Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৬

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৬

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৬
মুশফিকা রহমান মৈথি

স্নিগ্ধ বিছানায় বসলো। চুমুক দিলো নিজের কালো কফিতে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে তার স্ত্রীর দিকে। স্ত্রীর সেদিকে লক্ষ নেই। সে কথা বলতে ব্যস্ত। ঠোঁটে হাসি। গলায় উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। আবদুল্লাহ নামক ব্যক্তিটি ঠিক কি এমন বলছে যে এতো প্রফুল্ল হতে হবে। কথা বলতে বলতে কাঞ্চন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। স্নিগ্ধ প্রায় সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো। তার কপালের রেখা কুঞ্চিত হলো। সরফরাজ পটনভী কখনো ঈর্ষান্বিত হবে এটা কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয়। তাই নিজের মন যখন মস্তিষ্ককে শুধালো,

“জ্বলছে?”
মস্তিষ্ক কঠিন স্বরে উত্তর দিলো,
“না, চিন্তা হচ্ছে। এই পাগলী নতুন কোনো ঝামেলায় না পড়ে।”
হাস্যকর যুক্তি। কারণ ঝামেলায় পড়ার কোনো চিহ্ন নেই। কাঞ্চন শুধু একটা আবদুল্লাহ নামের ছেলের সাথে কথা বলছে। কথা বলতে বলতেই ফিরে এলো কাঞ্চন। অপ্রতীভ স্বরে বললো,
“রিচ হচ্ছে না রে! আচ্ছা এক কাজ কর, তোকে কিছু ক্লিপ দিচ্ছি। তুই এডিট করে মেইল করে দে।”
একটু পর সে আবার বললো,
“আরে আমি ঢাকার বাহিরে। এডিট করতে পারবো না। কিছু ক্লিপ নিয়েছি। ভয়েস রেকর্ড করে পাঠাচ্ছি। রাখছি।”
ফোনটা কাটতে যেয়েও কাটলো না। উলটো মুখ, নাক কুঁচকে বললো,
“আসলে?”

স্নিগ্ধ স্ত্রীর প্রতিটার মুখোভাব অবলোকন করছে। কথাগুলো তার মাথার উপর থেকে যাচ্ছে। তাও বোঝার চেষ্টা করছে। ঠিক কি নিয়ে এই আবদুল্লাহ নামক ব্যক্তির সাথে এতোটা কথা বলা যায়? ছোকরাটা আসলে কে? স্নিগ্ধর জানা মতে কাঞ্চনের কাজিনমহলের বান্দরের গ্রুপ ব্যতীত খুব একটা বন্ধুবান্ধব নেই। সে তার ক্লাসে খুব একটা মিশতো না। পটনভী মঞ্জিলে, কাজিনমহলের সামনে বিচ্ছু কাঞ্চন বাহিরে চুপচাপ, নিঃসঙ্গ।
স্নিগ্ধর মনে আছে একবার স্কুলল থেকে কাঞ্চনদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। স্কুল থেকে লালবাগ কেল্লা এবং আহসান মঞ্জিলে ছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হবে। বিষয়টা সকলের জন্য খুব আনন্দায়ক হলেও, কাঞ্চনের ক্ষেত্রে ছিলো না। ঘুরতে যাওয়ার দিন সকালে পেটে ব্যথার অজুহাত দিয়ে সে স্কুলেই যায় নি। পরে জানা গেছে, তার কোনো বন্ধু নেই স্কুলে। পৃথুলা এবং অঞ্জনা ভিন্ন স্কুলে পড়তো। সে কারণে কাঞ্চনের স্কুল ভালো লাগতো না। কখনো স্কুলের পিকনিক বা কোনো অনুষ্ঠানে সে যেত না। কলেজে উঠে পৃথুলাদের কলেজেই ভর্তি হলো সে। ভার্সিটিও একই। কাঞ্চনের কোনো বন্ধু বা বান্ধবী কে কখনো বাসায় আসতেও দেখে নি সে। তাই আবদুল্লাহ নামক ছেলেটির বিষয়ে তীব্র কৌতুহল জাগছে।

কাঞ্চনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে। আবদুল্লাহ নামক ব্যক্তিটি তাকে এমন একটা কথা বলছে যা তার মন আনন্দে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কথাটা কি? এই স্নিগ্ধের প্রতিনিয়ত খাওয়া কালো কফি বিরক্তিকর এবং তেঁতো লাগছে। অথচ এই কালো কফি সে প্রতিনিয়ত খায়। এক্সপ্রেসো খেতে তার ভালো লাগে। সরাসরি ক্যাফেইনটা মস্তিষ্ক সজাগ করে ফেলে। সেই পৌনে পাঁচটা থেকে ড্রাইভ করে সে খুলনায় এসেছে। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে যাচ্ছে। কিন্তু কফি কোনো কাজে দিচ্ছে না। উলটো স্নিগ্ধের মস্তিষ্ককোষগুলো “আবদুল্লাহ” নামক একটা জীবানুকে প্রতিহত করতে ব্যস্ত। এই জীবানুর উৎসটা জানা দরকার।
অবশেষে কাঞ্চনের কথা বলা শেষ হলো।ফোনটা কেটে কাঞ্চন ফড়িং এর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে এলো স্নিগ্ধের কাছে। তার ফেলে রাখা কফির কাপটা হাতে নিলো। কাঞ্চনের কফিটা ক্যাপাচিনো। স্নিগ্ধের বাড়িতে কফি মেশিনও আছে ব্যাপারটাতে মজা পেলো কাঞ্চন। তাও দামি কফি মেশিন। এই কফিমেশিনে ক্যাপাচিনো বানানো যায়। লোকটা কতটা বড়লোক! ভাবতেই অবাক লাগে। সে স্নিগ্ধর কাছে এলো। স্নিগ্ধর হাত ধরে টেনে বললো,
“উঠো!”

স্নিগ্ধ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। আবদুল্লাহ নামক জীবানুর সম্পর্কে কিছু শুধানোর সুযোগ পেলো না সে। তার পূর্বেই স্নিগ্ধর হাতে মোবাইল ধরিয়ে কাঞ্চন বললো,
“যখন বলবো শুধু হাতের একটা সুন্দর ছবি তুলবে। পারবে?”
বলেই স্নিগ্ধকে টেনে জানালার কাছে নিয়ে এলো। তারপর নিজের হাতের কফির কাপটার সাথে স্নিগ্ধর হাতের কফির কাপের সাথে মিলিয়ে একবার এঙ্গেল চেক করে বললো,
“এখন তুলো!”
স্নিগ্ধ তার বিস্ময় প্রকাশ করার সুযোগ পেলো না। যন্ত্রের মতো ছবি তুললো। ছবিটা তুলতেই কাঞ্চন ছোঁ মেরে মোবাইলটা নিলো। ছবি দেখে তার পছন্দ হলো না। মুখ ভসকিয়ে বললো,
“ছবি তুলতেও পারো না?”
স্নিগ্ধ এখনো শান্ত, কৌতুহলী চোখের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। কাঞ্চন খোঁচা মেরে বললো,
“যেভাবে ঠা ঠা করে গুলি করো, আমি ভেবেছি তুমি এঙ্গেল বুঝো। ধ্যাত। নাও আবার তুলো। আমার দিক থেকে সুন্দর হবে না।”

স্নিগ্ধ আবারও ছবি তুললো। মনের মধ্যে বহুল প্রশ্ন কিন্তু সেই প্রশ্নগুলো ব্যক্ত করার সুযোগ পেলো না স্নিগ্ধ। একটু আগে এই নারী তার গায়ে গ্লাস ছুড়েছে। একটুর জন্য গায়ে লাগে নি। তার ঠোঁট কামড়ে ফুলিয়ে দিয়েছে। অথচ সে এখন তার সাথে ছবি তুলছে! তাও কাপল ভাইবের ছবি। অবশেষে চৌত্রিশ বারের সময় স্নিগ্ধর ছবি কাঞ্চনের পছন্দ হলো। সে ছবিটা দ্রুত এডিট করলো। তারপর ক্যাপশন লিখলো,
“Sweet breakfast with my SALTY Person❤️”
স্নিগ্ধ কাঁধের উপর থেকে দেখলো। মৃদু স্বরে বললো,
“Person!”
কাঞ্চন একটু ধাক্কা খেলো। ভ্রু কুচকে ফেললো সাথে সাথে। ব্যাকস্পেস চিপে কাটলো শব্দটা। লিখলো,
“Sweet breakfast with my SALTY Enemy❤️”
বলেই পোস্ট করলো সে। স্নিগ্ধর ঠোঁটের কোনে হাসি উন্মোচিত হলো। অনেকটা গর্ববোধ প্রকাশ পেলো সেই হাসিতে। মুখটা কাঞ্চনের কাঁধের উপরে ছুঁই ছুঁই অবস্থায় রেখে গাঢ় স্বরে শুধালো,

“এটা কি হচ্ছে!”
“বিয়েকে ক্যাপিটালাইজ করছি!”
“মানে?”
“আমার পেজে রিচ হচ্ছিলো না। গত এক সপ্তাহে একটা ডলারও ইনকাম হয় নি। তাই রিচ বাড়ানোর পায়তারা করছি। আজকের দিনে বর সংক্রান্ত পোস্টে ধুমা রিচ। একটু ট্রাই করছি। যদি রিচ হয় তাহলে আই উইল সেল ইট!”
“তোর বরের ছবি দেখে মানুষের কি লাভ? এতে রিচ কিভাবে বাড়বে?”
“তুমি কি বুমার নাকি? বয়স কত?”
স্নিগ্ধ কঠিন চোখে তাকাতেই কাঞ্চন চোখ ঘুরালো। তারপর বললো,
“দেখো, এখনের জেনারেশন অনেক আনহ্যাপি। তারা রিয়েল লাইফ থেকে রিল লাইফের প্রতি বেশি আগ্রহী। এজন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের পেট চলে। ওরা নিজেদের লাইফের থেকে আমাদের লাইফের প্রতি বেশি ইনভল্ভড। আমার কিছু ফ্যান আছে। আমাদের এই ইনফ্লুয়েন্সারদের আবার ফ্যান ক্লাবও থাকে। এখন যদি আমি ছবি দিয়ে রিচ পাই, আমার ফ্যানেরা এডিট বানাবে, তাদের রিচ হবে। এতে আমার আরোও রিচ হবে। এভাবেই চলছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমার পেজে মনিটাইজেশন অন। রিচ মানে ডলার, ডলার মানে পাইসা। বুঝছো?”

স্নিগ্ধ হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো নিজের স্ত্রীর দিকে। বরকে সে সেল করবে? বিস্ময় দমিয়ে স্বাভাবিক স্বরে শুধালো,
“এজন্য তুই নিজের হ্যাপি মোমেন্টস শেয়ার করবি? আগে তো এগুলো এজ মেমোরিজ হিসেবে রাখতাম আমরা!”
“এখন শো অফের দুনিয়া। রিলেভেন্সির দুনিয়া। তুমি চাইলে তোমার একটা পেজ খুলে দিতে পারি। ব্লগ করবে, কোন খুনিকে কিভাবে মেরেছো, কাদের কিভাবে ধরছো। তোমাদের দিন কেমন কাটে। ভাই মানুষ হেঁদিয়ে আছে দেখার জন্য। একচুয়ালি না, পডকাস্টিং শুরু করি। তুমি সেখানে তোমার সব এক্সপেরিয়েন্স গুলো শেয়ার কর। কি বল, করবে? সেদিন একটা ভিডিও দেখলাম, হাসবেন্ড ওয়াইফকে তাদের দশ বছর বিয়ের উপলক্ষে আবার বিয়ের জন্য প্রপোজ করেছে, ভিউ কত জানো? সাত মিলিয়ন। সাত মিলিয়ন মানুষ ওদের দ্বিতীয় বিয়ের জন্য বসে আছে। আমাদের কি যায় আসে? কিন্তু এভাবেই দুনিয়া চলে। দেখো, আমি চেয়েছি ট্রাভেল ব্লগার হতে। কিন্তু এখন সেটা হতে পারছি না। খুব একটা রিচও আসছে না। পেজ তো চালাতে হবে।“
স্নিগ্ধর মস্তিষ্কে এখনো কথা বোধগম্য হচ্ছে না। সে কি ক্রাইম এবং ক্রিমিনালের জগতে এতোটাই জড়িয়ে গেছে সে নতুন জেনারেশনের এই চিন্তাধারাগুলো তার মাথায় ঢুকছে না? ফেসবুক খুব বেশি চালানো হয় না তার। মিশন এবং কাজ ব্যতীত যা একটু সময় পায় সেটুকু এই মেয়েটাকে সোজা করতে করতেই চলে যায়। চোখের দুকোন চেপে ধরে বললো,

“তাই বলে নিজের বিয়ে?”
“বিয়ে করে কোনো তো লাভ হোক আমার। দেখো, মেন্টাল স্ট্যাটাস তো এই বিয়ের দ্বারা আমার নষ্ট হয়েই গেছে অন্তত ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাটাস ঠিক হোক। আফটার অল আমি বিজনেসওম্যান।”
“এমন করে কি লাভ? নিজেদের পার্সোনাল মোমেন্ট অন্যদের দেখায়ে কি লাভ?”
“পাইসা! বললাম তো।”
“তোর অভাব টাকার!”
“অনেক!”
সাথে সাথে স্নিগ্ধ তার মানিব্যাগটা বিছানার পাশের টেবিল থেকে নিয়ে ধরিয়ে দিলো কাঞ্চনের হাতে। গাঢ় স্বরে বললো,
“মাসে বিয়াল্লিশ হাজার টাকা আমার স্যালারি। বাপের ফেলে আসা ব্যবসার টাকাও আছে। এই ডুপ্লেক্স বাড়িটা তোর নামে, কারণ আমার নামে সম্পদ রাখতে পারবো না। শুধু বাড়িটাই না। আমার সব সম্পত্তি তোর নামে ট্রান্সফারড হবে। তোর চাহিদা কি এর থেকে বেশি?”
স্নিগ্ধের অহং মোড়ানো কথাটা গায়ে লাগলো কাঞ্চনের। হাতে থাকা মানিব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে বললো,
“আমি কি ফকিন্নি? তোমার একটা টাকা আমার চাই না!”
“আমাকে সেল করা টাকা চাই?”

“এই তোমার একা বিয়ে হয়েছে? বিয়েটা আমারও। আমি আমার বিয়ে ক্যাপিটালাইজ করতেছি। আমি তো তোমার ফেস রিভিল করতেছি না। করবোও না।”
“আমার হাতের ছবি তো পোস্ট করছিস। ওইটা করলি কেন?”
“তুমি না আমার পার্ফেক্ট হাসবেন্ড? পার্ফেক্ট হাসবেন্ডের কাজ ওয়াইফকে সাপোর্ট করা।”
“আমার ওয়াইফ কুয়ার পড়তে গেলে আমি সাপোর্ট করতে পারবো না।“
“মারা খাও।“
স্নিগ্ধ এবার অধৈর্য্য হয়ে গেলো। সিলিং এর দিকে চেয়ে ফু করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। নিজের সংযম হারালো না। কাঞ্চনের চোখ তখন এঁটে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। সে দেখতে ব্যস্ত তার লাইক। প্রথম মিনিটে ৩ টা, দ্বিতীয় মিনিটে ১২ টা, তৃতীয় মিনিটে ৩০টা। কাঞ্চন মোবাইলে মনোযোগী হওয়ায় স্নিগ্ধ বাধ্য হয়ে ছোঁ মেরে মোবাইলটা নিয়ে গেলো। কাঞ্চন ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,

“দাও মোবাইল।“
“আগে নাস্তা।“
“এই বুড়া আব্বা টাইপ বিহেভ করতে তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো?”
“নাস্তা!”
“অসহ্য!”
নাস্তা খেতে খেতে কলিংবেল বাজলো। কাঞ্চনের ফোনটা পকেটে পুরে স্নিগ্ধ দরজা খুললো। দারোয়ান বাজার নিয়ে এসেছে। বাজারগুলো নিতে নিতে বললো,
“কত হয়েছে?”
“স্যার দুই হাজার টাকা।“
“নাও”
কড়কড়ে এক হাজার টাকার দুটো নোট আর একটা দুশো টাকার নোট দিয়ে বললো,

“থ্যাংকিউ।“
“কিছু লাগলে জানায়েন।“
“আচ্ছা।“
কাঞ্চন সিড়ির কাছে এসে শুধালো,
“কে এসেছে?”
“বাজার।“
“রান্না কে করবে।“
“আমার বউ।“
“মগের মুল্লুক নাকি?”
“নাহ, আপনার অবাধ্যতার শাস্তি। না রাঁধলে খাবার নেই। ডিসাইড।“
“ফুড পান্ডা তো আছে।“
“দারোয়ানকে বললে সে রাইডার ঢুকতে দিবে না।“
খুব নির্লিপ্ত ভাব। স্নিগ্ধ ডাইনিং টেবিলের উপর বাজারগুলো খুলতে লাগলো। সব ঠিকঠাক এনেছে কি না দেখছে। কাঞ্চন রাগী স্বরে বললো,
“বদলা নিচ্ছো?”
“না, জাস্ট তোরে ডিসিপ্লিনড করছি। আমি গোসল করতে করতে তুই দেখ কি বানাতে পারিস। আমি আলু, মুরগী, ডিম সব আনিয়েছি। ভর্তা পারলে ভর্তা, ভুনা পারলে ভুনা। আই ডোন্ট মাইন্ড।“
“আর কিছু রাঁধলে?”
“আমার ক্ষুধা লাগে না খুব একটা। দু-তিন বেলা না খাওয়াটা আসলে আমার জন্য বিষয় না। থিংক এবাউট ইউরশেলফ।“
“ধ্যাত।“
বাজারগুলো সব গুছিয়ে ফেললো স্নিগ্ধ। তারপর উপরে উঠে এলো। কাঞ্চনের সামনে দাঁড়ালো। তর্জনী দিয়ে তার থুতনি তুলে বললো,
“বউয়ের হাতের রান্না খাওয়ার জন্য আমি উদ্গ্রীব।“

নাস্তা শেষে নিচে এলো কাঞ্চন। নিচের তলায় ড্রয়িং রুম, ডাইনিং আর কিচেন। একটা সারভেন্ট রুম এবং বাথরুমও আছে। ঘর টা এতো চমৎকার করে সাজানো যে এখানে সিমেন্টের বস্তা না থাকলে এখানেই থেকে যেত। রান্নাঘরটাও খুব পরিপাটি। চিমনি বসানো চুলার উপর। চুলাটাও বেশ দামী। ফুপুকে একটা ধন্যবাদ দিতে হয়। এতো সুন্দর ডুপ্লেক্স ফ্লাট তার নামে লিখে দেওয়ার জন্য।
মুরগীটা কাটার ঝামেলা নেই। পিস করেই আনা। ভুনা মুরগী আর খিঁচুড়ি রাধবে? নাকি ভর্তা ভাত? প্রথমে পেঁয়াজ কেটে নিলো। আদা, রসুন ছুড়ালো। বাটতে হবে। ব্লেন্ডারে। এর মধ্যে তেল গরমে বসালো। তেল গরম হতে হতে ভাবলো একটু ফেসবুকের অবস্থা দেখে আসা যাক। ভাগ্যিস লোকটা মোবাইল রেখে গেছে। ফেসবুকে ঢুকতেই দেখলো মাত্র একঘন্টায় পোস্টে বারোশ লাইক। রিচ প্রায় ত্রিশ হাজার। ডলারের সাইনে ০.০৯ ডলার জমেছে। পেজের সবচেয়ে রিচড পোস্ট এটা। শুধু তাই নয়। কমেন্টে আর কমেন্টে ভরে গিয়েছে।

“মাশাআল্লাহ।“
“হাউ সুইট!”
“আপু আপনি বিবাহিত?”
“আমি তো হাতের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।“
ইত্যাদি কমেন্ট। মেসেঞ্জারের গ্রুপে ১০২টা ম্যাসেজ। নিশ্চিত পটনভীদের ফিডেও চলে গেছে। তারা পাগল হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আবদুল্লাহর ফোন এলো। আবদুল্লাহ কাঞ্চনের পেজের এডিটর। ছেলেটা খুব ভালো কাজ পারে। তাই যেকোনো সময় কাঞ্চন তার কাছেই সাহায্য চায়। হুটহাট রেস্ট্রিকশনে যেন কোনো ঝামেলা না হয় সেজন্যই একটা এডিটর রাখা। আবদুল্লাহ ফোন ধরতেই বলে উঠলো,
“এটা তো সেই হিট করেছে রে? রিচ আর রিচ। কমেন্টের রিপ্লাই দিস।“
“আমিও তো সেটাই দেখছি।“
“বাই দ্যা ওয়ে, হাসবেন্ড?”
“না ফুফাতো ভাই।“
“কন্টেন্ট?”
“ওমন-ই। রাখি, আমি রিপ্লাই দিচ্ছি।“

কাঞ্চন মজলো কমেন্টের রিপ্লাই দেওয়ার কাজে। এদিকে চুলায় যে সে তেল বসিয়ে এসেছে তার খেয়াল নেই। একটা সময় তেল পুড়তে পুড়তে কড়াইতে আগুন ধরে গেলো। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো কড়াই। লেলিহান শিখা ধীরে ধীরে বাড়ছে। চুলার উপরের সিলিং, পাশের টাইলস কালো হয়ে যাচ্ছে। কাঞ্চন তখন ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইল চাপছে। হঠাৎ মাথা তুলে দেখলো রান্নাঘর কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। মোবাইলটা রেখে রান্নাঘরে ঢুকতেই কাঞ্চন জমে গেলো। দাউ দাউ করে কড়াই জ্বলছে। সে ভুলেই গিয়েছিলো সে চুলা জ্বালিয়ে এসেছে। দ্রুত চুলার নব ঘুরিয়ে অফ করলো সে। আগুনের উচ্চতা বাড়ছে। একটু হলেই নিচে গ্যাসের সিলিন্ডার। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো কাঞ্চনের। এতো খামখেয়ালিপনা সে কি করে করলো। আগুণ নিভাতে হবে। তাই বোকার মতো এক মগ পানি ঢেলে দিলো সে কড়াইয়ে। অমনি শিখা আরোও বেড়ে গেলো। সাথে সাথে তার হাতে লাগল সেই শিখা। ফর্সা হাত মুহূর্তে ভাপে লাল হয়ে গেলো। সেদিকে অবশ্য কাঞ্চনের খেয়াল নেই। তার মাথা কাজ করছে না। ফলে চিৎকার করে স্নিগ্ধকে ডেকে উঠলো,
“স্নিগ্ধ? স্নিগ্ধ?”

স্নিগ্ধ মাত্র গোসল সেড়ে বের হতেই স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পেলো। ফলে একরমক ছুটে নিচে নামলো সে। পুরো ঘর কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। স্নিগ্ধ দ্রুত রান্নাঘরে প্রবেশ করলো। কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে রান্নাঘর। পলকের মধ্যে সে কাঞ্চনকে টেনে নিজের বিশাল শরীরের পেছনে আঁড়াল করলো। দ্রুত একটা ঢাকনা চেপে ধরলো কড়াইয়ের উপর। তারপর লুচনি দিয়ে কড়াইটা ধরে বেসিনে পানির কল ছেড়ে তার নিচে রেখে দিলো। পানি স্রোতে আগুণ নিভে গেলো। স্নিগ্ধ সিদ্ধহস্তে সব জানালা খুলে দিলো নিচের। যেন ধোঁয়াটা বের হয়ে যায়। রান্নাঘরের সিলিং, টাইলস কালো হয়ে গেছে। এবার স্নিগ্ধ ফেটে পড়লো রাগে,
“কি করছিলি তুই? মনোযোগ কোথায় থাকে? আগুণ ধরলো কি করে?”
“আমি ভুলে গেছিলাম, তেল দিয়ে?”
অপরাধী কণ্ঠে উত্তর দিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধর চেহারা আরোও কঠিন এবং রক্তিম হয়ে উঠলো। নিজের চুল টেনে ধরলো সে। রাগে তার গা কাঁপছে। ঘামছে সে। নিজের রাগ দমিয়ে বললো,
“ভুলে কি করে যাস? আর ইউ কিডিং মি?”
“ফোনে কথা বলছিলাম।“
“হোয়াট!“
“আসলে…”

“ইউ নো হোয়াট, আই এম ডান। তোর রেসপন্সিবিলিটি কেউ নিতে পারবে না। সামান্য দায়িত্বজ্ঞান নেই তোর। একটু হলে পুরো ঘরে আগুন ধরে যাইতো। ইউ আর ফাকিং ইররেসপন্সিবল। মানুষ ভুল থেকে শিখে কাঞ্চন। বড় হইছিস তুই। ইউ আর নট এ কিড। তেইশ বছর বয়স তোর। আর এগুলোকে পয়েন্টাউট করলে আমি ভিলেন। ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া, কি হতে পারতো?”
কাঞ্চন মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো, কোনো কথা বললো না। স্নিগ্ধর রাগ হচ্ছে। প্রচন্ড রাগ। কিন্তু সেটাকে সে প্রকাশ করতে পারছে না। কাঞ্চন তার গেঞ্জির কোন হাতের ভেতরে মুঠোবন্দি করে দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধ শীতল গলায় বলল,
“কাঞ্চন, আমি যথেষ্ট চেষ্টা করছি। তোর সাথে ধৈর্য্য ধরে আমি সংসার করার ট্রাই করছি। এমন কিছু করিস না, যে আমার নিজের আফসোস হয়। প্লিজ অন্তত একটু দায়িত্বজ্ঞান বাড়া। লাইফ ইজ নট এ জোক।“
“সরি, আমার জন্য তোমার ঘর পুড়তে গিয়েছিলো। কত লস হত!”
স্নিগ্ধ কিছু সময় শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চনের গলা ধরে গেছে। সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নত রাখায় চোখ দেখা যাচ্ছে না। তবে চোখে পানি টলটল করছে নিশ্চিত। স্নিগ্ধ অধৈর্য্য গলায় বললো,
“ইটস নট এবাউট মাই হাউজ ইডিয়েট।“
বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো সে। কাঞ্চন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এই ভুলটার জন্য সে অনুতপ্ত। সত্যি-ই অনুতপ্ত।

দিবার আলো সন্ধ্যার কালোয় একেবারেই মুছে গেছে। আকাশে মেঘ জমেছে। ফলে আকাশটা আরোও কালো লাগছে। স্নিগ্ধ ঘরের লাইট জ্বালালো। দুপুরের খাওয়া তাদের হয় নি। কাঞ্চনের সামনে সে এতটা সময় যায় নি। তার রাগ হচ্ছিলো। রাগের সময় তার মাথা ঠিক থাকে না। সে একবার এমন ভুল করেছে। এবার এমন ভুল করতে চায় না। তাই নিজেকে একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। রাগ পড়তেই নিজেদের ঘরে গেলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন শুয়ে ছিলো। স্নিগ্ধ পকেটে হাত পুরে বললো,
“খাবি না?”
কাঞ্চন নড়ে চড়ে উঠলো। নরম স্বরে বললো,
“ভালো লাগছে না।“
স্নিগ্ধ কিছু বললো না। বড়বড় পায়ে ধুপধাপ করে এগিয়ে এলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন কিছু বলার আগেই সে তাকে কোলে তুলে নিলো। কাঞ্চন হতবাক স্বরে বললো,
“কি সমস্যা?”
“আমার ক্ষুধা লেগেছে। রান্না করবো এখন।“
“আমি কি করবো?”
“বসে থাকবি। আই কান্ট লিভ ইউ এলোন। এটা তোর পানিশমেন্ট।“
বলেই বড় বড় পা ফেলে সিড়ি দিয়ে নামলো। কাঞ্চন অধৈর্য্য গলায় বললো,
“আমার পা আছে।“
“জানি।“

রান্নাঘরের কিচেন কাউন্টারের উপর বসালো কাঞ্চনকে। কাঞ্চনের পরনে একটা বার্বি ছাপা টিশার্ট। চুল উপরে মেসি বান করে রেখেছে। তবে মুখশ্রী ভীষণ বিষন্ন। স্নিগ্ধ ভালো করে মুরগীটা ধুলো। তারপর চুলায় কড়াই বসালো। একে একে সব মশলা দিলো। মশলা কষিয়ে এলে মুরগীটাও দিলো। কাঞ্চন পা গুটিয়ে কাউন্টারে বসা। সে অবাক নয়নে স্নিগ্ধের দক্ষ রান্না দেখছে। একটা সময় বলেই বসলো,
“তুমি রান্না করতেও পারো?”
“টুকটাক!”
“বাহ, তোমার বউ তো তাহলে খুব লাকি!”
“এই বাক্যটা আমি বলতে পারলে খুব খুশি হতাম। কিন্তু আফসোস, আমার বউ রান্নার নামে ঘর জ্বালিয়ে দেয়।”
কাঞ্চন অপরাধী স্বরে বললো,
“ওটা এক্সিডেন্ট ছিলো। আমিও রান্না পারি। কিন্তু আমি তোমার জন্য রাঁধবো না।”
“তাহলে তো বিষয়টা তোর সাজানো বলতে হয়। তুই যে ধান্দাবাজ। হয়তো আমাকে মারার প্লান এভাবেই করছিস! থাক, রান্না করেই খাবো না হয়। তাও চান্স নিতে পারবো না।”
স্নিগ্ধের কথায় না চাইতেও হেসে উঠলো কাঞ্চন। খোঁচা মেরে বললো,

“উরি বাবা, র‍্যাবের অফিসার দ্যা গ্রেট সরফরাজ পটনভী ভয় পায়!”
“পারিজাত পটনভীকে ভয় পেতে আমি বাধ্য।”
“ঢং! মরিচ মেখে দিব ন্যাকামি করলে।”
স্নিগ্ধর ঠোঁট বাকলো মৃদু। বা হাতে চুল টেনে পেছনে নিলো। পেশীবহুল হাত মুরগী নাড়ছে। মুরগী কষে এসেছে। এখনো পানি দিবে। কৌতুকভরে বলল,
“মরিচ মার্কা জবান আর গোলমরিচ মার্কা স্বভাব তো তোর আছেই। আর মাখার প্রয়োজন নেই। চুমু খেলেই যথেষ্ট। তোকে বিয়ে করার পর আমি গৌতম বুদ্ধের মতো হয়ে গেছি। এমন চলতে থাকলে এক বছরে আমাকে চাকরি বাকরি ছেড়ে কখন হিমালয়ে চলে যেতে হয় ঠিক নেই। আমার স্থান হবে হয় পাবনা নয় হিমালয়। আমি শিওর।”
“আমার মেন্টাল হেলথ বিগড়ায়ে এখন ঢং করছো? আমাকে ছেড়ে দাও বেঁচে যাই।”
“মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো ধরি নি, হাড্ডি। আমি এর শেষ দেখবো।”
“দেখো, আমি আটকাবার কে? পাবনায় গেলে চিঠি পাঠাবো নে। আর হিমালয়ে কবুতর।”
“আমার তো ভিন্ন কিছু মনে হয়! আই থিংক উই আর কম্পেটিবল। আচ্ছা দেখ তো সব ঠিক আছে কিনা?”
বলেই একটা চামচে একটু তরকারী নিয়ে দু বার ফু দিয়ে কাঞ্চনের মুখের কাছে ধরলো। কাঞ্চন একটু খেয়ে বললো,

“ঝাল অনেক।“
“তাই?”
বলে নিজেও একটু খেলো। আসলেই ঝাল হয়েছে। কাঞ্চন সাথে সাথেই বললো,
“আলু দেও, ঝাল কমে যাবে।“
“কাটি নি তো।“
“আমি কাটছি।“
“সাবধানে। পিলার ওখানে রাখা। ছুলিয়ে দে। আমি কেটে নিচ্ছি।“
“আমি পারি।“
বলেই কাউন্টার থেকে নেমে গেলো কাঞ্চন। সুন্দর মতো আলু ধুঁলো। ছোট ছোট করে কাটলো। একটা আলাদা কড়াই বসিয়ে সেখানে হালকা করে ভেজে নিলো। তারপর স্নিগ্ধর মুরগীতে দিয়ে দিলো। হাত ধুঁতে ধুঁতে শুধালো,
“ভাত বসিয়েছো?”
“না।“
“কত টুকু বসাবো?“
“রাইসকুকারের পটের দু পট বসা।“
“এতো কম!“
“আমি বেশি ভাত খাই না। আমি সালাদ খাব।“
“তুমি কাটো তোমার সালাদ। আমি ভাত বসাচ্ছি।“
বলেই চাল ধুঁয়ে ভাত রাইস কুকারে বসিয়ে দিলো। স্নিগ্ধ শসা আর টমেটো কেটে নিল। মুরগী প্রায় হয়ে গেছে। সে আবার কাঞ্চনকে খাওয়ালো,

“কেমন?”
“কি জানি মিসিং”
নিজেও একটু খেলো স্নিগ্ধ। মুখটা একটু কুঁচকে বললো,
“কিছু একটা মিসিং ঠিক-ই, কিন্তু কি?”
“একটু চিনি দাও তো।“
“চিনি?”
“হ্যা, ফ্লেবার ভালো আসবে। দাও।“
“নষ্ট হয়ে যাবে তো।“
“আরে ধ্যাত, তুমি কি মাস্টারশেফ এমেরিকাতে যাচ্ছো নাকি। খাব তো তুমি আর আমি। দাঁড়াও আমি দিয়ে দিচ্ছি।“
বলেই শেল্ফ থেকে চিনির বয়াম নামালো। অল্প একটু চিনি ছড়িয়ে দিলো কাঞ্চন। এরপর নাড়াচাড়া করে চামচে অল্প একটু নিয়ে টেস্ট করলো। গর্বিত স্বরে বললো,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৫

“নাউ ইটস পারফেক্ট।“
স্নিগ্ধর ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হলো। সে কাঞ্চনের কাঁধে থুতনি ঠেঁকিয়ে বললো,
“জাস্ট লাইক আওয়ার রিলেশন। ডোন্ট ইউ থিংক? এই রান্নার মতো আমরাও আমাদের ম্যারেড লাইফটাকে ব্যালেন্স করতে পারি। যদি তুই চাস।“

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here