শাহজাহান তন্ময় সারপ্রাইজ পর্ব
Nabila Ishq
শুভ জন্মদিন, মিস্টার শাহজাহান।
বন্ধুদের কিছু একটা আজ হয়েছিল। নাহলে ওমন জলদস্যুর মতো তন্ময়ের অফিসে এসে পাহারা দেবে কেনো? কেনোই-বা তাকে আটকে রাখবে এতক্ষণ? নিত্যদিনই অফিস শেষ করে রাত দশটার ভেতর তন্ময় বাড়ি ফেরে। বাচ্চারা নাহয় ভীষণ অভিমান করে। ঠোঁট ফুলিয়ে দুজনেই তোতাপাখির মতো অভিমানী অনুভূতির প্রকাশ করতেই থাকে। আর এমনিতেও কাজের জন্য মাসে দু-একবার শহর ছাড়তে হয় তার। গত মাসে সুইজারল্যান্ড যেতে হয়েছিল। থেকেছিল চারদিনের মতো। বাচ্চাদুটো কী সাংঘাতিক ভাবে অভিমান করে বসেছিল! বাচ্চার মা সহ বাচ্চাদের অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে তন্ময়ের দু-দিন আর অফিসই করা হয়নি। এইযে আজ আবারও দেরি হলো। বারোটা বাজবে প্রায়। ওরা নিশ্চয়ই জেগে আছে? তন্ময়কে দেখেই দু-ভাইবোন ছুটে আসবে ঠিক! তবে তাকে জড়িয়ে ধরবে না নিত্যদিনের মতো। কাছে এসেই পিঠ দেখিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকবে। বোঝাবে, ওরা আপাতত অভিমান করে আছে। কঠিন অভিমান!।
শাহজাহান বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার। এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে থাকার কারণ কী? বারোটা বাজতে তখনো এক মিনিট বাকি। এতো দ্রুতো কেউই ঘুমোতে সচরাচর যায় না। লিভিংরুমে সকলের হট্টগোল লেগে থাকে রাতে একটা, দুটো পর্যন্ত। এমন নীরবতা দেখে তন্ময় আওয়াজ তুলল না। শুধু কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। পকেট থেকে ফোন বের করে টর্চ জ্বালাল। আলোটা সামনে ফেলতেই সামান্য হকচকাল। মোস্তফা সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন সামনেই। অন্ধকারের ভেতর ওমন শুভ্র রঙা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী?
তন্ময় আশ্চর্য হয়ে মুখ খুলবে তখুনি লিভিংরুমের দেয়াল ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দ হলো। জ্বলল গ্রাউন্ড ফ্লোরের সবগুলো বাতি। একইসঙ্গে ভেসে এলো চেনাপরিচিত সবার কণ্ঠের সুরে বলা –
‘হ্যাপি বার্থডে।’
সিঁড়িগোড়ার সামনে, গ্রাউন্ডফ্লোরের একদম মধ্যিখানে কেকের স্ট্যান্ড দাঁড় করানো হয়েছে। ভীষণ বড়ো কেকটি শভ্র রঙের। কেকের ডিজাইনটা গাড়ির আকৃতিতে করানো। সবাই ওটাকেউ ঘিরেই দাঁড়িয়ে আছে। ঝাড়বাতিটা ঠিক ওদের মাথার ওপরে। তন্ময়ের দৃষ্টি সর্বপ্রথম গিয়ে পড়ল সাদা বাল্বের আলোয় সবার আড়ালে থাকা অরুর ওপরেই। নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ানোর বেশ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তন্ময় নিচের দিকে চেয়ে বুঝল শাড়ি পরে আছে ম্যাডাম। শাড়ির একাংশ দেখা যাচ্ছে। শুভ্র রঙা শাড়ি। তার পছন্দের রং। তন্ময় নিঃশব্দে হাসে। দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকায় বাকিদের দিকে। ফায়াজ-ফাইজা ছুটে এসে ধরেছে তন্ময়ের শক্তপোক্ত ঊরু। দুজনে দু ঊরু জড়িয়ে হ্যাপি ফুলের মতো হেসে বার্থডে গান গাইছে কোকিলা স্বরে –
‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…
হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার পাপা…
হ্যাপি বার্থডে টু ইউউ….’
তন্ময় দু-পায়ের পাতায় ভর দিয়ে বসে ছেলে-মেয়ের সামনে। দুজনের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে, ‘থেংকিউ পাপা।’
খিলখিলিয়ে হাসল ফায়াজ। তন্ময়ের গালে সমানে চুমু চুমু খেলো কিছু। ফাইজা আবার একটু লাজুক ভাইয়ের তুলনায়। সে পিটপিটিয়ে চেয়ে দু-গালে দু-বার ঠোঁট ছুঁইয়ে মুখ লুকোয় বাবার ঘাড়ে। তন্ময় মাথা বুলিয়ে দেয় আদুরে ভঙ্গিতে। শাবিহা এসে ধরল বড়ো ভাইয়ের হাত। টেনে উঠিয়ে কেকের দিকে আনতে – আনতে বলল –
‘দাঁড়িয়ে থেকো না, ভাইয়া। আসো কেক কাটো। আমরা সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষায়।’
তন্ময় অসহায় বটে। ‘এসব তার পছন্দ না’ অনুভূতি আর মুখ দিয়ে বেরুলো না। পরিবারের উচ্ছ্বাসের সামনে সবই তুচ্ছ। মোস্তফা সাহেবের অভিব্যক্তি নির্বিকার বেশ। ভদ্রলোক কোথায় একটা চেয়ে আস্তে করে বললেন –
‘হুম..ওই আরকি! শুভ জন্মদিন।’
তন্ময় তাকাল বাবার দিকে। মোস্তফা সাহেব এদিক-ওদিক চাচ্ছেন। একপর্যায়ে যখন ছেলের দিকে তাকালেন, তন্ময় নিঃশব্দে হেসে ফেলল। বলল –
‘থেংকিউ বাবা।’
মোস্তফা সাহেব গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘কাটো ওটা। সবাই অপেক্ষায়।’
সুমিতা বেগম অনেকক্ষণ যাবত অরুকে ইশারা করছেন এগিয়ে যাওয়ার। অথচ মেয়ে তার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আড়াল হয়ে আছে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে বসলেন –
‘সারাদিন শুধু গাল ফুলানোর স্বভাব করে রেখেছে।’
ফায়াজ উচ্চকণ্ঠে বলে বসল চটজলদি, ‘নানু, আমার মাম্মাম গাল ফুলোবেই। কারণ শি ইজ আ প্রিটি লিটল বেইবি। পাপা বলে তো। তুমি শোনোনি?’
জবেদা বেগম শব্দ করে হেসে ফেললেন। সুমিতা বেগম আড়চোখে চেয়ে দেখলেন সবাই মুখ লুকিয়ে হাসছে। মোস্তফা সাহেব দু-হাত বাড়িয়ে ডাকলেন –
‘দাদু ভাই, আসো! এদিকে আসো।’
ফায়াজ ছুটে গেলো দাদুর কোলে। তন্ময় এবারে শব্দ করে হেসে ফেলল। সবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অরুকে শাবিহা ঠেলে সামনে পাঠাল। বেচারি লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে এসে দাঁড়াল। হাঁটার তালে দুলল কুঁচিগুলো। এযাত্রায় তন্ময় পুরোপুরি দেখতে পেলো মহারানিকে। অরু কারচুপির কাজ করা জরজেটের শাড়ি পরে আছে। ব্লাউজের হাতাটা শর্ট। সুন্দর করে সেজেছে। কী ভীষণ সুন্দর লাগছে! কে বলবে তন্ময়ের পাশের বাচ্চা দুটো ওই এইটুকুন পাতলা, ছোটোখাটো মেয়ের পেট থেকে বেরিয়েছে? ওকেই তো বাচ্চা বাচ্চা লাগে। অরু চোখে চোখ রাখল না কোনোভাবেই। ঠেলাঠেলিতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওমনি পুরো পরিবার মুচকি মুচকি হাসতে থাকল অগোচরে। অরু লাজুক ভঙ্গিতে বলল –
‘কেক কাটুন।’
তন্ময় পাশে তাকাল। আওয়াজ নামিয়েই আওড়াল, ‘মিসেস শাহজাহান এখনো উইশ করেনি।’
অরু শুনেও বুঝি শুনল না। কেমন দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। বাচ্চাদের ঠেলে দিলো তন্ময়ের দিকে। তন্ময় সবাইকে নিয়েই কেক কাটল, খাইয়ে দিলো। রাতের একটা বাজল সেখানেই। ফায়াজ-ফাইজা বাবার সাথে ওপরে উঠতে চাইলে শাবিহা আর রুবি ওদের নিয়ে গেলো নিজেদের সাথে। তন্ময় আশেপাশে কোথাও অরুকে পেলো না। কী বিচ্ছু মেয়ে! সবাই তো উইশ করল, ও করেনি কেনো? এতো আয়োজন করে এখন হাওয়া? তন্ময় গলার টাই লুজ করতে করতে উঠে এলো দোতালায়। করিডোর হেঁটে এলো তাদের রুমের সামনে। কিছু একটা আন্দাজ করে দ্রুতো দরজা ঠেলে ঢুকল ভেতরে। মিষ্টি এক ঘ্রাণ নাকে ছুঁলো। বেডের পাশে রেড লাইট থিমে সাজানো ক্যান্ডেল ডিনার। ওরু দাঁড়িয়ে আছে ফ্লাওয়ার বুকে হাতে। গাল ভরে হেসে মিহিই স্বরে বলল –
শাহজাহান তন্ময় শেষ পর্ব
‘শুভ জন্মদিন, মিস্টার শাহজাহান।’
তন্ময় প্রবেশ করল অধৈর্য ভঙ্গিতে। অরুকে জাপ্টে ধরতে ধরতে নাকমুখে আওড়াল, ‘জমছে না।’
অরু লাজুক হাসে। তন্ময়ের গলা দু-হাতে শক্ত জড়িয়ে ওই খোঁচাখোঁচা গালে নিজের মসৃন গাল ঘষে কেঁপে আওড়ায়
‘শুভ জন্মদিন, তন্ময় ভাই।’
