Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৫)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৫)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৫)
মাইশা জান্নাত নূরা

নাস্তা শেষে সবাই বাংলো বাড়ির ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে আছে। নীরা বললো….
—”শুধু শুধু বসে বসে কতো গল্প করবো! চলো না আমরা গেইম খেলি একটা! ট্রুথ অর ডেয়ার। এতে আমাদের শৈশবের অনেক স্মৃতির কথাও মনে পড়ে যাবে।”
নির্ঝর বিরবিরিয়ে বললো….
—”না ভাই না এই গেইম আমি খেলবো না। এমনিতেই জীবনে বহুত ভাবে বাঁশ খেয়ে খেয়ে ই*জ্জতের কয়েক ফ্লেভারের ফালুদা তৈরি হয়ে গিয়েছে আমার। এখন নিজের ক্রাশের সামনে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক তা আমি চাই না।”
পিহু কৌতুহলী স্বরে বললো….

—”এই গেইমের নাম শুনেছি কখনও খেলার অভিজ্ঞতা হয় নি। আজ হলে মন্দ হবে না।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর নিচের ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে ধরলো, কপালে কয়েকটা ভাঁজও স্পষ্ট হয়েছে। কারণ এখন আর ‘না’ করার কোনো অপশন রইলো না ওর জন্য। তেজ বললো…..
—”বেশ তো, ভাবী যখন বলেছেন তখন হবে খেলা এই গেইম-ই। কারণ এই গেইমে কারোর কোনো শারিরীক পরিশ্রমও হবে না। অনু মোটামুটি সুস্থ হলেও শারিরীক পরিশ্রম হওয়ার মতো গেইম ওর জন্য ভালো হবে না। তবে নীরা, তোকে একটা কথা বলে রাখছি এখনই। এমন কোনো প্রশ্ন কাউকে করবি না বা এমন কোনো কাজ করার জন্য কাউকে বলবি না যা তাকে ও তার দ্বারা আরো কাউকে অস্বস্তির মাঝে ফেলবে। ঠিক আছে?”
নীরা বললো….

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”চিল মেজো ভাইয়া। রিস্ক না লিয়া তো মাজা কেয়সে আয়েগি? তোমার এই রুলস ভাবীপু, ইলমা আপু আর অনুর জন্য রাখা হলো আর তুমি, ছোট ভাইয়া আর আমি রি*স্ক নিয়েই ডেয়ার পূরণ করবো।”
নির্ঝর তেড়ে আসার মতো কন্ঠে বললো….
—”কেনো রে? আমরা রুলসের বাহিরে কেনো থাকবো? রুলস তো রুলসই, সবার জন্য সমান হতে হবে।”
নীরা দুষ্টু হাসি হেসে বললো….
—”ভয় পাচ্ছো তুমি ছোট ভাইয়া! তিন তিনজন মেয়ের সামনে বসে সামান্য ডেয়ারের রিস্ক নিতে ভয় পাচ্ছো তুমি? ছি: ছি: ছিহ্।”
পিহু ঠোঁট চেপে হাসছে। নির্ঝর ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললো….

—”নির্ঝর খান এতো তুচ্ছ বিষয়ে ভয় পায় না মূ*র্খ বালিকে। দিস তুই যা ডেয়ার দেওয়ার। আমি পূরণ করবো তা অক্ষরে অক্ষরে।”
নীরা হেসে বললো….
—”তেজ ভাই তুমি কিছু বলতে চাও রুলসের বিষয়ে?”
তেজ ছোট্ট করে ‘না’ বললো। নীরা বললো….
—”এই গেইমটা পুরো সময় আমি লিড করবো। ট্রুথ ও ডেয়ার সব আমিই সবাইকে দিবো। প্রথমে সবাইকে ট্রুথ দেওয়া হবে এরপর ডেয়ার।”
ইলমা শান্ত স্বরে বললো….
—”খুব বেশি পারসোনাল হয়ে যায় এমন প্রশ্ন করো না নীরা।”
নীরা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে ‘আচ্ছা’ বললো। অতঃপর গেইম শুরু করলো নীরা। সে দু’হাত একত্রে ঘষে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…..

—”ছোট ভাইয়া তোমার ট্রুথ হলো, ‘লাস্ট যেই মেয়েকে দেখে ক্রাশ খেয়েছো সেই মেয়ের নামের ১ম অক্ষর কি বলো’?”
নির্ঝরের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে অনুর উপর পড়লো। অনু স্বাভাবিক মুখশ্রী করেই বসে আছে ইলমার পাশে। খেলার প্রতি খুব একটা মনোযোগ নেই ওর। নীরা, তেজ আর পিহু ঠোঁট চেপে হাসছে কারণ ওরা জানে নির্ঝরের প্রেজেন্ট ক্রাশের নাম। নির্ঝর একবার ঢোক গি*লে অপ্রস্তুত স্বরে বললো….
—”অ।”
সঙ্গে সঙ্গে অনু চোখ তুলে তাকালো নির্ঝরের দিকে। ফলস্বরূপ ওদের দু’জনের চোখাচোখি হলো একবার। পরপরই দু’জনেই নিজেদের চোখ নামিয়ে নিলো। ইলমা ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা লক্ষ্য করলো কিন্তু কিছু বললো না। নীরা এবার তেজের দিকে তাকিয়ে বললো…..

—”তেজ ভাই, এবার তোমার পালা৷ তোমার ট্রুথ হলো, ‘জীবনে সবচেয়ে বড় মিথ্যা কাকে বলেছিলে এবং কেনো?”
তেজ এক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো….
—“নিজের কাছের মানুষদের।”
তেজের কথার ভাঁজ নীরা, পিহু আর নির্ঝর বুঝতে পারলেও ইলমা ও অনু পারলো না৷ নীরা ওর মুখ দিয়ে ‘চ-এর মতো’ শব্দ উচ্চারণ করলো এবার। ইলমা ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
—“কি নিয়ে বলেছিলেন মি*থ্যা?”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বললো….
—”আচ্ছা ছাড়ো এই বিষয়ে কথা না বাড়াই।”
তেজ বললো….

—”না, ট্রুথ যখন নিয়েছি তখন পুরো সত্য বলার সাহসও রাখতে হবে আমায়।”
নির্ঝর কিছু বলতে নিলে তেজ হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে বললো….
—”আমি আসলে একজন বা*উন্ডু*লে স্বভাবের ছেলে ছিলাম কিন্তু আমার পরিবারের সকলের সামনে আমি রূপ-সাজ-আচারণ পরিবর্তন করে থাকতাম। যেনো তারা কখনও আমার আসল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে না পারে। এটাই ছিলো আমার জীবনে দীর্ঘসময় ধরে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সবথেকে বড় মি*থ্যে।”
নির্ঝর নীরাকে ওর কনুই দ্বারা গু*তো মে*রে হিসহিসিয়ে চাপা স্বরে বললো….
—”সব হয়েছে তোর জন্য। দিলি তো ইলমার সামনে তেজ ভাইয়ের সব পর্দা ফাঁ*স করে।”
নীরা ফিসফিসিয়ে বললো…

—”আমি কি আর ভাবছিলাম মেজো ভাইয়া বিষয়টাকে এতোটা সিরিয়াস ভাবে নিবে! তবুও যে ক্লিয়ার করে পুরো বিষয়টা বললো না এটাই ভালো হয়েছে।”
পিহু হালকা শব্দে কৃত্রিম কাঁশি দিয়ে বললো….
—”নীরা পরের ট্রুথটা দাও তো জলদী।”
—”হ্যাঁ, হ্যাঁ এবার ট্রুথ তোমার জন্য ভাবীপু। তুমি বলো, তোমাদের যখন বিয়ে হলো তখন কি তুমি বড় ভাইয়াকে মন থেকে ভালোবাসতে? অনুভূতি কেমন ছিলো তোমার?”
পিহু হালকা হেসে বললো…..

—”ঠিক ভালোবেসে বিয়ে করেছি এমনটা বললে ভুল হবে। আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো হঠাৎ করেই কোনো পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সুযোগ ছাড়াই। এমপি সাহেব বারবার চেষ্টা করছিলেন তাঁর মনের অনুভূতিগুলো আমাকে বুঝিয়ে বলতে, আমাকে সেই অনুভূতিগুলোর সাথে পরিচয় করাতে। আর আমি যে কিনা, মায়ের পরে আর কারো কাছ থেকে প্রকৃত ভালোবাসা পাই নি সে হঠাৎ করেই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া অতটুকু টান, যত্ন ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সামলে নিতে পারছিলাম না। বিয়ের ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝতেই পারি নি আমার ভিতরে চলতে থাকা এই অনুভূতিটা কি খুশির ছিলো নাকি কোনো অজানা দুঃখের। বিয়ের দিনে দাঁড়িয়ে আমার হৃদয়টা বিভ্রান্ত অবস্থায় ছিলো। আনন্দ আর শূন্যতার মাঝখানে কোথাও আটকে ছিলাম আমি।”
ইলমা বললো….

—”এখন ভালোবাসেন তো আপনি বড়ভাইয়াকে ভাবী?”
লজ্জায় পিহুর শ্যমরঙা গাল দু’টো লালচে বর্ণ ধারণ করলো মূহূর্তেই। নীরা বললো….
—”ভাবীপু যেভাবে ব্লাশিং করছে এতেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের বড় ভাইয়া ছয় বলে ছয় ছক্কা মে*রে দিয়ে ভাবীপুর মন জয় করে নিয়েছে।”
পিহু কেবল লজ্জাজনক হাসি দিলো। তেজ বললো…
—”ভাবীর পিছনে লাগা ছেড়ে গেইম কন্টিনিউ কর আবার।”
নীরা বললো….
—”ওও তাই তো।”
এই বলে নীরা ইলমার দিকে তাকিয়ে উৎসাহী কন্ঠে বললো….
—“ইলমা আপু! তোমার ট্রুথ হলো, ‘তুমি কি কখনো কাউকে খুব বিশ্বাস করে ঠকেছো?”
ইলমার হাসিমুখটা মূহূর্তেই রূপ বদল করলো। ইলমা ওর দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির করে ছোট্ট করে ‘হ্যাঁ’ বললো। তারপর আর কিছু বললো না।
পিহু বললো…

—“ওকে, এবার অনুর পালা। আমাদের মধ্যকার সর্বকনিষ্ঠ সদস্যকে ট্রুথ দাও নীরা।”
নীরা বললো….
—“অনু, তোমার ট্রুথ হলো, ‘তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?”
অনু চোখ নামানো অবস্থাতেই ধীরস্বরে বললো….
—“আমার মা।”
—”শুধু মা? বাবা কি দো*ষ করলেন শুনি?”
নীরা, পিহু আর নির্ঝর অনুর অতীত সম্পর্কে কিছু জানে না। তাই নীরা যেমন স্বাভাবিক মনোভাব নিয়ে প্রশ্নটা করেছে অনুকে তা যে আসলে স্বাভাবিক না তা তেজ, ইলমা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে। অনু একবার ঢোক গি*লে বললো…..
—”আমার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন না। তাই তাকে আমার প্রিয়র তালিকায় আমি কখনও বসাতে পারি নি।”
ইলমা সঙ্গে সঙ্গে অনুর ডান হাতের উপর হাত রাখলো। নির্ঝর এর ভ্রু কিন্ঞ্চিত কুঁচকে এলো। নীরা, নির্ঝরের জানার আগ্রহ বাড়লো আরো একধাপ। নির্ঝর বললো….

—”মানে?”
সঙ্গে সঙ্গে তেজ বললো….
—”এতো মানে তোকে বুঝতে হবে না। এসব খেলা এখানেই ক্লোজ করা হচ্ছে।”
নীরা বললো….
—”কিন্তু মেজভাইয়া সবে তো ট্রুথ শেষ হলো এখনও ডেয়ার বাকি।”
—”ডেয়ার পরে আরেকদিন খেলবি। ওরা তো থাকছেই কয়েকদিন। একদিনেই সব খেলা শেষ করলে পরে খেলার জন্য কোনো অপশন খুঁজে পাবি না বুঝলি!”
নীরা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললো একবার আর কথা বাড়ালো না। তেজ ইলমাকে বললো….
—”আপনি অনুকে নিয়ে ঘরে যান ইলমা। অনেকসময় হলো বসে আছে ও। এখন একটু বিশ্রাম না নিলে শরীর আবার খারাপ লাগবে।”
ইলমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে অনুকে নিয়ে দোতলায় ওদের জন্য বরাদ্দ করা রুমটাতে চলে গেলো। নির্ঝর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অনুর যাওয়ার পানে। তেজ তা লক্ষ্য করে বললো….

—”জানি তোমাদের মাথায় অনেক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে এইমূহূর্তে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুর সামনে দেওয়া সম্ভব ছিলো না জন্যই ইলমার সাথে ওকে পাঠিয়ে দিলাম।”
পিহু শান্ত স্বরে বললো…
—”ওদের দু’জনের বিষয়েই সবকিছু শেয়ার করো তুমি আমাদের তেজ।”
অতঃপর তেজ সবটা সম্পর্কে ওদের অবগত করলো। অনুর ভ*য়ং*কর অতীত সম্পর্কে জানার পর ততোটাই স্তব্ধ ওরা তিনজন হয়েছে যতোটা কফিশপে ইলমার মুখে শোনার পর তেজ হয়েছিলো। কিয়ৎক্ষণ পিনপতন নীরবতা বিরাজ করলো ড্রয়িংরুম জুড়ে। নীরা বললো….

—”সকাল থেকেই আমি লক্ষ্য করছিলাম অনু কেমন চুপচাপ, হাসে না, সবার সাথে মেশার আগ্রহটা খুব কম। কিন্তু এর পিছনে যে এতো বড় একটা তি*ক্ত কর সত্য লুকিয়ে আছে তা কল্পনাও করি নি।”
নির্ঝর পুরোপুরি থ*ম হয়ে গিয়েছে। কি বলবে, কি অনুভূতি প্রকাশ করবে তা বুঝতে পারছে না সে। পিহু বললো….
—”অনুকে স্বাভাবিক করার দায়িত্ব আমাদের সবাইকে নিতে হবে। ছোট্ট একটা মেয়ে ও। এমন মনমরা হয়ে থাকবে সবসময় আমাদের সামনে এটা আমরা হতে দিতে পারি না। ওকে হাসতে শেখাবো পুনরায় আমরাই। এই দুনিয়ায় ওর আপন বলতে আর কেউ নেই সেই ভুল ধারণা আমরা ভাঙবো।”
তেজ বললো….
—”হুম, আজ অনুকে নিয়ে বিকেলবেলা আমার একজন সাইকিয়াট্রিস্ট বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বন্ধু অভিনবের কাছে যাবো। ওর ট্রিটমেন্টেই ইনশাআল্লাহ অনু নিজের ফেলা আসা স্মৃতিগুলোকে স্মরণ করে আর নিজেকে শারীরিক ভাবে আ*ঘা*ত করবে না।”

—”হুম ঠিক আছে৷ আমরাও যাবো তোমাদের সাথে।”
—”না ভাবী, তোমরা থাকো। এতোজন একসাথে সেখানে গেলে বিষয়টা ভালো দেখাবে না।”
—”আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তোমরাই চেকআপ করিয়ে আসো।”
বিকেলবেলা……
দুপুরের আগেই নীরা নির্ঝরকে সাথে নিয়ে খান ভিলায় গিয়েছিলো নিজেদের জন্য কিছু পোশাক-আশাক আনতে। যেহেতু বাংলো বাড়িতে কয়েকদিন থাকবে ওরা তাই এগুলো প্রয়োজন ওদের। পিহু নীরাকে বলে দিয়েছে ওর জন্য ৪ সেট কাপড় নিতে। কারণ ২ সেট সে ইলমাকে দিবে। নীরাও নিজের জন্য নেওয়ার পাশাপাশি আন্দাজ করে অনুর জন্য পোশাক নিয়েছে।

অনু আর নীরার উচ্চতা ও শারীরিক গঠন প্রায় কাছাকাছিই। দু’জনেই যথেষ্ট চিকন। তবে অনু একটু বেশি৷ তবুও নীরার জামা পড়ায় খুব একটা বেমানান লাগছে না অনুকে। একটা অফ হোয়াইট টপস, আকাশি ও সাদার মিশ্রণে তৈরি ঢিলা-ঢালা জিন্স পড়েছে অনু। সর্ট ওড়নাটা গলায় একটা পেঁচ দিয়ে বুকের উপর ফেলে রেখেছে। অনুর কাঁধ ছুঁই ছুঁই চুল গুলো ছাড়ানো অবস্থাতেই থাকে সবসময়। কোনো ভাবেই বাঁধার মতো নেই চুলগুলোর সাইজ। বাঁধার জন্য আরেকটু বড় হওয়া প্রয়োজন।
ইলমা পিহুর দেওয়া একসেট থ্রি-পিচ পড়েছে। থ্রি-পিসটা সুতি কাপড়ের উপর হাতের কাজ করা। খুব সিম্পল হলেও অসাধারণ ভাবে নীল রংয়ের জামা ও ওড়নার উপর সাদা সুতোয় করা কাজগুলো ফুঁটে আছে। ইলমা ওর কোমর ছুঁই ছুঁই চুলগুলো ঢিলা বিনুনি করেছে।
যেহেতু তেজ, ইলমা, অনু তিন জন একসাথে যাবে তাই বাইকে যাওয়া সম্ভব না বুঝে কার গাড়ি নিয়ে বেড়িয়েছে ওরা অভিনবের চেম্বারের উদ্দেশ্যে একটু আগেই।
বাংলো বাড়িতে এখন পিহু, নীরা, নির্ঝরই আছে কেবল। সারফারাজ সেই যে সকালে বেড়িয়েছিলো তখনও ফেরে নি। পিহু নীরাকে উদ্দেশ্য করে বললো…..

—”নীরা, চলো আমার হাতে হাতে সাহায্য করবে রাতের খাবারটা তৈরি করে ফেলবো আমরা।”
নির্ঝর বললো….
—”ভাবী, আমিও হাত লাগাই তোমাদের সাথে? একা একা বোর ফিল করবো নয়তো।”
পিহু হালকা হেসে বললো….
—”কখনও রান্নাঘরের ছায়াও মা*রিয়েছিলে তোমরা দুই ভাই? এখন কাজ করতে এসে কাজ আরো বাড়িয়ে বসো যদি হুম?”
নীরা বললো….

—”ওরা দুই অ*কর্মঠ কেবল হুকুম-ই করে গিয়েছে ভাবী এই বেলায় এই খাবার চাই ঐ বেলায় ঐ খাবার। তাই ওদের কাউকেই তুমি ভরসা করে ঘরোয়া কাজে হাত লাগাতে দিও না কখনও। আমি ১০০% শিওরিটি দিচ্ছি তোমার কাজ বাড়াবে বই কমাবে না।”
নির্ঝর নীরার মাথার পিছনে হালকা হাতে চা*প*ড় মে*রে বললো…..
—”আল্লাহ মুখ দিয়েছেন কথা বলার জন্য এরমানে এই নয় যে সবসময় মুখ দিয়ে দু’টো লাইন বেশি বের করতে হবে তোর। কখনও কাজে হাত লাগাই নি মানে এই না আজ কাজ করতে গেলে কেবল অ*কাজই করে বসবো!”
নীরা ওর চোখ-মুখ হালকা কুঁ*চকে নিয়ে মাথার পিছনে হাত বোলাচ্ছে। পিহু বললো….
—“তুমি নীরার কথা ছাড়ো নির্ঝর। আমি ভরসা করছি তোমায়। এসো পিঁয়াজ কেটে দাও আমায় তুমি আগে।”
নির্ঝর রান্নাঘরে প্রবেশ করে কাটিং বোর্ডটা সামনে নিয়ে পেঁয়াজের পাতলা খোসাটা হাত দিয়ে ছাড়াতে ছাড়াতে বললো….

—”এতো সহজ কাজটাই দিলেন আপনি আমাকে ভাবী! ঠিক আছে করছি।”
নীরা পাশ থেকে ছু*রিটা নির্ঝরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো….
—”যদি চোখ থেকে এক ফোঁটাও পানি না ফেলে তুমি এই সব কয়টা পেঁয়াজ কাটতে পারো ছোট ভাইয়া তাহলে তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।”
নির্ঝর বললো….
—”নিজের পায়ে কিন্তু কুঁ*ড়ো*লটা নিজেই মা*র*লি তুই নীরা। পরে যদি কথার খে*লাপ করিস তাহলে তোর মাথায় যে টাকর সমান চুলগুলো আছে সেগুলোও ছাটাই করে তোকে মহিলা গা*জনি বানিয়ে দিবো মনে রাখিস।”
নীরা জানে নির্ঝরের পক্ষে সম্ভব না কান্না না করে পেঁয়াজ সব কাটা তাই সে ফুল কনফিডেন্সের সাথে বললো….
—”হুম হুম ঠিক আছে, করবো না কথার খেলাপ। আগে কেটেই দেখাও সবগুলো পেঁয়াজ কান্না না করে।”
নির্ঝর ওর হাতে থাকা পেঁয়াজ ও ছু*রি*টা কাটিং বোর্ডের উপর রেখে বললো….

—”একটু দাঁড়া আমি আসতেছি ২মিনিটে।”
এই বলে নির্ঝর দৌড় লাগালো বাহিরের দিকে। নীরা পিছন থেকে ডেকেও পাত্তা পেলো না। পিহু বললো….
—”নীরা! আমার মনে হয় নির্ঝর তোমাকে হারানোর জন্য ফুল প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামবে বলে বাহিরে গেলো।”
নীরা পিহুর কথা হাওয়ার তালে উড়িয়ে দিয়ে বললো…..
—”কি যে বলো না ভাবীপু! বড় বড় এক্সপার্টটা পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে কেঁদে ফেলে সেখানে তো কখনও এসবের ধারের কাছেও না যাওয়া আমার গু*ন*ধর ছোট ভাইয়া। ওর কাছে হারার প্রশ্নই আসে না।”

ইলমা ও অনুকে নিয়ে অভিনবের প্রাইভেট ক্লিনিকের সামনে এসে গাড়ির ব্রেক কষলো তেজ। অভিনব তেজকে মেসেজ করে বলে দিয়েছিলো সময় ও ঠিকানা। তেজ বললো….
—”নেমে দাঁড়ান আপনি অনুকে নিয়ে আমি গাড়িটা পার্ক করে আসছি।”
ইলমা ও অনু গাড়ি থেকে নামলো। তেজ পার্কিং এ গাড়িটা রেখে এসে ওদের দু’জনকে নিয়ে ক্লিনিকের ভিতরে প্রবেশ করলো। তেজ আজ একটা সাদা রংয়ের ফিটেড শার্ট পড়েছে। সাথে কালো রংয়ের স্লিম প্যান্ট, লেদারের শু আর বাম হাতে একটা মেটাল স্ট্র্যাপের ক্লাসিক ঘড়ি পড়েছে। চুলগুলো হালকা এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে কপালে উপর। যথেষ্ট সুদর্শন লাগছে ওকে দেখতে। অভিনবের চেম্বারের বাহিরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করতেই ভিতর থেকে পুরুষালি কন্ঠে ‘ভিতরে আয় তেজ’ বাক্যটা শুনতেই দরজা খুলে ওরা তিনজন ভিতরে প্রবেশ করলো।

অভিনব এগিয়ে এসে তেজকে জড়িয়ে ধরলো। ইলমা আর অনুর দৃষ্টি পড়লো ওদের দু’জনের উপর। অভিনব তেজকে ছেড়ে দাঁড়াতেই ইলমা অভিনবকে একটু ভালো ভাবে লক্ষ্য করলো। ফর্সা শরীরে হালকা নীল শার্টটা অভিকে দারুণ মানাচ্ছে। সাথে স্লিম ফিট ট্রাউজার রয়েছে। শার্টের উপর দিয়ে পরিপাটি সাদা একটা অ্যাপ্রন, গলায় একটা স্টেথিস্কোপ ঝুলানো আছে। বাম হাতের কবজিতে সিম্পল রোলেক্স এর ঘড়ি আর চোখে চারপোণা ফ্রেমের একটা চশমা রয়েছে অভির। পরিপাটি সাইড পার্টেড চুলের স্টাইল দেখে যেকেউ বুঝবে অভি স্বভাবে ততোটাই শান্ত যতোটা ওকে দেখতে শান্ত মনে হচ্ছে।
তেজ ও অভি একে-অপরের সাথে কুশল বিনিময় করলো। অতঃপর তেজ ইলমা ও অনুর সাথে অভির পরিচয় করিয়ে দিলো। অনু পুরো চেম্বারটাতে একবার নজর বুলালো। চেম্বারটা খুব বেশি সাজানো না। অফ হোয়াইট রঙ করা হয়েছে দেওয়ালে, দেওয়ালের কর্ণারে কর্ণারে কিছু কৃত্রিম প্ল্যান্ট লাগানো রয়েছে, একপাশে একটা বইয়ের তাক, একটা ছোট টেবিল ও সোফা সেট রয়েছে যেখানে ৪-৫ জন মানুষ অনায়াসে বসতে পারবে। পাশেই একটা কাঁচের দেওয়াল তোলা আছে। দেওয়ালের ওপাশে একটা হেলানো চেয়ার সহ আরো খুঁটি নাটি অনেক জিনিসপত্র রাখা আছে। সেগুলো নাম অনু জানে না। অনুকে একবার দেখে নিয়ে অভি বললো…..

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৪)

—”অনু, তুমি আমার ছোট হবে তাই তুমি করেই বলছি।”
অনু মাথা নাড়লো হালকা ভাবে। অভি বললো….
—”তেজ তুই ইলমাকে নিয়ে এখানেই বস। আমি অনুকে নিয়ে কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে যাবো। এখান থেকে তোরা সবটাই দেখতে পারবি।”
তেজ ছোট্ট করে ‘আচ্ছা’ বললো। ইলমা অনুকে বললো….
—”ভয় লাগছে?”
অনু বললো….
—”না, আপা।”
ইলমা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললো কেবল। অতঃপর অভি অনুকে নিয়ে কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে চলে গেলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩০