ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৫
মুশফিকা রহমান মৈথি
স্নিগ্ধর পিঠে, কাঁধে এলোপাতাড়িভাবে কিল, ঘুষি মারতে লাগলো কাঞ্চন। তার পা ছটফট করছে। শিং মাছ পানি থেকে তুললে যেমন ছটফট করে কাঞ্চন তার একবিন্দু ব্যতিক্রম নয়৷ নাকের পাটা ফুলিয়ে রাগী স্বরে সে বললো,
“স্নিগ্ধ ভাই আমাকে নামাও!”
স্নিগ্ধ নির্বিকার। আসলেই কি তার শরীর সিমেন্ট দিয়ে তৈরি? পঞ্চাশ কেজির একটি মেয়েকে রীতিমত বস্তার মত করে ঘাড়ে তুলে সে হাটছে। একেবারে নিজের পার্ক করা কুচকুচে কালো গাড়িটার কাছে যেয়ে চাবির বোতাম চাপলো। গাড়ি আনলক হলো। ফ্রন্ট সিটের দরজাটা খুলে একরকম আছাড় মারার মতো বসালো কাঞ্চনকে। কাঞ্চনের শুভ্র মুখ রাগে লাল হয়ে আছে। ঠোঁটের উপর জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। স্নিগ্ধ বা হাতে তার হাত দুটো মুঠোবন্দি করে হাত হাতের বুড়ো আঙ্গুল বুলালো ঠিক ঠোঁটের উপরে। কাঞ্চন কেঁপে উঠলো। রাগী চোখে তাকাতেই স্নিগ্ধ ভারী স্বরে শুধালো,
“পুলিশ স্টেশনে হাবি আর এখন ভাইয়া? বিশ্বভণ্ড। ব্যপার না। ওয়াইফ আলোর পথে আনাই পারফেক্ট হাসবেন্ডের দায়িত্ব।”
বলেই গ্লাভ বক্সের ভেতর থেকে একটা লম্বা দড়ি বের করলো। কাঞ্চনের বোঝার আগেই সে কাঞ্চনের হাতজোড়া বেঁধে ফেললো। কাঞ্চন রক্ত চোখে বললো,
“এটা কি করছো?”
“আমার জাতীয় পাখিকে বাঁধছি যেন পালাতে না পারে।”
কাঞ্চনের হাত বাঁধা শেষে, গাড়ির বেল্ট বেধে দিলো তার গায়ে। তারপর সশব্দে বন্ধ করে দিলো দরজা। নিজে বসলো ড্রাইভিং সিটে। কাজিনমহল এখনো নিজেদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বাড়ির পথের ঠিক বিপরীত দিকে তীব্র বেগে স্নিগ্ধর গাড়িটা চলে গেলো। রিদম প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে বললো,
“চাপামাসির বেঁচে ফিরার চান্স কত!”
“জিরো!”
তাকবীর উত্তর দিলো। তাশদীদ হাত তুলে সদ্য আলো ফুটবে ফুটবে করা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
“চাপামাসির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। রেস্ট ইন পিস।”
তারপর হাত নামিয়ে বললো,
“ওর মিলাদে কি খাব?”
“জিলাপি খাবো না। তেহারিকে সেট করা হোক!”
রিদমের কথায় অঞ্জনা চশমা ঠিক করে বললো,
“তোরা কি জানিস তোরা ভাই নামে কলঙ্ক?”
“তাহলে কি নাম বদলে কলঙ্ক রেখে দিব? ফেরদৌস পটনভী কলঙ্ক? ইটস নট গিভিং!”
রিদমের কথায় অঞ্জনা দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,
“তাশদীদের সাথে থাকতে থাকতে তুই ওর মতো জাউড়া হয়ে যাচ্ছিস!”
“এই আমাকে টানিস না। ও আগেই জাউড়া ছিলো, আমি শুধু অনুঘটক। যা ওর জাউড়ামিকে তরান্বিত করি!”
“এই তোর ছুটি শেষ হয় না কেন! যা ভাগ চিটাগং। এখানে তুমি পলুশ্যন বাড়াচ্ছিস।”
তাশদীদ বাঁকা হেসে বললো,
“আমি চলে গেলে মিস করবি আমাকে!”
“জীবনেও না।”
“তোর ভালো লাগবে ঝামেলাহীন বোরিং লাইফ? আমি তোর স্বাদহীন একঘেয়ে জীবনের লবণ-মরিচ। এভাবে দুরছাই করিস না বিল্লি!”
অঞ্জনা স্থির চোখে তাশদীদের সৌম্য মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইলো। কিছু না বলেই তাশদীদের হাতের ছিলে যাওয়া অংশে একটা চাপ দিলো। মারামারির সময় চামড়া ছিলে গিয়েছিলো। রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে আছে অংশটা। চাপ পড়ায় নীল হয়ে উঠলো মুখটা। অথচ বেয়াদব ছেলেটার ঠোঁটের এখনো সেই গা জ্বলানো হাসি। তাশদীদ বাঁকা হেসে বললো,
“তোর দেওয়া যন্ত্রণাও আমার কাছে অমৃত লাগে রে জংলি বিল্লি!”
পিচ ঢালা পথে স্নিগ্ধের কালো গাড়ির চাকা পিষছে। এখনো ভোরের আলো ফুটে নি। আকাশ কালো হয়ে আছে। বৃষ্টি হয়েছিলো একটু আগেই। তাই প্রকৃতি কেমন ভেজা ভেজা। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। গাড়ি চলছে তবে খুব কম। তাই স্নিগ্ধের গাড়ির বেগ বাড়ানো। বাতাসের গতিতে চলছে। সে ডান হাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছে। বাম হাতে কাঞ্চনের হাতের লাল দড়ির একাংশ। কাঞ্চন হাত নাড়াচ্ছে কিন্তু বাঁধন বিন্দুমাত্র ঢিলে হচ্ছে না। দড়িটা এমন ভাবেই বাঁধা যেন হাত না ছুটে আবার কাঞ্চনের হাতেও ব্যাথা না লাগে। হাত ছাড়ানোর জন্য টানাটানি করলে তখন দড়ির গায়ে ঘষা লেগে জ্বলুনি অনুভব হচ্ছে। আসামীদের দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে লোকটা এখন দড়ি বাঁধায় এক্সপার্ট হয়ে গেছে। কাঞ্চন ক্লান্ত হয়ে গেলো। বাঁধা হাত কোলের উপর রেখে বিরক্ত গলায় বললো,
“এই আমি কি গরু?”
“কে যেন ওই ছেলেদের পেটে মাথা দিয়ে গুতো দিয়েছিলো!”
কাঞ্চন নিচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে চেপে ধরলো। স্নিগ্ধের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাস্তায় উপর আবদ্ধ। কাঞ্চন ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“আমি ক্রিমিনাল না।”
“একটু আগে কে যেন জেলে ছিলো!”
“হাতে ব্যথা করছে, স্নিগ্ধ ভাই!”
আহ্লাদী স্বরে কথাটা বললো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ এবার দৃষ্টি সরিয়ে তার মুখোপানে চাইলো। নির্ঘুম, ক্লান্ত, তৈলাক্ত মুখ। মাথার উঁচু করে বাঁধা ঝুটিটা ঢিলে হয়ে কিছু ছোট চুল খুলে এসে মুখে ভীড় করেছে। খুব অসহায় মায়া মায়া চাহনী। স্নিগ্ধ একপলক তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“হাত নাড়াস না। ব্যথা করবে না।”
“আমি কি পালিয়ে যাবো? আর গাড়ি লক করা। আমি চাইলেও বের হতে পারবো না।”
“তোর কি বিশ্বাস? কাচ ভেঙ্গে ফেলতে পারিস। গাড়ির ইএমআই এখনো শেষ করি নি৷ ভাঙ্গলে গৎসা আমার যাবে।”
কাঞ্চন না চাইতেও হেসে ফেললো। কেডস খুলে পা তুলে বসলো সিটে। স্নিগ্ধ দড়িটা কোলে রেখে কাঞ্চনের সিটটা পেছনে সরিয়ে দিলো। ফলে গা এলিয়ে দিলো কাঞ্চন। টিটকারির স্বরে বললো,
“আমাকে নিয়ে দেখছি তোমার বিশাল চিন্তা! আজাইরা!”
“আমার একমাত্র হাড্ডি তুই! তোকে ছাড়া অন্যদের নিয়ে ভাবার ইচ্ছে বা অবকাশ আমার নেই!”
কথাটা খুব দৃঢ় স্বরে কথাটা বললো সে। কাঞ্চন দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ভেজা রাস্তা, সদ্য আলো ফুটতে থাকা আকাশ এবং ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দেখতে মন্দ লাগছে না। নির্ঘুম চোখের পাতায় ঘুমদেবী ভর করেছেন। আর খুলে রাখা সম্ভব নয়। একটা সময় চোখ বুজে ফেললো কাঞ্চন। তলিয়ে গেলো গভীর ঘুমে। যখন চোখ খুললো তখন নিজেকে একটা অপরিচিত জায়গায় দেখলো। এটা কোথায়? সে বুঝতে পারলো না। তবে সারি সারি গাড়ি পার্ক করে রাখা। গ্যারেজে কি তারা? কিন্তু এটা তো পটনভী মঞ্জিলের গ্যারেজ নয়। স্নিগ্ধ তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে? এখন বাজেই বা কয়টা? মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখলো বন্ধ হয়ে আছে। চার্জার অবশ্য ব্যাগে আছে। কিন্তু গাড়িতে চার্জ দেওয়ার সিস্টেমটা সে জানে না।
বাহিরে আলো নেই। গ্যারেজের মধ্যে সাধারণত আলো থাকে না খুব একটা। স্নিগ্ধ ভাইয়ের গাড়ির গ্লাসটাও কালো। সাউন্ডপ্রুফ তাই কোনো শব্দও কানে আসছে না। কাঞ্চন অনেকটা সময় গ্লাসের ভেতর থেকে দেখে বোঝার চেষ্টা চালালো। কিন্তু গাড়ি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কাঞ্চন পাশে তাকাতেই দেখলো স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে তাদে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে স্নিগ্ধ। তার মুখটা ক্লান্ত লাগছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ধাঁরালো কাটা কাটা চেহারার এই পুরুষটি অসম্ভব সুদর্শনের কাতারে পরে। পুরু ভ্রু, তীক্ষ্ণ চোয়াল, খাড়া নাক, আর অব্যক্ত অহমিকা– এই পুরুষের কুৎসিত স্বভাব ব্যতীত কোনো খুঁত কি আছে? খুঁত দৃষ্টিনন্দন হয়ে চোখে লাগে। স্নিগ্ধর ঠোঁটের ঠিক নিচে একটা তীল আছে। খুব খেয়াল না করলে নজরে আসে না। এই তিলটাও সুন্দর। কপালের উপর চুলগুলো পড়ে আছে অবহেলায়। ফলে ঘুমন্ত মুখটা মায়া মায়া লাগছে। যত্নহীন মানুষও এতোটা সুন্দর হতে পারে? কাঞ্চন ঠিক কতটা সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার জানা নেই। তবে ঘুমন্ত মানুষটাকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। ঠিক সেই সময় চোখ মেললো স্নিগ্ধ। ঠোঁটের কোনে হাসি এঁটে বললো,
“গুড মর্নিং ওয়াইফি।“
কাঞ্চন সাথে সাথেই চোখ সরিয়ে নিলো। ফলে স্নিগ্ধর ঠোঁটের হাসি আরোও বিস্তৃত হলো। হাতের ভেতরে থাকা দড়িটা ছেড়ে সে গাড়ি থেকে বের হলো। কাঞ্চনের পাশের দরজাটা খুলে বললো,
“বের হ।“
“পারবো না। পায়ে ব্যথা করছে। হাটতে ইচ্ছে করছে না।“
ভুল অবশ্য বলে নি কাঞ্চন। লম্পটগুলোর সাথে মারামারির সময় পা মুচকে গিয়েছিলো। এতোসময় ব্যথা অনুভব হয় নি। এখন পায়ের পাতা টনটন করছে। স্নিগ্ধ কিছু সময় তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো। মুখ তুলে হাওয়ায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর নিগূঢ় স্বরে বললো,
“ডোন্ট ব্লেম মি দেন।“
বলেই কাঞ্চনের মাজা এক হাতে টেনে ঘাড়ে তুলে নিলো আবার। এতো দ্রুত কাজটা করলো যে কাঞ্চন বুঝতে পারলো না ঠিক কি হলো। সে আবার স্নিগ্ধের কাঁধের উপর থেকে বেয়ে ঝুলে আছে। রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
“আমি বস্তা না, মানুষের বাচ্চা।“
“টোল্ড ইউ।“
স্নিগ্ধ ওভাবেই তাকে ঘাড়ের উপর রেখে গাড়ির দরজা ধরাম করে বন্ধ করলো। চাবির বাটন দিয়ে গাড়ি লক করে হনহন করে লিফটের কাছে গেলো। কাঞ্চনের হাত বাঁধা সে কিল ঘুষিও মারতে পারছে না স্নিগ্ধকে। শুধু গজগজ করছে,
“নামাও আমাকে স্নিগ্ধ ভাই।“
“কল মি হাবি, স্টেশনে তো পীরিত উতলে যাচ্ছিল।“
“নামাও আমাকে।“
“বউয়ের পায়ে ব্যথা, আদর্শ স্বামী আমি। এতো কষ্ট কি তাকে দিতে পারবো?”
“নটকা পুরুষ একটা।“
“ওয়ার্ন করেছিলাম। তুই শুনিস নি।“
লিফটে উঠে সেভেন বাটন চাপলো স্নিগ্ধ। লিফটেও কাঞ্চন তার ঘাড়েই ছিলো। সিমেন্টের বস্তার ঘাড়টা কি দিয়ে বানানো। আরে ভাই, সবাই জানে তোর বডি আছে। বাইসেপ আছে, সিক্স প্যাক আছে। তাই বলে কি সেটা ফ্লেক্স করবি। কাঞ্চন হাল ছেড়ে দিলো। তার মাথা ঘুরাচ্ছে ক্ষিধেতে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে লোকটা সেটাও জানা নেই। মেরে টেরে ফেলার ধান্দা? সেদিন ক্রাইম পেট্রোলে দেখেছে, স্বামী স্ত্রীকে একটা ফ্লাটে এনে তাকে মেরে ফেলেছে। এই লোককে এক চিলতে বিশ্বাস করে না কাঞ্চন। অবশ্য তার ব্যাগেও ইমার্জেন্সি কিট আছে। উলটাপালটা দেখলেও সেও ব্রুসলি হয়ে যাবে।
সাত তলায় লিফট থামলো। লিফটের দরজা খুললো। একটা এপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ালো স্নিগ্ধ। মাথা সোজা করে একবার দেখলো কাঞ্চন। বাদামী রঙ্গের কাঠের নেমপ্লেটের উপর গোল্ডেন রঙ্গে লেখা “Mr Sarfaraz Potnavi, Mrs Parijat Potnavi”। লেখাগুলো দেখে কাঞ্চনের মস্তিষ্ক জমে গেলো। তার নাম কেন এই নেমপ্লেটে? তাও স্নিগ্ধ ভাইয়ের সাথে। স্নিগ্ধ গেট খুললো। প্রবেশ করলো ভেতরে। লাইট জ্বালাতেই আলোকিত হলো অন্ধকার ঘর। ঘরটা বন্ধ থাকায় কেমন বদ্ধ বদ্ধ একটা গন্ধ নাকে লাগছে। অথচ ফ্লাটটা অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো। দরজা খুলতেই একটা প্যাসেজ। প্যাসেজ পার হয়েই বিশাল ডাইনিং রুম। স্নিগ্ধ সেই ডাইনিং টেবিলে বসালো কাঞ্চনকে। কাঞ্চন চারপাশটা দেখলো। মাথার উপর ঝুলন্ত ছোট একটা ঝাড়বাতি। বদ্ধ বদ্ধ গন্ধ লাগলেও কোথাও কোনো অপরিষ্কারের ছোঁয়া নেই। সব ঝা চকচকে। ডাইনিং রুমে ওয়াল শো কেস। তার পাশ থেকে চলে গিয়েছে সিড়ি। বাসাটা ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট। কাঞ্চন আশপাশটা দেখে মৃদু গলায় বললো,
“এটা কোথায়?”
“খুলনা।“
“তোমার নিজস্ব ফ্লাট?”
“না, আমাদের নিজস্ব ফ্লাট। বাহিরের নেমপ্লেট দেখিস নি?“
“তোমার কিছুই আমাদের নয়। একবছর পর আমাদের নাম এমনেই আলাদা হয়ে যাবে।“
“একবছর পর্যন্ত তো জড়িত থাকবে। ততদিন এটা আমাদের ফ্লাট।“
কাঞ্চন ফ্লাটের ডেকোরেশন, ফার্নিচার, আর্কিটেকচার দেখে অনুমান করতে পারছে লোকটা কি পরিমাণের শৌখিন! স্নিগ্ধ ভাইয়ার কত টাকা? তার বেতনের টাকায় করা এটা? ঘুষ খায় নাকি? এতো বেশি টাকা হওয়া সম্ভব না। কাঞ্চনকে তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকাতে দেখে স্নিগ্ধ তার গাল টিপে বললো,
“ঘুষের টাকা না। মা আমাদের গিফট করেছে বিয়েতে।“
“তা আমাকে এখানে আনার কারণ কি?”
“ব্রেইনসেলগুলো কি টায়ার্ড? শর্ট টাইম মেমোরি লস? ডিড ইউ ফরগেট এবাউট দ্যা পানিশমেন্ট?”
“মানে?”
কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো কাঞ্চনের। স্নিগ্ধ তার দিকে ঝুকে এলো। লম্বা দেহটাকে বাঁকালো। দু হাত রাখলো কাঞ্চনের দু পাশে। কাঞ্চনের চোখে চোখ রেখে বলল,
“আগামী সাতদিন এই ফ্লাটে আমার কাছে একা থাকতে হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সাতদিনে তুই ডিসিপ্লিনড হবি। যদি না হস আরোও বাড়বে দিন। নানাজান তোকে জাতীয় পাখি বানিয়ে দিয়েছেন। তাইতো রাত বিরাতে জেল থেকে তোকে ছাড়াতে হয়। স্বামী হিসেবে স্ত্রীকে লাইনে আনা আমার কর্তব্য। এটাকে মিনি হানিমুন হিসেবেও ধরতে পারিস।“
“ইমপসিবল। আমি বাড়ি যাব।“
“ওয়ে নেই। আমি নানাজান, মাকে জানিয়ে দিয়েছি।“
“আমাকে সাতদিন নিজের সাথে আটকে রাখবে? হাউজ এরেস্ট? এটা মানবাধিকার বিরোধী জানো না?”
কাঞ্চন রাগে কাঁপছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে। স্নিগ্ধ তার নাক ছুঁই ছুঁই করে এগিয়ে এলো। ফিঁচেল কণ্ঠে বললো,
“তেজস্ক্রিয় মৌলদের সতর্কতার সাথে ডোন্ট টাচ সাইন দিয়ে রাখতে হয়। তাদের যেখানে সেখানে রাখাটাই বরং মানবাধিকার বিরোধী।”
“আমি তেজস্ক্রিয় মৌল?”
“তুই তার থেকেও ডেঞ্জারাস।”
“তাহলে তো তোমার সবচেয়ে বেশি ভয় থাকা প্রয়োজন। একা ফ্লাটে তোমাকে খু ন করে ফেললেও কেউ টের পাবে না।”
স্নিগ্ধ এবার গাঢ় স্বরে বলল,
“Try it. I will try something else.”
কাঞ্চন সন্দিহান চোখে তাকালে সে বললো,
“যতবার তুই অবাধ্য হবি, আমি তোকে চুমু খাব।“
কাঞ্চনের চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। স্নিগ্ধ শিরদাঁড়া টান টান করে দাঁড়ালো। আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল,
“নাস্তা কি খাবি? এখন এগারোটা বাজে। তেমন কিছু পাওয়া যাবে কি না শিওর না।”
“তোমার মাথা খাবো।“
“শিওর মাই ওয়াইফি।“
বলেই তার কপালে চুমু খেলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন তার উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে কেঁপে উঠলো। চোখজোড়া বিস্ফারিত হলো। কপাল দু হাতে চেপে ধরে গর্জে উঠলো,
“এটা কেন?”
“থিংক।“
কাঞ্চন আশেপাশে তাকিয়ে কাঁচের গ্লাস সাজানো দেখলো টেবিলে। হাত ভাঙ্গা তাই সে নিতে পারলো না। কিন্তু চেষ্টা চালাল। স্নিগ্ধ তার এমন কাজে বেশ মজা পেলো। ফলে তার হাতের দড়িটা না খুলেই নাকে চুমু আঁকলো। কাঞ্চনের শরীর ঝাঁকুনি খেলো। স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বললো,
“মাথায় যে খোড়াপাতি আইডিয়া আসছে ঝেড়ে ফেল। নয়তো আজকে চুমুতে রেকর্ড গড়ে ফেলবো আমি। নেক্সট চুমুটা তোর ঠোঁটে হবে।“
“স্বপ্ন দেখো। সাহস থাকলে হাতটা খুলো।“
স্নিগ্ধ ঝুঁকে এলো তার দিকে। গাঢ় স্বরে বললো,
“একটু ফ্রেশ হয়ে নেই ওয়াইফি।“
“ভয় পাচ্ছো?”
“বউকে ভয় পাওয়া স্বামীর কর্তব্য।“
“তুমি একটা আসামী।“
স্নিগ্ধ এবার কাঞ্চনের থুতনি আঙ্গুল দিয়ে উঁচু করলো। গালে চুমু আঁকলো। গভীর চুমু। সেই চুমুতে কেঁপে উঠলো কাঞ্চন। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। স্নিগ্ধ গাঢ় স্বরে বললো,
“তুই সাপ হলে আমি ওঝা। তুই বাঁদর হলে আমি মাদারী। তুই ওল হলে আমিও তেঁতুল। হ্যাভ ফান হাড্ডি।“
বলেই পকেটে হাত গুঁজলো। কাঞ্চনকে টেবিলের উপর বসিয়ে রেখে সেই সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলো। ঠিক তখনই একটা গ্লাস তীব্র বেগে ছুড়ে এলো তার দিকে। একটুর জন্য তার গায়ে লাগে নি। গ্লাসটা দেওয়ালে লেগে ঝনঝন করে ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়লো সিড়িতে। স্নিগ্ধ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলো কাঞ্চন তার হাতের দড়ি খুলে ফেলেছে। মেয়েটি এতো সময় ইচ্ছে করেই দড়িটা খুলে নি। তার গা কাঁপছে রাগে। স্নিগ্ধ কিছু সময় তাকিয়ে থেকে একপ্রকার ছুটে এসে তার কোমল কটিদেশ চেপে ধরল সে। কাঞ্চন নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু তার পূর্বেই স্নিগ্ধের বা হাত চলে গেলো চুলের ভেতরে। আগ্রাসী উষ্ণ ঠোঁটজোড়া চেপে ধরলো কাঞ্চনের নরম ঠোঁটজোড়া। স্নিগ্ধের পুরু ঠোঁটের স্পর্শে সারা শরীর ঝনঝন করে উঠলো কাঞ্চনের। তার মস্তিষ্ক কাজ করা থামিয়ে গেলো। চোখ স্থির হয়ে গেলো। মনে হলো অন্তস্থলে তীব্র ভূমিকম্প হলো। সেই কম্পনের মাত্রা রিকটার স্কেলে মাপা সম্ভব নয়। হুশ যখন ফিরলো ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠলো। সাথে সাথেই স্নিগ্ধের আগ্রাসী ঠোঁটে, জিহবায় কামড় বসিয়ে দিলো। একটু পর তীক্ষ্ণ রক্তের স্বাদ লাগলো জিহবায়। অবাক চোখে স্নিগ্ধের দিকে চাইলো সে। স্নিগ্ধ এক বিন্দু নড়লো। চুমুর লাগাম টানলো স্নিগ্ধ নিজ ইচ্ছায়। তার ঠোঁট লাল হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের কোনে রক্ত। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের সেই রক্তটা মুছে গাঢ় স্বরে বললো,
“আমি জাউড়া কিসিমের লোক কাঞ্চন। তোর এই সামান্য আঘাতে আমার কিছু হবে না।“
কাঞ্চন থরথর করে কাঁপছে। সজোরে নিজের ঠোঁট মুছতে সে ব্যস্ত। স্নিগ্ধের চোয়াল শক্ত। স্থির চোখে সে কাঞ্চনকে দেখছে। মাথার শিরা দপদপ করে জ্বলছে। বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে সে নিজেকে শান্ত করলো। কপালের চামড়া টেনে খুব অসহায় স্বরে বললো,
“ফ্রেশ হয়ে নে। আপাতত বিশ্বযুদ্ধ স্থগিত। তবে যত অবাধ্য হবি, আমি ততটাই ডেস্পারেট হব। ডোন্ট চ্যালেঞ্জ মি।“
“গো টু হেল।“
বলেই কাঞ্চন হনহন করে উপরে উঠে গেলো। উপরে মোট তিনটে ঘর। একটা লিভিং রুম। দুটো ঘর তালাবদ্ধ। একটা ঘর খোলা। অর্থাৎ এখানেই থাকতে হবে। শয়তান গুন্ডা কোথাকার। ওয়াল আলমারির স্লাইডিং ডোরটা খুলতেই দেখলো একপাশে অনেকগুলো টিশার্ট এবং প্লাজো। সব তার পছন্দ অনুযায়ী, আতরাঙ্গি। বাথরুমে শ্যাম্পু থেকে শুরু করে টুথপেস্টটাও কাঞ্চনের পছন্দ অনুযায়ী। কাঞ্চনের বুকে দাউ দাউ করে আগুণ ধরছে। এই শয়তান লোকটা চায় কি? এসব করলে সে গলে যাবে? জোর করে সংসার হয়? কি প্রমাণ করতে চায় সে? মোবাইলটা চার্জে দিয়ে গোসল করলো সে।
গোসল থেকে বের হতেই দেখলো স্নিগ্ধ নাস্তা নিয়ে এসেছে। পরোটা, ডাল, কলিজাভুনা। তার গায়ে শার্ট নেই। শুধু ট্রাউজার পরা। পেটানো তামাটে শরীরটা উন্মুক্ত। কফির কাপ দুটো রাখা। কফি স্নিগ্ধ নিজ হাতেই বানিয়েছে। ভাবটা এমন যেন একটু আগে কিছু হয় নি। এতো নাটুকে লোকটা! চুল মুছতে মুছতে ঘরের বড় জানালার কাছে দাঁড়ালো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ কফি হাতে এসে দাঁড়ালো তার পেছনে। ভারী স্বরে বললো,
“খাবার ঠান্ডা হচ্ছে। অনেকক্ষন কিছু খাস না। কফি তোর পছন্দ অনুযায়ী বানানো। দুধ, চিনি দেওয়া।“
“আমাকে হাউজ এরেস্টে রেখে দরদ দেখানো হচ্ছে? এটা ইললিগ্যাল, জানো না!”
স্নিগ্ধের ঠোঁট ফুলে গিয়েছে। খয়েরি ঠোঁটের কোনটা লাল হয়ে আছে। সে ফিঁচেল কণ্ঠে বললো,
“এটাকে সংসার করা বলে হাড্ডি।”
“অসহ্য! এই তোমার জামা নেই? নেংটা ঘুরো কেন?”
“ইউ লাইকড ইট। ডায়েরিতে তো আমার নেকেড বডির ছবিও আঁকাতি।“
কাঞ্চন ঠোঁট কামড়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। বিতৃষ্ণা ভরে বললো,
“চুতিয়া ছিলাম। বুঝতাম না।“
“এখন?”
“আমার চোখ খুলে গেছে।“
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৪
“যা দেখি সেটা তো ভুলও হতে পারে।“
“তোমার মতো শয়তানকে বুঝতে আমার ভুল হয় নি।“
স্নিগ্ধর চোখের দৃষ্টির ধাঁর বাড়লো। চোয়াল শক্ত হলো। ঠিক তখন-ই ফোন বেজে উঠলো কাঞ্চনের। কাঞ্চন কথা থামিয়ে ফোনটা হাতে নিলো। তার চোখ মুখ উজ্জল হলো। সেই উজ্জ্বলতা তীক্ষ্ণ চোখে দেখলো স্নিগ্ধ। তীক্ষ্ণতা বাড়লো যখন কানে এলো, কাঞ্চনের হাস্যজ্জ্বল স্বরে,
“হ্যালো, আব্দুল্লাহ?”………
