Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩০

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩০

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩০
মাইশা জান্নাত নূরা

অভিনব কাঁচের দরজাটা ভেতর থেকে আলতো করে বন্ধ করলো। বাইরে থেকে তেজ আর ইলমা স্পষ্ট সব দেখতে পাচ্ছে কিন্তু কোনো শব্দ শুনতে পারছে না। কারণ সব রোগীরই প্রাইভেসি বলতে একটা বিষয় আছে৷ আবার কিছু অভিভাবক আছেন যারা রোগীর চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় তাদের মুখ থেকে বের হওয়া সকল সত্য কথার ভার নিতে না পেরে সিনক্রিয়েট করে বসেন। তাই অভিনব নিজ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট এর জন্য এই আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন৷ অভি ওর ফোন থেকে তেজকে একটা টেক্সট করে ফোনটা সাইডে টেবিলের উপর রাখলো। টেক্সটের শব্দ কর্ণপাত হতেই তেজ ওর ফোনটা চেক করলো….

“তোর হাতের ডান পার্শে থাকা মিনি ওয়ারড্রবের ১ম ড্রয়ারের ভিতর ব্লুটুথ কানেক্টেড দু’টো হেডফোন রাখা আছে। হেডফোন দু’টো বের করে তোরা দু’জন পড়ে নে। অনুর সাথে হওয়া আমার সব কথপোকথন শুনতে পারবি এটার সাহায্যে।”
আজ অভিনবের কাছে আসার আগেই তেজ অনুর অতীত সম্পর্কে ও অনু যখন পুরোনো স্মৃতি মনে করে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেরই শারীরিক ক্ষ*তি করে বসে সেইসব সম্পর্কে অভিকে অবগত করেছে।
তেজ অভির কথানুযায়ী ওয়ারড্রব থেকে হেডফোন দু’টো বের করে একটা নিজে পরলো ও অন্যটা ইলমাকে পড়তে বললো। কাঁচের দেওয়ালের ওপারে থেকে অভি শান্ত স্বরে অনুকে বললো…..

—”চেয়ারটাতে বসে পড়ো।”
এপাশ থেকে এখন তেজ ও ইলমা দু’জনেই ওদের কথপোকথনগুলো স্পষ্ট শুনতে পারছে। অনু অভির কথামতো ওর সামনে থাকা হেলানো চেয়ারটাতে বসলো। চেয়ারের দু’হাতল নিজের দু’হাত দ্বারা শক্ত করে চেপে ধরলো অনু। অনুর মুখশ্রী জুড়ে ভীতির ছাপ না থাকলেও কিছুটা অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। অভিনব ওর সামনে থাকা স্টুলটা টেনে এনে অনুর মুখোমুখি বসে ওর চোখে চোখ রেখে হালকা হেসে নরম ও ধীর গলায় বললো……
—“অনু, তুমি চাইলে আমাকে অভি ভাইয়া বলতে পারো।ডাক্তার সাহেব শব্দটাতে আমি খুব একটা কম্ফোর্ট ফিল করি না।”
অনু কিছুটা অবাক কন্ঠে বললো…..

—“ভাইয়া?”
—“হুম। কারণ একজন ডাক্তারের তার পেশেন্টের সাথে প্রথমত মনের টান তৈরি করতে হয় এতে পেশেন্ট তার চিকিৎসায় নিয়জিত ডাক্তারকে আপন মনে করতে পারে আর বিনা সংকোচে নিজের ভিতরে চেপে থাকা সকল কথা শেয়ার করতে পারে। তারপরই তো ডাক্তারটি পারেন তার পেশেন্টকে সাহায্য করতে! তুমি চাও তো আমার সাথে ফ্রী হতে?”
অনু ধীরে মাথা নেড়ে বললো…..
—”হুম চাই।”
অভি ওর পাশেই টেবিলের উপর থেকে একটা ছোট স্ট্রেস বল নিয়ে অনুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো…..
—“এটা ধরো। যখনই নিজের ভিতরে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করে অনেক রাগ কাজ করবে, চিন্তা হবে তখনই এটার উপর প্রেসার প্রয়োগ করবে। এতে ভালো লাগবে।”
অনু স্ট্রেস বলটা হাতে নিলো। কয়েক সেকেন্ড বলটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর ধীরে কয়েকবার চাপ দিলো।
বাইরে বসা ইলমা ফিসফিস করে বললো….

—“অনু ভিষণ চাপা স্বভাবের। খুব সহজে কারোর সাথে মিশে যেতে পারে না।”
তেজ ধীরস্বরে বললো….
—“অভির কাজই এটা ওর কাছে আসা সকল পেশেন্টের বিশ্বাস অর্জন করে তার সাথে মিশে গিয়ে তার ট্রিটমেন্ট করা। অনেক দক্ষ অভি ওর নিজের কাজে। চিন্তা করবেন না আপনি।”
ইলমা প্রতিত্তুরে কেবল একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
অভি অনুকে বললো…..
—”চোখ বন্ধ করো। আমি যতোক্ষণ পর্যন্ত খুলতে বলবো না খুলবে না।”
অনু চোখ বন্ধ করলো। অভি টেবিলের উপর থেকে নোটপ্যাড ও একটা কলম নিলো। অনুর দিকে তাকিয়েই অভি বললো……

—“অনু, তোমার কি এখন ভয় লাগছে?”
অনু ধীর ও স্বাভাবিক গলায় বললো…..
—“ভয় লাগছে না, কিন্তু কিছুটা অস্বস্তি কাজ করছে ভিতরে ভিতরে।”
অভি অনুর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে নিজের কোলের উপর থাকা নোডপ্যাডটাতে কিছু লিখছে। অভি বললো….
—“ঠিক আছে। এই মূহূর্তে কিছুটা অস্বস্তি লাগা নরমাল বিষয়। এবার বলো, তুমি কি মাঝে মাঝে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করে খুব ভয় পেয়ে যাও?”
অনু কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর বললো….

—“হ্যাঁ।”
—“এই ভয়টা ঠিক কোন বিষয়ে চিন্তা করার কারণে বেশি হয়?”
অনু ঠোঁট কামড়ে বললো….
—“যখন আমার পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে তখন।”
অভি খুব সতর্কভাবে প্রশ্ন করলো…..
—“তুমি কি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখো?”
—“হুম।”
—“আশেপাশে হঠাৎ কোনো শব্দ হলে ভয় পেয়ে যাও?”
—“হ্যাঁ।”
—“নিজেকে কষ্ট দিলে ভালো লাগে? মানে শারীরিক ভাবে নিজেকে ক্ষ*ত-বি*ক্ষ*ত করলে কি শান্তি অনুভব হয়?”
অনু ওর হাতে থাকা স্ট্রেস বলটা খুব শক্ত করে চেপে ধরে বললো….

—“হ্যাঁ।”
অভি খুব নরম গলায় বললো…..
—“তুমি কি জানো এমনটা করার পিছনে আসলে কারণ কি?”
—”না।”
—”যখন আমাদের মন ও মস্তিষ্কের ভিতরে জমে থাকা ক*ষ্ট গুলো বাহিরে বের হওয়ার জন্য কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না তখনই আমরা নিজের ক্ষ*তি করে শান্তি খুঁজে পাই।”
অনু একবার ঢোক গি*ললো। ওর বুঁজে থাকা চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু। অভি তা লক্ষ্য করেছে ঠিকই। কিন্তু এ বিষয়ে কিছু বললো না সে। অনু আস্তে আস্তে ওর হাতে থাকা স্ট্রেস বলটাতে চাপ দিচ্ছে। অভি জিজ্ঞেস করলো….

—“আজকে বা গত কয়েকদিনের মাঝে তুমি নিজেকে আ*ঘাত করার চেষ্টা করেছিলে?”
—“আজ করি নি। তবে গতকাল নিজের হাতে কাঁ*মড় বসানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারি নি ইলমা আপা আটকে দিয়েছিলো।”
—“এখন এমনটা করতে ইচ্ছা করছে?”
—“না।”
আরো কিছুসময় অনুর সাথে এভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললো অভি। অতঃপর বললো….
—“অনু, তোমার ব্রেন অতীতে বড় কোনো বিষয়ে ভয় পেয়েছিলো। তাই এখনো ব্রেনটা নিজেকে সেভ রাখতে মাঝে মাঝে ভয় এর রূপ নিয়ে তোমার মাঝে উপস্থিত হয়। এটা কোনো জটিল সমস্যা না। একটা সাধারণ একটা ট্রমা। এই ট্রমা থেকে পুরোপুরি বের হওয়ার জন্য তোমাকে তিনটা জিনিস করতে হবে।”
কথাগুলো বলছে আর নিজের নোটপ্যাডে কিছু লিখছে অভি। অনু চোখ মেলে তাকালো অভির দিকে। অভি আবারও বললো…..

—”১️- নিয়মিত থেরাপি নিতে হবে, দুই আমি যে ঔষধ গুলো লিখে দিবো সেগুলো নিয়মিত খেতে হবে, ডোজ কমপ্লিট করতে হবে, আর ৩য় তো তোমায় আমায় প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এরপর কখনও যদি তোমার নিজের ক্ষতি করতে ইচ্ছে করে তাহলে তুমি সর্বপ্রথম তোমার ইলমা আপাকে জানাবে।”
অনু একটু ভেবে বললো….
—“দিলাম প্রতিশ্রুতি।”
এতোসময়ের ওদের কথপোকথন শোনার পর বাইরে বসা তেজ ও ইলমার ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।তেজ ধীরস্বরে বললো….
—“অনু ভালো হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
অনুর উপর ১ম দিনের প্রয়োগকৃত সবগুলো সেশন শেষ হলে অভি দরজা খুলে বললো….

—“বাহিরে চলো অনু। আজকের মতো আমরা এখানেই বিরতি ঘোষনা করছি।”
অনু বাইরে আসার আগেই তেজ ও ইলমা নিজেদের কান থেকে হেডফোনটা খুলে জায়গা মতো রেখে দিয়েছে। অতঃপর অনু ইলমার পাশে এসে দাঁড়াতেই ইলমা শান্ত স্বরে বললো…..
—”কেমন লাগলো তোমার অনু?”
অনু হালকা হেসে বললো….
—”অভি ভাইয়া খুব ভালো। ভালো লেগেছে আমার আপা।”
অভি স্মিত হেসে বললো….
—“প্রথম সেশন ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর জন্য বিশেষ ভাবে ধন্যবাদের প্রাপ্যতা অনুই রাখে। ও যদি আমার সাথে সহযোগীতা পূর্ণ আচারণ না করতো তাহলে এটা সম্পন্ন হয় সম্ভব ছিলো না। আর এখন থেকে নিয়মিত ফলোআপ করতে হবে।”
তেজ বললো….

—”ইলমা আপনি অনুকে নিয়ে গেইটের সামনে দাঁড়ান আমি আসছি একটু পর।”
ইলমা ‘আচ্ছা’ বলে অনুকে নিয়ে বাহিরে চলে গেলে তেজ অভিকে বললো…..
—”চিন্তার কোনো কারণ নেই তো বন্ধু?”
অভি বললো….
—”না, আপাতত চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে ওকে সামলে উঠার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। হাসিখুশি পরিবেশের মাঝে রাখতে হবে। কোনোভাবেই মানসিক চাপ দেওয়া যাবে না। ওর সামনে কখনও ওর পুরোনো দিনের কোনো বিষয় নিয়ে কথা তোলা যাবে না।”
তেজ মাথা নেড়ে বললো…..

—“ঠিক আছে, এই দায়িত্ব আমি নিলাম।”
—”কাল তো আমাকে বাহিরে যেতে হতো ৭ দিনের জন্য। এরপর আমার বউয়ের ডেলিভারি টাইম ঘনিয়ে আসবে। সেইসময়টা আমি চেম্বারে বসবো না বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু অনুর যা অবস্থা দেখলাম ওর ট্রিটমেন্ট এর ভার আমি অন্য কাউকে দিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারবো না। তাই আমি আমার বাহিরে যাওয়ার ফ্লাইটটা কেন্সেল করেছি। পরের মাসে চলে যাবো। এই মাসটা টানা অনুর সেশন হলে ওর নিজের প্রতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।”
—”তুই অনুর বিষয়টাকে এতোটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবি ভাবি নি। ধন্যবাদ রে।”
—”আরে ধুর বেডা, তোর সাথে আমার ফ্রেন্ডশিপ কি আজ-কালের যে এসব ধন্যবাদ-টন্যবাদের ফর্মালিটি মানতে হবে!”
তেজ হেসে বললো….

—”তুই শা*লা আগেই বিয়ে করে নিলি। ছক্কা মে*রে বাপ ও হতে যাচ্ছিস। আরেকটু সবুর রাখলে তোর ঘাড়ে আমার বোনটাকে ঝুলিয়ে দিতাম।”
—”নীরার কথা বলছিস? ঐ পুঁচকিটা যে ২ বছর আগে আমি তোদের বাড়ি গেলে আমার আশে-পাশে ঘুরঘুর করতো!”
—”পুঁচকি আর পুঁচকিটি নেই। বড় হয়ে গিয়েছে। দায়িত্বশীল হয়ে গিয়েছে।”
—”হুম বয়স যতো বাড়বে ততো ম্যচিউরিটি আসবে। নীরা কি জানে আমার বিয়ের কথা?”
—”না।”
—”কি রে! নীরার কথা বলতে গিয়ে তোর মুখের রং এমন বদলে গেলো কেনো? কি হয়েছে?”
তেজ একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরার বিষয়ে সবটা খুলে বললো অভিকে। অভি ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়েছে। রাগে কপাল ও ঘাড়ের সূক্ষ্ম শিরাগুলো হালকা ফুলে উঠেছে। অভি বললো…..

—”এই কাজটা যে হা*রা*মির বাচ্চা করেছে ওকে খুঁজে বের করতে এতো সময় লাগছে কেনো তোদের?”
—”কোনো প্রমাণ তো নেই আমাদের কাছে। কিভাবে খুঁজে বের করবো?”
—”তো এভাবেই পার পেয়ে যাবে ঐ শ*য়*তান?”
—”সারফারাজ ভাই কোনো না কোনো উপায় ঠিক বের করবেন।”
—”আচ্ছা। আমাকে আপডেট জানাস। নীরার ছেলেকে কবে বাংলাদেশি আনার ব্যবস্থা করবি তোরা?”
—”সারফারাজ ভাইয়ের থেকে শুনতে হবে। ভাইয়া মনে হয় ইতিমধ্যে নির্বাণকে দেশে আনার সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে ফেলেছে।”

—”নিবার্ণকে আনার পর একদিন আমার এখানে আনিস। বাচ্চাটাকে কোলে নেওয়ার ইচ্ছা জেগেছে অনেক।”
—”আচ্ছা আনবো। এখন তাহলে আসি দোস্ত।”
অভি ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো। তেজ বেড়িয়ে যেতেই অভি ওর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়লো। এসি চলছে ফুল পাওয়ারে তবুও কপাল ও গলা বেয়ে ঘাম ঝরছে। অভি ওর শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করলো। উন্মুক্ত হলো ওর ফর্সা লোমশহীন বুকটা। অভির বুকের বামপার্শে কিছুটা নিচে এক ইন্ঞ্চি সম জায়গা জুড়ে থাকা লালচে গোল জন্মদাগটা জ্বল জ্বল করছে৷ অভি ওর কপালের উপর হাত ভাঁজ করে দু’চোখ বন্ধ করে নিলো৷

তেজ ক্লিনিকের বাহিরে আসতেই ইলমা ভ্রু কুঁচকে বললো….
—”দাঁড়িয়ে রেখে রেখে আমাদের পায়ে ব্য*থা ধরানোর পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন আগে বললেই হতো!”
তেজ বিরবিরয়ে বললো….
—”বউ হতে যদি তাহলে নিজ হাতে পা মালিশ করে ব্য*থা সারিয়েও দিতাম।”
—”এখন আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি বিরবির করছেন? গাড়িটা আনবেন নাকি অটো ধরতে হবে আমাদের!”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে বললো….
—”আনছি তো।”
এই বলে তেজ ছুট লাগালো পার্কিং সাইড এর দিকে গাড়ি আনার জন্য। কিয়ৎক্ষণ পর গাড়িটা এনে ইলমা ও অনুর সামনে দাঁড় করালে ইলমা আর অনু একত্রে পিছন সিটে বসে পড়লো। তেজ লুকিং গ্লাসটা এমন ভাবে ঘুরিয়ে রাখলো এখন গ্লাসে ইলমার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। তেজ গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললো…..

—”আমাকে ড্রাইভার বানিয়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত?”
ইলমা ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো….
—”এই গাড়ি চালিয়ে কি নিজেকে পাইলট মনে করছেন আপনি? পাইলট বলে সম্বোধন করতে হবে আপনাকে?”
তেজ নাক ও ঠোঁট হালকা ছি*ট*কালো ইলমার কথায়। অতঃপর গাড়ি স্টার্ট করে বিরবিরিয়ে বললো…..
—”আল্লাহর এই বান্দির মুখ তো মুখ না তিতকরলা আর নীমপাতার সংমিশ্রণে তৈরি কোনো এটম বো*ম। যখনই ফাঁ*টে একেবারে ইজ্জতের দফা-রফা করে ছাড়ে।”
ইলমা অনুর সাথে টুকটাক বিষয়ে কথা বলছে। তেজ গাড়ি ড্রাইভ করছে আর একটু পরপর আঁড়চোখে লুকিং গ্লাসের দ্বারা ইলমাকে দেখছে। ইলমা বিষয়টা কয়েকবার নোটিশ করেও কিছু বললো না।
বেশকিছুক্ষণ পর ওরা বাংলো বাড়িতে এসে পৌঁছালো। ইলমা অনুকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। অতঃপর ইলমা তেজের সিটের পাশের জানালায় দু’টো টোকা দিতেই তেজ জানালার গ্লাস নামিয়ে দিলো। ইলমা বললো….

—”পাইলট সাহেব এরপর থেকে আপনার এই গাড়ির মতো দেখতে আধুনিক প্লেনটা চালানোর সময় সামনের রাতার দিকে নজর রাখবেন। আয়নার সাহায্যে পিছনে বসা মেয়েদের দিকে না।”
এই বলে ইলমা অনুকে নিয়ে চলে গেলো ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তেজ ইলমার যাওয়ার পানে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো….
—”পছন্দ করি জন্যই তোর অপ*মান গুলো হজম করে নেই নয়তো কবেই থা*পড়া*ইয়া তোর কান-মান লাল কইরা দিতাম বেদ্দ*প ছেঁ*ম*ড়ি।”

বাংলো বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই নির্ঝরকে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে পায়চারি করতে দেখলো ইলমা ও অনু। এগিয়ে এসে ইলমা বললো…..
—”আজ আবার আপনার কি হলো?
নির্ঝর পায়চারি থামিয়ে বললো….
—”এসেছেন আপনারা!”
ইলমা বললো….
—”না, আসবো ভাবছিলাম। পারমিশন মিলবে কি আসার?”
—”ওমা, আপনার মেজাজ এমন তু*ঙ্গে উঠে আছে কেনো?”
—”উঠার শখ হয়েছে তাই উঠেছে।”
—”অনু কেমন আছেন এখন আপনি?”
অনু ছোট্ট করে ‘ভালো আছি’ বললো। ইলমা অনুকে বললো….
—”তুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হও অনু। আমি তোমার খাবারটা রুমেই নিয়ে আসছি।”
অনু ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে দোতালায়। তখুনি পিহু আর নীরা একত্রে ওদের রুম থেকে বেড়িয়ে ড্রয়িংরুমে এলো। পিহু বললো…..

—”ডাক্তার কি বললো ইলমা?”
—”সেশন চালিয়ে যেতে হবে ভাবী। কিছু ঔষধ লিখে দিয়েছে সেগুলো খাওয়াতে হবে ঠিকভাবে। আর বলেছেন সেশন চলা কালীন এই সময়টাতে অনুকে সবসময় হাসিখুশি রাখতে হবে, মানুষের মাঝে রাখতে হবে। একলা থাকতে দিলেই পুরোনো কথা মনে করবে ফলস্বরূপ ওর মাথায় প্রেসার পড়বে তখন আবারও নিজের ক্ষ*তি করার চেষ্টা করতে পারে ও।”
পিহু ভাবুক স্বরে বললো……
—”হুম বুঝতে পারছি। ডাক্তার যেভাবে চলতে বলেছেন সেভাবেই চলতে হবে। অনুকে সবসময় খুশি রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। বাচ্চা মেয়েটাকে ওভাবে একলা-একা গু*ম*ড়ে গু*ম*ড়ে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারি না।”
—”হুম।”
—”খাবার রান্না করে রেখেছি আমি আর নীরা মিলে। বেড়ে দিচ্ছি রুমে নিয়ে যাও। দু’জনে একসাথে খেয়ে বিশ্রাম নিও তোমরা।”
—”আচ্ছা ভাবী।”
অতঃপর পিহু রান্নাঘরে গিয়ে অনু আর ইলমার জন্য খাবার বাড়লো বাটিতে। ট্রে-তে সব খাবার সুন্দর করে গুছিয়ে ইলমাকে দিলে ইলমা তা নিয়ে উপরে চলে গেলো।
পিহু, নীরা আর নির্ঝর সোফায় বসে পড়তেই তেজ ভিতরে প্রবেশ করলো। ড্রয়িংপ্লেসে এসে দাঁড়িয়ে বললো….

—”রুমে চলে গিয়েছে ওরা?”
পিহু বললো….
—”হুম।”
তেজ নীরার দিকে একটা প্যকেট এগিয়ে দিয়ে বললো…..
—”এর ভিতর অনুর সব ঔষধ রাখা আছে। ফেরার পথে নেওয়ার কথা স্মরণ ছিলো না। এখন আবার ফার্মেসিতে গিয়ে নিয়ে আসলাম। দিয়ে আয় ওদের রুমে। প্রেসক্রিপশনটা ইলমাকে বুঝিয়ে দিস।”
নীরা ‘আচ্ছা’ বলে প্যকেটটা নিয়ে চলে গেলো দোতলায় ইলমা, অনুর রুমের দিকে। তেজ নির্ঝরের পাশে বসে ওর কাঁধের উপর হাত রেখে বললো…..
—”ভাবী, তোমার গুণ*ধর এই দেবরটা তো আরেকটা ঝা*মে*লা পাঁ*কিয়ে বসে আছে। কিভাবে মেনেজ করবো আমি ভেবে পাচ্ছি না তাই তোমাকে বলবো বলে ঠিক করেছি। তুমি ভাইয়াকে বলে এই বিষয়টা মেনেজ করবে।”
তেজের কথা শুনে নির্ঝরের চোখের আকৃতি বড় হয়ে গেলো। নির্ঝর বললো….

—”তেজ ভাই! আমার সা*ন্ডে-মা*ন্ডে ক্লোজ করার জন্য এভাবে উঠে পরে লাগবে তুমি আমি তো ভা…!”
নির্ঝরকে পুরো কথা শেষ করতে দিলো না তেজ। নির্ঝরের মুখ এক হাতে চেপে ধরে বললো….
—”তুই চুপ থাক। এই বিষয় হে*ন্ডে*ল করা আমার একার কর্ম না। তাই ভাইয়াকে জানাতেই হবে।”
তখুনি মূল দরজা পেরিয়ে সারফারাজ ভিতরে প্রবেশ করে বললো…..
—”কি হয়েছে? কি জানানো দরকার আমাকে?”
সারফারাজের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্র নির্ঝরের কলিজা শুকিয়ে মরুভূমি রূপ ধারণ করলো যেনো। সারফারাজ ভাড়ি কদম ফেলে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালো। তেজ নির্ঝরের মুখের উপর থেকে হাত সারতেই নির্ঝর সটাম উঠে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”তে-তেমন কিছু না বড় ভাইয়া। তেজ ভাই এমনিই ব….!”
সারফারাজকে ওর পান্ঞ্জাবির দু’হাতা গোটাতে দেখে নির্ঝর আর কথা শেষ করতে পারলো না। শুকনো ঢো*ক গি*লে ধপ করে সোফার উপর বসে পড়ে পিহুকে বললো….
—”ভাবী প্লিজ বাঁচিয়ে নিও আমায় এবারের মতো। ভাইয়ার হাতে জু*তোর বা*রি খেতে চাই না আমি।”
পিহু চোখের ইশারায় নির্ঝরকে আস্বস্ত করে বসা থেকে উঠে সারফারাজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে বললো…..

—”সারাদিন পর বাহির থেকে ফিরলেন রুমে চলুন ফ্রেশ হবেন। তারপর কিছু খাবেন। তারপর ঠান্ডা মাথায় ওদের সব কথা শুনবেন না হয়।”
সারফারাজ পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”আবারও এই বাঁ*দর দু’টোর সঙ্গ দিয়ে বাঁচিয়ে নিচ্ছো তুমি বউ?”
পিহু সারফারাজের পান্ঞ্জাবির গুটিয়ে রাখা হাতা দু’টোর ভাঁজ স্বযত্নে খুলতে খুলতে বললো….…
—”না তো। আমি আমার স্বামীর ক্লান্ত মুখটা দেখছি। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন তা বুঝতে পারছি। তাই বউয়ের কর্তব্য পালন করার কথা বলছি।”
সারফারাজ তেজ আর নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…..

—”এখানে বসে থাকবি দু’টো। এক চুল নড়লে অবস্থা খারাপ আছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি এক্ষুণি।”
পিহু এবার ‘আরে আসুন তো’ বলে সারফারাজের হাত ধরে টানতে টানতে রুমের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করলো। রুমে আসার পর পিহু দরজার ছিটকিনি লাগাতেই সারফারাজ সঙ্গে সঙ্গে পিহুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। পিহুর পিঠ এই মূহূর্তে দরজার সাথে ঠেকানো অবস্থায় আছে। আর সারফারাজ পিহুর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতোটা কাছাকাছি যে একে-অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট ভাবে শোনা ও অনুভব করা সম্ভব। পিহু বললো….
—”ক-কি-কি করছেন? আপনাকে তো বললাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুমে এনেছি। গি-গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন।”
সারফারাজ পিহুর দিকে ঝুঁকে এলো খানিকটা। হাত দু’টো পিহুর দু’পাশে দরজার উপর রেখেছে। পিহু এখন সারফারাজের বাহুতে বন্দীনি অবস্থায় আছে। পিহু নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। মূহূর্তেই একরাশ লজ্জা ও অন্যরকম অনুভূতিরা ঘিরে নিয়েছে পিহুকে। সারফারাজ পিহুর হালকা কুঁচকে যাওয়া লাল আভা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো…..

—”বউ আজ নিজ থেকে টেনে রুমে নিয়ে এসেছে আমায়। এই সুযোগ কিভাবে হাত ছাড়া করবো আমি? একটুসখানি আদর-সোহাগ তো বিনিময় হিসেবে ডিজার্ভ করোই তুমি বউ। বলো…!”
পিহুর হৃদপিণ্ডে বেগ বেড়েছে অনেকটা। পিহু ঠোঁট কাঁ*মড়ে বললো….
—”না না লাগবে না আমার কোনো বিনিময়-টিনিময়।”
—”কোথায় যেনো শুনেছি বউরা না বললে সেটার অর্থ হ্যা ধরতে হয় আর হ্যা বললে…..!”
সারফারাজকে বাকি কথাটুকু শেষ করতে না দিয়েই পিহু সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”হ্যা বললে না তাই তো? তাহলে হ্যা বলছি। হ্যা, হ্যা লাগবে আমার আপনার আদর-সোহাগ। এবার তো ছাড়ুন আমায়!”
সারফারাজ হেসে বললো….

—”কখন বললাম হ্যা বললে না ধরতে হয়?”
—”না বললে হ্যা ধরা হলে হ্যা বললো না ধরা হবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
—”উহুহ, না বললে হ্যা ধরা গেলেও হ্যা বললে হ্যা-ই ধরতে হয়।”
সারফারাজের এরূপ যুক্তি শুনে পিহুর মুখ হা হয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। সারফারাজ দু*ষ্ট হাসি দিয়ে বললো……
—”তুমি প্রস্তুত তো বউ আমার আদর-সোহাগের ভার নেওয়ার জন্য?”
পিহু কিছু বলার আগেই সারফারাজ পিহুর ঠোঁটে ছোট্ট করে একবার চুমু খেয়ে বললো…..
—”বউ আমার খুশিতে কথা বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছে। চলো বউ আমারও আর তর সইছে না।”
এই বলে সারফারাজ পিহুকে পাজাকোলে তুলে নিলো। পিহু সঙ্গে সঙ্গে সারফারাজের বুকে কিল-ঘুষি মা*রতে শুরু করলো। আর বললো…..

—”এই না না, নামান আমাকে। অ*সভ্য, যাচ্ছে-তাই লোক কোথাকার। আমাকে যা – তা যুক্তি দেখিয়েছেন আপনি। এসব যুক্তি আমি মানি না।”
সারফারাজ কি আর শোনার অবস্থায় আছে! সে পিহুকে বিছানায় আলগোছে ফেলতেই পিহু চোখের পলকে দ্রুত বিছানার ওপাশে নেমে গেলো। সারফারাজ বললো…..
—”কি হলো বউ নামলে কেনো? কাছে আসো। এখন কি এসব করে সময় নষ্ট করার সময় বলো!”
পিহু বললো….
—”একদম না। একদম আমার কাছে আসবেন না। তাহলে কিন্তু এই যে এই বালিশ গুলো সব ছুঁ*ড়ে মা*রবো আমি আপনার উপর।”
সারফারাজ এগিয়ে যেই না পিহুর এপাশে আসবে ওমনি পিহু ঘুরে ওপাশে চলে গেলো। সারফারাজ বললো…..
—”মুরগীর বাচ্চার মতো সাইজ নিয়ে কতোক্ষণ এভাবে এপাশ-ওপাশ করবে তুমি বলো? ক্লান্ত হয়ে ধরা দিতেই হবে আমায়। তখন কিন্তু ডোজের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলছি।”
পিহু বললো…..

—”গন্ডারের মতো ভাড়ি শরীর আপনার। ক্লান্ত আমি না আগে আপনি হবেন।”
—”তাই নাকি! দেখা যাক তাহলে কে জিতে আর কে হারে।”
এই বলে সারফারাজ পিহুকে ধরার চেষ্টা করলো ওভাবেই এপাশ-ওপাশ ঘুরে কিন্তু পারলো না। এরপর হুট করেই সারফারাজ ওর বুকের বাম পাশে হাত চেপে ধরে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে বললো……
—”আহহহ, বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠলো! বউ, কই তুমি! পানি দাও আমায়। ব্য*থা করছে খুব।”
পিহু হঠাৎই সারফারাজের এমন অবস্থা দেখে ভ*য় পেয়ে গেলো খানিকটা। দ্রুত এগিয়ে এসে গ্লাসে পানি নিয়ে সারফারাজের পাশে বসে বললো…..

—”কি হলো আপনার? হুট করে বুকে ব্য*থা করছে কেনো? এভাবে ছুটলেন আমার পিছনে তাই? খুব অসুবিধা হচ্ছে নাকি? এমপি সাহেব, পানিটুকু পান কর…..!”
পিহু পুরো কথা শেষ করার আগেই সারফারাজ পিহুকে ধরে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর উপরে উঠে নিজের শরীরের হালকা ভার ছেড়ে দিলো। ঘটনার আকস্মিকতায় পিহু যেনো ভ্য*বা-চ্য*কা খেয়ে বসলো। সারফারাজের দু’হাতের মাঝে পিহুর হাত জোড়া বন্দী। সারফারাজ পিহুকে একবার চোখ টিপ দিয়ে বললো……

—”হেরে গেলে তো! এবার কি হবে তোমার হুম?”
পিহু বললো…..
—”তারমানে একটু আগে আপনি বুকে ব্য*থার অভিনয় করছিলেন?”
—”হুম হুম।”
পিহু দাঁতে দাঁত চেপে বললো…..

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৫)

—”খারাপ লোক কোথাকার। ছাড়ুন আমায়। ভয় পাইয়ে দিয়ে ধরেছেন আপনি। এটাকে আসলে জেতা বলে না। চিটারি করা বলে। আপনি একটা চি*টার, বা*টপ….!”
সারফারাজ পিহুর কথা শেষ করার পূর্বেই ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিলো। চুমুর প্রভাব এবার গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করলো। নিজের অর্ধাঙ্গিনীর মাঝে পুরোপুরি ডুবে গেলো সারফারাজ৷

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩১