাকে বিছানায় ঘুমাতেই দেয় না, স্পর্শ তো দূরের কথা।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে সে আনমনে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। ঠিক তখনই তার নাকে এসে ধাক্কা দেয় এক উগ্র, মাদকতাময় সুগন্ধ। তৌসির প্রথমে বুঝতে পারে না গন্ধটা কিসের! সে ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়। ঘরের আলো আজ একটু ম্লান, কোণে জ্বলছে সুগন্ধি ধুনুচি, তার ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে ছাদের দিকে ধীর লয়ে।

ধীরে ধীরে সে ঘুরে তাকায় সোফার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পা দুটো মাটিতে আটকে যায় ঠিক কেউ পেরেক ঠুকে দিয়েছে মনে হয়।
সোফার ওপর বসে আছে নাজহা টকটকে লাল শাড়িতে, খোঁপায় বেলি ফুল, কপালে লাল টিপ, হাতে কাচের চুড়ি। ঘরের হলুদাভ আলোয় তার ফর্সা মুখখানি ঠিক জ্বলজ্বল করছে অগ্নিশিখার মতো। কানের ঝুমকো নড়ছে হালকা কাঁপনে। নাজহার এই রূপ দেখে তৌসিরের কলিজা ছ্যাঁত করে ওঠে। তার বুকের ভেতর হঠাৎ মনে হলো কেউ হাতুড়ির ঘা মারছে ধপ ধপ করে।
মনে মনে সে আওড়ায়, “আমার কাল নাগিন আজ লাল নাগিন সাজলো কোন দুঃখে?”
তৌসির ইচ্ছে করেই বেশিক্ষণ নাজহার দিকে তাকায় না। কারণ সে জানে, তাকালেই মনটা লাগামছাড়া হয়ে পড়বে, দুচোখ ভরে দেখতে চাইবে বউকে, এতদিনের তৃষ্ণা মুহূর্তে বাঁধ ভাঙবে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় দেয়ালের দিকে, তারপর টেবিলের দিকে, শেষে ঝুলন্ত ক্যালেন্ডারের দিকে। কিন্তু নাজহার এই টকটকে লাল রঙের ছবি তার চোখের সামনে থেকে সরছেই না, চোখের পাতায় এঁকে বসে গেছে অবিকল।
ওদিকে নাজহা রুক্ষ দৃষ্টিতে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে ফুঁসছে। তার নাকের পাটা ফুলে উঠছে রাগে, বুকটা উঠছে-নামছে দ্রুত ছন্দে। কাচের চুড়িগুলো তার কাঁপা হাতে টুংটাং শব্দ তুলছে ক্ষীণভাবে।
তৌসির একটু ভয় নিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে যায় নাজহার সামনে। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে? আজ এমনভাবে বসে আছো যে?”

নাজহা রাগে দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়। সে দাঁড়াতেই তার সরু কোমরের বাঁক স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে তৌসিরের চোখের সামনে। বিবিজান শাড়িটা এমন সুকৌশলে পরিয়েছেন যে নাজহার শরীরের প্রতিটি বাঁক ফুটে উঠেছে স্পষ্ট হয়ে। তৌসির নিজেকে সামলাতে না পেরে মুখ চেপে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। আজকের এই পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেওয়া তার পক্ষে সত্যিই দায়! তার বুকের ভেতর হাজার হাজার প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে।
কিন্তু নাজহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বাঁধভাঙা বন্যার মতো তার ভেতরের ক্ষোভ ফেটে পড়ে। বাঘিনির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সে তৌসিরের ওপর, দুই হাতে খামচে ধরে তার পাঞ্জাবির কলার আর চিৎকার করে ওঠে, “কেন? আপনি জানেন না? আপনার জন্যই তো এই বে*শ্যা সাজিয়ে দিয়ে গেছেন আপনার বে*শ্যা বিবিজান আমায়৷ আজ চল্লিশ দিন পার হয়েছে, আমি সুস্থ, তাই এখন আপনার চাহিদা পূরণ করতে হবে আমাকে? এসব নাটক নিজে সাজিয়ে এখন সাধু সাজছেন?”

নাজহার এই অপ্রত্যাশিত ক্ষোভে তৌসির হকচকিয়ে যায়। তার চোখে ফুটে ওঠে বিস্ময়, ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক হয়ে পড়ে। সে দ্রুত নাজহার বাহুতে হাত রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, “দেখ, আস্তে কথা ক। ঘরে বাচ্চারা ঘুমাইতাছে। আর বিবিজানকে এভাবে বলিস না, উনি শুনলে খারাপ হইব। উনি সাজিয়ে দিয়ে গেছেন, গেছেন। তুই কাপড় বদলে চুপচাপ ঘুমিয়ে যা।”
এ কথায় নাজহার রাগ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তার চোখ থেকে মনে হচ্ছে আগুন ঝরছে ফিনকি দিয়ে। পাগলের মতো তৌসিরের কলার খামচে ধরে সপাটে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দেয় সে তার গালে! তার হাতের কাচের চুড়িগুলো ঝনঝন করে বেজে ওঠে তীব্র শব্দে। থাপ্পড়ের এই শব্দে ঘরের নীরবতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে। এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা যন্ত্রণা, রাগ আর ক্ষোভ সব বাঁধ ভেঙে চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসে। নাজহা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে ওঠে, “কেন আমাকে আপনার বিবিজান সাজাবে? আমি কি নতুন বউ? তিন বাচ্চার মা আমি! আমি আমার জামাইয়ের সাথে কখন শুবো, সেটা উনি ঠিক করার কে? কেন আমার সাথে এসব জোর করবে? আর আপনি কেন ওই মহিলার পক্ষ নিচ্ছেন? বলুন আমাকে! আমাদের এই পরিণতির জন্য দায়ী আপনার এই অন্ধভক্তি!”

তৌসির কীভাবে বোঝাবে যে সে অন্ধভক্ত নয়, সে নিজেই কতটা অসহায় এই বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে! বিবিজানের সামনে দাঁড়ানোর সাহস এই বাড়ির কোনো পুরুষের নেই, সে ব্যতিক্রম নয়। সাধ্য নেই তার সাধ্য নেই সে যে বড্ড অসহায়। চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৌসির। তার বুকের ভেতর কষ্টের ঢেউ ওঠে বড় ঢেউ, যা ভাঙতে চায় সব বাঁধ। নাজহার চোখের পানি বুড়ো আঙুলের ডগায় মুছে দিতে দিতে ক্লান্ত গলায় সে বলে, “আমার কথাটা শোন, আস্তে চিল্লা। আর আমার কলারটা ছাড়, পাঞ্জাবিটা ছিঁইড়া যাইব। এমনিতেই দুইবার সেলাই করছি, এখন ছিঁড়লে আর সেলাই করতে পারব না। আমি বিবিজানের পক্ষ নিচ্ছি না, শুধু বলছি যে………
নাজহা এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলে, “আর আপনার যদি শরীরের এতই প্রয়োজন হয়, তবে আমাকে বললেই পারতেন যে আয় আমার সাথে শো! বাইরে বে*শ্যাদের দিয়ে হচ্ছে না, তোকে লাগবে, বললেই তো হতো!”

নাজহার মুখ থেকে এই কথা শোনার পর তৌসিরের আর মাথা ঠিক থাকে না। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে সে নাজহার এক বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তাকে ঝাঁকিয়ে তোলে। চুড়িগুলো আবারও কেঁপে ওঠে ঝনঝন শব্দে। সরাসরি নাজহার চোখে চোখ রেখে ভয়ংকর এক ধমক দিয়ে ওঠে, “এই চুপ!”
নাজহা ভড়কে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তৌসিরের চোখে সে যা এখন দেখল, তেমন সে কোনোদিন দেখেনি। তৌসির তাকে আবারও ঝাঁকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তোর কী মনে হয়? আমার এতই উত্তেজনা যে আমি বাইরের যার তার সাথে বিছানায় চইল্যা যামু? এ ছিনাল, তোরে না বলছিলাম আমি তৌসির শিকদার মাগিবাজ না! তাইলে তুই কোন সাহসে এই কথা বললি? সারাদিন খেটে রাতে আসলাম একটু শান্তিতে থাকতে, আর ঘরে এলেই এইসব সাউয়ার কাহিনি!”
এ কথা বলেই তৌসির নাজহাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে রাগ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা প্রায় বন্ধ করে দিতে গিয়েও পুরোপুরি বন্ধ করে না, এক চিলতে ফাঁক থেকে যায়। নাজহা নিজের মাথা দুই হাতে চেপে ধরে পুনরায় সোফায় বসে পড়ে। তার বুকের ভেতরটা হু হু করে কাঁদছে, খোঁপা থেকে বেলি ফুলের একটা কুঁড়ি খসে পড়ে তার কোলে। সে সেই কুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক, ঠিক সেটাই তার এই মুহূর্তের একমাত্র সঙ্গী।
কিন্তু তৌসির ঘর থেকে বেরিয়েও বের হয় না দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। তার বুকের ভেতর ঝড় বইছে প্রচণ্ড ঝড়। নাজহার শেষ কথাগুলো তার কানে বাজছে বারবার, প্রতিধ্বনির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে।

“বেশ্যাদের দিয়ে হচ্ছে না, তোকে লাগবে, বললেই তো হতো!” এই কথাটা তার কলিজায় বিঁধেছে ছুরির মতো।
হঠাৎ কী মনে করে সে দ্রুত পায়ে ফিরে আসে ঘরে। রুমে ঢুকেই সে সোজা এগিয়ে যায় নাজহার দিকে এবং এক টানে তাকে টেনে তুলে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। নাজহা টাল সামলাতে না পেরে তার বুকে গিয়ে ঠেকে। কোনো কথা না বলে শক্ত হাতে সে পেঁচিয়ে ধরে নাজহার ঘাড়ের পেছনটা। এরপর পাগলের মতো নাজহার ঠোঁটে চেপে ধরে নিজের ঠোঁট।
নাজহা তৌসিরের এই হঠাৎ আচরণে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস আটকে যায় বুকের মধ্যে। সে ডান হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তৌসিরের বুকে কিল বসাতে চায়, কিন্তু তৌসির কোনো বাধাই মানে না। সে নিজের অন্য হাত ধীরে ধীরে নামিয়ে নিয়ে যায় নাজহার সরু কোমরে। শাড়ির ভাঁজের ওপর দিয়ে সেই স্পর্শ গরম লোহার ছেঁকার মতো অনুভূত হয় নাজহার কাছে। দীর্ঘদিন পর সেই পুরোনো স্পর্শের নতুন আবহে নাজহার সারা শরীর বিদ্রোহ করে কেঁপে ওঠে। তার হাঁটু দুটো অসাড় হয়ে আসে, তার হাতের চুড়িগুলো নিঃশব্দ কাঁপনে দুলতে থাকে।

​তৌসির নাজহার ঠোঁট ছেড়ে দেয়। নাজহার দুই গালে দুই হাত রেখে তার ভেজা চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার এই চোখের চাহনিতে ভাসছে হাজার প্রশ্ন, হাজার আকুতি। তারপর আবেগঘন কণ্ঠে সে নাজহা কে বলে, “তুই ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো নারীর অস্তিত্ব নাই, আর তুই আমাকে এসব কস! আমি নিতে পারি না এই কথাগুলা। এসব ক্যান বলিস? তুই নিজেও জানস আমি এসব করি না। নিজের জেদ মেটাতে কত কিছুই তো করছিস! তোর জন্য আমার নিজের সন্তানগুলারে কোলে নিতে পারি না আমি, ওদের পাশে শুতে পর্যন্ত পারি না। তুই যা বলস আমি সব শুনি। কিন্তু এই যে কথাটা আজ বললি, এটা আমার কলিজায় মরিচ গুঁড়ো ঢেলে দেওয়ার মতো কাজ করছে আমি তোর গায়ে ফুলের টোকাও দিতে চাই না। আমারে মাফ করে দিস, আর এমন কখনো হইবো না। আমি আর রাগ দেখামু না। তোর কাছে তো আমি একটা পশু, তাই সেই হিসেবেই বলতাছি, এই পশু তোর সব কথাই শুনব। মাফ করে দিস, খুব রাগ উঠে যায় আমার।”

​নাজহা একদম নিঃশব্দে কথাগুলো শোনে। তার ভেজা চোখের পাতা কাঁপতে থাকে ফুলের পাপড়ির মতো। কিন্তু এই কথাগুলো তার অন্তরে কোনো তন্ত্রীতে গিয়ে বাজে না। এতদিনের জমা কষ্ট, অপমান, একাকীত্ব সব মিলিয়ে তার ভেতরে যে পাথর তৈরি হয়েছে, সেই পাথর গলে না এত সহজে।তারপরও তৌসিরের চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে ঠাণ্ডা, নিষ্ঠুর কণ্ঠে সে বলে, “আমি আপনাকে কখনোই মাফ করতে পারব না তৌসির। আপনার যদি আমাকে প্রয়োজন পড়ে, আমি আসব আপনার কাছে। কিন্তু সেটা শুধু শরীরের কাছে, আত্মার কাছে নয়। কারণ আমার আত্মা আপনাকে ভীষণ ঘৃণা করে।”
​তৌসির এ কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড মূর্তির মতো স্থির হয়ে থাকে। তার চোখের ভেতরে কী এক গভীর কষ্ট থমকে দাঁড়ায়, ঠোঁট দুটো অল্প কেঁপে ওঠে। “আত্মা আপনাকে ভীষণ ঘৃণা করে।” এই বাক্যটা তার কানে ঠিক সীসার মতো ভারী হয়ে গেঁথে যায়। এই কষ্টকে পাশে সরিয়ে সে আবার নাজহার ঠোঁটে আর গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। এবার তার স্পর্শে দৃঢ়তা মিশে আছে, দোদুল্যমানতা নেই। তার এই ভঙ্গি বলছে, “ঠিক আছে, আত্মা নয়, তোর কাছে আসতে দে একটু আসব।”

​নাজহা বুঝতে পারে তৌসির কী চাইছে। সে আর কোনো বাধা দেয় না, আবার সাড়া-ও দেয় না। সে দাঁড়িয়ে থাকে ঠাণ্ডা এক পাথরের মূর্তি। বাধা দিলে সমস্যা আছে, কারণ বিবিজান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি তালুকদারদের বারোটা বাজাবেন। তাছাড়া ঘরের ভেতর কী হচ্ছে, সেটার সব খবরও তিনি রাখবেন, এই বিশ্বাসটা নাজহার মজ্জায় গেঁথে গেছে।
​কিছুক্ষণ পর।
​তৌসির নাজহাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যায় মেঝেতে পাতা বিছানার দিকে। বিছানাটা যদিও তার জন্য পাতা, আজ সেটাই তাদের দুজনের সাক্ষী হয়। নাজহাকে সে নিজের বুকের নিচে আটকে নেয়। নাজহার লাল শাড়ির আঁচল ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলে সে। তার খোঁপাটা আলগা করে দেয় নিজের হাতে, ঘন লালচে কালো চুলগুলো বিছানার ওপর ছড়িয়ে পড়ে ঝর্নার মতো, বিছানার সাদা চাদরে মনে হচ্ছে লালচে কালো নদী বইছে। নাজহার ফর্সা গলায় তৌসির ঠোঁট চেপে ধরে, আলতো করে নাক ঘষতে থাকে। নাজহার ঝুমকো দুটো ঝনঝন শব্দে কেঁপে ওঠে, মনে হয় সেগুলোই কথা বলছে নাজহার হয়ে।

​নাজহা তৌসিরের কাঁধে হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দেয়, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে, “আ…আজ, আজ না!”
​নাজহার সারা শরীর কাঁপছে, আড়ষ্টতায় ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে হাতুড়ির মতো। এতদিন পরের এই স্পর্শ, এই ঘনিষ্ঠতা তার শরীরে অচেনা এক শিহরণ তুলছে, যা সে চাইছে না কিন্তু আটকাতেও পারছে না।
​কিন্তু তৌসির নাজহার কোনো কথাই শোনে না। সে ধীরে ধীরে নাজহার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। তার দুই হাত নাজহার সারা শরীর জুড়ে অধিকার খাটাতে থাকে, সেই অধিকার যা দশ মাস ধরে সে হারিয়ে রেখেছিল। প্রতিটি স্পর্শে মনে হয় লেখা আছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভাষা।
​নাজহা ঢোক গিলে বিরক্তি নিয়ে বলে, “বেশি করে ফেলছেন। বাচ্চারা জেগে গেলে ওদের কী দেব? হাত সরান!”

​তৌসির নাজহার কানে কানে ফিসফিস করে বলে, “চুপ করে শুয়ে থাক, একদম চিল্লাবি না।”
​তার গরম নিঃশ্বাস নাজহার কানের লতিতে গিয়ে ঠেকে, এই উষ্ণতায় নাজহার সারা শরীর কেঁপে ওঠে অজান্তেই। নাজহা চুপ হয়ে যায়। তার চোখের কোণ বেয়ে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়তে থাকে অশ্রুবিন্দু, বালিশে মিশে যেতে থাকে নিঃশব্দে।
​তৌসির আজ নাজহাকে নিজের মতো করে কাছে টেনে নেয়। তার এতদিনের না পাওয়া আকাঙ্ক্ষা সে নাজহার চোখের জলের বন্যাকে উপেক্ষা করেই পূরণ করে নেয়। ঘরের কোণে সুগন্ধি ধুনুচি তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে, তার ধোঁয়া সাক্ষী হয়ে থাকে এই বৈপরীত্যের এক পাশে দেহের মিলন, অন্য পাশে আত্মার বিচ্ছেদ। লোবানের সুবাস মিশে যায় নাজহার চোখের নোনা জলের সাথে, বাতাসে তৈরি হয় এক ভিন্নরকম সুবাস, যা ভালোবাসারও নয়, ঘৃণারও নয় শুধুমাত্র টিকে থাকার। নাজহা তৌসিরের দেওয়া মিষ্টি যন্ত্রণায় কাঁদে ছটফটিয়ে ওঠে কিন্তু তৌসির তাকে ছেড়ে দেয় না।

​সকাল ছটা বাজে।
​জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের নরম সোনালি আলো এসে পড়ছে ঘরের মেঝেতে। বাইরে পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে কিচিরমিচির, শিকদার বাড়ির উঠোনের পুরনো আমগাছটায় বসে দুটো শালিক নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে মনে হচ্ছে। রাতের সেই মাদকতাময় গন্ধ এখন ফিকে হয়ে এসেছে, তার জায়গা নিয়েছে সকালের তরতাজা বাতাস।
​নাজহা বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার বুকের ওপর দুধের গন্ধ ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে তাদের ছোট্ট মেয়ে তৌশি। ওর ছোট্ট মুঠি নাজহার বুকের একপাশ ধরে আছে । নাজহার দুই বাহুর দুই পাশে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে তাদের দুই ছেলে। বড়টার মাথা মায়ের কাঁধে, ছোটটার পা মায়ের পেটের ওপর তুলে দেওয়া, নিশ্চিন্ত ঘুমের ভঙ্গিতে ঘুমচ্ছে ওরা।
আর নাজহার ডান উরুতে মুখ গুঁজে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে আছে তৌসির। সে সারারাত নাজহাকে দুচোখ এক করতে দেয়নি, আর এখন সকালবেলা এই বাচ্চারাও তাকে বিশ্রাম নিতে দিচ্ছে না। কী বিচিত্র এক নিয়তি নাজহার!

​নাজহা এই অবস্থায় শুয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে চোখ মেলে। ছাদের পাখা ধীরে ধীরে ঘুরছে ঘরঘর ঘরঘর, তার একঘেয়ে শব্দ মনে হচ্ছে এই সকালের একমাত্র সুর। সে একা একজন মানুষ, অথচ তার ওপর ভর করে শুয়ে থাকে আরও তিনজন না, চারজন। নাজহার কোমর পর্যন্ত কাঁথা দেওয়া, যার নিচে তৌসির ঘুমচ্ছে। নাজহা তো নিজের গায়ে ঠিকমতো কাপড় জড়ানোরও সুযোগ পায়নি। কালকের লাল শাড়িটা কোথায় ছড়িয়ে পড়ে আছে ঘরের কোণে, কে জানে হয়তো সেই সাক্ষী কাপড়টাও লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে।
​এই দৃশ্যটা, পারিবারিক এই মুহূর্তটা তার কাছে ভীষণ আনন্দের। তিনটি সন্তানের স্পর্শ, স্বামীর উষ্ণ নিঃশ্বাস উরুতে, এমন সকাল প্রতিটি নারীর স্বপ্নের হওয়ার কথা। কোনো সিনেমার দৃশ্যের মতোই নিখুঁত এই ছবি। কিন্তু নাজহার ভেতরে জমানো ঘৃণার পরিমাণ এত বেশি যে, এই আনন্দ পুরোপুরি ফুটে উঠতে পারে না। ঘৃণা আর ভালোবাসা, বিরক্তি আর মায়া সব মিলে যায় এক বিচিত্র পাঁকে।

​তার ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে আছে হালকা লাল রঙের চিহ্ন। কানের ঝুমকো একটা কখন যে খুলে গিয়ে বালিশের নিচে চলে গেছে। খোঁপা খুলে চুলগুলো ছড়িয়ে আছে বালিশের চারপাশে, তার মধ্যে দু-একটা বেলি ফুলের শুকিয়ে যাওয়া পাপড়ি লেপ্টে আছে। সারা শরীরের তৌসিরের সদ্য চুমু আঁকা।
​তবুও নাজহা কী মনে করে হঠাৎ একটু হাসে। খুব হালকা, খুব গোপন এক হাসি। এক গভীর তৃপ্তি নিয়ে হাসে। এই হাসির মানে হয়তো সে নিজেও জানে না শুধু এইটুকু জানে, এই মুহূর্তটুকু তার, একান্তই তার। এই বাচ্চাদের উষ্ণতা, এই সংসার, এই সকাল সব তার নিজের হাতে গড়া, নিজের রক্তে-ঘামে তৈরি।
​জানালার বাইরে ধীরে ধীরে সূর্য উঠছে। শিকদার বাড়ির উঠোনে একটা পাখি এসে বসে টুনটুনির মতো ছোট্ট একটা পাখি, ডেকে ওঠে টিটি টিটি। নতুন একটা দিন শুরু হচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে কাজের বুয়ার হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং শব্দ।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৪

​কিন্তু নাজহার ভেতরের সেই পুরোনো যন্ত্রণা, সেই পুরোনো ঘৃণা সব একই রয়ে যায়। এক ফোঁটাও কমে না, বরং আরেকটু জমাট বাঁধে। শুধু সাথে যোগ হয় গতরাতের নতুন এক অধ্যায়, যা তার স্মৃতির খাতায় লেখা হয়ে গেছে ওই টকটকে লাল শাড়ির রঙে। এই রঙ কোনোদিন মুছবে না, কোনোদিন ফিকে হবে না। যতদিন সে বেঁচে থাকবে, ততদিন এই রাতের কথা, এই সাজানো নববধূর অপমানের কথা, এই দেহের মিলন আর আত্মার বিচ্ছেদের কথা তার বুকের গভীরে রক্তক্ষরণ করেই যাবে নীরবে, একান্তে, কারও অজান্তে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here