শাহজাহান তন্ময় বোনাস পর্ব ১
Nabila Ishq
কনফারেন্স রুমের লাইটগুলো জ্বলছে না। এলইডি মনিটরের সামনে যিনি প্রেজেন্টেশন দিচ্ছেন শুধু তাকেই দেখা যাচ্ছে গোটা অন্ধকার রুমে। এবং শুধু তার কণ্ঠই শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। মনিটরে ভাসছে কোম্পানির এই বছরের হিসেব।
‘স্যার, হাউ অ্যাবাউট দিস ওয়ে? আমরা ভিন্নভাবে আগাতে পারি। মার্কেটিং পলিসি ঘোরাতে পারি….’
কোম্পানির প্রেসিডেন্ট, শাহজাহান তন্ময় সকলের সামনে বসে আছে। পরনে থ্রিপিস স্যুট। যা তার পেশিবহুল শরীরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আপাতত কোটের বোতাম গুলো খোলা। সাদা শার্টের ওপরে কালো ভেস্ট দেখা যাচ্ছে। পায়ের ওপরে পা তুলে তন্ময় মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কর্মচারীর প্রেজেন্টেশন। সামনেই, টেবিলের ওপরে তার ফোন, স্যামসাং গ্যালাক্সি এস টুয়েন্টি-সিক্স আল্ট্রা সাইলেন্ট মুডে রাখা। তবে হঠাৎ স্ক্রিন জ্বলে ওঠায় তন্ময়ে নজর আনমনা পড়ল। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে নোটিফিকেশন এসেছে। ভেসে আছে, জান শব্দটি। তন্ময় মনিটরে দৃষ্টি রেখে ফোন হাতে নিলো। প্রেজেন্টেশন শুনতে শুনতে এবং আড়চোখে মনিটর দেখতে দেখতে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল। অরু মেসেজ করেছে –
‘এইযে, তাড়াতাড়ি এক্ষুণি আমাকে কল করুন। নাম্বারে।’
তন্ময় বিনাবাক্যে, নির্দ্বিধায় সাথে সাথে অরুর নাম্বারে কল করল। রিং হয়ে কল কেটে গেল। কল ধরেনি অরু। তখুনি অরু আবার মেসেজ করল –
‘থামবেন না। অনেক অনেক কল দিন।’
ওদিকে কর্মচারী তন্ময়ের উদ্দেশ্যে বলল, ‘স্যার, এইদিকটা দেখুন.. উই ক্যান টেক দিস ওয়ে ফর আওয়ার মার্কেটিং!’
তন্ময় নির্বিকার মুখে মনিটরে চেয়ে অরুর নাম্বারে একের পরে এক কল দিতে থাকল। পরের দশ মিনিট তন্ময় কল করল আর অরু কাটল শুধু। এবারে রিং বেজে বন্ধ হতেই অরুর মেসেজ এলো ফের। একটা GIF দিয়েছে। একটা মেয়ে পুতুল ছেলে পুতুলকে ঝাঁপিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে শক্ত করে। অরু লিখেছে নিচে –
‘গাল পাতুন তাড়াতাড়ি।’
তন্ময় লিখল, ‘Hmmm’
‘আপনার গালে চুমু খেলাম। ডার্ক রেড লিপস্টিক দেয়া ঠোঁট দিয়ে।’
তন্ময় মেসেজ দেখে থমকাল একমুহূর্তের জন্য। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তো চোখে চোখ রাখতে পারে না! তন্ময়ের গলার অ্যাডাম্স অ্যাপল ওঠানামা করল। দম ছেড়ে লিখল –
‘Picture -’
মেসেজ দিয়ে তন্ময় ফোন আর রাখল না টেবিলে। হাতে রেখেই স্ক্রিনে ঘনঘন তাকাতে থাকল। মিটিং তখনো চলছে পুরোদমে। অথচ দশ মিনিটের মাথাতেও অরু মেসেজ এলো না আর। এর কিছুক্ষণ পরে নোটিফিকেশন এলো। তন্ময় মসৃন ভঙ্গিতে নোটিফিকেশন চেপে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল। অরু একটা ছবি পাঠিয়েছে। একটা লাল কারচুপির, জরজেটের লাল শাড়ি পরনে। খুব কাছ থেকে সেল্ফি তুলেছে। ছোটো নাক থেকে বুক পর্যন্ত। নাক, ডার্ক রেড লিপস্টিকে সজ্জিত ঠোঁট, ফর্সা গলা… সবমিলিয়ে ছবি দেখে তন্ময় থমকে রইল কিছুক্ষণ! আসার আগে সে জিজ্ঞেস করেছিল, অনুষ্ঠানে কী পরে যাচ্ছে! তখন তো ঠিক বলল, কিছু একটা পরে চলে যাবে! এই ওর এই কিছু একটা? অরু শাড়ি পরলে ওকে আর বাচ্চাটা দেখায় না। পরিপূর্ণ নারী লাগে। চোখ সরানো মুশকিল হয়ে পড়ে! তন্ময় চায় না সে পাধে না থাকলে ও শাড়ি পরে বাইরে যাক। অথচ এই মেয়ে! গর্দভ!
‘স্যার…’
তন্ময় উঠে দাঁড়াল হঠাৎ। টেবিল থেকে নিজের জিনিসপত্র তুলে নিতে নিতে বলল, ‘আগামীকাল বাকিটা। আজ এইপর্যন্তই।’
অরু ঠোঁট ফোলাল। কিছু বলল না! কিচ্ছু না! কী সুন্দর একটা ছবি ও দিলো লজ্জার মাথা খেয়ে অথচ বিপরীতে একটা শব্দও বলল না! পাশ থেকে এক দুসম্পর্কের মামাতো বোন রাইসা অরুর কাঁধ ছুঁয়ে দুষ্টুমি স্বরে বলল –
‘বিয়ের এতোগুলো বছর হচ্ছে! অথচ তন্ময় ভাইয়া এখনো কেমন তোকে কেমন চোখে হারায়! দেখলি কীভাবে কলের ওপরে কল দিতে থাকল! বাব্বা!’
অরু গর্ব নিয়ে সিল্কি চুলগুলো মুখের সামনে থেকে কানে গুঁজল। আড়চোখে দেখল রাইসার পাশে দাঁড়ানো সুমনার গোমড়া মুখ। হু, এখনো তার তন্ময় ভাইকে নিয়ে প্রত্যাশা রাখা! স্পর্ধা দেখো মেয়ের! ওকে দেখানোর জন্যই তো তন্ময়কে দিয়ে এতো কল করাল। বোঝাতে হবে না তন্ময় অরুর জন্য পাগল? চোখে হারায়! ফায়াজ কোথা থেকে কয়েকজন পোলাপান নিয়ে ছুটে এলো। ছোটো ছোটো হাতে মায়ের আঁচল ধরে বলল –
‘মাম্মা, পাপা কি আসবে? আমরা কখন ফিরব?’
বাগান জুড়ে তখন আত্মীয়। অরু মায়ের দুসম্পর্কের এক বোনের মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছে। এইতো সন্ধ্যায় বেরুবে। তন্ময়ের আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো। আসতে পারবে না জানিয়েছে। অরু একটু ঝুঁকে রুমাল দিয়ে ছেলের ঘর্মাক্ত মুখ মুছে দিয়ে বলে –
‘এইতো আরেকটু পরে, বাবা। এভাবে দৌড়ায় না। নানুর আশেপাশে থাকো।’
সুমনা বেগম ফাইজাকে কোলে নিয়ে রেখেছেন। নাতনিদের প্রতি তিনি ভীষণ মনোযোগী। আশপাশ থেকে সরতে দিচ্ছেন না। তাদের সাথে বাড়ির অনেকজন এসেছে। জবেদা বেগম, মুফতি বেগম, আকাশ, দীপ্ত। সবগুলো ওদিকে, নাচগান দেখছে। দীপ্ত এসে ফায়াজকে নিয়ে গিয়েছে। সে আবার ফায়াজ – ফাইজা বলতে পাগল। ফায়াজ – ফাইজাও দীপ্ত বলতে অজ্ঞান। অরুর আর সুমনার মুখ দেখতে ইচ্ছে হলো না। সরে এলো ওদের থেকে।
তন্ময় ভাই, একটা যাচ্ছে তাই! এতো সুন্দর ছবি দেখে একটা কমপ্লিমেন্ট তো দিতে পারতো? অরুর অভিমান আকাশ ছুঁলো। একটু নির্জনে, আবছায়াতে এসে আড়াল হয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েজ দিলো গোমড়া মুখে –
‘আমি আজ বাসায় ফিরব না। আজ না শুধু, আমি কয়েকদিন এখানেই থাকব। ফিরব না…’
অরু সাথে সাথে প্রত্যুত্তর স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। বিপরীতে যখন সাথে সাথে পেছন থেকে জবাব এলো ভয়ে প্রায় বেচারি লাফিয়ে উঠল –
‘চড়িয়ে আপনার সবগুলো দাঁত ফেলে দিতাম।’
অরু ধড়ফড়িয়ে ফিরে তাকাল। তন্ময় দাঁড়িয়ে আছে। কোট হাতে। এলোমেলো চুল। আধো অন্ধকারে তেমন চোখমুখ দেখা গেল না। অরু নিজের আনন্দটুকুও দেখাতে পারল না। তন্ময় লেপ্টে এসে দাঁড়াল। চাপদাড়ি ওয়ালা গালটা পেতে দিলো –
শাহজাহান তন্ময় ঈদ স্পেশাল
‘চুমু….’
অরু ফিক করে হেসে ফেলল। আশেপাশে চেয়ে দেখে নিলো। ঝটপট মাথা তুলে চোখ বুজে তন্ময়ের গালে ঠোঁট ডোবাল। পরপর অন্য গালে ঠোঁট ছোঁয়াতে গিয়ে অনুভব করল কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছে। তন্ময় মাথাটা ঘুরিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিয়েছে।
