Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৭
মুশফিকা রহমান মৈথি

“তারপর একদিন তোমার মনে হবে এই ব্রাটটাকে আর সহ্য হচ্ছে না। প্যারাসাইট হয়ে চুষে খাচ্ছে সব। তখন আমার কি হবে?”
স্মিত স্বরে ঠোঁটে সূক্ষ্ণ হাসির রেখা এঁকে কাঞ্চন কথাটা বললো। কথাটার ভার এতোটাই ছিলো যে সরফরাজ পটনভী নড়েচড়ে উঠতে বাধ্য হলো। সূক্ষ্ণ অসন্তোষের রেখা ফুটে উঠলো মুখে। অসন্তোষটা কাঞ্চনের উপর নাকি নিজের উপর বোঝা গেলো না। কাঞ্চন নিরুত্তাপ। তার মনোযোগ মুরগী রান্নায়। ঝোল টেনে এসেছে। আলু সেদ্ধ হয়ে গিয়েছে, চুলা বন্ধ করতে হবে। স্নিগ্ধ মেরুদন্ড টানটান করে দাঁড়ালো। কোনো কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। রোদে পুড়ে তামাটে মুখখানা কেমন শক্ত হয়ে গেছে। কাঞ্চন চুলা বন্ধ করে ডাইনিং টেবিলের বিশাল ওয়াল শো কেস থেকে একটা ফুল ডিজাইনের বাটি বের করলো। সেটা পরিষ্কার করে মুছে মুরগীটা ঢাললো। সুন্দর লাগছে। একটা ছবি তুলতে হবে।

ভাত হয়ে এসেছে। সালাদগুলো একটা হাফ প্লেটে সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলটা গুছালো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ বুকে হাত বেঁধে এক দৃষ্টিতে স্ত্রীকে দেখছে। মেয়েটা একটা নমুনাই বটে। উড়ণচণ্ডী, লাফাঙ্গা কিসামের মেয়েরা ঘর গৃহস্তর কাজে হয় লবডঙ্ক। কিন্তু কাঞ্চন তেমন নয়। সে যে পারদর্শী তাও নয়। তবে কাজ পারে। টেবিল গুছিয়ে বেশ কয়েকটা ছবি তুললো সে। পেজে পোস্ট করবে। গতছবিতে বর্তমানে ৫কে এর মতো লাইক। এই ছবিটা পোস্ট করে দেখতে চায় রেসপন্স কেমন!
ক্যাপশন লিখলো,
“দুজনে মিলে করি কাজ,
খারাপ হোক, ভালো হোক
নাহি লাজ❤️”
ফোনটা রেখে দেখলো স্নিগ্ধ পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে মুখে চিন্তার রেখা। কাঞ্চন ভাত বাড়তে বাড়তে বললো,

“আসেন মহারাজ! খেয়ে ধন্য হই!”
স্নিগ্ধ খাওয়ার পুরোটা সময় চুপ ছিলো। কাঞ্চন খেতে খেতে বলছিলো,
“রান্নাটা ভালোই হয়েছে বলো।”
“হুম”
“তোমার ভালো লাগছে না?”
“হুম”
“হুম হুম করছো কেন? শব্দ হারিয়ে গেছে?”
স্নিগ্ধ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“তুই কি খাওয়ার সময় এভাবেই ভোটর ভোটর করিস!”
“হ্যা, করি। চুপচাপ খেতে ভালো লাগে না। কেন মিস্টার হাসবেন্ড! বিরক্ত লাগছে!”
“নাহ, অভ্যস্ত নই যে। কান নিতে পারসে না।”
“ইশ! কেন কানকে টর্চার করছো?”
“কিছু পেতে হলে কষ্ট করতে হয়!”
কাঞ্চন মুখ বাঁকিয়ে বললো,

“ঢং বাদ দেও। গা পিত্তি আমার জ্বলে যায়।”
স্নিগ্ধ একটা শসার টুকরা মুখে পুরে ঠোঁটে ফিঁচেল হাসি ছড়িয়ে বললো,
“পৃথিবীতে যদি একটা পাগল থাকে সেটা তুই। তবুও আমার বউ হিসেবে তোকেই চাই। শুধু তোকে।”
কাঞ্চনের হাত থেমে গেলো। স্থির চোখে কিছু সময় সে স্নিগ্ধকে দেখলো। পরখ করতে চাইলো সেই শক্ত খুলির ভেতরে যে মস্তিষ্ক আছে তাতে আসলে ঠিক কি চলছে? কিন্তু তার কিসমিসের মতো ব্রেইন কিছু ধরতে পারলো না। হতাশা ছাড়া কিছুই পেলো না। বলে ভাত দ্রুত মাখতে মাখতে বললো,
“এতো জেদি কেন তুমি!”
“রক্তের মধ্যেই ডিফেক্ট। কি করবো?”
“রক্ত খুলে ফেলে দেও। আমি ডোনার জোগাড় করবো। বদ লোক কোথাকার!”
স্নিগ্ধর প্লেটে ভাত কম। দু থেকে তিন লোকমার মতো। তিন চার পিস মুরগীর টুকরো আর গোল গোল করে কাঁটা টমেটো আর শসা। কাঞ্চন আরেকটু ভাত নিতে নিতে বললো,
“এতো কম খেয়ে রাত কাটবে তোমার?”
“আমি তো বরাবর কম খাই হাড্ডি। আমাদের বিয়ের ত্রিশ দিন হতে চললো, তুই খেয়াল করিস নি?”
“ইচ্ছে হয় নি।”
“এখন তো তোর একটু কেয়ারফুল হওয়া প্রয়োজন! এজ মাই প্রোপার ওয়াইফ, আমার খেয়াল রাখার দায়িত্ব তোর।”
“তারপর?”
“মানে?”
কাঞ্চন বিষন্ন স্বরে বললো,

“তারপর আমার ভাগ্যটাও আমার মার মতো হোক। মা যেমন তার সম্পূর্ণটা দিয়ে ওই লোকটাকে ভালোবেসেছে, আর ওই লোকটা একটা সময় বিরক্ত হয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমার কি মনে হয় জানো, বিয়ে জিনিসটা জোর করে হয় না৷ সংসার জোর করে হয় না। এই বিষয়গুলো মন থেকে আসা উচিত। আমার মন থেকে আসছে না। তাই আমি চাইলেও আমাদের ব্যালেন্সড সংসারটা হবে না। এমন হত যে আমি তোমাকে এখনো ভালোবাসি, তাহলে হয়তো আনকনসাস মাইন্ডে এই সংসার সংসার খেলায় আনন্দ পেতাম। সেটাও তো কেস না। আমার মনে হয় তোমারও এই সংসারের মধ্যে নিজেকে জড়ানোর চিন্তা ছেড়ে দেওয়া উচিত। তুমি তোমার ইগোর কারণে নিজের উপর জুলুম করছো। একটা সময় তেঁতো হয়ে যাবে। কারণ অপর পাশ থেকে শুধু শূন্যতা পাবে।”
“তোর মনে হয় আমি নিজের উপর জুলুম করছি? আমি মন থেকে করছি না? ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য করছি?”

“আমি আসলে তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। যতবার তুমি আমার প্রতি দরদ দেখাও আমার কানে তোমার বলা কথাগুলো ভাসে। “আই এম জাস্ট এ প্যারাসাইট৷”। তুমি হয়তো কাউকে ভালোবাসো নি। তাই যে মানুষটাকে তুমি পছন্দ কর, সেই মানুষটার মনে তোমাকে নিয়ে এমন তুচ্ছ ভাবনা খুব পীড়া দেয়। অথচ তুমি একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গিয়েছো আমাদের বিয়ের পর। ইটস কনফিউজিং। তোমার মতে আমি তোমার উড বি ওয়াইফকে পালাতে সাহায্য করেছি। তাহলে আমার প্রতি এতো কেয়ার কেন তোমার?”
প্রশ্নটা আন্দোলিত হলো ঘরে। স্নিগ্ধ কোনো উত্তর দিলো না। সে কঠিন মুখে বসে আছে। কাঞ্চন একটু থেমে বিষন্ন স্বরে বললো,

“মানুষ তোো রাতারাতি বদলায় না স্নিগ্ধ ভাই। আমি কি করে বিশ্বাস করবো তোমাকে? আমার ডায়েরিটা তুমি কি করে পেয়েছো আমি জানি না। জানতে চাইও না। তবে শুধু ডাইরিটার কারণে যদি তুমি আমার প্রতি গিল্ট ট্রিপে ভুগে আমাকে দয়া দেখাও সেটা তো আমি সহ্য করবো না। আমি আমার পার্টনারের কাছ থেকে দয়া চাই না। দয়া একটা সময় ফিঁকে হয়ে যায়। আমার বাবাকে দেখো। একটা সময় মাকে দয়া করতে করতে সে বিরক্তি হয়ে গিয়েছিলো। তারপর সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো। আজকে যখন আমি ঘরে আগুণ লাগিয়ে ফেলেছিলাম তোমার ফ্রাস্ট্রেশন আমি দেখেছি। তুমি জেদের বশে আমার সাথে সংসার তো করতে আগ্রহী কিন্তু আমাকে মেনে নেওয়াটা এতোটা সহজ নয় তোমার জন্য। আমি নিজেকে তোমার জন্য বদলাবো না স্নিগ্ধ ভাই। আমি ব্রাট হই, উচ্ছৃঙ্খল হই, আমি যাই হই। আমি, আমি থাকবো। এই আমিটাকে আমি ভালোবাসি। আমাকে পোষ আনাতে এসো না। তুমি মর্টাল এনিমি হলেও একটা সময় আই ফেল ফর ইউ, তাই তোমার জীবনটা তেঁতো হয়ে যাক আমি চাই না।”

এই প্রথম কাঞ্চন খুব বুঝদার মানুষের মতো নিজের পক্ষ রাখলো। একটা সম্পর্কের ভিত্তি শুধু জেদ হতে পারে না। স্নিগ্ধর মস্তিষ্কে কি চলে সে জানে না। কিন্তু স্নিগ্ধর এই কেয়ারিং স্বভাবটা তাকে যে বিচলিত করছে না এমন না। প্রতিটা মুহূর্তে তার হৃদয়ে বদ্ধ দরজায় এই লোকটার এমন আচরণ কড়া নাড়ছে। কড়াইতে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুণের সামনে স্নিগ্ধ যখন তাকে আড়াল করে দাঁড়ালো এক মুহূর্তের জন্য কাঞ্চনের হৃদয় থমকে গিয়েছিলো। নিরাপত্তার আশ্বাস নাকি ভরসা করার মতো একটা শক্ত কাঁধ– জানে না কাঞ্চন। শুধু এতোটুকু মনে হয়েছিলো মাঝে মাঝে একটা ভরসার স্থান থাকলে মন্দ হয় না। সে মুগ্ধ হয়েছিলো স্নিগ্ধের বিচক্ষণতায়। অবাধ কৃতজ্ঞতাবোধ করছিলো। এমন নিরাপত্তা কি আগে বোধ করেছে? মনে নেই। দুপুর থেকে তার মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে আছে। জটিল প্যাঁচ লেগেছে। সেই প্যাঁচ আরোও ঘন হচ্ছে। স্নিগ্ধ প্লেট নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

“বেশ, এক বছর পরও যদি তোর মনে হয় আমাকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয় তাহলে আই উইল লেট ইউ গো। বাই দ্যা ওয়ে, এই ফ্লাটে একটু সমস্যা আছে।”
“হ্যা!”
“আই ডোন্ট নো, দারোয়ানের থেকে শোনা। হুটহাট নিজের ফ্লাটের মানুষ শব্দ শুনে। চেয়ার টানার, কিছু ফেলানোর। আই ডোন্ট বিলিভ অবশ্য। তবুও যদি তুই আলাদা ঘুমাতে চাস। আমি নিষেধ করবো না!”
সমস্যা আছে মানে কি? ভুত? আত্মা? জ্বিন? কাঞ্চনের খাওয়াটা পুরো চটকে গেলো। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। ভুত যে সে ভয় পায় বিষয়টা এমন না। তবুও গা ছমছম করছে। ফ্লাটটা দুজনের তুলনায় অনেক বেশি বড়। এটাই সমস্যা। কাঞ্চনের ফ্যাকাশে মুখ দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো স্নিগ্ধ। যাওয়ার সময় কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললো,
“বু”
কাঞ্চন কেঁপে উঠলো। স্নিগ্ধর হাসি মুখটা দেখে মেজাজ চটকে গেলো। কাঞ্চন ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
“স্নিগ্ধ ভাই! ভালো হবে না কিন্তু!”
স্নিগ্ধ উত্তর না দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো।

খাবার গুছিয়ে, প্লেট সব ধুয়ে রাখলো দুজন মিলে। সাতদিনের জন্য কাজের মেয়ে খোঁজার প্যারা নিয়ে আগ্রহী নয় স্নিগ্ধ। যদিও স্নিগ্ধ মজা করেছে তবুও আলাদা ঘরে ঘুমানোর সাহস দেখালো না কাঞ্চন। বলা যায় না। ঘুমের মধ্যে চোখ খুলতেই দেখবে দরজার কোনায় ঘাপটি মেরে কেউ বসে আছে। দাঁত বের করে বলবে,
“ভালো আছো? মুড়ি খাবা?”
এতো এডভেঞ্চারও পছন্দ না কাঞ্চনের। তাই স্নিগ্ধের ঘরের ঘুমাতে গেলো। বিছানার মাঝে কোলবালিশের বর্ডার তুললো। স্নিগ্ধ বিষয়টা খেয়াল করে হাসতে হাসতে বললো,
“আমি ঘুমন্ত বোয়াল মাছের সাথে কিছু করতে আগ্রহী নই।”
“তোমার গায়ের উপর উঠে আসা স্বভাব আছে৷”
“বউয়ের গায়ের উপর ই উঠছি। অন্য মহিলার না।”
বলতে বলতে ওয়াশরুমের দরজাটা খুললো সে। অমনি দরজার উপরে রাখা পানি ভর্তি মগ তার মাথার উপর পড়লো। তার পরণের ট্যাংক টপ পুরো ভিজে গেলো। চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। কাঞ্চন হেসে কুটি কুটি হয়ে গেলো। ভেজা চুল গুলো বা হাতে টেনে পেছনে ঠেলে গজগজ করে উঠলো,

“কাঞ্চনের বাচ্চা!”
“এখনো হয় নি। গুড নাইট হাবি।”
বলেই মুখ চাঁদরে ঢেকে ফেললো। রাতের বেলায় আবার জামা বদলাতে হলো স্নিগ্ধের। একটা লাল ট্যাংক টপ গায়ে গলিয়ে চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে দেখলো কাঞ্চন ঘুমে কাঁদা। হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। কিছুটা সময় স্থির নয়নে চেয়ে রইলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চনের ঠিক মুখের কাছে হাটু গেড়ে বসলো সে। দৃষ্টি গাঢ় হলো। আনমনে হাতটা কাঞ্চনের ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই মেয়েটা নড়েচড়ে উঠলো। স্নিগ্ধ মৃদু হেসে হাত সরিয়ে নিল। গাঢ় স্বরে আওড়ালো,
“সারাদিন আমাকে জ্বালিয়ে এখন শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছিস, হাড্ডি। You are a total train wreck, and I’m totally hooked”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৬

সকালে স্নিগ্ধের ঘুম ভাঙ্গলো একটু দেরিতে। ঘর তখন রোদে ঝলমল করছে। স্নিগ্ধ হাত বাড়াতেই দেখলো তার পাশের স্থানটা ফাঁকা। শীতল বিছানা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলো। চোখ মেলে তাকালো আশেপাশে। কাঞ্চন নেই। দু-তিন বার ডাকলো সে। সাড়া পেলো না। কাঞ্চন শুধু ঘরে নয়, বাসাতেই নেই……

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here